ছাতা ও শুভঙ্করবাবু

উল্লাস মল্লিক

বাস থেকে নেমে শুভঙ্করবাবু বুঝতে পারলেন ব্যাগ থেকে ছাতা হাপিস। আসলে আজ সকাল থেকেই অদৃষ্ট যেন ফেউয়ের মতো লেগে আছে পিছনে। সকালে চা খেতে গিয়ে অসাবধানে জিভ পুড়ে গেল। ‘উ-হু-হু-হু’ করে তাড়াতাড়ি গ্লাস থেকে জল খেতে গেলেন। জল কতটা খেলেন বলা যায় না, কিন্তু বিষম খেলেন মারাত্মক। কেশে কেশে নাক চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল। রান্নাঘর থেকে গিন্নি মধুবালা চিৎকার করে বললেন, ডালে লঙ্কা-ফোড়ন তো এখনও দিইনি, এত কাশি আসছে কোথা থেকে! পেটের মধ্যে কি কাশির গোডাউন বানিয়েছ! সাত সকালেই হাঁচি-কাশি মোটেই ভালো কথা নয়। গৃহস্থের অমঙ্গল হয়। অনেক হয়েছে, এবার হাঁচি-কাশি বন্ধ রেখে বাজারটা করে আনো। না হলে ভালো জিনিস পাবে না।

যাই হোক, কাশি দমন করে ব্যাগ হাতে বাজারে গেলেন শুভঙ্করবাবু। আকাশে কালো মেঘের দল হুড়ুম দুরুম করে এমনভাবে দৌড়ে আসছিল যেন পাগলা কুকুর তাড়া করেছে। ঝুঁকি না নিয়ে ছাতা সঙ্গে নিলেন। সেই সাবেক কালের দীর্ঘ বাঁটওলা কালো ছাতা। তার বহুদিনের বন্ধু। এরকম মজবুত জিনিস আজকাল আর পাওয়া যায় না।

ঘুরে ঘুরে বাজার করা পছন্দ তার। আজও তেমনই করলেন। তারপর ফেরার পথে হঠাৎ খেয়াল হল, কী যেন নেই, কী যেন নেই। হ্যাঁ, মনে পড়েছে ছাতা! ছাতাটা ফেললেন কোথায়? আবার ফিরে গেলেন বাজারে। যার যার কাছ থেকে জিনিস কিনেছিলেন তাদের কাছে গেলেন। প্রত্যেকেই জানাল ছাতার ব্যাপারে তারা কিচ্ছুটি জানে না। তাহলে ছাতা গেল কোথায়? শুভঙ্করবাবুর হঠাৎ মনে হল এখনও তো কাঁচকলা বাকি। বাজারের শেষ প্রান্তে একটা ছেলের কাছ থেকে কাঁচকলা কিনেছিলেন। হয়তো সেখানেই ফেলে এসেছেন।

প্রায় দৌড়ে গেলেন ছেলেটার কাছে। তাকে দেখে চিনতেও পারল ছেলেটি। একগাল হেসে বলল, আর এক ছড়া দেব স্যার? আমার এই কলা আয়রন ভিটামিন প্রোটিনে ভরপুর। এই কলা রেগুলার খেলে পুষ্টি হয় শরীরে। বুদ্ধি আয়ু দুটোই বেড়ে যায়। শুভঙ্করবাবুর তখন অতশত শোনার ধৈর্য নেই। হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, আচ্ছা, এখানে একটা ছাতা ফেলে গেছি?

ছেলেটি বলল, ছাতা এতক্ষণে আপনার বাড়ি পৌঁছে গেছে।

শুভঙ্করবাবু বললেন, মানে!

স্যার, আপনি ছাতা ফেলে যাবার পরই একটা কাস্টমার এল। লোকটা নতুন; আগে কোনওদিন দেখিনি। উনি কাঁচকলা বাছাবাছি করছিলেন। আমি বললাম, এই যাহ্, স্যার, ছাতা ভুলে চলে গেছেন। উনি বললেন, উনি নাকি আপনার বিশেষ পরিচিত, তাই উনিই আপনাকে ছাতাটা দিয়ে দেবেন। আমি তবু বললাম, ঠিক বলছেন তো? উনি বললেন, উনি আপনার বাড়ির একতলায় ভাড়া থাকেন। ব্যস, আমার আর সন্দেহ থাকল না; ছাতাটা দিলাম। বলছি স্যার, আপনার বাড়িতে ভাড়া দেওয়ার মতো আর একটা ঘর হবে? আমার এক বন্ধু ঘর খুঁজছে।

ততক্ষণে যা বোঝার বুঝে গেছেন শুভঙ্করবাবু। তার একতলা বাড়ির নীচের তলার ভাড়াটে কোনওদিনই ছাতা ফেরত দেবে না তাকে।

হতাশ শুভঙ্করবাবু ফিরে আসছিলেন। সেই কাঁচকলা ছোকরা পিছন থেকে ডাকল, একছড়া নিলেন না স্যার, এই কাঁচকলায় বুদ্ধি বাড়ে।

কোনও প্রকারে রাগ সামলে চলে এসেছিলেন তিনি।

ভাত-টাত খেয়ে অফিসে বের হবার সময় গিন্নি বললেন, ছাতা কোথায়? অগত্যা ঘটনা কবুল করতেই হল শুভঙ্করবাবুকে। বউমা পারমিতা আগ বাড়িয়ে বলল, আমার তো চারটে ছাতা, তা থেকে আপনি একটা নিয়ে যান। বউমা একটা ছোট্ট ছাতা এনে ধরিয়ে দিল।

ছাতা হাতে নিয়ে খুব অবাক হয়ে গেলেন শুভঙ্করবাবু। প্রথম কারণ, এত বেঁটে ছাতা আগে দেখেছেন বলে মনে পড়ছে না তার। বেঁটে না বলে বামন বলাই ভালো! আর, দ্বিতীয়ত, একটা মানুষের চারটে ছাতা! একটা ছাতাই তো যথেষ্ট। শুভঙ্করবাবু নিজে চিরকাল একটা ছাতা নিয়েই তো কাটিয়ে দিলেন। শুভঙ্করবাবুর দৃঢ় বিশ্বাস, রাবণ ছাড়া কারোরই একাধিক ছাতার প্রয়োজন পড়ে না। সবই অর্থের অপচয়।

বউমা বলল, এটা থ্রি-ফোল্ড ছাতা। খোলার সময় একটু সাবধানে খুলবেন। শুভঙ্করবাবু ভাবলেন, কী দিন কাল-ই না এল! এ কি হোমিওপ্যাথি ওষুধের শিশি, যে খুলতে হবে সাবধানে! তবে মনে মনে ঠাকুরকে ডাকলেন, যেন এ ছাতা খোলার দরকার না পড়ে। আজই অফিস থেকে ফেরার পথে নতুন ছাতা খরিদ করে নেবেন।

কিন্তু মানুষ ভাবে এক, আর হয় এক। বিশেষ করে বর্ষার দিনে। বাড়ি থেকে বাসস্টপ হেঁটেই যান শুভঙ্করবাবু। মিনিট পনেরো লাগে। আজ বাড়ি থেকে বেরোবার মিনিট পাঁচেক পরই শুরু হল ঝিরঝিরে বৃষ্টি। অগত্যা ছাতা খুলতেই হয়। কিন্তু খুলতে গিয়ে বিপত্তি। কিছুতেই খুলছে না। একটু টানাটানি করলেন। ঝাঁকাঝাঁকিও। ভয়ও পাচ্ছেন। জিনিস নিজের নয়, অন্যের। বউমা সৌখিন। দামও হয়তো অনেক। ভেঙে টেঙে গেলে মুশকিল। হঠাৎ মনে পড়ল সেই মন্ত্রটার কথা। ছোটবেলায় ঠাকুমার কাছে শুনেছিলেন। ঠাকুমাকে নাকি এটা দিয়েছিলেন ঠাকুমার গুরুদেব। খুলে যা সিম সিম। কোথাও কঠিন গেরো পড়ে গেলে ঠাকুমা এই মন্ত্রটা বিড়বিড় করে বলতেন। তখন নাকি খুব জটিল গেরোও খুলে যেত। ঠাকুমার কথা শুনে শুভঙ্করবাবুও ট্রাই করেছিলেন। কয়েকবার খুলে ছিল, কয়েকবার খোলেনি। ঠাকুমা বলেছিলেন, মন্ত্র ঠিক মতো বলা হয়নি।

যাই হোক, এখন মনে পড়ল সেই ছড়া। কিন্তু একটা সংশয় দেখা দিল মনে। দড়ির গেরো খোলার মন্ত্র ছাতায় কাজ করবে কি? তখনই বিশ্বনাথ ডাক্তারের কথা মনে পড়ল তার। কিছুদিন আগে তার পেট ব্যথা হয়েছিল আর গিন্নির জ্বর। বিশ্বনাথ ডাক্তার এসে দু’জনকে একই ওষুধ দিলেন। একটু অবাক হয়ে গিয়েছিলেন শুভঙ্করবাবু। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, আধুনিক ওষুধ এরকমই। বিভিন্ন জায়গায় আলাদা আলাদা কাজ করে। এখন সেই ভরসায় শুভঙ্করবাবু ঠাকুমার সেই মন্ত্রটা আওড়ে ছাতা খোলার চেষ্টা করলেন। ছাতাটা সাৎ করে ওপর দিকে উঠে একটু মাথা ঝাঁকিয়ে খুলল।

খুলল, কিন্তু সবটা নয়, আধখানা। এবং শুভঙ্করবাবুর ডানদিকে যে ব্যক্তি শশব্যস্ত হয়ে যাচ্ছিলেন, শিকের খোঁচা লাগল তার চোখে। এক চোখ চেপেই তেড়ে এলেন তিনি। বিস্তর গাল মন্দ করলেন শুভঙ্করবাবুকে। বললেন, জানেন, আমার মামা উকিল।

শুভঙ্করবাবু ভয়ে চুপসে গেলেন। বললেন, ও, আচ্ছা আচ্ছা।

আমি আপনার বিরুদ্ধে কেস করতেই পারি।

শুভঙ্করবাবু বললেন, সে তো বটেই, সে তো বটেই।

কিন্তু কেস আমি করব না।

ঝামেলা দেখে বেশ কিছু লোকজন জড়ো হয়ে গিয়েছিল। তাদের একজন বলে উঠলেন, কেন করবেন না! মামলা তো একটা করাই উচিত। চোখ বলে কথা!

খোঁচা খাওয়া ভদ্রলোক বললেন, আমার দুপুরে একটা নেমন্তন্ন আছে। বটেশ্বরবাবুর নাতির মুখে-ভাত।

আর একজন বললেন, আরে আপনি মামলাটা ঠুকে দিয়ে তারপর নেমন্তন্ন বাড়ি যান।

খোঁচা খাওয়া ভদ্রলোক বলে উঠলেন, ধুর মশাই, একদম লেট করা যাবে না, বটেশ্বরবাবুর বাড়ি অনেকবার নেমন্তন্ন খেয়েছি, ওদের বাড়ির লোকজন সব বসে যায় ফার্স্ট ব্যাচে, আর ওদের সেকেন্ড ব্যাচ থেকেই টানাটানি পড়ে যায়।

বলেই, হন-হন করে হাঁটা দিল লোকটা।

ততক্ষণে বৃষ্টি ধরে এসেছে। ছাতার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। এই আধখোলা ছাতার কী ব্যবস্থা হবে সেটা নিয়ে ভারি চিন্তিত হয়ে পড়লেন শুভঙ্করবাবু। কারণ যে-কোনও দরকচা মার্কা জিনিসের মতো দরকচা মার্কা ছাতারও কোনও ভ্যালু নেই। হয় সবটা খোলা চাই, নয় তো পুরোটা বন্ধ। কী মনে করে ছাতার হ্যান্ডেল ধরে আর একবার ঝাঁকুনি দিলেন শুভঙ্করবাবু, এবার সটাং করে খুলে গেল ছাতা। কিন্তু ছোট্ট একটা বিপত্তি-ও ঘটে গেল। ঠিক সেই সময়ই একটা ষাঁড় এসে পড়ল সামনে। ষাঁড়টা এমনিতেই একটু রগচটা। তারপর বৃষ্টিবাদলা তার একেবারেই পছন্দ নয়। মাথা এমনিতেই গরম ছিল। হঠাৎ ছাতাটা এগিয়ে আসাতে তার বোধহয় মনে হল কেউ তাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। চ্যালেঞ্জ নিতে সে সদা প্রস্তুত। অতএব শিং বাগিয়ে এগিয়ে এল। কিন্তু শুভঙ্করবাবুর চ্যালেঞ্জ ছিল ষাঁড় নয়, ছাতার সঙ্গে। অতএব তিনি দৌড় দিলেন।

পলায়নরত শত্রুকে আঘাত করতে নেই—এই সুশিক্ষা ষাঁড়ের ছিল না। সে-ও দৌড় দিল। কিছুটা দৌড়ানোর পর শুভঙ্করবাবুর উপলব্ধি হল, এই ষাঁড়ের সঙ্গে খোলা ছাতা হাতে দৌড়ে পাল্লা দেওয়া অসম্ভব। প্রাণ অথবা ছাতা, যে-কোনও একটার মায়া ত্যাগ করতে হবে। বউমার যেহেতু আরও তিনটে ছাতা আছে, তাই ছাতার মায়াই ত্যাগ করলেন আপাতত। ছাতা ফেলেই দৌড় দিলেন।

সামনে একটা বাড়ির ছাদে মই ঠেকানো ছিল। মই বেয়ে উঠে পড়লেন ছাদে। তখনই একটা দৃশ্য চোখে পড়ল তার। একটু দূরেই খোলা ছাতাটা পড়ে আছে রাস্তার ধারে আর সেই বেপরোয়া ষণ্ড সেটার সামনে দাঁড়িয়ে ফোঁস ফোঁস করে গর্জন করছে। হঠাৎ আরও একটা কাণ্ড ঘটতে দেখলেন শুভঙ্করবাবু। পাশ দিয়ে একটা অল্পবয়সি ছেলে ছাতা মাথায় দিয়ে যাচ্ছিল। কোন বিবেচনায় কে জানে, সেই ক্রুদ্ধ ষাঁড় তাকেই তাড়া করল। শুভঙ্করবাবু আর দেরি করেননি। মই বেয়ে নিচে নেমে এলেন। তারপর ছাতা মাথায় সোজা চলে এলেন বাসস্টপে।

বাসস্টপে আবার নতুন ঝামেলা। অফিসগামী বাস এল একটা। প্রবল ভিড়। বৃষ্টির মধ্যেও কিছু প্যাসেঞ্জার গেটে ঝুলছে। অফিস টাইমে এটা অবশ্য নিত্যদিনের ব্যাপার, এরই মধ্যে ফাঁক গলে ঢুকে যেতে হবে ভিতরে। রিটায়ারমেন্টের আর বছর পাঁচেক বাকি। সুতরাং, ভিড় বাসে কীভাবে উচ্চিংড়ের মতো ঢুকে বাজপাখি হয়ে যেতে হয়, সে আদব কায়দা তার বিলক্ষণ জানা। কিন্তু ছাতা বন্ধ করতে গিয়ে দেখলেন বন্ধ হচ্ছে না। ছাতা বন্ধ না হলে তো রোজকার এই পলিসি কাজ করবে না। অনেক টানাটানি হ্যাঁচকা হেঁচকি করলেন। উলটে-পালটে দেখলেন। অসাবধানে একটা শিক নিজের নাকেই গুঁজে গিয়ে হাঁচি শুরু হল শুভঙ্করবাবুর। সেই ফাঁকে বাস গেল বেরিয়ে।

একটু টেনশানে পড়ে গেলেন শুভঙ্করবাবু। ছাতা বন্ধ না হলে কোনও বাসেই তো ওঠা যাবে না। কিন্তু এ ছাতা বন্ধ করতে গেলে তো জখম হবার সম্ভাবনা। তখন অফিস ছেড়ে অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হবে। আচ্ছা, অ্যাম্বুলেন্সে কি খোলা ছাতা নিয়ে ওঠা যায়! হঠাৎ মনে হল, বউমাকে একটা ফোন করলে কেমন হয়। তারই তো ছাতা। সে নিশ্চয়ই খোলা আর বন্ধ করার ট্যাকটিশ জানে।

বউমাকে ফোন করলেন শুভঙ্করবাবু। বউমা পারমিতা জানাল, ছাতাটা একটু গড়বড় করছে বটে, বিশেষ করে বন্ধ করার সময়। আসলে প্রথম ফোল্ডের একটা শিক বাঁ-দিক থেকে ডানদিকে বেঁকে গেছে, আর সেকেন্ড ফোল্ডের একটা শিক ডানদিক থেকে বাঁ-দিকে বেঁকে গেছে আর থার্ড ফোল্ডের একটা...

পারমিতাকে থামিয়ে দিয়ে শুভঙ্করবাবু বলে উঠলেন, এত কিছু তো মনে রাখতে পারব না বউমা।

পারমিতা বলল, ঠিক আছে, আমি হোয়াটস অ্যাপ করে দিচ্ছি।

শুভঙ্করবাবু বললেন, তাই দাও।

দেখতে দেখতে আর একটা বাস এসে গেল। এটাতে অত ভিড় নেই। খোলা ছাতা নিয়েই উঠতে গেলেন শুভঙ্করবাবু। কন্ডাকটর বললেন, ছাতা মুড়ুন, ছাতা মুড়ে উঠুন।

শুভঙ্করবাবু বললেন, এ ছাতা ওয়ান-ওয়ে ছাতা, মোড়া যায় না। কন্ডাকটর বললেন, বাহ্, দারুণ ছাতা তো, কোথা থেকে কিনলেন?

শুভঙ্করবাবু বললেন, দোকান থেকে।

কন্ডাকটর বললেন, বাহ্, দোকানের ঠিকানাটা দেবেন তো।

শুভঙ্করবাবু বললেন, সে তো দেব; কিন্তু আগে উঠতে দিন।

কন্ডাকটর বললেন, কিন্তু ছাতার জন্যে এক্সট্রা ভাড়া লাগবে।

শুভঙ্করবাবু বললেন, কত?

তিরিশ টাকা।

শুভঙ্করবাবু বললেন, ওরে বাবা, তিরিশ!

কন্ডাকটর বললেন, কমই বলেছি, এই ছাতার জায়গায় অন্তত পাঁচটা প্যাসেঞ্জার বাড়তি তুলতে পারতাম আমি।

আর কথা না বাড়িয়ে খোলা ছাতা নিয়েই শুভঙ্করবাবু উঠে পড়লেন বাসে। এক কোণে ছাতা মাথায় দাঁড়িয়েও পড়লেন। প্যাসেঞ্জাররা প্রায় সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছিল। আলোচনা করছিল নিজেদের মধ্যে। একজনের কথা কানে এল তাঁর। সে বলছে, এটা একটা রোগ। কিছুদিন হল এদিকে এসেছে। বর্ষাকালে এর প্রকোপ বাড়ে। রুগি ছাতা বন্ধ করতে ভয় পায়। এমনকী বাথরুমেও ঢোকে ছাতা মাথায়। ছাতা মাথায় দিয়েই শাওয়ারে চান করে।

তখন অন্য একজন জিগ্যেস করল, এদের কি কামড়ানোর প্রবণতা থাকে?

প্রথম প্যাসেঞ্জার বলল, সবার নয়, তবে কারও-কারও থাকে।

সেই সময়েই কন্ডাকটর এগিয়ে এলেন, চুক্তি মতো অতিরিক্ত তিরিশ টাকা দিতে হল তাকে।

বাস বেশ গতিতেই ছুটছিল, বৃষ্টিও কমে আসছিল। হঠাৎ প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে লাফিয়ে উঠল বাসটা। শুভঙ্করবাবু বাসের প্ল্যাটফর্ম থেকে ছ’ইঞ্চি ওপরে উঠে গেলেন। ছাতাটা ঠুকে গেল বাসের ছাদে। এবং শুভঙ্করবাবু অবাক হয়ে দেখলেন ছাতাটা মুড়ে গেছে। বাসটা আসলে বড় একটা গাড্ডায় পড়েছিল। জল জমে থাকায় ড্রাইভার সাহেব দেখতে পাননি। যাই হোক, এবার সহজেই তিনভাঁজ করে ছাতাটাকে জব্দ করে ফেললেন শুভঙ্করবাবু। তারপর কাঁধে ঝোলা রেকসিনের ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখলেন। একটা সিটও পেয়ে গেলেন সেই সময়। তারপর ঠান্ডা হাওয়ার আমেজে অনতিবিলম্বে ঘুমিয়েও পড়লেন।

বাস থেকে নেমে টের পেলেন, ব্যাগ কেটে কেউ ছাতাটা হাতিয়ে নিয়েছে। বৃষ্টি একেবারেই থেমে গিয়েছিল। বেশ হাসি মুখেই অফিসে ঢুকলেন শুভঙ্করবাবু। যে ছাতা নিয়েছে, সে তো জানে না কী জিনিস নিল। ব্যবহার করতে গিয়ে নিশ্চয়ই খুব গালাগালি দেবে শুভঙ্করবাবুকে।

অফিস থেকে ফেরার সময় বাস থেকে যখন নামলেন, তখন সন্ধে গড়িয়ে গেছে। মুশকিল হল আবার ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। শুভঙ্করবাবু ভেবেছিলেন, আজ বুঝি আর বৃষ্টি হবে না। কাল অফিসে যাবার পথে নতুন ছাতা কিনে নেবেন। কিন্তু আবার বৃষ্টি।

যাই হোক, খুব দ্রুত পথ হাঁটছিলেন শুভঙ্করবাবু। হঠাৎ একটা জিনিস চোখে পড়ল তার। রাস্তায় প্রায় সবাই ভিজতে ভিজতে যাচ্ছে। এর মধ্যে অনেকেরই হাতে মোড়া ছাতা। বৃষ্টি পড়ছে, সঙ্গে ছাতা আছে; কিন্তু কেউই ছাতা খুলছে না! তাহলে কি সবার ছাতারই অবস্থা বউমার ছাতার মতো! পাশ দিয়ে একটা লোক যাচ্ছিল। হাতে মোড়া ছাতা। প্রবল কৌতূহলে তাকে কারণ জিগ্যেস করলেন শুভঙ্করবাবু। তিনি বললেন, আসলে এলাকায় একটা ষাঁড় সকাল থেকে খেপে আছে। মানুষকে আক্রমণ করছে। তবে সব মানুষকে নয়। যাদের মাথায় ছাতা আছে তাদেরই বেছে বেছে আক্রমণ করছে। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানায়, সকালে এক ব্যক্তি তার মুখের সামনে ছাতা খুলে তাকে উত্তেজিত করে। সেই থেকেই ষাঁড়ের এই রূপ। খবর দেওয়া হয়েছে থানায়। সেখান থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যতই বৃষ্টি পড়ুক ছাতা মাথায় দেওয়া চলবে না, যতদিন না পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। সেই ব্যক্তির খোঁজ চলছে।

সব শুনে, হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলেন শুভঙ্করবাবু।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%