শিশির বিশ্বাস
ট্যাক্সিক্যাব বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতে এক মুহূর্ত দেরি করেনি তন্ময়৷ এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে ঢুকতে যাবে, কেমন একটা বাজে গন্ধ নাকে এসে লাগল৷ নতুন এ.সি গাড়ি৷ ঝকঝকে সিট৷ কোথা থেকে গন্ধটা আসছে ভেবে পেল না৷ সামনের সীটে ড্রাইভার স্থির হয়ে বসে আছে৷ বলতে গিয়েও চেপে গেল৷ শুনে হাসবে হয়তো৷ হাতে সময়ও বেশি নেই৷ দ্রুত ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলল, ‘হাওড়া স্টেশন৷ ট্রেন ধরতে হবে দাদা৷ একটু জোরে টানবেন৷’
উত্তরে কোনো জবাব না এলেও ড্রাইভার মুহূর্তেই ছেড়ে দিল গাড়ি৷ বাইরের দিকে তাকিয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নেমে এলো তন্ময়ের বুক থেকে৷ হাতে সময় যা আছে, পৌঁছে যাওয়া যাবে৷
নাগপুর থেকে ভালো একটা চাকরির ইন্টারভিউ এসেছে৷ ভাগ্যিস, স্টেশনে পৌঁছোবার ট্যাক্সির জন্য কিছু আগেই চেষ্টা শুরু করেছিল বলেই শেষ রক্ষা হল৷
কলকাতা শহরে যা অবস্থা, দরকারের সময় ট্যাক্সি পাওয়া কখনো প্রায় ভাগ্যের ব্যাপার৷ ব্যতিক্রম হয়নি আজও৷ ওলা বা উবেরের জন্য মোবাইল খুলে আধ ঘণ্টার বেশি নষ্ট হয়েছে৷ তারপর পথে বেরিয়ে চলতি ট্যাক্সি খুঁজবে কিনা যখন ভাবতে শুরু করেছে, হঠাৎই মনে পড়ে গিয়েছিল বন্ধু সমরের কথা৷ একই সঙ্গে পাশ করে বেরিয়েছে৷ ক্যাম্পাস থেকে চাকরিও এক সঙ্গে৷ সমরের আসানসোলে হলেও ওর চাকরি হয়েছিল ব্যাঙ্গালোরের দিকে৷ জয়েনও করেছিল৷ কিন্তু অল্প দিনেই টের পেয়েছিল চাকরিটা তেমন আহামরি হয়নি৷ মাইনে যা মেলে, চলে যায় হয়তো, কিন্তু ওই পর্যন্তই৷ বাড়িতে কিছু পাঠাবার তো প্রশ্নই নেই, বরং কয়েক দফায় মাকেই পাঠাতে হয়েছে টাকা৷
মা অবশ্য তবু চাকরি না ছাড়তেই বলেছিলেন৷ কিন্তু তন্ময় জোর করেই ফিরে এসেছিল৷ তারপর থেকে লেগে রয়েছে নতুন একটা চাকরির খোঁজে৷ এখনো শিকে ছেঁড়েনি৷ অথচ সমরের ভাগ্য প্রায় সোনায় বাঁধানো৷ একেই তো চাকরি আসানসোলে৷ তার উপর যথেষ্ট ভালো পোস্ট৷ বছর ঘুরতে গাড়িও কিনে ফেলেছে৷ মাঝেমধ্যে নিজেই ড্রাইভ করে চলে আসে৷ বাড়িতে কী এক দরকারে এবারও দিন কয়েক হল কলকাতায় এসেছে৷ খবর পেয়ে তন্ময় গিয়েছিল একদিন৷ অনেক রাত পর্যন্ত কাটিয়ে এসেছে৷ আজ বাড়ি থেকে আগেভাগে বের হবার ইচ্ছের পিছনে সেটাও এক কারণ৷ সেকথা বলতে হলে একটু গোড়া থেকে শুরু করতে হয়৷
কলেজে সমরই ছিল ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু৷ হোস্টেলে একই ঘরে থাকত৷ পাঁচটা বছর একই সঙ্গে ওঠাবসা৷ সময় কাটানো৷ প্ল্যানচেটের উপর বেজায় আগ্রহ ছিল সমরের৷ বহু পুরোনো একটা প্ল্যানচেট যন্ত্র ছিল ওর দাদুর কাছে৷ হরিদ্বারে কার কাছ থেকে পেয়েছিলেন৷ মাঝেমধ্যেই ওই যন্ত্র নিয়ে প্ল্যানচেটে বসতেন তিনি৷ তাঁর মৃত্যুর পর ঘরের এক দেরাজে পড়ে ছিল যন্ত্রটা৷
বয়স কম থাকায় দাদুর প্ল্যানচেটের আসরে সমরের ডাক না পড়লেও অনেক কিছুই শোনার সুযোগ হয়েছিল৷ তাই কৌতূহল একটা ছিলই৷ কিন্তু দাদুর মৃত্যুর পর যন্ত্রটার খোঁজ মামাদের কেউ দিতে পারেনি৷ তারপর প্রায় বছর দশেক পরে কলেজে তখন ওদের শেষ বছর৷ হঠাৎই একদিন বড়মামার ফোন, প্ল্যানচেট যন্ত্রটা পাওয়া গেছে৷ ঘরের এক পুরোনো দেরাজের মধ্যে ছিল৷ খবরটা শুনে ও সেই সপ্তাহেই চলে গিয়েছিল মামাবাড়িতে৷ ফিরে এসেছিল যন্ত্রটা সঙ্গে নিয়ে৷ মনে আছে সেই প্রথম রাতেই সেটা নিয়ে প্ল্যানচেটে বসেছিল দু’জন৷
তিনকোণা পানের খিলির মতো ছোট এক যন্ত্র৷ তলায় পিছন দিকে দুটো চাকা লাগানো৷ যে কোনো দিকে ঘুরতে পারে৷ মাথার দিকে পেনসিল আঁটার ব্যবস্থা৷ সামনে সেই পেনসিল আর পিছনে দুই চাকার উপর দাঁড়িয়ে থাকে প্ল্যানচেট যন্ত্র৷ গোড়ায় দেখে তেমন ভরসা হয়নি তন্ময়ের৷ এই সাধারণ মানের একটা যন্ত্র দিয়ে মৃত আত্মা নামিয়ে আনা যায়, একেবারেই বিশ্বাস হয়নি৷ ভরসা সমরেরও তেমন হয়নি৷ কারণও ছিল৷ প্লানচেট যন্ত্র নিয়ে প্লানচেটে বসার প্রচলন ইদানীং প্রায় নেই৷ বর্তমানে যন্ত্রের বদলে একজন মিডিয়াম নেওয়া হয়৷ তিনিই হাতে কাগজ-পেনসিল নিয়ে বসেন৷ আত্মা তাঁর মাধ্যমেই প্ল্যানচেটের আসরে বসা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন৷ আত্মার বক্তব্য মিডিয়ামই লিখে জানায়৷
কিন্তু প্ল্যানচেট যন্ত্রে কোনো মিডিয়ামের দরকার হয় না৷ যন্ত্র নিজেই আত্মার হয়ে জবাব লেখে৷ এভাবে প্ল্যানচেটে বসে আত্মার সাড়া পাওয়া কিন্তু খুব সহজ নয়৷ বেশির ভাগ সময় নিরাশ হতে হয়৷ তবে সমরই বলেছিল, যন্ত্রটা যেহেতু বহু দিনের পুরনো, দাদু নিজেই বহু আত্মা ডেকে এনেছেন এই যন্ত্র দিয়ে, তাই ভরসা করাই যায়৷ সেজন্য কিছু প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছিল৷ বাড়িতে দাদুর বড় একটা বাঁধানো ছবি আছে৷ মোবাইলে তার একটা ছবি তুলে এনেছিল৷ প্ল্যানচেটে বসার আগে তন্ময়কে সেই ছবি দেখিয়ে বলেছিল, ‘আমার দাদুর এই ছবি ভালো করে দেখে নে আগে৷ প্ল্যানচেটে বসে দাদুর ছবি একমনে ভাবতে হবে৷ প্রথম দিন, প্লানচেটে দাদুর আত্মাকেই আগে ডাকব৷ যদি উনি আসেন, প্ল্যানচেটের খুঁটিনাটি জেনে নিতে পারব৷’
প্রথম রাতে সেই ভাবেই প্লানচেটে বসেছিল ওরা৷ হালকা নাইট ল্যাম্পের আলোয় ঘরে টেবিলের উপর একটা বড় সাদা কাগজের উপর যন্ত্রটা রেখে দু’জন দুই দিকে বসে আলতো করে যন্ত্রে আঙুল ছুঁইয়ে রেখে একমনে ভাবতে শুরু করেছিল মৃত মানুষটির কথা৷ গোটা কয়েক ধূপকাঠিও ঘরে জ্বেলে দেওয়া হয়েছিল৷ চমৎকার গন্ধে মৃত মানুষটির কথা ভাবতে, কিছু সুবিধাও হচ্ছিল৷ এভাবে মিনিট দশেক থাকার পরেই তন্ময় লক্ষ করল, খুব ধীরে হলেও প্ল্যানচেট মেশিন নড়তে শুরু করেছে৷ কী আশ্চর্য, চলে বেড়াচ্ছে কাগজের উপর! খানিক এভাবে নড়ার পর সেটা থামতে ওরা তাড়াতাড়ি টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে দেখল কাগজের উপর লেখা রয়েছে, আমি ব্রজমাধব রায়৷ বহুদিন পরে ডাক পেলাম তোমাদের৷
কাগজের উপর সেই লেখা দেখে উৎসাহে লাফিয়ে উঠেছিল সমর৷ ‘তন্ময়, উনি আমার দাদু! দাদু এসেছেন!’
কাগজ পালটে ফের প্ল্যানচেটে বসলেও সেই রাতে যন্ত্র আর নড়েনি৷ সমরই পরে বলেছিল, ‘আমারই ভুল৷ ওই ভাবে চেঁচিয়ে ওঠা একেবারেই ঠিক হয়নি৷’
সমরের দাদু ব্রজমাধব রায়ের আত্মাকে পাওয়া যায়নি পরের রাতেও৷ তবে তন্ময়ের তখন বিশ্বাস জন্মে গেছে৷ এভাবে প্ল্যানচেটে বসে সত্যি সত্যিই যে মৃত ব্যক্তির আত্মার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়, চোখের সামনে না দেখলে কোনো দিন বিশ্বাসই করত না হয়তো৷ দারুণ কৌতূহলে এরপর প্রায় প্রতি রাতেই দু’জন প্ল্যানচেটে বসতে শুরু করেছিল৷ যোগাযোগ হয়েছিল একাধিক আত্মার সঙ্গে৷ সেই প্রথম দিনের পরে সমরের দাদু ব্রজমাধব রায়ের সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় যোগাযোগ হয়েছিল প্রায় মাস দেড়েক পরে৷ তিনিই সেদিন জানিয়েছিলেন, প্ল্যানচেট যন্ত্রের মাধ্যমে আত্মা সব সময় যোগাযোগ করতে পারে না৷ বর্তমান যন্ত্রটা বহু দিনের পুরোনো৷ অন্তত তিনশো বছরের৷ বহু হাতে ঘুরেছে৷ বহু আত্মা এই যন্ত্রের সাহায্যে যোগাযোগ করেছেন৷ সেই কারণে আত্মারা সহজেই চলে আসতে পারেন৷ সমর যেন যত্ন করে রেখে দেয়৷
সমর কলকাতায় এসেছে খবর পেয়ে সেদিন তন্ময় যে ওর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল, সে ওই প্লানচেটের টানেই৷ চাকরির ইনটারভিউ দিতে যাচ্ছে৷ সেই ব্যাপারে যদি কোনো আশার কথা জানা যায়৷ শুনে সমরও সেদিন সময় নষ্ট করেনি৷ রাত কিছু বাড়তে ওদের বাড়ির চিলেকোঠায় নিরিবিলিতে প্ল্যানচেট নিয়ে বসে পড়েছিল দু’জন৷ কাকে ডাকা যায় ভাবতে গিয়ে সমরের প্রথমেই মনে এসেছিল নিজের দাদুর কথা৷ ইদানীং প্লানচেটে তাঁকে আনতে বেশি দেরি করতে হয় না৷ চলে আসেন অল্প সময়ের মধ্যেই৷ কিছু বলতে না পারলেও একটা পরামর্শ দিতে পারবেন৷
প্ল্যানচেট শুরু করতেই যথারীতি অল্প সময়ের মধ্যে চলে এসেছিলেন তিনি৷ তারপর ওদের প্রশ্ন শুনে নিজেদের প্রয়াত গুরুদেব ওঙ্কার মহারাজের কথা বলেছিলেন৷ সিদ্ধ পুরুষ তিনি৷ হয়তো বলতে পারবেন কিছু৷ সমরের মামাদের গুরুদেব ওঙ্কার মহারাজকে তন্ময় দেখেনি৷ তবে তাঁর বড় একটা ছবি টাঙানো আছে সমরদের বসার ঘরে৷ নিত্য সেই ছবিতে নতুন মালা, ধূপ-ধুনো দেওয়া হয়৷ সেই ছবি তন্ময় বহুবার দেখেছে৷ মহারাজের উপর লেখা বইও পড়েছে৷ প্ল্যানচেটে বসে মানুষটির কথা ভাবতে তাই অসুবিধা হয়নি৷ প্রায় আধঘণ্টার মতো স্থির হয়ে থাকার পর নড়ে উঠল যন্ত্র৷ ধীরে ধীরে কিছু লিখেও ফেলল কাগজের উপর৷
ওঙ্কার মহারাজের মতো মানুষ, যাঁর শিষ্য সংখ্যা লাখেরও বেশি, তিনি ওদের মতো সামান্য জনের ডাকে আসবেন কিনা সন্দেহ ছিল তন্ময়ের৷ সন্দেহ ছিল সমরেরও৷ প্ল্যানচেট যন্ত্র নড়ে উঠলেও বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভুল করে অন্য কোনো আত্মা চলে এসেছে৷ তখন তাকে চলে যাওয়ার অনুরোধ করে ফের নতুন করে বসতে হয়৷
মেশিন থামতে তাই আলো জ্বেলে দুরুদুরু বক্ষেই টেবিলে কাগজের দিকে তাকিয়েছিল দু’জন৷ কী আশ্চর্য! কাগজের উপর কিছু জড়ানো অক্ষরে লেখা, বাবারা আমি ওঙ্কার মহারাজ৷ তোমরা স্মরণ করেছ, ব্রজমাধব বাবাজীরও সেই ইচ্ছে, তাই আসতেই হল৷ এবার বলো৷
দ্রুত হাত তুলে প্রণাম করল ওরা৷ সমর মাথা নামিয়ে বলল, ‘মহারাজ, আমার বন্ধু তন্ময় এসেছে৷ নাগপুরে একটা চাকরির ইনটারভিউয়ের ডাক পেয়েছে ও৷ সেই ব্যাপারে জানতে চায়৷ অনেক দিন থেকেই ভালো একটা চাকরির খোঁজে আছে৷’
প্রশ্ন করে ওরা ফের প্ল্যানচেট ছুঁয়ে বসল৷ প্রায় কুড়ি মিনিটের মতো স্থির হয়ে রইল যন্ত্রটা৷ তারপর নড়তে শুরু করল৷
মিনিট কয়েক পরে মেশিন থামতে ওরা আলো জ্বেলে ঝুঁকে পড়ল কাগজের উপর৷ সেই একই জড়ানো অক্ষরে লেখা রয়েছে, বন্ধুর নাগপুরের চাকরিতে কিছু বিঘ্ন আছে৷ তবে সেজন্য মন খারাপ নয়৷ বরং এই বছরই আরো বড় এক চাকরির যোগ রয়েছে ওর৷
বলা বাহুল্য, কাগজে সেই লেখা পড়ে তন্ময় কিছু ভরসা যে পেয়েছিল, তা বলাই বাহুল্য৷ তবে কিছুটা ধন্দেও পড়ে গিয়েছিল৷ তাহলে কি নাগপুরে ইন্টারভিউ দিতে যাবে না? পরিষ্কার উত্তর প্ল্যানচেটে আসেনি৷ সেটা জানবার জন্য দু’জন পরামর্শ করে ফের প্ল্যানচেটে বসেছিল৷ টানা প্রায় চল্লিশ মিনিট বসে থেকেও কোনো সাড়া পাওয়া গেল না৷ অন্য কেউ হলে হয়তো হাল ছেড়ে দিত৷ কিন্তু এ ব্যাপারে ওদের অভিজ্ঞতা আছে৷ অনেক সময় এক ঘণ্টা পরেও সাড়া পাওয়া যায়৷
হাল না ছেড়ে তাই থম হয়ে বসে ছিল ওরা৷ হঠাৎই এক ভয়ানক ব্যাপার ঘটে গেল৷ ওরা নিঃশব্দে অর্ধ-নিমীলিত চোখে বসে আছে৷ আচমকাই ঘরের হালকা আলোটা নিভে গেল৷ বন্ধ ঘরের ভিতর মুহূর্তে ঘন অন্ধকার৷ সেই অন্ধকারের ভিতর অমানুষিক কন্ঠস্বরে প্রায় ধমকে উঠল কেউ, ‘যাঁ বঁলবার উঁনি তোঁ বঁলেই দিঁয়েচেন৷ তঁবু বঁসে রঁইচিস ক্যাঁন যাঁ!’
বলা বাহুল্য, হঠাৎ ওই ঘটনায় দু’জনের অন্তরাত্মা কেঁপে গিয়েছিল প্রায়৷ এতদিন প্ল্যানচেট করছে, এমন কখনো হয়নি৷ ভয় পাওয়ারই কথা৷ ভাগ্যিস, নাকিসুরে সেই কথা শেষ হতেই ঘরের টিউব লাইটটা জ্বলে উঠেছিল৷ অন্ধকার ঘর মুহূর্তে আলোয় ভরে যেতে কিছুটা হলেও সামলে নিতে পেরেছিল৷ নইলে অন্য কিছু ঘটে যেতেও পারত৷ সেই রাতে প্ল্যানচেটের ওখানেই ইতি৷ তন্ময়ও দেরি না করে বাড়ি ফিরে এসেছিল৷ থিতু হতে লেগে গিয়েছিল বেশ অনেকটা সময়৷
পরের দিন কিছু বেলার দিকে একা ঘরে বসে তন্ময় রাতের ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছে, সমরের ফোন এলো৷ ‘তন্ময়, অঘটন যেহেতু কিছু আর ঘটেনি, ব্যাপারটা নিয়ে বেশি মাথা ঘামাসনি৷ আমার তো মনে হয় প্ল্যানচেটে যে বার্তাই আসুক তোর নাগপুরের ইন্টারভিউটা দেওয়া দরকার৷’
ঠিক এই কথাটা তন্ময়ও ভাবছিল৷ চাকরিটা খারাপ নয়৷ বড় মালটিন্যাশনাল কোম্পানি৷ ভিতরে প্রস্তুতিও একটা নেওয়া হয়ে গেছে৷ হুট করে বাতিল করা ঠিক হবে না৷ প্ল্যানচেট বার্তায় চাকরিতে কিছু বিঘ্নের কথা বলা হয়েছে৷ হয়তো নাও হতে পারে৷ সেজন্য চেষ্টা করতে তো দোষ নেই৷ যদি হয়ে যায়, আরো ভালো চাকরি পেলে ছেড়ে দেবে তারপর৷ সমরের সঙ্গে আরো কিছুক্ষণ পরামর্শ করে তন্ময় শেষ পর্যন্ত ইন্টারভিউ দিতে যাওয়াই মনস্থ করেছিল৷
বলা যায়, ওই সমরের জন্যই এই শেষ মুহূর্তে গাড়িটাও পাওয়া গেল আজ৷ নইলে যা অবস্থা দাঁড়িয়েছিল, হয়তো সময়মতো হাওড়া স্টেশনে পৌঁছোতেই পারা যেত না৷ ভাগ্যিস, ওলার জন্য অপেক্ষা করতে করতে সমরের কথা মনে পড়েছিল হঠাৎ! বরাবরের মতো এবারও আসানসোল থেকে নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে বাড়ি এসেছে৷ সেটা মনে পড়তেই সমরকে ফোন করেছিল তারপর৷ যদি গাড়িতে করে পৌঁছে দিতে পারে৷
সমরের গাড়ি পাওয়া যায়নি অবশ্য৷ ফোন করতে জানা গিয়েছিল, সে তখন এক আত্মীয়কে প্লেনে তুলে দেবার জন্য এয়ারপোর্টে রয়েছে৷ এখনই ফেরার উপায় নেই৷ তবে সেজন্য চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি৷ মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ফোন করে জানিয়েছিল, ওর পরিচিত একজনের গাড়ি ভাড়া দেবার ব্যবসা৷ ট্যাক্সিক্যাবও আছে৷ তন্ময়দের বাড়ির ঠিকানা তাঁকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ মিনিট দশেকের মধ্যে পৌঁছে যাবে৷
দশ মিনিট নয়৷ ট্যাক্সিক্যাব তার আগেই পৌঁছে গিয়েছিল৷ যে গাড্ডায় পড়েছিল, হাতে চাঁদ পাওয়া বলা যায়৷ হাতে সময় যা আছে, আরামে পৌঁছে যেতে পারবে৷ ট্যাক্সিতে বসে সেই কথাই ভাবছিল তন্ময়৷ শুধু গাড়ির ভিতর সেই গন্ধটা রয়ে গেছে এখনো৷ ক্রমশ বাড়ছে আরো! গোড়ায় কেমন ভ্যাপসা গন্ধ মনে হচ্ছিল৷ এখন রীতিমতো পচা গন্ধ৷ ঘুলিয়ে উঠছে শরীর৷ ঝকঝকে এ. সি গাড়ির ভিতর এমন গন্ধ, ব্যাপারটা অদ্ভুত তো অবশ্যই৷ ওদিকে ড্রাইভার লোকটা সেই থেকে একটি কথাও বলেনি৷ দুই হাত স্টিয়ারিংয়ের উপর৷ গাড়ি তখন ঝড়ের বেগে রেড রোড ধরে ছুটছে৷ জ্যামে না পড়লে বড় জোর আর মিনিট দশেকের পথ৷ ভাগ্যিস, সমর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল৷ আর একটু পরে গাড়িটাও হাজির হয়ে গিয়েছিল প্রায় দেবদূতের মতো! নইলে অকূল পাথারেই পড়তে হতো৷ বলা যায়, সেই কারণেই এ যাবৎ গন্ধটা নিয়ে আর উচ্চবাচ্য করেনি৷ কিন্তু আর যেন পারা যাচ্ছে না৷
প্রায় ঝড়ের গতিতে গাড়ি রেড রোড পার হয়ে তখন আকাশবাণী ভবনের সামনে৷ হঠাৎই সিগন্যাল পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল গাড়িটা৷ সামান্য ইতস্তত করে তন্ময় ডাকল, ‘ড্রাইভারদা, ও ড্রাইভারদাদা৷’
উত্তরে ওদিক থেকে বিন্দুমাত্র সাড়া মিলল না৷ স্টিয়ারিং হাতে লোকটা সেই একই রকম থম হয়ে বসে আছে৷ হতাশ হয়ে তন্ময় জানলার কাচ কিছু নামিয়ে দিল এবার৷ গন্ধটা কিছু কমতে পারে হয়তো৷ কিন্তু তেমন কিছু হবার আগে অন্য এক ব্যাপার ঘটল৷ আচমকা গোটা কয়েক মাছি উড়ে এল৷ ঢুকে পড়ল গাড়ির ভিতর৷ বোঁ বোঁ শব্দে বার কয়েক এদিক ওদিক উড়ে সামনে ড্রাইভারের মাথার উপর পাক খেতে লাগল৷
পচা গন্ধে এ পর্যন্ত যথেষ্ট অসুবিধা হলেও তন্ময়ের মাথায় অন্য ভাবনা আসেনি৷ কতক্ষণে হাওড়া পৌঁছবে সেই চিন্তাই পাক খাচ্ছিল৷ এবার ভাবনাটা আচমকা অন্য দিকে বাঁক নিতে গলাটা সামান্য ঝেড়ে নিয়ে কথা বলতে যাবে, পকেটে মোবাইলটা হঠাৎ বাজতে শুরু করল৷
ইতিমধ্যে সিগন্যাল পেয়ে পাশের অন্য গাড়ি চলতে শুরু করলেও কী এক কারণে ওদের গাড়ি আগের মতোই দাঁড়িয়ে৷ ওদিকে পিছনের গাড়ি তারস্বরে হর্ন দিতে শুরু করেছে৷ তবু ড্রাইভার সেই একই রকম স্থির৷ অবাক করার মতোই ব্যাপার৷ তবু কথা না বলে ও পকেটের মোবাইলের দিকে হাত বাড়াল৷ ঠিক সেই সময় সামনে ড্রাইভারের মুখে প্রথম কথা শোনা গেল৷ প্রায় খেঁকিয়ে উঠল লোকটা, ‘জাঁনলার কাঁচ নাঁমিয়ে দিঁয়েছেন ক্যাঁন? বেঁজায় বাঁজে লোঁক তোঁ আঁপনি! মোঁটে কঁতা শোঁনেন নাঁ!’
নাকিসুরে আচমকা সেই ধমকে এমনিতেই চমকে গিয়েছিল তন্ময়৷ সেদিন প্ল্যানচেটে বসে এই কন্ঠস্বরই শুনেছিল ওরা৷ থম হয়ে তাকিয়ে আছে৷ ড্রাইভার পিছন দিকে আস্তে ঘাড় ফেরাল৷ কী ভয়ানক! সেই মুখে চামড়ার লেশমাত্র নেই৷ শুধু গলিত পচা মাংস!
তন্ময় যথেষ্টই সাহসী মানুষ৷ তবু গাড়ির ভিতর হঠাৎ ওই ভয়ানক দৃশ্য সহ্য করতে পারেনি৷ জ্ঞান হারিয়ে সিটের উপর লুটিয়ে পড়েছিল মুহূর্তে৷ পকেটে মোবাইলটা তখনো তারস্বরে বেজে চলেছে৷
তন্ময়কে সেই দিন সন্ধে নাগাদ উদ্ধার করা হয়েছিল হাওড়ার এক গলির ভিতর থেকে৷ তখনো জ্ঞান ফেরেনি৷ সেই গাড়ি বা ড্রাইভারেরও খোঁজ মেলেনি৷ ওদের বাড়িতে তার অনেক আগেই অবশ্য হইচই শুরু হয়ে গিয়েছিল৷ রীতিমতো কান্নাকাটি৷ থানায় থানায় ফোন৷
তন্ময় রওনা হয়ে যাবার আরো মিনিট পনেরো পরে সমরের বুক করা ট্যাক্সি তন্ময়দের বাড়িতে পৌঁছোয়৷ তারপর যখন জানতে পারে, সমরের পাঠানো গাড়িতেই তন্ময় ইতিমধ্যে রওনা হয়ে পড়েছে, অবাক হয়ে ট্যাক্সির ড্রাইভার ফোন করেছিল সমরকে৷ ব্যাপার শুনে সমর তখনই ফোন করেছিল তন্ময়কে৷ কিন্তু ফোন ধরার মতো অবস্থা তখন যে তার ছিল না, সে তো আগেই বলা হয়েছে৷
এ গল্প এখানেই শেষ নয় অবশ্য৷ ক্লাইম্যাক্সটাই বাকি রয়ে গেছে৷ রাতেই জানা গিয়েছিল সেই খবর৷ যে ট্রেনে তন্ময়ের যাবার কথা ছিল, মাঝ পথে ভয়ানক এক দুর্ঘটনায় পড়েছে সেটা৷ আহতের সংখ্যা অনেক৷ মারা গেছে বেশ কয়েকজন৷
বলা যায়, তন্ময় সেদিন হাওড়া স্টেশনে ট্রেন ধরতে যাবার পথে ওই ভৌতিক গাড়ির পাল্লায় পড়ার কারণে বড় একটা বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়ে গিয়েছিল৷ মাস কয়েকের মধ্যে কলকাতায় এক মালটিন্যাশনাল কোম্পানিতে ভালো চাকরিও হয়ে গিয়েছিল তারপর৷
—
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন