ন্যাটা

উল্লাস মল্লিক

শনিবারের বারবেলায় ভূতে কামড়াল মিঠুনকে।

মাঠে যাচ্ছিল মিঠুন। উসুমপুর ইয়াং স্টারের সঙ্গে আজ জান-কবুল ম্যাচ। গত বছর এই ইয়াং স্টারের কাছেই বিতিকিচ্ছিরিভাবে হেরেছিল মিঠুনদের ‘বেলডাঙা আমরা ক’জন’। খেলায় তো হারজিত আছেই। কিন্তু খেলা যারা দেখেছিল তারা বলছিল, এ যেন হাতি আর ছুঁচোর লড়াই। কথাগুলো আঁতে লেগেছিল মিঠুনদের। ছুঁচোর সঙ্গে তুলনা তাদের! বিদঘুটে গন্ধওলা একটা প্রাণী। শুনে ভেতরে যেন হিটারের কয়েল জ্বলছিল সবার। সেদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিল, সামনের বছর করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে। সেইভাবেই রণসজ্জাও সাজিয়েছে মিঠুনরা।

বকুলপুর থেকে তমাল নামে একটা ছেলেকে ভাড়া করে আনা হচ্ছে। অলরাউন্ডার। ব্যাট বল দুটোতেই সুপার ক্লাস। তার থেকেও বড় কথা বাঁ-হাতি। অর্থাৎ বল ব্যাট দু’টোই বাঁ-হাতে করে। পেট চুক্তি ভাড়া। জিতলে বিরিয়ানি কর্নারের মাটন বিরিয়ানি আর চিকেন চাপ, সঙ্গে কোল্ড ড্রিংস। তবে হারলে লেবু’দার দোকানে পেটাই পরোটা আর আলুর দম।

আসলে গত বছর ইয়াং স্টারের এক বাঁ-হাতিই পদ্মবনে উন্মাদ হাতির মতো তাণ্ডব চালিয়েছিল। ঝড় তুলেছিল ব্যাটে আর বল হাতে নিয়েছিল পাঁচ উইকেট। আসলে বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যানকে বল করা ডান-হাতি বোলারের কাছে বেশ কঠিন কাজ। লাইন লেন্থ ঠিক রাখতে পারে না। মার খেয়ে যায়। ঠিক তেমনই কঠিন ডান-হাতি ব্যাটসম্যানের বাঁ-হাতি বোলারের মোকাবিলা। কোনাকুনি দৌড়ে এসে এমন ইয়র্কার ছাড়ে যে পায়ের পাতার ওপর আছড়ে পড়ে স্ট্যাম্পকে ডিগবাজি খাওয়ায়। ইয়াং স্টারের সেই বাঁ-হাতি একেবারে নাজেহাল করে ছেড়েছিল তাদের।

মাঠে যাবার একটা শর্টকাট রাস্তা আছে। চৌধুরী বাগান। রাস্তা ঠিক নয়, পায়ে চলা পথ। খুব বেশি মানুষ এদিকে আসে না যে! জায়গায়টা বদনামের জায়গা।

চৌধুরী বাগান নামেই বাগান, আসলে জঙ্গল। জানা অজানা নানা গাছ। গুঁড়ি এত মোটা যে আড়ালে হাতিও লুকিয়ে পড়তে পারে। সূর্যের আলো গাছের ঝামড়-ঝোমড় ডাল পাতার মধ্যে দিয়ে প্রবল লড়াই করেও ঢুকতে পারে না। ফলে দিনের বেলাতেও ঝুঁঝকো অন্ধকার। ঠিক এই ধরনের জায়গায় বসত গড়তে ভালোবাসে ভূত পেত্নির দল। খুব ডাকাবুকো মানুষ ছাড়া তাই চৌধুরী বাগান এড়িয়ে চলে সকলে।

কিন্তু মিঠুন অন্য বস্তু। পাড়ায় গুজব, ভগবান নাকি টক আমড়া, জল বিছুটি, কাঁকড়া বিছে ইত্যাদি প্রভৃতি ভালো ভালো জিনিস মাল মসলায় মিশিয়ে দিয়েছিলেন মিঠুনকে তৈরি করার সময়। ভূতের ভয়কে ‘বাপি বাড়ি যা’র মতো উড়িয়ে দেয় সে। তাই চৌধুরী বাগান দিয়ে শর্টকাট করছিল মিঠুন। হঠাৎ পিঠে কিছু একটা ফুটল যেন। অনেকটা সুচ ফোটার মতো। থমকে দাঁড়াল মিঠুন। কী কামড়াল রে বাবা; পোকামাকড় কিছু! একটু জ্বালা জ্বালা করছে। জায়গাটায় হাত দিতে গিয়ে মিঠুন বুঝল হাত পৌঁছাচ্ছে না। মিঠুন খেয়াল করেছে মানুষের এই এক ম্যানুফ্যাকচারিং ডিফেক্ট। পিঠের এমন সব জায়গা আছে সেখানে মানুষের হাত পৌঁছায় না। চুলকালে পরনির্ভর হওয়া ছাড়া উপায় নেই। ঠিক তেমনই এক দুর্গম জায়গায় জ্বালা করছে মিঠুনের।

হঠাৎ খিল খিল হাসি কানে এল তার। কে হাসে! কচি ছেলের গলা মনে হচ্ছে! এদিক-ওদিক তাকাল মিঠুন। কেউ নেই। কে যেন বলে উঠল, আমাকে দেখতে পাবে না।

গলাটা বাচ্চা ছেলের। মিঠুন একটু অবাক হয়ে বলল, কেন, কোথায় লুকিয়েছ তুমি!

আমি লুকোইনি, সামনেই আছি।

সামনে আছ, তবু দেখতে পাচ্ছি না! ভূত-টুত নাকি!

টুত নই, ভূত।

মিঠুন বলল, আরিব্বাস, তাই নাকি!

হ্যাঁ, তবে ছানা ভূত।

মানে, বাচ্চা?

হ্যাঁ।

বয়েস কত?

এক লক্ষ তিরাশি হাজার বছর ন’মাস সতেরো দিন।

মিঠুন আঁতকে ওঠে, অ্যাঁ, বলো কী! এক লক্ষ তিরাশি হাজার...ভুল শুনছি নাকি!

না না, ঠিকই শুনেছ, এক লক্ষ তিরাশি হাজার বছর ন’মাস সতেরো দিন। বার্থ সার্টিফিকেট অনুযায়ী এটাই আমার বয়েস। অবশ্য, সব বাবা-মাই চায় ছেলেপুলের বয়েস কমাতে; তাই সার্টিফিকেট বানানোর সময় দশ-পনেরো হাজার বছর যদি হাওয়া করে দেওয়া থাকে, সেক্ষেত্রে বয়েস আর একটু বেশি হবে।

মিঠুন বলল, বলো কী, এত বয়েস!

হ্যাঁ, আমার বাবার বয়সই তো মোটামুটি দু’কোটি বছরের বেশি, আমার মায়ের পৌনে দু’কোটি, দাদুর...

মিঠুন বলে ওঠে, বুঝেছি, বুঝেছি। তোমাদের ফ্যামেলির কারও বয়েসের গাছ পাথর নেই।

আমাদের এখানে নিয়মই এরকম। এই দেখো না, এই জঙ্গলের বয়েস তোমরা হিসেব করতে পার না। আমি তো চোখের সামনে গজাতে দেখলাম। এই তো সেদিন দেখলাম, সমুদ্র গর্ভ থেকে বড় একটা পাথরের চাঁই মাথা চাড়া দিয়ে উঠল, কিছু কাল পর দেখি মানুষ নাম দিল হিমালয়। তারই উঁচু একটা খোঁচার নাম দিল এভারেস্ট। একদল তো এভারেস্ট এভারেস্ট করে একেবারে হেদিয়ে পড়ল। অথচ দেখাব কিছু নেই, বরফ আর বরফ। কিন্তু উঠতেই হবে। উঠতে গিয়ে কতজন আছাড় খেয়ে দমফোট হয়ে অক্কা পেল। এখন তারা মনে করলেই দিনে সতেরোবার এভারেস্টের টঙে চড়ে হাওয়া খেয়ে আসতে পারে।

মিঠুন বলল, বাপরে বাপ। তুমি একটা কাজ করবে? আমার পিঠে কী যেন একটা কামড়াল, দেখবে কী ব্যাপার।

কী আবার কামড়াবে, আমিই কামড়েছি।

তুমি! মিঠুন অবাক হয়ে বলে, কামড়ালে কেন!

আরে, সাড়ে তিন হাজার বছর আগে আমার দাঁত উঠেছে যে! নতুন দাঁত উঠলে সুরসুর করে খুব। তখন কামড়াতে ইচ্ছে হয়। তবে ভয়ের কিছু নেই। একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে।

মিঠুন আর সময় নষ্ট করল না। দ্রুত পা চালিয়ে চলে গেল মাঠে। আর গিয়েই দুঃসংবাদটা পেল। তমাল নামে যে বাঁ-হাতি প্লেয়ারের পেটচুক্তি খেলার কথা ছিল তার ভয়ংকর পেটখারাপ। সে খেলতে বা খেতে কোনওটাই পারবে না। টিমের সদস্যদের দেখে মনে হচ্ছে ওয়াটারলু যুদ্ধে সদ্য বিধ্বস্ত নেপোলিয়ানের সৈন্য সব। খেলবে কী, উঠে দাঁড়াবার তাকতটুকু নেই। সবচেয়ে মর্মান্তিক, ওদের সেই ন্যাটা দিব্যি আছে; স্যাডো করছে, আর মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে মিঠুনদের দিকে। সে দৃষ্টি যেন রক্তচোষার দৃষ্টি। দেখলে বুক শুকিয়ে যায়।

টস হল। আমরা ক’জনের ক্যাপ্টেন কুশল টসে জিতল। কিন্তু অন্ধের কিবা দিন, কিবা রাত! সবাই জানে, ব্যাটিং নিলেও হার, বোলিং নিলেও তাই। কুশল মিঠুনকে জিগ্যেস করল, কী করি বল তো! মিঠুন বলল, এক কাজ কর, তুই নিজে টস কর একটা। হেড পড়লে ব্যাট, টেল পড়লে বল। সেটাই করা হল, টেল পড়ল।

যাই হোক ফিল্ডিং নিল কুশল।

সেই বাঁ-হাতি একজনকে সঙ্গে নিয়ে নামল ওপেন করতে। পপিং ক্রিজে স্টান্স নিয়ে দাঁড়াল সে। ক্যাপ্টেন কুশল বল তুলে দিল চিন্ময়ের হাতে। চিন্ময়ের মুখ দেখে মনে হল, ওকে বুঝি খালি হাতে মাংসাশী ডাইনোসোরের মোকাবিলা করতে বলা হয়েছে। পা টেনে টেনে বোলিং মার্কে গেল সে।

না, ন্যাটা ব্যাট দিয়ে বলকে যতটা থাবড়ানি দেবে ভাবা হয়েছিল ততটা দিল না। একটা মাত্র চার। প্রথম ওভার; তাই বুঝি দেখে খেলল একটু। শেষ বলে সিঙ্গল নিল একটা। এটা দেখেই মিঠুনের হৃৎপিণ্ড জগঝম্প শুরু করে দিল। কারণ পরের ওভারটাই তার।

কিন্তু কী আর করা। বধ্যভূমিতে তো যেতেই হবে তাকে। আকাশের দিকে তাকাল মিঠুন। ঝকঝকে নীল আকাশ। মনে হচ্ছে, আগামী পাঁচ বছরেও বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। আচ্ছা, ভূমিকম্প কি হতে পারে না একটা! বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রথম বলটা করল মিঠুন। না, চার বা ছয় নয়। ব্যাটসম্যান সে সুযোগই পেল না। তবে কি ব্যাটসম্যান পরাজিত হল! না, তাও না। আসলে বলটা গিয়ে লাগল লেগ আম্পায়ারের গায়ে। বোম্বাই ওয়াইড। এক রান একস্ট্রা। মিঠুন ভাবল, ইস, কী করে যে হড়কে বেরিয়ে গেল বলটা!

পরের বলটাও ওয়াইড। থার্ড স্লিপ ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়েও বাঁচাতে পারল না। বল বাউন্ডারি লাইন পেরিয়ে গেল। বাই চার আর ওয়াইড এক। মোট পাঁচ রান।

কুশল দৌড়ে এল। কী রে, কী হচ্ছে তোর! নার্ভাস ফিল করছিস!

মিঠুন বলল, বুঝতে পারছি না, হাতটা যেন মনে হচ্ছে ঠিক কন্ট্রোলে নেই।

কুশল বলল, মাথা ঠান্ডা করে বলটা লেন্থে রাখ।

মিঠুন ঘাড় নাড়ল। কিন্তু পরের বলটা ব্যাটসম্যানের মাথার অনেক ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেল। মনে হল, মিঠুন বল ছুড়ে গাছ থেকে আম পাড়তে চাইছে। আবার দৌড়ে এল কুশল। বলল, তুই আম্পায়ারকে বল, হাতে চোট লেগেছে। বল করতে প্রবলেম হচ্ছে। আমি অন্য কাউকে দিয়ে ওভার কমপ্লিট করিয়ে নিচ্ছি।

মিঠুন বলল, আচ্ছা, আর একটা বল দেখি। যদি না পারি, তখন না হয় অন্য ব্যবস্থা করবি।

তারপরের দুটো বল মিঠুন কোনও প্রকারে উইকেটে রাখল বটে কিন্তু বাঁ-হাতি দুটোকেই হেলায় বাউন্ডারির রাস্তা দেখিয়ে দিল।

তারপর এক কাণ্ড করল মিঠুন। আম্পায়ারকে জানিয়ে দিল, বাকি বলগুলো সে বাঁ-হাতে করবে। সবাইকে অবাক করে পরের বলটা বাঁ-হাতে করল মিঠুন। মারাত্মক ডেলিভারি। ব্যাটসম্যান পুরো বোম্পাচাক। অফস্ট্যাম্পের গায়ে নিশ্বাস ফেলে উইকেট কিপারের হাতে চলে গেল বল। তারপরের দুটো বলও খতরনাক। ভাগ্য জোরে বেঁচে গেল ব্যাটসম্যান। ওভারের শেষ বল নিখুঁত ইয়কার। বাঁ-হাতির মিডল স্ট্যাম্প গড়াগড়ি খেল। মাঠে প্রবল হাততালি আর উল্লাসধ্বনি। ওভার শেষ হতেই দৌড়ে এল কুশল। কী ব্যাপার রে!

মিঠুন বলল, ডান হাতে ঠিক তাল পাচ্ছিলাম না যেন! দেখলাম, বাঁ-হাতটা উসখুস করছে। তাই বাঁ-হাতেই ট্রাই করলাম।

তেরো ওভারে মাত্র সত্তর রানে চিৎপাত হয়ে পড়ল ইয়াং স্টার। মিঠুনের পনেরো রানে সাত উইকেট। কিন্তু ব্যাট করতে নেমেই হোঁচট খেয়ে পড়ল আমরা ক’জন। তেরো রানে চার উইকেট। ব্যাটসম্যান কুলকিনারা করতে পারছে না সেই বাঁ-হাতির। তার একারই তিন উইকেট।

মিঠুন নামল ব্যাট হাতে। বেশ যেন অকুতোভয়। সবাইকে অবাক করে বাঁ-হাতে ব্যাট ধরল মিঠুন। বল হাতে সেই রক্তচোষা বাঁ-হাতি। তখনও ওভারের দুটো বল বাকি। বল দুটো যে খারাপ ছিল তা বলা যাবে না, কিন্তু মিঠুন যেন ব্যাট দিয়ে মাছি তাড়াবার ভঙ্গিতে দুটোকেই বাউন্ডারি টপকে দিল।

দশ ওভারেই ম্যাচ খতম।

পা চালিয়ে বাড়ি ফিরছিল মিঠুন। কী করে কী ঘটে গেল এখনও বুঝতে পারছে না সে। মাঠে নামার পর ডান হাতটা কেমন যেন ভারী ভারী লাগছিল, কিছুতেই বশে থাকছিল না।

চৌধুরী বাগানে এখন আরও ঘন অন্ধকার। ঠিক সেই জায়গায় এল যখন সেই বাচ্চা ভূতটা বলে উঠল, জিতে গেলে ম্যাচ।

মিঠুন বলল, জিতেছি মানে, একেবারে মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছি!

জানি তো, আমিও দেখছিলুম খেলা। তুমি তো বাঁ-হাতে কামাল করে দিলে।

মিঠুন বলল, হ্যাঁ, কীভাবে যে কী হল কিছুই বুঝতে পারছি না!

আবার বাচ্চা ভূতের খিলখিল হাসি। বলল, আরে তোমাকে বলা হয়নি, বাচ্চা ভূতে কামড়ালে মানুষ ন্যাটা হয়ে যায়। তবে একদিনের জন্যে। পরদিন আবার যেমন কে তেমন। তোমারও তাই হয়েছে। কাল থেকে তুমিও ঠিক হয়ে যাবে।

মিঠুন হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।

বাচ্চা ভূত বলল, যাও, বাড়ি যাও। বললাম তো কাল থেকে সব ঠিক আবার।

মিঠুন বলল, সে না হয় যাচ্ছি; কিন্তু একটা কথা বলব?

বলো।

বলছি, যেদিন যেদিন ম্যাচ থাকবে, সেদিন একটু কামড়ে দেবে আমাকে?

ভূত বলল, তথাস্তু!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%