লাশঘর ‘দি হেভেন’

শিশির বিশ্বাস

হরেকৃষ্ণ সৎকার সমিতির গাড়িটা যখন ‘দি হেভেন’-এর সামনে এসে দাঁড়াল, রাত তখন সাড়ে আটটা৷ কলকাতা শহরে সন্ধে রাত বলা যায়৷ তবে আজকের কথা অনেকটাই আলাদা৷ সকাল থেকেই টিপটিপে বৃষ্টি৷ সেই সাথে মাঝেমধ্যেই ঝোড়ো হাওয়া৷ এক কথায় দুর্যোগ৷ দিনটা তবু কিছু ভালো ছিল৷ সন্ধে থেকে বৃষ্টির তেজ আরো বেড়েছে৷ অগত্যা সরু গলিটা প্রায় শুনশান৷ জনমানুষ তো ছার, একটা বাইক বা গড়িও নেই৷ ভরসা বলতে কর্পোরেশনের গোটা কয়েক টিমটিমে বাতি৷ এই বাদলার রাতে তাতে অন্ধকার দূর হয়েছে সামান্যই৷ সেই আধো অন্ধকারে প্রায় ভূতের মতো দাঁড়িয়ে পুরোনো দিনের ছোট দু’তলা বাড়িটা৷ ‘দি হেভেন’৷ গাড়ি থামিয়ে গোবিন্দ সাবধানে সেই বাড়ির দিকে তাকাল৷

নাম ‘দি হেভেন’ হলেও, আসলে লাশঘর৷ মড়া বা লাশ নিয়ে অবশ্য গোবিন্দর কোনো অ্যালার্জি নেই৷ সৎকার সমিতির গাড়ির ড্রাইভার৷ লাশ নিয়েই কারবার৷ গত দশ বছর এই চাকরিতে রয়েছে৷ কয়েক হাজার লাশ শ্মশান, গোরস্থান নয়তো লাশঘরে পৌঁছে দিয়েছে৷ রাত দুপুরে বেরোতে হয় হামেশাই৷ কিন্তু কোনোটাই এই দি হেভেনের মতো নয়৷ সেই দশ বছর আগে এক রাতে প্রথম যেদিন এখানে লাশ জমা করতে এসেছিল, সেই অভিজ্ঞতা আজও তাড়া করে বেড়ায়৷

জরুরি তলব পেয়ে সেদিন হসপিটাল থেকে এক লাশ নিয়ে যখন এই বাড়িতে পৌঁছেছিল রাত প্রায় দেড়টা৷ আধা সাহেব পাড়া৷ ভেবেছিল, পথে নিশ্চয়ই লোকজন থাকবে৷ কিন্তু কোথায় কী? প্রায় নির্জন রাস্তায় পুরোনো বাড়িটা প্রায় ভূতের মতো দাঁড়িয়ে৷ ভারি কাঠের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ৷ গোড়ায় তো মনে হয়েছিল, বোধ হয় চিনতে ভুল হয়েছে৷ কিন্তু ভালো করে নজর করতে ভুল ভাঙল৷ ভারি দরজার একপাশে ছোট এক নেমপ্লেটে আরো ছোট করে লেখা ‘দি হেভেন’৷ পাশে কলিং বেলের সুইচ৷ সামান্য ইতস্তত করে সেই সুইচে চাপ দিয়েছিল৷ তেমন বড় বাড়ি নয়৷ বাইরে থেকে আওয়াজ পাওয়ার কথা৷ কিন্তু কিছুই শুনতে পেল না৷ গোড়ায় তো মনে হয়েছিল, বেল খারাপ৷ তবু দরজার কড়া নাড়বার আগে ফের একবার সুইচ টিপতে যাবে, প্রায় বিনা নোটিসে মস্ত দরজাটা ক্যাঁচ করে খুলে গেল৷ দরজার ওপাশে আধো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রোগা পাতলা একটা মানুষ৷ মাথায় কদমছাঁট চুল৷ হলদে ফ্যাকাসে শরীরে পোশাক বলতে ছোট এক শর্টস৷ আধো অন্ধকারেও লোকটার হাড় সর্বস্ব বুকের পাঁজরা গুনে নেওয়া যায়৷ গোবিন্দ রোগা,পাতলা মানুষ কম দেখেনি, কিন্তু এমন আগে দেখেছে বলে মনে করতে পারল না৷ আধো অন্ধকারে লোকটা যেভাবে স্থির হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল, বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে গোবিন্দ পিছিয়ে গেল কয়েক পা৷ দেখে লোকটা অন্ধকারে দু’পাটি দাঁত বের করে নাকি সুরে বলল, ‘ম্যাঁন, হোঁয়াই আর ইউ ওঁয়ারি? আঁই জোঁ, জোঁসেফ স্মিথ৷’

সেই কথায় প্রায় যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে পেয়েছিল গোবিন্দ৷ হ্যাঁ, ‘দি হেভেন’ নামে এই লাশঘরের মালিক জোসেফ স্মিথই বটে৷ তবু কথা বলতে গিয়ে বার কয়েক ঢোঁক গিলতে হল৷

দু’এক কথায় বিষয়টি ব্যক্ত করার পরে লোকটা গলা সামান্য ঝেড়ে নিয়ে বলল, ‘ফোনে তোমার কথা খানিক আগে জানিয়েছে৷ তা কাগজপত্র এনেছ?’

গাড়িতে কাগজপত্র ছিল৷ ফিরে গিয়ে গোবিন্দ সেগুলো এনে দিল৷ অন্ধকারেই লোকটা মিনিট কয়েক কাগজের উপর চোখ বুলিয়ে বলল, ‘হুম, ঠিক আছে৷ তুমি ভিতরে গিয়ে বসো৷ আমি লাশ নিয়ে আসছি৷’

দরজার ওধারে প্রায় ঘুটঘুটে অন্ধকার৷ এই মাঝ রাতে ওই অন্ধকারে লাশঘরের ভিতরে একা যাবার কথা শুনে প্রায় আঁতকে উঠে গোবিন্দ যথাস্থানে দাঁড়িয়ে রইল৷ ওদিকে জোসেফ ততক্ষণে লম্বা পায়ে লাশ-গাড়ির পিছনের দরজা খুলে এক টানে স্ট্রেচারের অর্ধেক বের করে ফেলেছে৷ এই অবস্থায় ট্রলিতে করেই লাশ নিয়ে যাওয়া হয়৷ কিন্তু তেমন কিছু নেই দেখে গোবিন্দ যখন ভাবছে, স্ট্রেচার ধরার জন্য হয়তো ডাকবে৷ সেই সময় লোকটা হঠাৎ ধাঁ করে লাশটা পাঁজাকোলা করে তুলে ফেলল৷ তারপর সামান্য কুঁজো হয়ে লম্বা পা ফেলে দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল৷ অগত্যা পিছনে ছুটতেই হল গোবিন্দকে৷ কাগজে সই করে বডি রিসিভ না করা পর্যন্ত ছুটি নেই তার৷

দরজা পার হয়ে অন্ধকারে কয়েক ধাপ সিঁড়ি৷ উঁচু এক চাতালে উঠে বাঁ-দিকে ঘুরলেই আর একটা দরজা৷ পার হলেই বড় এক হলঘর৷ ভিতরে টিমটিম করে একটা মাঝারি পাওয়ারের হলদে বাতি জ্বলছে৷ সেই সামান্য আলোয় অতবড় ঘরটায় প্রায় গা ছমছম পরিবেশ৷ কাঠের মেঝে হলেও ভিজে শ্যাওলা-ধরা স্যাঁতসেঁতে দেয়াল৷ ঝাঁঝালো ওষুধের গন্ধ৷ দেয়ালে গোটা কয়েক মস্ত টিকটিকি শিকারের অপেক্ষায় স্থির হয়ে রয়েছে৷ ফ্যাকাসে হলদে রঙের সেই টিকটিকিগুলোর দিকে তাকিয়ে গোবিন্দর সারা শরীর হঠাৎ কেমন শিরশির করে উঠল৷ ও তাড়াতাড়ি ঘাড় নামিয়ে জোসেফের দিকে তাকাল৷ খালি গায়ে লিকলিকে চেহারার লোকটা ততক্ষণে কাজে লেগে পড়েছে৷ ঘরের মাঝে বড় এক টেবিলে বডিটা রেখে টর্চের আলোয় চোখের পাতা উলটে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছে৷ এরপর অদ্ভুত কায়দায় চ্যাপ্টা এক চিমটে দিয়ে দুই ঠোঁট উলটে দেখে নিয়ে একগাল হেসে বলল, ‘নাহ, হাসপাতাল পার্টির কাছে যত্নেই ছিল দেখছি৷ দিন চারেক ভালোই থাকবে এখন৷ একটু বসো বাপু৷ ড্রয়ারে ঢুকিয়েই ছেড়ে দিচ্ছি তোমাকে৷’

নতুন লাশের ব্যাপারে বুড়ো যে বেজায় খুঁতখুঁতে, গোবিন্দ আগেই শুনেছিল৷ তাই কিছুটা হলেও হাঁফ ছেড়েছিল এরপর৷ কিন্তু সেই একটু সময় যে কতক্ষণ, একেবারেই আঁচ করতে পারেনি৷ হাড়ে হাড়ে মালুম পেল তারপর৷ ঘরের একপাশের দেয়াল জুড়ে প্রমাণ সাইজের সারি সারি ড্রয়ার৷ প্রতিটির সামনে একটা করে কার্ড ঝুলছে৷ সেই কার্ডে ভিতরে ঢোকানো লাশের বিবরণ৷ বুড়ো অবশ্য ইতিমধ্যে টেবিলের একধারে রাখা মোটা এক বাঁধানো খাতা খুলে ফেলেছে৷ সেই খাতার কাজ শেষ হতে লাগল প্রায় মিনিট পনেরো৷ তারপর টেবিলের লাশ ফাঁকা এক ড্রয়ারে ঢুকিয়ে সামনে লেবেল ঝুলিয়ে দিয়ে যখন কাগজে সই করে দিল, নয় নয় করেও পৌনে একঘণ্টা সময় পার হয়ে গেছে৷ সারাটা সময় সেই ভয়ানক ঘরের ভিতর প্রায় দম বন্ধ করে পড়ে থাকা ছাড়া উপায় ছিল না৷ সই করা কাগজ ফেরত পেতে তাই আর এক মুহূর্ত দেরি করেনি৷

প্রথম দিনের সেই ভয়ানক অভিজ্ঞতা গোবিন্দ তারপর আর মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারেনি৷ দি হেভেন লাশঘর আজও ওর কাছে আতঙ্ক৷ শুধু মাত্র এই কারণেই অনেক বার ভেবেছে, ছেড়ে দেবে কাজটা৷ কিন্তু চেষ্টা করেও বিকল্প একটা ব্যবস্থা না হওয়ায় ছাড়া হয়নি৷

দি হেভেন লাশঘরে আগে বেশি কাজ পড়ত না অবশ্য৷ মাসে এক আধবার৷ তবু সেই আশঙ্কায় সিটিয়ে থাকত৷ দুর্ভাগ্যই বলতে হবে, ইদানীং প্রায়ই আসতে হচ্ছে৷ আসলে দিনকাল পালটে গেছে৷ দিনের মধ্যে সৎকার আজকাল অনেক ক্ষেত্রেই হয় না৷ ছেলেমেয়েরা বাইরে থাকে৷ বিদেশ হলে তো কথাই নেই৷ আসতে তিন, চার দিন লেগে যায়৷ অগত্যা দি হেভেনের মতো লাশঘরই ভরসা৷

এই যেমন আজ৷ সকাল থেকেই ঝড়-বাদল৷ এক কথায় দুর্যোগের দিন৷ সারাদিন কোনো ডাক না আসায় ভেবেছিল, বাঁচা গেল বোধ হয়৷ কিন্তু ঠিক সন্ধের মুখেই বেজে উঠল ফোন৷ ধরতেই ওদিক থেকে সৎকার সমিতির ম্যানেজার হারাধন নন্দীর গলা৷ লাশ আনতে হবে কল্যাণীর ওদিকে এক হাসপাতাল থেকে৷ পৌঁছে দিতে হবে দি হেভেনে৷ শুনেই গলা প্রায় শুকিয়ে গিয়েছিল৷ এই সন্ধের আগে গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করে অতদূর পৌঁছোতে সময় লাগবে যথেষ্টই৷ তারপর লাশ নিয়ে ফিরতেও সময় কম নয়৷ কাঁচুমাচু হয়ে বলেছিল, ‘আজকের রাতটা বাদ দিলে হয় না হারাধনদা৷ এই জলকাদার পথ৷ কথা দিচ্ছি, কাল ভোরেই বের হয়ে পড়ব৷’

তাতে প্রায় ধমকে উঠেছিল হারাধন নন্দী, ‘খেপেছিস! একেই দিন চারেকের পুরোনো বডি৷ ছেলে আমেরিকায় থাকে৷ কথা ছিল আগামী কাল এসে পড়বে৷ বডি তাই হাসপাতালেই রাখা ছিল৷ ছেলে হঠাৎ খবর পাঠিয়েছে, কী গোলমালে তাঁর আসতে আরো দিন চারেক লাগবে৷ এদিকে আর এক বিপত্তি, যে হাসপাতালে বডি ছিল তাদের মেশিনে গোলমাল৷ গতকাল থেকে ঠিকমতো কাজ করছে না৷ জানিয়ে দিয়েছে, বডি তারা আর এক দিনও রাখতে পারবে না৷ দেরি না করে রওনা হয়ে পড়৷’

অগত্যা ঢোঁক গিলে গোবিন্দ বলেছিল, ‘বাড়ির লোকজন কেউ থাকবে তো দাদা?’

‘বাড়ির লোকজন!’ হেসে উঠল হারাধন নন্দী, ‘ওল্ড এজ হোমের পার্টি৷ বাড়ির লোক পাবি কোথায়! অসুস্থ হয়ে পড়তে তারা হাসপাতালে ভরতি করে খালাস৷ এখন দায় আমাদের৷’

কথা না বাড়িয়ে ম্যানেজার হারাধন নন্দী লাইন কেটে দিয়েছিল এরপর৷ গোবিন্দও আর দেরি করেনি৷ লাশের বাড়ির লোক নেই মানেই, পুরো দায়িত্ব তার উপর৷ অগত্যা দেরি না করে বের হয়ে পড়েছিল সেই দণ্ডেই৷

এই ঝড়জলের দিনেও বডি নিয়ে রাত সাড়ে আটটার মধ্যেই পৌঁছে গিয়েছিল দি হেভেনের দরজায়৷ বৃষ্টির বেগ মাঝে সামান্য কমলেও ফের বাড়তে শুরু করেছে৷ দেরি করা যায় না৷ গাড়ি থেকে নেমে গোবিন্দ দরজার বেল টিপল৷

দি হেভেনের দরজায় বেল টিপে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না৷ সেই প্রথম দিনের মতো মিনিট দেড়েকের মধ্যেই খুলে যায়৷ আজ সময় একটু বেশিই লাগল৷ বার পাঁচেক বেল টেপার পরে ঘটাং করে দরজা খুলে যে মানুষটা উঁকি দিল, তাকে একেবারেই আশা করেনি গোবিন্দ৷ জোসেফের ছেলে টমাস৷ বাবা না থাকলে কখনো ডিউটি সামলায়৷ টমাস একেবারেই উলটো স্বভাবের৷ সব দিক থেকেই৷ বেঁটেখাটো গাঁট্টাগোট্টা চেহারা৷ নেশায় চুর হয়ে থাকে৷ ব্যবহার মোটেই ভালো নয়৷ ওর অর্ধেক ইংরেজিই বুঝতে পারে না গোবিন্দ৷ তাই পারতপক্ষে বেশি কথা বলে না৷ তবু ওকে দেখে আজ কিছুটা যেন স্বস্তি পেল৷ ব্যবহার যাই হোক, লাশ নিয়ে এলে টমাস একেবারেই বসিয়ে রাখে না৷ ড্রয়ারে চালান করে দিয়ে চটপট কাগজে সই করে দেয়৷

গোবিন্দ তাড়াতাড়ি হাতের কাগজপত্র তার দিকে বাড়িয়ে দিতে যাবে, টমাস হঠাৎ খেঁকিয়ে উঠল৷ ঘড়ঘড়ে জড়ানো গলায় যা বলল, তার অর্থ, এখানে জায়গা নেই বাপু৷ সব ড্রয়ার ভরতি হয়ে রয়েছে৷ ভেগে পড়ো৷

খানিক চেষ্টায় টমাসের কথার অর্থ বোধগম্য হতে গোবিন্দর মাথায় প্রায় আকাশ ভেঙে পড়ল৷ কী সর্বনেশে কথা! ঢোক গিলে কোনোমতে বলল, ‘তবে যে ম্যানেজারবাবু এখানে লাশ পৌঁছে দিতে বললেন৷ নিশ্চয় কথা বলে নিয়েছেন৷’

‘কী জানি, হয়তো বলেছিলেন৷ কিন্তু এখন জায়গা নেই আর৷ অন্য কোথাও দেখ৷’ বলতে বলতে টমাস যেভাবে খেঁকিয়ে উঠল, দু’পা পিছিয়ে এল গোবিন্দ৷ দু’চোখ টকটকে লাল৷ সন্দেহ নেই, নেশাটা কিছু বেশিই হয়ে গেছে৷ এমন আগে দেখেনি৷ নিশ্চয় ছেলেটার মাথার ঠিক নেই৷ নরম গলায় গোবিন্দ ব্যাপারটা বোঝাতে যাবে, গলা সপ্তমে তুলে ফের খেঁকিয়ে উঠল টমাস৷ দড়াম করে দরজাটা ওর মুখের উপর বন্ধ করে দিল৷ ভাগ্যিস, মাথাটা সরিয়ে নিতে পেরেছিল৷ নইলে থেঁতলেই যেত হয়তো৷

এই অবস্থায় টমাসের সঙ্গে আর কথা চলে না৷ গোবিন্দ পকেট থেকে মোবাইল বের করে ম্যানেজার হারাধন নন্দীকে ফোন করল৷ কপাল একেই বলে, লাইন পাওয়া গেল না৷ নট রিচেবেল৷

সম্ভবত এই ঝড়জলের রাতে ওদিকের টাওয়ারে কোনো গোলমাল৷ বার কয়েক চেষ্টা করে শেষে থামতেই হল৷ মোবাইল ফের পকেটে চালান করে গোবিন্দ গাড়িতে উঠল এবার৷ এমন আগেও হয়েছে৷ তবে সে দিনের বেলা৷ জানাতে ম্যানেজারবাবুই অন্য ব্যবস্থা করেছে৷ সেখানে লাশ পৌঁছে দিয়েছে৷ আজ সব দিক দিয়েই গোলমাল৷ একে এই দুর্যোগের রাত৷ তার উপর ম্যানেজারকেও পাওয়া গেল না৷ ভাবতে গিয়ে অন্য এক জায়গার কথা মনে পড়ে গেল৷ নতুন এক বেসরকারি হাসপাতাল৷ একবার এমন সমস্যা হওয়ায় ম্যানেজারবাবু ওখানেই ব্যবস্থা করেছিল৷ জায়গাটা খুব দূরে নয়৷ একবার ঢুঁ মারা যায়৷ হয়তো এর মধ্যে টেলিফোনে ম্যানেজারবাবুকেও পাওয়া যেতে পারে৷

বৃষ্টির তেজ ক্রমশ বাড়ছে৷ অযথা দেরি না করে গাড়িতে স্টার্ট দিল গোবিন্দ৷ গাড়ি ব্যাক করে বড় রাস্তায় পড়েছে হঠাৎ পকেটে মোবাইল বেজে উঠল৷ নিশ্চয়ই ম্যানেজারবাবু৷ তড়িঘড়ি গাড়ি সাইড করে পকেট থেকে মোবাইল বের করে বাটন টিপেই কানের কাছে ধরল৷

অতি আগ্রহে মোবাইলে কলিং নম্বর লক্ষ করেনি৷ হ্যালো বলতেই ওদিক থেকে পরিচিত সেই নাকি সুর, ‘হ্যাঁল্লো বাঁবু৷ তুঁমি বডি নিয়ে এসেছিলে নাকি?’

টেলিফোনের ওদিকে আর কেউ নয়৷ খোদ দি হেভেনের মালিক জোসেফ৷

‘হ্যাঁ, গিয়েছিলাম তো৷’ হতাশ গলায় গোবিন্দ বলল৷

‘এঁই ঝঁড়জলের রাতে বডি নিয়ে কোথায় যাবে! চঁলে এস এখানে৷ কুঁইক৷’ ওদিক থেকে জোসেফের উত্তর৷

‘তবে, তবে যে টমাস বলল, জায়গা নেই!’ অবাক হল গোবিন্দ৷

‘আঁরে ছাড়ো ওর কথা৷ বাঁবার এত দিনের কারবার, গুড উইল, দু’দিনে লাটে তুলবে ছোঁড়া! তুঁমি চলে এসো বাবু৷’

কথা শেষ করে লাইন ছেড়ে দিল জোসেফ৷ গোবিন্দও আর এক মুহূর্ত দেরি করল না৷ গাড়ি ঘুরিয়ে ফের ছুটল দি হেভেনের দিকে৷

দরজা খুলে জোসেফ ওর অপেক্ষায় বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল৷ গোবিন্দ গাড়ি থামাতেই সেই আগের মতোই দু’সারি দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসল৷ তারপর সেই পরিচিত স্বরে বলল, ‘তুঁমি বসো বাবু৷ আঁমি বডি নিয়ে আসছি৷’

রাতে এখানে এলে ইদানীং আর ভিতরে যায় না গোবিন্দ৷ বডির সঙ্গে কাগজপত্রগুলোও বুড়োর হাতে ধরিয়ে দিয়ে গাড়িতেই বসে থাকে৷ কাজ সারা হলে সই-সাবুদ করে জোসেফই পৌঁছে দিয়ে যায়৷ কিন্তু আজ ঝড়জলের রাতে এই নির্জন পথে একা গাড়িতে থাকতে ভরসা হল না৷ ইতিমধ্যে গাড়ির পিছনের দরজা খুলে বডি তুলে ফেলেছে জোসেফ৷ ও কাগজপত্র হাতে তার পিছনে পায়ে পায়ে ঢুকে পড়ল ভিতরে৷

বুড়ো ভিতরে ঢুকে মস্ত টেবিলের উপর বডি নামিয়ে রাখতেই গোবিন্দ নরম গলায় বলল, ‘একটু তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিলে ভালো হয় সার৷ বাইরে ঝড়জলের যা—’

কিন্তু ওর কথা শেষ হবার আগেই বুড়ো প্রায় আঁতকে উঠল, ‘এঁ যেঁ প্রায় রটন বডি নিয়ে এসেছ বাবু!’

কড়া ওষুধ দেওয়া বডির অবস্থা যে ভালো নয় জানাই ছিল৷ গোবিন্দ কথা না বলে হাতের কাগজগুলো এগিয়ে দিল৷ সামান্য উলটে দেখে জোসেফ হতাশ গলায় বলল, ‘চাঁরদিন আগের বডি৷ রাঁখতে হবে আরো সাতদিন! এঁখুনি ব্যবস্থা না নিলে সাত দিন পরে লাশ নয় বাবু৷ পাঁওয়া যাবে স্কেলিটনটা৷ গুঁড হোমের বদনাম হয়ে যাবে!’

বুড়ো ফের কী বলে ওঠে৷ গোবিন্দ তাড়াতাড়ি বলল, ‘এ ব্যাপারে দি হেভেনের সুনাম রয়েছে বলেই তো ছুটে আসি সার৷ যা করতে হয় করুন৷’

জোসেফ অবশ্য গোবিন্দর উত্তরের জন্য অপেক্ষা করেনি৷ ততক্ষণে ওষুধপত্রের ঢাউস একটা বাক্স টেবিলে নামিয়ে খুলে ফেলেছে৷ বড় একটা সিরিঞ্জ রেডি করে বোতল থেকে অনেকটা ফর্মালিন নিয়ে একটু পরেই জোসেফ বডির বিভিন্ন স্থানে পুশ করতে শুরু করল৷ খালি করে ফেলল পুরো বোতলটাই৷ তারপর কী একটা ওষুধ বডির উপর স্প্রে করে শুরু করল ম্যাসেজ৷ ওষুধের গন্ধ তো ছিলই৷ এবার লাশের উপর জোসেফের সরু দুটো হাত দ্রুত চলতে শুরু করতেই গা গুলিয়ে উঠল গোবিন্দর৷ বেশ বুঝতে পারছিল, বুড়ো যা খুঁতখুঁতে মানুষ, লাশের ব্যবস্থা না করে আর কাগজপত্রে হাত দেবে না৷ বুড়োর কাজ শেষ হতে কতক্ষণ লাগবে জানা নেই৷ ও কী করবে ভাবছে৷ মুশকিল আসান করে দিল জোসেফ নিজেই৷ টেবিলে লাশের উপর হাত চালাতে চালাতেই বলল, ‘বাঁবু, এবার কিছু সিক্রেট কাজ আছে৷ তুঁমি বরং বাইরে গাড়িতে গিয়ে বসো৷ আঁধ ঘণ্টার মতো লাগবে৷ কাঁজটা হয়ে গেলেই পেপার সই করে দিচ্ছি৷’

মরা লাশ সংরক্ষণের ব্যাপারে দি হেভেনের জোসেফের যে কিছু একান্ত গোপনীয় ক্রিয়াকর্ম রয়েছে, জানা ছিল গোবিন্দর৷ সেই দৌলতে আধপচা লাশ এক মাস পরেও মনে হবে এক দিন আগের৷ বলা যায়, বুড়োর এই হাতের কাজের কারণেই দি হেভেনের নামডাক৷ সবাই ছুটে আসে৷ বলা বাহুল্য, সেসব একেবারেই গোপনীয় ব্যাপার৷ গোবিন্দ বলল, ‘তাহলে বাইরে গাড়িতে গিয়ে বসছি আমি৷’

মুহূর্তে উঠে দাঁড়িয়ে গোবিন্দ বের হয়ে পড়ল ঘর থেকে৷ বলা যায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচল৷

বুড়ো আধ ঘণ্টার মতো লাগবে বলেছিল৷ কিন্তু একটু একটু করে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পার হয়ে গেল, তখনও ওদিকে থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই৷ আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরে গোবিন্দ গাড়ি থেকে নেমে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল৷ বেরোবার সময় দরজাটা সামান্য টেনে দিয়েছিল৷ সেইভাবেই রয়েছে৷ ঠেলে সরিয়ে ও ভিতরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল৷ এই দরজাটাও ও হালকা ভাবে টেনে দিয়েছিল৷ এখন ভিতর থেকে বন্ধ৷ ও বেল টিপবে কিনা ভাবছে৷ ভিতরে মানুষের আওয়াজ শুনতে পেল৷ কেউ উত্তেজিত গলায় কথা বলছে৷ কিন্তু ভারি দরজার কারণে বুঝতে পারল না৷ বুড়োর কাজ এখনো শেষ হয়নি ভেবে ও ফের গাড়িতে এসে বসল৷ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত সাড়ে দশটা৷ আর কতক্ষণ এভাবে থাকতে হবে ভেবে না পেয়ে ম্যানেজার হারাধন নন্দীকে ফের ফোন করবে কিনা ভাবছে৷ ওই সময় মোবাইলটা বেজে উঠল৷

বের করেই দেখে খোদ ম্যানেজার হারাধন নন্দীরই ফোন৷ রিসিভ করতেই ওদিক থেকে হারাধন নন্দীর উত্তেজিত গলা, ‘কী সর্বনেশে কাজ করেছ গোবিন্দ! তোমার চাকরি তো গেছেই৷ টানাটানি পড়বে আমার চাকরি নিয়েও৷’

সন্ধের পর থেকে হেনস্তা এযাবৎ কম হয়নি৷ তাই ম্যানেজারের ধমক খেয়েও গোবিন্দর কোনো প্রতিক্রিয়া হল না৷ ঠান্ডা গলায় বলল, ‘কেন, কী হয়েছে হারাধনদা?’

‘তুমি কোথায় এখন? বাড়িতে?’

‘বাড়িতে! বাড়িতে কেন? দি হেভেনের বুড়ো জোসেফের কাছে বডি জমা করে বাইরে গাড়িতে বসে আছি৷ এখনো কাগজ সই হয়নি৷’

কয়েক মুহূর্ত ওদিকে কোনো কথা নেই৷ তারপর হারাধন নন্দীর ভয়ার্ত গলা, ‘জোসেফ বডি জমা নিয়েছে?’

‘হ্যাঁ, হারাধনদা৷ বডির অবস্থা মোটেই ভালো নয় বলে ওষুধপত্র লাগাতে লাগাতে আমাকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলল৷’

‘গোবিন্দ, যা বলছি একটু ঠান্ডা মাথায় শোন৷ দি হেভেনে বডি রাখার নাকি জায়গা নেই৷ আমি টমাসকে বলে দিচ্ছি৷ ওর কাছে থেকে বডি নিয়ে কাছেই ওরিয়েন্ট হসপিটালে পৌঁছে দাও৷ কথা বলেছি, ওখানে ব্যবস্থা হয়ে যাবে৷’

‘কেন হারাধনদা? জোসেফ তো তেমন কিছু বলল না!’ অবাক হয়ে গোবিন্দ প্রশ্ন করলেও ওদিকে থেকে কোনো উত্তর এল না৷ হারাধন নন্দী লাইন কেটে দিয়েছে৷

হতচকিত গোবিন্দ ফের তাঁকে ফোন করবে কিনা ভাবছে৷ সশব্দে দি হেভেনের দরজা খুলে বেরিয়ে এল টমাস৷ ‘ইউ বাস্টার্ড, তোমাকে, তোমাকে গুলি করে মারব আমি!’

নেশাখোর টমাস এভাবেই কথা বলতে অভ্যস্ত৷ গোবিন্দ মোলায়েম গলায় বলল, ‘কেন গো দাদা? কী অপরাধ?’

‘তোমাকে আমি বলেছিলাম না, এখানে বডি রাখার জায়গা নেই৷’

‘বলেছিলেন তো৷ চলেও গিয়েছিলাম৷ তারপর ফের—’

‘তারপর ফের ফিরে এসে,’ গোবিন্দর কথা কেড়ে নিয়ে টমাস বলল, ‘লাশ নিয়ে চোরের মতো ভিতরে ঢুকেছ৷ দশ নম্বর ড্রয়ারে আমার বাবার বডি ছিল৷ সেটা বের করে বাইরে টেবিলে রেখে ড্রয়ারের ভিতর তোমার আনা লাশ ঢুকিয়ে দিয়েছ! আস্পর্ধা তো কম নয়!’

‘জ, জোসেফ সাহেবের ব—’

কথা শেষ করতে পারল না গোবিন্দ৷ মুখটা হাঁ হয়ে আটকে গেল৷

‘হ্যাঁ, জোসেফ সাহেবের বডি৷ আজ সন্ধেয় হঠাৎই মারা গেছেন উনি৷ সেরিব্র্যাল অ্যাটাক৷’

লাশ-গাড়ি চালিয়ে গোবিন্দর বুকের পাটা কিছু বেড়েছে, সন্দেহ নেই৷ নইলে ওই কথা শোনার পরেও গাড়িতে স্টার্ট দিতে পেরেছে৷ তারপর ঘটাংঘট শব্দে একদম টপ গিয়ার৷ পিছনে টমাস তখন চ্যাঁচাতে শুরু করেছে৷ ‘যাচ্ছ কোথায়! বডি আর কাগজপত্রগুলো নিয়ে যাও৷’

কিন্তু তাতে কিছুমাত্র কান দিল না গোবিন্দ৷ পকেটে মোবাইলটাও বেজে উঠল ওই সময়৷ সন্দেহ নেই, ম্যানেজারবাবু৷ কিন্তু মরে গেলেও এই রাতে দি হেভেনে আর লাশ আনতে যাচ্ছে না৷ বরং ছেড়েই দেবে চাকরিটা৷

অধ্যায় ১ / ১৬
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%