শিশির বিশ্বাস
অনেক দিন আগের কথা৷ কোম্পানির আমল৷ আইন-কানুন কড়া বটে৷ তবে ব্যবস্থা তেমন মজবুত নয়৷ জনা কয়েক পুলিশ আর পেয়াদা নিয়ে ছোট এক থানা৷ থানার বড়বাবুর জন্য বড় জোর এক বেতো ঘোড়া৷ অথচ হাতে বিশাল এক এলাকার দেখাশোনার ভার৷ সুতরাং কাজ চলত তেমনই৷ নদীনালার দেশ বাংলায় ঠগি-ঠ্যাঙাড়ে আর ডাকাতের উৎপাত নিত্যকারের ঘটনা৷ মাঝি-মাল্লাদের অনেকেই ভিড়ে পড়েছে তাদের দলে৷ মানুষ তাই বড় ভয়ে পথ চলে৷ খুন-জখম, ডাকাতি, রাহাজানি লেগেই রয়েছে৷ সুযোগ বুঝে অনেক জমিদারও এসব কাজে হাত পাকিয়ে নিয়েছে৷ তাদের অনেকেই তখন বড়-বড় ডাকাত দলের পাণ্ডা৷ এই সময় জমিদারদের এই সব কুকীর্তির সঙ্গী ছিল লেঠেলের দল৷ দিনে এরা সাধারণ মানুষ৷ সংসারের কাজে ব্যস্ত৷ কিন্তু রাত নামলে মাঝে মধ্যেই তাদের ডাক পড়ত জমিদারের কাছে৷
মধুখালির আক্রাম সর্দার ছিল এমনই এক লেঠেল৷ নবাবপুরের জমিদারের ডাকাতদলে তার ডাক পড়ত মাঝেমধ্যেই৷ আক্রামের পৈতৃক জীবিকা অবশ্য ছিল পদ্মায় মাঝির কাজ৷ নৌকোয় যাত্রী বইত৷ সময়ে মাছও ধরত৷ তবে সেসব নিছক লোক দেখাবার জন্য৷
চলছিল এইভাবেই৷ এমন সময় জেলার শাসনভার নিয়ে এলেন রিচার্ড সাহেব৷ জবরদস্ত মানুষ৷ মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে অবস্থা অনেকটাই বদলে ফেললেন৷ জেলার প্রতিটি মহল্লার চৌকিগুলোকে আরো জোরদার করা হল৷ সদরে বসে নয়, সেপাইদের নিয়ে দিন রাত জল আর জমি চষে বেড়াতে লাগলেন৷ হাতেনাতে ধরা পড়লেই প্রকাশ্যে ফাঁসি৷ অনেকেই বলত, সাহেবের নাকি কিছু বিশ্বস্ত চর আছে৷ গোপনে তারাই সব খোঁজ-খবর পৌঁছে দেয় তাঁর কানে৷ এই অবস্থায় জমিদারদের রাতবিরেতে গোপন অভিযানে বেরোনো একেবারে বন্ধ না হলেও কমে গেল অনেকটাই৷ তবু মারাত্মক ব্যাপারটা ঘটল ওই মধুখালিতেই৷
নবাবপুরের জমিদার সে রাতে দলবল নিয়ে বের হয়েছিল মধুখালির কাছে এক হাওড়ে ডাকাতি করতে৷ হাওড় হল পূর্ব বাংলার বিশাল আকারের বিল বা জলা৷ বর্ষার দিনে জল বাড়লে ঢেউ প্রায় সাগরের মতো৷ ওই সাগর থেকেই জলার নাম হাওড়৷ তা সেই রাতে ডাকাতি করে ফেরার পথে জমিদারের ডাকাত দল একেবারে সাহেবের মুখোমুখি৷ গোপন সূত্রে সংবাদ পেয়ে রিচার্ড সাহেব ওত পেতে ছিলেন হাওড়ের মাঝ দরিয়ায়৷ নবাবপুরের জমিদার বমাল ধরা পড়ে গেলেন৷ সঙ্গে দলের আরো কয়েকজন৷ জমিদার বলে অবশ্য রেহাই পাননি তিনি৷ পরদিনই সাহেব তাঁকে হাটের মাঝে মস্ত পাকুড় গাছের ডালে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দিলেন৷ দিন তিনেক ঝুলে রইল লাশ৷
দলে আক্রামও ছিল সেদিন৷ কিন্তু বেঁচে গিয়েছিল বরাত জোরে৷ বিপদের গন্ধ পেয়ে সেও ঝাঁপ দিয়েছিল জলে৷ পদ্মার পাকা মাঝি৷ তাই দলের অনেকে ধরা পড়লেও সে পড়েনি৷ গভীর রাতে হাওড়ের ঢেউ সামাল দিয়ে ডুবসাঁতারে সেপাইদের চোখ এড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছিল ডাঙায়৷
আচমকা এই ঘটনায় বেশ দমে গিয়েছিল আক্রাম৷ প্রাণের ভয়ে পালিয়ে ছিল কিছু দিন৷ শেষে যখন বুঝেছে, ধরা পড়েও কেউ ওর নাম ফাঁস করেনি, তখনই ফের পৈতৃক জীবিকায় থিতু হয়েছে৷ কিন্তু মাসে দশ বারোটা মাথা ফাটাতে যে অভ্যস্ত, তার কি এসব ভালো লাগে? থেকে থেকেই হাত দুটো নিশপিশ করে ওঠে৷ ওদিকে আসল রোজগার বন্ধ হতে হাতেও টান৷ সংসার চলাই দায়৷ এমন সময় ব্যাপারটা ঘটল৷ সেদিন এক গঞ্জের ঘাটে নৌকো ভিড়িয়ে যাত্রীর অপেক্ষায় বসে ছিল আক্রাম৷ সারাদিনে একটিও যাত্রী মেলেনি৷ হতাশ মানুষটা ঠায় বসে মনে-মনে যখন রিচার্ড সাহেবের মুণ্ডপাত করছে, তখন এক যাত্রী এসে হাজির হল ঘাটে৷ বয়স বছর চল্লিশের আশেপাশে৷ মজবুত পেটানো শরীর৷ পরনের পোশাক অতি সাধারণ মানের৷ কাঁধে মোটা কাপড়ের ছোট এক ব্যাগ৷
মানুষটি কাছে আসতেই আক্রাম নড়ে উঠে বলল, ‘এই নাওয়ে (নৌকোয়) আসেন কত্তা৷ যাবেন কোথা?’
লোকটা সামান্য ইতস্তত করে বলল, ‘ভাগ্যকুল৷’
শুনে অজান্তেই আক্রামের চোখ দুটো সামান্য কুঁচকে উঠল৷ কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা জোগাল না৷ প্রায় এক বেলার পথ ভাগ্যকুল৷ এদিকে সূর্য ঢলে পড়েছে অনেকটাই৷ অমাবস্যার গাঢ় অন্ধকার খানিক বাদেই নেমে আসবে বর্ষার দুরন্ত পদ্মার বুকে৷ আকাশ পরিষ্কার বটে, তবে বর্ষার মেঘ দানা বাঁধতে সময় লাগে না৷ লোকটার বুকের পাটা আছে!
ওকে চুপ থাকতে দেখে লোকটি বলল, ‘বিশেষ দরকার মাঝি৷ তাড়াতাড়ি পৌঁছে দিতে হবে৷ ভাড়া নিয়ে চিন্তা নেই৷ পুষিয়ে দেব৷’
কয়েক মুহূর্ত কী ভাবল আক্রাম৷ বলল, ‘এই অমাবস্যার রেতে বর্ষার পদ্মায় এতটা পথ পাড়ি দেওয়া এই বান্দার কাছে কিছু নয়৷ ব্যাপারটা হল গিয়ে আপনার৷ বিপাকে পড়লে নিজের জানটারে বাঁচাবার ক্ষ্যামতা যদি রাখেন তো চলেন৷’
এই অবেলায় মাঝি এতটা পথ যেতে রাজি হবে ভাবেনি লোকটি৷ আক্রামের মুখের কথা ফুরোতেই এক লাফে নৌকোয় উঠে জাঁকিয়ে বসে বলল, ‘হাসালে মাঝির পো৷ চাঁদপুরের প্রভাস রায়ের এমন কয়েক গণ্ডা পদ্মা দেখা আছে৷ এবার নৌকো ছাড়ো দেখি৷ ঝটপট পৌঁছে দেওয়া চাই৷’
আক্রামের চোখ দুটো বারেকের জন্য যেন ঝিলিক দিয়ে ওঠে৷ কোনো কথা না বলে ছেড়ে দেয় নৌকো৷ পদ্মার প্রবল স্রোত আর দাঁড়ের টানে তরতর করে ভেসে চলে৷
দেখতে দেখতে সূর্য ডুব দিল দিগন্তের কাছে পদ্মার জলে৷ খানিক বাদে গাঢ় অন্ধকার ছেয়ে ফেলল পদ্মার বুক৷ চারপাশে কিছুই আর নজরে পড়ে না৷ শুধুই চাপ-চাপ অন্ধকার৷ প্রবল জলস্রোতের কলকল আওয়াজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দাঁড়ের ছপছপ শব্দ৷ রাত একটু বাড়লে আক্রাম বলল, ‘এবার শুয়ে পড়েন গো কত্তা৷ বসে কত আর ঢুলবেন!’
যাত্রী মানুষটি তখন অবশ্য ঘুমে ঢুলছিল না৷ কিন্তু আক্রামের কথায় নড়ে উঠে বলল, ‘তা মন্দ বলনি মাঝি৷ একটু গড়িয়ে নিলে মন্দ হয় না৷ কদিন ধরে বেজায় খাটুনি যাচ্ছে৷ দু’চোখের পাতা এক করার সময় পাইনি৷’
আক্রাম ইতিমধ্যে টিমটিমে এক টেমি জ্বেলে দিয়েছে৷ সেই আলোয় ব্যাগ থেকে একটা চাদর বের করে ছই-এর নীচে বিছিয়ে শুয়ে পড়ল লোকটি৷ কিছুক্ষণের মধ্যে তার মৃদু নাসিকা গর্জন শোনা গেল৷
আক্রাম আগেই মনস্থির করে ফেলেছিল৷ শুধু সুযোগের অপেক্ষায় ছিল এতক্ষণ৷ আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর সন্তর্পণে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল৷ যতদূর দৃষ্টি চলে সামান্যতম আলোর বিন্দুও নজরে পড়ে না৷ বর্ষাকালে এই ঘোর অমাবস্যার রাতে নেহাত দায়ে না পড়লে কেউ পদ্মায় বের হয় না৷ নিশ্চিন্ত হতেই আক্রামের হাতে দাঁড়ের একটানা ছপছপ শব্দ থেমে গেল হঠাৎ৷ মুহূর্তে দু’হাতের শক্ত মুঠোয় ধরা দাঁড়টা সাঁ করে উঠেই নেমে এল সামনে নিদ্রিত মানুষটির মাথা লক্ষ্য করে৷
লেঠেল দলের সর্দার আক্রামের হাতে নিশানা ব্যর্থ হয় না কখনো৷ কিন্তু আজ অন্য এক ব্যাপার ঘটে গেল৷ মৃত্যুদূতের মতো আক্রামের হাতের দাঁড় মাথায় পড়ার আগেই লোকটার দেহ বোঁ করে পাশের দিকে গড়িয়ে গেল৷ দাঁড়টা সশব্দে আছড়ে পড়ল নৌকোর উপর৷ সামলে নিয়ে আক্রাম ফের দাঁড় তুলে আঘাত করতে যাবে তার আগেই বিদ্যুৎ বেগে দুটো কঠিন হাত ধরে ফেলল সেটা৷
যতটা চমকাবার ঠিক ততটাই চমকাল আক্রাম৷ কী ভয়ানক! লোকটা তাহলে ঘুমোয়নি! ঘাপটি মেরে পড়ে ছিল মাত্র! কিন্তু আর পিছিয়ে আসার উপায় নেই৷ বার কয়েক হ্যাঁচকা টানে দাঁড়টা ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করল৷ কিন্তু একবিন্দু নড়াতে পারল না৷ লোকটার হাতের মুঠোয় যেন বজ্রের শক্তি! আর দেরি করা চলে না৷ মুহূর্তে সেটা ছেড়ে দিয়ে বাকি দাঁড়টা তুলে নিয়েছিল আক্রাম৷ কিন্তু ওদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী ততক্ষণে লাফিয়ে উঠে সপাটে তার হাতের দাঁড় চালিয়ে দিয়েছে আক্রামের হাতিয়ার লক্ষ্য করে৷
ঠকাস শব্দে আক্রামের হাতের দাঁড় ছিটকে পড়ল পদ্মার জলে৷ প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতের অস্ত্র এবার উঠে এল আক্রামের মাথা লক্ষ্য করে৷ কিন্তু নবাবপুরের জমিদারের ডাকাত দলের সর্দার আক্রাম অন্য ধাতুতে গড়া৷ বিপদে মাথা ঠান্ডা রাখার কৌশল ভালোই জানা আছে৷ অত সহজে হার মানার পাত্র নয়৷ মাথা ঠান্ডা রেখে নিমেষে হাত আর পায়ের চাপে নৌকোটাকে প্রবলভাবে দুলিয়ে দিল সে৷ টাল সামলাতে না পেরে লোকটা কিছু বেসামাল হয়ে পড়তেই আক্রাম মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর৷ দুটো কঠিন নির্মম হাত চেপে বসল কণ্ঠনালির উপর৷
অল্প সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ৷ প্রায় ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল আক্রামের৷ ওহ, ঘোড়েল লোকটা যে গোড়াতেই তাকে সন্দেহ করেছিল, ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি! ঘুমোবার নামে দিব্যি ঘাপটি মেরে পড়ে ছিল৷ আরো হুঁশিয়ার হওয়া উচিত ছিল৷ চাঁদপুরের প্রভাস রায় কী যেমন তেমন মানুষ! কত্তার কাছে নামটা বার কয়েক শুনেছে৷ ব্যাটা রিচার্ড সাহেবের টিকটিকি৷ সন্দেহ নেই, এই টিকটিকিটির জন্যই কত্তাবাবাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হয়েছে৷ সেদিন অল্পের জন্য ফাঁসির দড়ি এড়াতে পেরেছিল৷ আজও যে শেষ রক্ষা হয়েছে, তা ওর চৌদ্দো পুরুষের ভাগ্য! লাশটা এবার সরিয়ে ফেলা দরকার৷ চট করে ব্যাগটা খুলে ফেলে আক্রাম৷ কাপড়-চোপড় আর কাগজপত্রের ভিতর থেকে টাকা-পয়সার গেঁজেটা বের করে ব্যাগসহ লাশটা ছুঁড়ে দেয় পদ্মার জলে৷ স্রোতের টানে কোথাও গিয়ে আটকে থাকবে৷ ফুলে পচে উঠবে৷ কারো নজরে যদি পড়েও যায়, ততক্ষণে পদ্মার কচ্ছপ আর রাঘব বোয়াল খুবলে নেবে দেহটাকে৷ চাঁদপুরের প্রভাস রায়কে চেনে সাধ্য কার!
দাঁড় হাতে ফের গুছিয়ে বসে আক্রাম৷ ওই ভাগ্যকুলের ঘাটেই নৌকো ভেড়াবে এই মতলব৷ অনেক দিন বাদে মনের ভিতর আগের সেই খুশির আমেজ অনেকটাই ফিরে এসেছে যেন৷ মনের আনন্দে ঝপ-ঝপ করে দাঁড় টানছিল৷ হঠাৎ নৌকোর পাশে নদীর জল ছিটিয়ে ঘপাস করে শব্দ হতে সামান্য চমকে উঠল৷ কীসের শব্দ? দাঁড় তুলে কান খাড়া করতে শব্দটা ফের শুনতে পেল৷
স-স-স-স৷ অন্ধকারে চোখ দুটো চকচক করে ওঠে আক্রামের৷ মস্ত এক ভেটকি মাছ চলেছে নৌকোর পাশ দিয়ে৷ একবার চেষ্টা করে দেখবে নাকি? ঘাই দেওয়ার যা বহর, ওজন মন খানেকের কম নয়৷ দেরি না করে ছই-এর উপর বাঁধা তীক্ষ্ণ তিন ফলার ট্যাঁটা খুলে নেয় আক্রাম৷ হাতে নিয়ে নিঃশব্দে বসে থাকে৷ অপেক্ষা বৃথা যায় না৷ খানিক বাদে মাছটা ফের ঘাই মেরে ওঠে নৌকোর পাশে৷ মুহূর্তে আক্রাম তার হাতের ট্যাঁটা ছুঁড়ে মারে৷ কিন্তু পাশ কেটে বেরিয়ে যায় সেটা৷ আক্রামের নিশানা বড়ো একটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না৷ সে মাছ ধরার ট্যাঁটাই হোক বা মানুষ মারার সড়কি৷ তবে অমাবস্যার অন্ধকার বলে কথা৷ একটু নিরাশ হয়ে আক্রাম দড়ি টেনে ট্যাঁটা তুলতে যাবে খুব কাছেই অন্ধকারে খিঁক করে হেসে উঠল কেউ৷
চমকে উঠে ঘাড় ফেরাল আক্রাম৷ নাহ, কেউ নেই৷ হাসিটাও আর শোনা যাচ্ছে না৷ গোড়ায় সামান্য ঘাবড়ে গেলেও মনের ভুল ভেবে ব্যাপারটা উড়িয়ে দিল ও৷ ট্যাঁটা তুলে যথাস্থানে রাখতে যাবে, ফের মাছটা নৌকোর পাশে ঘাই দিয়ে উঠল৷ চোখ দুটো ফের চকচক করে উঠল আক্রামের৷ নাহ, মাছটা নৌকোর পাশেই আছে, পালায়নি৷ হাতের ট্যাঁটা বাগিয়ে ধরে ফের তৈরি হল ও৷ কিন্তু এবারও লক্ষ্যভ্রষ্ট৷ আর সেই মুহূর্তেই পাশে খিঁক-খিঁক শব্দে হাসির আওয়াজ৷ অন্ধকারে হাসছে কেউ৷
অন্য কেউ হলে মাছ ধরায় ইতি টেনে সরে পড়ত তৎক্ষণাৎ৷ কিন্তু খুনে লেঠেল আক্রাম এবার আর চমকাল না৷ সন্দেহ নেই, ব্যাপারটা হতচ্ছাড়া কোনো শুশুকের কাজ৷ অভিজ্ঞতায় ও দেখেছে, কয়েক জাতের শুশুক জলের উপর মুখ তুলে কখনো ডেকে ওঠে৷ হঠাৎ শুনলে হাসির মতো মনে হয়৷ আপন খেয়ালে তেমনই কোনো শুশুক ডাকছে৷ এসব নিয়ে মাথা ঘামালে পদ্মার মাঝিদের চলে না৷ আর বেপরোয়া মাছটার যা ভাব, একটু হুঁশিয়ার থাকলে সহজেই গেঁথে ফেলতে পারবে৷
অনুমান বৃথা গেল না৷ বার কয়েকের চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত সফল হল আক্রাম৷ নিক্ষিপ্ত অস্ত্র সেবার শিকার লক্ষ্য করে আছড়ে পড়তেই দারুণ শব্দে জল ছিটিয়ে ডুব দিয়েছিল মাছটা৷ সেই মুহূর্তে কবজিতে বাঁধা ট্যাঁটার দড়িতে টান পড়তে আক্রাম বুঝে ফেলে, নিশানা ব্যর্থ হয়নি৷ এবার খানিক খেলিয়ে যাওয়া শুধু৷ ক্রমশ কাবু হয়ে আসবে মাছটা৷ যত বড় আকারেরই হোক, নৌকোয় টেনে তোলা সমস্যা হবে না৷
এ ব্যাপারে আক্রামের অভিজ্ঞতা অনেক দিনের৷ তবু আজ সময় লাগল৷ মস্ত এক ভেটকি মাছ৷ অনেক কসরতে খেলিয়ে একসময় সেটাকে কাছে এনে তুলে ফেলল নৌকোয়৷ ঘাড়ের কাছে বিঁধে রয়েছে ট্যাঁটার ফলা৷ টাটকা রক্তের রেখা৷ তবু তেজ কমেনি৷ মাছটা ফের লাফিয়ে জলে না পড়ে, সেই আশঙ্কায় আক্রাম গলুইয়ের কাছে একটা পাটাতন তুলে মাছটা ঠেলে দিল খোলের ভিতর৷ ট্যাঁটার ফলাটা কোনো মতে টেনে তুলে পাটাতনটা যথাস্থানে চাপিয়ে দিল৷
খোলের ভিতর বিশাল আকারের মাছটা তখনও লাফালাফি করছে৷ সেই আওয়াজে খুশিতে মনটা নেচে ওঠে আক্রামের মন৷ বরাত বলে একেই! একেবারে সব দিক থেকেই৷ মনখানেক ওজনের মাছটা ভাগ্যকুলে মহাজনদের আড়তে তুলে দিলে ভালো দাম মিলবে৷ অগত্যা সেই ভাগ্যকুলের ঘাটেই একসময় নৌকো ভেড়াল আক্রাম৷
গভীর রাতে ঘাট প্রায় নির্জন৷ শরীরের উপর ধকলও গেছে৷ নৌকো ভিড়িয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল ছই-এর ভিতর৷
আক্রামের ঘুম যখন ভাঙল, ভোর হয়ে বেলা তখন অনেকটা চড়ে উঠেছে৷ মস্ত গঞ্জের ঘাট ভাগ্যকুল৷ জমে উঠেছে ইতিমধ্যেই৷ মজুরদের মাথায় ঘাটে বাঁধা নৌকো থেকে মাল নামছে৷ মাল বোঝাই হচ্ছে কতক নৌকোয়৷ আড়মোড়া ভেঙে ঘাটে নামল আক্রাম৷ ফুরফুরে মনে এগিয়ে গেল ওধারে মহাজনের গদির দিকে৷ এই সকালেই আজ বাজার যেমন জমে উঠেছে, মনে হয় মাছটার ভালো দামই মিলবে৷
কিন্তু ওদিকে ব্যাপার যে অন্যরকম, তা ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেনি আক্রাম৷ মাত্র গোটা দুই গদিতে ঢুঁ মেরেছে, তার মধ্যেই কানে এল খবরটা৷ মুহূর্তে হাতুড়ির ঘা পড়ল বুকের ভিতর৷ কী সর্বনাশ! এ যেন সেই ‘যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে সন্ধে হয়!’
খোদ রিচার্ড সাহেব কাল দুপুর থেকে দলবল নিয়ে ডেরা ফেলে রয়েছে গঞ্জে৷ ঢাকা থেকে কার নাকি জরুরি খবর নিয়ে আসার কথা৷
খবরটা শুনে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না আক্রাম৷ মাছ বিক্রি মাথায় পড়ে রইল৷ দ্রুত ফিরে এল ঘাটে৷ সন্দেহ নেই, সাহেব যার জন্য অপেক্ষা করছে সেই প্রভাস রায়কে সে গত রাতে পদ্মার বুকে খুন করে ভাসিয়ে দিয়ে এসেছে৷ এই সাহেবের তাড়াতেই টিকটিকিটি ঝুঁকি নিয়েও গতকাল সওয়ার হয়েছিল তার নৌকোয়৷ নাহ, এখানে আর এক মুহূর্তও নিরাপদ নয়৷ সেবার অতি অল্পের জন্য ফাঁসির দড়ি এড়ানো গেছে৷ ভেবেছিল, ওই পথ ছেড়ে দেবে এবার৷ তবু গত রাতে ফের সেই কাজই করে ফেলল৷
ভাবতে-ভাবতে আক্রাম দ্রুত নৌকোর দড়ি খুলছিল৷ হঠাৎ ঘাটের ওদিক থেকে কে ডাকল৷ মাথা তুলে সেদিকে তাকাতেই বুকটা ধড়াস করে উঠল৷ কালো হয়ে গেল সারা মুখ৷ একটু আগে মাছটার গতি করার জন্য আড়তদার হারান শা-র গদিতে গিয়েছিল৷ ঘাটে দাঁড়িয়ে সেই লোকটা৷ পাশে বন্দুক হাতে জনা কয়েক সেপাই আর এক লালমুখো সাহেব৷ খোদ রিচার্ড৷
সেদিকে তাকিয়ে আক্রামের গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হল না৷ মস্ত এক সেলাম ঠুকে দু-হাত জোড় করে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল৷ ওকে ওইভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে হারান শা বলল, ‘ঘাবড়াসনি আক্রাম৷ বড় সাহেব তোর মাছের কথা শুনে নিজেই চলে এলেন৷ ঢাকা থেকে জরুরি সংবাদ আসার কথা আছে৷ সাহেব তাই আজকের দিনটা থেকে যাচ্ছে এখানে৷ চৌকিতে বিরাট খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা৷ গঞ্জের অনেকের নেমতন্ন৷ তোর মাছের হিল্লে হয়ে যাবে মনে হয়৷ সাহেব মানুষ বলে কথা! জিনিস পছন্দ হলে ভালো দাম পেয়ে যাবি৷
প্রত্যুত্তরে আক্রাম বিড়বিড় করে মাথা নাড়ল একটু৷ গলা দিয়ে স্বর বের হল না৷ ও বেশ বুঝতে পারছিল, আড়তদার হারান শা যাই বলুক, পাশে দাঁড়ানো সাহেবের চোখ দুটো কুঁচকে আসছে ক্রমশ৷ সন্দেহভরা চোখ দুটো ফালাফালা করে ফেলছে ওকে৷ সেই ভয়ানক দৃষ্টির সামনে ওর বিশাল শরীরটা ক্রমে কুঁকড়ে আসতে লাগল৷
ও-পক্ষ অবশ্য দেরি করল না৷ উত্তরের অপেক্ষা না করেই রিচার্ড সাহেব দলবল নিয়ে উঠে পড়লেন নৌকোয়৷ হারান শা বলল, ‘মাছটা সাহেবকে এবার দেখা আক্রাম৷
গলুইয়ের ধারে পাটাতনের নীচে মাছটা রয়েছে৷ প্রায় বলির পাঁঠার মতো আক্রাম একবার সামনে দাঁড়ানো সাহেবের দিকে তাকাল৷ তারপর কাঁপতে-কাঁপতে নিচু হয়ে পাটাতনটা তুলে ফেলল৷ আর তারপরেই আঁতকে উঠে কয়েক পা পিছিয়ে গেল৷ হাতের পাটাতন ঠক করে ছিটকে পড়ল৷ কী ভয়ানক! নৌকোর খোলের ভিতর শোয়ানো রয়েছে প্রভাস রায়ের মৃতদেহ৷ সকালের উজ্জ্বল আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে মুখটা৷ গলায় বেঁধা ট্যাঁটার ফলার তিনটে গভীর ক্ষত থেকে ঝরে পড়া রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে৷
মধুখালির ডাকসাইটে লেঠেল, নবাবপুরের জমিদারের ডাকাতদলের সর্দার আক্রাম জীবনে অনেক সংকট মুহূর্ত সামাল দিয়েছে৷ কিন্তু এমন কখনো হয়নি৷ দারুণ আতঙ্কে তার সারা শরীর তখন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে৷ দু’হাত উপরে তুলে অস্ফুট কাঁপা গলায় শুধু বলতে পারল, ‘স-সত্যি বলছি গো, ও প্রভাস রায় নয়৷ মাছ৷
—
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন