উল্লাস মল্লিক

আমার ঠাকুমা বিশ্বরূপা দেবী ছিলেন খুবই ভুলোমনা। মুখে বলতেন, জিনিসপত্র খুব সাবধানে রাখবে। দিনকাল ভালো নয়। মুশকিল হল নিজের জিনিস এমন জায়গায় রাখতেন যে নিজেই খুঁজে পেতেন না। তখন সবাইকে দোষ দিতেন। কানের দুল থেকে চানাচুরের প্যাকেট—সব কিছুই হারাতেন ঠাকুমা। সবই শেষ পর্যন্ত পাওয়া যেত। কিন্তু তার আগে বাড়ির লোকজনকে জেরায় জেরায় আতঙ্কিত করে তুলতেন। এমনকী জঙ্গি পর্যন্ত ছাড় পেত না। জঙ্গি আমাদের পোষা কুকুর। খুবই শান্তিপ্রিয়। বাড়িতে চোর-টোর ঢুকলেও হই-চই করত না।
বহুদিন আগে জঙ্গি আমার একটা লাল প্যাস্টেল খেয়ে ফেলেছিল। সেই থেকে ঠাকুমার ধারণা, জঙ্গি সর্বভুক। তাই জঙ্গিও সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ যেত না। একবার তো আলমারির চাবি হারিয়ে গিয়েছিল। ঠাকুমার সাসপেক্ট জঙ্গি। জঙ্গিকে নাকি আগের দিন চাবির দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে থাকতে দেখেছেন। দাদু খবরের কাগজ পড়ছিলেন। পড়তে পড়তেই বললেন, সর্বনাশ, চাবি ওর পটিতে তালা মেরে না দেয়!
যাই হোক, জঙ্গির সৌভাগ্য যে পটি বন্ধ হয়ে যায়নি। কারণ চাবি পাওয়া গেল রান্নাঘরে কালোজিরের কৌটোতে। ঠাকুমার হারানো জিনিস এমনই সব শিহরন জাগানো জায়গা থেকে উদ্ধার হত। যেমন কানের দুল পাওয়া যেত ডিটারজেন্টের কৌটোয় আর সে কৌটো ফ্রিজের মধ্যে! ওয়াশিং মেসিনের ভেতর থেকে বেশ কয়েকবার হাতা খুন্তি বেরিয়ে এসেছে। এর পর নাকছাবি ফুলদানির ভেতর থেকে উদ্ধার হবে সে আর এমনকী কথা!
শুধু আমার ঠাকুমা নন, চারদিকে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা ভুলো। জিনিসপত্র কোথায় রাখেন মনে থাকে না। একজায়গায় যেতে গিয়ে অন্য জায়গায় চলে যান, দোকানে গিয়ে পাঁচটা জিনিসের মধ্যে তিনটে ভুল; কিংবা সরষের তেলের বদলে টম্যাটো সস। আরও কত মারাত্মক ভুল যে ভুলোমনারা করেন!
অবশ্য এমন ভুল যে শুধু সাধারণ মানুষেই করেন তা নয়, অনেক বিখ্যাত মানুষও এ ব্যাপারে কৃতিত্বের ছাপ রেখে গেছেন। এঁদের কেউ বিজ্ঞানী, কেউ শিল্পী-সাহিত্যিক, কেউ বা বাঘা অধ্যাপক। এক অধ্যাপকের কথা বলি। পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। এক মাথা কাঁচাপাকা চুল, চোখে কালো মোটা ফ্রেমের চশমা, হাতে চকখড়ির গুঁড়ো। তিনি প্রায়ই ক্লাসরুম ভুলে যেতেন। গোটা কলেজই তাঁর এই ভুলোমনের কথা জানত। তাই ভুল ক্লাসে ঢুকলেই ছাত্ররা স্মরণ করিয়ে দিত, স্যার এটা কিন্তু কেমিস্ট্রির ক্লাস। অধ্যাপক ‘সরি’ বলে বেরিয়ে যেতেন। একদিন এমনই ভুল করে ইংরিজির ক্লাসে ঢুকে পড়লেন। যে ইংরিজির অধ্যাপকের সেই ক্লাস নেবার কথা তিনি সেদিন অনুপস্থিত। ছাত্র ছাত্রীরা ভাবল স্যারের সঙ্গে একটু মজা করা যাক। তাই তারা আর ভুল ভাঙাল না স্যারের।
অধ্যাপক বললেন, আজ কী পড়ানোর কথা তোমাদের?
ছাত্ররা বলল, স্যার, প্যারাডাইস লস্ট।
অধ্যাপক বললেন, বাহ, ভালো কথা, বই খোল সবাই।
তারপর প্যারাডাইস লস্টের ওপর টানা লেকচার দিয়ে গেলেন সেই অধ্যাপক। ছাত্ররা অনেক ভেবেও সিদ্ধান্তে আসতে পারল না কার লেকচার বেশি ভালো—পদার্থবিদ্যার এই স্যারের, নাকি তাদের নিয়মিত যিনি ক্লাস নেন তাঁর।
এখন, এই সব বিখ্যাত মানুষ কত কঠিন সূত্র, ক্রিয়া-বিক্রিয়া- প্রতিক্রিয়া মনে রাখেন, কত কালজয়ী গল্প উপন্যাসের ওপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্লাস নিতে পারেন, লেখার সময় বেছেবুছে ঠিক অমোঘ শব্দটি বসিয়ে দেন, একটা চরিত্রের সঙ্গে আর একটা চরিত্রকে কখনও মিশিয়ে ফেলেন না, অথচ এঁরাই সকাল দশটায় প্রেসারের ওষুধ খেয়ে বারোটায় ভুলে যান, উল্টো গেঞ্জি গায়ে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়েন, ছোট অ্যালাচ আনতে বললে গোলমরিচ এনে বসেন, কোনও অনুষ্ঠানে গিয়ে ফেরার সময় দু’পায়ে দু’রকম চটি পরে ফেরেন। কী করে এমন হয়! তাহলে কি নিশিদিন এঁরা সৃষ্টি বা গবেষণার জগতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকেন, দৃষ্টি থাকে পাখির চোখে! তখন জামা গেঞ্জি জুতো গোলমরিচ ফিনাইল বা গায়ে মাখা সাবান সব ঘেঁটে ঘোল হয়ে যায়।
এক বিজ্ঞানীর কথা বলি। নিমন্ত্রণ খেতে গিয়েছিলেন একজনের বাড়ি। খাবার টেবিলে এঁচোড় চিংড়ি খেয়ে বললেন, কুমড়োর ছক্কাটা কিন্তু জমে গেছে; কমলাভোগ খেয়ে বললেন, ল্যাংচাটা কোন দোকানের? খাওয়া দাওয়া শেষ হল, গল্পগুজব করলেন, তারপর বাড়ি ফিরে এলেন দু’পায়ে দু’রকম জুতো পরে।
কিছুদিন পর বৈকালিক ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন, রাস্তায় দেখা হল আর এক বিজ্ঞানীর সঙ্গে। তিনিও সেদিন নিমন্ত্রিত ছিলেন। দু’জন সেদিনের মেনু নিয়ে কিছুক্ষণ কথা বললেন। সত্যিই প্রত্যেকটা পদই ছিল অপূর্ব। যদিও কিছু মতবিরোধও দেখা গেল তাঁদের মধ্যে। প্রথম বিজ্ঞানী যেটাকে কাজু দেওয়া কুমড়োর ছক্কা বললেন; দ্বিতীয় বিজ্ঞানী সেটাকেই বললেন লাউ চিংড়ি। দ্বিতীয় বিজ্ঞানী যেটাকে মোচার ঘণ্ট বললেন, প্রথম বিজ্ঞানীর মতে সেটা নির্ঘাত মটরপনির। দুজনেই আত্মবিশ্বাসী, একটু স্যাম্পেল থাকলে ল্যাব-টেস্ট করে প্রমাণ করে দিতে পারতেন। অবশ্য একটা ব্যাপারে দু’জনেই সহমত যে, প্রতিটা রান্না, সে কুমড়োর ছক্কাই হোক বা মোচার ঘণ্ট, স্বাদে অমৃতসম।
কথাবার্তার মধ্যেই প্রথম বিজ্ঞানীর নজর গেল দ্বিতীয় বিজ্ঞানীর জুতোর দিকে। অবাক হয়ে দেখলেন, ঠিক তাঁরই মতো একজোড়া জুতো। তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। দ্বিতীয় বিজ্ঞানীও দেখে অবাক। তাই তো, দু’জনের জুতো হুবহু এক! তিনি প্রথম বিজ্ঞানীর কাছে জানতে চাইলেন, কোন দোকান থেকে কিনেছেন এই জুতো। জানতে চাওয়ার কারণ আছে। আগের কোনও জুতোই এই জুতোর মতো এত চমৎকার ফিট করেনি পায়ে। উনি ওঁর বৃদ্ধ পিতার জন্য এইরকম এক জোড়া জুতো কিনতে চান। বহু দোকানে ঘুরেছেন, কিন্তু এমন জুতো কারও কাছে নেই। মুশকিল হল, কোন দোকান থেকে কিনেছেন, সেটাও স্মরণ করতে পারছেন না কিছুতেই। তিনি তো ধরেই নিয়েছিলেন, এই বিশেষ জুতো কোম্পানি মাত্র একজোড়া জুতো উৎপাদন করেই বন্ধ হয়ে গেছে। দ্বিতীয় বিজ্ঞানীর ওই একই অবস্থা। এই জুতো তাঁর পায়েও আরামপ্রদ; তিনিও তাঁর খুল্লতাতর জন্যে অনেক খুঁজেও পাননি। তিনিও সিদ্ধান্তে এসেছিলেন, কোম্পানি একজোড়া উৎপাদন করেই তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে।
যাই হোক, আজ দুজনেরই ধারণা ভাঙল, কোম্পানিটা আসলে দু’জোড়া জুতো করে উঠে গেছে।
বিজ্ঞানীদের ভুলোমনের একটা গল্প তোমাদের সবারই জানা। বিজ্ঞানী নিউটন ডিম সিদ্ধ করার সময় জলে ঘড়ি ফেলে হাতে ডিম নিয়ে নিবিষ্ট মনে সময় দেখছিলেন। কিন্তু তারপর? বাকি অংশটা অনেকেরই অজানা। এক সময় চেতনায় ফিরলেন নিউটন। দেখলেন, টগবগে গরম জলে ঘড়ি ফুটছে। ফল যা হবার তাই, ঘড়ি গেল বিগড়ে। নিউটন ভাবলেন, প্রথমেই দোকানে নিয়ে যাব কেন; আগে নিজে একটু চেষ্টা করে দেখি। ঘড়ি খুলে সারিয়েও ফেললেন তিনি। শুধু সামান্য একটা গন্ডগোল থেকে গেল। দেখা গেল, দুটো কাঁটা দু’দিকে ঘুরছে। এ আর এমন কী ব্যাপার। নিউটন চটজলদি অঙ্ক কষে ফর্মুলা বের করলেন একটা। কাঁটার অবস্থান সেই ফর্মুলায় ফেললেই প্রকৃত সময় বেরিয়ে আসবে। শেষ পর্যন্ত খবর এই মহান বিজ্ঞানীর ঘড়িটি তিনবার চুরি হয়ে যায়; এবং তিনবারই ফেরত দিয়ে যায় চোর।
স্কুলে আমার এক বন্ধু ছিল। উজ্জ্বল। ভীষণ ভুলে যেত সে। কোনওদিন বই আনে তো খাতা আনে না, আর খাতা আনলে জ্যামিতি বক্স ভুলে যায়। কোনওদিন আবার ব্যাগটাই ফেলে আসে বাড়িতে। সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ আঁকতে বললে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের ছবি আঁকে। একদিন হেডস্যার ডেকে পিঠে হাত বুলিয়ে জিগ্যেস করলেন, হ্যাঁ রে বাবা উজ্জ্বল, পড়াশোনার সময় মনটা কোথায় থাকে। সত্যি করে বল, কিছু বলব না। উজ্জ্বল একটু মাথা চুলকে বলল, মনটা কোথায় থাকে বলতে পারব না। স্যার; কিন্তু আমি তো মাঠে থাকি। কখনও ইডেনে, কখনও লর্ডসে, কখনও পার্থে। তখন হয়তো আমি আর সচিন একসঙ্গে ব্যাট করছি। বিপক্ষের আক্রমণ ছিন্নভিন্ন করে দুজনেই ডবল সেঞ্চুরির কাছাকাছি। আমি পর পর তিনটে ছয় মারলাম। সচিন এগিয়ে এল আমার দিকে। বলল, ডবল সেঞ্চুরির দোরগোড়ায় এত চালিও না। একটু ধরে খেল। যাবার সময় ব্যাট দিয়ে পিচটা একটু ঠুকে দিল সচিন। এই সময় স্যার বইখাতা কিংবা ব-দ্বীপের দিকে মন দিলেই আউট হয়ে যাব।
শুনে হেডস্যার একটু চুপ করে থাকলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ব্যাপার কী জানিস, তুই ক্রিকেট আমি ফুটবল। আমি তো মারাদোনার সঙ্গে বিশ্বকাপ খেলি। কিন্তু বাজার করার সময় কুমড়োর বদলে লাউ কিনে ফেললে তোর জেঠিমার সে কী অশান্তি। আমি যে তখন ব্রাজিলের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করছি, মারাদোনা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলছে, এমন গোল আমি করতে পারতাম না সেগুলো তোর জেঠিমা কিছুতেই বিশ্বাস করবে না! কী আর করা যাবে বল!
বলে, কেমন উদাস হয়ে গেলেন হেডস্যার।
কিছুক্ষণ পরে উজ্জ্বল মৃদু গলায় বলল, আসব স্যার তাহলে?
হেডস্যার বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, যা; ক্লাস আছে তো?
উজ্জ্বল বলল, না স্যার, ম্যাচ আছে; অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন