উল্লাস মল্লিক

করুণানন্দবাবু কলম চুষছিলেন। এই এক বদভ্যাস তাঁর। লেখা না এলেই কলম চোষেন। স্কুল জীবনে জ্যামিতি না পারলে পেনসিল চুষতেন। উঃ, সেই সময় জ্যামিতি বলে একটা আতঙ্কবাদী বিষয় ছিল বটে। জ্যামিতি কষার চেয়ে পাগলা ষাঁড়ের মুখোমুখি হওয়া অনেক সহজ বলে মনে হত।
প্রমাণ করো, এবিসি ত্রিভুজ বিসিডি ত্রিভুজের চাইতে বড়। আরে ভাই, খাতায় আঁকলেই তো পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে বড়। শুধু বড় নয়, অনেক বড়। চোখেই তো দেখতে পাচ্ছি। এরপর প্রমাণ করার আছে কী! দরকারই বা কোথায়! কিংবা প্রমাণ করো, এক্স-ওয়াই রেখাটি, ও-কেন্দ্রীয় বৃত্তটিকে আড়াআড়ি দুটি বিন্দুতে ছেদ করেছে। সেটাও তো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ছেদ মানে! ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে একেবারে। এতেও তো প্রমাণের কিছু নেই!
যাই হোক, সেই আতঙ্কের প্রহর বহুকাল আগেই পেরিয়ে এসেছেন তিনি। নানা ঘাটের জল খেয়ে কালে কালে হয়ে উঠেছেন লেখক। এখন আর পেনসিল চোষার দরকার পড়ে না, কিন্তু জব্বর ধরনের প্লট না পেলে অজান্তেই কলম চলে যায় মুখে। আজও তেমনটাই হয়েছিল।
হঠাৎ কে যেন বলে উঠল, স্যর!
ভুরু কুঁচকে এদিক-ওদিক তাকালেন করুণানন্দবাবু। কে ‘স্যর’ বলে ডাকল! কোনও পাঠক নাকি! পাঠকরা আজকাল লেখকদের ‘স্যর’ সম্বোধন করেন বটে। কিন্তু তাঁর তো তেমন কোনও পাঠক নেই। যত পাঠক এই আদিত্য সরকার, বীণা দাশগুপ্ত, রাহুল মুখার্জির মতো লেখকদের। তাহলে বোধহয় মনের ভুল। তাই আবার তিনি লেখায় মনোনিবেশ করার চেষ্টা করলেন।
একটু পরে আবার ডাক, স্যর!
আবার ভুরু কুঁচকে এদিক-ওদিক তাকালেন। রাত প্রায় বারোটা। গোটা পাড়া নিঝুম। বাড়িরও সবাই গভীর ঘুমে। ঘরের দরজায় খিল। কেউ ঢুকে পড়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এটাও ঠিক, মনের ভুল নয়, স্পষ্ট শুনেছেন ‘স্যর’ ডাক।
স্যর, অধম এখানে! আপনার পায়ে কোটি কোটি প্রণাম।
করুণানন্দবাবু আবার এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে বললেন, কোথায় তুমি মূর্তিমান, একটু সামনে এসে উদিত হও।
সামনেই আছি স্যর।
মানে? সামনে তো কাউকেই দেখছি না! চ্যাংড়ামি হচ্ছে নাকি!
না স্যর, চ্যাংড়ামি নয়। সত্যি বলছি, এই তো আমি আছি পেনদানির মধ্যে। আপনার সামনে টেবিলের ওপর।
করুণানন্দবাবুর লেখার টেবিলে একটা টেরাকোটার শৌখিন কলমদানি রাখা আছে। তিন-চারটে পেন গোঁজা তাতে। করুণাবাবু তাকালেন কলমদানির দিকে। এর মধ্যে কি কেউ থাকতে পারে!
পারে, পারে স্যর; ভূত হলে থাকতে পারে। করুণাবাবুর মনের কথা বুঝে নিয়ে কেউ যেন বলে উঠল কলমদানির ভেতর থেকে।
তুমি ব্যাটা ভূত!
হ্যাঁ, স্যর!
হতেই পারে না।
কেন হবে না স্যর!
ভূত বলে কিছু নেই।
আছে স্যর, খুব আছে।
আমি বিশ্বাস করি না।
প্লিজ স্যর, বিশ্বাস করুন।
করুণানন্দবাবু বললেন, ঠিক আছে, প্রমাণ দেখাও।
স্যর, কলমদানিতে ঢুকেছি, সেটাই কি যথেষ্ট নয়!
না না। তুমি অন্য কিছু ভেলকি দেখাও, তবে বিশ্বাস করব।
ভূত বলল, ভেলকি স্যর দেখাতেই পারি। কিন্তু অনেকেরই ভেলকি দেখে দাঁত কপাটি লেগে যায়।
করুণানন্দবাবু বললেন, আরে ব্যাটা, আমি সে বান্দা নই। তুমি দেখাও তো আগে।
বলার সঙ্গে সঙ্গে করুণানন্দবাবু দেখলেন, কলমদানি থেকে একটা পেন শূন্যে উঠে গেল। তিনবার ডিগবাজি খেয়ে আবার নেমে এল কলমদানিতে।
ভুরু দুটো একটু কুঁচকে উঠল করুণানন্দবাবুর।
ভূত বলল, স্যর, দেখলেন?
দেখলাম। বললেন করুণানন্দবাবু।
বিশ্বাস হল?
একটু হল, কিন্তু পুরোটা হয়নি।
তাহলে?
আর একটা দেখাও।
স্যর, আবার!
হ্যাঁ, আর একটা দেখাও।
স্যর, দেখাচ্ছি। তবে একটা ছড়া বলে রাখি—আনি পানি মানি না, লেগে গেলে জানি না।
বলার সঙ্গে সঙ্গে টেবিলের পেপার ওয়েটটা সটাং করে উঠে করুণানন্দবাবুর কপালে একটা ঠোক্কর দিয়ে আবার টেবিলে বসে গেল।
করুণানন্দবাবু কপালে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, উঃ, কী কাণ্ড! কপালে সুপুরি গজিয়ে গেল!
স্যর, আমি কিন্তু বলেছিলাম—আনি পানি মানি না, লেগে গেলে জানি না। আমরা ছোটবেলায় খেলার সময়, এই ছড়াটা বলতাম। তখন কারোর লেগে গেলে দোষ ধরা যেত না। এবার কি বিশ্বাস হল আপনার স্যর?
একটু একটু হচ্ছে বইকী।
একটু একটু হলেই হবে স্যর। একটু একটু থেকেই একসময় অনেকটু অনেকটু হবে। বলছিলাম কী স্যর, কলম চুষছেন কেন!
করুণানন্দবাবু বললেন, সে শুনে আর কী করবে!
বলুন না স্যর, শুনি একটু। কাজকর্ম তো কিছু নেই তেমন।
করুণানন্দবাবু বললেন, লেখা ঠিকমতো জমছে না, তারপর পাবলিশাররাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। নতুন বই লিখে নিয়ে গেলে ফিরিয়ে দিচ্ছে। বলছে, আপনার আগের বইগুলোই সব লাট হয়ে পড়ে আছে, কোনও খদ্দের নেই। নতুন আর ছাপতে পারব না।
ভূত বলল, হুম, বুঝেছি।
কী বুঝেছ!
আপনার বই বিক্রি হচ্ছে না কেন।
কেন!
বই বেরোবার পর আপনি কী করেন?
করুণানন্দবাবু বলেন, কী আর করব, কিছুই করি না, যেমন খাওয়া-দাওয়া ঘুম স্নান ছিপ ফেলে মাছ ধরা—এ সবই করি।
আরে, না না; ও সব নয়। মানে, প্রচারের জন্য কী করেন?
করুণানন্দবাবু একটু ভুরু কুঁচকে বললেন, আরে আমি কি ভোটে দাঁড়িয়েছি নাকি, যে চোঙা ফুঁকে প্রচার করব!
ভূত বলল, না না, সে প্রচার নয়; মানে, বইয়ের প্রচার। মানে, বিজ্ঞাপন যাকে বলে।
বিজ্ঞাপন! করুনন্দবাবু বললেন, সে তো আমার পাবলিশার করবে।
ভূত বলল, তা হয় তো করে, কিন্তু সে আর ক’টা। আসল দায়িত্ব নিতে হয় খোদ লেখককেই। আপনাকেই আপনার বইয়ের বিজ্ঞাপন করতে হবে। এখন এসবেরই যুগ।
করুণানন্দবাবু বললেন, আরে, আমি কি বেগুনওলা যে বাজারে বসে চিৎকার করব—বেগুন, বেগুন, ভালো বেগুন; টাটকা বেগুন, নিয়ে যান; সকাল থেকে তিন ঝোড়া শেষ, তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি...দেরি করলে পাবেন না! নাকি চুনো মাছ বিক্রেতা? যে বলবে, চলে আসুন, চলে আসুন, টাটকা চুনোমাছ, চুনোমাছ নিয়ে যান...দেরি করলে আর পাবেন না...চুনোমাছ খেলে চোখের দৃষ্টি বাড়বে...দিনের বেলায় আকাশে তারা দেখতে পাবেন!
ভূত বলল, না স্যর, ঠিক ওরকম নয়।
তবে কি দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টার সাঁটব!
না স্যর, অত মেহনতের দরকার নেই। আপনাকে শুধু ফেসবুক করতে হবে একটু।
করুণানন্দ বললেন, কী বুক!
ফেসবুক স্যর।
সেটা দিয়ে কি আমড়া পাড়ে, না মাছ ধরে?
ভূত বলল, কোনওটাই নয় স্যর, এটা প্রচার করে। আপনার বইয়ের প্রচার করে দেবে। আপনার একটা বইয়ের নাম বলুন স্যর।
করুণানন্দবাবু বললেন, শক্তিগড়ের শার্দূল।
কেমন বিকিয়েছে স্যর?
ভালো নয় মোটেও।
তার মানে প্রচার হয়নি। এটাই যদি ফেসবুকে প্রচার করা যেত—দুর্ধর্ষ, দুর্দান্ত! প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে সাড়ে তিন হাজার কপি নিঃশেষিত। দিকে দিকে প্রশংসার ঝড়, লেখকের সই করা কয়েকটা কপি পড়ে আছে মাত্র...তাড়াতাড়ি...পা চালিয়ে...এরকম সুযোগ হেলায় হারাবেন না...এভাবে প্রচার করলে দেখতেন আপনার বইও হু-হু করে কাটছে।
করুণানন্দবাবু অবাক হয়ে বললেন, তাই নাকি? এমনও হয়?
ভূত বলল, এমনটাই হয় স্যর। এটাই এখন রেওয়াজ।
তাই আপনাকেও একটা অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে।
করুণানন্দবাবু প্রায় আঁতকে উঠলেন, অ্যাকাউন্ট, ওরে বাবা! নতুন কোনও অ্যাকাউন্ট আমি খুলতে পারব না। ব্যাঙ্কের একটা অ্যাকাউন্টেই অস্থির হয়ে উঠেছি। একটা কাজে তিনদিন ব্যাঙ্কে ছুটতে হয়। আমার আর অ্যাকাউন্টের দরকার নেই ভাই।
ভূত বলল, না না স্যর, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নয়, ফেসবুক অ্যাকাউন্টের কথা বলছি। ঠিক আছে স্যর, বুঝতে পেরেছি, আপনাকে কিছু করতে হবে না, আমিই যা করার করে দেব। দেখবেন, কেমন হই হই করে বিক্রি হচ্ছে আপনার বই।
করুণানন্দবাবু বললেন, সে তুমি যা ইচ্ছে করগে যাও।
ভূত বলল, তবে স্যর একটা নিবেদন।
করুণানন্দবাবু বললেন, বলে ফেলো।
আপনি কখনও ভূতের গল্প লেখেননি তো?
না। বললেন করুণানন্দবাবু।
কেন স্যর?
আমি তো ভূতে বিশ্বাসই করি না। যেটা বিশ্বাস করি না, সেটা নিয়ে লিখতেও ইচ্ছে করে না।
স্যর, এখনও বিশ্বাস করেন না? এত প্রমাণ দিলাম!
একটু গলা ঝেড়ে নিয়ে করুণানন্দবাবু বললেন, এখন অবশ্য একটু একটু করি।
ওই কথাই তো বলছি স্যর, একটু একটু থেকেই অনেকটু হবে। আপনি স্যর শুরু করে দিন।
কী শুরু করব?
ভূতের গল্প।
এই রে, কোনওদিন তো লিখিনি!
চেষ্টা করুন স্যর, হয়ে যাবে। আমি মেটিরিয়াল সাপ্লাই দেব। আমার নিজের ভূত জীবনের কাহিনি বলব। ভূত হয়ে খুব সুখে নেই স্যর। সেখানেও অনেক অশান্তি। আমাদের রাজ্যেও ল্যাঙ মারামারি, দলাদলি, দাদাগিরি—সব আছে। তার সঙ্গে আছেন হেডস্যর, অঙ্কস্যর, ইংলিশস্যর। দেখা হলেই বলেন, ট্রানস্লেশন বল, কেউ বলে, কান ধরে দাঁড়া। কী যে অশান্তি, কী বলব স্যর। লাইফ একেবারে হ্যান্ডল ম্যান্ডোল হয়ে যাচ্ছে। আমার খুব ইচ্ছে আপনি আমাকে নিয়ে লিখুন। বই হিট করার দায়িত্ব আমার। প্লিজ স্যর।
করুণানন্দবাবু বললেন, একটু ভেবে দেখি।
ভূত বলল, একটু নয় স্যর, অনেকটু।
ছ’মাস পর...
নতুন বই বেরিয়েছে করুণানন্দবাবুর। বইয়ের নাম—ভূত হয়েও শান্তি নেই। প্রচ্ছদেই মাত। কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে সাদা লিকলিকে একটা ভূতের ছবি। কান দুটো ধরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে। এক মাসে সতেরোটা এডিশন শেষ। এখন ফেসবুক খুললেই শুধু করুণানন্দবাবু। সেই সঙ্গে ভূত হয়েও শান্তি নেই।
বিভিন্নজন প্রশংসা করছেন, কত মানুষ কমেন্ট করছেন, লাইক দিচ্ছেন। কেউ বলেছেন, বাংলা সাহ্যিত্যের সম্পদ। কেউ বলছেন, এই বই না পড়লে বাংলা সাহিত্য পাঠ সম্পূর্ণ হয় না। কেউ বলেছেন, বিখ্যাত ডাচ লেখক স্টুয়ার্ট ফ্র্যাঙ্কলিনের চেয়েও প্রতিভাবান এই লেখক। কেউ বলেছেন, পড়লে মনেই হবে না কল্পনা, মনে হবে বাস্তব অভিজ্ঞতা। কল্পনাশক্তি কতটা জোরালো হলে এমন লেখা সম্ভব। একজন তো বলেই দিলেন, বাঙালি তো বহুকাল সাহিত্যে নোবেল পায়নি, এবার বুঝি খরা কাটল। করুণানন্দবাবুর হাত ধরেই বাংলা সাহিত্য আবার জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করবে।
করুণানন্দবাবু ফোনের ব্যাপারে ভীষণ আনাড়ি। তিনি শুধু কল করতে আর রিসিভ করতে পারেন। সেই ভূত এসে ফোন খুলে সব দেখিয়ে দেয়। করুণানন্দবাবু অবাক হয়ে বলেন, এগুলো কী!
ভূত বলে, ফেসবুক অ্যাকাউন্ট স্যর।
কাদের?
ভূতেদের স্যর। আমি আর আমার বন্ধুরা খুলেছি। এগুলোই আসল ভূতুড়ে অ্যাকাউন্ট। এ সব অ্যাকাউন্ট কোনও মানুষের তৈরি নয় স্যর।
করুণানন্দবাবু কী বুঝলেন কে জানে, শুধু বললেন, বেশ বেশ!
ভূত বলল, এ বার পরের বইটার ভাবনা চিন্তা শুরু করে দিন স্যর। অ্যাকাউন্টগুলো তো রইলই। আরও অনেক দুঃখ কষ্ট আছে আমার।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন