উল্লাস মল্লিক

বোমকাইয়ের মনে যে বড় দুঃখ! দুঃখে দুঃখে একেবারে সিলিন্ডার ভর্তি। দুঃখের চাপে মাঝে মাঝে সিলিন্ডার লিক করে একটু-আধটু বাইরে চলে আসে। তখন তার গা থেকে দুঃখ দুঃখ গন্ধ ছাড়ে। লোকজন বলে, কী রে বোমকাই, কীসের দুঃখ তোর, মুখটা অমন করে আছিস কেন! খাওয়া দাওয়া হয়নি! নাকি বাপ বাড়ি থেকে খেঁদিয়ে দিয়েছে!
না, বাপ তাকে খেঁদিয়ে দেয়নি এখনও। বলতে নেই, ভালো ব্যবহারই করেন। তবে ওই, মাঝে-মাঝেই কীভাবে যেন সেই কুটকুটে প্রসঙ্গটি তুলে ফেলেন। চাকরি। বাবা বলেন, এবার চাকরি বাকরির একটা চেষ্টা কর। আমি তো আর সারাটা জীবন থাকব না।
বোমকাই চুপ করে থাকে। চুপ করে থাকা ছাড়া উপায় কী! বলে বলে তো বাবাকে বোঝান যায় না, ঠুনকো চাকরি বাকরি করার জন্য জন্ম হয়নি তার। সে চায় মস্তান হতে। হ্যাঁ মস্তান। তার নামে এলাকা কাঁপবে। কালো জিন্স, কালো হাতকাটা গেঞ্জি আর কালো সানগ্লাস পরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে, সম্ভ্রমে দু’পাশে সরে দাঁড়াবে সবাই। ফুটবল খেলা দেখতে গেলে টিকিট কাটার কোনও ব্যাপারই থাকবে না। কর্মকর্তাদের কেউ একজন একটা চেয়ার সাইডলাইনের ধারে পেতে দিয়ে বলবে, বসুন বোমকাইদা, মনের আনন্দে খেলা দেখুন। ব্যাগ নিয়ে বাজারে গেলে কাড়াকাড়ি পড়ে যাবে। তার হাত থেকে ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে আলুওলা আলু ঢুকিয়ে দেবে ব্যাগের মধ্যে; আলুওলার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে সবজিওলা সেরা সেরা সবজিগুলো ভরে দেবে ব্যাগে। মাছের ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে ছুটবে মাছওলা। আড়াই কিলো সাইজের কাতলা ঢুকিয়ে দেবে ব্যাগের মধ্যে। ব্যাগ ছাপিয়ে মাছের লেজ উঁকি দেবে বাইরে।
তারপর হয়তো, একদিন লক্ষণপুর তিন মাথার মোড়ে গিয়ে দেখল বিরাট গন্ডগোল। দু’দলের ঝামেলা লেগেছে। পুলিশ কিছু করতে পারছে না। ঠিক সেই সময় অকুস্থলে পৌঁছাল বোমকাই। ডান হাতটা আম্পায়ারের ‘বাই’ দেখানোর মতো উপরে তুলল। ব্যস, ঝামেলা খতম। হাঙ্গামা থামিয়ে দিল দু’দলই। দলের সর্দাররা এসে বলবে, বোমকাইদা, তুমিই একটা বিচার করে দাও। বোমকাইয়ের বিচার নত মস্তকে মেনে নেবে দু’পক্ষই। পুলিশ অফিসার এগিয়ে এসে বলবেন, বোমকাইবাবু, প্লিজ একটু থানায় চলুন না, একটু কফি খাবেন। আর, আপনি পুলিশে জয়েন করুন না; দেশ ও দশের খুব উপকার হয় তাহলে।
কফি খেলেও বোমকাই কিন্তু পুলিশে যোগ দেবে না। বোমকাই তো পুলিশ হতে চায়নি জীবনে। মাস্টার, ব্যবসাদার, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, ডাকপিওন কিছুই হতে চায়নি সে। তার জীবনে একটাই লক্ষ্য। মস্তান হবে। পাড়া কাঁপাবে।
আসলে ভাবনাটা মাথায় এসেছিল অনেকদিন আগে। ক্লাস সেভেনে। দুপুরবেলা খড়দা থেকে পিসেমশাই হাজির। রবিবার। মা বললেন, অন্নপূর্ণা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে রাজভোগ নিয়ে আয় চারটে। কাজের দায়িত্ব খুশিমনেই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল বোমকাই। ও নিশ্চিত জানত, প্লেটের চারটে রাজভোগ খাবেন না পিসেমশাই। বড় জোর দুটো। তারপর তিনি ঘরের চৌকাঠ ডিঙলেই একটা মুখে চালান করে দেবে বোমকাই। কিন্তু সেদিন মিষ্টি নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ তোতনদার মুখোমুখি।
সবাই জানে, তোতনদা বিরাট মস্তান। ইয়া লম্বা, চওড়া বুক, চোখ রক্তবর্ণ। সারা গায়ে মাসল একেবারে ঠেলাঠেলি করছে। যাকে বলে একেবারে পাঠান চেহারা। তোতনদা ডাকল তাকে, অ্যাই শোন এদিকে।
তোতনদা ডেকেছে যখন যেতেই হয়। ভয়ে ভয়ে সামনে গেল বোমকাই।
কী নিয়ে যাচ্ছিস?
বোমকাই ভয়ে ভয়ে বলল, রাজভোগ।
এখন রাজভোগ কে খাবে?
পিসেমশাই।
‘দেখি দেখি’, বলে বোমকাইয়ের হাত থেকে মিষ্টির প্যাকেটটা একরকম ছিনিয়েই নিল তোতনদা। তারপর প্যাকেট খুলে বলল, জয় মা তারা, এ তো এক একটা পেটোর সাইজ। তোর পিসেমশাইয়ের যা চিমড়ে চেহারা, তাতে এ রাজভোগ হজম করতে পারবেন না।
বোমকাই মিউ মিউ করে বলল, আমার পিসেমশাইয়ের মোটেই চিমড়ে চেহারা নয়।
চিমড়ে নয় তো কী হয়েছে! এই রাজভোগ খেলে তিনদিনের মধ্যে চিমড়ে হয়ে যাবেন। তোর পিসেমশাইয়ের ভালোর জন্যেই অবেলায় এই রাজভোগগুলি কষ্ট করে খেতে হচ্ছে আমায়। পিসেমশাইকে বলিস, যেন প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করেন।
শুকনো মুখে বাড়ি ফিরে এসেছিল বোমকাই। বাবা শুনে রেগে অগ্নিশর্মা। পুরোনো একটা ছাতা হাতে বেরিয়ে পড়েছিলেন। বলেছিলেন, শুনেছিলাম বটে, বঙ্কুবাবুর ছেলেটা কিছুদিন হল ত্যাঁদড়ামি শুরু করেছে। আজ ওর একদিন কি আমার একদিন!
শুনে বোমকাইয়ের টেনশন। সম্মুখ সমরে কার জয় হবে? মন বলছে, বাবা, কিন্তু বাস্তব বুদ্ধি বলছে, তোতনদা ছাতার বাঁটে কাবু হবার বান্দা নয়।
যাই হোক, যুদ্ধটা শেষ পর্যন্ত লাগেনি। কিছুক্ষণ পর অক্ষত ছাতা আর নতুন রাজভোগ নিয়ে বাড়ি ফিরলেন বাবা। বাবার দাবি তোতনদা নাকি গলির মুখে দাঁড়িয়ে আঙুল চাটছিল। বাবাকে দেখেই কেমন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
সেদিন থেকেই শপথ নিয়েছে বোমকাই। বড় হয়ে মস্তান হবে। পাড়া কাঁপবে তার নামে। কিন্তু হবে বললেই তো হওয়া যায় না। তার জন্যে মেহনত লাগে। মনবাসনাটা প্রথম প্রকাশ করে জিগরি দোস্ত ছোটকুর কাছে। ছোটকু শুনে প্রথমে তো খুব অবাক। তারপর বলে, মাইরি বলছিস! বোমকাই বলে, নয়তো কী!
ছোটকু বলল, আমার বন্ধু মস্তান হবে, ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। শোন তোকে প্রথমেই একটা কাজ করতে হবে। আমাদের বাড়িওলাটা হেভি শয়তান, মাঝে মাঝে জল বন্ধ করে দেয়, টাইট দিতে হবে ব্যাটাকে।
তবে ছোটকু একটা ফ্যাঁকড়া তুলল। বলল, কিন্তু তোর এই পেঁকুলে চেহারা, এতে হবার নয়। একটু হোমরা চোমরা বডি বানাতে হবে। বডি বানাতে হলে জিম করতে হবে আর ছোলা গুড় খেতে হবে।
ছোটকুর উপদেশ মতো সঙ্ঘশ্রী ব্যায়াম সমিতিতে নাম লেখাল বোমকাই। কিন্তু জিম কপালে সইল না। একদিন বারবেল চাগাতে গিয়ে হাত ফসকে পড়ল পায়ে। থেঁতো হয়ে গেল পায়ের পাতা। একটা আঙুলের হাড় ভাঙল। সুস্থ হতে আড়াই মাস। সেরে ওঠার পর নাক কান মলে বিদায় জানাল জিমকে।
ব্যাপার দেখে ছোটকু বলল, চিন্তা নেই। জিম টিম বাদ দে। মস্তানের আসল শক্তি হল মেশিন। শুনে একটু অবাক হয়ে গেল বোমকাই। মেশিন দিয়ে কীভাবে লোকজনকে চমকানো যাবে! ওই বিশাল জিনিসটা কি ঘাড়ে করে নিয়ে ঘুরতে হবে রাস্তায় রাস্তায়? বিশেষ করে ওটা নিয়ে অলিতে গলিতে কাউকে চেজ করা বেশ চাপের ব্যাপার। তাদের বাড়িতেই একটা সেলাই মেশিন আছে। বহু পুরনো মেশিন। মা মাঝে মাঝে চালান। কিন্তু ওটার মধ্যে ভীতিপ্রদ তো কিছু নেই!
তার অজ্ঞতা দেখে হাসল ছোটকু। বলল, ওরে হাঁদা এ মেশিন সে মেশিন নয়। এ মেশিন থেকে আগুনের গুলি ছোটে। চালাতেও হবে না; কোমরে গোঁজা থাকলেই পাবলিকের হাঁটু কাঁপবে।
বোমকাই বলল, বলিস কী! তুই কি পিস্তল রিভলভারের কথা বলছিস?
ইয়েস।
বোমকাইয়ের পেটের ভেতরটা গুড়গুড় করে উঠল।
আজ বোমকাই অকুতোভয়। কারণ তার হাতে মেশিন। আসল নয় যদিও। কিন্তু দেখতে ডিটো আসলের মতো। সেদিনের সেই ক্লাস সেভেনের বোমকাই আজ বাইশ বছরের যুবক। গ্র্যাজুয়েট হয়ে গেছে অনেকদিন, কিন্তু আজও মস্তান হতে পারেনি। কারণ মেশিন জোগাড় করে ওঠা হয়নি তার। সেদিনের সেই তোতনদা আজ আর মস্তানি করতে পারে না। মস্তানি করবে কী, দাঁড়াতেই পারে না ভালো করে। একবার হনুমানের ভয়ে পাঁচিল থেকে লাফ দিতে গিয়ে কোমরে মারাত্মক চোট পায়। সেই থেকে লাঠি ছাড়া চলতে পারে না। সকাল সন্ধে বাবার মুদির দোকানে বসে হিসেবের খাতা লেখে। তার ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু মস্তান হবার ইচ্ছেটা বুকের মধ্যে ওঁৎ পেতে আছে। শুধু একটা মেশিনের অপেক্ষা। ব্যস, ডান।
মেশিন জোগার করার চেষ্টা যে করেনি বোমকাই তাও নয়। ছোটকু একবার কোথা থেকে খবর আনল, পাড়ায় পাড়ায় যে সব টিনভাঙা লোহাভাঙাওলা আসে, তাদের কেউ কেউ বিক্রির জন্যে সঙ্গে মেশিন রাখে। তক্কে তক্কে থাকতে হবে শুধু। কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলতে হবে—আছে নাকি, ভাই। তেমনই একটা লোকের খোঁজ একদিন পেয়েছিল বোমকাই। সে ‘আসল জিনিস’ দেবে বলে পঁয়ত্রিশ টাকা অ্যাডভান্সও নিয়েছিল। কথা ছিল দু’দিন পর রাত ঠিক ন’টার সময় দক্ষিণ কালীমন্দিরের পিছনে জিনিসটা হস্তান্তর হবে। সন্ধের পর জায়গাটা নির্জন। একটু বুক ডিপ ডিপ করছিল বোমকাইয়ের। কিন্তু একটু পরেই যার হাতে মেশিন উঠে আসবে, যার দাপটে এলাকা কাঁপবে, তার অন্তত সামান্য অন্ধকারকে ভয় পেলে চলে না।
মা কালীর নাম নিয়ে মন্দিরের পিছনে পৌঁছে গেল সে। তিন-চারটে কুকুর আর ঝাঁক ঝাঁক মশা, এ ছাড়া কেউ কোথাও নেই। ঘণ্টাখানেক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মশার কামড় খেল বোমকাই। মেশিনওলার টিকির দেখা নেই। কিন্তু কুকুরগুলোর হঠাৎ কী হল কে জানে, প্রবল রবে প্রতিবাদ শুরু করল। মেশিনের আশা ত্যাগ করে সেদিন চম্পট দিয়েছিল বোমকাই। সেই মেশিনওলার খোঁজ আজও পায়নি সে। মাঝখান থেকে পঁয়ত্রিশ টাকা জলে গেল।
হঠাৎ হাতে চলে এল সেই ব্রহ্মাস্ত্র। গতকাল কানাইগড়ে বন্ধু সুব্রতর বাড়ি গিয়েছিল বোমকাই। ওর ঘরে টেবিলের ওপর পড়ে ছিল অস্ত্রটা। দেখেই চমকে ওঠে বোমকাই। ঠিক এই জিনিসটাই তো খুঁজছে সে। পুলিশ, গোয়েন্দা, গ্যাংস্টারের হাতে এই জিনিসের ছবিই তো দেখে এসেছে এতকাল। সুব্রতর কাছ থেকে জানতে পারল কিছুদিন আগে পাড়ার নাটকে মস্তানের ভূমিকায় অভিনয় করেছিল সে। ওটা সেই জিনিস। সুব্রতর কাছ থেকে জিনিসটা চেয়ে এনেছিল বোমকাই। সুব্রত অবাক হয়ে জিগ্যেস করেছিল, কী করবি তুই! বোমকাই বলেছিল, আমিও পাড়ার নাটকে মস্তানের অভিনয় করছি।
সেই মেশিন নিয়ে আজ বেরিয়েছে বোমকাই। কোমরে গোঁজা। তার ওপর দিয়ে পরেছে জামাটা। দরকার মতো বের করবে। বকুলতলার মোড়ে দেখা হয়ে গেল বিজন হালদারের সঙ্গে। বাজারে বিজন হালদারের কেক পেস্ট্রির দোকান। একবার একটা পচা কেক গছিয়েছিল বোমকাইকে। তখন মেশিন ছিল না বোমকাইয়ের কাছে। তাই ব্যবস্থা নিতে পারেনি। আজ বোমকাইয়ের মনে হল একে দিয়েই শুরু করা যাক। সে সোজা গিয়ে মেশিনটা ঠেকাল বিজন হালদারের ঘাড়ে। চাপা গলায় বলল, নড়াচড়া করলেই গুড়ুম। বিজন হালদার মস্ত একটা হাই তুলে বললেন, আরে খামোকা কাতুকুতু দিচ্ছিস কেন! তারপরেই এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়িয়ে বোমকাইয়ের হাত থেকে কেড়ে নিলেন মেশিনটা। হতভম্ব বোমকাই ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। বিজন হালদার মেশিনটা ছুড়ে মারেন বোমকাইকে। তারপর বলেন, ছোঃ, ছোঃ, ছোঃ, শেষ পর্যন্ত নকল মাল!
মন খারাপ হয়ে যায় বোমকাইয়ের। দেখেই বুঝে গেছে নকল! কী করে হয়! সে তো একটুও বুঝতে পারেনি। তাহলে কি সবাই বুঝে যাবে? কেউ ভয় পাবে না! ভাবতে ভাবতে বাসস্ট্যান্ডে চলে এল বোমকাই। বাসস্ট্যান্ড খুব ফাঁকা আজ। নাকি বাস ধর্মঘট চলছে? ইতি উতি কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। যেন তীর্থের কাক। ট্যাক্সি কি অটো কিছু একটা পেলেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ছে। ইচ্ছেমতো রেট হাঁকছে ড্রাইভারেরা।
দূরে একটা ট্যাক্সি আসতে দেখল বোমকাই। দেখেই প্ল্যানটা মাথায় চলে এল। এগিয়ে গেল ট্যাক্সিটার দিকে। হাত দেখিয়ে দাঁড় করাল ট্যাক্সি। মাঝবয়সি ড্রাইভার বললেন, কোথায় যাবেন? এবার চিন্তায় পরে গেল বোমকাই। এখন কোথায় আর যাবে সে; কোথাও তো যাবার নেই তার। এতদিনের স্বপ্নটা ওই পচা কেকওলা ভেঙে চুরমার করে দিল। ড্রাইভার তাগাদা দিলেন, কী হল, কোথায়! বোমকাইয়ের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, চন্দনপুর। কেন যে ‘চন্দনপুর’ বেরিয়ে এল কে জানে! চন্দনপুর তার মামার বাড়ি। অনেকদিন যাওয়া হয়নি। মা মাঝে-মাঝেই যেতে বলে; কিন্তু যাওয়া হয়ে ওঠে না। যাই হোক, মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে যখন কিছু করার নেই। ড্রাইভার বললেন, পাঁচশো টাকা লাগবে।
পাঁচশো! খুব অবাক হয়ে বোমাকাই বলে, দু’শোর বেশি হতেই পারে না।
ড্রাইভার এবার একটু উগ্রভাবে বলে উঠলেন, না না, রেট এক; উঠতে হয় উঠুন, নাহলে ছাড়ুন।
আর দেরি করে না বোমকাই। মেশিনটা বের করে ড্রাইভারের কপালে ঠেকায়।
‘বাপরে বাপ’ বলে এমন আঁতকে ওঠেন ড্রাইভার যে বেখেয়ালে হর্নে হাত পরে যায়। ভ্যাক ভ্যাক করে দু’বার হর্ন বেজে ওঠে।
বোমকাই চাপা গলায় বলে, খুলি উড়িয়ে দেব কিন্তু।
ড্রাইভার বললেন, স্যার, যাবেন তো ভালো কথা, বসে পড়ুন আর জিনিসটা লুকিয়ে ফেলুন। না হলে, অ্যাকসিডেন্ট হয়ে যাবে। আপনার যা ইচ্ছে দেবেন। না ইচ্ছে হয়, না দেবেন।
ট্যাক্সির পিছনের সিটে গা এলিয়ে বসে পড়ে বোমকাই। মনে ফুরফুরে আনন্দ। যাক, মিশন সাকসেসফুল। কিন্তু দু’শো টাকাই বা দেবে কোথা থেকে। পকেটে গোটা পঁচিশ-তিরিশ টাকা পড়ে আছে। এদিকে কথা হয়েছে দুশো। মস্তান হওয়া যখন হয়ে গেছে তখন চুক্তির টাকাটা দেওয়াই উচিত। যাই হোক, মামার বাড়ি পৌঁছে দিদার কাছ থেকে নিয়ে দিয়ে দেবে। মামার বাড়ি গেলে দিদা তো এমনিতেই টাকা দেয়।
দেখতে দেখতে তালবাগান মোড়ে চলে এসেছে গাড়ি। লম্বামতো একজন মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে হাত দেখাচ্ছেন। বাস বন্ধ বলে ইনিও মনে হয় বেকায়দায় পড়েছেন। বোমকাই গাড়ি থামাতে বলল ড্রাইভারকে। গাড়ি থামতেই লোকটা এগিয়ে এল। বলল, চড়কতলা যাবে?
চন্দনপুর যাবার পথেই চড়কতলা! বোমকাই বলল, উঠে আসুন।
লম্বু বলল, কত?
বোমকাই বলল, যা ইচ্ছা।
লোকটা একটু অবাক চোখে তাকাল বোমকাইয়ের দিকে। তারপর ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে পড়ল।
গাড়ি ছুটল আবার। রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা।
এবার পঞ্চাননতলা মোড়। বোমকাই দেখল একটা ছেলে রাস্তার ধরে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে। বয়েস আন্দাজ পনেরো-ষোলো। তারই পাশে মাটিতে উবু হয়ে বসে পক্ককেশ এক বৃদ্ধ।
বোমকাইয়ের নির্দেশ মতো গাড়ি থামল। ছেলেটি জানাল, ওই বৃদ্ধ তার দাদু; শ্বাসকষ্টে খুব কষ্ট পাচ্ছেন। পাড়ার ডাক্তারবাবু বলেছেন, হাসপাতালে নিয়ে যেতে। কিন্তু এখন দেখছে বাস বন্ধ।
বৃদ্ধ আর নাতিকে তোলা হল গাড়িতে।
সেই লম্বু বলল, আমার তাহলে কী হবে!
বোমকাই বলল, আমরা আগে হাসপাতালে যাব, আপনি এখানে নেমে যেতে পারেন। অথবা আমাদের সঙ্গে যেতে পারেন।
লোকটা একটু বিরক্তির সঙ্গে বলল, দূর বাবা, এতো মহা ফ্যাচাঙে পড়া গেল। আমাকে কিন্তু চড়কতলাতে ঠিক নামিয়ে দিতে হবে।
গাড়ি ছুটল হাসপাতালের দিকে। কিন্তু কিছুটা গিয়েই প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল গাড়ি। কী ব্যাপার, কী ব্যাপার! ড্রাইভার বললেন, দাঁড়ান দেখছি। তারপর কতরকমভাবে চেষ্টা করল ড্রাইভার। কিন্তু কিছুতেই স্টার্ট নিল না গাড়ি। ড্রাইভার মাথা চুলকে বললেন, মনে হচ্ছে, ইঞ্জিনে বড় গোলমাল। মেকানিক ডাকতে হবে।
লম্বু এবার রেগে কাঁই। গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। কী কুক্ষণেই এই গাড়িতে উঠেছি রে বাবা। এর চেয়ে হেঁটে চলে যাওয়া অনেক ভালো।
লাফিয়ে বোমকাই নামল গাড়ি থেকে। সোজা লম্বুর সামনে গিয়ে বলল, আরে যাচ্ছেন কোথায়?
লম্বু বলল, কোথায় আবার, বাড়ি। গাড়ির যা ছিরি আপনাদের। এখন দেখছি হেঁটেই যেতে হবে।
আরে, বাড়ি পরে যাবেন। এখন তো আপনাকে গাড়ি ঠেলতে হবে।
মানে! ভুরু দুটো কুঁচকে ওঠে লম্বুর।
মানে, ওই দাদু খুব কষ্ট পাচ্ছেন। এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু গাড়ি তো খারাপ। তাই গাড়ি ঠেলতে হবে। আপনি ঠেলবেন, আমি ঠেলব, নাতিও ঠেলবে। দাদু থাকবেন গাড়ির ভেতর, আর ড্রাইভার ধরে থাকবে স্টিয়ারিং। ঠিক আছে?
লম্বু বেশ জোরেই বলে উঠল, ইয়ার্কি নাকি; আমি গাড়ি ঠেলতে পারব না।
বোমকাই চকিতে জিনিসটা বের করে লম্বুর কপালে ঠেকায়। বলে, আমার নাম বোমকাই; আমার নামে বোম আর, হাতে মেশিন। দশ গুনব। ওয়ান-টু-থ্রি...
লম্বু বলে উঠল, আরে গাড়ি ঠেলা নিয়ে কথা! কী আর এমন; কত ঠেলেছি! চলো, চলো, আর হাতের যন্তরখানা সরাও তো ভাই কপাল থেকে।
প্রবল আনন্দে বাতাসে একটা গুলি ছুড়তে যাচ্ছিল বোমকাই। তারপরে মনে হল, ইস, কেলেংকারি করেছিল আর কী!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন