লুচি

উল্লাস মল্লিক

আবার নাকি ইনস্পেকটর আসবেন কিরুদের স্কুলে। কিরুদের জনার্দন লাহা স্মৃতি বিদ্যানিকেতন পরিদর্শনে আসবেন ইনস্পেকটর। কিরুর খুব আনন্দ। ইনস্পেকটর এলে একদিন ছুটি। টোকাপুরে ঝুলনের মেলা বসেছে। জমজমাট মেলা। মরণকূপের খেলা আছে, ম্যাজিক শো আছে। ছুটির দিন যাওয়া যাবে। ম্যাজিশিয়ানকে ধরে দু-একটা ম্যাজিক শিখে নেবে বলে ঠিক করল কিরু।

এদিকে হেডস্যারের টেনশন। টেনশন কিরুকে নিয়ে। হতচ্ছাড়া ছেলে কখন কী বলে বসে। এর আগের বার ইনস্পেকটর এসেছিলেন, ক্লাসে ক্লাসে ঘুরে ছেলেদের পড়া জিগ্যেস করছিলেন। কিরুদের ক্লাসে যখন এলেন, কিরু ইনস্পেকটরের সামনেই বলে দিল, ভবতোষ স্যার ক্লাসে এসে রোজ ঘুমোন।

শুনে খুবই অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন ইনস্পেকটর। ক্লাস থেকে বেরিয়েই হেডস্যারকে বলেছিলেন, এ কেমন কথা মাস্টারমশাই। আপনার টিচার ক্লাসে এসে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেন। ভেরি ব্যাড।

অপ্রস্তুত হেডস্যার কাঁচুমাচু মুখ করে বলেছিলেন, মনে হয় স্যার একদিন শরীর টরির খারাপ ছিল, তাই হয়তো একটু ঝিমুনি মতো এসে গিয়েছিল। না হলে ভবতোষবাবু খুবই সিরিয়াস মানুষ, যত্ন নিয়ে পড়ান।

ইনস্পেকটর বললেন, না না, একদিন কেন, এই ছেলেটি তো বলল, রোজই নাকি ঘুমোন। ভেরি ব্যাড।

হেডস্যার তখন বললেন, আসলে সত্যি কথা বলি আপনাকে, ওই ছেলেটির মাথায় একটু গন্ডগোল আছে, আনাড়ি কথাবার্তা যখন তখন বলে বসে।

ইনস্পেকটর মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, না না, আনাড়ি হবে কেন, ছেলেটিকে দেখে তো দিব্যি ভালো ছেলে মনে হল। সরল ছেলে, সাদা মনে সত্যি কথাটা বলে দিয়েছে। ভেরি ব্যাড।

তারপর সারাক্ষণ মুখ গম্ভীর করেই ছিলেন ইনস্পেকটর। মাধ্যমিক পরীক্ষায় জনার্দন বিদ্যানিকেতনের রেজাল্ট যথেষ্ট ভালো, জেলা স্পোর্টসেও স্কুল প্রাইজ প্রায়। তারপর ছেলেরা নাটক আবৃত্তি কুইজ ডিবেটে তুখোড়—এত কিছু গুণগান শুনিয়েও ইনস্পেকটর সাহেবের গাম্ভীর্য গলাতে পারেননি হেডস্যার। শেষ পর্যন্ত সেই গাম্ভীর্য ভাঙাল গণেশ ময়রার রাজভোগ। সব মিটে গেলে ইনস্পেকটরের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। এলাহি ব্যবস্থা। লুচি মাংস মিষ্টি—ঢালাও ব্যবস্থা সব। পেট পুরে খাওয়ানো হয় ইনস্পেকটরকে।

ইনস্পেকটর গম্ভীর মুখেই লুচি, ছোলার ডাল, মাংস খাচ্ছিলেন। হেডস্যার ‘আর দুটো লুচি দিই স্যার’, ‘মাংস আর একটু নিন, রেওয়াজি খাসির মাংস’, ‘চাটনিটা একটু চেখে দেখুন স্যার’—এইসব বলছিলেন আর বোঝার চেষ্টা করছিলেন ইনস্পেকটর সাহেবের মন গলল কি না। গম্ভীর মুখে খেয়ে যাচ্ছিলেন ইনস্পেকটর। চাটনি পর্যন্ত গম্ভীরই ছিলেন।

চাটনির পরে মিষ্টি। নবাবহাটির গণেশ ময়রার রাজভোগ বিখ্যাত। এক-একটার টেনিস বলের সাইজ; আর তেমনই স্বাদ। গম্ভীর মুখে চাটনিটা চেটে খেয়ে একটা রাজভোগ তুলে নিয়ে কামড় বসালেন ইনস্পেকটর। রসাল আবেশে চোখ দুটো যেন বুজে এল। অস্ফুটে বলে উঠলেন, বাহ! হাবুডুবু খাওয়া হেডস্যার ‘বাহ’ শব্দটাকে খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইলেন। বললেন, ভালো স্যার। মিষ্টিটা ভালো লেগেছে আপনার?

ফ্যানটাস্টিক। বাকিটা মুখে পুরতে পুরতে বললেন ইনস্পেকটর। হেডস্যার বললেন, এই রাজভোগটার খুব নাম আছে স্যার।

রাজভোগ বলছেন কেন মাস্টারমশাই! ইনস্পেকটর বললেন, শুধু রাজভোগ বললে একটু অবিচার করা হবে, এর নাম হওয়া উচিত মহারাজভোগ।

খুব বিগলিত হেসে হেডস্যার বললেন, তা যা বলেছেন।

প্রথমটা শেষ করে দু’নম্বরটা ধরলেন ইনস্পেকটর। এতক্ষণ মুখ কালো করে একপাশে বসেছিলেন ভবতোষ স্যার। না জানি ফিরে গিয়ে ইনস্পেকটর তাঁর নামে কী রিপোর্ট করেন ওপর মহলে। ভবতোষ স্যার যেন এবার একটু আশার আলো দেখলেন। বলে উঠলেন, আর দুটো দেব স্যার?

দেবেন! একটু যেন ইতস্তত ভাব ইনস্পেকটরের গলায়।

সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলেন না ভবতোষ স্যার। ভরা হাটে তাঁর হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছিল কিরু। তিনি এবার রাজভোগের হাঁড়িটা হাতিয়ার করলেন। ঘরের এক কোণে একটা টুলের ওপর রাখা ছিল রাজভোগের হাঁড়ি। ভবতোষ স্যার লাফিয়ে উঠে হাঁড়িটা তুলে নিলেন, তারপর বসিয়ে দিলেন ইনস্পেকটরের সামনে।

বললেন, খান স্যার, যত খুশি খান। সবগুলো খেয়ে নিন, আপনার জন্যেই তো আনা। এক হাঁড়ি রাজভোগ অবশ্য খেতে পারেননি সেই ইনস্পেকটর সাহেব। গোটা পাঁচেক খেয়েছিলেন, বাকিগুলো বেঁধে নিয়ে গিয়েছিলেন। গাম্ভীর্য-টাম্ভির্য সব হাপিস। এমনকী যাবার সময় ভবতোষ স্যারকে বলে গিয়েছিলেন, দেখুন মাস্টারমশাই, আপনার তো বয়েস হয়েছে, বুঝি, এই বয়েসে ভাত খেয়ে স্কুলে এলে একটু ভাতঘুম আসেই। বলি কী, ঘুমোবেন যখন একটু চোখ কান খোলা রেখে ঘুমোবেন, ছেলেরা যাতে বজ্জাতি করতে না পারে।

ভবতোষ স্যার বলেছিলেন, ঠিক আছে স্যার, এরপর ঘুমোলে, চোখ কান খোলা রেখেই ঘুমোব।

যাই হোক, সে যাত্রায় গণেশ ময়রার রাজভোগ বাঁচিয়ে দিয়েছিল সবাইকে।

কিন্তু এবার কী হবে? হেডস্যারের বিশেষ চিন্তা কিরুকে নিয়ে। ছিটেল ছেলেটা কখন কী বেফাঁস বলে বসে। ছুটির পর স্যার ডাকলেন কিরুকে। বললেন, বাবা কিরু, শুনেছিস তো ইনস্পেকটর আসছেন আবার? তুই একটু চুপচাপ থাকিস বাবা, বেফাঁস কিছু বলে বসিস না যেন।

কিরু বলল, স্যার, চুপ করেই থাকব না হয়, কিন্তু স্যার এবার আপনাদের মেনু কী?

মেনু! বেশ অবাক হয়ে বললেন হেডস্যার।

কিরু বলল, হ্যাঁ স্যার, ইনস্পেকটর এলে তো শুনেছি খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা থাকে শেষকালে। এবার কী কী হচ্ছে স্যার?

হেডস্যার বললেন, ও, সেই খাওয়াদাওয়া? ওই তো লুচি, বেগুনভাজা, ছোলার ডাল, খাসির মাংস, চাটনি, আর একটু মিষ্টি-টিষ্টি।

লুচি থাকছে স্যার? কিরু বলল, ঘিয়ের লুচি?

হ্যাঁ, লক্ষ্মী ঘিয়ের।

দুটো হবে না স্যার? লক্ষ্মী ঘিয়ের লুচি আমার দারুণ লাগে।

হেডস্যার তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, হবে বাবা হবে, দুটো কেন, তোকে পেট পুরেই খাওয়াব। তুই শুধু বেচাল কিছু বলে বলিস না বাবা। ইশকুলের সুনাম বলে কথা।

কিরু বলল, একদম ভাববেন না স্যার, আমি একেবারে বোবা-কালা হয়ে থাকব।

তাই থাকিস বাবা। হেডস্যার বললেন, বোবা-কালা হয়েই থাকিস।

কিরু বলল, অন্ধ হয়ে থাকব স্যার? যদি বলেন অন্ধও সাজতে পারি; কালো একটা চশমা হলেই হবে। হেডস্যার বললেন, না না, অতটা দরকার নেই। তুই শুধু মুখটা বন্ধ রাখিস।

রাখব স্যার। কিরু বলল, কিন্তু লুচির কথাটা ভুলে যাবেন না যেন।

দুদিন পরেই ইনস্পেকটর এলেন ইশকুলে। লম্বা চওড়া চেহারা, পুরু গোঁফ, দেখেই বোঝা যায় রাশভারী ধরনের মানুষ। হেডস্যারকে সঙ্গে নিয়ে ক্লাসে ক্লাসে ঘুরতে লাগলেন। প্রশ্ন করতে লাগলেন ছাত্রদের। অমন দোর্দণ্ডপ্রতাপ হেডস্যারও যেন সিঁটিয়ে আছেন ইনস্পেকটরের পাশে।

কিরুদের ক্লাসেও এলেন ইনস্পেকটর। গোলকস্যার ক্লাস নিচ্ছিলেন তখন। সবাই উঠে দাঁড়াল। ইনস্পেকটর গমগমে গলায় বললেন, সিট ডাউন। ছাত্ররা সমস্বরে বলল, থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।

কিরু গলা মেলাল না। সে তো আজ বোবা-কালা। জোরে একবার শ্বাস টানল শুধু। লুচি ভাজা হচ্ছে, লক্ষ্মী ঘিয়ের লুচি। গন্ধ ছাড়ছে।

ইনস্পেকটর প্রথমে পাদ্মনাভকে তুললেন। বলো, সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ কাকে বলে?

গড়গড় করে বলে গেল পদ্মনাভ।

বাহ, বেশ, বেশ। বললেন ইনস্পেকটর।

তারপর পলাশকে তুললেন। তুমি বলো, ব-দ্বীপ কীভাবে সৃষ্টি হয়?

বেশ গুছিয়ে উত্তর দিল পলাশ।

কথায় বলে, যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধে হয়। এরপরেই ইনস্পেকটরের দৃষ্টি পড়ল কিরুর ওপর। বললেন, তুমি বেশ শান্তশিষ্ট ছেলে দেখছি, কী নাম তোমার?

কিরু উঠে দাঁড়াল। নামটা বলবে কি না ঠিক করতে পারছে না। সে তো আজ বোবা-কালা।

হেডস্যার কিরুকে ইশারা করলেন। কিরু বুঝল, নাম বলতে বলছেন স্যার। অর্থাৎ মুখ খুলতে বাধা নেই। সে বলল, কিংকর কর্মকার। সবাই কিরু বলে ডাকে আমাকে।

বাহ, খুব সুন্দর নাম। ইনস্পেকটর বললেন, তোমাকে একটা প্রশ্ন করি? বলো তো সার্কেল মানে কী?

সার্কেল। সার্কেল। বিড়বিড় করতে লাগল কিরু।

হ্যাঁ, সার্কেল। সি আই আর সি এল ই। ইনস্পেকটর বললেন, খুবই সহজ, পারবে তুমি, চেষ্টা করো।

কিরু বলল, একটু দাঁড়ান স্যার, আসলে পেটে আসছে কিন্তু মুখে আসছে না।

ইনস্পেকটর বললেন, বেশ, ভেবেই বলো।

কিরু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথা চুলকোতে লাগল।

হেডস্যার বুঝে গেলেন, যত সময়ই পাক, যতই ভাবুক উত্তর কিরুর পেট থেকে মুখে আসার কোনও সম্ভাবনাই নেই। ইশকুলের সুনামে কালি লাগল বলে। স্যার দাঁড়িয়েছিলেন ইনস্পেকটরের পিছনে। ইনস্পেকটর দেখতে পাচ্ছিলেন না স্যারকে। কিন্তু কিরু পাচ্ছে। হেডস্যার কিরুকে ইশারা করলেন, বাতাসে আঙুল ঘুরিয়ে গোল একটা বৃত্ত এঁকে দেখালেন। দেখেই উত্তেজিতভাবে কিরু বলে উঠল, মনে পড়েছে স্যার, মনে পড়েছে। বলব?

হ্যাঁ, বলবে তো বটেই। বললেন ইনস্পেকটর।

সার্কেল মানে স্যার লুচি।

লুচি! খুব অবাক হয়ে বললেন ইনস্পেকটর।

হ্যাঁ, স্যার লুচি। কিরু খুব আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল, লক্ষ্মী ঘিয়ের লুচি।

ইনস্পেকটর একটু চুপ করে থাকলেন। মুখে যেন মৃদু একটা হাসি ফুটে উঠল। তারপর বললেন, আচ্ছা, তোমাকে আর একটা প্রশ্ন করি। বল তো, ট্র্যাঙ্গেল মানে কী?

ট্যাঙ্গেল। ট্র্যাঙ্গেল। আবার বিড়বিড় করে মাথা চুলকোতে লাগল কিরু।

হ্যাঁ, ট্র্যাঙ্গেল। ইনস্পেকটর বললেন, টি আর আই এ এন জি এল ই। কিরু বলল, বলছি স্যার, পেটে আসছে মুখে আসছে না।

হেডস্যার আবার ইশারা করলেন কিরুকে। বাতাসে একটা ত্রিভুজ এঁকে দেখালেন।

কিরু বলল, হ্যাঁ স্যার, মনে পড়েছে, ট্র্যাঙ্গেল মানে হল পরোটা।

পরোটা! প্রবল বিস্ময় ইনস্পেকটরের গলায়।

হ্যাঁ স্যার পরোটা। কিরু বলল, তবে লক্ষ্মী ঘিয়ের নাকি ডালডার সেটা ঠিক বলতে পারব না।

এবার হো হো করে হেসে ফেললেন ইনস্পেকটর। তারপর বললেন, তুমি বোধহয় খেতে খুব ভালোবাসো? কিরু মাথা চুলকোতে চুলকোতে একটু লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল, হ্যাঁ স্যার, বিশেষ করে লুচি পরোটা খুবই ভালোবাসি স্যার।

ইনস্পেকটর বললেন, ঠিক আছে, বোসো।

ছুটির পর স্টাফরুমে বসে খাচ্ছিলেন ইনস্পেকটর। থালায় বড় বড় ক’টা ফুলকো লুচি, বেগুনভাজা, ছোলার ডাল। প্লেটে গণেশ ময়রার সেই বিখ্যাত রাজভোগ। হেডস্যার সামনে বসেছিলেন। মনটা একটু খিঁচ-খিঁচ করছে স্যারের। সব ক্লাসেই ছেলেরা ঠিক ঠিক উত্তর দিয়েছে। ডুবিয়ে দিয়েছে শুধু কিরু।

ঠিক তখনই দরজায় এসে দাঁড়াল কিরু। দেখেই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন হেডস্যার। কড়া চোখে তাকালেন কিরুর দিকে। কিরু একগাল হেসে বলল, স্যার, চলে এলাম।

হেডস্যার গম্ভীর গলায় বললেন, তোমার কথা পরে শুনব, তুমি এখন এসো, যা বলার কাল বলবে।

ইনস্পেকটর কিরুকে দেখেই বলে উঠলেন, আরে, তুমি সেই ছেলেটা না। কী যেন নাম—কিংকর?

কিরু বলল, আজ্ঞে, হ্যাঁ স্যার।

ইনস্পেকটর বললেন, তা কিংকর, হবে নাকি দুটো?

কিরু বলল, অ্যাঁ!

বলছি, দুটো সার্কেল খাবে নাকি? ইনস্পেকটর বললেন, এখানে তো ট্র্যাঙ্গেলের ব্যবস্থা নেই, তবে সার্কেল আছে। খাবে দুটো সার্কেল?

কিরু বলল, তা স্যার দিলে তো খাই।

ইনস্পেকটর হেডস্যারকে বললেন, দিন মাস্টারমশাই, কিংকরকে দুটো সার্কেল দিন।

কিরু বলল, বেগুনভাজাও একটা দেবেন স্যার, বেগুনভাজা দিয়ে সার্কেল খুব ভালো লাগে আমার। আর ছোলার ডাল যদি থাকে তাও দিতে পারেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%