অমাবস্যার রাতে

শিশির বিশ্বাস

গল্পটা শুনেছিলাম আসামের এক শহরে জনার্দন চৌধুরীর কাছে৷ ভদ্রলোক একসময় নামি শিকারি ছিলেন৷ সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে ডাক আসত৷ উড়িষ্যা, আসাম আর নেফার জঙ্গলেই কাজ করেছেন বেশি৷ সুন্দরবনেও গিয়েছিলেন একবার৷ এ সেই গল্প৷ ব্যক্তিগত কিছু কাজে সেবার তিনি কলকাতায় গিয়েছিলেন৷ খবর পেয়ে হরেন রায় ধরেছিলেন তাঁকে৷

ভদ্রলোক টিউবওয়েল বসাবার সরকারি কনট্রাকটর৷ সরকার থেকে সুন্দরবনের গ্রাম-গঞ্জে টিউবওয়েল বসানোর কিছু কাজ চলছিল তখন৷ তারই একটার দায়িত্ব পেয়েছিলেন উনি৷ বিভিন্ন গ্রামে কয়েকশো টিউবওয়েল বসাতে হবে৷ কিন্তু কাজে নেমে সমস্যায় পড়ে গিয়েছিলেন শুরুতেই৷

এ সেই পঞ্চাশের দশকের কথা৷ বাদাগ্রামের আর এক নাম তখন আতঙ্ক৷ অনেক গ্রামের শেষে সরু এক খাল৷ পার হলেই বাঘের জঙ্গল৷ ভাটায় জল পর্যন্ত থাকে না৷ থকথকে কাদা৷ সবে দুটো গ্রামে কাজ হয়েছে, তারপরেই একরাতে ক্যাম্পে বাঘের হানা৷ ধূর্ত বাঘ খাল পার হয়ে হানা দিয়েছিল কুলি, মিস্ত্রিদের তাঁবুতে৷ সময়মত জেগে ওঠায় ভয়ানক কিছু না হলেও কুলি, মজুরদের ভিতর তাই নিয়ে বিশাল হইচই৷ এই ভয়ানক জায়গায় কেউ এক দণ্ডও থাকতে রাজি নয়৷ ফিরে যাবে৷

বড় সরকারি কাজ৷ সবে শুরু হয়েছে৷ হরেন রায় তখন সঙ্গেই ছিলেন৷ ব্যাপার দেখে প্রমাদ গণলেন৷ অনেক বুঝিয়ে তাদের শান্ত করা গেলেও বাস্তব অবস্থা বুঝতে ভুল হয়নি৷ কাজ সম্পূর্ণ করতে শুধু কুলি, মিস্ত্রি নয়, একজন জাঁদরেল বাঘ শিকারিও দরকার৷ অগত্যা কাজ সাময়িক বন্ধ করে সেই দিনই ছুটলেন গোসাবায়৷ তারপর লঞ্চ আর ট্রেন ধরে একদিন পরে কলকাতা৷

অভিজ্ঞ ঠিকেদার৷ চেনাজানা কম নয়৷ সামান্য খোঁজখবর করতেই সন্ধান পেলেন জনার্দন চৌধুরীর৷ আসামের নামি শিকারি৷ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতাও আছে৷ সেই মানুষ দিন কয়েকের জন্য কলকাতায় এসেছেন শুনে আর দেরি করেননি৷ ছুটে গিয়ে ধরেছিলেন তাঁকে৷ ভয়ানক এই বিপদ থেকে উদ্ধার করে দিতেই হবে৷ অনেক টাকার সরকারি কাজ৷ যথা সময়ে সম্পূর্ণ করতে না পারলে বদনাম হয়ে যাবে৷ ক্ষতি সবদিক দিয়ে৷

ভদ্রলোকের অবস্থা দেখে জনার্দনবাবু রাজি হয়ে গিয়েছিলেন৷ এরপর আলিপুর অফিস থেকে বাঘ শিকারের পারমিট৷ হরেন রায় তার পরের দিনই ভদ্রলোককে সঙ্গে নিয়ে ক্যানিং লোকাল ধরলেন৷ অদ্ভুত ব্যাপারটা ঘটেছিল সেই যাওয়ার পথেই৷

গোড়ায় ঠিক ছিল ক্যানিংয়ের গেস্ট হাউসে রাত কাটিয়ে পরের দিন ভোরে গোসাবার লঞ্চ ধরা হবে৷ কিন্তু ক্যানিং পৌঁছে যখন শুনলেন, কী এক কারণে সেদিন ভোরের লঞ্চ ছাড়তে পারেনি৷ তাই বেলার দিকে একটা লঞ্চ দেওয়া হয়েছে৷ কাজের তাগিদে দ্বিতীয়বার না ভেবেই চেপে বসেছিলেন তাতে৷

লঞ্চ যখন গোসাবা পৌঁছল বিকেল পড়ে এসেছে৷ পথের হদিস মোটামুটি জানা ছিল৷ অনেক চেষ্টায় ভ্যানরিক্সা জোগাড় করে যখন ঝাউখালি পৌঁছোলেন প্রায় সন্ধে৷ নৌকোয় নদী পার হয়ে ওপারে মোল্লাচক পৌঁছোতে সময় লাগেনি৷ কিন্তু তারপর খোঁজ নিয়ে যা শুনলেন, বেজায় দমে গেলেন তাতে৷ যাবেন কচুবেড়ে৷ এখান থেকে মাঠ বরাবর হাঁটাপথও রয়েছে৷ নভেম্বর মাসে ভেড়ির আলপথও শুকনো৷ ভেবেছিলেন, ভ্যানরিক্সা পেয়ে যাবেন৷ যত রাতই হোক, ক্যাম্পে পৌঁছে যেতে পারবেন৷

‘কিন্তু খবর নিয়ে যা শুনলেন মাথায় হাত পড়ার জোগাড়৷ দু’জনই শহরের মানুষ৷ আজ যে অমাবস্যা কারো খেয়াল হয়নি৷ এমনিতেই এদিকে ভ্যানরিক্সা নেই৷ তার উপর এই অমাবস্যার রাতে ওদিকে কোনো নৌকোও যাবে না৷ রাতে এখানে থাকতে হবে কোথাও৷ কিন্তু চেষ্টা করেও তেমন খোঁজ মিলল না৷ এক প্রাইমারি স্কুল আছে৷ তবে তার দরজার পাল্লা নেই৷ মাটিতে বসে ক্লাস৷ পরিচয় পেয়ে গ্রামের দু’একজন তাঁদের বাড়িতে রাত কাটাতে বলেছিলেন৷ কিন্তু কারো শোবার ঘর একটার বেশি নয়৷

অবস্থা দেখে জনার্দন চৌধুরী শেষে বললেন, ‘হরেনবাবু, পথ যখন বলছেন মাত্র মাইল দশেক, হেঁটেই তো যাওয়া যায়৷ পথ চেনেন?’

হরেন রায় অভিজ্ঞ মানুষ৷ কাজের প্রয়োজনে আগেই খোঁজখবর কিছু নিয়ে রেখেছিলেন৷ বাদা অঞ্চল মানেই ভেড়ির উঁচু আলপথ৷ পাশে কোথাও গ্রাম৷ ভয় একটাই, বাঘের৷ মাথা চুলকে সেই কথাই বললেন৷

জনার্দন চৌধুরী উত্তর দিলেন, ‘বাঘ নিয়ে ভাবতে হবে না৷ পথ চিনে যেতে পারলে বাকিটা আমি সামলে নিতে পারব৷’

অগত্যা সময় নষ্ট না করে মেঠো পথে নেমে পড়লেন ওরা৷ গ্রামে অমাবস্যার রাত৷ পরিষ্কার আকাশে ফুলঝুরির মতো তারার মেলা৷ সেই আলোয় মোটামুটি কাজ চলে৷ সঙ্গে টর্চও রয়েছে৷ কিন্তু সমস্যা হল অন্য ব্যাপারে৷ বেজায় এবড়োখেবড়ো পথ৷ যথেষ্ট সাবধান হয়েও মাঝে মধ্যেই হোঁচট খেতে হচ্ছিল৷ শিকারি মানুষ জনার্দন চৌধুরীর পায়ে হান্টার সু৷ কিন্তু হরেন রায় ধুতি-পাঞ্জাবি-পরা মানুষ৷ পায়ে সৌখিন চটি৷ সমস্যা হচ্ছিল তাঁরই বেশি৷

ঘণ্টা আড়াই একটানা হাঁটার পর হরেনবাবু যেখানে এসে পৌঁছলেন, তার বাঁ দিকে নতুন এক রাস্তা মাঠের ভিতর দিয়ে চলে গেছে৷ নতুন এই পথের কথা কচুবেড়ে গ্রামে শুনেছেন তিনি৷ নাম চাঁদগড়ির রাস্তা৷ পথটা চাঁদগড়ির মাঠের ভিতর দিয়ে সোজা কচুবেড়ের রাস্তায় উঠেছে৷ সময় কম লাগার কারণে এই পথই ব্যবহার করে সবাই৷ কিন্তু সে দিনের বেলা৷ রাতে যায় না কেউ৷ কিন্তু হরেনবাবু আর পারছিলেন না৷ পথ চলতে খুবই সমস্যায় পড়তে হচ্ছিল৷ সঙ্গী জনার্দন চৌধুরীর সঙ্গে পরামর্শ করে সেই চাঁদগড়ির রাস্তাই ধরলেন এরপর৷

খানিক চলার পরেই অবশ্য টের পেলেন কাজটা ভালো হয়নি৷ চাঁদগড়ির এই পথ আরো ভয়ানক! শুধু এবড়োখেবড়োই নয়, কাঁটাঝোপে ভরতি৷ তার উপর অনেক স্থান ভয়ানক সরু৷ সাবধানে পা না ফেললে বিপদ৷ এ ছাড়াও নতুন এক আপদ, মাটি থেকে উঁচিয়ে রয়েছে অজস্র ভাঙা ইটের টুকরো৷ অজ বাদাগ্রামের পথে এত ইট কোথা থেকে এল ভেবে পেলেন না! মাইল খানেক যেতেই নাজেহাল৷ তারই মধ্যে হঠাৎই এক ইটের কানায় হোঁচট খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েই যেতেন হয়তো৷ জনার্দনবাবু সময়মত ধরে ফেলায় রক্ষা পেলেও ডান পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ উড়ে গিয়ে রক্তারক্তি৷ রীতিমতো খোঁড়াতে শুরু করলেন৷

ওই অবস্থায় খানিক চলার পর ভগবান মুখ তুলে চাইলেন বোধ হয়৷ প্রায় আশীর্বাদের মতোই সামনে এক গ্রামের দেখা পাওয়া গেল৷ পথের পাশে প্রথম বাড়িটাই মাটির উঁচু প্রাচীর ঘেরা পাকা বাড়ি৷ মোটা কাঠের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ৷ বার কয়েক ডাকাডাকি করতে দরজা খুলে আলো হাতে এক গৌরবর্ণ দীর্ঘদেহী রাশভারী মানুষ মুখ বাড়ালেন৷ পঞ্চাশের আশপাশে বয়স৷ পরনে গরদের ধুতি৷ গায়ে জড়ানো তারই প্রান্ত৷ কপালে বড় সিঁদুরের ফোঁটা৷ সম্ভবত গৃহকর্তা৷ আলো তুলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখলেন ওদের৷ জনার্দন-বাবুর রাইফেলের দিকে খানিক দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে ভারি গলায় বললেন, ‘কে আপনারা? এই রাতে!’

উত্তরে হরেন রায় সমসার কথা ব্যক্ত করতে উনি ধীর কণ্ঠে বললেন, ‘কচুবেড়ে আরো দুই ক্রোশের মতো৷ পথে সরু খালও পড়বে গোটা কয়েক৷ তার একটার সাঁকো দিন দুই হল আধ-ভাঙা হয়ে রয়েছে৷ অন্ধকারে পার হওয়া মুশকিল৷ এই রাতে বের হওয়া উচিত হয়নি আপনাদের৷’

পায়ের যন্ত্রণায় হরেনবাবু তখন ভেঙে পড়েছেন৷ ভদ্রলোকের কথা শুনে করুণ গলায় বললেন, ‘রাতের জন্য একটু থাকার ব্যবস্থা করা যায় সার?’

ভদ্রলোকের সমস্যা জনার্দন চৌধুরীও বুঝতে পারছিলেন৷ তাই চুপ করে রইলেন৷

‘চন্দ্রবাস ভুইঁয়ার বাড়িতে আশ্রয় চেয়ে কেউ ফিরে যায়নি আজ পর্যন্ত৷ আসুন, আসুন আপনারা৷’ মানুষটি দু’জনকে ভিতরে নিয়ে গেলেন এরপর৷

মাটির উঁচু পাঁচিল ঘেরা চৌহদ্দির ভিতরে পাকা ইটের একাধিক কোঠাবাড়ি৷ রাস্তায় ভাঙা ইটের রহস্য বোঝা গেল এবার৷ যথেষ্টই ধনী পরিবার৷ যে ঘরে ওদের এনে বসানো হল সেটাও পাকা৷ সুদৃশ্য মাদুরপাতা মেঝের একদিকে চমৎকার বিছানা৷ চন্দ্রবাস ভুইঁয়া বললেন, ‘লেঠেলদল থাকলেও রাত বাড়লে দেউড়ি বন্ধ করে শুয়ে পড়ে তারা৷ দেউড়ি খোলা হয় না তারপর৷ তবে দিন কয়েক হল গুরুদেব এসেছেন৷ আজ রাতে তাঁর ঘরে শাস্ত্রপাঠ, পুজোর ব্যবস্থা৷ জেগে ছিলাম সেই কারণেই৷ যাই হোক, বাইরে গামলায় জল আছে৷ হাত-পা ধুয়ে বিশ্রাম নিন৷ কাছেই গুরুদেবের ঘর৷ আমি সেখানেই আছি৷ চিন্তা করবেন না৷’

বাইরে মস্ত মাটির গামলায় জল ছিল৷ দ্রুত হাত-পা ধুয়ে ঘরে এসে শুয়ে পড়লেন ওরা৷ ক্লান্ত দেহে দু’জনের চোখ তখন ঘুমে জড়িয়ে এসেছে, হঠাৎই দরজার বাইরে চন্দ্রবাস ভুইঁয়ার সাড়া পাওয়া গেল, ‘ঘুমিয়ে পড়েছেন নাকি?’

টোকাও পড়ল বন্ধ দরজায়৷ ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন ওরা৷ জনার্দনবাবুই দরজা খুলে দিলেন৷ বাইরে অপ্রস্তুত মুখে চন্দ্রবাস ভুইঁয়া৷ হাত কচলে বললেন, ‘এত রাত বলেই গোড়ায় বলতে পারিনি৷ কিন্তু বাড়িতে অভুক্ত অতিথির কথা শুনে আমার স্ত্রী খবর পাঠিয়েছে৷ যৎসামান্য ব্যবস্থা হয়েছে, চলুন৷’

বিকেলের পর থেকে পেটে কিছুই পড়েনি৷ নানা সমস্যায় মনেও আসেনি৷ মানুষটির কথায় হঠাৎ দু’জনের খেয়াল হল, খিদেয় নাড়িভুঁড়ি জ্বলছে৷ কেউ তাই আপত্তি করলেন না৷

এই রাতেও আয়োজনে ত্রুটি নেই৷ ঝকঝকে কাঁসার থালায় নতুন ধানের সুগন্ধি খই, ভেজানো চিঁড়ে-মুড়ি৷ সঙ্গে গোটা কয়েক করে মর্তমান কলা৷ নতুন খেজুর পাটালি, বড় বড় কদমা আর ফেনি বাতাসা৷ পাশে মস্ত বাটি ভরতি দুধ৷ চুড়ি আর পায়ের তোড়ার শব্দে দরজার আড়ালে মহিলাদের উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছিল৷ তবে কেউ সামনে এলেন না৷ চন্দ্রবাস ভুইঁয়া নিজেই দাঁড়িয়ে থেকে খাওয়ালেন৷ খাওয়া শেষে ঘরে আসতে নক্সাকাটা ছোট এক রুপোর থালায় পানও পৌঁছে দিয়ে গেলেন৷

হরেন রায় তৎক্ষণাৎ একটা পান মুখে দিয়ে শুয়ে পড়লেন৷ আসামের মানুষ জনার্দন চৌধুরীরও পানের নেশা৷ হাতে নিয়ে মুখে দিতে যাবেন, হঠাৎ খেয়াল হল, রাইফেলটা ঘরের কোনে যেভাবে রেখেছিলেন সেইভাবে নেই৷ ইতিমধ্যে কেউ ঘরে এসে হাতে নিয়েছিল৷ পান মুখে দেওয়া হল না, ছুটে গেলেন রাইফেলের কাছে৷ সামান্য দেখেই বুঝলেন ট্রিগার জ্যাম হয়ে রয়েছে৷ অথচ খানিক আগেও ঠিক ছিল৷

পুরনো উইনচেস্টার রাইফেলটা তাঁর বহুদিনের সঙ্গী৷ খুলে লিভার ঠিক করে নেওয়াই যায়৷ সরঞ্জামও সঙ্গে রয়েছে৷ কিন্তু জনার্দন চৌধুরী সেদিকে গেলেন না৷ ততক্ষণে তাঁর বুঝতে বাকি নেই, ধনী জমিদার হলেও সম্ভবত এরা ঠগি৷ সুযোগ পেলে খুন, লুঠতরাজে অভ্যস্ত৷ ভেবেছে টের পাবে না কেউ৷ কিন্তু তিনিও পেশাদার শিকারি৷ থার্ড সেন্সটা বরাবরই প্রখর৷ রাইফেল যে যথাবৎ নেই, চোখ পড়তেই ধরে ফেলেছেন৷

মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে জনার্দন চৌধুরী পাশে হরেন রায়ের দিকে তাকালেন৷ ব্যাপারটা ওনাকেও জানিয়ে রাখা দরকার৷ কিন্তু মানুষটি ইতিমধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছেন দেখে নিবৃত্ত হলেন৷ দরজার ওধারে কেউ হয়তো ওত পেতে রয়েছে৷ শুনে ফেলতে পারে৷ কোমরে শার্টের তলায় হোলস্টারে রয়েছে মাউজার সি, ৯৬ পিস্তল৷ সন্তর্পণে সেটা বের করে বন্ধ দরজার উপর চোখ রেখে থম হয়ে রইলেন৷ দশ রাউন্ড ম্যাগাজিন সহ এই আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে লেপার্ডের মোকাবিলা করেছেন, আর এ তো মানুষ!

কতক্ষণ ওইভাবে বসে ছিলেন, হুঁশ নেই জনার্দনবাবুর৷ ভরপেটে কিছুটা ঝিমুনিভাব এসে গিয়েছিল হয়তো৷ হঠাৎ দরজার বাইরে চাপা ফিসফিস আওয়াজে কান খাড়া হয়ে উঠল৷

‘গুরুদেব, লোকটা পান খায়নি দেখছি! দিব্যি জেগে রয়েছে! হাতে আবার হার্মাদের ছোট বন্দুক!’ চন্দ্রবাস ভুইঁয়ার কণ্ঠস্বর চিনতে ভুল হল না জনার্দন চৌধুরীর৷

‘ঘাঁবড়াসনি বাঁপু,’ খনখনে গলায় সান্ত্বনা দিল অন্য একজন, ‘আমি তন্ত্রাচার্য বিশ্বম্ভর ভট্ট যখন রয়েছি, অন্তত একটা বলির ব্যবস্থা আজ করতে পারব৷ ভাবিসনি৷’

‘তাহলে কী তারা মায়ের কাছে জোড়া বলি আজ পূর্ণ হবে না গুরুদেব!’ প্রায় ডুকরে উঠলেন চন্দ্রবাস ভুইঁয়া৷ ‘ফের অমাবস্যার রাত যে সেই এক মাস পরে! এর মধ্যে শয়তান প্রতাপাদিত্য যদি আমার চন্দ্রগড়ে হানা দেয়, সর্বনাশ হবে যে! হায় হায়!’

‘না, সর্বনাশ হবে না৷ জোড়া বলির ব্যবস্থা না হলেও তারা মায়ের কাছে একটা বলি তো পড়ছে আজ৷ সাময়িক কিছু কাজ তাতেও মিলবে৷ বাকি বলি পরের অমাবস্যায় হলেও চলবে৷ তুই দাঁড়া এখানে৷ আমি বলি নিয়ে আসছি৷’

বাইরে সেই ফিসফিস কথা সবই শুনতে পারছিলেন জনার্দন চৌধুরী৷ কিন্তু সম্পূর্ণ বুঝে উঠতে পারছিলেন না৷ আসামের মানুষ তিনি৷ কার্যসিদ্ধির জন্য নরবলির প্রথা ওখানেও নাকি ছিল একসময়৷ বাংলার এই সুন্দরবন অঞ্চলে সেই প্রথা এখনো চালু রয়েছে ভেবে অবাক হলেন৷ প্রতাপাদিত্য নামে কেউ হয়তো চন্দ্রবাস ভুইঁয়ার জমিদারি দখল করতে চায়৷ কিন্তু থানা-পুলিশ থাকতে তান্ত্রিক দিয়ে তারা মায়ের কাছে নরবলি! ভাবতে গিয়ে কেঁপে উঠলেও মুহূর্তে সামলে নিলেন৷

ঘরে মৃদু প্রদীপ জ্বলছে৷ সেই আলোয় হাতের মাউজার উঁচিয়ে বন্ধ দরজার দিকে তাক করে স্থির হয়ে রইলেন৷

একটু একটু করে সময় পার হয়ে গেলেও দরজা খোলার লক্ষণ নেই তখনো৷ ওই সময় তাঁর হঠাৎ মনে হল, ঘরের ভিতর তৃতীয় কেউ রয়েছে৷ খুব কাছেই৷ তড়িৎ গতিতে চারপাশে চোখ ঘোরালেন৷ কিছুই চোখে পড়ল না৷

জাঁদরেল শিকারি জনার্দন চৌধুরী কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন এবার৷ এমন আগে হয়নি৷ এই থার্ড সেন্স বা অদৃশ্য অনুভূতি শক্তির কারণেই তাঁর শিকারি মহলে সুনাম৷ নির্জন অরণ্যে একা নরখাদক বাঘের মোকাবিলা করেছেন বহুবার৷ ঘরের ভিতর অবশ্যই তৃতীয় কেউ রয়েছে৷ তাহলে দেখতে পারছেন না কেন? থতমত হয়ে তাকিয়ে আছেন৷ হঠাৎ খুব কাছে সেই পরিচিত খনখনে কণ্ঠস্বর, ‘হঁল না রে চন্দ্রবাস, হঁল না৷’ অদৃশ্য কণ্ঠে একরাশ হতাশা ঝরে পড়ল৷

‘কেন, কেন গুরুদেব!’

‘এ যে খুঁতো মানুষ! এক পায়ের নখ উড়ে গেছে৷ রক্তও বের হয়েছে৷ তারা মা এই বলি নেবেন না৷’

দরজার বাইরে চন্দ্রবাস ভুইঁয়া প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন তাই শুনে৷ ঘরের আলোটাও দপ করে নিবে গেল ওই সময়৷ জনার্দন চৌধুরী শুনতে পেলেন তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে হিমশীতল গলায় কেউ বলছে, ‘সঁর্ব সুঁলক্ষণযুক্ত ছিঁলি রেঁ তুঁই৷ পাঁনটা খেঁয়ে নিঁলেই পাঁরতিস৷ মঁহা উঁপকার হঁত চঁন্দ্রবাসের৷’

হাতে গুলি ভরতি আগ্নেয়াস্ত্র৷ কিন্তু কানের পাশে হঠাৎ সেই আওয়াজে সারা শরীর জমে হিম হয়ে গেল জনার্দনবাবুর৷ চেষ্টা করেও নড়তে পারলেন না৷

জনার্দন চৌধুরী সেইভাবে কতক্ষণ পড়ে ছিলেন ঠিক নেই৷ যখন হুঁশ ফিরে চোখ মেলে তাকালেন সকালের আলো ফুটেছে৷ কিন্তু কোথায় সেই কোঠাবাড়ি, বিছানাপাতা চমৎকার ঘর! কিছুর চিহ্নমাত্রও নেই৷ দু’জন পড়ে আছেন ভাঙাচোরা ইট, ঝোপঝাড়ে ভরতি পোড়ো এক মাঠের মাঝে৷ পাশে রাইফেল, অন্য জিনিসপত্র৷

গোড়ায় মনে হয়েছিল স্বপ্ন৷ রাতে ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়ে স্বপ্ন দেখেছেন৷ কিন্তু পাশে হরেন রায়ের অবস্থা দেখে অন্য রকম ভাবতেই হল৷ অনেক কষ্টে ঠেলে তুললেও মানুষটা প্রায় মাতালের মতো টলতে লাগলেন৷ অসুস্থ ভদ্রলোককে নিয়ে এরপর কচুবেড়ে ক্যাম্পে আসতে অনেক মেহনত করতে হয়েছিল তাঁকে৷ সম্পূর্ণ সুস্থ হতে হরেন রায়ের পুরো একটা দিন লেগেছিল৷ সেই রাতের কোনো কিছুই পরে আর তিনি মনে করতে পারেননি৷

জনার্দন চৌধুরীও ভাঙেননি কিছু৷ ইতিমধ্যে খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, অমাবস্যার রাতে ওই চাঁদগড়ির পথে চলতে গিয়ে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছে একাধিক মানুষ৷ কেউ তারপর সুস্থ হয়ে উঠতে পারেনি৷ হরেন রায় সেদিক দিয়ে ভাগ্যবান৷ মাত্র এক দিনেই সুস্থ হয়ে উঠেছেন৷ এসব কারণে অমাবস্যা তো বটেই, এমনি রাতেও কেউ ওপথ মাড়ায় না৷

সেবার টিউবওয়েলের কাজ শেষ হতে লেগেছিল মাস দেড়েকের মতো৷ কুলি, মিস্ত্রির দল কিছু ধাতস্থ হয়ে উঠতে মাসখানেক পরে জনার্দন চৌধুরীও চলে এসেছিলেন৷ তারপর সেই যে তিনি সুন্দরবন ছেড়েছিলেন, কোনোদিন আর ওদিকে যাননি৷ সেই রাতে আসলে কী ঘটেছিল অনেক ভেবে কিনারাও করতে পারেননি৷ গল্প শেষ করে তাই প্রশ্ন করেছিলেন আমাকেও, কিছু হদিস দিতে পারি কিনা৷

ইতিহাস নিয়ে সামান্য চর্চা রয়েছে৷ কিছু উত্তর দেওয়াই যেত৷ সুন্দরবন অঞ্চলে একসময় একাধিক ভুঁইয়া তথা বড় জমিদার ছিলেন৷ তাঁদের জমিদারি দখল করে রাজা প্রতাপাদিত্য বড় এক রাজ্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন৷ মস্ত এক নৌবহর নিয়ে নদীপথে অভিযানেও বের হয়েছিলেন তারপর৷ খবর পেয়ে জমিদার চন্দ্রবাস ভুইঁয়া আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য স্মরণ নিয়েছিলেন তান্ত্রিক গুরু বিশ্বম্ভর ভট্টর৷ তিনি অমাবস্যার রাতে জোড়া নরবলির বিধান দিয়েছিলেন৷ কিন্তু নির্দিষ্ট রাতে বলি জোগাড় না হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি৷ পরের অমাবস্যা আসার আগেই প্রতাপাদিত্যের আক্রমণে ধ্বংস হয়েছিল তাঁর প্রাসাদ বাড়ি চন্দ্রগড়৷ নিজেও নিহত হয়েছিলেন৷ সেই চন্দ্রগড় প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষই এখন লোকমুখে চাঁদগড়ির মাঠ৷

কিন্তু সে তো ষোলো শতকের অন্তিম পর্বের কথা! প্রায় চারশো বছর আগের এক টুকরো ইতিহাস! সেই নিশুতি অমাবস্যার রাতের ঘটনার সঙ্গে তার সম্পর্ক ইতিহাস নয়, ভিন্ন বিষয়৷ তাই চুপ করে রইলাম৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%