উল্লাস মল্লিক

বাংলা পরীক্ষার দিন সকালবেলা ভোম্বলকে পথে বসিয়ে নার্সিংহোমে ভর্তি হয়ে গেল অর্পণ।
ক্লাস এইটে এটা ভোম্বলের থার্ড-ইয়ার। ফার্স্ট ইয়ারে পেয়েছিল কুল্লে উনিশ। বাংলায় তিন, ইংরিজিতে পাঁচ, ইতিহাসে সাত, ভূগোল আর অঙ্কে শূন্য। একটাও ডবল ফিগারে যায়নি। প্রবল হতাশার মধ্যে এক চিলতেই আশার আলো—বাংলার চেয়ে ইংরিজিতে স্ট্রং।
পরের বছর উন্নতি করল ভোম্বল। প্রভূত উন্নতি বলা যেতে পারে। মোট উনচল্লিশ। ডবলেরও বেশি। তবু মন উঠল না স্যারেদের। হেডস্যার ঘাড় নেড়ে বললেন, না রে, আর একটা বছর এইটেই বোস তুই। ভিতটা আরও পাকাপোক্ত হবে, আর ইন্টার-স্কুল চ্যাম্পিয়ানশিপের জুনিয়ার লেভেলটা খেলে দিতে পারবি।
ফুটবলে সারদাময়ী বিদ্যানিকেতনের নাম ছিল। অফিস রুমের একটা আলমারি ভর্তি শিল্ড আর ট্রফি। আগের বছরও চ্যাম্পিয়ান হয়েছে স্কুল। ম্যান-অফ-দ্যা-টুর্নামেন্ট ভোম্বলের মোট চোদ্দো গোল। নাইনের ছেলেরা খেলতে পারে না জুনিয়ার লেভেলে।
এবারও সারদাময়ী বিদ্যানিকেতনকে চ্যাম্পিয়ান করল ভোম্বল। ফাইনালে হ্যাটট্রিক। তার মধ্যে একটা গোল মারাদোনার মতো ছ’জনকে কাটিয়ে। ম্যান-অফ-দ্যা-ম্যাচের ট্রফিটা হাতে নিয়েই গেমটিচার প্রবীরস্যারকে প্রশ্ন করেছিল, স্যার এবার তাহলে উঠছি তো?
আহ্লাদিত প্রবীরস্যার তখন গোটা একটা লাড্ডু মুখে পুরেছেন। সেটা গিলে নিয়ে বললেন, আর তো ওঠার জায়গা নেই রে ভোমলা! ফাইনালে উঠেই তো জিতলাম। আনন্দে কি তোর মাথা ফাতা বিগড়ে গেল?
ভোম্বল বলল, ও ওঠা নয় স্যার, আমার নাইনে ওঠার কথা বলছিলাম।
আচ্ছা, আচ্ছা, সে দেখা যাবে’খন, বলে আবার একটা গোটা লাড্ডু ঢুকিয়ে নিলেন মুখে।
তখনই একটু কু-গেয়েছিল ভোম্বলের মনে। সে জানে এসব খুবই গ্যাঁড়াকলে প্রতিশ্রুতি। মা যখন বাবাকে বলে, নতুন একটা কানের দুল চাই, ঠাকুমা বলে, খোকা একবার পুরীতে নিয়ে যাবি, জগন্নাথ দর্শন করব, বাবা তখন এভাবেই বলে আচ্ছা, আচ্ছা, দেখা যাবে’খন। আজ পর্যন্ত কিছু দেখতে পায়নি ভোম্বলের মা-ঠাকুমা।
ভোম্বল তাই এবার নিজের পথ নিজেই দেখে নিল। সোজা গিয়ে চুক্তি সেরে ফেলল অর্পণের সঙ্গে। অর্পণ থার্ড বয়; খুবই শান্তশিষ্ট ভালোমানুষ ধরনের ছেলে; কেবল একটু খাই-খাই বাতিক। ভোম্বল সরাসরি প্রস্তাব দিল, তুই আমাকে পরীক্ষায় দেখাবি, আমি তোর খাওয়া-দাওয়ার দিকটা দেখব।
তারপর থেকে রেগুলার টিফিনের সময় আলুকাবলি, ঘুঘনি-পাউরুটি, ভেজিটেবিল চপ ইত্যাদি প্রভৃতির জোগান দিয়ে যেতে হয়েছে ভোম্বলকে। অঙ্কর একটা ক্লাস টেস্টে কিছুটা রিটার্নও দিয়েছে অর্পণ। একটা গ.সা.গু আর একটা গতিবেগের অঙ্ক মিলিয়ে দিল ভোম্বল। নম্বর বলার সময় অঙ্ক স্যার তো বলেই ফেললেন, তুই তো কলির কালিদাস হয়ে গেলি রে ভোম্বল।
উৎসাহিত ভোম্বল পরদিনই সমূহ বইখাতা কেজিদরে ঝেড়ে দিল ঠোঙাওলার কাছে। অর্পণ যখন সহায় ওসব বাহুল্য রাখার কোনও মানেই হয় না। তাছাড়া পকেটেও টান পড়ছিল। রোজ অর্পণের আহারের ব্যবস্থা করা বেশ ব্যয়বহুল। কোনওদিন ঠাকুমা, কোনওদিন দাদুর কাছে হাত পেতে, কোনওদিন বাজারের হিসেব গ্যাঁড়াকল করে দিয়ে চালাচ্ছিল এতদিন।
পরীক্ষার দিন সকালে সেই শোক সংবাদটা পেল ভোম্বল। অর্পণ নার্সিংহোমে। সারারাতব্যাপী একুশবার বড় বাইরে যাবার পর আর বাড়িতে রাখা যায়নি তাকে। স্যালাইন চলছে।
আগের দিন বিকেলেও অর্পণকে নিয়ে বাসুদার রোল কর্নারে গিয়েছিল ভোম্বল। বলা ভালো, অর্পণ নিয়ে গিয়েছিল ভোম্বলকে। বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। ইশকুল একসপ্তা ছুটি। প্রিপারেশান লিভ চলছে। সমস্ত বকেয়া সুদে-আসলে গিলছিল অর্পণ। চার নম্বর চিকেন রোলটা খাবার সময়ই সতর্ক করে দিয়েছিল ভোম্বল, কাল পরীক্ষা, মাথায় রাখিস। অর্পণ খুব আত্মবিশ্বাসের হাসি হেসে পকেট থেকে হজমি বড়ি বের করে দেখিয়েছিল।
ভোম্বলের অবস্থা এখন নিধিরাম সর্দারের মতো। ঢাল-তলোয়ার দূর অস্ত একটা লাঠি পর্যন্ত হাতে নেই। উলটোদিকে বাংলা স্যার, অঙ্ক স্যার, ইংরিজি স্যারের মতো বাঘা বাঘা যোদ্ধা। ভয়েস চেঞ্জ, ন্যারেশান, কারক-বিভক্তি, সময় দূরত্ব, অক্ষরেখা দ্রাঘিমার মতো মারণাস্ত্র নিয়ে ধেয়ে আসছে তার দিকে। বইগুলো থাকলে টুকলি করে শেষ লড়াইটা অন্তত দিতে পারত।
পরাজিত সৈনিকের মতো পরীক্ষার হলে গিয়ে বসল ভোম্বল। বিড়বিড় করে একটা প্রার্থনাই করছিল শুধু, এক্ষুনি দেশে একটা দাঙ্গা লেগে যাক বা প্রলয় ভূমিকম্প গোছের কিছু একটা হোক। ঈশ্বর কিন্তু বধির হয়েই থাকলেন। ঠিক সময়মতো বেল পড়ল আর গম্ভীর হলধরস্যার আরও গম্ভীর মুখে প্রশ্নপত্র বিলি করলেন।
সাদা পাতা নিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকল ভোম্বল। মনে মনে হিসেব করার চেষ্টা করছিল অর্পণের পেছনে এযাবৎ মোট কত ইনভেস্ট করেছে সে। গার্ডে ছিলেন হলধরস্যার। একবার কাছে এসে খোঁচা দিয়ে গেলেন, কী বাবা ভোম্বল তোমার এমন বোমভোলা দশা কেন? দু-একটা আঁচড়-টাচড় অন্তত কাটো। নাকি পরিচ্ছন্নতায় ফুল মার্কস নেবার ধান্দা করছ!
ফাইনালে হ্যাটট্রিক করার পর এই হলধরস্যারই মাঠে ঢুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন তাকে। ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ভোম্বল।
আরে বাবা, নাম, রোল নাম্বারগুলো অন্তত লেখো। কে যেন পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল।
একটু অবাক হয়ে গেল ভোম্বল। এদিক ওদিক তাকাল। সবাই তো মন দিয়ে লিখছে। কে বলল তাহলে? কিন্তু স্পষ্ট শুনল যে।
আমি তোমার পাশেই আছি। কিন্তু দেখতে পাবে না আমাকে।
ভোম্বল বলল, যাঃ বাবা, পাশেই আছ, অথচ দেখতে...তুমি কি তাহলে?
ঠিক ধরেছ, ভূত।
ভোম্বল বলল, এখানে কী করছ?
আমি তো এখানেই থাকি।
হঠাৎ হলধর স্যার কাকে যেন ‘অ্যাই’ করে ধমকে উঠলেন।
সেই ফিসফিসে গলা বলল, ওহ, হলধর স্যার আগের মতোই রাগি আছেন দেখছি। একবার হাঁক পাড়লে আমাদের বুকের মধ্যেও কেমন গুড়গুড় করে উঠত।
তুমি এই ইশকুলে পড়তে না কি?
পড়তামই তো, সেই জন্যেই তো মায়া কাটাতে পারছি না।
ভূত হলে কী করে?
সে কাহিনি শুনে আর কী হবে। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল যেন।
ভোম্বল বলল, বলো না শুনি।
না গো, বলতে গেলে আজও আমার বুক ফেটে যায়। বলতে বলতে গলাটা যেন ধরে এল একটু।
ভোম্বলের মজা লাগছিল। কৌতূহলও হচ্ছে বেশ।
তুমি লিখবে না? অনেকটা সময় চলে গেছে কিন্তু।
ভোম্বল বলল, লিখব কী করে; অর্পণটা যে ডুবিয়ে ছেড়ে দিল।
তোমার দশাও আমার মতো দেখছি; বছরের পর বছর আমিও গোল্লা পেতাম। ক্লাস এইটে চার বছর ছিলাম, এখনও সারদাময়ী বিদ্যানিকেতনে এটা রেকর্ড।
ফিক করে হেসে ফেলল ভোম্বল।
আরও একটা রেকর্ড করেছিলাম আমি। পর পর তিনবার চ্যাম্পিয়ান করেছিলাম স্কুলকে। তুমি তো সবে দুবার করেছ। বল পায়ে পড়লে কেউ আমাকে আটকাতে পারত না। নাও লেখো, সময় চলে যাচ্ছে।
পেন বাগিয়ে লিখতে শুরু করে দিল ভোম্বল। কানের কাছে কে যেন ফিসফিস করে বলছে, আর গড়গড় করে লিখে যাচ্ছে সে। শর্ট কোশ্চেনের পর দুটো বড় প্রশ্ন। তারপর রচনা।
ও বাবা, ‘প্রত্যাহিক জীবনে বিজ্ঞান’ এসেছে দেখছি; আমাদের সময়ে এই রচনাটাই এসেছিল। ঝাড়া সাড়ে পাঁচ পাতা লিখেছিলাম।
সাড়ে পাঁ-চ-পাতা! অবাক হয়ে ভোম্বল বলল, তবে যে বললে ফেল করতে বছর বছর।
আরে, নিজে কি লিখেছিলাম, বাসুদেব চক্রবর্তীর ‘রচনা বিচিত্রা’ খুলে লাইন বাই লাইন নামিয়ে দিয়েছিলাম।
টুকেছিলে?
কী করব বলো; কাঁহাতক বছরের পর বছর এক ক্লাসে থিতু হয়ে থাকা যায়; এদিকে পড়া এক লাইনও মাথায় থাকে না।
বই খুলে টুকলে; ধরা পড়ে যাওনি?
সে সব কায়দা ছিল। তার জন্য অবশ্য বাড়িতে ঘড়ি ধরে প্র্যাকটিশ করেছিলাম প্রচুর। বেঞ্চির আড়ালে কোলের ওপর বই রেখে, এক চোখ খাতায় অন্য চোখ বইয়ের পাতায়...আরে চার-পাঁচ জন ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিতে পারলে একজন স্যারকে পারব না? কিন্তু এখন ভাবি, ধরা পড়লেই বোধহয় ভালো ছিল, তাহলে আজ আর আমার এ দুর্দশা...!
কী দুর্দশা?
থাক সে কথা; বলতে গেলে বুক ফেটে যায়। নাও, লেখো; সময় চলে যাচ্ছে।
আবার কলম ছুটল ভোম্বলের। ঠিক সাড়ে পাঁচ পাতার মাথাতেই শেষ হল রচনা। তারপর সন্ধিবিচ্ছেদ, উপসর্গ-অনুসর্গ, সমাস, প্রত্যয়।
ব্যস, এবার খাতা জমা দিয়ে দাও।
ভোম্বল বলে, সে কী, এখনও তো সময় আছে। কারক-বিভক্তি বাকি, ভাবসম্প্রসারণ বাকি, কবিতা অংশের একটা ‘তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো’ লেখা হয়নি।
না, আর লিখে কাজ নেই।
ভোম্বলের যেন নেশা লেগে গেছে। জীবনে একসঙ্গে এত আগে কখনও লেখেনি। সে বলে ওঠে, সব লিখব আজ।
খরবদার; ওই ভুল আমিও করেছিলাম।
কী করেছিলে।
সব লিখে ফেলেছিলাম রে ভাই। তোমার মতো আমারও নেশা লেগে গিয়েছিল; সংযত রাখতে পারিনি নিজেকে।
তারপর?
তারপর আর কী, রেজাল্ট আউটের দিন দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করছি, মনে আশঙ্কা পারব তো পাশ করতে, যা লিখেছি, ঠিকঠাক হয়েছে তো, নাকি তাড়াহুড়োতে গোলমাল হয়ে গেছে, প্রশ্নের দাগ-টাগগুলো হয়তো উলটো পালটা হয়ে গেছে...কী জানি...এবার ফেল করলে বাড়িতে জায়গা হবে না, আসার সময় দেখে এসেছি বাবা বেতের ছড়িতে তেল মাখাচ্ছে—এইসব ভাবছি, এমন সময় হেডস্যার নাম ডাকতে শুরু করলেন। আর উঃ। কী বলব, বলতে গেলে এখনও...
কী-কী? ভীষণ কৌতূহলের গলায় বলে ওঠে ভোম্বল।
প্রথমেই আমার নাম! আমি ফার্স্ট! বাংলায় ৯২, ইংরিজিতে ৯৪, ইতিহাসে ৯০, ভূগোলে ৯৭...নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছি না। কে যেন ঠেলে পাঠিয়ে দিল স্যারের দিকে; মার্কসিট হাতে নিয়ে দেখি, হ্যাঁ, সত্যিই তো আমি ফার্স্ট। এই তো ওপরে আমরাই নাম; বাংলায় ৯২, ইংরিজিতে ৯৪, ইতিহাসে...একেবারে হার্টফেল। আর কী বলব, তখন যে আমার কী হচ্ছে। বিস্ময়ে আনন্দে উত্তেজনায় মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম সেখানেই।
অ্যাঁ!
হ্যাঁ, একদিন ছুটি দেওয়া হয়েছিল ইশকুলে। একটা যেন দীর্ঘশ্বাসের শব্দ পেল ভোম্বল। হঠাৎ সে টের পেল, কে যেন চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকাচ্ছে আর গর্জন করছে, হতভাগা, এক লাইনও লেখার নাম নেই, পরীক্ষা হলে ঘুম। লাল লাল চোখ মেলে তাকাল ভোম্বল।
স্যার বলছেন, লেখ হতচ্ছাড়া।
চোখ-টোখ রগড়ে ভোম্বল সাদা পাতা বাড়িয়ে দিল স্যারের দিকে।
স্যার অবাক হয়ে বললেন, কী হল রে।
আর এক বছর জুনিয়ার লেভেলে খেলব স্যার। বেশ আত্মবিশ্বাসী গলায় ভোম্বল বলল, আমিও রেকর্ড করতে চাই, তিনবার চ্যাম্পিয়ান করতে চাই ইশকুলকে। তারপর দেখা যাবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন