চিকাইয়ের প্রাপ্তিযোগ

উল্লাস মল্লিক

চিকাইয়ের মন খারাপ। আজ সে সর্বস্বান্ত। একেবারে আগাপাছতলা ফতুর। এখন যে একটা কাঠি আইসক্রিম কিনে খাবে সে পয়সাও নেই। রোদে গলা শুকিয়ে চচ্চড়ি। কড়া রোদে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরছে সে। গিয়েছিল রামনগরে। সেখানে বসন্ত জ্যোতিষী হাত দেখেন। তাঁর কাছেই গিয়েছিল সে। জ্যোতিষী ঠাকুর বলেছেন, টাকা ঠিকই ছিল, চিকাই ঘুম থেকে উঠতে দেরি করেছে, অন্য কেউ হাতিয়ে নিয়েছে টাকা।

রামনগরের বসন্ত জ্যোতিষী হাত দেখে মানুষের ভূত ভবিষ্যৎ বলে দেন। মানুষের হারিয়ে যাওয়া জিনিসের সন্ধান দেন। চিকাইয়ের অনেক দিনের ইচ্ছা জ্যোতিষী ঠাকুরের কাছে গিয়ে হাতটা দেখিয়ে আসবে। অনেক কিছু জানার আছে তার। অঙ্কে এবার লাড্ডু পেয়েছে সে। সেই সঙ্গে বাবার রামধোলাই। অ্যানুয়াল পরীক্ষায় রেজাল্ট কেমন হবে সেটা জানা দরকার। তেমন বুঝলে ক’দিনের জন্যে বাড়ি ছেড়ে হাওয়া হয়ে যাবে।

ভূগোল স্যার রতনবাবু কথায় কথায় গাঁট্টা দেন। সেই রতনবাবুর ডান হাত কবে ভাঙবে সেটাও জানতে হবে। তারপর আরও আছে। মুখুজ্জে বাড়ির ছোট ছেলেটা পর পর তিনদিন ঘুড়ি কেটে দিয়েছে তার। ভো-কাট্টা ভো-কাট্টা বলে ব্যাপক প্যাঁক দিয়েছে। এর বদলা চাই। জ্যোতিষী ঠাকুরের কাছে মাঞ্জার জম্পেস একটা ফরমুলা জেনে নেবে। এই সব নানাবিধ প্রশ্ন নিয়েই সে হাজির হয়েছিল বসন্ত জ্যোতিষীর কাছে।

বাড়িতেই জ্যোতিষী ঠাকুরের চেম্বার। চার দেওয়ালে নানা দেবদেবীর ছবি। মেঝেতে পাতা একটা আসনে বসে ছিলেন জ্যোতিষী ঠাকুর। ঘাড় পর্যন্ত লম্বা চুল। কপালে লম্বা করে টানা সিঁদুরের টিপ। পরনে রক্তাম্বর। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। চিকাই ঘরে ঢুকতেই বললেন, আয়, বোস। তোর জন্যেই অপেক্ষা করছি।

চিকাই একটু অবাক হয়ে গিয়েছিল। তার জন্যে অপেক্ষা করছেন ঠাকুর। সে তো আগে কিছু বলেনি। তাহলে জানলেন কী করে!

জ্যোতিষী ঠাকুর বললেন, কী রে অবাক হচ্ছিস তো! আরে বেটা পৃথিবীর তামাম মানুষের ভূত ভবিষ্যৎ আমার নখদর্পণে। তুই তো বেশ কিছুদিন উতলা হয়ে পড়েছিস, আমার জন্যে তোর প্রাণ কাঁদছে—সবই আমি জেনে গেছি রে। আয় বেটা, বোস।

চিকাই বসল জ্যোতিষী ঠাকুরের কাছে।

জ্যোতিষী ঠাকুর বললেন, দে, হাতটা দে।

ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল চিকাই।

খুব মনোযোগ দিয়ে চিকাইয়ের হাত দেখতে লাগলেন ঠাকুর। আতস কাচও বের করলেন। হঠাৎ বলে উঠলেন, আয় বাপ!

চিকাই একটু ঘাবড়ে গিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল জ্যোতিষীর দিকে।

জ্যোতিষী ঠাকুর বললেন, তুই তো রাজার ব্যাটা রে! প্রচুর টাকা আসছে তোর হাতে।

আরও ঘাবড়ে গেল চিকাই।

ঠাকুর বললেন, বিরাট প্রাপ্তি যোগ তোর, অনেক টাকা। গুণে শেষ করতে পারবি না। সঙ্গে তোর টাকা আছে তো এখন?

চিকাই ঘাড় নেড়ে বলল, আছে।

কত? জিগ্যেস করলেন জ্যোতিষী ঠাকুর।

পকেটে দশ টাকার নোট ছিল একটা। চিকাই বের করে দিল ঠাকুরকে।

দশ টাকায় হয়! ঠাকুর বললেন, এত বড় প্রাপ্তি যোগ, একশো এক টাকা লাগবে।

একশো এক! চোখ কপালে উঠে গেল চিকাইয়ের।

হ্যাঁ, একশো এক। যা, বাড়ি যা, গিয়ে নিয়ে আয়। তাহলেই তুই রাজা বাদশা হয়ে যাবি।

অগত্যা দৌড়ে বাড়ি ফিরল চিকাই। ফিরেই টাকা খুঁজতে বসল। দশ টাকা দেওয়া আছে ঠাকুরকে। তাহলে আর একানব্বই টাকা লাগবে। নিজের কাছে সতেরো টাকা ছিল; বাবার পাঞ্জাবির বুক পকেট থেকে পেল পঞ্চাশ টাকার একটা নোট, বোনের ব্যাগ থেকে বারো টাকা। মোট দাঁড়াচ্ছে ঊনআশি টাকা। নব্বই হচ্ছে না। কিন্তু তার সময়ও নেই। ঊনআশি টাকা নিয়েই ছুটল জ্যোতিষীর কাছে।

ঠাকুর বললেন, এনেছিস?

চিকাই হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, একা নব্বই হল না ঠাকুর, ঊনআশি টাকা পেয়েছি, হবে ঠাকুর এতে?

ঠাকুর বললেন, ঠিক আছে তাই দে, আমি ম্যানেজ করে নেব।

চিকাই বলল, এর জন্য আমার প্রাপ্তির টাকা কমে যাবে না তো!

আরে না না, বললাম তো ম্যানেজ করে নেব।

ঠাকুর টাকাটা নিয়ে কালীঠাকুরের পায়ে ছুঁইয়ে লাল একটা ব্যাগে রেখে দিলেন। তারপর চিকাইয়ের হাতটা টেনে নিলেন আবার। কিছুক্ষণ দেখে বললেন, শোন, তুই এখন লক্ষ লক্ষ টাকার মালিক। তোর হাতের অর্থরেখা তেমনই দেখাচ্ছে। কাল ভোর চারটের সময় ঘুম থেকে উঠবি, সদর দরজা খুললেই লাল একটা কাপড়ের ব্যাগ পাবি, ভর্তি টাকা থাকবে ব্যাগে। গুণে শেষ করতে পারবি না।

তারপর বাড়ি ফিরে এসেছিল চিকাই। সারাটা দিন উত্তেজনার মধ্যে কাটল। রাতে ঘুম হল না ভালো। চারটের আগেই উঠে পড়ল সে। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলল। কিন্তু কোথায় টাকার ব্যাগ। কিছু তো নেই। এদিক ওদিক এমনকী বাড়ির পিছন পর্যন্ত খুঁজে এল সে। না, কোথাও লাল ব্যাগের চিহ্নমাত্র নেই। একটু বেলা হতেই ছুটল জ্যোতিষী ঠাকুরের কাছে। ঠাকুর শুনে বললেন, টাকার ব্যাগ ঠিকই ছিল, চিকাই উঠতে দেরি করে ফেলেছে, অন্য কেউ হাতিয়ে নিয়েছে সেই টাকা।

নিঃস্ব চিকাই তাই খর রোদে হাঁটতে হাঁটতে ফিরছে। একটু পরেই ঝাঁপান ডাঙার মোড়ে চলে এল সে। জায়গাটা নির্জন। বড় বড় কতগুলো আম জাম খিরিশ গাছ। গাছের মোলায়েম ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল চিকাই। হঠাৎ দেখল সামনে একটা ছেলে। বয়েস তারই মতন। ছেলেটা এগিয়ে এসে বলল, কী ভাই, মন খারাপ নাকি?

চিকাই বলল, হ্যাঁ তো।

কী হয়েছে?

চিকাই বিস্তারিত বলল।

শুনে একটু চুপ করে থাকল ছেলেটা। তারপর বলল, আচ্ছা, চল তো দেখি।

চিকাই বলল, কোথায়?

ছেলেটা বলল, জ্যোতিষী ঠাকুরের কাছে; আমিও হাত দেখাব।

চিকাই বলল, দরকার নেই; ও ব্যাটা ঝুটো গণৎকার। ঠকিয়ে টাকা নিয়ে নেবে।

ছেলেটা বলল, আরে দেখাই যাক না, আমাকে ঠকানো অত সহজ নয়। চল, চল।

ছেলেটার তাড়াতেই উঠে পড়ল চিকাই।

সেই ছেলেটার হাতই এখন দেখছেন জ্যোতিষী ঠাকুর। ঠিক আগের মতোই আতস কাচ বের করে ভুরু কুঁচকে দেখছেন। জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখছে চিকাই।

জ্যোতিষী ঠাকুর বললেন, বল, কী জানতে চাস।

অনেক কিছু ঠাকুর। ছেলেটা বলল, আমার ইংরাজিতে খুব ভয়। এবার পাস করতে পারব তো?

ঠাকুর মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, হয়ে যাবে।

ছেলেটা বলল, ঠাকুর আমার দিদিমার মাথায় খুব যন্ত্রণা হয়; কিছুতেই ভালো হচ্ছে না। কী হবে ঠাকুর!

একটু চুপ করে থেকে জ্যোতিষী ঠাকুর বললেন, সারবে, কিন্তু এটার জন্যে মায়ের একটা পুজো দিতে হবে। একশো এক টাকা নিয়ে আয়।

ছেলেটা বলল, আনছি ঠাকুর, আর দু’একটা জেনে নিই। বলছিলাম কী, কাল একটা ফুটবল ম্যাচ আছে ভবানী সংঘের সঙ্গে, কী রেজাল্ট হবে?

তোরা জিতবি, যা এবার টাকাটা নিয়ে আয়।

ছেলেটা বলল, আচ্ছা যাচ্ছি ঠাকুর, আর একটা মাত্র প্রশ্ন, বলছিলাম কী, আমি কতদিন বাঁচব?

মানে! বেশ অবাক হয়েই বলে উঠলেন ঠাকুর।

না, মানে, আমাদের পাড়ার একটা ছেলে, আমারই বয়সি, হঠাৎ পেটের ব্যথায় মরে গেল। তাই বলছি, আমার কিছু হবে না তো!

হো-হো করে হেসে উঠলেন ঠাকুর। বললেন, না রে বেটা না, তুই একশো বছর বাঁচবি। তোর আয়ুরেখা তাই বলছে।

ছেলেটা বলল, তাই যদি হয়, তবে আমার এমন দশা হল কী করে!

চিকাই অবাক হয়ে দেখল, ছেলেটার মুন্ডুটা ধড় থেকে খসে গিয়ে মেঝেতে গড়াগড়ি দিচ্ছে আর জ্যোতিষী ঠাকুর বিরাট একটা লাফ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ঘর থেকে।

টাকার ব্যাগটা নিয়ে ফিরছিল চিকাই। জ্যোতিষী ঠাকুরের ব্যাগ এটা। লক্ষ লক্ষ নয় কিন্তু বেশ কিছু টাকা আছে এতে। সকাল থেকে মনে হয় বেশ ক’জনকে টুপি পড়িয়েছেন। একটু আগে একটা কাঠি আইসক্রিম কিনেছে চিকাই। সেটা চুষতে চুষতেই হাঁটছিল সে। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল সেই ছেলেটার কথা। জ্যোতিষী ঠাকুর ঘর থেকে দৌড়ে বেড়িয়ে যেতেই ছেলেটার ধড় থেকে মুন্ডু জুড়ে গেল আবার। ব্যাগ নিয়ে চিকাইয়ের হাতে ধরিয়ে দিল। বলল, পালাও। বলেই মিলিয়ে গেল বাতাসে।

হাঁটতে হাঁটতে চড়ক ডাঙার মোড়ে চলে এল চিকাই। দেখল ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। চিকাই বলল, তুমি তাহলে ভূত!

ছেলেটা বলল, তা তো জানি না। তবে এটা জানি, আমি তোমার বন্ধু, আর তুমিও আমার বন্ধু।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%