উল্লাস মল্লিক

জয়চণ্ডীতলা মোড়ে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই বিজুবাবু টের পেলেন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। রাত দশটা হবে। বিজুবাবু ঘড়ি পরেন না। ঘড়ি এক ধরনের ফ্যাশন বই তো নয়। যে সময়কে বাঁধতে পারবি না তোরা, সেই জিনিসকে মেপে কী লাভ! যে বয়ে যাচ্ছে তাকে যেতে দাও তার মতো। বাইরে বের হলে যদি খুব দরকার পড়ে তখন ঘড়িওলা কোনও লোকের কাছ থেকে সময় জেনে নেন। ওতেই দিব্যি কাজ চলে যায়। তাই ঘড়ি কিনে অর্থের অপচয় করেননি বিজুবাবু। ঘণ্টাখানেক আগে পাঁচ-পাড়ার মোড়ে একটা মিষ্টির দোকানে সময় দেখেছিলেন তিনি। ন’টা দশ। সেই হিসেবে এখন দশটা হবে।
বিজুবাবু গভীর চিন্তাভাবনা আর হিসাব নিকেশ করে দেখেছেন যে, একটু চেষ্টা করলে জীবন থেকে আরও অনেক কিছুই ছেঁটে ফেলা যায়। তাতে জীবন হালকা হয় আর খরচও কমে। এর জন্য লোকে আড়ালে তাকে কিপ্পুস বলে। কেউ তার বাড়ি খোঁজ করলে পালটা জিগ্যেস করে, কোন বিজু, কিপটে বিজু? এতে অবশ্য কিছু যায় আসে না বিজুবাবুর। কাউকে কিছু একটা নামে ডাকলেই সে সেটা হয়ে যায় না। এই যেমন দাস পাড়ার হারাধন দাস। সে বেচারি একটু বেশি খায়দায় বলে লোকজন তার নাম দিয়েছে হাতি। হাতি হারাধন। তা সেই জন্যে তো তার লেজ শুঁড় গজিয়ে যায়নি।
লোকজন যা বলার বলবে, তোমার কাজ তুমি মন দিয়ে করে যাবে। যেমনটি করেছিলেন আমাদের মহাপুরুষরা। রামমোহন বিদ্যাসাগর! তাঁরা যদি লোকজনের কথায় চলতেন তাহলে কোনও কাজই করতে পারতেন না। তাই যেটা নিজে ভালো মনে করবে, সেটাই করবে।
এই যেমন ধরা যাক জুতো। জীবনে চটি বা জুতোর খুব বেশি প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না তার। ফালতু দেখনদারি। জুতো আবিষ্কারের আগে কি মানুষ বেঁচে ছিল না! দিব্যি ছিল। কোনও এক বখাটে লোকের মাথায় হঠাৎ কী বাই চাপল সে জুতো আবিষ্কার করে বসল। ব্যস, অমনি চারদিকে ‘জুতো জুতো’ রব। সবাইকে জুতো পরতেই হবে। ব্যাপারটা কালে কালে এমন দাঁড়াল যে এখন এক-এক জনের পাঁচ সাত, এমনকী কুড়ি-পঁচিশ জোড়া পর্যন্ত জুতো।
তারপর জামা কাপড়। এক জোড়া ধুতি আর সুতির এক জোড়া পাঞ্জাবিতে দিব্যি চলে যায় তার। খুব নোংরা না হলে কাচাকাচির ঝামেলায় যান না। ছিঁড়েটিড়ে গেলে নিজেই সেলাই রিফু করে নেন। সুচ আর সুতো পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ধার করে আনেন। এখন প্রতিবেশীরা নানান রঙের সুতো দেন প্রতিবার। সেলাই তাপ্পি পড়ে নানা রঙের। সেলাইয়ের পাশে সেলাই, তাপ্পির ওপর তাপ্পি। দেখে মনে হবে, কী জমকালো জামা! একেবারে রাজরাজড়ার মতো।
একদিন একটা ভিখারি ভিক্ষে চাইছিল তার কাছ থেকে। জ্ঞান হওয়া ইস্তক কাউকে একটা পয়সা ভিক্ষে দিয়েছেন বলে তো মনে পড়ে না তাঁর। সেদিনও যথারীতি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ভিখারিকে। সে যাবার সময় বলে গেল, এমন দামি জামা পরেছেন আর দুটো পয়সা ভিক্ষে দিতে পারছেন না!
তারপর ছাতা। যে দেশে আড়াই মাস বর্ষাকাল সে দেশে ছাতার কী প্রয়োজন! বিশেষত এখনও যখন এদিক-ওদিক কিছু কলা গাছ কচু পাতা চোখে পড়ে। একটা পাতা ছিঁড়ে নিলেই তো হল। তারপর চারপাশে কিছু দয়ালু ছাতাওলাও দেখা যায়। যেখানে কলা বা কচু পাতা মেলে না, সেখানে ‘ছাতাওলা’ ধরতে হয়। ও দাদা, ও কাকা, ও ভাইপো, কোনদিকে যাবে গো! ছাতাটা বাড়িতে ফেলে এসেছি। একটু এগিয়ে দেবে নাকি! তো, কেউ না কেউ রাজি হয়েই যায়। আর একবার ছাতার তলায় ঢুকতে পারলেই হল। একটু একটু করে ছাতার দখল কী করে নিতে হয় বিজুবাবু সেটা ভালোই জানেন। কিছুক্ষণ পরে দেখা যায় বিজুবাবুর হাতে ছাতার বাঁট, বিজুবাবু মাঝখানে আর ছাতার প্রকৃত মালিকের শরীরের অর্ধেকটা ছাতার বাইরে। আর বিজুবাবু মাঝেমাঝেই বলছেন, ভিজছেন না তো। শরীরে একটু আধটু জল লাগলে ক্ষতি নেই, কিন্তু মাথা না ভেজে।
সেই দয়ালু ছাতাওলা ভদ্রতা করে বলেন, না না, আমি ঠিক আছি, আপনি ঠিক আছেন তো?
বিজুবাবু একটু লজ্জা লজ্জা গলায় বলেন, হ্যাঁ-হ্যাঁ, ঠিকই আছি; আসলে একটা ছাতার তলায় মিলেমিশে পথ চলাই তো আমাদের সংস্কৃতি। কথায় আছে—যদি হও সুজন, তেঁতুল পাতায় ন’জন। ছোট্ট একটা তেঁতুল পাতায় যদি ন’জন হতে পারে, এত বড় ছাতায় দু’জন কোনও ব্যাপারই নয়। ঠিক কিনা বলুন আপনি?
এমন পরিস্থিতিতে সায় দেওয়া ছাড়া আর কিছু উপায় থাকে না ছাতাওলার। এইভাবেই বিজুবাবু বাড়ি পৌঁছে যান।
কিন্তু আজ ব্যাপারটা একটু জটিল হয়ে পড়ল। জয়চণ্ডীতলা মোড় ঘুটঘুট্টাই অন্ধকার। এখানে কিছু ছোটখাটো দোকান আছে বটে, কিন্তু সন্ধের পরে পরেই সবাই দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরে যায়। আসলে এদিকে লোক চলাচল কম। সন্ধের পর এমনিতেই বিক্রিবাটা খুব একটা হয় না। বৃষ্টি ক্রমশ তেজ বাড়াচ্ছে। কার্তিকের শেষ। কিছুদিন হল বাতাসে একটা শীত শীত ভাব। এই ঠান্ডায় বৃষ্টির জলে ভিজলে জ্বর সর্দি এমনকী নিমোনিয়া পর্যন্ত হতে পারে। আর অসুখ মানেই ডাক্তার, গুচ্ছের ওষুধ। এককাঁড়ি পয়সা খরচ।
একবার নিমোনিয়া হয়েছিল তার। এমনই অসময়ের বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর এল প্রথমে। গা-হাতপায়ে ব্যথা, মাথা টনটন। বিজুবাবু ভেবেছিলেন, দু’একদিন ঠিক করে খাওয়া দাওয়া করলে এমনিতেই সেরে যাবে। কিন্তু কোথায় কী! সঙ্গে শুরু হল হাঁপটান। বিজুবাবু একেবারে নেতিয়ে পড়লেন। চোখে অন্ধকার। কতক্ষণ বা কতদিন আচ্ছন্ন হয়ে ছিলেন জানেন না বিজুবাবু। তো পাড়ার লোক গদাধর ডাক্তারকে ডেকে এনে চিকিৎসা করিয়েছিল। তিনি সুস্থ হলেন বটে কিন্তু ডাক্তার ফিজ চেয়ে বসলেন। বিজুবাবু বুঝলেন, এসব পাড়ার লোকের শয়তানি। তার যাতে কিছু পয়সা গলে যায়, সেই ব্যবস্থা করেছে। তিনি বললেন, আমি টাকা দেব কেন! আমি তো আপনাকে ডাকিনি। কাউকে ডাকতেও বলিনি। যারা ডেকেছে তাদের বলুন।
প্রতিবেশীদের ডাকা হল। দেখা গেল, প্রতিবেশীদের মধ্যে কেউই ঘটনাটা স্মরণ করতে পারছেন না। হঠাৎ তারই মধ্যে ফেলু সাহা গদাধর ডাক্তারকে বলে উঠলেন, ডাক্তারবাবু, আমি তো আপনার কাছ থেকে টাকা পাই, কুড়ি টাকা। ডাক্তারবাবু একটু অবাক হয়ে বললেন, তুমি আমার কাছ থেকে কীভাবে টাকা পাও?
ফেলু সাহা বললেন, সেই যে গেল মাসে পেট ব্যথায় কাউকে না পেয়ে আপনার কাছে গেলুম, আপনি ওষুধ দিলেন। তিরিশ টাকা ফিজ। আমার কাছে তখন একটা পঞ্চাশ টাকার নোট। আমি দিলাম আপনাকে। আপনি বললেন, খুচরো নেই, পরে নিয়ে যেও। আমার পেটের ব্যথায় তখন মাথা-পাগল দশা। তাই চুপচাপ বাড়ি চলে গেলাম। তার পর তো তিন চারদিন গেলাম। হয় আপনি নেই, আর নয় আপনি আছেন, কিন্তু খুচরো নেই। অসুখ তো সারলই না, টাকাটাও গেল। আজ আপনাকে পেয়েছি, খুচরো দিয়ে তারপর কথা।
গদাধর ডাক্তার বললেন, ডাক্তার কি সবসময় পকেটে খুচরো নিয়ে ঘোরে; দাঁড়াও, বাড়ি থেকে খুচরো নিয়ে আসছি।
গদাধর ডাক্তার সেই যে কাটলেন আর ফিরলেন না। পাড়া-প্রতিবেশীরা সব একে একে চলে গেলেন। যাবার সময় সকলেই মত প্রকাশ করলেন, ডাক্তারদের উচিত পকেটে খুচরো নিয়ে চিকিৎসা করা।
চকাং করে একবার বিদ্যুৎ চমকাল। সেই আলোয় দ্রুত একবার চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিলেন বিজুবাবু। খুবই চেনা জায়গা তার। আশপাশে কচুবন বা কলাবাগান কিছুই নেই। তবু ওই যে লোকে বলে, আশার ওপর আশা; অনেকটা তেমনই আর কী!
কড়াৎ করে বাজ পড়ল একটা। আরও একটু ঝেঁপে এল বৃষ্টি। আশপাশে দাঁড়াবার মতো কোনও জায়গা নেই। থাকার মধ্যে আছে একটা নিমগাছ। বিশাল মোটা গুঁড়ি তার। কত বয়েস কেউ জানে না। ওটার নিচে দাঁড়ানো যেতে পারে। কিন্তু বৃষ্টি বেশিক্ষণ চললে ওখানেও দাঁড়িয়েও ভিজতে হবে।
তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে গাছের নিচে চলে এলেন বিজুবাবু। গাছের ওপর কিছু একটা ঝটপট করে উঠল। পাখিটাখি হবে। বৃষ্টিতে সবাই আশ্রয় খুঁজছে।
আবার একটা বাজ পড়ল। কাছাকাছিই কোথাও শেয়ালের দল ডেকে উঠল। এবার একটু ভয় পেলেন বিজুবাবু। না না, শেয়ালের ডাকের জন্যে নয়, ভয় পেলেন ঝেঁপে আসা বৃষ্টির জন্যে। ভিজলেই নিমোনিয়া। আবার প্রতিবেশীদের বজ্জাতি, আবার পয়সা খরচ। সে বার ডাক্তারবাবু প্যাঁচে পড়ে পালিয়েছিলেন, কিন্তু বার বার তেমনটা হবে ভাবার কোনও কারণ নেই।
আবার আলোর ঝলকানি। আর তাতেই একটু আশার আলো দেখতে পেলেন বিজুবাবু। একজন আসছেন। এবং ছাতা মাথায়। এ দিকেই আসছেন ভদ্রলোক। এবার ভদ্রলোককে রাজি করাতে হবে শুধু।
ভদ্রলোক কাছাকাছি আসতেই বিজুবাবু বলে উঠলেন, দাদাভাই, কোথায় যাবেন?
আবার বিদ্যুৎ চমক। বিজুবাবু দেখলেন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে গেছেন একটু তফাতে। মাথায় কালো রঙের একটা ছাতা। মুখ দেখা যাচ্ছে না। বিজুবাবু আবার প্রশ্ন করলেন, কতদূর যাওয়া হবে?
ভদ্রলোক বললেন, চলে আসুন।
বিজুবাবু আর বিলম্ব না করে প্রায় দৌড়ে চলে গেলেন ছাতার নিচে।
ভদ্রলোক বললেন, এত রাতে কোথা থেকে?
বিজুবাবু বললেন, গিয়েছিলুম বড়গাছিয়া।
বড়গাছিয়া কেন? সে তো অনেক দূর।
বিজুবাবু বললেন, দূর একটু আছে বটে। তা পা চালিয়ে গেলে আর কতক্ষণ, গিয়েছিলুম লঙ্কা কিনতে।
লঙ্কা!
হ্যাঁ। বললেন বিজুবাবু। ততক্ষণে দু’জনে হাঁটতে শুরু করে দিয়েছেন।
ভদ্রলোক বললেন, আপনাদের বাজারে কি লঙ্কা পাওয়া যায় না!
বিজুবাবু বললেন, যায় বটে; কিন্তু সে লঙ্কায় ঝাল কম।
ভদ্রলোক বললেন, আরেব্বাশ! কীরকম ব্যাপারটা!
বিজুবাবু বললেন, তাহলে বুঝিয়ে বলি আপনাকে ব্যাপারটা। আমি মানুষটা একটু মিতব্যয়ী। অনেকে আমাকে কৃপণ বলে। তাতে আমার কোনও দুঃখ নেই। ওদের আমি অর্বাচীন বলে মনে করি। কৃপণতা আর মিতব্যয়ীতা এক জিনিস নয়। তেমনই, ব্যয় আর অপচয়ও এক নয়। অপচয়কে আমি খুব অপছন্দ করি।
ভদ্রলোক বলে উঠলেন, আমিও, আমিও; অপচয় কোনও কাজের কথা নয়।
বিজুবাবু বললেন, আমি দিনে একবার মাত্র খাই। দুপুরবেলা। ভাত নয়, রুটি। ভাতের অনেক ঝামেলা। ভাত করতে জ্বালানি বেশি খরচ হয়। তারপর ভাত খেতে যাই হোক একটা তরকারি লাগে। কিন্তু শুধু কাঁচালঙ্কা দিয়ে রুটি খাওয়া যায়।
ভদ্রলোক বললেন, তাই নাকি!
হ্যাঁ। বিজুবাবু বললেন, প্রথমে লঙ্কায় একটা কামড় দিতে হবে। ঝাল লাগবে। তখন রুটি চিবতে হবে। ঝাল কমে গেলে আবার লঙ্কায় কামড়। তারপর আবার রুটি। এইভাবে দেখবেন খাওয়া শেষ।
ভদ্রলোক বললেন, বাস রে, দারুণ আইডিয়া।
বিজুবাবু বললেন, হ্যাঁ। এবার ঘটনা হচ্ছে, লঙ্কায় লঙ্কায় ঝালের কমবেশি হয়। কখনও একটা লঙ্কায় দুটো রুটি খাওয়া যায় আবার কখনও একটা লঙ্কায় একটার বেশি খাওয়া যায় না। এদিকে আমাদের বাজারে লঙ্কার ঝাল দিন দিন কমছিল। টের পাচ্ছিলাম আমি। লঙ্কাওলাদের কারসাজি আর কী। তা হঠাৎ খবর পেলাম বড়গাছিয়া বাজারে একজন সন্ধের পর কাঁচালঙ্কা নিয়ে বসে। তার লঙ্কায় নাকি প্রচণ্ড ঝাল। এক কামড়ে অনেকগুলো রুটি খেয়ে ফেলা যায়। সেই সন্ধানেই গিয়েছিলুম। কিন্তু সে আজ লঙ্কা নিয়ে বসেনি। শরীর-টরির খারাপ বোধহয়।
কড়াৎ করে বাজ পড়ল একটা। বিজুবাবু একটু কেঁপে উঠে ছাতার হ্যান্ডেলটা বাগিয়ে ধরলেন। তারপর আরও একটু সরে গেলেন ভদ্রলোকের দিকে। ভদ্রলোক বললেন, হ্যাঁ-হ্যাঁ, ছাতার ভিতর ঢুকে আসুন। না হলে জলের ছাট লাগবে গায়ে।
বিজুবাবু বুঝতে পারলেন, লোকটা নরম সরম প্রকৃতির। আস্তে আস্তে এর ছাতার দখল নিতে হবে। তেমনটাই করে থাকেন তিনি।
কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল, ছাতার ঠিক মধ্যিখানে বিজুবাবু। ছাতার বাঁট তারই হাতে আর যাঁর ছাতা তিনি একেবারে ধারে চলে গেছেন।
বিজুবাবু একটু ভদ্রতা দেখাবার জন্যে বললেন, ভিজছেন না তো আপনি; তা হলে একটু না হয় সরে আসুন।
ভদ্রলোক বললেন, গায়ে একটু বৃষ্টির ছাট লাগছে বটে, তেমন কিছু নয়। মাথা না ভিজলেই হল। ওটাই আসল।
বিজুবাবু বললেন, একদম ঠিক।
ভদ্রলোক বললেন, মাথা ভিজলেই কেলেঙ্কারি; একদম নিমোনিয়া।
বিজুবাবু বললেন, ঠিক, ঠিক; হাত-পা যত ইচ্ছে ভিজুক। মাথাটা শুকনো রাখা দরকার। আমার তো মাথা ভিজে গেল বলেই নিমোনিয়ায় পড়লুম। এক কাঁড়ি টাকা খরচা করে কোনওরকমে প্রাণটা বাঁচল।
ভদ্রলোক বললেন, আমারও তো সেম কেস—নিমোনিয়া। মাথাটাই যে ভিজে গিয়েছিল। কিন্তু...
কিন্তু কী? প্রশ্ন করলেন বিজুবাবু।
কোনও উত্তর নেই।
বিজুবাবু আবারও বললেন, কিন্তু কী?
এবারও উত্তর নেই।
বিজুবাবু এবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। একটা বিদ্যুৎ চমকাল। বিজুবাবুর গায়ের লোমগুলো ছোট ছোট ধানগাছের মতো খাড়া হয়ে উঠল। বিজুবাবু দেখলেন, ভদ্রলোকের মুন্ডুটা শুধু ছাতার তলায় আর ধড়টা ছাতার বাইরে। প্রবল বৃষ্টিতে ভিজছে ধড়টা।
মুন্ডু বলল, আমার নিমোনিয়াটা আর সারল না বুঝলেন।
বিজুবাবু দৌড় দিলেন। থামলেন একেবারে বাড়ির সদর দরজায়। খেয়াল করলেন ছাতাটা হাতছাড়া হয়নি।
পরদিন পাড়ার লোকজন একটা দৃশ্য দেখল যা আগে কখনও দেখা যায়নি। বিজুবাবুর হাতে ছাতা। পুরোনো রঙচটা একটা ছাতা। কাপড়ে দুটো তাপ্পি। কেউ বলল, সেকেন্ড হ্যান্ড কিনেছেন। কেউ বলল, চেনাজানা কেউ দয়া করে দিয়েছে। কেউ বলল, কে আবার দেবে; খরচের ভয়ে কারও সঙ্গেই তো সম্পর্ক রাখে না। মনে হয়, ভূতে দিয়েছে। ভূতের ছাতা। কেউ বলল, ছাতার ভূতও বলতে পারো, যা অবস্থা ছাতার!
বিজুবাবু এসব কথার উত্তর দেন না। দিব্যি কাজে লাগছে ছাতাখানা। মাঝে মাঝে শুধু একটা চিন্তাই কুটকুট করে। সেই মুন্ডু ব্যাটা যদি ছাতা চাইতে আসে কী বলবেন তাকে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন