গাঁট্টা

উল্লাস মল্লিক

ভবতারণ দেখল মরে যাওয়া খুব সোজা। একটা গাঁট্টাই যথেষ্ট। মাপমতো জায়গায় লাগাতে হবে শুধু। তাহলে কয়েক সেকেন্ডেই প্রাণপাখি হুশ। কষ্টের কোনও ব্যাপারই নয়।

মুখুজ্জে পাড়া থেকে ফিরছিল ভবতারণ। বাসু মুখুজ্জের বউকে ভূতে ধরেছে। ঝাড় ফুঁক করতে ডাক দিয়েছিল ওরা। ভবতারণ গিয়ে দেখল, মেছো পেতনির উৎপাত। সেই মতো মন্ত্র আওড়াল, আঁশবঁটি ছ্যাঁকার ব্যবস্থা করল। মেছো পেতনি বাপ-বাপ করে দৌড়। মুখুজ্জেরা রইস লোক। দিল-টিল ভালোই। খুশি মনে বাড়ি ফিরছিল ভবতারণ। জামডাঙার মোড়ে ঘটনাটা ঘটল। জায়গাটা নির্জন। সন্ধে উতরে গেছে অনেকক্ষণ। বড় বড় গাছের জন্যে জমাট বাঁধা অন্ধকার। সেই অন্ধকার ফুঁড়ে উদয় হল বলাই।

বলাইকে দেখে একটু অবাক হল ভবতারণ। ছেলে সুবিধের নয়। মোদো মাতাল। তার ওপর চুরি ছিনতাইয়ের হাত আছে। বলাই বলল, মুখুজ্জে বাড়ি ঝাড়ফুঁক হল!

ভবতারণ পাশ কাটাতে চাইল, ওই হল আর কী!

কামানি তো ভালোই হয়েছে তাহলে।

ওই যেমন হয় আর কী! বলল ভবতারণ।

মালকড়ি কিছু ছাড় না কাকা; বাজার খুব ডাউন।

ভবতারণ অবাক হয়ে বলে, এ আবার কী কথা বলাই! আমার কষ্টের রোজগার।

বলাই সে সব শুনতে রাজি নয়। টাকা তার চাই। তাই নিয়ে দু’জনের টানা হ্যাঁচড়া। বলাই হঠাৎ একটা গাঁট্টা মারল ভবতারণের মাথায়। মাথাটা ঘুরে গেল ভবতারণের। চোখে অন্ধকার দেখল। টলে পড়ল রাস্তার ধারে। ফুস।

ভবতারণ দেখল শূন্যে ভেসে আছে সে। শরীরটা পড়ে আছে রাস্তার ধারে। বেশ ভ্যাবাচ্যাকা মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে বলাই। চুরি ছিনতাই করলেও খুনি তো নয়। বেঘোরে লেগে অক্কা পেয়েছে ভবতারণ। এখন কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। ভবতারণ দেখল, নাকের কাছে হাত নিয়ে নিঃশ্বাস পড়ছে কিনা দেখতে চাইছে বলাই। হতাশায় মাথা নাড়ছে। তারপর হাতের কব্জি ধরে নাড়ি পরীক্ষা করল। আরও হতাশায় হয়ে গেল মুখ। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক তাকিয়ে ভবতারণের জামার পকেট থেকে টাকাগুলো বের করে নিল। তারপর বডিটা ঠেলে পগারে ফেলে দিয়ে হনহন করে হাঁটতে লাগল।

ভবতারণ কিছুক্ষণ ঝুলে রইল বাতাসে। ঠিক কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। বডি কি এভাবেই পড়ে থাকবে? এমন জায়গায় ফেলেছে ঝট করে কারও নজরে পড়বে না। বাড়ির লোক খুব খোঁজাখুঁজি করলে হয়তো পেতে পারে। সে হয়তো সকাল হয়ে যাবে। তারপর ভাবল সে যাক গে, যা করার করবে; মরে যখন গেছে পিছুটান রেখে লাভ নেই; ভূতলোকে চলে যাওয়াই ভালো।

ভাবামাত্র সাঁ-সাঁ করে উঠতে লাগল ওপরে। কিছুক্ষণ ওঠার পর একটা সূক্ষ্ম জালে ঠেকল মাথাটা; তারপর জাল ফুঁড়ে চলে গেল ওপারে। তখনই সিড়িঙ্গে মতো একজন এগিয়ে এল। বলল, নতুন?

ভবতারণ বলল, হ্যাঁ।

বয়েস কত?

এই সাতান্ন।

রোগে, না অপঘাতে?

ভবতারণ বলল, অপঘাতে।

সিড়িঙ্গে বলল, আজকাল অপঘাতে বড় বেশি টেঁসে যাচ্ছে মানুষ। তা নাম কী তোমার?

নাম বলল ভবতারণ।

নামটা যেন চেনা চেনা। সিড়িঙ্গে বলল, বাড়ি কোথা?

ভবতারণ বলল, বলরামপুর।

বলরামপুর...ভবতারণ...বলরামপুর...ভবতারণ...বিড়বিড় কিরতে লাগল সিড়িঙ্গে।

ভবতারণ বলল, কী হল ভাই তোমার।

সিড়িঙ্গে বলল, কী যেন মিলবে মিলবে করছে, কিন্তু স্মরণশক্তিটা একেবারে ঘেঁটে গেছে তো! আসলে ব্রেন ক্যানসারে মরলুম যে। তারপর থেকে মনে রাখা বেশ ঝকমারির ব্যাপার। আচ্ছা, তুমি কি ভব ওঝা?

ভবতারণ বলল, হ্যাঁ, তাই।

ওরে বাবা রে, তুমি মরেছ! বলে, আনন্দে তিন পাক ঘুরে নেয় সিড়িঙ্গে। সঙ্গে শূন্যে দু’টো ডিগবাজি।

ভবতারণ বেশ অবাক হয়ে যায়, আরে এত নাচানাচির কী হল!

সিড়িঙ্গে বলে, নাচব না; কতদিন তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি জানো সেটা। কবে আসবে তুমি; কবে মরবে।

ভবতারণ বলে, আরে কেন!

সিড়িঙ্গে বলে, বছর দুই আগে ঝিঙেখালির সামন্তদের ছোট বউকে ধরেছিলুম, তোমাকে ডাকা করাল, তুমি এসে এমন লঙ্কা পোড়া শোঁকালে যে দমফোট হয়ে মরে যাই আর কী! উঁহ্‌, ভাবলে এখনও গা-হাত-চোখমুখ জ্বালা জ্বালা করে ওঠে। মনে পড়ে তোমার?

ভবতারণ একটু করোটি চুলকে বলে, আসলে এত কেস করেছি, সব কি আর মনে রাখা যায়? তবে ঝিঙেখালির দিকে মাঝে মধ্যে ডাক পড়ত বটে।

সিড়িঙ্গে হঠাৎ একটু এগিয়ে এসে, খটাস খটাস করে দুটো থাপ্পড় মারল ভবতারণের চোয়ালে।

ভবতারণ অবাক হয়ে বলল, আরে খামোখা মারছ কেন!

মারব না! সিড়িঙ্গে তেড়েমেড়ে বলল, কী লঙ্কাপোড়া যে ঝেড়েছিলে; সেদিন থেকে তক্কে তক্কে আছি, পেলেই একহাত নেব।

চোয়াল দু’টো চিনচিন করছে ভবতারণের। চোয়ালে হাত বুলোতে বুলোতে বলল, সে তো মনুষ্যজন্মের কথা; পেটের জন্যে কত মানুষ কত কাজ করে!

সিড়িঙ্গে বলে, পেটের দায়ে সব মানুষই তো কাজ করে। কিন্তু খারাপ করলে শাস্তি পেতেই হবে। চোর যেমন চুরি করে, পেটের দায়েই তো করে, কিন্তু ধরা পড়লে তাকে ধোলাই দেয় লোকে। তোমার বেলায় সেই নিয়ম। উঁহ্‌, এখনও চোখমুখ জ্বালা জ্বালা করে।

বলে, আবার দুটো থাপ্পড় মারল সিড়িঙ্গে।

পাশ দিয়ে গাঁট্টা গোঁট্টা একজন যাচ্ছিল। ব্যাপার দেখে সে-ও এগিয়ে এল। বলল, কী হয়েছে ফিচুংদা?

ভবতারণ বুঝল, ভূতলোকে সিড়িঙ্গের নাম তাহলে ফিচুং।

ফিচুং বলল, এই ব্যাটাকে অনেকদিন ধরেই খুঁজছিলুম, আজ বাগে পেয়েছি রে টাচুং।

টাচুং একটু এগিয়ে এল ভবতারণের দিকে। ফিচুং তাকে বিস্তারিত বলল।

টাচুং আগাপাছতলা মাপল ভবতারণকে। তারপর বলল, তুমিই সেই ভব ওঝা বটে। একবার আমাকেও বড় হেনস্তা করেছিলে। পটলহাটির জলধর সর্দারকে ধরেছিলুম আমি। তা তুমি গিয়ে মন্ত্র পড়তে পড়তে একরকমের তুলসী গাছের ডালপাতা দিয়ে এমন ঝাড়লে যে পড়িমড়ি করে পালাতে হল আমায়। ওহ্‌, সে তুলসী গাছের কী ঝাঁঝ; এখনও যেন চিড়বিড় করে ওঠে গা হাত-পা।

কী তুলসী গাছ রে টাচুং? বলে ফিচুং।

সে আমাদের উচ্চারণ করতে নেই। এমনি তুলসীর চেয়ে তার ঝাঁঝ অনেক বেশি। দশরথের বড় ছেলের নামে যে তুলসী গাছ।

বুঝেছি, বুঝেছি, আর বলতে হবে না। ওরে বাবা, সে তুলসীর ঝাঁঝ খুব।

টাচুং বলে, আমিও অনেকদিন ধরে খুঁজছি তোমাকে।

বলেই পরপর কতগুলো কোঁতকা দিল ভবতারণকে। ব্যথায় ককিয়ে উঠল ভবতারণ।

তারপর কোথা থেকে কী ঘটে গেল কে জানে, হইহই করে ভূতের দল আসতে লাগল। শুরু হল অত্যাচার। কেউ ল্যাং দিয়ে ফেলে দিচ্ছে, তো কেউ হাতে দিচ্ছে হ্যাঁচকা টান। কেউ বা লাথি কষাচ্ছে পাছায়। এদের সবাই নাকি কোনও না কোনও সময় অত্যেচারিত হয়েছে ভব ওঝার হাতে। সবাই শোধ তুলতে চায়।

হঠাৎ এক লম্বা ভূত এল কোথা থেকে। বলা কওয়া নেই, খটাস করে একটা গাঁট্টা মারল ভবতারণের মাথায়। মাথা বোঁ বোঁ করে ঘুরতে লাগল ভবতারণের। চোখে অন্ধকার। কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে পড়ে গেল ভবতারণ।

চোখ মেলে তাকাল ভবতারণ। বুঝতে পারল একটা পগারে শুয়ে আছে সে। ঝিঁঝি ডাকছে একটানা। বুকের ওপর একটা হোঁতকা কোলাব্যাঙ। মাথাটা একটু চিন চিন করছে। ধীরে ধীরে উঠে বসল ভবতারণ। লাফ দিয়ে পালিয়ে গেল ব্যাঙটা। একটু একটু করে সব মনে পড়ল ভবতারণের। মানুষের গাঁট্টা খেয়ে ভূত হয়েছিল, আবার ভূতের গাঁট্টা খেয়ে মানুষ হয়ে গেছে সে।

কাপড়ের ব্যাগটা পাশেই পড়ে আছে। সেটা কাঁধে তুলে নিল ভবতারণ। হাঁটতে লাগল রাস্তা ধরে। একটু যেতেই হরিদেবপুর তেমাথার মোড়। দোকানপাট বন্ধ হচ্ছে। দেখল কেষ্ট মান্নার চায়ের দোকানে চা খাচ্ছে বলাই। দাঁড়িয়ে গেল ভবতারণ।

চা খেয়ে বাড়ির পথ ধরল বলাই। পিছু নিল ভবতারণ। জামডাঙার মোড়ে চলে এসেছে বলাই। এই পথ দিয়েই বাড়ি যেতে হবে তাকে। পিছন থেকে বলাইয়ের কাঁধে হাত রাখল ভবতারণ। চমকে তাকাল বলাই। খুব মৃদু স্বরে ভবতারণ বলল, বাবা, বয়েস হয়েছে; অত জোরে মারে কেউ!

বলাইয়ের মুখ দিয়ে গোঁ-গোঁ আওয়াজ বেরল শুধু। ধড়াস করে বডিটা পড়ল রাস্তায়। ভবতারণ বুঝল, জ্ঞান হারিয়েছে বলাই। তাই দেরি না করে হাত ঢোকাল প্যান্টের পকেটে। টাকাগুলো বের করে নিয়ে গুণল ভবতারণ। ক’টা টাকা কম। চায়ের দোকানে খরচা করেছে বোধহয়। যাই হোক বাকিটা তো আছে। টাকাগুলো পকেটে রেখে একটা শ্যামাসঙ্গীত গাইতে গাইতে বাড়ির পথ ধরল ভবতারণ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%