নীলকুঠির সাহেব ভূত

শিশির বিশ্বাস

গল্পের শুরুতে পাইকডাঙা গ্রামের কথা সামান্য বলা দরকার৷ ইংরেজ আমলের আগে বাংলায় পাইক বলতে বোঝাত বিশেষ এক পদাতিক বাহিনীর সৈনিক৷ এক হাতে মস্ত বেতের ঢাল, অন্য হাতে সড়কি নয়ত রামদা নিয়ে খালি পায়ে রে-রে করে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ত শত্রুর উপর৷ বড়-বড় রণপা চেপে মাঠ-ঘাট ভেঙে দ্রুত পৌঁছে যেতে পারত রণক্ষেত্রে৷ অথচ এরা লড়াই করত নিতান্তই খালি পায়ে৷ তবু জল-কাদায় দেশ বাংলায় এ ব্যাপারে জুড়ি ছিল না তাদের৷ খাস মোগল বাহিনীও রীতিমতো সমীহ করত৷ পরবর্তী কালে পাইকদের অনেকে বন্দুক চালাতেও রীতিমতো দক্ষ হয়ে উঠেছিল৷ বাংলার বারো ভুঁইয়াদের শক্তির প্রধান উৎসই ছিল এই পাইক বাহিনী৷

পাইকডাঙা গ্রামের প্রাচীন মানুষ যারা, তাদের কাছে শোনা যায়, একসময় তাদের পূর্বপুরুষ নাকি প্রতাপাদিত্যর পাইক বাহিনীতে কাজ করত৷ প্রতাপাদিত্যর পতনের পরে তাদের কয়েকজন এসে ঠাঁই নেয় এই পাইকডাঙায়৷ সেই থেকে গ্রামের ওই নাম৷ যে মানুষটি তাদের এই গ্রামে নিয়ে এসেছিলেন, সেই হারাই ঢালি ছিলেন প্রতাপাদিত্যের এক পাইক দলের সর্দার৷ দুই হাতে লম্বা মোটা বাঁশের লাঠি আর সড়কি নিয়ে তিনি নাকি পঞ্চাশ জনের সঙ্গে টক্কর দিতে পারতেন৷ সড়কি ছুঁড়ে ফুঁড়ে দিতে পারতেন একশো হাত দূরের প্রতিপক্ষকে৷ স্বয়ং প্রতাপাদিত্যও খাতির করতেন তাঁকে৷ ক্রমে চাষবাস বা অন্য কাজে ভিড়ে পড়লেও পাইকডাঙার মানুষের তাই খানিকটা প্রচ্ছন্ন গর্ব ছিল৷ সামান্য চাষি-মজুর মানুষ হলেও কাউকে তেমন পরোয়া করত না৷ গ্রামের রাবণ সর্দারকে তো খোদ জমিদারবাবুও খাতির করতেন৷ নদীর নতুন চর দখল বা অন্য ব্যাপারে কাছারিতে হামেশাই তার ডাক পড়ত৷ এই সময়ই ঘটল ব্যাপারটা৷ তবে পাইকডাঙায় নয়, পাশে হাজিপুর গ্রামে৷

তখন ইংরেজ আমল৷ হঠাৎ কোম্পানির ফরমান নিয়ে হাজিপুরে এসে জাঁকিয়ে বসল দুই নীলকর সাহেব৷ বড় সাহেব ওয়াটসন, আর তার সহকারী জন৷ সে সময় দেশ ছেড়ে যে সব ইংরেজ এদেশে আসত, তাদের বেশির ভাগেরই মূল উদ্দেশ্য ছিল অতি অল্প সময়ে দু-পয়সা কামিয়ে নিয়ে দেশে পাড়ি জমানো৷ ওয়াটসন এদেশে এসেছিল কোম্পানির ছোটোখাটো এক চাকরি নিয়ে৷ বছরকয়েক সেই কাজ করার পর তার বোধোদয় হল, কোম্পানির কাজে মাইনে বেজায় কম৷ তার চাইতে নীল চাষে লাভ অনেক বেশি৷ অথচ পেটে বিদ্যের তেমন দরকার হয় না৷ এর মধ্যে এক জুতসই সঙ্গীও জুটে গেল৷ জন নামে এক ছোকরা৷ অতি অল্পবয়সে বখে যাওয়া জনের বাড়ি ম্যাঞ্চেস্টারে৷ এক মারদাঙ্গায় জড়িয়ে কিছুদিন জেলও খেটেছে৷ তারপর জেল থেকে খালাশ হয়ে পাড়ি জমিয়েছে এদেশে৷ ছোকরার সঙ্গে ওয়াটসনের আলাপ কলকাতায়৷ দু’জনে জমে যেতে এরপর আর দেরি হয়নি৷ করিতকর্মা ওয়াটসন অনেক খোঁজখবর নিয়েই নীলকুঠি খুলেছিল হাজিপুরে৷ গ্রামে বা আশেপাশে বেশির ভাগই চাষাভুসো শ্রেণির মানুষ৷ এদেশে কাজ করতে এসে ওয়াটসন বুঝেছিল, এই গরিব মানুষগুলোর উপরে জুলুম করা সবচেয়ে সহজ৷

হাজিপুরে নীলকুঠি খুলেই সাহেব ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে দিলেন, মহামান্য কোম্পানির হুকুম, বিঘে পিছু ছ-কাঠা জমিতে সবাইকে নীল চাষ করতে হবে৷ সে নীল কিনে নেবেন সাহেব৷ চাষের আগে সেই বাবদ মহানুভব সাহেব অগ্রিম কিছু টাকা অর্থাৎ ‘দাদন’ দেবেন চাষিদের৷

নীল চাষ এদিকে নতুন৷ ব্যাপারটা আগে জানা ছিল না হাজিপুরের মানুষের৷ গোড়ায় তাই সন্দেহ হয়নি৷ কিন্তু বছর ঘুরতেই বুঝতে বাকি রইল না আসল ব্যাপার কী! নামেই দাদন, তাতে চাষের খরচটুকুও ওঠে না৷ মাথার ঘাম পায়ে ফেলাই সার হয়৷ তার উপর নীল বিক্রির সময় যে দাম ধরা হয় তাতে দাদনের টাকা কেটে হাতে কানাকড়িও জোটে না৷ প্রতিবাদ করলেই বিশ ঘা শ্যামচাঁদ, অর্থাৎ চাবুকের বাড়ি৷ নয়তো সাহেবের বুটজুতোর লাথি৷

এদেশে গোলামি করার লোকের অভাব নেই৷ ততদিনে ওয়াটসন সাহেবের নীল কুঠিতে নানা কাজে শামিল হয়ে গেছে বেশ কিছু মানুষ৷ তাদের কেউ-কেউ তেজে সাহেবেরও উপরে৷ সাহেব ধরে আনতে বললে তারা বেঁধে নিয়ে আসে৷ বিশ ঘা শ্যামচাঁদের হুকুম হলে লাগিয়ে দেয় চল্লিশ ঘা৷ গ্রাম জুড়ে তাই শুরু হল হাহাকার৷

হাজিপুর পাইকডাঙার মতো নয়৷ অনেক বড় আর বর্ধিষ্ণু গ্রাম৷ খোদ জমিদারও বাস করেন এই গ্রামে৷ উপায় না দেখে গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ ব্যাক্তি কিছু একটা বিহিতের জন্য একদিন এসে হাজির হলেন তাঁর কাছে৷

জমিদার হরিহর চৌধুরী দাপুটে জমিদার৷ তাঁর হুকুমে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায়৷ কিন্তু খাস বিলেতের সাহেবদের কাছে একেবারেই যে কেঁচো, তা গ্রামের সাধারণ মানুষের জানার কথা নয়৷ তাই মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে তাঁদের বিদেয় করলেও কার্যক্ষেত্রে কিছুই করলেন না৷ বরং খবরটা কানে গেল সাহেবরা গোঁসা না হয়, তাই সেই দন্ডেই নায়েবকে ডেকে নীলকুঠির দুই সাহেবকে নেমন্তন্ন করে খানাপিনার আয়োজন করতে বলে দিলেন৷

ব্যাপার বুঝতে হাজিপুরের প্রজাদের বেশি সময় লাগেনি৷ জমিদারের কাছে গিয়ে বিহিত তো কিছু হলই না, বরং বিপদ আরো বাড়ল৷ দিনকয়েকের মধ্যেই নীলকুঠির দেওয়ান পেয়াদা নিয়ে সারা গ্রামে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে দিয়ে গেল, ছয় নয়, এবছর থেকে বিঘে প্রতি পুরো দশ কাঠা জমিতে নীল চাষ করতে হবে৷ সাহেবের হুকুম৷

আগেই বলেছি, বর্ধিষ্ণু গ্রাম হাজিপুর৷ অনেক শিক্ষিত মানুষও বাস করেন৷ তবু প্রতিকারের কোনো উপায় কারো মাথায় এল না৷ মানসম্মান নিয়ে প্রাণে বাঁচতে অনেকেই যখন গ্রাম ছাড়ার কথাও ভাবতে শুরু করেছে, তখনই হঠাৎ এক ঘটনায় বদলে গেল সব৷

হাজিপুরে কুঠি বানালেও ওয়াটসন সাহেব শুধু ওই একটা গ্রাম নিয়ে পড়ে থাকতে আসেননি৷ ওই সময় একদিন তিনি দেওয়ান হরনাথ রায়কে ডেকে পাঠিয়ে পাশে খেলাতপুর আর পাইকডাঙা গ্রামেও দাদন ধরাতে হুকুম করলেন৷ হরনাথের কায়ক্লেশে দিন চলত৷ এখন নীলকুঠির দেওয়ান হয়ে দিন পালটে গেছে৷ সাহেবের ফরমান শুনে খানিক ইতস্তত করে বললেন, ‘হুজুর ওই পাইকডাঙা গ্রামটা বাদ রাখলে ভালো—’

‘হোয়াট!’

দেওয়ান হরনাথ রায়ের মুখের কথা শেষ হবার আগেই সাহেব যেভাবে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, তাতে গলা দিয়ে আর উত্তর জোগাল না তাঁর৷ কোনোমতে একটা সেলাম ঠুকে পালিয়ে বাঁচলেন৷

নীলকুঠি চালাতে হলে অনেক দিকে নজর রাখতে হয়৷ ওয়াটসন সাহেবেরও ব্যবস্থায় খামতি ছিল না৷ এর দিনকয়েক পরেই যে খবর কানে এল, তাতে কপালে ভাঁজ না পড়ে উপায় ছিল না৷ কুঠির দেওয়ানকে তক্ষুনি ডেকে পাঠিয়ে বললেন, ‘ইহা কী শুনিটেছি দেওয়ান!’

পাইকডাঙার চাষিরা কেউ নীলের দাদন নিতে আপত্তি করেনি৷ খুশি মনেই টাকা গুনে নিয়েছে৷ কিন্তু ব্যাপার হল, এখনো কেউ কুঠি থেকে বীজ নিতে আসেনি৷ চাষ শুরু করার কোনো উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না৷ বরং গ্রামের লাঠি খেলার আখড়ায় দেখা যাচ্ছে বড়দেরও৷ কসরত হচ্ছে সড়কি আর রামদা নিয়ে৷ খবরটা হরনাথের কানেও পৌঁছেছে৷ হাত কচলে বলল, ‘হুজুর ওই জন্যই পাইকডাঙায় দাদন ধরাতে মানা করেছিলাম৷ আসলে ওটা ডাকাতের গাঁ৷’

‘‘ড্যাকোইট!’’ ওয়াটসন সাহেব হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, ‘দেন দে শুড বি পুট ইন জেল!’

সবকো জেলে বন্ধ করিয়া দিব৷’

‘সেটাই ভালো হুজুর৷’ সাহেবের কথায় হরনাথ সায় দিয়ে বললেন বটে, কিন্তু ভরসা পেলেন না৷ দু-চারজনকে জেলে পুরে যে পাইকডাঙার মানুষকে দমানো যাবে না, তিনি ভালো করেই জানেন৷ তার উপর খবর, পাইকডাঙার আসল চাঁই রাবণ সর্দার দিন কয়েক ধরে বেপাত্তা৷ কোনো খোঁজ নেই৷ পুলিশ ধরবে কাকে?

যথারীতি ওয়াটসন সাহেবের হুমকিতে নড়েচড়ে উঠল সদরের পুলিশ দপ্তর৷ পাইকডাঙায় ধরপাকড় হল৷ চালান দেওয়া হল ফাটকে৷ চাঁই রাবণ সর্দারের খোঁজ অবশ্য পাওয়া গেল না৷ সব শুনে ওয়াটসন সাহেব তার খোঁজে জমিদারের কাছারিতে নজর রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন৷ কিন্তু নিরাশ হতে হয়েছে৷ লোকটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে৷ তার উপর খবর, ধরপাকড়ের কারণে গোটা পাইকডাঙা ফুঁসছে৷ তাই তিনি নিজেও সাবধান হয়েছেন৷ একা বেরোন না কোথাও৷

তবু এক সন্ধেয় ব্যাপারটা ঘটে গেল৷ জরুরি এক কাজে ওয়াটসন সাহেবকে সেদিন সদরে যেতে হবে৷ বের হতে গিয়ে দেখলেন তাঁর ঘোড়াটা মোটেই সুস্থ নেই৷ ঝিমোচ্ছে৷ কুঠিতে জনেরও একটা ঘোড়া আছে৷ গোড়ায় ওয়াটসন সাহেব ঠিক করেছিলেন জনের ঘোড়া নিয়েই বের হবেন৷ কিন্তু জন জানাল, কাছের এক কশাড় জঙ্গলে আজ তার শুয়োর শিকারে যাবার কথা৷ ব্যবস্থাও হয়ে রয়েছে৷ তার ঘোড়া আজ না নিলেই ভালো হয়৷

জনের আপত্তি দেখে ওয়াটসন তাই অন্য ব্যবস্থা করলেন৷ সদরে এভাবে তিনি আগেও অনেকবার গেছেন৷ মাইল কয়েক দূরে নদীর ঘাট৷ সেখান থেকে নৌকো পাওয়া যায়৷ সাহেব তাই চার বেহারার এক পালকির ব্যবস্থা করে সেই পথ ধরলেন৷ সঙ্গে চলল লাঠি-সড়কি হাতে জবরদস্ত দুই লাঠিয়াল পেয়াদা৷

নৌকোয় যাওয়া-আসা৷ সদরে কাজ সেরে ফিরতে ওয়াটসনের সেদিন সন্ধে পার হয়ে সামান্য রাত হয়ে গিয়েছিল৷ জনকে বলে রেখেছিলেন, বিকেলে ঘাটে ঘোড়া নিয়ে অপেক্ষা করতে৷ কিন্তু দেখা গেল, সে আসেনি৷ এদিকে কাছাকাছি পালকি পাওয়া গেল না৷ বায়না পেয়ে সবাই অন্য গ্রামে গেছে৷ অগত্যা সঙ্গী দুই পেয়াদা নিয়ে ওয়াটসন হাঁটাপথেই রওনা হয়ে পড়লেন৷ পথ মানে মাঠের আল৷ তবে জোৎস্না রাত৷ আকাশে ফুটফুটে চাঁদ৷ তাই অনেকটাই ভরসা পেলেন তিনি৷ সামনে পিছনে অস্ত্র হাতে দু’জন পেয়াদা৷ মাঝে ওয়াটসন সাহেব৷ অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে কোমরের পিস্তলটা হাতে নিয়ে নিয়েছেন৷ দ্রুত পা চালিয়ে সবাই তখন প্রায় নীলকুঠির কাছে এসে পড়েছে৷ সামনে নদীর এক মরা খাত৷ বর্ষায় সামান্য জল হলেও সারা বছর শুকনো খটখটে৷ পাশেই প্রাচীন এক শশ্মান৷ তারপর বড় একটা ফাঁকা মাঠ৷ লোকের মুখে সে মাঠের নাম এখন কুঠিবাড়ির মাঠ৷ সেই মাঠের শেষে নীলকুঠি৷

ওয়াটসন সাহেব দুই লাঠিয়াল পেয়াদা নিয়ে সবে সেই মরা নদীর খাত পার হয়ে শশ্মানে পা দিয়েছেন, হঠাৎ কাছেই তারস্বরে গোটাকয়েক ফেউ ডেকে উঠল৷ শেয়ালের ডাক গ্রামের মানুষের কাছে অজানা নয়৷ তবু আচমকা সেই শব্দে সাহেবের দুই পেয়াদা মুহূর্তের জন্য হলেও সামান্য কেঁপে উঠেছিল৷ জায়গাটার বিশেষ সুনাম নেই৷ ভূত-প্রেতের আস্তানা৷ বাঘও বের হয় কখনো৷ অজান্তেই মুখে রাম নাম বের হয়ে এল দুই পালোয়ানের৷ তারপর সামলে উঠে সড়কি বাগিয়ে হেঁকে উঠতে যাবে, তার আগেই অন্ধকারে মাথায় প্রচন্ড আঘাতে দু’জনেই লুটিয়ে পড়ল মাটিতে৷ তারপর কিছুই আর মনে নেই তাদের৷

দিনভর শিকার শেষে খানাপিনার পর জন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বেহুঁশ হয়ে৷ সেই ঘুম ভাঙতে যখন বড় সাহেব ওয়াটসনের কথা মনে পড়ল, তখন সন্ধে পার হয়ে গেছে৷ তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে বের হতে যাবেন, পিছনে মাঠের দিক থেকে হঠাৎ গুলির শব্দ ভেসে এল৷ ওয়াটসন সাহেবের পিস্তলের আওয়াজ চিনতে ভুল হল না তাঁর৷ লোকজন নিয়ে তক্ষুনি ছুটলেন মাঠের দিকে৷ হাতে গোটা কয়েক মশাল নিয়ে সবাই যখন শশ্মানের কাছে এসে পৌঁছোল, ওয়াটসন সাহেবের সঙ্গী দুই পেয়াদার তখনও জ্ঞান ফেরেনি৷ হাতের সড়কি হাতেই ধরা৷ মুখ থুবড়ে পড়ে আছে৷ অদূরে ওয়াটসন সাহেবের কাটা মুন্ডু৷ রক্তে থিকথিক করছে চারপাশ৷

নীলকুঠির সাহেব খুন! হইচই হয়েছিল কম নয়৷ থানার দারোগা, সদর থেকে বড়সাহেব, ছুটে এলেন সবাই৷ ওয়াটসন সাহেবের রক্ষী দুই পেয়াদাকে ধরে চালান দেওয়া হল সদরে৷ ধরপাকড় হল৷ কিন্তু কোনো কিনারা হল না৷ ওয়াটসন সাহেবের ধড়েরও কোনো হদিশ মিলল না৷

তবে নীলকুঠি চলল আগের মতোই৷ ওয়াটসনের হঠাৎ এই মৃত্যুতে, বলতে নেই, বরং কিছু সুবিধাই হল জনের৷ আগে মাথার উপর ওয়াটসন ছিল৷ এখন নিজেই সর্বেসর্বা৷ তবে সাবধান হয়েছেন৷ ঘোড়া ছাড়া বের হন না৷ বেরোলেও ফিরে আসেন সন্ধের আগেই৷ তার আরো একটা কারণ, ইতিমধ্যে চাউর হয়ে গেছে ওয়াটসন সাহেবের ভূত নাকি সন্ধের পরে মাঝে মধ্যেই ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়ায় কুঠিবাড়ির মাঠে৷ গায়েব হয়ে যাওয়া ধড়ের কোন হদিশ মেলেনি৷ সৎকারও হয়নি৷ সাহেব তাই নাকি ভূত হয়ে ঘুরে বেড়ান৷

গোড়ার দিকে গুজবে মোটেই গা করেনি জন৷ কিন্তু তারপর আর ফেলতে পারলেন না৷ গ্রামের অনেকে তো বটেই, এমনকী নীলকুঠির জনা কয়েক কর্মচারীরও নজরে পড়ল ব্যাপারটা৷ গভীর রাতে কখনো ঘোড়ায় চড়ে এক সাহেব বেগে ছুটে যাচ্ছে কুঠিবাড়ির মাঠ দিয়ে৷ ভয়ে কয়েকজন তো কাজ ছেড়েই পালাল৷ স্বভাবে বেপরোয়া হলেও জনের আবার বেজায় ভূতের ভয়৷ তার উপর সেদিন তারই গাফিলতির কারণে অপঘাতে মরতে হয়েছে ওয়াটসনকে৷ সময়মতো ঘুম ভাঙলে ঘোড়া নিয়ে ঠিক সময় হাজির হওয়া যেত নদীর ঘাটে৷ এভাবে হয়তো মরতে হত না তাঁকে৷ রাতে জন তাই কুঠির বাইরে বের হওয়াই ছেড়ে দিলেন৷

তবু একদিন সামান্য ব্যতিক্রম হয়ে গেল৷ দাদন ধরাতে জন সেদিন পেয়াদা নিয়ে পাশের এক গ্রামে গিয়েছিলেন৷ কাজ শেষ হতে খেয়াল হল ইতিমধ্যে বিকেল পার হয়ে অন্ধকার নামতে শুরু করেছে৷ দেখে আর দেরি না করে ঘোড়া হাঁকিয়ে রওনা হয়ে পড়লেন সেই দন্ডেই৷ সঙ্গের লোকজন পিছনে পড়ে রইল৷ শ্মশান পার হয়ে যখন নীলকুঠির মাঠে এসে পড়লেন, সন্ধের অন্ধকার তখন ঘন হয়ে উঠেছে৷ অজান্তেই বুকটা ঢিপঢিপ করে উঠল জনের৷ কোনো দিকে দৃকপাত না করে আরো দ্রুত ঘোড়া ছোটালেন৷ ইচ্ছে এক দমে পৌঁছে যাবেন নীল কুঠির চৌহুদ্দির ভিতর৷ কিন্তু তার আগেই ঘটে গেল এক ভয়ানক ব্যাপার৷ বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে জন তখন মাঠের প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন৷ মাঠের মাঝে এক জায়গায় কিছু বুনো গাছের জটলা৷ হঠাৎ সেই গাছের আড়াল থেকে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ তুলে হুড়মুড়িয়ে বের হয়ে এল এক ঘোড়সওয়ার মূর্তি৷ একেবারে জনের ঘোড়ার সামনে৷ সংঘর্ষ এড়াবার জন্য লাগাম টানল জন৷ নিমেষে হাত চলে গেল কোমরে পিস্তলের দিকে৷ ততক্ষণে উলটো দিকের সেই ঘোড়সওয়ার একেবারে মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে৷ সেদিকে তাকিয়ে সারা শরীর হিম হয়ে গেল জনের৷ সামনে ঘোড়ার পিঠে আর কেউ নয়, খোদ ওয়াটসন৷ সেই মাথা ভরতি ঝাঁকড়া লম্বা চুল৷ মোটা এক জোড়া গোঁফ৷ সেই পোশাক৷ কটমট করে তাকিয়ে আছেন ওর দিকে৷ দু’চোখে যেন আগুন ছুটছে৷ জনের হাতের পিস্তল হাতেই ধরা রইল৷ দারুণ আতঙ্কে তাঁর সারা শরীর তখন হিম হয়ে গেছে৷ স্থির হয়ে গেছে চোখের পলক৷ কিন্তু সে কয়েক সেকেন্ড মাত্র৷ তারপরেই দারুণ আতঙ্কে কাঠ হয়ে জন ঘোড়া থেকে ঘুরে পড়ে গেলেন মাটিতে৷

জনের ঘোড়া অল্প পরেই একা ফিরে এল কুঠির আস্তাবলে৷ পিঠে সাহেব নেই৷ তাই দেখে কুঠির সবাই বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে ছুটল তাঁর খোঁজে৷ ছোটো সাহেবের হদিশ পেতে তাদের দেরি হয়নি৷ আগাছার সেই জঙ্গলের পাশে চিৎপাত হয়ে পড়ে আছেন তিনি৷ জ্ঞান না ফিরলেও শ্বাস বইছে৷ ধরাধরি করে সাহেবকে এরপর নিয়ে আসা হল কুঠিতে৷ খানিক বাদে তাঁর জ্ঞান ফিরল বটে, কিন্তু রীতিমতো ভুল বকতে শুরু করলেন৷ রাতটা অপেক্ষা করে পরদিনই তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল সদরে৷ সেখানে তাঁর সুস্থ হয়ে উঠতে লেগে গিয়েছিল প্রায় দিন সাতেক৷ আর তারপরেই সোজা পাড়ি দিয়েছিলেন কলকাতায়৷ আর কোনো দিন নীলকুঠিতে ফেরেননি৷

শোনা যায়, এরপর হাজিপুরের নীলকুঠি বেচে দেবার বিস্তর চেষ্টা হয়েছিল৷ কিন্তু খদ্দের মেলেনি৷ সুতরাং হাজিপুরের নীলকুঠি উঠেই গেল তারপর৷ কিন্তু ওয়াটসন সাহেবের ভূতের গল্পটা রয়ে গেল৷ সাহেবের স্বভাব নাকি মরার পরেও যায়নি৷ এখনো তিনি পোড়ো ভাঙা নীলকুঠির কয়েদখানায় দিনদুপুরে শ্যামচাঁদ হাতে হম্বিতম্বি করেন৷ আর রাত হলেই ঘোড়ায় চেপে টহল দিয়ে বেড়ান কুঠিবাড়ির মাঠে৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%