উল্লাস মল্লিক

নাহ্, দেশটার আর কিছু হবার নয়। সব কিছুতেই লাইন। ব্যাঙ্কে লাইন, পোস্ট অফিসে লাইন, সিনেমা হলে লাইন, পাবলিক টয়লেটে লাইন; আর এখন মরেও লাইন।
গঙ্গারামের গঙ্গাপ্রাপ্তি হয়েছে ঘণ্টা তিনেক আগে। শরীর ছেড়ে বেরিয়ে এসে গঙ্গারাম দেখল, বডিটা খাটে, মুখ একটু হাঁ, চোখ দুটো আধবোজা। বউ বনলতা মাথার কাছে আর বউমা ছন্দসী পায়ের কাছে বসে কাঁদছে। গঙ্গারাম বুঝল, জীবদ্দশায় যে যত বেশি জ্বালায় সে-ই পায়ের কাছে বসে কাঁদে। এটাই নিয়ম। একটু পরে ডাক্তারবাবু এলেন, পরীক্ষা করে ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে চলে গেলেন।
ঘরে পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন গিজগিজ করছে। এখন গঙ্গারামের সুখ্যাতি সবাই করছে—গঙ্গারামের মন কত ভালো ছিল, কেমন পরোপকারী ছিল, তাঁর কাছে সাহায্য চেয়ে কেউ কখনও খালি হাতে ফিরে আসেনি ইত্যাদি ইত্যাদি।
পাড়ার ক্লাবের সেক্রেটারি মানিকলাল দাস বললেন, আমাদের ক্লাবকে প্রতিবছর ডোনেশন দিতেন উনি। গানবাজনার সমঝদার ছিলেন। প্রতি বছর ক্লাবের জলসায় সভাপতি হতেন গঙ্গারামবাবু।
পরাশর নামে পাড়ার একটা ছেলে ভিড়ের মধ্যে থেকে বলে উঠল, ছোটবেলায় একবার আমি ডুবে যাচ্ছিলাম, গঙ্গারামবাবু জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাকে উদ্ধার করেন।
এ কথা শুনে গঙ্গারাম তো বেশ অবাক। কারণ সাঁতারই জানত না সে। তখনই মনে পড়ল, মাস তিনেক আগে তার কাছ থেকে দশ হাজার টাকা ধার নিয়েছিল পরাশর। বলেছিল, পনেরো দিনের মধ্যে ফেরত দেবে। মরার আগে পর্যন্ত সেই টাকা পায়নি গঙ্গারাম। ব্যাটা এ ভাবেই বুঝি ঋণ শোধ করতে চাইছে আজ।
যাই হোক, একটু পরেই ক্লাবের ছেলে ছোকরারা চলে এল। চোখে মুখে ক্যাজুয়াল ভাব। যেন পাড়ার জঙ্গল সাফ করতে এসেছে। শববাহী গাড়িও চলে এল কর্পোরেশন থেকে। নামটি বেশ—স্বর্গরথ। সেই রথে চড়েই শ্মশানে চলে এল গঙ্গারাম। এসে দেখল, এখানেও লাইন। বিরক্তিকর!
হঠাৎ গঙ্গারামের চোখে পড়ল সিড়িঙ্গে টাকমাথা একটা লোক ঘোরাঘুরি করছে। হেঁটো ধুতি, স্যান্ডো গেঞ্জি, হাতে একটা তাপ্পিমারা বাজারের ব্যাগ। প্রথমে গঙ্গারাম ভাবল, কোনও বডির আত্মা-টাত্মা হবে। কিন্তু হাতে বাজারের ব্যাগ কেন! গঙ্গারাম এগিয়ে গেল। বলল, কোন বডিটা তোমার?
লোকটা খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে বুকে টোকা মেরে বলল, বডি তো আমার এটাই। আমি যমরাজের ট্রান্সপোর্ট ডিপার্টমেন্টে চাকরি করি, আমার কাজই হল এখান থেকে আত্মা নিয়ে যাওয়া। খপ করে ধরি, টপ করে ঢোকাই আর হুস করে উড়ে গিয়ে যমরাজের সামনে ব্যাগ উপুড় করে দিই। ব্যস, কাজ শেষ। আবার বেরিয়ে পড়ি ব্যাগ নিয়ে।
গঙ্গারাম বলল, তা তোমার ব্যাগের এমন দশা কেন? একটা ভালো ব্যাগও কি জোটেনি!
সিড়িঙ্গে বলল, আরে, এটা দুদিন আগেও এক্কেবারে নতুন ব্যাগ ছিল। আত্মার তো কোনও ওজন থাকে না। মানে, আগে থাকত না। তাই আগে একসঙ্গে অনেক আত্মা ব্যাগের মধ্যে নিতে পারতাম। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এখন সব কিছুর মতো আত্মাতেও ভেজাল। তাই আত্মারও ওজন হচ্ছে। এবং ক্রমশ তা বাড়ছে। তা হয়েছে কী, একদিন ব্যাগ ভর্তি করে নিয়ে যাচ্ছি, মাঝ পথে ব্যাগ গেল ছিঁড়ে। বহু আত্মা ছিটকে এদিক-ওদিক পালাল। তাদের ধরে আনতে যান কয়লা। আপাতত তাপ্পি দিয়ে চালাচ্ছি।
গঙ্গারাম বলল, তা আমাকে কি এখন খপ করে ধরে ব্যাগে পুরে নেবে?
সিড়িঙ্গে বলল, না না, দেরি আছে। নিয়ম হল বডি পুড়ে যাবার পর আত্মাকে তোলা। আগে আত্মাকে তুলে বেশ কয়েকবার ঝামেলায় পড়েছিলাম। অনেক সময় হয় কী, একটু রসিকতা করার জন্যে আত্মা নিজেই বডি ছেড়ে বেরিয়ে আসে। তখনও হয়তো ওপরে যাবার সময় হয়নি। এদিক-ওদিক ঘুরে বাজারদর, পার্টি পলিটিক্স, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ এ সবের খোঁজখবর নেয়। অনেক সময় আমরাও ভুল করে ব্যাগে ঢুকিয়ে নিই। তখন তো হেভি চেল্লামিল্লি। বাধ্য হয়ে ছেড়ে দিতে হয়। অমনি সুরুৎ করে আবার বডিতে ঢুকে যায় তারা। ডাক্তার হয়তো ততক্ষণে ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছে, কোথাও আবার শ্মশান ঘাটে নিয়ে আসা হয়েছে বডি। এসব ঘটনাই কাগজে পরদিন খবর হয়— ডাক্তার ডেথ সার্টিফিকেট দেবার পর বিছানায় উঠে বসল রুগি। কিংবা চিতায় তোলার আগের মুহূর্তে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে জল চাইল মৃতদেহ। সেইজন্যেই ওপর থেকে নিয়ম করে দেওয়া হয়েছে বডি না পুড়লে আত্মা ক্যাপচার করা যাবে না।
গঙ্গারাম বলল, তাহলে আমাকে ক্যাপচার করতে তো অনেক দেরি!
তা বটে! সিড়িঙ্গে বলল, তুমি ভাই খুব খারাপ সময়ে মরেছ, আর কয়েক ঘণ্টা আগে অক্কা পেলে এখানে এতক্ষণ ভেসে থাকতে হত না। আসলে, যেটা চুল্লিতে আছে সেটার পর আর একটা ঢুকলেই দুটোকে ধরে নিয়ে চলে যাব; কারণ জলসার সময় হয়ে গেছে। ফিরে এসে বাকিগুলোকে নেব।
জলসা! কীসের জলসা?
সিড়িঙ্গে বলল, দশ বছর পরপর ওপরে একটা জলসা হয়। নাচ গানের আসর। অপ্সরা-রম্ভারা নাচে। কিন্নর-কিন্নরীর দল গান গায়। সে এক বিরাট ব্যাপার। দেবতাদের সঙ্গে ওখানকার আত্মারাও সেদিন জলসা দেখার সুযোগ পায়। তুমি আগে গেলে তুমিও পেতে।
গঙ্গারাম বলল, আবার কবে হবে?
আবার দশ বছর পর, এর মধ্যে জাবদা খাতা দেখে যদি মনে হয় তোমার পাপ তাপ কম, তখন তোমাকে আবার মানুষ করে পাঠিয়ে দেবে। তাহলে আর চান্স পাবে না দেখার।
গঙ্গারাম বলল, কিন্তু আমার যে খুব ইচ্ছে করছে দেখার! গান বাজনা খুব ভালোবাসি আমি। কিছু একটা ব্যবস্থা কি করা যায় না?
কী আর ব্যবস্থা হবে, তাহলে তো লাইন ডিঙোতে হয়।
লাইন ডিঙোব কী করে? ওরা লাইন ছাড়বেই বা কেন?
ভাবো, ভাবো, ভেবে দেখো। তোমাদের এখানকার নিয়ম আমি কি সব জানি?
একা গঙ্গার ধারে এসে ধূমপান করছিল জয়ন্ত। গঙ্গারাম কানের কাছে ফিসফিস করে প্রস্তাবটা দিল। ছেলে যতটা চমকাবে ভেবেছিল ততটা চমকালো না। শুধু সিগারেটটা তাড়াতাড়ি ফেলে দিল। দেখে ভালো লাগল গঙ্গারামের। যাক, মরার পর আত্মাকেও শ্রদ্ধা ভক্তি দেখাচ্ছে ছেলে। আজকালকার ছেলেপুলেরা সব বাপ বেঁচে থাকতেই এসবের ধার ধারে না।
ছেলের সঙ্গে কথা বলার আগে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আগের বডিটার আত্মার সঙ্গে কথা বলে নিয়েছিল গঙ্গারাম। লোকটার নাম মাধব। উলুবেড়িয়ার চটকলে কাজ করত একসময়। সামান্য বেতন। মাধব পঞ্চাশ হাজার টাকায় রাজি। নিজের ছেলেকেও রাজি করিয়ে ফেলছে মাধব। বলেছে, ওই টাকায় একটু ধুমধাম করে শ্রাদ্ধ শান্তি করবি বাবা।
জয়ন্ত জিগ্যেস করল, তা তুমি এগোতে চাইছ কেন।
ওপরে গিয়ে জলসা দেখব রে! আমার বড় প্রাণের জিনিস। বাবা, তোর জন্যে অনেক স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রেখে যাচ্ছি। আমার ঘরের সবুজ আলমারির লকারে বেশ কয়েকটা নোটের বান্ডিল আছে। সব দু’হাজার টাকা। ওই টাকাগুলো কাজে লাগা।
এরই মধ্যে জয়ন্ত একজনকে দিয়ে ক’টা বান্ডিল আনিয়ে নিয়েছে বাড়ি থেকে। জয়ন্ত আর মাধবের ছেলের মধ্যে পঞ্চাশ হাজার হস্তান্তর হয়ে গেল। একধাপ এগোল গঙ্গারাম। মাধবের শ্মশানবন্ধুরা একটু অবাক হয়ে গেল। তাদের বলা হল, কাকিনাড়া থেকে মাধবের এক পিসতুতো বোন আসছে, দাদাকে শেষ দেখা দেখতে চায়, কিন্তু রাস্তায় ভয়ানক জ্যাম। তাই তারা লাইন ছেড়ে দিচ্ছে।
পরের বডি টপকানোর জন্যে এক লাখ খসাতে হল গঙ্গারামের ছেলে জয়ন্তকে। বডির নাম, সুকুমার। তার ছেলে তমালের একটা চাকরি আটকে আছে দু’লাখ টাকা ঘুষের জন্যে। এক লাখ জোগাড় আছে, আর এক লাখ বাকি। এটা পেলেই তমালের চাকরি পাকা। তমালকে শুধু শ্মশানবন্ধুদের বলতে হল উদয়নারায়ণপুর থেকে সুকুমারের কোন এক ভাইঝি আসছে কাকাকে শেষ দেখা দেখতে।
এইভাবে এগোতে এগোতে প্রথম বডিটার ঠিক পিছনে জায়গা করে নিল গঙ্গারাম। এখন এটাকে টপকালেই কাজ শেষ। হাতে জলসার টিকিট!
আত্মাকে দেখার জন্য এদিক-ওদিক তাকাল গঙ্গারাম। দেখল একটু দূরে একটা বিশাল বটগাছের উঁচু ডালে বসে পা দোলাতে দোলাতে সুর ভাঁজছে সে। গঙ্গারাম সঙ্কেত পাঠাল লাইন বদলা বদলি করার। কারণটাও বলল। এটাই শেষ ধাপ। তাই প্রথমেই দু’লাখের প্রস্তাব। প্রস্তাব ফিরিয়ে দিল বটগাছের আত্মা।
গঙ্গারাম ভাবল, রেটে বুঝি পোষাচ্ছে না। ব্যাটার আরও টাকার দরকার। প্রস্তাব গেল আড়াই লাখের।
এবারও নাকচ প্রস্তাব।
গঙ্গারাম তৎক্ষণাৎ ‘তিন’ করে দিল।
সেটাও নাকচ।
গঙ্গারাম ভাবল, বাবা! এর তো বিশাল খাঁই।
তাই ব্ল্যাঙ্ক চেক অফার করল। কত চাই ভাই তোমার? বলো, ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
উত্তর এল, যাচ্ছি।
মুহূর্তের মধ্যে ঝপাং করে সে সামনে এসে পড়ল।
এদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে। বডি যদি একবার চুল্লিতে ঢুকে যায় কিছু করার থাকবে না। গঙ্গারাম বলে উঠল, কত চাইছ ভাই?
সুর থামিয়ে আত্মা বলে উঠল, চেনা যাচ্ছে কি?
গঙ্গারাম বলল, কে!
ভালো করে দেখো।
গঙ্গারাম সত্যিই এতক্ষণ ভালো করে তাকায়নি আত্মার দিকে। চুল্লির দিকেই নজর ছিল তার। এবার তাকাল। তাকিয়েই চমকে উঠল। আরে, এ যে তারাপদ! সেই ছোটবেলার বন্ধু। একই পাড়ায় থাকত। তারাপদরও গানবাজনার শখ ছিল খুব। নানা জায়গায় জলসা শুনতে যেত একসঙ্গে। তারপর একসময় ওরা পাড়া ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যায়। সেই থেকে আর যোগাযোগ নেই।
তারাপর বলল, চিনতে পারলি?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুই তো তারাপদ!
যাক।
গঙ্গারাম বলল, দু’বন্ধু তাহলে একই দিনে!
তাই তো দেখছি।
গঙ্গারাম বলল, বলছিলাম কী, আমার প্রস্তাবটা ভেবে দেখেছিস।
একটু চুপ করে থাকে তারাপদ। তারপর বলে, আমিও তো নাচগানের ভক্ত। তুই তো সবই জানিস।
গঙ্গারাম বলে, আরে, বন্ধুর জন্যে না হয় এটুকু করলি—।
তারাপদ বলে, সে হয়তো করাই যায়। কিন্তু বাবলাতলার মাঠে সেই ফাংশনের কথা মনে পড়ে। সেই যে শহর থেকে বড় বড় আর্টিস্ট এসেছিল। দশ টাকা টিকিট। কিন্তু আমাদের কারও কাছেই তখন অত পয়সা ছিল না। ঠিক করেছিলাম, দু’জনেই প্যান্ডেলের বাইরে দাঁড়িয়ে গান শুনব। কিন্তু তুই কোনওভাবে দশটা টাকা জোগাড় করে ফেলেছিলি! আমাকে লুকিয়ে চলে গিয়েছিলি জলসা শুনতে। বড় আঘাত পেয়েছিলাম রে সেই দিন। আজ তাই তোকে লাইনটা ছাড়তে পারছি না। ওপরে আবার দেখা হবে। বাই!
গঙ্গারাম বলার চেষ্টা করল, না, আসলে সেদিন, মানে...
কথা শেষ হবার আগেই দেখল, তারাপদর বডিটা একটু একটু করে ঢুকে যাচ্ছে চুল্লির ভিতর। আর তারাপদর আত্মাটাকে খপ করে ধরে সেই সিড়িঙ্গে লোকটা ঢুকিয়ে নিচ্ছে তাপ্পিমারা ব্যাগে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন