শিশির বিশ্বাস
গাঢ় নিশ্ছিদ্র অন্ধকার৷ সেই অতল অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছি ক্রমশ৷ আতঙ্কে হাত-পা ছুঁড়ে বৃথাই চিৎকার৷ গলা দিয়ে বিন্দুমাত্র আওয়াজ বের হচ্ছে না৷ তারই মধ্যে হঠাৎ ধুপ ধুপ আওয়াজ৷ খুব ধীর গতিতে হেঁটে আসছে কেউ৷ আওয়াজটা বাড়ছে ক্রমশ৷ তারপরেই দেখলাম নিকষ অন্ধকার ফুঁড়ে ভয়ানক এক দানব এগিয়ে আসছে আমার দিকে৷ অন্ধকারে ঝলসে উঠছে একরাশ তীক্ষ্ণ নখ৷ দারুণ আতঙ্কে চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম৷
ভয়ানক স্বপ্নটা ভেঙে গেল ওই সময়৷ চোখ মেলে যা দেখলাম, তা অবশ্য আরো ভয়ানক! পাশে বসে বিশাল চেহারার হাকিম সাহেব৷ হাতের ডানায় সুচ ফুঁড়ে ইনজেকশন দিচ্ছেন৷ যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে শরীর৷ পাশেই উদ্বিগ্ন মুখে দাদু আর ঠাকুরমা৷
স্বপ্ন আর বাস্তব মিলিয়ে ভয়ানক ছবিটা ছেলেবেলায় তারপর প্রায় তাড়া করে বেড়াত আমাকে৷ ঘুমের ঘোরে সেই স্বপ্ন দেখে চমকে উঠে বসতাম৷ ব্যাপারটা যে নিছক স্বপ্ন, সত্যি নয়, বুঝতেও সময় লাগত৷ কিন্তু তারপরেও আতঙ্ক কিছুমাত্র কমত না৷ হিম হয়ে আসত শরীর৷ ভয়ে বলতেও পারতাম না কাউকে৷ এমনকী কাছের মানুষ ঠাকুরমাকেও নয়৷ আসলে স্বপ্নে দেখা সেই ভয়ানক দৈত্য আর বাস্তবের হাকিম সাহেব মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল৷ শুধু রাতে নয়, এরপর দিনের বেলাতেও স্বপ্নটা কখনো ভেসে উঠত চোখের সামনে৷ তাড়া করে আসত সেই দৈত্যটা৷ দিনের অনেকটা সময় দাদু নানা কাজে বাইরে থাকতেন৷ তাই লেগে থাকতাম ঠাকুরমার সঙ্গে৷ আর যমের মতো ভয় পেতাম হাকিম সাহেবকে৷
মানুষটির পুরো নাম ছিল আবদুল হাকিম৷ সবাই হাকিম সাহেব বলেই ডাকত৷ কাছাকাছি সবচেয়ে পশারওয়ালা ডাক্তার ছিলেন উনি৷ কালো বিশাল শরীর৷ দেখতে মোটেই সুশ্রী ছিলেন না৷ মুখ ভরতি বসন্তের দাগের জন্য আরো ভয়ানক দেখাত৷ ঘোড়ায় চেপে রোগী দেখতে বেরুতেন৷ বাড়ির বাইরের উঠোনে খটখট শব্দ হলেই বুঝতাম, উনি এসেছেন৷ লাফিয়ে ঘোড়া থেকে নেমেই হাঁক পাড়তেন, ‘কই গো মাতুব্বরদা৷ নাতি কেমন?’
আমার মুখে ততক্ষণে ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে৷ ঠাকুরমা আমার সেই মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা আঁচ করতেন হয়তো৷ বাড়িতে দাদু না থাকলে মাথায় কাপড় টেনে দরজার আড়াল থেকে বলতেন, ‘দাদুভাই আজ ভালোই আছে হাকিম সাহেব৷ একবার দেখে যাবেন নাকি?’
‘তাহলে থাক৷’ ভারি গলায় উত্তর আসত, ‘একটা কথা কই দিদিজান৷ মণিরে এবার কলিকাতা পাঠায়ে দেন৷ ছোট মানুষ তো৷’
ভিতরে কাঠ হয়ে বসে আমি এরপর হাকিম সাহেবের লাফিয়ে ঘোড়ায় ওঠার শব্দ পেতাম৷ খট, খট আওয়াজ মিলিয়ে যেত ক্রমশ৷ হাঁপ ছাড়তাম আমিও৷
ছেলেবেলায় বাবা চাকরি নিয়ে কলকাতায় চলে এলেও দাদু আর ঠাকুরমার ইচ্ছেয় কিছুদিন দেশের বাড়িতেই থেকে গিয়েছিলাম৷ ম্যালেরিয়া রোগটা শরীরে জাঁকিয়ে বসেছিল ওই সময়৷ যখন তখন কাঁপিয়ে জ্বর আসত৷ তারপর বেহুঁশ৷ চিন্তিত দাদু আর ঠাকুরমা চিকিৎসার কোনো ত্রুটি রাখেননি৷ জ্বর উঠলেই তল্লাটের সেরা ডাক্তার হাকিম সাহেবকে খবর দেওয়া হত৷ দাদুর বন্ধু মানুষ ছিলেন উনি৷ জ্বর থাক বা না থাক, কাছাকাছি কোনো কলে এলে খোঁজ নিয়ে যেতেন৷ দশাসই চেহারা ছিল মানুষটার৷ তেমনই বুকের পাটা৷ নানা গল্প চালু ছিল ওনাকে নিয়ে৷ একবার ভাটির দিকে এক গ্রামে নাকি বাঘ এসেছিল৷ খবর পেয়ে নিজের দোনলা বন্দুক নিয়ে চলে গিয়েছিলেন৷ দিন চারেক বাদে মেরেও এনেছিলেন সেই বাঘ৷ আশপাশের গোটা কয়েক গ্রামের মানুষ ভেঙে পড়েছিল দেখতে৷ একবার কী এক ব্যাপার নিয়ে হঠাৎ দুই দলে দাঙ্গা বাধার উপক্রম৷ ভয়ে কাঁপছে সবাই৷ হাকিম সাহেব ভিন গাঁয়ে গিয়েছিলেন রোগী দেখতে৷ খবর পেয়ে ছুটে এসেছিলেন৷ একা হাতে ঠেকিয়েছিলেন সেই দাঙ্গা৷ এসব কারণে তাঁর শত্রু ছিল অনেক৷ কিন্তু পরোয়া করতেন না৷ ডাক পেলে রাতবিরেতে ছুটে যেতেন ভিন গাঁয়ে৷ কারো পরামর্শে কর্ণপাত করেননি৷
এসব শুনেছি অনেক পরে৷ কিন্তু সেইদিনের সেই ব্যাপারের পর হাকিম সাহেব আমার কাছে হয়ে উঠেছিলেন মূর্তিমান আতঙ্ক৷ দেখলেই স্বপ্নের সেই ভয়ানক দৈত্যটার কথা মনে পড়ে যেত৷ নিকষ অন্ধকারের ভিতর তলিয়ে যাচ্ছি ক্রমশ৷ সামান্য প্রাণের স্পন্দন নেই৷ তারই মধ্যে খট, খট শব্দে এগিয়ে আসছে বিকট চেহারার সেই দৈত্যটা৷ কালো হাঁড়ির মতো বিশাল মাথা৷ ছড়ানো মোটা নাক৷ পুরু ঠোঁট৷ মুখ ভরতি বসন্তের দাগ৷ ঠিক হাকিম সাহেব৷ তবে এরপর বেশিদিন আর গ্রামে দাদু-ঠাকুরমার কাছে থাকা হয়নি৷ খবর পেয়ে বাবা এসে কলকাতায় নিয়ে গিয়েছিলেন৷
কলকাতায় আসার পর ম্যালেরিয়া ছাড়ল অল্প দিনের মধ্যেই৷ তবে ভয়ানক সেই স্বপ্নটা সহজে ছাড়েনি আমাকে৷ যদিও বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছু কমে এসেছিল, এই মাত্র৷ বলা যায়, সেই কারণেই দেশের বাড়িতে এরপর আর যাইনি৷ দাদু আর ঠাকুরমা অবশ্য মাঝেমধ্যে আসতেন৷ সেই স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত যে একদিন সত্যি হয়ে দেখা দেবে, ভাবতেও পারিনি৷ সেটাই ঘটে গেল এক রাতে৷
স্কুল ছেড়ে সবে কলেজে ভরতি হয়েছি৷ হঠাৎ দেশ থেকে দাদুর আর্জেন্ট টেলিগ্রাম৷ ঠাকুরমা ভীষণ অসুস্থ৷ কয়েকটা জরুরি ওষুধ দরকার৷ তার মধ্যে কোরামিনও রয়েছে৷ বাবা অফিসে৷ উৎকণ্ঠিত মা অফিসে ফোন করতে বললেন৷ তখন সামান্য একটা ফোন করতে হলেও ছুটতে হত কাছের পোস্ট অফিসে৷ কিন্তু সেজন্য নয়, জানতাম বাবার অফিসে অডিট চলছে৷ তাই বললাম, ‘দরকার নেই মা৷ আমি ওষুধগুলো নিয়ে এখুনি বেরিয়ে পড়ছি৷ দেরি করা ঠিক হবে না৷’
মা চিন্তিত গলায় বললেন, ‘কিন্তু তুই কি পারবি? কতদিন যাসনি!’
মার চিন্তার কারণ ছিল৷ একে তো সেই যে দেশের বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় এসেছি, আর যাইনি৷ তারপর স্টেশন থেকে বাড়ি মাইল পাঁচেক পথ৷ এখুনি বেরিয়ে পড়লেও মাঝে ট্রেন পালটে গ্রামের স্টেশনে পৌঁছোতে সন্ধে হয়ে যাবে৷ অন্ধকার গ্রামে অতটা পথ চিনে যাওয়া সহজ নয়৷ কিন্তু মায়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দিলাম আমি৷ পরিস্থিতি বুঝে মাও আর আপত্তি করলেন না৷ বলা যায়, সেই দণ্ডেই ব্যাগ গুছিয়ে বের হয়ে পড়লাম৷
ওষুধগুলো কিনতে সময় লাগল৷ বিশেষ করে কোরামিন৷ প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি হয় না৷ টেলিগ্রাম দেখিয়ে গোটা কয়েক দোকান ঘুরে ওষুধটা যখন হাতে পেলাম, অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে৷ তারপর পথে ট্রেন পালটাতে হল৷ গ্রামের স্টেশনে যখন নামলাম, রাত প্রায় দশটা৷
পৌঁছোতে রাত হয়ে যাবে ভেবেছিলাম৷ কিন্তু এতটা হবে ভাবিনি৷ ছোট হল্ট গোছের স্টেশন৷ নিচু প্ল্যাটফর্মের মাঝে টিমটিম করে এক কেরোসিন ল্যাম্প জ্বলছে৷ শুক্লপক্ষের চাঁদ ইতিমধ্যে পশ্চিম দিগন্তে ঢলে পড়েছে৷ অস্ত যাবে অল্প সময়ের মধ্যে৷ স্টেশনে জনা কয়েক মানুষ নামলেও অন্ধকারে কে কোথায় ছিটকে গেছে! কিন্তু আমার সে উপায় নেই৷ অগত্যা স্টেশন মাস্টারকে ধরলাম৷ সব শুনে তিনি পথের হদিশ বুঝিয়ে দিলেও সাফ জানালেন, এই অন্ধকার রাতে অচেনা পথে না যাওয়াই ভালো৷ পরের ট্রেন ভোর পাঁচটায়৷ ওই ট্রেনে ওদিকের মানুষ পাওয়া যেতেও পারে৷ তাদের সঙ্গ ধরলে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যাবে৷ না হলেও ততক্ষণে আলো ফুটে যাবে৷ সমস্যা হবে না৷
কিন্তু আমার উপায় ছিল না৷ তাড়াতাড়িতে সঙ্গে টর্চ আনতে ভুলে গেছি৷ তবু অসুস্থ ঠাকুরমার কথা ভেবে নেমেই পড়লাম পথে৷
দু’দিকে বিস্তীর্ণ মাঠের মাঝে উঁচু কাঁচা রাস্তা৷ পথের দু’দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দু’চারটে বাবলা আর খেজুর গাছ৷ ডালের ফাঁকে থোকা থোকা জোনাকি৷ দূরে দু-একটা শেয়ালের কোরাস৷ সেই সাথে দূরের কোনো গ্রাম থেকে ভেসে আসা কুকুরের চিৎকার৷ নির্জন পথে এছাড়া কোথাও প্রাণের স্পন্দন নেই৷ আকাশে চাঁদ তখনও রয়েছে৷ সেই আলোয় পথ চিনতে অসুবিধা হচ্ছিল না৷ বড় বড় পায়ে দ্রুত এগিয়ে চলেছি৷ বড় এক কবরস্থান চোখে পড়ল৷ পথের ধারেই নতুন এক কবর৷ পাশেই ডাঁই করা ইট-বালি৷ দু-এক দিনের মধ্যেই বাঁধানো হবে৷ পয়সাওয়ালা কোনো ব্যক্তির কবর৷ মনে পড়ল, এ পথে মধুখালির কাছে পথের ধারে এক কবরখানা আছে৷ সন্দেহ নেই সেটাই৷ মনটা খুশি হয়ে উঠল৷ অল্প সময়ের মধ্যে অনেকটাই চলে এসেছি তাহলে! জামতলা হাট আর মাইল খানেক পথ মাত্র৷ ছোটবেলা দাদুর হাত ধরে কতবার ওই হাটে এসেছি৷ চেনা পথ৷ তারপর গ্রাম মাত্রই মাইল দেড়েক৷
কিন্তু ভাবনার সঙ্গে বাস্তবের মিল সবসময় হয় কোথায়? মধুখালি পেরিয়ে আসার কিছুক্ষণের মধ্যে পশ্চিম আকাশে চাঁদ অস্ত যেতেই টের পেলাম সেটা৷ দেখতে দেখতে অন্ধকার আরো ঘন হয়ে উঠল৷ সেই সাথে হঠাৎই মেঘ করে এল আকাশে৷ অন্ধকার আরো বাড়ল৷ কলকাতার মানুষ৷ অনেক রাতেও পথ চলা অভ্যাস৷ কিন্তু অন্ধকার এমন ভয়ানক হতে পারে, ধারণাই ছিল না৷ ভাবতে গিয়ে, হঠাৎ সারা শরীর প্রায় কাঁটা দিয়ে উঠল! মনে হল, ছেলেবেলার সেই ভয়ানক স্বপ্নটা হঠাৎ যেন সত্যি হয়ে উঠেছে! চারপাশে সেই গাঢ় নিশ্ছিদ্র অন্ধকার! সামান্য দূরেও কিছু নজরে পড়ছে না৷ সেই অন্ধকারের ভিতর ক্রমশ অতলের দিকে এগিয়ে চলেছি৷ তলিয়ে যাচ্ছি ক্রমশ! পার্থক্য দু’পাশে থোকা থোকা জোনাকির ঝাঁক৷ অন্ধকারের ভিতর একদল দানব যেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে৷ প্রায় ভুলে যাওয়া ছেলেবেলার সেই আতঙ্ক দেখতে দেখতে প্রায় গিলে ফেলল আমাকে৷ একবার তো মনে হল, নিছক সেই স্বপ্নটাই দেখছি আবার৷ ঘরে শুয়ে আছি বিছানায়৷ এখুনি ভেঙে যাবে ঘুমটা৷ সেই ছোটবেলায় যেমন হত৷ কিন্তু তা যে সম্ভব নয়, এই মুহূর্তে ঘুমিয়ে নয়, জেগেই আছি, একই সঙ্গে বুঝতে পারলাম সেটাও৷
শুধু তাই নয়, হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, দশ বছর আগের সেই স্বপ্নের মতোই চারপাশ হঠাৎ কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে৷ খানিক আগে দূর থেকে ভেসে আসা শেয়ালের কোরাস, কুকুরের ডাক আর শোনা যাচ্ছে না৷ সামান্য প্রাণের স্পন্দনও নেই কোথাও৷ বোধহয় বৃষ্টিও নামবে৷ একবার ভাবলাম, স্টেশনে ফিরে যাই বরং৷ কিন্তু অনেকটাই চলে এসেছি৷ ফেরার পথ ধরলেও এই ঘন অন্ধকারে শেষ পর্যন্ত যে, সেখানে পৌঁছোতে পারব, এমন নিশ্চয়তা নেই৷ তাই বাতিল করতে হল সেই মতলব৷
অনুমানে পা ফেলে প্রায় হাতড়ে হাতড়েই চলতে লাগলাম এরপর৷ প্রতি মুহূর্তে ভয় হচ্ছিল, এখুনি হয়তো পথের ধারের খাদে হুমড়ি খেয়ে গড়িয়ে পড়ব৷ এভাবে কতক্ষণ চলেছি, মনে নেই৷ হঠাৎ খেয়াল হল, আমি একা নই, পিছনে কেউ আসছে৷ চারপাশের নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে খুব হালকা ধুপধুপ আওয়াজ৷ এই ঘন অন্ধকারে দেখা সম্ভব নয় জেনেও পিছনে তাকালাম৷ যথারীতি নজরে পড়ল না কিছু৷ তারপর কান পেতে বোঝার চেষ্টা করতেই মাথার ভিতর টনক নড়ল৷ ছেলেবেলায় স্বপ্নের ঘোরে শোনা অন্ধকারে হুবহু সেই পায়ের আওয়াজটা ফিরে এসেছে আবার! এ শব্দটাও মানুষের পায়ের নয়! বিলম্বিত লয়ে খট-খট আওয়াজ৷ যেন পেরেকের উপর হাতুড়ি পড়ছে৷ আওয়াজটা ক্রমশ জোরাল হচ্ছে৷ এগিয়ে আসছে কাছে৷ স্বপ্নে দেখা সেই দৈত্যটা নয়তো! আতঙ্কে শরীর হিম হয়ে গিয়েছিল আগেই৷ কোনো মতে চেঁচিয়ে বলতে গেলাম, ‘কে? কে ওখানে?’
সামান্য ফ্যাসফ্যাস আওয়াজ ছাড়া গলা দিয়ে কোনো স্বরই বের হল না৷ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে৷ শব্দটা ইতিমধ্যে আরো কাছে এগিয়ে এসেছে৷ অন্ধকারে দেখা না গেলেও উৎস কয়েক হাত মাত্র৷ হঠাৎ মনে হল, বাঁচতে হলে পালানো ছাড়া অন্য উপায় নেই৷ মুহূর্তে দিগবিদিক হারিয়ে ছুটতে শুরু করলাম৷ আর তখনই হুঁশ হল অদূরে আমার সামনে সর্বাঙ্গ সাদা কাপড় গায়ে একটা মানুষ৷ বলিষ্ঠ চেহারা হলেও মাথা অদ্ভুতভাবে ঝুঁকে পড়েছে বুকের উপর৷ দেখে কিছুটা হলেও সাহস ফিরে এল৷ গলা ঝেড়ে নিয়ে চিৎকার করে বললাম, ‘শুনছেন৷’
কিন্তু ওদিক থেকে কোনো সাড়া এল না৷ সেই একই ভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে চলতে লাগল৷ অগত্যা গতি বাড়ালাম আমিও৷ পিছনে সেই আওয়াজ তখনও সমানে তাড়া করে আসছে৷
এভাবে কতক্ষণ সেই মানুষটির পিছনে ছুটেছি, হুঁশ নেই৷ কিন্তু আশ্চর্য, দূরত্ব সামান্য কমাতে পারলেও ধরতে পারিনি তাকে৷ তারপর একসময় হঠাৎই দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি৷ ছুটে সামনে গিয়ে হাত বাড়িয়েছিলাম৷ ভয়ানক চমকে উঠে মুহূর্তে টেনে নিলাম৷ মানুষটির মাথা সেই একইভাবে ঝুঁকে রয়েছে বুকের উপর৷ তবু অন্ধকারেও যেন চিনতে পারলাম তাঁকে৷ মুহূর্তে দারুণ আতঙ্কে হিম হয়ে গেল শরীর৷ হাকিম সাহেব! কেমন মরা মাছের মতো চোখে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে৷ গলায় গভীর এক ক্ষতচিহ্ন৷ মাথাটা কোনো রকমে ঝুলে রয়েছে৷
আতঙ্কে আমার সারা শরীর তখন প্রায় পাথর হয়ে গেছে৷ বুকের উপর ঝুলে থাকা মাথাটা নড়ে উঠল সামান্য, ‘মণি, আর ভয় নাই৷ সামনেই বাড়ি৷ একাই যাতি পারবা৷’
আতঙ্কে হিম হয়ে যাওয়া শরীরে সেই কথায় হঠাৎ যেন প্রাণ সঞ্চার হল৷ ততক্ষণে সামনে সেই মানুষটা কথা শেষ করে এগিয়ে গেছে৷ অন্ধকারে আর দেখতে পেলাম না৷ পিছনে তাড়া করে আসা সেই আওয়াজটাও আর শোনা যাচ্ছে না৷ তারপরেই খেয়াল হল, দাঁড়িয়ে আছি কোনো এক লোকালয়ের ভিতর৷ অদূরে ঘর-বাড়ির আভাস৷ পথের পাশেই এক বাড়ির ভিতর আলো জ্বলছে৷ জানলা দিয়ে সেই আলোর রেখা৷ আরে, ঘরের পিছনে ওই তো আমাদের সেই জোড়া নারকেল গাছ! পাশেই পথের উপর দাঁড়িয়ে আছি! চিৎকার করে ডাকলাম, ‘দাদু, উ, উ, উ, আমি শুভ, শুভময়৷ দরজা খোল৷’
মুহূর্তে সশব্দে গোটা কয়েক দরজা খুলে গেল৷ ওদিকে কাছারি ঘরের দিক থেকে কাজের মানুষ হারানের গলার আওয়াজ, ‘কে? মণিভাই! এত রাতে!’
ততক্ষণে ওদিকের বড় ঘর থেকে দাদু হাতে আলো নিয়ে বের হয়ে এসেছেন৷ কাছে এসে অবাক হয়ে বললেন, ‘দাদুভাই!’
‘হ্যাঁ দাদু৷ দুপুরে টেলিগ্রাম পেয়েই বেরিয়ে পড়েছি৷ তবু ওষুধ কিনতে দেরি হয়ে গেল৷ কেমন আছে ঠাকুরমা? কোরামিন এনেছি৷’
আমার ওই কথায় দাদুর চোখ দিয়ে হঠাৎ জল গড়িয়ে পড়ল৷ উত্তর না দিয়ে ঘরে নিয়ে এলেন৷ আমার সাড়া পেয়ে আশপাশের আরো কয়েকজন হাজির হয়েছেন৷ ঘরে এসে দেখি অসুস্থ ঠাকুরমাও জেগে উঠেছেন৷ বুক থেকে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল৷ তাড়াতাড়ি বললাম, ‘কোরামিন আর লাগেনি?’
‘লেগেছিল দাদুভাই৷’ ধরা গলায় দাদু বললেন৷
‘কোথায় পেলে?’
উত্তর দিতে গিয়েও দাদু থেমে গেলেন হঠাৎ৷ একজন ঠাকুরমার কাছ থেকে আমাকে পাশের ঘরে টেনে এনে বললেন, ‘ওসব এখন থাক মণিভাই৷ সে অনেক কথা৷’
কিন্তু থাক বললে আমার যে চলবে না৷ তাড়াতাড়ি বললাম, ‘কী? হাকিম সাহেব?’
‘হ্যাঁ, হাকিম সাহেব৷ কোরামিন পাওয়া যায়নি শুনে উনি নিজেই দূরের এক রোগীর বাড়ি থেকে খুঁজে এনেছিলেন ওষুধটা৷ গতকাল অনেক রাতে৷’
‘কেমন আছেন উনি?’ উৎকণ্ঠিত গলায় কোনো মতে বলতে পারলাম৷
‘উনি খুন হয়েছেন গত রাতে৷ এখান থেকে ফেরার পথে৷ শত্রু তো কম ছিল না৷ এই রাতে একা ফিরতে তাই মানা করেছিল সবাই৷ লেঠেলের জন্য সর্দার পাড়ায় লোকও পাঠানো হয়েছিল৷ কিন্তু কানে তোলেননি৷ জানিয়েছিলেন, ঘোড়া যখন রয়েছে, চিন্তার কিছু নেই৷ বরং একা গেলে অনেক তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছোতে পারবেন৷’
—
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন