রুম নম্বর ১৩

শিশির বিশ্বাস

‘অদ্ভুত এক ঘটনা আমার জীবনেও ঘটেছিল রে৷ তার জেরে শুধু বন্ধুবিচ্ছেদ নয়, ছাড়তে হয়েছিল চাকরিটাও৷’

আজকের কাগজে এক ভৌতিক ঘটনার কথা ছাপা হয়েছে৷ কথা হচ্ছিল তাই নিয়ে৷ তার মধ্যেই বিনুমামা হঠাৎ বোমা ফাটালেন৷ কারণ, বিনুমামার গল্প মানেই স্রেফ দম বন্ধ করে শোনা ছাড়া অন্য পথ নেই৷

‘তাহলে কাগজের কথা থাক৷ প্লিজ, তোমার ওই গল্পটাই বল৷’ করুণ গলা পুপুলের৷

ছেলেবেলা থেকেই বিনুমামা ডানপিটে মানুষ৷ অনেক অভিজ্ঞতায় ঝুলি ভরতি৷ কিন্তু ব্যস্ত মানুষটির দেখা পাওয়াই মুশকিল৷ কলকাতায় জরুরি কাজ থাকলে কখনো রাতটা কাটিয়ে চলে যান পরের দিনই৷ এই সময় বিনুমামাকে বিরক্ত করতে মায়ের বেজায় আপত্তি৷ কিন্তু আজ মাকে হঠাৎ ব্যতিক্রম দেখা গেল৷ আগ্রহে মোড়া টেনে কাছে বসে বললেন, ‘হ্যাঁরে বিনু, যখন কলকাতায় ছিলি, কী নাকি এক ভয়ানক ব্যাপার হয়েছিল! সেই গল্পটা?’

‘হ্যাঁ রে দিদি৷’ বিনুমামা সামান্য গুছিয়ে বসে শুরু করলেন, ‘তখন কলকাতায় এক নামি কোম্পানির সেলস রেপ্রেজেন্টেটিভ৷ মাস গেলে মাইনে, সেলের উপর কমিশন, সব মিলিয়ে রোজগার কম নয়৷ কিন্তু কলকাতায় চাকরি নামেই৷ হামেশাই ছুটতে হয় নানা জায়গায়৷ মুশকিল হত থাকার ব্যবস্থা নিয়ে৷ সেসময় ছোটখাটো মফস্বল শহরে তেমন ভালো হোটেল একেবারেই ছিল না৷ তো এইভাবেই চলছিল৷ এর মধ্যেই হঠাৎ কাজ পড়ল দূরের এক ছোট মফস্বল শহরে৷ হঠাৎ কোম্পানির বড় কর্তাদের হুঁশ হয়েছে, ওখানে প্রডাক্টের বিক্রি ভীষণ কম৷ অর্ডার প্রায় নেই বললেই চলে৷ সুতরাং ডাক পড়ল সমর আর আমার৷ কাজের মানুষ বলে কোম্পানিতে দু’জনের তখন যথেষ্টই কদর৷

‘দূর কম নয়৷ সকাল আটটায় ট্রেন ধরেছিলাম৷ যথাস্থানে নামতে প্রায় একটা বেজে গেল৷ এরপর বাসে আরও ঘণ্টা দুয়েকের পথ৷ সঙ্গে স্যাম্পলের মালপত্র বোঝাই দুটো ঢাউস বাক্স৷ বাসের প্রশ্নই ওঠে না৷ এছাড়া ভরসা বলতে রুটের অটো, তিন চাকার কিম্ভূত এক ভ্যানগাড়ি৷ তাও কখন আসবে ঠিক নেই৷ স্ট্যান্ডে এক দালালকে ধরে ব্যবস্থা করা হল৷ খানিক বাদে এক অটোভ্যান আসতে মালপত্র নিয়ে আমাদের ভিতরে বসার ব্যবস্থা হবার পরে ভাগ্যবান মাত্র জনা ছয়েক প্যাসেঞ্জার বসতে পারল৷ অপেক্ষমান বাকি যাত্রীরা অবশ্য সেজন্য পরোয়া করল না৷ যে যেখানে পারে, ভ্যানের পা-দানি, নয়তো ছাদে বা পিছনে দাঁড়িয়ে গেল৷ তিল ধারণের জায়গা রইল না৷ এরপর সেই ভ্যান যখন চলতে শুরু করল, হঠাৎ দেখলে মনে হবে গাড়ি নয়, এক ঝাঁক মানুষ উড়ে চলেছে৷ সেই গাড়িতেও দেখলাম চলতি পথে দিব্যি নতুন যাত্রী উঠছে৷

‘ওই অবস্থায় প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পরে যখন যথাস্থানে পৌঁছুলাম, প্রায় বিধ্বস্ত অবস্থা৷ তবে ভ্যানের ড্রাইভার কথার খেলাপ করেনি৷ কথামতো এক হোটেলের সামনেই নামিয়ে দিয়ে গেল৷ এমন কী হেল্পার ছোকরাকে দিয়ে স্যাম্পলের বাক্স দুটোও কাঁধে করে পৌঁছে দিল হোটেলে৷ গাড়িতে বসেই ড্রাইভার হেঁকে বলল, বাবুদের ভালো দেখে একটা ঘর দিও জনার্দনদা৷

‘ততক্ষণে হোটেলের দিকে তাকিয়ে আমরা তো থ হয়ে গেছি৷ এমন ঝাঁ-চকচকে হোটেল এই ধাপধাড়া জায়গায় মিলবে, স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি৷ খুশিতে সমর তো জোরে একটা সিটিই দিয়ে উঠল৷ কাউন্টারে মাঝবয়সি এক ভদ্রলোক বসে আছেন৷ জুতোর মস, মস শব্দে সমর এগিয়ে গিয়ে বলল, শুনলেন তো? চট করে ভালো দেখে একটা ঘর দিন তো জনার্দনবাবু৷ ডবল বেড৷ আগে একটু বিশ্রাম দরকার৷

‘সমর কিছুমাত্র বাড়িয়ে বলেনি৷ ঘড়ির কাঁটা তখন তিনটের ঘর ছুঁতে চলেছে৷ তার উপর এমন ঝাঁ-চকচকে হোটেল দেখে চাহিদাও বেড়ে গেছে৷ কিন্তু সমর খেয়াল না করলেও লক্ষ করেছিলাম, আমাদের মালপত্র নিয়ে নামতে দেখে কাউন্টারে বসা জনার্দনবাবুর মুখ কেমন কাঁচুমাচু হয়ে গেছে৷ তারপর ড্রাইভারের হাঁক শুনে শুকিয়ে প্রায় কাঠ হবার জোগাড়৷ সমরের কথায় তিনি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন৷ সেলস রেপ্রেজেন্টেটিভের কাজ৷ কোথায় কী দরকার, ভালোই জানা আছে৷ ছোকরার সেই মুখের দিকে তাকিয়ে সমর প্রায় হাঁক ছাড়ল এবার, রুম তো আছে হোটেলে৷ তবে অমন হাঁ করে কী দেখছেন দাদা?

‘আজ্ঞে হ্যাঁ সার, আছে৷ তবে—

‘কোট-প্যান্ট-টাই পরা সমরের সেই হাঁকে বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে কী বলতে গিয়েও থেমে গেলেন তিনি৷ তারপর শশব্যস্তে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনারা একটু বসুন সার৷ ম্যানেজারবাবুকে ডেকে আনছি৷

‘আমাদের কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তিনি সিঁড়ি ভেঙে প্রায় দৌড় লাগালেন উপর তলার দিকে৷

‘ব্যাপারটা কী হল, যখন ভাবছি, কাউন্টারের জনার্দনবাবুর সঙ্গে প্রায় হন্তদন্ত হয়ে নেমে এলেন মাঝবয়েসি ম্যানেজার৷ লুঙির উপর পাটভাঙা পাঞ্জাবি৷ বোঝা যায়, অবেলায় ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, কোনো মতে গায়ে পাঞ্জাবি চাপিয়ে চলে এসেছেন৷ কাউন্টারের ড্রয়ার থেকে চশমা বের করে নাকের উপর চাপিয়ে আমাদের দু’জনের উপর এক পলক বুলিয়ে ঢোঁক গিলে বললেন, আজ্ঞে সার, জনার্দন ছেলেমানুষ৷ আসলে উপরে ১৩ নং ঘরটা খালি আছে ঠিকই৷ কিন্তু ঠিক ব্যবহার করার অবস্থায় নেই৷ অনেক দিন খালি রয়েছে কিনা৷ আপনারা বরং অন্য—

‘ভদ্রলোকের কথা শেষ হতে পেল না৷ শুধু সমর নয়, হাঁ, হাঁ করে উঠলাম আমিও, ওই ঘরটাই চাই আমাদের৷

‘কিন্তু, সামান্য ঢোঁক গিললেন উনি, কিন্তু সার, প্রায় বছর খানেক হল ওই ঘরে কেউ থাকেনি৷

‘সো হোয়াট? সমর প্রায় খেঁকিয়ে উঠল, সারাদিন জার্নি করে ভয়ানক টায়ার্ড৷ ফাঁকা যখন আছে, ওই ১৩ নং ঘরটাই চাই৷

‘এভাবে বলছেন যখন, ম্যানেজার অল্প ঢোঁক গিললেন, দিচ্ছি তাহলে৷ কিন্তু কোনো অসুবিধা হলে দোষ দেবেন না৷

‘এসব মফস্বল শহরের হোটেলে বড় সমস্যা ইলেকট্রিসিটি৷ কখন মিলবে, ঠিক থাকে না৷ কিন্তু যে কাজে এসেছি, সারাদিন প্রায় বাইরেই কাটবে৷ ইতিমধ্যে দেখে নিয়েছি, টাউনের বাইরে হোটেলটা বেশ ফাঁকায়৷ পিছনে দক্ষিণ দিকে বিশাল এক আধমজা জলা৷ দু’তলায় জানলা খুলে দিলে ফ্যান না হলেও চলে যাবে৷ ম্যানেজারকে সেই কথাই বলেছিলাম৷ কিন্তু ফল হল উলটো৷ প্রায় হেঁচকি তুলে তিনি বললেন, পিছনের জানলা একদম খুলবেন না সার৷ এই হোটেলে ওটা একদম বারণ৷

‘ভদ্রলোকের সেই কথায় কেউই আর উত্তর করলাম না৷ ততক্ষণে বুঝে ফেলেছি, অযথা কথা বললেই কথা বাড়বে৷ সময় নষ্ট৷

‘খাতাপত্রের কাজ সারা হতে ম্যানেজার নিজেই আমাদের উপরে দু’তলার কোণের দিকে ১৩ নম্বর রুম খুলে দিলেন৷ দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল৷ মেঝেতে কার্পেট পাতা চমৎকার ঘর৷ ধুলো ময়লার লেশমাত্রও নেই৷ অযথা কেন যে উনি রুমটা দিতে আপত্তি করছিলেন, বুঝতে পারলাম না৷ ভদ্রলোক অবশ্য বিদায় নেবার আগেও ফের সতর্ক করে দিয়ে গেলেন, পিছনের জানলা একদম খুলবেন না সার৷ বড্ড পচা কাদার গন্ধ৷

‘পিছনে একজন মালপত্র নিয়ে এসেছিল৷ নামিয়ে দিয়ে বিদায় নিতেই সমর দরজা বন্ধ করে প্রথমেই ঘরের পিছন দিকের দুটো জানলাই খুলে দিল৷ ফ্যান আগেই চালিয়ে দেওয়া হয়েছে, তবু জানলা খুলতেই ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়িয়ে গেল শরীর৷ আর কী দারুণ দৃশ্য! দিগন্তবিস্তৃত বিল৷ কোথাও টলটলে জলের উপর সবুজ শ্যাওলা আর কচুরিপানা৷ কাদা থাকলেও বেশিরভাগ অংশেই ধান চাষ হয়েছে৷ চড়া রোদে সবুজের উপর দোল খাচ্ছে দামাল বাতাস৷ চোখ জুড়ানো দৃশ্য৷ এই ধাপধাড়া জায়গায় এমন দারুণ একটা ঘর পাওয়া যাবে, ভাবাই যায় না৷

‘দুপুরে কারো খাওয়া হয়নি৷ বিকেলে ভারি টিফিনের কথা বলে রাখা হয়েছিল৷ চিকেন কারির সঙ্গে গোটা কয়েক করে গরম পরোটা দিয়ে সেটা সাঙ্গ হবার পরে নীচে লাউঞ্জে বসে শুরু হল কাজের কথা৷ প্রায় শহরের বাইরে হোটেল৷ আগামী কাল থেকে দু’জনের জন্য দুটো গাড়ি দরকার৷ হোটেলের ম্যানেজার ধনঞ্জয় বর্মণ তখন কাউন্টারেই ছিলেন৷ তাঁকে বলতে উনি জানালেন, দুটো অটোভ্যানের ব্যবস্থা আজই করে রাখবেন৷ শুধু তাই নয়, দোকানপাট, টাউনের হালচাল সম্পর্কেও কিছু খোঁজখবর দিলেন৷

‘রাতে পাঁঠার মাংসের গরম ঝোল-ভাত দিয়ে ভূরিভোজের পরে সেই যে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছিলাম আর হুঁশ ছিল না৷ যাকে বলে, এক ঘুমে রাত কাবার৷ ভোর সকালে জানলা দিয়ে আসা ফুরফুরে বাতাসে ফের পাশ ফিরতে যাচ্ছি, ক্যাঁক করে ডোরবেল বেজে উঠল৷ সমর তখনও ঘুমোচ্ছে৷ উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম৷ দরজার ওধারে রীতিমতো উদ্বিগ্ন মুখে ম্যানেজার ধনঞ্জয়বাবু৷ আমাকে দেখেই বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, বাপরে, ভয়ানক চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলেন সার৷ সকালে খোঁজ নিতে শুনলাম, সারা রাত্তিরে আপনাদের কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি৷ তাই ছুটে এলাম৷

‘বলতে বলতে তাঁর চোখ পড়ল ঘরের পিছনের খোলা জানলার দিকে৷ আঁতকে উঠে বললেন, এ কী করেছেন সার! ওদিকের জানলা খুলতে মানা করেছিলাম না!

‘তা করেছিলেন, পালটা সওয়াল আমার, কোনো কাদার গন্ধ কিন্তু পাইনি কেউ৷ বরং কী দারুণ হাওয়া বলুন দেখি!

‘তাই বুঝি! গোড়ায় ভদ্রলোক একটু থতমত খেয়ে গেলেও আমার কথায় চোখ দুটো যেন সামান্য উজ্জ্বল হয়ে উঠল৷ আর কথা না বলে চলে গেলেন৷ আমি দরজা বন্ধ করে ফের একটু গড়িয়ে নেবার জন্য এগোচ্ছি, দেখি, ইতিমধ্যে সমরও জেগে উঠেছে৷ বিছানায় শুয়েই বলল, তুই কাল অনেক রাতে ঘরের ভিতর অন্ধকারে পায়চারি করছিলি?

‘না তো! অবাক হয়ে বললাম, সেই যে শুয়েছি, তারপর এই উঠলাম৷ তাছাড়া ঘরে তো নাইট ল্যাম্প ছিল৷ একেবারে অন্ধকার হবার কথা নয়!

‘সেই কথাই তো বলছি৷ নাইট ল্যাম্প তখন অফ করা ছিল৷ গোড়ায় ভেবেছিলাম, লোডশেডিং৷ কিন্তু ফ্যান চলছে দেখে ভুল ভাঙল৷ কে বলে সাড়া দিয়ে উঠতেই পায়ের শব্দ থেমে গেল৷ সেই মুহূর্তে ওদিকে তোর খাটটা কেমন মচমচ শব্দ করে উঠল৷ কেউ খাটে উঠলে যেমন হয়৷ কিন্তু তারপর বেড সুইচ অন করে দেখি তুই অঘোরে ঘুমচ্ছিস৷ ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারলাম না৷ ঘুমচ্ছিস দেখে তোকে অবশ্য আর ডাকিনি৷ ফের নাইট ল্যাম্পটা জ্বেলে দিয়ে শুয়ে পড়লাম৷

‘খানিক পরে সমর আবার বলল, আচ্ছা বিনোদ, তোর ঘুমের ঘোরে এভাবে হেঁটে বেড়াবার অভ্যাস নেই তো? আমাদের কলেজের হোস্টেলে এমন একটি ছেলে ছিল কিন্তু৷

‘সমরের ওই কথায় হো-হো করে হেসে ফেললাম, এতদিন তোর সঙ্গে পরিচয়৷ বরাবর একসাথে টুর করে আসছি, আজ হঠাৎ এই কথা বলছিস!

‘সমর কিন্তু থামল না৷ বিছানায় উঠে বসল এবার৷ সরি, তবে আমার অবস্থা একবার বোঝার চেষ্টা কর৷ তোর কথার পরে আমার তো এখন সন্দেহ হচ্ছে, এই ঘরে কোনো গোলমাল আছে৷ তারপর নম্বরটাও আবার ১৩৷ একেবারে সোনায় সোহাগা৷ নইলে শুরু থেকেই ওরা এভাবে আপত্তি করবে কেন? তুই দরজা খোলার পরেই ঘুম ভেঙেছে আমার৷ ম্যানেজার ভদ্রলোকের মুখটা দেখেছিলি? ভয়ানক দুশ্চিন্তায় ছিলেন উনি৷ তাই ভোর হতেই ছুটে এসেছেন৷

‘মাথা নেড়ে বললাম, একদম৷ তবে ব্যাপারটা ভেঙেও তো বলছে না কেউ৷ আজ একটু খোঁজ নেব তাহলে৷

‘তা নিতে পারিস৷ কিন্তু আমার মনে হয়, হোটেল আজই পালটানো দরকার৷ সারা দিন তো টাউনেই ঘুরতে হবে৷ তেমন হোটেলের খোঁজ পেলে সন্ধের মধ্যেই পালটে ফেলব ঠিক করেছি৷ তুই কী বলিস?

‘সমরের সেই মুখের দিকে তাকিয়ে সায় না দিয়ে উপায় ছিল না৷ যাই হোক, গাড়িতে স্যাম্পলের বাক্স চাপিয়ে যে যার মতো বেরিয়ে পড়েছিলাম যথাসময়ের মধ্যেই৷ কে কোন এরিয়ায় কাজ করবে, আগেই ঠিক করা ছিল৷ কাজ বলতে বিরাট কিছু নয়৷ সাহেবি পোশাকে গলায় টাই ঝুলিয়ে দোকান থেকে দোকানে ঢুঁ মারো৷ ঝাঁ চকচকে পোস্টার আর গিফট ধরিয়ে দাও৷ সেই সাথে কয়েকটা স্যাম্পল প্যাকেট আর কথার ফুলঝুরি৷ এর উপর নামি কোম্পানির গুড উইল তো রয়েছেই৷ বেশিরভাগ পার্টি তাতেই কাত হয়ে যায়৷ তৎক্ষণাৎ কিছু অর্ডারও চলে আসে৷’

এই পর্যন্ত বলে বিনুমামা থামলেন৷ গল্পটা কোন দিকে বাঁক নিতে যাচ্ছে, তখনও কেউ বুঝে উঠতে পারিনি৷ তবে কিছু যে একটা ঘটতে চলেছে, বুঝতে বাকি নেই৷ অজান্তেই মামার কাছে ঘেঁসে এসেছি৷ পুপুল বলল, ‘সেদিন রাতেও ওই হোটেলে ছিলে?’

‘রাত কী বলছিস! তার আগেই তো ঘটে গেল ব্যাপারটা৷’ সামনে উৎসুক শ্রোতাদের উপর সামান্য চোখ বুলিয়ে নিয়ে বিনুমামা বললেন, ‘তবে তার আগের কথাও একটু বলা দরকার৷ আমার ভ্যানের ড্রাইভার জগদীশের সঙ্গে কিছুক্ষণের মধ্যেই বেশ খাতির জমিয়ে ফেলেছিলাম৷ এটা অবশ্য আমাদের কাজের মধ্যেই পড়ে৷ একটু জমিয়ে নিতে পারলে নতুন জায়গায় অনেক সাহায্য পাওয়া যায়৷ জগদীশের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি৷ প্রবল উৎসাহে নিজেই দোকান বুঝে নিয়ে যাচ্ছিল আমাকে৷ এমনকী, স্যাম্পলের প্যাকেট, পোস্টারও বয়ে দিচ্ছিল৷

‘অনেকক্ষণ ধরেই খেয়াল করছিলাম, ছেলেটি কিছু বলার জন্য উসখুস করছে৷ হঠাৎ বলল, সার শুনলাম, হোটেলের ১৩ নম্বর ঘরে আছেন৷ রাতে কোনো সমস্যা, মানে কিছু দেখেননি?

‘জগদীশের ওই কথায় সকালে সমরের ব্যাপারটা মনে পড়ল৷ কাজের চাপে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম৷ কৌতূহলী হয়ে বললাম, কী ব্যাপার বলো দেখি? ম্যানেজার ধনঞ্জয়বাবুও ওই ঘর ভাড়া দিতে চাইছিলেন না৷ একরকম জোর করেই নিয়েছি!

‘প্রত্যুত্তরে জগদীশ আমার দিকে তাকিয়ে অল্প ঠোঁট চাটল৷ সামান্য ইতস্তত করে বলল, সার, রাতে যখন কিছু হয়নি, আর নাই বা শুনলেন৷

‘কিন্তু আমি ছাড়লাম না৷ ওকে উসকে দিতেই বললাম, ঠিক করেছি, আজ বিকেলের মধ্যেই ছেড়ে দেব হোটেল৷ বন্ধু সমর হয়তো এর মধ্যে নতুন হোটেলের খোঁজ শুরু করে দিয়েছে৷ তাই বলতেই পারো৷

‘অল্প ভেবে ফের ঠোঁট চাটল জগদীশ৷ হোটেল যখন ছেড়েই দেবেন, তাহলে বলেই ফেলি৷ বছর খানেক আগে হোটেল সবে চালু হয়েছে৷ এক ভয়ানক ব্যাপার হয়েছিল ওই ১৩ নং রুমে৷

‘কী? জগদীশ থামতেই প্রশ্ন করলাম৷

‘হোটেল চালু হবার মাস খানেক পরে আপনাদের বয়সি দুই বন্ধু ওই ঘরে উঠেছিল৷ রাতে এক বন্ধু অন্যজনকে খুন করে ফেরার হয়ে যায়৷ এখনও পুলিশ তার খোঁজ পায়নি৷ সারা টাউনে সে এক হইহই কাণ্ড৷

‘জগদীশ থামতেই হো-হো করে হেসে উঠলাম আমি, এই ব্যাপার! আরে হোটেলে এসব হামেশাই হয়ে থাকে৷ কত রকমের মানুষ আসে৷ তাতে রুম ভাড়া দেওয়া আটকাবে কেন?

‘হাসির কথা নয় স্যার৷ সেই ঘটনার পরে ওই রুমে কেউই এক রাতের বেশি থাকতে পারেনি৷ রাতে কেউ নাকি অন্ধকার ঘরের ভিতর হেঁটে বেড়ায়৷ অথচ আলো জ্বাললে কিছুই দেখা যায় না৷ হাঁটার শব্দও থেমে যায়৷ একবার তো আরও ভয়ানক ব্যাপার হয়েছিল৷ জেগে উঠে ঘরের এক বোর্ডার ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠতেই এক ছায়ামূর্তি অন্ধকারে ছুটে গিয়ে খোলা জানলা দিয়ে লাফ দিয়েছিল বাইরে৷ পিছনের বিলে তখন অনেক জল৷ সেই জলে ভারি কিছু লাফিয়ে পড়ার জোরাল শব্দ হোটেলের অন্য ঘর থেকেও শোনা গিয়েছিল৷ সেই থেকে ম্যানেজার ঘরের ওদিকের জানলা খুলতে মানা করে দিয়েছেন৷ শুনেছিলাম, ওই ঘর এখন আর ভাড়াও দেওয়া হয় না৷

‘দুপুরে একটার মধ্যে হোটেলে খেতে আসার কথা৷ কাজ সেরে ফিরতে কিছু দেরিই হয়ে গেল৷ রিসেপশন কাউন্টারে গতকালের সেই জনার্দনবাবু৷ জিজ্ঞাসা করতে জানাল, তিনি ঘণ্টা খানেক হল কাউন্টারে আছেন৷ সমর এর মধ্যে ফেরেনি৷

‘রুমের দু’সেট চাবির একটা সমরের কাছে৷ অন্যটা রিসেপশন কাউন্টারেই থাকে৷ সেটা চেয়ে নিয়ে উপর তলায় ঘরের দিকে গেলাম৷ বাইরে বের হলে দু’জনের এক সাথে খাওয়া অভ্যাস৷ হাতমুখ ধুয়ে সমর না ফেরা পর্যন্ত সামান্য জিরিয়ে নেওয়া যাবে৷ নতুন হোটেলের খোঁজেই হয়তো দেরি হচ্ছে৷ বিকেলে যদি আবার হোটেল বদলাতে হয়, তার আগে একটু বিশ্রাম মন্দ নয়৷

‘ভাবতে ভাবতে রুমের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকেছি, সমরের বেডের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম৷ আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে সমর তার বেডে শুয়ে ঘুমোচ্ছে৷ মাথার উপর ফুল স্পীডে ফ্যান ঘুরছে৷ বুঝতে পারছিলাম, কাউন্টারে জনার্দনবাবু বসার আগেই সমর ফিরে এসেছে৷ ঘরে এসে আমার অপেক্ষায় থেকে শেষে ঘুমিয়ে পড়েছে৷ তবু কৌতূহলে এগিয়ে গেলাম৷ শীতকাল নয়৷ এভাবে আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে ওকে কখনো ঘুমোতে দেখিনি৷

‘প্রায় অসাড়ে ঘুমোচ্ছে সমর৷ অকারণে ডাকা ঠিক হবে কিনা, খাটের পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছি৷ হঠাৎ সমরের শরীরের উপরের অংশ আচমকাই সোজা হয়ে উঠে এল৷ মুখের উপর থেকে চাদর সরে যেতেই অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল আমার৷ সমর নয়, একটা ফুলে ওঠা পচা মড়া৷ চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে এসেছে৷ বেরিয়ে আসা কশের তীক্ষ্ণ দাঁত, গালের দু’পাশে কাঁচা রক্তের দাগ৷’

‘অ্যাঁ!’

আঁতকে উঠে সবাই তখন বিনুমামার প্রায় কোলের উপর উঠে পড়েছি৷ মা বললেন, ‘বলিস কী! ভ্যাম্পায়ার!’

‘আমিও তাই ভেবেছিলাম রে৷ জীবনে অমন ভয় খুব বেশি পাইনি৷ তবে সাহস হারিয়ে ফেলিনি৷ তাকিয়ে দেখি পাশেই টেবিলে সমরের ফল কাটার বড় ছুরিটা৷ সেটা তুলে নিয়ে বসিয়ে দিতে যাব, সেই পচা মড়া মুহূর্তে উঠে দাঁড়িয়ে পাশেই খোলা জানলা দিয়ে বাইরে লাফ দিল৷ ঝপাং করে জলে পড়ার শব্দও শুনতে পেলাম৷ হতভম্ব হয়ে ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে আছি, চোখ পড়ল বিছানার দিকে৷ বিছানায় উঠে বসে ঘুম চোখে সমর অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে৷ আমি চোখ ফেরাতেই সে আতঙ্কে বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে চিৎকার করতে করতে খোলা দরজা দিয়ে বাইরে ছুটে বেরুল৷’

বিনুমামা থামলেন৷ আমাদের কারো মুখেই কথা নেই৷ মা বললেন, ‘তারপর?’

‘তারপর?’ বিনুমামা অল্প হাসলেন, ‘অফিসে আমার সব চাইতে কাছের বন্ধু সমর এরপর কোনো সম্পর্কই আর আমার সাথে রাখেনি৷ ওর দৃঢ় বিশ্বাস, ঘোরের মধ্যে আমি ওকে খুন করতে গিয়েছিলাম৷ আগের রাতেও নাকি ঘুমের ঘোরে সেই চেষ্টা করেছিলাম৷ সেবারও হঠাৎ ওর ঘুম ভেঙে যাওয়ায় বেঁচে গেছে৷ এমন বিপজ্জনক মানুষের সঙ্গে কে আর সম্পর্ক রাখে? ওর কথা ভেবে এরপর আমিও কোম্পানি ছেড়ে দিলাম৷ আসলে সমর সেদিন হোটেলের কাউন্টারে জনার্দনবাবু বসার আগেই ফিরে এসেছিল৷ ওর ভ্যানের ড্রাইভারের কাছে হোটেলের সব কথা সেও শুনেছিল৷ রাতের সেই অভিজ্ঞতার কারণে বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে ফিরে এসেছিল অনেক আগেই৷ তেমন ভালো হোটেলও খুঁজে পায়নি৷ কী করবে ভাবতে ভাবতে আমার অপেক্ষায় চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল তারপর৷’

‘তাই বলে তোকে এমন ভুল বুঝবে? এতদিনের বন্ধু!’ মা বললেন৷

‘ওকে দোষ দেওয়া যায় না৷’ বিনুমামা অল্প মাথা নাড়লেন, ‘ভয়ানক কিছু সেদিন ঘটে যেতেই পারত৷ সমরের বিছানায় উঠে বসতে দেখেছিলাম পচে ফুলে ওঠা এক মড়াকে৷ ছুরি বসিয়ে দেবার আগেই মড়াটা জানলা দিয়ে জলে লাফিয়ে পড়েছিল৷ সেই শব্দ শুধু আমি নই, হোটেলের অনেকেই শুনতে পেয়েছিল৷ অথচ বিছানায় বসেছিল সমর৷ ভৌতিক ছাড়া একে আর কী বলা যায়? ম্যানেজার ধনঞ্জয়বাবুর কথায় কর্ণপাত না করা একেবারেই ঠিক হয়নি, স্বীকার করতেই হয়েছিল পরে৷ ভগবান রক্ষা করেছেন৷

‘যাই হোক, এই ঘটনার অনেক পরে কাগজে একটা খবর দেখেছিলাম৷ এই গল্পের সঙ্গে সেটাও বলা দরকার৷ সেই হোটেলের ১৩ নং রুমের পিছনে বিলের কাদায় পুলিশ জামাকাপড় পরা একটা পূর্ণ বয়স্ক মানুষের কঙ্কাল খুঁজে পেয়েছিল৷ কঙ্কালের প্যান্টের পকেটে ছোট এক থলিতে গোটা কয়েক সোনার বাট৷ তদন্তে প্রকাশ পেয়েছিল, বছর কয়েক আগে ওই রুমে যে যুবক খুন হয়েছিলেন, কঙ্কালটি তার ফেরারি সঙ্গীর৷ পুলিশের অনুমান, সঙ্গীকে খুন করে সোনার বাটগুলো হাতিয়ে নিয়ে পালাবার জন্য জানলা দিয়ে লাফ দিয়েছিল সে৷ নীচে বিলের জল এত গভীর হবে, হয়তো ভাবতে পারেনি৷ সাঁতার না জানায় ডুবে মরেছিল৷ দেহ ঘন কচুরিপানার নীচে চলে যাওয়ায় মৃতদেহও ভেসে ওঠেনি৷’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%