বাদুড়তলার বাগানে

শিশির বিশ্বাস

টানা অনেকটা হেঁটে আসার পর অমল বুঝতে পারল, পথ ভুল করেছে৷ ব্যাপারটা খেয়াল হতে পরিস্থিতি অনুধাবন করে বেজায় দমে গেল ও৷ চৌদ্দো বছর বয়স হলেও বেড়াতে কম যায়নি৷ হাজারিবাগ আর বেতলার জঙ্গলেও গেছে৷ গেছে গরুমারা, জলদাপাড়াতেও৷ তাই জঙ্গলে ঘোরার অভিজ্ঞতা নেই, বলা যায় না৷ কিন্তু মামাবাড়ির গ্রামের পাশে এই বাদুড়তলার বাগানের জুড়ি একটিও পায়নি৷ হাজার কয়েক একর জমি নিয়ে এই বাগানে সারা বছর বাদুড়ের রমরমা৷ তাই হয়তো এই নাম৷ আম, জাম, কাঁঠাল থেকে শুরু করে বেল, ঝাঁকড়া আসশ্যাওড়া৷ বড় বড় তাল, খেজুর আর নারকেল গাছ, কী নেই এই বাগানে! মামাদেরও অনেকটা জমি আছে এখানে৷ সেই গাছের খাজা কাঁঠাল আর গোলাপখাস আমের স্বাদই আলাদা৷ প্রতি বছর গরমের ছুটি পড়লে তাই ওর মামাদের বাড়িতে একবার আশা চাই৷ এবার অবশ্য আম-কাঁঠালের সময় নয়৷ পুজোয় এবার পুরি বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল৷ বাড়ির সবাই মিলে দিন পনেরো থাকা হবে সেখানে৷ হলিডে হোম বুক, ট্রেনের রিজার্ভেশন, সব হয়ে রয়েছে৷ কিন্তু অফিসে জরুরি কাজের কারণে বাবার ছুটি শেষ মুহূর্তে ক্যানসেল হয়ে যাওয়ায় ভেস্তে গেছে সব৷ এবার পুজো তাই মোটেই ভালো কাটেনি অমলের৷ মন খারাপ৷ শেষে কালী পুজোর দিন কয়েক আগে মা বললেন, ‘যা অমু, ছুটি শেষ হতে তো দিন কয়েক বাকি আছে৷ মামাবাড়ি থেকে ঘুরে আয়৷ ওরা যাবার জন্য অনেক করে চিঠি লিখেছে৷’

ব্যাপারটা অজানা নয় অমলের৷ মামাদের বাড়িতে এবার মানতের কালী পুজো৷ যাবার কথা ওদের সবার৷ কিন্তু বাবার ছুটি নেই বলে মার যাবার উপায় নেই৷ এ ব্যাপারে অমলের খুব যে একটা ইচ্ছে ছিল এমন নয়৷ তবু আসতেই হয়েছে৷ নইলে মামারা দুঃখ পাবেন৷ ছোটমামার সাহচর্যে দিন কয়েক কিন্তু মন্দ কাটেনি৷ মামাবাড়িতে এলে বেশিরভাগ সময় তাকে পাওয়া যায় না৷ ছোটমামা বাইরে থেকে পড়াশোনা করে৷ গরমের ছুটি নেই ওদের৷ আসতে পারে না৷ এবার বাড়িতে পুজো৷ তাই কালী পুজোর কয়েকদিন আগেই চলে এসেছে৷ দারুণ ডাকাবুকো স্বভাবের মানুষ এই ছোটমামা৷ অমলের একেবারে মনের মতো৷ বাড়ির কাছেই নদী৷ বর্ষার পরে বেশ জল আছে এখনো৷ স্রোতের টানও রয়েছে৷ মামার সঙ্গে নদীতে ঝাঁপিয়ে স্নান৷ বিকেলে নৌকোয় চড়ে ঘণ্টা দুই ঘুরে আসা৷ এর মধ্যে মাইল কয়েক দূরের বিলে বঁড়শি ফেলে মাছ ধরতেও গেছে৷ বিলে ধানখেতের মাঝে কোথায় মাছ রয়েছে, মামার নখদর্পণে৷ টোপ গেঁথে ছিপ ফেলতেই টপাটপ চমৎকার সাইজের বড়-বড় পাবদা আর ট্যাংরা মাছ৷ সেই মাছের স্বাদই আলাদা৷ তবে ধরার আনন্দ আরো বেশি৷

অমল পেটুক মানুষ৷ আম-কাঁঠালের সময় না হলেও দিনগুলো তাই কাটছিল ভালোই৷ আজ অবশ্য মাছ ধরতে যাওয়া হয়নি৷ একদিন পরেই মামাদের কালী পুজো৷ সেই দৌলতে বাড়ির কাজ বেড়েছে৷ বিকেলে মালপত্র মেলাতে গিয়ে খেয়াল হল, বাকি সব চলে এলেও কদমা, ফেনিবাতাসা আসেনি৷ অথচ যদু-ময়রার কাছে যথাসময়ে অর্ডার দেওয়া রয়েছে৷ বড়মামা নিজেই হয়তো ছুটতেন৷ কিন্তু ছোটমামা বলল, ‘চল অমল, আমরাই খোঁজ নিয়ে আসি৷ ময়রার ঠেক অন্য গ্রামে হলেও বাদুড়তলার বাগানের ভিতর দিয়ে গেলে বেশি সময় লাগে না৷ ওদিকটা একটু ঘুরেও আসতে পারবি৷’

বাড়িতে পুজোর কাজে ব্যস্ত থাকায় ছোটমামা আজ আর ওকে নিয়ে বেরোতে পারেনি৷ তাই বাদুড়তলার বাগানের নামে নেচে উঠেছিল৷ আম-কাঁঠালের সময় যদিও এখন নয়, তবু অন্য ফলের গাছের অভাব নেই বাগানে৷ চটপট তৈরি হয়ে ছোটমামার সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিল এরপর৷

গ্রামের পরে ছোট এক মাঠ পার হতেই বাদুড়তলার বাগান৷ ভিতরে ঢুকে এবার একটু অবাক হয়ে গেল অমল৷ মাত্র মাস কয়েক আগেও ঘুরে গেছে৷ কিন্তু এখন একেবারেই যেন অন্য রকম৷ গাছপালা আর ঘন ঝোপঝাড়ে চেনার উপায় নেই৷ বিকেলে বাইরে যথেষ্ট আলো থাকলেও ভিতরে বেশ অন্ধকার৷ কৌতূহলে প্রশ্ন করতে ছোটমামা বললেন, ‘গ্রাম বাংলার এই সব বাগান সারা বছর একরকম থাকে না৷ বর্ষায় বৃষ্টির জল পেলেই নতুন ঝোপঝাড় গজিয়ে ভয়ানক ঘন হয়ে ওঠে৷ তবে বাগানের সেই অবস্থা সারা বছর থাকে না৷ বর্ষা চলে গেলেই ঝোপঝাড় শুকিয়ে কমে আসে৷ জ্বালানির জন্য গ্রামের মানুষ কেটে নিয়ে যায়৷ গরমের দিনে তাই বাগান অনেক পাতলা হয়ে আসে৷’

বাবা-মায়ের সঙ্গে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটা জঙ্গল ঘোরা হয়ে গেছে অমলের৷ আজ বাদুড়তলার বাগানে ঢুকে ওর মনে হল, সেসব জঙ্গল এর চাইতে বেশি ঘন নয়৷ ও বলল, ‘এ তো বাঘ থাকার মতো জঙ্গল!’

উত্তরে ছোটমামা বলল, ‘তবে শোন বলি৷ বড়োদের কাছে শুনেছি, একসময় এই বাদুড়তলার বাগানে এই সময় প্রায় বছরই বাঘ এসে আস্তানা নিত৷ গ্রামের কয়েক জনের কাছে বাঘ মারার জন্য বন্দুকও ছিল৷ সেসব দিন আর নেই৷ শেয়াল আর খটাশের আস্তানা৷ তবে—’

ছোটমামা কী বলতে গিয়েও হঠাৎ থেমে গেল৷ কিন্তু তা নিয়ে তেমন কৌতূহল দেখাল না অমল৷ আসলে তখন ওর চোখ আটকে গেছে অন্য দিকে৷ বাগানের ভিতর দিয়ে সরু পায়ে চলা পথ৷ তারই অদূরে এক ঝাঁকড়া পেয়ারা গাছ৷ গাছ ভরতি পেয়ারা ফলে রয়েছে৷ ওকে জুলজুল চোখে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ছোটমামা বলল, ‘কী রে, পেয়ারা খাবি?’

ঘাড় নেড়ে অমল ততক্ষণে গাছের কাছে৷ গাছে ভালোই উঠতে পারে ও৷ তবে ছোটমামা সে সুযোগ দিল না৷ নিজেই গাছে উঠে গোটা কয়েক ডাঁশা পেয়ারা পেড়ে এনে ওর হাতে দিল৷ চমৎকার পেয়ারাগুলো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় বাকি পথটা তেমন কোনো কথা আর হল না৷

পাশের গ্রামে যদু-ময়রার ঠেক বেশি দূরে নয়৷ ভিতরে মস্ত উনুনে চিনি আর গুড় জ্বাল হচ্ছে৷ গন্ধে ম-ম করছে চারপাশ৷ এক ঝাঁক মাছির সঙ্গে গোটা কয়েক হলদে রঙের বোলতাও গুড়-চিনির গন্ধে ভনভন করে উড়ে বেড়াচ্ছে৷ ওদের দেখেই প্রৌঢ় যদুময়রা ছুটে এল৷ মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, ‘আজ্ঞে ছোটবাবু কর্মচারীটি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় কদমা আর ফেনিবাতাসার পুরোটা এখনো তৈরি করা যায়নি৷ নিশ্চিন্ত থাকুন, বাকিটা তৈরি করে আগামী কালের মধ্যেই পৌঁছে দিয়ে আসব৷’

ওরা ফেরার পথ ধরবে, হঠাৎ ছোটমামা বলল, ‘দাঁড়া অমল, এদিকে যখন এলাম, একবার প্রশান্তর সঙ্গে দেখা করে যাই৷ আগেরবার দেখা হয়নি ওর সঙ্গে৷ পুজোর রাতে আসবে নিশ্চয়৷ তবে তখন কী আর আড্ডা হয়! আজ হাতে সময় যখন আছে, দেখা করে আসি৷’

ছোটমামার কথায় অমল প্রমাদ গণল৷ মানুষটার আর সবই ভালো৷ কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় বসলে আর হুঁশ থাকে না৷ এই অবস্থায় ছোটমামার সঙ্গ দেওয়া মানেই বিকেলটা বরবাদ৷ তার উপর অন্য মতলবও রয়েছে৷ ও বলল, ‘আমি তাহলে একাই চলে যাই৷ অসুবিধা হবে না৷’

ওর কথায় ছোটমামা আপত্তি করল না৷ আসলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার সময় ছোটদের কেউ সঙ্গে থাকলে কিছু মুশকিলও হয়৷ তাই বলল, ‘যেতে চাইছিস যখন, দেরি করার দরকার নেই৷ গ্রামের ভিতর দিয়ে যেতে সময়ও একটু লাগবে৷’

অমল মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘গ্রামের ভিতর দিয়ে যাব কেন? যে পথে এলাম, সেই পথেই ফিরব৷’

‘একদম নয়৷’ অমলের কথায় প্রায় হাঁ-হাঁ করে উঠল ছোটমামা, ‘আলো পড়ে আসছে৷ এখন ওদিক দিয়ে যাবার দরকার নেই৷ পথ হারিয়ে ফেলবি৷’

‘কী যে বলো ছোটমামা!’ অমল হেসে উঠল, ‘পথ হারিয়ে ফেলব, বললেই হল?

‘তা হয়তো ফেলবি না, ছোটমামা বললেন, ‘তবে এই অবেলায় কী দরকার বাগানের পথে যাবার? সাপ-খোপ রয়েছে৷ অন্য বিপদেও তো পড়তে পারিস৷’

ছোটমামা ভুল বলেনি৷ কিন্তু অমল নিরুপায়৷ আসলে ওর ইচ্ছে ছিল, বাগান দিয়ে ফেরার পথে আরো কয়েকটা ডাঁশা পেয়ারা পেড়ে নিয়ে যাবে৷ কিন্তু এখন মামার কথায় অন্য গন্ধ পেয়ে বলল, ‘সাপ-খোপ নিয়ে ভয় নেই আমার৷ সামলে নিতে পারব৷ কিন্তু অন্য কী বিপদ ছোটমামা?’

অমলের সেই প্রশ্ন পাশ কাটিয়ে ছোটমামা বলল, ‘জেদ যখন ধরেছিস, চল খানিক এগিয়ে দিয়ে আসি৷’

আসলে ছোটমামা তার এই ভাগনেটিকে বিলক্ষণ চেনে৷ তাই আর আপত্তি করল না৷ অমল কিন্তু থামল না৷ ছোটমামা তখন ওকে নিয়ে বাদুড়তলার বাগানের দিকে এগোতে শুরু করেছে৷ ফের বলল, ‘অন্য কী বিপদ, বললে না তো মামা!’

ছোটমামা অবশ্য বিন্দুমাত্র কান দিল না তাতে৷ ভেবেছিল, পথে কাউকে পেয়ে যাবে৷ সঙ্গে ধরিয়ে দিলে বাগান পার করে দিতে পারবে৷ কিন্তু বাগানের ভিতর খানিক দুর হেঁটে এসেও যখন তেমন কাউকে পাওয়া গেল না৷ চিন্তিত হয়ে বলল, ‘ভালো করে শোন অমল৷ এই পথ ধরে নাক বরাবর চলে যাবি৷ মিনিট পাঁচেক চলার পর একটা বেল গাছ পার হলেই দেখবি বাঁ হাতে একটা পথ বেরিয়েছে৷ সেই পথ ধরে আরো—’

বলতে বলতে হঠাৎই থামল ছোটমামা৷ আসলে ভাগনের মুখের দিকে তাকিয়ে বেশ বুঝতে পারছিল, তার কোনো কথাই সম্ভবত শ্রোতার কানে পৌঁছোচ্ছে না৷

ছোটমামার বুঝতে ভুল হয়নি৷ আসলে সামান্য ব্যাপারে এত উদ্বেগের কোনো কারণই খুঁজে পাচ্ছিল না অমল৷ বাগানের এই পথে আগেও অনেকবার গেছে৷ যদিও সঙ্গে অন্য কেউ ছিল৷ তবু ভুল হবার কথা নয়৷ ও বলল, ‘তুমি অযথাই ভয় পাচ্ছ মামা৷ ঠিক চিনে যেতে পারব৷ একদম চিন্তা করো না৷’

‘ছোটমামা আর আপত্তি করল না৷ শুধু বলল, ‘হ্যাঁ, যে প্রশ্ন করছিলি তখন, গ্রামে এক গেছো-পাগল আছে৷ বদ্ধ উন্মাদ৷ প্রায়ই বাদুড়তলার বাগানে গাছে উঠে বসে থাকে৷ হঠাৎ যদি চোখে পড়ে যায়, ভয় পাসনি আবার৷’

‘তাই বলো!’ ছোটমামার কথায় হেসে ফেলল অমল৷

ছোটমামা ফের একবার ওকে সাবধান করে বিদায় নিতে নিশ্চিন্ত মনেই অমল চলতে শুরু করেছিল৷ তারপর যা হল, সে তো শুরুতেই বলেছি৷ প্রথম টনক নড়ল প্রায় মিনিট পঁচিশের মতো হেঁটে আসার পর৷ বেশ জোরেই পা চালিয়ে চলেছে, কিন্তু পেয়ারা গাছটার তখনও দেখা নেই৷ তবে কি পথ ভুল হল! ফের ঘড়ির দিকে তাকাল ও৷ আসার সময় এই পথটা পার হতে মিনিট পনেরোর বেশি লাগেনি৷ পথ ভুল হয়নি তো? সন্দেহটা মাথা চাড়া দিলেও দমে না গিয়ে আরো কিছু দূর এগিয়ে গেল৷ কিন্তু প্রায় মিনিট পাঁচেক চলার পরেও পেয়ারা গাছটার সন্ধান মিলল না৷

সুতরাং দাঁড়াতে হল৷ পথ যে ভুল হয়েছে, তাতে আর সন্দেহ নেই! কলকাতার ছেলে অমল বরাবরই একটু ডানপিটে গোছের৷ স্কুলে, পাড়ায় এজন্য সুনাম এবং দুর্নাম দুটোই আছে৷ তাই ছোটমামার আশঙ্কাকে একেবারেই পাত্তা দেয়নি৷ বিশেষ করে বাদুড়তলার এই বাগান ওর কাছে কিছুমাত্র নতুন নয়৷ মামা কিংবা অন্যদের সঙ্গে আগে অনেকবার এসেছে৷ ওর এই চৌদ্দো বছর বয়সের মধ্যে বহু জায়গা একাই ঘুরে এসেছে, যেখানে আগে কখনো যায়নি৷ কিন্তু দুটো যে এক জিনিস নয়, সেটা এখন বেশ বুঝতে পারছিল৷ সেসব জায়গায় পথে মানুষ থাকে৷ সমস্যায় পড়লে তাদের সাহায্য নেওয়া যায়৷ কিন্তু প্রায় জঙ্গলের মতো নির্জন বাগানে, সেই সুবিধা কোথায়? এতটা পথ হেঁটে এল, একটা মানুষের দেখা পাওয়া যায়নি৷ আর ভিতরে পায়ে চলা পথ তো একটা নয়৷ মাকড়সার জালের মতো অসংখ্য৷ সবই এক রকম দেখতে৷ প্রায় গোলক ধাঁধার রাজ্য৷ তার উপর এই বিকেলে সূর্য প্রায় দিগন্তের কাছে৷ কার্তিক মাসে রোদের তেজ তেমন থাকে না৷ আর এই ঘন গাছপালায় ঘেরা বাগানের ভিতর রোদের ছিটেফোঁটাও নেই৷ আলো অনেকটাই কমে এসেছে৷ কোথাও তো রীতিমতো অন্ধকার৷ সন্দেহ নেই, ছোটমামা এমনটা অনুমান করেই মানা করেছিল এই পথে আসতে৷ ভাবতে গিয়ে মাথাটা হঠাৎ ঝিমঝিম করে উঠল৷ তবে সেটা সামাল দিতে সময় লাগল না৷ ও বুঝতে পারল, এই অবস্থায় আন্দাজে পথ হেঁটে একেবারেই লাভ হবে না৷ বিপদ আরো বাড়বে৷ এই শেষ বিকেলে পথে দাঁড়িয়ে কারো জন্য অপেক্ষা করেও লাভ নেই৷ বরং নাক বরাবর কোনো এক দিকে হেঁটে বাগানের বাইরে চলে যাওয়াই নিরাপদ৷ একবার বাইরে বেরোতে পারলে কোনো মানুষের সন্ধান নিশ্চয় পাওয়া যাবে৷

কিন্তু শিরে যে তখন খাড়া ঝুলছে, বুঝতে সময় লাগল না অমলের৷ পায়ে চলার পথ কোনোটাই সোজা নাক বরাবর নয়৷ খানিক গিয়েই ডান নয়তো বাঁ দিকে বেঁকে গেছে৷ তারপর ফের হয়তো যথাদিকে ঘুরেছে, কিন্তু পথের গোলকধাঁধার ভিতর তার হিসেব রাখাই মুশকিল৷ আরো প্রায় আধ ঘণ্টার মতো ঘোরাঘুরিই সার হল৷ বাগান থেকে বের হবার রাস্তা পাওয়া গেল না৷ এদিকে আলো কমে আসছে৷ অন্ধকার ক্রমশ জমাট বাঁধতে শুরু করেছে৷ অমল বেশ বুঝতে পারল, ইতিমধ্যে ও দিকও হারিয়ে ফেলেছে৷ বেচারা এমন বিপদে আজ পর্যন্ত পড়েনি৷ গোঁয়ার্তুমি করতে গিয়ে ভালো শিক্ষা পেল আজ৷ আর কিছুক্ষণ পরেই সন্ধে নেমে আসবে৷ বাগানের পথে বিকেলেই কোনো মানুষের দেখা পাওয়া যায়নি৷ আর রাতে যে তেমন কাউকে দেখা যাবে, সেই আশা না করাই ভালো৷ ভাবতে গিয়ে এই বিপদের মধ্যেও অমলের মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল৷ গোঁয়ার্তুমি করতে গিয়ে অযথাই বিব্রত করা হল মামাবাড়ির সবাইকে৷ আড্ডা শেষ করে ছোটমামা একসময় বাড়িতে ফিরবে৷ তারপর শুরু হবে হইচই৷ হ্যাজাক-বাতি জ্বেলে গ্রামের মানুষ ডেকে ওকে খুঁজতে বের হবে৷ হেনস্তার একশেষ৷ ছি-ছি!

অমল এ পর্যন্ত মাথা মোটামুটি ঠান্ডাই রেখেছিল৷ কিন্তু আর পারল না৷ আধো অন্ধকার বাগানের ভিতর পথের মাঝে দাঁড়িয়ে প্রায় কুলকুল করে ঘামতে শুরু করল৷ ঠিক সেই সময় ওর নজর গিয়ে পড়ল অদূরে এক গাব গাছের মাথার উপর৷

কী কাণ্ড! সেই গেছো-পাগলটা গাছের ডালে বসে জুলজুল চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে৷ ছোটমামা সাবধান করে বলেছিল, লোকটা নাকি বদ্ধ উন্মাদ৷ কিন্তু হঠাৎ মানুষটাকে দেখে বুক থেকে যেন পাথর নেমে গেল অমলের৷ হোক বদ্ধ উন্মাদ, কিন্তু বিপদের মুখে হাতের কাছে পাওয়া খড়কুটোরও অনেক দাম৷ গলাটা সামান্য ঝেড়ে নিয়ে অমল মোলায়েম গলায় বলল, ‘এই যে ভাই, একটু আসবেন এখানে৷’

উত্তরে লোকটা তৎক্ষণাৎ কোনো সাড়া দিল না৷ তবে মাথা সর্বস্ব লিকলিকে খড়ি-ওঠা শরীরটা নড়ে উঠল সামান্য৷ চোখের দৃষ্টিটা আরো খরখরে হয়ে উঠল৷ তারপর ধারালো দু-পাটি দাঁত বের করে খিঁক করে হাসল৷ সেই হাসি দেখে একটু দমে গেল অমল৷ কামড়ে দেবে নাকি! তবে সাহস হারাল না৷ কলকাতার গলিতে একবার এক পাগলা কুকুর ধেয়ে এসেছিল৷ সেই বিপদ যখন সামলাতে পেরেছে, এ তো একটা মানুষ৷ দেখাই যাক৷ লোকটার অবশ্য তখনও গাছ থেকে নামার লক্ষণ নেই৷ অমল ফের ডাকল তাকে, ‘একটু আসুন না ভাই৷ বড় বিপদে পড়েছি৷’

গাছের উপর লোকটা এবার নড়ে উঠল সামান্য৷ তারপর গাছ বেয়ে সড়াৎ করে প্রায় চোখের পলকে নেমে পড়ল৷ লিকলিকে বেঢপ আকারের ঢ্যাঙা লোকটা এরপর কাছে এসে ঝুঁকে পড়ে ফাটা শঙ্খের মতো আওয়াজে বলল, ‘কি বলতেচো গা?’

লোকটার কথায় ধড়ে যেন প্রাণ এল অমলের৷ ছোটমামা বদ্ধ উন্মাদ বলেছিল৷ কিন্তু তেমন মনে হচ্ছে না! আশায় বুক বেধে মোলায়েম গলায় বলল, দেখুন না ভাই, বড্ড বিপদে পড়েই ডাকতে হল আপনাকে৷

‘ভালো রে ভালো!’ দু-পাটি দাঁত মেলে ধরে ফের খিঁক করে হাসল লোকটা, ‘বিপদে পড়ে ফের মোকেই ডাকতেচো!’

লোকটার সেই কথার মাথামুণ্ডু তেমন বুঝতে না পারলেও গা করল না অমল৷ পাগলের কথা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই৷ ও তাড়াতাড়ি বলল, ‘বাগানে পথ হারিয়ে ফেলেছি ভাই৷ একটু দেখিয়ে দিন না৷’

‘কাদের বাড়ির ছেলে গা তুমি? কোন গেরামের?’ ভাঁটার মতো দুই চোখ পাকিয়ে খরখরে গলায় বলল লোকটা৷

অমল অবশ্য তা নিয়ে মাথা ঘামাল না৷ তাড়াতাড়ি বড়মামার নাম জানিয়ে গ্রামের নাম বলতে যাবে, তার আগেই লোকটা বলল, ‘অ, কত্তাবাবুদের বাড়ির ছেলে!’

লোকটার ভাঁটার মতো জ্বলে ওঠা চোখ দুটো হঠাৎ যেন অনেকটাই নরম হয়ে এল৷ তারপর বলল, ‘তা চলেন, পৌঁচে দে আসি৷’

লোকটা বড় বড় পা ফেলে চলতে শুরু করল এরপর৷ পিছনে অমল৷ কিছুক্ষণের মধ্যে লোকটা বাগান থেকে বের হয়ে ওকে নিয়ে যেখানে এসে হাজির হল তার পাশেই এক সর্ষে খেত৷ আলের কোনায় বড়সড় এক বাবলা গাছের ডালে একরাশ খড়কুটোয় তৈরি শালিখের বাসা৷ সেদিকে তাকিয়ে প্রায় যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল অমলের৷ এই তো সেই বাগানে ঢোকার রাস্তা! বিকেলের সূর্য বিদায় নিলেও, ভালোই আলো রয়েছে এখনো৷ মামাদের গ্রামটাও দেখা যাচ্ছে৷ ওফ! ছোটমামার কথায় কান না দিয়ে কী বিপদেই যে পড়েছিল! ভাগ্যিস, পাগল লোকটার মুড আজ ভালো ছিল৷ নইলে হেনস্তার শেষ থাকত না৷

‘কি গো বাপু, যেতি পারবেন তো এবার?

‘খুব পারব৷’ একগাল হাসল অমল, ‘কী বলে যে ধন্যবাদ দেব৷ খুব উপকার করেছেন৷’

‘ও ঠিক আছে৷’ লোকটা বলল এবার, ‘তা একটা কতা বলি বাপু৷ কত্তাবাড়িতে তো কাল গেলে পরশু কালী পুজো৷ জোড়া পাঁটা বলি পড়বে৷ তা এত মানুষের নেমতন্ন হল, মোদের কতা মনে পড়লনি! খেতি মোদেরও তো সাধ জাগে৷ হ্যাঁ কী না?’

লোকটার সেই কথায় অমলের মুখ লাল হয়ে উঠল৷ যদিও ব্যাপারটা ওর এক্তিয়ারে পড়ে না, তবু বলল, ‘ঠিক কথা ভাই৷ ভুল হয়ে গেছে কত্তাবাবুদের৷ আমি তাদের হয়ে ক্ষমা চাইছি৷ আর হাতজোড় করে নেমতন্ন করে যাচ্ছি৷ যাবেন কিন্তু৷’ বাড়িতে ফিরে অমল তখনই ভাঙেনি ব্যাপারটা৷ রাতে ছোটমামা ফিরেই খোঁজ নিল ওর৷ তারপর বলল, ‘কী রে, পথ চিনে ফিরতে সমস্যা হয়নি তো?’

‘হয়নি আবার! দু’চোখ প্রায় বিস্ফারিত করে অমল বলল, ‘বাপরে! পথ তো নয়, যেন গোলকধাঁধা! কী যে ঝামেলায় পড়েছিলাম!’

‘তারপর?’ অমলের ওই কথায় প্রায় দম বন্ধ করে ছোটমামা বলল৷

‘তারপর আর কী! মুশকিল আসান হল সেই গেছো পাগলের দৌলতে৷ হঠাৎ দেখা হতে রিকোয়েস্ট করলাম৷ সেই পথ দেখিয়ে—’

কথা শেষ করতে পারল না অমল৷ তার আগেই ডাকাবুকো ছোটমামা দু’বার হেঁচকি তুলে চিতপাত৷ ফিটের ব্যামোর মতো অবস্থা৷ এরপর বাড়িসুদ্ধ মানুষের ছুটোছুটি৷ ডাক্তার বদ্যি৷

ছোটমামা অবশ্য সুস্থ হতে সময় নেয়নি৷ তবে ব্যাপারটা সহজে মেটেনি৷ কালী পুজোয় জোড়া পাঁঠা নয়, পুরো তিন জোড়া পাঁঠা আনিয়েছিলেন বড়মামা৷ পুজোর রাতে পাত পেড়ে এলাহি ভোজ দিয়েছিলেন৷ সেই ভোজে অনেক অপরিচিত মুখও নাকি দেখা গিয়েছিল৷ গ্রামের মানুষ কোনো দিন দেখেনি তাদের৷ এমনকী খাওয়া শেষ হতে তাদের কাউকে দ্বিতীয়বার আর দেখা যায়নি৷ তাই নিয়ে পরের কয়েক দিন গ্রামে নানা ফিসফাস৷ তবে মামাদের কেউ তেমন গা না করায় বিষয়টা তেমন জমতে পায়নি৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%