উল্লাস মল্লিক

সেদিন সাবর্ণস্যার ক্লাসে আসতেই কিরু বলে উঠল, আমি বলব স্যার!
সাবর্ণস্যার অবাক হয়ে বললেন, কী বলবি কিরু!
পড়া স্যার।
স্যার বললেন, পড়া তো এখনও ধরিনি রে কিরু!
কিরু বলল, একটু পরেই তো ধরবেন; আপনি তো আর লজেন্স বিলি করতে আমাদের ক্লাসে আসেননি; পড়া ধরতেই এসেছেন। তাই স্যার, আগে ভাগেই ইট পেতে রাখলাম।
সাবর্ণস্যার ভুরু কুঁচকে তাকালেন কিরুর দিকে। তারপর বললেন, বাবা, খুব কথা শিখেছিস যে!
কিরু বলল, সবই আপনাদের আশীর্বাদ।
স্যার বললেন, আচ্ছা বল, পলাশীর যুদ্ধ সম্পর্কে কী জানিস?
কিরু বলল, স্যার, এটা কি একটা প্রশ্ন হল! এর উত্তর তো সবার জানা। পলাশীর আমবাগানে হয়েছিল যুদ্ধটা। যারা ‘বন পলাশীর পদাবলী’ সিনেমাটা দেখেছে তারা সবাই জানে।
সাবর্ণস্যারের মুখটা রাগে থমথম করে উঠল। বললেন, হতভাগা, লেখাপড়া ছেড়ে এখন সিনেমা-বায়োস্কোপ নিয়ে পড়েছিস নাকি!
না স্যার, আমি ওসব দেখি না। কিন্তু স্যার আমি নিশ্চিত ওই সিনেমাতে সব বলা আছে। আপনি বরং অন্য প্রশ্ন করুন।
সাবর্ণস্যার বললেন, আচ্ছা শিবাজীর রণকৌশল সম্বন্ধে কী জানিস বল।
কিরু বলল, স্যার, এমন প্রশ্ন করে লজ্জা দেবেন না।
স্যার অবাক হয়ে বললেন, প্রশ্নে আবার লজ্জা কী, কার কাছে লজ্জা, কেনই বা লজ্জা!
কিরু বলল, আমার মামাতো বোনের কাছে লজ্জা স্যার। আমার থেকে তিন ক্লাস নিচে পড়ে। সেদিন সে-ও দেখলাম, এটা, মানে, শিবাজীর রণকৌশল মুখস্থ বলছে। তাই অত নিচে আমি নামতে পারব না স্যার।
সাবর্ণস্যার বললেন, এ তো মহা মুশকিল! তাহলে বল দেখি, ইতিহাসের সবচেয়ে সাহসী এবং বীর রাজা কে?
কিরু একটু হেসে বলল, স্যার, এটাও খুব সহজ প্রশ্ন। উত্তর দেওয়া শোভা পায় না আমার। কিন্তু স্যার, আপনার যখন আমার উপযুক্ত কঠিন প্রশ্ন মাথায় আসছে না, তখন এটার উত্তর আমি দেব।
স্যার রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বললেন, দে বাবা, দে। দিয়ে উদ্ধার কর আমাকে।
কিরু বলল, শুধু ভারতবর্ষের নয় স্যার, পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যত রাজা এসেছেন, তাদের মধ্যে সবচাইতে সাহসী ছিলেন সম্রাট কণিষ্ক।
সাবর্ণস্যার আঁতকে উঠলেন, বলিস কী, বলিস কী? এ তথ্য তুই কোথা থেকে পেলি? কোন বইতে লেখা আছে এ সব!
কিরু একটু হেসে বলল, তথ্য-টথ্যর কী দরকার? এ তো কমন সেন্স! এর জন্য বই পড়ারও প্রয়োজন পড়ে না।
স্যার বললেন, ঠিক আছে, তুই বল আগে, শুনি।
কিরু বলল, যুদ্ধের সময় একজন যোদ্ধা সবচাইতে কীসের ভয় পায় বলুন তো?
স্যার বললেন, কীসের?
মুন্ডুর ভয়। ধড় মুন্ডু আলাদা হয়ে যাবার ভয়। ঠিক নয় কি, বলুন আপনি।
সাবর্ণস্যার বললেন, মানে!
মানে স্যার, ধরুন মুখোমুখি দু’জন যোদ্ধা। হাতে খাপখোলা তলোয়ার। দু’জনেই সুযোগের অপেক্ষায়। কে কার ধড় থেকে মুন্ডু নামিয়ে দেয়, ঠিক কিনা স্যার!
সাবর্ণস্যার মাথা নেড়ে বললেন, ঠিক বটে!
এটাই হল পয়েন্ট স্যার। কিরু বলল, মানে স্যার, সম্রাট কণিষ্কের প্লাস পয়েন্ট। আপনি কোথাও কণিষ্কের মাথা দেখাতে পারেন? কোনও ছবিতে, কোনও বইয়ে? কোথাও দেখতে পারবেন না স্যার। মুন্ডুহীন সম্রাট তাই নির্ভয়ে যুদ্ধ করতেন। তাঁর মুন্ডু যাবার কোনও স্কোপই ছিল না। তাই জন্যেই বলছি স্যার, ইতিহাসে তিনিই সবচাইতে বীর রাজা।
দেখলাম, সাবর্ণস্যার কুলকুল করে ঘামছেন। কাঁপা হাতে রুমাল বের করে মুখ মুছলেন। তারপর চিৎকার করে উঠলেন, হতভাগা, বেরো ক্লাস থেকে! বেরিয়ে যা!
কিরু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথা চুলকোতে লাগল।
স্যার আবার হুংকার দিয়ে উঠলেন, কী রে, কথা কানে গেল না?
কিরু বলল, কোথায় যাব স্যার, এই দুপুর রোদে?
সাবর্ণস্যার বললেন, গোল্লায় যা।
কিরু বলল, কোন গোল্লায় যাব স্যার—রসগোল্লায় না কাঁচাগোল্লায়?
স্যার বললেন, যেখানে খুশি যা! রসগোল্লা, কাঁচাগোল্লা, পাকাগোল্লা—যেখানে খুশি।
পাকাগোল্লা কোন দোকানে পাওয়া যায় স্যার?
মানে! সাবর্ণস্যারের ভুরু দুটো কুঁচকে উঠল।
মানে স্যার, রসগোল্লা আর কাঁচাগোল্লা তো মিষ্টির দোকানে পাওয়া যায়। কিন্তু পাকাগোল্লা তো কোনওদিন খাইনি। চোখেও দেখিনি। তাই বলছিলাম স্যার, পাকাগোল্লার ঠিকানাটা যদি একটু বলতেন।
স্যার বললেন, হতচ্ছাড়া! বেরো বলছি আগে, দূর হ!
স্যার, ঠিকানাটা পেলেই চলে যাব।
সাবর্ণস্যার বললেন, যমের দক্ষিণ দুয়ারে যা।
সেখানে গেলে কি পাকাগোল্লা পাওয়া যাবে স্যার!
গিয়ে দেখ।
কিরু বলল, আচ্ছা স্যার, একটা কথা জিগ্যেস করব?
স্যার বলল, আর কোনও কথা নয়। তুই ভাগ এখান থেকে। ক্লাসের ক্ষতি হচ্ছে। আমি পড়াব এবার।
উত্তরটা দিয়েও তো পড়ানো যায় স্যার। পড়ানোর সঙ্গে উত্তর দেওয়ার তো কোনও বিরোধ নেই। আপনার যদি ভাত খাবার আগে হাঁচি আসে, আপনি কি হাঁচবেন না! নাকি ভাত খাওয়া পর্যন্ত হাঁচিটা মুলতুবি রাখবেন!
সাবর্ণস্যার কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে বললেন, ওরে, থাম কিরু, থাম! আমার মাথা ঘুরছে। বল, বল, কী বলবি বল।
বলছিলাম কী স্যার, যমের দক্ষিণ দুয়ারে তো যেতে বললেন, যমের অন্য দুয়ারগুলো কেমন?
স্যার বললেন, মানে!
মানে স্যার, দক্ষিণ দুয়ার যেমন আছে, তেমনই নিশ্চয়ই পুব, পশ্চিম, উত্তর দুয়ারও আছে। সে সব দুয়ারে কি যাওয়া যাবে? বিশেষ করে, যদি দেখি, দক্ষিণ দুয়ারে ব্যাপক লাইন, তাহলে তো স্যার, অন্য দুয়ারগুলো দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করা যেত।
স্যার বললেন, তুই বড্ড বাজে বকছিস কিরু! বেরিয়ে যেতে বললাম, বেরিয়ে যা। আমার অনেক কাজ।
কিরু বলল, স্যার, কাজ কি আমারও কম নাকি! প্রচুর কাজ আমার। কিন্তু সব কাজ ফেলে শুধু আপনার কথা রাখতে আমাকে যমের দক্ষিণ দুয়ারে যেতে হচ্ছে।
স্যার বললেন, যা যা, দূর হ।
কিরু বলল, স্যার আর একটা কথা, কী করে যাব? ক’নম্বর বাস ধরব। ট্রেনেও চাপতে হবে নাকি?
স্যার বললেন, বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে জিগ্যেস কর। ওরাই বলে দেবে।
কিরু বলল, কিন্তু স্যার, আমার কাছে তো পয়সা নেই। বাস ভাড়াটা দিন না, যাওয়া-আসা দু’পিঠেরই দেবেন কিন্তু। আমি বড় হয়ে যখন চাকরি করব, তখন শোধ করে দেব।
সাবর্ণস্যারের মুখ রাগে থমথম করছে। তিনি সোজা গেলেন কিরুর কাছে। বেঞ্চের ভেতর থেকে নড়া ধরে টেনে বের করলেন কিরুকে। তারপর বের করে দিলেন ক্লাসের বাইরে। বললেন, তোর মুখ আর এক মুহূর্তও দেখতে চাই না আমি।
কিরু বলল, আমিও কি স্যার আপনার মুখ দেখতে চাই? আপনি স্কুলে না এলে সেদিন আমার খুব মজা। আপনি স্কুলে এলেই আমাদের ক্লাসে আসবেন, আর বেছে বেছে আমাকে পড়া ধরবেন। স্যার আপনার জ্বর সর্দিও কি হয় না? কিংবা ধরুন, একটু ম্যালেরিয়া, জন্ডিস বা পেটব্যথা...!
স্যার বেশ রেগে গিয়ে বলে উঠলেন, ওরে আমার অকালকুষ্মাণ্ড, তুই আমার রোগভোগ কামনা করছিস? হেডস্যারকে বলছি, যাতে আজকেই তোকে টিসি দিয়ে দেন।
কিরু বলল, আচ্ছা স্যার, রোগভোগ না হয় নাই হল, কিন্তু স্কুলে আসার পথে একআধ দিন হোঁচটও তো খেতে পারেন। মুখ থুবড়ে পড়লেন, একটু কেটে ছড়ে গেল। ডাক্তার দু’দিন বাড়িতে রেস্ট নিতে বললেন। ব্যস, দু’দিন কামাই আপনার। আমরাও তাহলে একটু হাঁপ ছাড়তে পারি।
সাবর্ণস্যার বললেন, ওরে মর্কট, তুই যাবি, নাকি...
কিরু বলল, স্যার, যাব তো বটেই। আমারও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। কিন্তু বলছিলাম কী, ব্যাগটা থাকবে, নাকি নিয়ে যাব?
নিয়ে যা, নিয়ে যা, হতভাগা! কোনও চিহ্নই থাকবে না তোর। বলে, স্যার নিজেই বেঞ্চি থেকে তুলে নিলেন কিরুর ব্যাগটা।
কিরু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, স্যার, সাবধান ভেতরে কাঁকড়া বিছে আছে কিন্তু!
শোনামাত্রই ব্যাগটা হাত থেকে ফেলে দিলেন সাবর্ণস্যার। সেইসঙ্গে কেমন একটা বিকট চিৎকার করে উঠলেন। আমার ধারণা, একমাত্র দু’ফুট দূরে ইয়েতি দেখলে মানুষের ভেতর থেকে এমন শব্দ বের হয়।
ব্যাগটা মেঝেতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে বেরিয়ে এল কিছু বই খাতা আর একটা ছোট প্লাস্টিকের কৌটো।
সাবর্ণস্যার বললেন, সত্যিই তুই কাঁকড়াবিছে এনেছিস স্কুলে!
হ্যাঁ স্যার, ওই কৌটোটার মধ্যে আছে।
ঘটনা হল, কিরু বিড়াল কুকুর পোষে। ইঁদুর পোষে। স্কুলের মাঠ থেকে একবার একটা হেলে সাপও ধরেছিল। সুতরাং তার ব্যাগে কাঁকড়াবিছে থাকা বিচিত্র কিছু নয়।
স্যার বললেন, তুই বাবা আগে নিয়ে যা এগুলো।
কিরু আবার ক্লাসে ঢুকে ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে নিল। তারপর বলল, স্যার দেখলেন তো, মাথা থাকার কত ঝামেলা। আপনার যদি মাথা না থাকত, আপনি কিছু দেখতেও পেতেন না, শুনতেও পেতেন না। তাহলে ভয়ও পেতেন না। সম্রাট কণিষ্কর ঠিক সেটাই হয়েছিল। ঠিক কিনা বলুন স্যার!
সাবর্ণস্যার একটু কাঁপা গলায় বললেন, ঠিক বাবা, ঠিক।
কিরু বেরিয়ে যেতে যেতে বলে, ওই জন্যেই বলে স্যার, কিরুর কথা বাসি হলে মিষ্টি হয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন