বিশ্বনাথবাবুর ছাতা

উল্লাস মল্লিক

ছত্রপতি গোলদারকে দেখেই ভিড়ের মধ্যে গা ঢাকা দিলেন বিশ্বনাথবাবু। ছত্রপতি গোলদারের ছাতার দোকান। বাজারে ব্যাঙ্কের পাশে ‘ছাতা-মাথা’ নামে যে দোকানটা আছে সেটার মালিক ছত্রপতিবাবু। ইদানীং ওঁকে দেখলেই লুকিয়ে পড়ছেন বিশ্বনাথবাবু। ব্যাপারটা এমন নয় যে ‘ছাতা-মাথা’ থেকে ধার বাকিতে ছাতা কিনেছেন তিনি। ওঁর কাছে যতবারই ছাতা কিনেছেন, পাই-পয়সা চুকিয়ে দিয়েছেন। ‘পেইড’ স্ট্যাম্প দেওয়া সেই সব ক্যাশমেমো বেশ গুছিয়ে রাখা আছে। এমনকী এখন বিশ্বনাথবাবুর হাতে যে ছাতা, সেটারও পাই-পয়সা মিটিয়ে দিয়েছেন তিনি। তবুও ছত্রপতিবাবুকে দেখেই লুকিয়ে পড়তে হচ্ছে তাঁকে।

ব্যাপার হল, বিশ্বনাথবাবু খুব ছাতা হারান। সব দেশে সব কালেই মানুষ ছাতা হারায়। এটা আশ্চর্যের কোনও বিষয়ই নয়। শোনা যায়, কোন এক দেশে এক ছাতায় দু’বছর কাটানো ব্যক্তিকে পুরস্কার দিত সরকার। কিন্তু বেশ ক’বছর সেই পুরস্কারের দাবিদার পাওয়া যাচ্ছে না। অবশ্য বিশ্বনাথবাবুর ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। ছাতা হারানোতে ক্লান্তি নেই তার। ওর দুটো রেকর্ড আছে যেগুলো অনায়াসেই গিনেস-বুক অফ রেকর্ডসে জায়গা করে নিতে পারে। এক নম্বর, উনি একদিনে দুটো ছাতা হারিয়েছিলেন একবার। সকালে বাজার করতে গিয়ে প্রথম ছাতাটা হারালেন। ফেরার পথে ‘ছাতা-মাথা’ থেকে নতুন ছাতা কিনলেন একটা। সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফেরার পথে সেটিও হারালেন। হয়তো হ্যাটট্রিকও হয়ে যেত; কিন্তু ততক্ষণে ‘ছাতা-মাথা’ বন্ধ হয়ে গেছে। তবে আফসোস মিটে গেল কিছুদিন পরেই। কদমতলার টুকটুকিদি আর জামাইবাবু এসেছিলেন বাড়িতে। যাবার সময় ছাতা ফেলে গেলেন। পরের দিন দুটো ছাতা নিয়ে বেরিয়েছিলেন বিশ্বনাথবাবু। সঙ্গে নিজের ছাতা। অফিস ফেরতা দিয়ে আসবেন দিদিরবাড়ি। কিন্তু ভিড় বাসে তিনটেই চোট হয়ে গেল।

ছাতা আজ থেকে হারাচ্ছেন না বিশ্বনাথবাবু। উনি একটা জিনিস লক্ষ করেছেন ছাতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে ওর ভাগ্যও খুলে যায়। মানে যেদিনই ছাতা হারান সেদিনই তার জীবনে ভালো একটা কিছু ঘটে। প্রথম যে দিনটা স্মরণ করতে পারেন সেটা হল মাধ্যমিকের টেস্ট পরীক্ষার রেজাল্টের দিন। অসুখ থেকে উঠেই পরীক্ষায় বসেছিলেন বিশ্বনাথবাবু। তাই আশঙ্কা ছিল মনে। হয়তো অ্যালাও হবেন না। সেদিন সকালে বাজার করতে গিয়ে ছাতা হারাল তাঁর। বাড়িতে বকুনি খেলেন। মন খারাপ নিয়েই রেজাল্ট জানতে গিয়েছিলেন তিনি। গিয়ে দেখলেন, ভালোভাবে উতরে গেছেন।

তার পরের ঘটনাটা ঘটল কলেজে ভর্তির দিন। ভেবেছিলেন অনার্সে চান্স পাবেন না। কলেজে যাওয়ার পথে বাসে ছাতা হারাল। কিন্তু কলেজে গিয়ে দেখলেন, ফার্স্ট লিস্টেই নাম।

তিন নম্বরটা তো আরও রোমহর্ষক। তখন বেকার জীবন। ইতিউতি চাকরির দরখাস্ত ছাড়ছেন। কয়েকটা ইন্টারভিউও দিয়েছেন। কিন্তু আশার আলো চোখে পড়ছে না কিছু। বিকেলে খেলা দেখতে মাঠে গিয়েছিলেন। সেখানেই হারালেন ছাতাটা। মন বলছিল কিছু একটা হবে আজ। হবেই হবে। বাড়ি ফিরে দেখলেন চাকরির নিয়োগপত্র এসেছে। ব্যস, আর কোনও সন্দেহ রইল না বিশ্বনাথবাবুর। ছাতা হারানোর সঙ্গে সৌভাগ্যের যোগ স্পষ্ট।

একবার অফিসের একটা ফাইলে অনিচ্ছাকৃত একটা ভুল করে ফেলেছিলেন। কর্তৃপক্ষের নজরে আসে সেটা। সেই ভুল পরীক্ষা করতে গিয়ে বিরাট একটা চুরির হদিস পেয়ে যান তারা। বিশ্বনাথবাবুর বেতন বৃদ্ধি হয়েছিল। বলা বাহুল্য সেদিনও ছাতা হারিয়েছিল তার।

মায়ের হাঁটুর ব্যথা সারছিল না কিছুতেই। অফিসের শান্তনুদা একটা কবিরাজি তেলের কথা বলেছিলেন। বকুলপুর বলে একটা গ্রামে এক কবিরাজমশাইয়ের তেল। বাস ট্রেন ভ্যানরিকশা ঠেঙিয়ে বকুলপুরে সেই কবিরাজের বাড়ি গিয়েছিলেন বিশ্বনাথবাবু। ফেরার পথে ট্রেনে ছাতা খোয়া যায় তাঁর। তখনই তিনি বুঝে যান, এই ওষুধে কাজ হবেই! মা, আজও, এই বয়েসেও, তরতর করে সিঁড়ি ভেঙে তিনতলায় উঠে যান।

তাই ছাতা হারালে এক প্রকার আনন্দই হয় তাঁর। রাতের ঘুম আরও গভীর হয়। জানে সৌভাগ্য উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে; এল বলে। ফলে ছাতা হারালে উনি এতটুকু উদ্বিগ্ন হন না। বরং খুশি হন। খুশি মনেই নতুন একটা ছাতা কিনে নেন ছত্রপতি গোলদারের ‘ছাতা-মাথা’ থেকে।

এখন ছত্রপতিবাবুর সঙ্গে বিশ্বনাথবাবুর বেশ একটা হৃদ্যতা হয়ে গেছে। দোকানে পা দিলেই হাসিমুখে বলেন, আরে আসুন আসুন; কতদিন পর আমার দোকানে আপনার পায়ের ধুলো পড়ল। আপনারাই হচ্ছেন আমার লক্ষ্মী। প্রতিবার নতুন ছাতা আর ক্যাশমেমো বিশ্বনাথবাবুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে ছত্রপতিবাবু বলেন, আবার আসবেন। দোকানের হালখাতার নেমন্তন্ন তো বিশ্বনাথবাবু পানই, এমনকী ছত্রপতিবাবুর পঞ্চদশ বিবাহ বার্ষিকীতে গুটিকতক নিমন্ত্রিতের মধ্যে বিশ্বনাথবাবু ছিলেন অন্যতম। কিছুদিনের মধ্যে দুই পরিবারের ঘনিষ্ঠতা এমন জায়গায় গেল যে এক সঙ্গে পুরী ভ্রমণও হল। ছত্রপতিবাবু মাঝে মাঝে ফোন করেন বিশ্বনাথবাবুকে। কথাবার্তা অনেকটা এইরকম হয়।

হ্যালো, বিশ্বনাথবাবু...

আরে ছত্রপতিবাবু যে, কী খবর?

এই চলে যাচ্ছে দাদা, গিন্নির নাকের ওপর একটা ফুসকুড়ি হয়েছিল, সেটা নিয়ে একটু ঝামেলা গেল; এখন অবশ্য ঠিক আছে; আপনার খবর বলুন।

আমি দাদা একটু প্রবলেমে আছি।

কী সর্বনাশ হল।

অফিসে নতুন যে সাহেব এসেছেন, বহুত ঢ্যাঁটা। এক মিনিট লেট হলেই হম্বিতম্বি করছেন, ছুটির ঠিক আগে বড় কাজ ধরিয়ে দিচ্ছেন। বাড়ি ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে।

তাই নাকি, তাহলে খুবই তো চিন্তার বিষয়। হ্যাঁ, একটা কথা বলছিলাম, লাস্ট যে ছাতাটা নিয়ে গেলেন, সেটাই চলছে তো?

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বিশ্বনাথবাবু। হ্যাঁ সেটাই তো চলছে।

মাস খানেক তো হয়ে গেল প্রায়।

সে তো হলই।

আসলে নতুন একলট ছাতা এসেছে। এমআরপি’র ওপর থার্টি পারসেন্ট স্পেশাল ডিসকাউন্ট। চলবে আরও পনের দিন। আপনাকে জানিয়ে রাখলাম। এর মধ্যে যদি ঠাকুরের দয়ায় আপনার পুরনো ছাতাটার একটা ব্যবস্থা হয়ে যায় তাহলে আপনি সুযোগটা নিতে পারবেন।

আরে দাদা, আমিও তো ঠাকুরকে ডাকছি। মা ভৈরবীর মন্দিরে একটা পুজো দেব ভাবছি।

বিশ্বনাথবাবু তো ঠাকুরকে ডাকবেনই। পুজো দেওয়ার কথাও ভাববেন। কারণ উঁনি জানেন, ছাতাটা হারালেই নতুন সাহেব বদলি হয়ে যাবেন।

ঘটনাটা ঘটল মাস তিনেক আগে। অসুস্থ পিসিমাকে দেখতে বৈদ্যবাটী গিয়েছিলেন বিশ্বনাথবাবু। ফেরার পথে ছাতা হারালেন। বাড়ি পৌঁছে পিসতুতো দাদা গোবিন্দদার ফোন পেলেন। পিসিমার বিভিন্ন টেস্টের রিপোর্ট একটু আগে এসেছে। সব নরমাল। এমনটাই যে হতে চলেছে, সেটা ছাতা হারানোর পরেই বুঝতে পেরেছিলেন বিশ্বনাথবাবু।

যাই হোক, পরদিনই, ‘ছাতা মাথা’-তে চলে গেলেন তিনি। বিশ্বনাথবাবুকে দেখে আকর্ণ হাসলেন ছত্রপতিবাবু। বললেন, আসুন আসুন, দারুণ সময়ে এসে পড়েছেন; ভাবছিলাম আপনার কথা।

বিশ্বনাথবাবু বললেন, কেন অফারের মাল আছে?

ছত্রপতিবাবু বললেন, না না, স্পেশাল ডিসকাউন্টের মাল এখন নেই; কিন্তু ক’দিন আগেই নতুন একলট মাল এসেছে। ছাতাগুলো খুব অদ্ভুত। কী গুনতুক করা আছে কে জানে, যারাই কিনছে দু’একদিনের মধ্যে হারিয়ে ফেলছে। আমি তো মশাই মনে মনে একটা নামও দিয়েছি এই ছাতার। ‘ব্যাকুল-হারা’ ছাতা। মানে, হারিয়ে যেতে ব্যাকুল। একেবারে আপনার উপযুক্ত ছাতা।

শুনে ভারি আনন্দ হল বিশ্বনাথবাবুর। আজ সকালেই একটা বিচ্ছিরি ঘটনা ঘটে গেছে। সকালে ব্রাশ করছিলেন যখন, হঠাৎ বাড়িওয়ালা হাজির। খুব গম্ভীর গলায় বললেন যে বাড়িটা ছেড়ে দিতে হবে। শুনে বেশ অবাক হয়ে গেলেন বিশ্বনাথবাবু। জন্মাবধি এই বাড়িতে ভাড়া আছেন তাঁরা। দোতলা বাড়ি। একতলায় তাঁরা থাকেন; দোতলায় বাড়িওয়ালা। চুক্তি অনুযায়ী বছর বছর ভাড়াও বাড়ে। দুটো পরিবারের সম্পর্কও বেশ ভালো। শুক্তো বিউলির ডাল আদান প্রদান হয়। তাই আজ তাঁর এ হেন ব্যবহারে বেশ অবাক হয়ে গেলেন বিশ্বনাথবাবু।

যাই হোক, এখন এই ‘ব্যাকুল-হারা’ ছাতার কথা শুনে একটু স্বস্তি পেলেন বিশ্বনাথবাবু। এই ছাতা নাকি কারও কাছেই দুদিনের বেশি টিকছে না। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, বাড়িওলার সমস্যা দু’দিনের মধ্যেই মিটে যাবে।

নীল রঙের একটা ছাতা নিয়ে বিশ্বনাথবাবুর হাতে দিলেন ছত্রপতিবাবু। বললেন, এই সেই ছাতা। ছাতাটা হাতে নিয়ে দেখলেন বিশ্বনাথবাবু। বেশ ছাতা। কাপড়টা ভালো। হ্যান্ডেলেও কারুকাজ। সবচেয়ে বড় কথা এর নাকি উড়ু উড়ু মন। ছাতা কিনে খুশি মনে বাড়ি ফিরলেন বিশ্বনাথবাবু। ফেরার পথে জোড়া কলতলার মোড়ে দেখা হল বাড়িওলা ধনগোপালবাবুর সঙ্গে। অন্য দিন হলে হাসেন ধনগোপালবাবু। আজ মুখ ফিরিয়ে নিলেন। বিশ্বনাথবাবু মনে মনে বললেন, কতদিন আর মুখ ফিরিয়ে নেবেন, হাসতে আপনাকে হবেই। আপনার হাসির ব্রহ্মাস্ত্র আমার হাতে, তে-রাত্তির পোহাবে না, এই ‘ব্যাকুল হারা’ নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে; তখন না হেসে আপনি যাবেন কোথায়।

কিন্তু, তার পরেই শুরু হল বিপত্তি। একদিন যায়, দু’দিন যায়, তিনদিন যায়, ছাতা হারায় না। দেখতে দেখতে দশ দিন হয়ে গেল। এর মধ্যে একদিন ধনগোপালবাবুর ছেলে গোবিন্দ দলবল নিয়ে শাসিয়ে গেছে। বিশ্বনাথবাবু জানেন শুধু ছাতা হারানোর অপেক্ষা। এই গোবিন্দই সেদিন হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে যাবে।

পরদিন সকালে বাজারে দেখা হল ছত্রপতিবাবুর সঙ্গে। তখন বিশ্বনাথবাবুর হাতে ছাতা। ছত্রপতিবাবু একটু অবাক চোখে ছাতাটার দিকে তাকিয়ে বললেন, সেই ছাতাটাই তো?

বিশ্বনাথবাবু বললেন, হ্যাঁ, সেটাই।

ছত্রপতিবাবু বললেন, এখনও চলছে!

বিশ্বনাথবাবু একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, হ্যাঁ, দেখুন না, কী সমস্যাতেই যে পড়েছি!

কত দিন হল কিনেছেন?

খুব অপরাধীর মতো গলা করে বিশ্বনাথবাবু বললেন, তা ধরুন দশ দিন।

দশ দিন! প্রায় আঁতকে উঠে ছত্রপতিবাবু বললেন, আপনি তো মশাই রেকর্ড করে বসে আছেন।

রেকর্ড!

হ্যাঁ, রেকর্ড। ছত্রপতিবাবু বললেন, এই লটের ছাতা যারা কিনেছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশিদিন চলেছে ঝাঁপড়দহ রথতলার এক ভদ্রলোকের। ন’দিন। কিন্তু আপনি ইতিমধ্যেই তাকে ছাড়িয়ে গেছেন; এখন কোথায় থামবেন কে জানে! এদিকে আমি তো রোজই ভাবছি, আজ এলেন, আজ এলেন...

বিশ্বনাথবাবু বললেন, সত্যিই খুবই লজ্জার ব্যাপার; কিন্তু কী করব বলুন!

ছত্রপতিবাবু বললেন, ‘কী করব বলুন বলে’, হাত গুটিয়ে বসে থাকলে তো হবে না, একটু উঠে পড়ে লাগুন।

বিশ্বনাথবাবু বললেন, সে তো বটেই, লাগতেই হবে।

কীভাবে উঠে পড়ে লাগতে হয় জানা নেই বিশ্বনাথবাবুর। তবু মনে হল কথাটা বললে বুঝি একটু সান্ত্বনা পাবেন ছত্রপতিবাবু।

আবার ক’দিন পর ব্যাঙ্কে দেখা ছত্রপতিবাবুর সঙ্গে। বিশ্বনাথবাবুর সেদিন মন খুব খারাপ। বাড়িওলা ওপর থেকে আবর্জনা ফেলছেন। ছত্রপতিবাবু ভুরু কুঁচকে বিশ্বনাথবাবুর ছাতাটার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, আজ পনেরো দিন।

বিশ্বনাথবাবু বললেন, কীসের পনেরো দিন!

ছত্রপতিবাবু বললেন, আপনার ছাতা কেনার।

আবারও ভীষণ সংকুচিত হয়ে পড়লেন বিশ্বনাথবাবু। লজ্জায় মুখ তুলে তাকাতে পারছিলেন না।

ছত্রপতি বললেন, আপনার রেকর্ড তো মশাই সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে।

লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছিল বিশ্বনাথবাবুর। এ কলঙ্ক নিয়ে বাঁচবেন কী করে!

হঠাৎ ছত্রপতিবাবু বললেন, একবার দিন তো আপনার ছাতাটা। সেই লটেরই ছাতা তো; নাকি ভুল করে অন্য লটের ছাতা দিয়ে দিয়েছি।

বিশ্বনাথবাবুর কাছ থেকে ছাতাটা নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন ছত্রপতিবাবু। খুললেনও একবার। পাশের লোক শিকের খোঁচা খেয়ে খিঁচিয়ে উঠলেন। পরোয়া না করে ছাতাটা ভালো করে শুঁকলেন ছত্রপতিবাবু। এতদিন পর্যন্ত লোকজনকে সাবান, ঘি, আম এ সবই শুঁকতে দেখেছেন বিশ্বনাথবাবু। আজ প্রথম একজনকে ছাতা শুঁকতে দেখলেন। ছাতাটা বিশ্বনাথবাবুকে ফিরিয়ে দিয়ে ছত্রপতিবাবু বললেন, ঠিকই তো আছে; একই লটের মাল। কিন্তু আপনার কী হল বলুন তো। ফর্ম তো বিরাট কোহলির থেকেও খারাপ।

বিশ্বনাথবাবু আন্তরিকভাবে চাইছিলেন, ধরণী দ্বিধা হও; পাতালে আত্মগোপন করি। যেভাবে প্রার্থনা করছিলেন তাতে হয় তো ব্যাঙ্কের মেঝে ফেটে দু’ভাগ হয়ে যেত। কিন্তু কাউন্টার থেকে ডাক এল বলে জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হল তাকে।

তারপর থেকে ছত্রপতিবাবুকে দেখলেই লুকিয়ে পড়ছেন বিশ্বনাথবাবু। আজ যেমন বাজারে বাটা মাছের দরদাম করছিলেন। ঠিক তখনই দেখলেন, ছত্রপতিবাবু এগিয়ে আসছেন। বাটা মাছ ছেড়ে ভিড়ে গা ঢাকা দিলেন বিশ্বনাথবাবু। কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন, ছত্রপতিবাবু ভিড়ের মধ্যে খুঁজছেন তাঁকে। এভাবে বেশিক্ষণ লুকিয়ে থাকা যাবে না। তাই তিনি বাজার ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলেন। একটু আবজল পাবার জন্যে ছাতা খুললেন ছত্রপতিবাবুও রাস্তায়। রাস্তা দিয়ে হন হন করে হাঁটতে লাগলেন বিশ্বনাথবাবু। এক হাতে মাছের ব্যাগ, অন্য হাতে খোলা ছাতা। কিন্তু পিছন পিছন ছত্রপতিবাবুও আসছেন। জোরে হেঁটে আসছেন ছত্রপতিবাবু। তিনি পাল্লা দিতে পারছেন না। দৌড় দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। ছাতা মাথায় দৌড় অসম্ভব। তাই ছাতা মুড়ে দৌড়াতে লাগলেন বিশ্বনাথবাবু।

একটু পরে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলেন ছত্রপতিবাবুও দৌড়ে আসছেন। গতি আরও বাড়াবার চেষ্টা করলেন বিশ্বনাথবাবু। গলা শুকিয়ে কাঠ। দু’দিন আগে বাড়িওলা জল বন্ধ করে দিয়েছেন। গত দু’দিন চান হয়নি। পাড়ার কল থেকে কোনওরকমে একটু জল এনে কাজ চালাচ্ছেন। ছুটতে ছুটতে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়লেন বিশ্বনাথবাবু। ব্যাগ আর ছাতা ছিটকে পড়ল। তখনই ছাতাটা নিয়ে দৌড় দিল বছর কুড়ির একটা ছেলে। মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল গলির মধ্যে।

ছত্রপতিবাবুও দৌড়ে এসে তুললেন বিশ্বনাথবাবুকে। জামা প্যান্টে ধুলো। কয়েক জায়গায় ছড়ে-কেটে গেছে। চোখে জল।

ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে ছত্রপতিবাবু বললেন, আরে মশাই অমন দৌড়াচ্ছিলেন কেন!

ধরা গলায় বিশ্বনাথবাবু বললেন, আমাকে ক্ষমা করুন।

ক্ষমা; কীসের ক্ষমা!

এখনও হারায়নি। আমি আপনার কাছে মুখ দেখাতে পারছি না লজ্জায়।

ছত্রপতিবাবু একটু হেসে বললেন, এখন তো হারিয়েছে।

বিশ্বনাথবাবু বললেন, মানে?

মানে, আপনার ছাতা চুরি হয়ে গেছে।

তাই নাকি! বলে, এদিক ওদিক তাকালেন বিশ্বনাথবাবু।

হ্যাঁ, আপনার হাত থেকে ছিটকে পড়তেই একটা ছেলে নিয়ে পালাল। আপনি একুশ দিনের রেকর্ড করেছেন।

বিশ্বনাথবাবু বললেন, খুবই লজ্জার রেকর্ড।

ছত্রপতিবাবু বললেন, ছাতা-টাতা ছাড়ুন তো মশাই; আমি আপনাকে খুঁজছিলাম অন্য একটা কারণে। সামনে রবিবার আমার বড় মেয়ের জন্মদিন। আপনাকে কিন্তু আসতেই হবে।

বিশ্বনাথবাবু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। তার আগেই ফোনে রিং। গিন্নি। ফোন ধরতেই গিন্নি বলে উঠলেন, কখন মাছ আনবে, আর কখন রান্না হবে শুনি!

বিশ্বনাথবাবু বললেন, এই তো যাচ্ছি।

আর একটা কথা; বাড়িওলার কী সুমতি হয়েছে কে জানে, আবার জলের কানেকশন দিয়ে দিয়েছে।

বিশ্বনাথবাবু একটু হেসে বললেন, জানি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%