শিশির বিশ্বাস
চন্দনপুরে গঙ্গাধর তান্ত্রিকের একসময় নামডাক ছিল৷ বেশ বড় গ্রাম চন্দনপুর৷ নিয়মিত বাজার বসে৷ ফি হপ্তায় তিন দিন বড় হাট৷ আশপাশের দশ,বারোটা গ্রামের মানুষ মালপত্র নিয়ে আসে৷ ফড়ে আর আড়তদারেরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে৷ সেই দৌলতে বাইরের মানুষের ভালোই আনাগোনা৷
গঙ্গাধর তান্ত্রিক অবশ্য বাজারে নয়, বসতেন বাড়িতেই৷ নানা সমস্যা নিয়ে মানুষ আসত৷ স্বস্ত্যয়ন বা ক্রিয়াকর্মে ডাক পড়ত হামেশাই৷ সে তুলনায় রোজগার অবশ্য তেমন ছিল না৷ আসলে সেদিকে লক্ষও ছিল না তাঁর৷ আপনভোলা সাদাসিধে মানুষ৷ বিয়ে-থা করেননি৷ চলে যেত৷ গঙ্গাধর তান্ত্রিক অবশ্য চন্দনপুরের আদি মানুষ নন৷ বছর কুড়ি আগে তাঁকে গ্রামে এনেছিলেন শতদল মজুমদার ওরফে শতমোড়ল৷ প্রবীণ মানুষ তিনি৷ সবাই সম্মান করত৷ সেই শতমোড়ল যতদিন বেঁচে ছিলেন, গঙ্গাধর তান্ত্রিকের সুবিধা অসুবিধার দিকে লক্ষ রাখতেন৷ কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরেই আপনভোলা গঙ্গাধর তান্ত্রিক কেমন চুপ মেরে গেলেন৷ কাজেকর্মেও যেন উৎসাহ হারিয়ে ফেললেন৷ বাইরে বেশি বেরও হতেন না৷ লোকজনের ভিড়ও কমে আসতে লাগল৷
তো চলছিল এইভাবেই৷ ষোলোকলা পূর্ণ হল গুণধর ওঝা চন্দনপুরে জাঁকিয়ে বসার পর৷ চন্দনপুরে মাত্র বছর তিনেক পা দিয়েছেন৷ গোড়ায় বাজারের এককোণে ছোট দরমার ঘরে শুরু৷ এখন সেটা ঝাঁ চকচকে দু’তলা বাড়ি৷ ভিড় লেগেই রয়েছে৷ আর হাটবারে তো কথাই নেই৷ এদিকে কারো এখন জানতে বাকি নেই, গুণধর ওঝার তুকতাক আর ঝাড়ফুঁকের মন্ত্র কথা বলে৷ গোটা কয়েক ভূতপ্রেত নাকি তাঁর হাতে বাঁধা হয়ে রয়েছে৷ গাঁয়ের বৃদ্ধ সনাতন জোয়ারদার সহজ মনের মানুষ৷ একদিন ফস করে বলে ফেলেছিল, ‘যাই বলুন ওঝামশাই, আমাদের গঙ্গাধর তান্ত্রিকও কম নয়৷’
ব্যস, তাতেই গুণধর ওঝা খেপে কাঁই৷ ‘তাহলে মন্ত্রটা ফুঁকে দেই? দেখি গঙ্গাধর তান্ত্রিক রক্ষা করতে পারে কিনা?’
কটমট চোখে এক ঝলক দৃষ্টিবাণ হেনে গুণধর ওঝা এরপর হাতে লম্বা একটা মড়ার হাড় নিয়ে খানিক বিড়বিড় করে তিনটে ফুঁ দিয়েছিলেন মাত্র৷ তাতেই সনাতন জোয়ারদারের ভিরমি খাওয়ার জোগাড়৷ ক্ষমা-টমা চেয়ে পালাতে পথ পান না৷ তাতেও অবশ্য ছাড় মেলেনি৷ দিন কয়েক পরে এক শ্রাদ্ধবাড়ি নেমন্তন্ন খেতে গিয়েছিলেন৷ বাড়ি ফিরে রাতেই ভেদ কলেরা৷ যায় যায় অবস্থা৷ শেষে ছেলেরা গুণধর ওঝার কাছে ছুটে যেতে রক্ষা মেলে৷
গুণধর ওঝার ঝাড়ফুঁক যে কথা বলে, তা চন্দনপুরের মানুষ টের পেয়েছে আরো অনেক ব্যাপারে৷ সেসব ছড়িয়ে গেছে বাতাসের বেগে৷ অগত্যা গুণধর ওঝার ঠেকে মানুষের ঢল নামতে দেরি হয়নি৷ চন্দনপুরে গঙ্গাধর তান্ত্রিক নামে যে একজন মানুষ আছেন, প্রায় ভুলেই গিয়েছিল সবাই৷ ভয়ানক ব্যাপারটা ঘটল সেই সময়৷
আগেই বলেছি, গঙ্গাধর তান্ত্রিককে নিয়ে পরের দিকে আর মাথা ঘামাত না কেউ৷ তাই এক অমাবস্যার রাতে মানুষটি যখন দেহ রাখলেন শিয়রে মাত্র গুটি কয়েক মানুষ৷ তাদের একজন প্রতিবেশী দীনু চক্রবর্তী ওরফে দীনুঠাকুর৷
দীনুঠাকুর যে গঙ্গাধর তান্ত্রিকের খুব ঘনিষ্ঠ, এমন নয়৷ ঘনিষ্ঠ ছিলেন যজমান শতদল মজুমদারের৷ হয়তো সেই কারণে, অথবা কর্তব্যের খাতিরে শেষ সময়ে হাজির হয়েছিলেন৷ গঙ্গাধর তান্ত্রিকের তখন শেষ অবস্থা হলেও জ্ঞান হারাননি৷ শিয়রে দীনুঠাকুরকে দেখে ক্ষীণ গলায় জানিয়েছিলেন শেষ ইচ্ছের কথা৷ আজ অমাবস্যার রাত৷ মৃতদেহ যেন ভোর হবার আগেই গঙ্গার ঘাটে নিয়ে দাহ করা হয়৷
গঙ্গার শ্মশানঘাট কাছে নয়৷ প্রায় মাইল পাঁচেক দূরে৷ গ্রামের কাঁচারাস্তা৷ গাড়িঘোড়া নেই৷ তবু চন্দনপুরে ব্যাপারটা এমন বিরাট কিছু নয়৷ এদিকে অনেকেই এমন ইচ্ছের কথা ব্যক্ত করে যান৷ যাদের লোকবল আছে, দেরি না করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রওনা হয়ে পড়েন৷ যাদের নেই, তাদের জন্য রয়েছে কেঁধোর দল৷ বারোয়ারি শ্মশানযাত্রী সব গ্রামেই কিছু না কিছু আছে৷ কিন্তু এদিকে কেঁধো মানে যারা মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে দূরে গঙ্গার ঘাটে শ্মশানে নিয়ে দাহ করে আসে৷ কিছু খরচ হাতে গুঁজে দিলেই তারা মড়ার খাট কাঁধে নিয়ে ছোটে গঙ্গার দিকে৷ সব সময় বাড়ির মানুষ হয়তো অত দূরে যেতে পারেন না৷ সেক্ষেত্রে গ্রামের শ্মশানে মুখাগ্নির কাজ সেরে মৃতদেহ কেঁধোদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়৷ সৎকারের বাকি কাজটা তারাই করে৷ চন্দনপুরে তেমন কেঁধোও রয়েছে৷
দীনুঠাকুরও তেমনটা ভেবে রেখেছিলেন৷ রাত গোটা দশেক নাগাদ যখন গঙ্গাধর তান্ত্রিক দেহ রাখলেন, খবর পাঠিয়েছিলেন কেঁধো গোকলোর কাছে৷ গোকলো গ্রামের কেঁধোদের সর্দার৷ বড় একটা দল আছে তার৷ খবর পেয়ে সে জনা কয়েক শাগরেদ নিয়ে চলেও এসেছিল৷ কিন্তু গোল বাধাল গুণধর ওঝা৷
মড়া তখন খাটিয়ায় তুলে বাঁধাছাঁদার কাজ চলছে৷ খবর পেয়ে কোত্থেকে এসে হাজির৷ মড়ার উপর খানিক চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, ‘আজ রাতে কিছুতেই গঙ্গাধর তান্ত্রিকের দেহ গঙ্গায় নিয়ে দাহ করা যাবে না৷ একে অমাবস্যা, তায় রাতটা ভালো নয়৷ বিপদ ঘটতে পারে৷’
এদিকে গুণধর ওঝার তখন বেজায় প্রতাপ৷ তবু কয়েকজন প্রতিবাদ করে বলল, ‘কিন্তু উনি যে আজ রাতের মধ্যেই সৎকারের কথা বলে গেছেন!’
গুণধর ওঝা সেকথা ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘ও নিয়ে কাউকে ভাবতে হবে না৷ সৎকার এই রাতেই হবে৷ তবে গ্রামের শ্মশানে৷’
ব্যাপার যা বুঝবার, উপস্থিত অনেকেই ততক্ষণে বুঝে ফেলেছেন৷ এমন আগেও দুই-একবার হয়েছে৷ মাস কয়েক আগে মালোপাড়ায় একজন অমাবস্যার রাতে মারা গিয়েছিল৷ বাড়ির মানুষকে দিয়ে মুখাগ্নি করিয়ে গুণধর ওঝা সেই মড়া শ্মশানে নিয়ে গিয়েছিলেন৷ তারপর কী হয়েছিল, কেউ জানে না৷ গুজব, গুণধর ওঝা নাকি সেই মড়া শ্মশানে নিয়ে রাতভর পিশাচ সাধনা করেছিলেন৷ সন্দেহ নেই, গঙ্গাধর তান্ত্রিকের মৃতদেহ নিয়েও গুণধর ওঝার তেমন কিছু ইচ্ছে৷
গ্রামে গঙ্গাধর তান্ত্রিকের আপন বলতে কেউ নেই৷ গুণধর ওঝার কথায় এরপর কে আপত্তি করবে? কিন্তু হঠাৎই ফুঁসে উঠলেন দীনুঠাকুর৷ সাফ জানিয়ে দিলেন, তা হবার নয়৷ মৃত্যুশয্যায় মানুষটাকে যখন কথা দিয়েছেন, সৎকার গঙ্গার ঘাটেই হবে৷
গ্রামের পুরোহিত দীনু চক্রবর্তী ওরফে দীনুঠাকুর নিতান্তই শান্তশিষ্ট মানুষ৷ কখনো কারো সাতপাঁচে থাকেন না৷ তাঁর এমন রোখ আগে দেখেনি কেউ৷ গুণধর ওঝাও ভাবতে পারেননি৷ মানুষটা অন্য কেউ হলে হয়তো কিছু একটা করেই বসতেন৷ কিন্তু বেশ জানেন, গ্রামে দীনুঠাকুরের যজমান কম নয়৷ তার উপর গ্রামের পুরোহিত হবার কারণে কিছু প্রতিপত্তিও আছে৷ থতমত খেয়ে খানিক বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বললেন, ‘সে তো বুঝলাম ঠাকুর৷ কিন্তু এই রাত্তিরে ওই মড়া গঙ্গায় নেবে কে?’
‘কেন? কেঁধো গোকলো তার দলবল নিয়ে এসেছে৷ ওরাই নিয়ে দাহ করে আসবে৷’
‘তুমি হাসালে ঠাকুর৷ আজ রাতে গাঁয়ের সীমানা ওরা পার হোক দেখি!’ কথা শেষ করে গুণধর ওঝা রক্তচোখ মেলে অদূরে গোকলোদের দিকে একবার দৃষ্টিবাণ হেনে গটমট করে পা ফেলে চলে গেলেন৷
গুণধর ওঝার প্রতিপত্তি দীনুঠাকুর এরপর টের পেলেন ভালোই৷ পাড়ার দু’চারজন যারা জড়ো হয়েছিল, একে একে সরে পড়েছে৷ বাকি ছিল গোকলো আর তার দলবল৷ সবাই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখে দীনুঠাকুর তাদের তাগাদা লাগালেন৷ ‘কী রে গোকলো৷ চটপট ব্যবস্থা করে ফেল এবার৷ একে অন্ধকার রাত৷ বেশি দেরি করলে সময় মতো পৌঁছোতে পারবি না৷ পথও তো কম নয়৷’
দীনুঠাকুরের সেই কথায় গোকলো খানিক থম হয়ে রইল৷ তারপর সামান্য ঢোঁক গিলে বলল, ‘তা ঠিক ঠাকুর৷ সেই জন্যই তো তাড়াহুড়ো করে এসেছিলুম৷ কিন্তু গুণধর ওঝা যে ফরমান দিয়ে গেলেন, কেউ আর ভরসা পাচ্ছে না৷’
‘বলিস কী রে!’ দীনুঠাকুর প্রায় আকাশ থেকে পড়লেন৷ ‘মৃত্যুশয্যায় মানুষটিকে কথা দিয়েছি!’
সামান্য থম হয়ে থেকে গোকলো ঢোঁক গিলে পাশে সঙ্গীদের দিকে তাকাল, ‘ঠাকুরমশায়ের কথা শুনলি তো? কী বলছিস?’
উত্তরে কারো মুখেই কথা নেই৷ নীরবে শুধু ঘাড় নাড়ল কয়েকজন৷ সেদিকে তাকিয়ে দীনুঠাকুর প্রমাদ গণলেন৷ ‘তোরা এইভাবে শেষে আমার মুখ পোড়াবি রে গোকলো! শুনতে পাই, বেজায় করিৎকর্মা মানুষ তুই!’
দীনু ঠাকুর গাঁয়ের পুরোহিত মানুষ৷ সেই দৌলতে গোকলোও খাতির করে তাঁকে৷ গ্রামে গঙ্গাধর তান্ত্রিকের যখন দিন ছিল, অনেকবার তাঁর কাছেও এসেছে৷ সে কথা মনে পড়তে হঠাৎ ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলল, ‘ঠাকুরমশাই, একটা কথা বলি, হতভাগার দল রাজি হবে বলে মনে হচ্ছে না৷ তবে আমিও গোকলো৷ একাই একশো৷ হতভাগাদের কাউকে দরকার নেই৷ শুধু আপনি সঙ্গে থাকলেই হবে৷’
গোকলো এমন প্রস্তাব দেবে, দীনুঠাকুর ভাবতেই পারেননি৷ কিন্তু তখন আর পিছিয়ে আসার উপায় নেই৷ ঢোঁক গিলে বললেন, ‘সে কী কথা রে! শেষে আমাকে শ্মশানে যেতে বলছিস!’
‘তা ছাড়া আর উপায় কী ঠাকুর৷ এই রাতে মড়া নিয়ে অতদূরে যাওয়া৷ তারপরে সৎকারের কাজ৷ আপনার থাকাটা দরকার৷’
যুক্তি ফেলনা নয়৷ দীনুঠাকুর ঢোঁক গিলে বললেন, ‘তা ঠিক বলেছিল৷ কিন্তু এই বয়সে অতটা পথ হাঁটা কী আর আমার কর্ম রে? তায় অমাবস্যার বাতের ব্যথা৷’
আসলে গোকলোর ওই প্রস্তাবের পর দীনুঠাকুরের পিছিয়ে আসার উপায় ছিল না৷ তাই ওই বাহানা খাড়া করেছিলেন৷ নয়তো এই বয়সেও শরীর যথেষ্টই মজবুত৷ ক্রিয়াকর্মে ডাক পেলে সাইকেলে পাঁচ মাইল পথও পাড়ি দিতে পারেন৷ গোকলো বলল, ‘আপনাকে হাঁটতে হবে না ঠাকুর৷ যাব নৌকোয়৷ বর্ষায় মাথাভাঙা খালে এখন ভালোই জল৷ টেনে লগি মেরে গেলে ঠিক সময়ে পৌঁছে যেতে পারব৷ গাঁয়ের ঠাকুরমশাই আপনি৷ সঙ্গে থাকলে গুণধর ওঝার পরোয়া করি না৷’
বলা বাহুল্য এরপর দীনুঠাকুর আর আপত্তি করতে পারেননি৷
মাথাভাঙা খালের ঘাট গ্রাম থেকে প্রায় আধ মাইল দূরে৷ মৃতদেহ এই পথটুকু বয়ে দেবার জন্য অন্তত চারজন মানুষ দরকার৷ গোকলোর শাগরেদরা ইতিমধ্যে সুট-সুট করে সরে পড়েছে৷ দীনুঠাকুর বললেন, ‘তোর ছেলেরা গেল কোথায় রে? অন্তত খালের ঘাট পর্যন্ত তো বয়ে দিয়ে আসুক৷’
শাগরেদের দল কোথায় গেছে, ভালোই জানা আছে গোকলোর৷ জানেন দীনুঠাকুরও৷ সব কয়টা এখন গুলে সর্দারের গাঁজার ঠেকে৷ সামান্য ইতস্তত করে গোকলো উঠে সেই দিকে গেল৷ কাজটা যে ঠিক হল না, সেটা বুঝতে পারছিলেন দীনুঠাকুর৷ পাকা গেঁজেল গোকলো একবার ঠেকে বসে পড়লে, হুঁশ ফেরানো মুশকিল৷ খানিক অপেক্ষার পর তাঁর কপালে যখন ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে, তিনজন শাগরেদ নিয়ে গোকলো হাজির৷ অযথা সময় নষ্ট না করে মড়ার খাট কাঁধে নিয়ে রওনা হয়ে পড়ল তারা৷ দীনুঠাকুরও পিছনে চলল৷
একদমে মাথাভাঙা খালের ঘাটে পৌঁছে থামল ওরা৷ এই রাতে ঘাটে গোটা কয়েক ছোট-বড় নৌকো বাঁধা৷ সবই গ্রামের৷ মড়ার খাটিয়া তার একটায় তুলে দেওয়া হল৷ উঠে বসলেন দীনুঠাকুরও৷
বার কয়েক হরিধ্বনি দেওয়া ছাড়া এপর্যন্ত কেউ একটি কথাও বলেনি৷ মড়ার খাট নৌকোয় তুলে দিয়ে তিন শাগরেদ দাঁড়িয়ে ছিল খালের ঘাটে৷ গোকলো অন্ধকারে নিচু গলায় তাদের সঙ্গে খানিক কী পরামর্শ করে নিল৷ তারপর এক লাফে নৌকোয় উঠে জোরে লগি মারতে লাগল৷
জোরালো বাতাসে খালে তখন ভালোই স্রোত৷ তায় গোকলোর হাতের লগি৷ নৌকো ছুটল তরতর করে৷ মৃতদেহের পাশে বসে দীনুঠাকুর তখন অনেকটাই নিশ্চিন্ত৷ এভাবে চললে গঙ্গার ঘাটে পৌঁছোতে সময় লাগবে না৷ কিন্তু হঠাৎই দূরে অন্ধকারে চোখ পড়তে চমকে উঠলেন তিনি৷ অমাবস্যার নিকষ অন্ধকার রাত হলেও চোখ তখন অনেকটাই সয়ে গেছে৷ পরিষ্কার আকাশে তারার আলোয় চারপাশ আবছা হলেও দেখা যাচ্ছে৷ দু’পাশে অন্ধকার ফাঁকা মাঠ৷ হঠাৎ সেই অন্ধকারের ভিতর দূরে একটা আলো জ্বলে উঠল৷ ক্রমে এগিয়ে আসতে লাগল ওদের দিকে৷
দীনুঠাকুর যথেষ্টই সাহসী মানুষ৷ নইলে স্রেফ কথা রাখার জন্য এই রাতে মড়া নিয়ে বের হতেন না৷ ব্যাপারটা কী ভাবছিলেন, হঠাৎ খেয়াল হল গোকলো ইতিমধ্যে খাল ছেড়ে মরাবিলের দিকে নৌকো বাইতে শুরু করেছে৷
তাড়াতাড়ি বললেন, ‘ও কীরে গোকলো, মরাবিলের দিকে নৌকো ঘোরালি কেন?’
গোকলো থতমত খেয়ে সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, ‘এ-এপথে খানিক তাড়াতাড়ি হবে গো ঠাকুর৷ নিশ্চিন্তি থাকেন৷’
বর্ষাকাল৷ খালের অনেক জায়গা এই সময় মরাবিলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে৷ কিন্তু সেই পথে গেলে কিভাবে তাড়াতাড়ি হবে, অনেক ভেবেও কিনারা করতে পারলেন না৷ দূরে সেই আলো ইতিমধ্যে নিভে গেছে৷ আর দেখা যাচ্ছে না৷ তবু ভিতরে মোটেই স্বস্তি পাচ্ছিলেন না তিনি৷ মৃতদেহের পায়ের দিকে বসে ছিলেন৷ হঠাৎ প্রবল ঝাঁকানিতে টলে উঠল শরীর৷ হয়তো পড়েই যেতেন৷ তবে সামলে নিতে পারলেন৷ আর তারপরেই টনক নড়ল৷ মাঠের অল্প জলে নৌকো আটকে গেছে৷ কড়া গলায় বললেন, ‘কী মতলব রে তোর গোকলো? এ তো মরাবিলের শ্মশানের দিকে নৌকো নিয়ে এসেছিস!’
ইতিমধ্যে গোকলো জলে নেমে নৌকো ঠেলতে শুরু করেছে৷ কোনো উত্তর দিল না৷ দীনুঠাকুর অবশ্য থামলেন না৷ ততক্ষণে অন্য এক সন্দেহ তাঁর মাথায় চাড়া দিয়ে উঠেছে৷ ফের কড়া গলায় বললেন, ‘তুই গোকলো তো রে? সেই থেকে মাথায় গামছা দিয়ে রেখেছিস!’
‘হেঁ-হেঁ, ঠিঁক ধঁরেছেন ঠাঁকুর৷’ খোনা গলায় হেসে উঠল অন্যপক্ষ৷ মুখে গামছার ফাঁক দিয়ে গোটা কয়েক লম্বা দাঁত ঝিলিক দিয়ে উঠল৷ ‘গোঁকলো কোঁতায় গোঁ ঠাকুর৷ সে তো গ্যাঁজার ঠেকে৷’
দীনুঠাকুরের বুকের পাটা আছে বটে! এরপরেও মাথা ঠিক রাখতে পেরেছিলেন৷ লোকটার খোনা গলা মাঝেমধ্যেই যে বিলকুল ঠিক হয়ে যাচ্ছে, ধরতে পেরেছিলেন সেটা৷ আর তাতেই মনে হয়েছিল, ভুত বা অপদেবতা নয়৷ সম্ভবত শয়তান গুণধর ওঝার লোক৷
গোকলোকে সঙ্গীদের খোঁজে পাঠানোই ভুল হয়েছিল তখন৷ গুণধর ওঝার লোক ওত পেতে ছিল৷ সুযোগটা হাতছাড়া করেনি৷ মাথায় গামছা ফেলে চলে এসেছে৷ অন্ধকারে তিনিও চিনতে পারেননি৷ তারপর খাল ছেড়ে নৌকো নিয়ে এসেছে সেই শ্মশানের দিকেই৷ গুণধর ওঝার ঠেকে৷ কিন্তু এই অবস্থায় কী বা আর করতে পারেন তিনি? বেশি বাড়াবাড়ি করলে প্রাণটাই খোয়াতে হবে হয়তো৷ নাহ, বেচারা গঙ্গাধর তান্ত্রিকের শেষ ইচ্ছেটা আর পূর্ণ করতে পারলেন না৷
এদিকে লোকটা তখনো নৌকো ঠেলে চলেছে৷ হঠাৎ ‘হাঁক’ করে কাছেই শরবনের দিক থেকে ভয়ানক এক শব্দ৷ বেজায় চমকে দীনুঠাকুর ঘাড় ফিরিয়ে দেখলেন, সেই উঁচু শরবনের মাথার উপর দাঁড়িয়ে আপাদমস্তক সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা মূর্তি৷ হাতছানি দিয়ে ডাকছে৷ এরপর মানুষটি আর মাথা ঠিক রাখতে পারেননি৷ দু’বার আঁ-আঁ শব্দ করেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেছেন৷ কিছুই মনে নেই তারপর৷
চোখে-মুখে ঠান্ডা জলের ঝাপটায় দীনুঠাকুরের জ্ঞান যখন ফিরল, তখন প্রায় শেষ রাত৷ হ্যারিকেনের আলোয় কয়েকজন অপরিচিত মানুষ সমানে ঝাঁকাচ্ছে তাকে, ‘ও ঠাকুর মশাই, ঠাকুর মশাই, ওঠেন৷ শ্মশানে এসে গেছি৷ তান্ত্রিক ঠাকুরের দেহ এবার যে চিতায় দেওয়া দরকার৷’
সেই কথায় মুহূর্তে সব মনে পড়ে গেল দীনুঠাকুরের৷ ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন৷ তাকিয়ে দেখলেন, সত্যিই গঙ্গার শ্মশানঘাটে নৌকো পৌঁছে গেছে৷ গঙ্গাধর তান্ত্রিকের মৃতদেহ যেমন ছিল তেমনই রয়েছে নৌকোয়৷ কিন্তু মৃতদেহের পাশে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে আর একজন মানুষ৷ তাড়াতাড়ি বললেন, ‘তোমরা কারা ভাই? আর উনিই বা কে?’
‘বলছি, বলছি ঠাকুর৷’ বার কয়েক মাথা চুলকে কাঁচুমাচু মুখে একজন বলল, ‘আ-আমরা গুণধর ওঝার শাগরেদ৷ আর নৌকোয় যিনি পড়ে রয়েছেন, তিনিই গুণধর ওঝা৷ এখনো হুঁশ ফেরেনি৷ আপনি বাঁচান ওনাকে৷’
এরপর যা ফাঁস হল, তা এক কথায় ভয়ানক বললেও কম বলা হয়৷ পাটখেতের উপর দাঁড়িয়ে থাকা যে মূর্তি দেখে দীনুঠাকুর বেহুশ হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন, সে গুণধর ওঝা স্বয়ং৷ দাঁড়িয়ে ছিলেন রণপার উপর৷ দীনুঠাকুরকে ভয় দেখানই ছিল মূল উদ্দেশ্য৷ তা সবকিছু হিসেব মতোই করেছিলেন তিনি৷ গোলমাল হয়ে গেছে তারপরেই৷
একে তান্ত্রিক মানুষ৷ তায় মৃত্যু অমাবস্যার রাতে৷ শবসাধনায় এমন মড়া কোটিতে মেলে না৷ গুছিয়ে সব ব্যবস্থাই করেছিলেন গুণধর ওঝা৷ শাগরেদদের নিয়ে শরবনের ভিতর ঘাপটি মেরে ছিলেন৷ দীনুঠাকুর জ্ঞান হারাতেই তারা উঠে পড়েছিল নৌকোয়৷ ঠিক ছিল, মড়া নিয়ে বাকিরা চম্পট দিলেই একজন নৌকোয় দীনুঠাকুরকে গ্রামে খালের ঘাটে পৌঁছে দেবে৷ তারপর কায়দা করে অলৌকিক একটা গল্প রটিয়ে দিলেই হল৷
ভয়ানক কাণ্ডটা ঘটে গেছে তার আগেই৷ কাছে গিয়ে দারুণ উৎসাহে গুণধর ওঝা সবে মড়ায় হাত দিয়েছেন৷ মৃত গঙ্গাধর তান্ত্রিকের দুই হাত তড়িৎ গতিতে উঠে এসে আচমকা জাপটে ধরল তাকে৷ চেপে ধরল বুকের উপর৷ হঠাৎ ওই ব্যাপারে গুণধর ওঝা ঘাবড়ে গেলেও বার কয়েক ছাড়াবার বৃথা চেষ্টা করেছিলেন৷ তারপর ‘বাঁচাও; বাঁচাও’ পরিত্রাহি আর্তনাদ৷
ব্যাপার দেখে গুণধরের সঙ্গীসাথীরা ততক্ষণে আতঙ্কে হিম হবার জোগাড়৷ গুরুর সঙ্গে শ্মশান, গোরস্থানে ঘোরাঘুরি কম নয়৷ গোটা কয়েক ভুত-প্রেত গুরুর কাছে নাকি বাঁধা হয়ে আছে৷ মরা লাশকে ভয় পাবে, এমন পাত্রই কেউ নয়৷ কিন্তু এমন কাণ্ড কখনো দেখেনি৷ গুরুর আর্তনাদে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে সবাই প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তারপর৷ কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও কিছু করতে পারেনি৷ মৃত গঙ্গাধর তান্ত্রিকের দুই হিমশীতল হাত ততক্ষণে পাথর হয়ে জাপটে ধরেছে গুণধর ওঝাকে৷ ছাড়ায় কার সাধ্য!
ওই সময় মৃত গঙ্গাধর তান্ত্রিকের ঠোঁট দুটো নড়ে উঠল৷ ‘আঁজ রাঁতের মঁধ্যেই গঁঙ্গারঘাটে নিঁয়ে চিঁতায় নাঁ তোঁলা পঁর্যন্ত তোঁর ছাঁড় নেঁই রেঁ গুঁনধর৷ এঁবার কীঁ কঁরবি ভাঁব৷ বেঁজায় তাঁলেবর হঁয়েছিলি তোঁ!’
এরপর আর কলজে ঠিক রাখতে পারেনি গুণধর ওঝা৷ একে মৃত গঙ্গাধর তান্ত্রিকের হিমশীতল দেহের সঙ্গে সেই থেকে লেপটে রয়েছে, তার উপর ওই ব্যাপার! দু’বার মাত্র আঁ-আঁ করে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেছে গঙ্গাধর তান্ত্রিকের মৃতদেহের উপর৷
ব্যাপার দেখে তার শাগরেদের দল আর দেরি করেনি৷ প্রায় কাঁপতে কাঁপতে নৌকো ঠেলে ফের মাথাভাঙা খালে৷ তারপর ঝড়ের গতিতে নৌকো বেয়ে গঙ্গার শ্মশান ঘাটে৷
কিন্তু মৃত গঙ্গাধর তান্ত্রিকের দুই হাত তখনো একই ভাবে জাপটে ধরে আছে বেহুঁশ গুণধর ওঝাকে৷ এই অবস্থায় কীভাবে দেহ চিতায় তোলা হবে বুঝে উঠতে না পেরে খোঁজ পড়েছে দীনুঠাকুরের৷ বেহুঁশ দীনুঠাকুর তখনো নৌকোর একধারে পড়ে৷ অগত্যা সেবা-শুশ্রূষা করে তাঁর জ্ঞান ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা৷ যদি তিনি কিছু ব্যবস্থা করতে পারেন৷
তা দীনুঠাকুরকে কিছু আর করতে হয়নি৷ মুশকিল আসান হয়ে গেছে আপনিই৷ জ্ঞান ফিরে আসতে তিনি যখন সব কথা শুনছিলেন, মৃত গঙ্গাধর তান্ত্রিকের হাত গুণধর ওঝাকে ছেড়ে দিয়েছে সেই সময়৷ খানিক চেষ্টার পর জ্ঞানও ফিরে এসেছে৷
গুণধর ওঝা আর তার দলবলের হাতেই এরপর সৎকার গঙ্গাধর তান্ত্রিকের৷ নিয়মে কোনো ফাঁক রাখেনি কেউ৷ গ্রামে ফিরে ভালোমানুষ দীনুঠাকুর অবশ্য ফাঁস করেননি কিছু৷ কিন্তু ভরসা পায়নি গুণধর ওঝা নিজেই৷ চন্দনপুরের অমন জমজমাট পসার গুটিয়ে সরে পড়েছে দিন কয়েকের মধ্যেই৷
—
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন