ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ

শান্তনু দাশ

মোহিতমঞ্চের অডিটোরিয়াম পুরো হাউজফুল। দেহির পরিচিত লোকজন, কোর্টের বন্ধু-বান্ধব, বাড়ির সবাই এসেছে নাটক দেখতে। অডিয়েন্স সীটের সেকেন্ড রোতে যশ ও রূপম একসাথে বসা। আসেনি কেবল শুভ্রা। দেহি একটা বিশেষ দায়িত্ব শুভ্রার উপর দিয়ে রেখেছে। শুভ্রার নাটক না দেখলেও অসুবিধা নেই। কারণ রিহার্সাল চলাকালীন সে এতবার এসেছে যে নাটক মুখস্থ হয়ে গেছে। একবার রিহার্সালের সময় দেহির কানে কানে শুভ্রা বলেছিল, “আমাকে শ্যামা চরিত্রটা দিতে পারত, কপালকুণ্ডলার ননদ।”

মুহূর্তের মধ্যে কালীস্ত্রোত্রম দিয়ে মঞ্চের পর্দা খুলতে থাকে। একটি নীল আলো এসে পড়েছে মঞ্চে আসীন চরিত্রটির উপর, ব্যাঘ্রচর্মধারী কাপালিক। ধীরে ধীরে নাটক এগোতে থাকে। দর্শকমহল কখনও ভয়ে শান্ত কখনওবা করতালি দিয়ে নিজেদের ভাব প্রকাশ করছে। নাটকে দেহির এন্ট্রি হওয়া মাত্রই দর্শকরা একদৃষ্টে দেহির দিকে তাকিয়ে। মাঝে একবার দেহিকে পুরুষবেশে আসতে হবে। সেই মুহূর্তে দেহি মঞ্চে আসতেই লোকেরা হাততালি দিয়ে পুরো অডিটোরিয়াম কাঁপিয়ে তোলে। কিছু কিছু দর্শক নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে, “কেউ বলবে, এটা মেয়ে?” নাটক একদম শেষলগ্নে। এরপরেই কপালকুণ্ডলার গঙ্গাসমাধি। দেহির সিন শুরু হল কাপালিকের সঙ্গে।

— “আমিও মঙ্গলকাঙ্ক্ষী নই কাপালিক। কপালকুণ্ডলার নির্বাসনে আমার সম্মতি আছে কিন্তু হত্যা? হত্যা আমি কিছুতেই করব না। আমার উদ্দেশ্য একটি, আর সেটি হল নবকুমার। আমি এই পুরুষবেশে কপালকুণ্ডলার সহিত সাক্ষাৎ করলে তুমি দূর হতে তা নবকুমারকে দর্শন করাবে, যাতে নবকুমারের মনে ভ্রান্ত উদয় হয় যে তার প্রিয়তমা পত্নী রাত্রিকালে অপর পুরুষের সহিত প্রেমালাপে মগ্ন। তৎপর তোমার যদি মনে হয়, তুমি কপালকুণ্ডলাকে ভৈরবী সম্মুখে বলি দেবে, দিতে পারো। কিন্তু স্মরণে রেখো কাপালিক, নবকুমারের দেহে আঁচ অঙ্কিত করতে যেও না, তাহলে আমার কোপ হতে ওই ভৈরবীও তোমায় রক্ষা করতে পারবে না।” স্ত্রী নয় পুরুষ কণ্ঠে দেহি সংলাপ বলতেই দর্শকরা আচম্বিত হয়ে দেহির দিকে তাকিয়ে থাকে।

নাটক শেষ হতেই করতালিতে ফেটে পড়ে মোহিত মঞ্চ।

পরেরদিন সকাল দশটা নাগাদ দেহি চেম্বারে ঢুকতেই দেখে শুভ্রা যাবতীয় ফাইল রেডি করে টেবিলে আগে থাকতেই গুছিয়ে রেখেছে। দেহি, শুভ্রার কাঁধে হাত রেখে বলে ওঠে, “রেডি?”

— “আমি তো রেডি, তুই কি রেডি?” শুভ্রার প্রশ্নে দেহি হেসে বলে, “খুনি চোখের সামনে, আর আমি এদিক ওদিক করে বেড়াচ্ছিলাম।” কথাটা বলে হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে সময়টা দেখে নিয়ে দেহি “চল। সময় হয়ে গেছে।” বলে।

কোর্টরুমে দত্তবাড়ির সবাই উপস্থিত। দেবাশীষ কয়েকজন পুলিশের মাঝে বসা। দেহি ও শুভ্রা নিজেদের মধ্যে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে করতেই জজসাহেব কোর্টে উপস্থিত হয়। সবাই উঠে দাঁড়িয়ে জজসাহেবকে সম্মান জানিয়ে জজের অনুমতি পেয়ে নিজের নিজের জায়গায় বসে। টেবিলের উপর রাখা বিভিন্ন কাগজপত্রে একবার করে চোখ বুলিয়ে নিয়ে জজসাহেব বলে “মিসেস দেহি, ইউ মে প্রসিড।”

আদেশ পেয়ে দেহি নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে এসে বলতে শুরু করে, “মাই লর্ড আগের হেয়ারিং ডেটে দত্তবাড়ির ছোটবউ শ্রীমতি দ্যুতি দেবীর শারীরিক অসুস্থতার জন্য কোর্টে উপস্থিত হতে পারেননি। আজ উনি উপস্থিত, তাই প্রথমেই আমি দ্যুতি দেবীকে উইটনেস বক্সে ডেকে নিতে চাই।”

— “পারমিশন গ্রান্টেড।” জজসাহেব কথাটা বলতেই দ্যুতি উইটনেস বক্সে এসে দাঁড়ায়। আদালতের কার্যবিধি মিটিয়ে দেহি, দ্যুতি দেবীর কাছে গিয়ে প্রশ্ন করে, “আপনার জবানবন্দিতে আছে আপনি কৌশিক দত্তের উইলের কথা পুলিশকে জানিয়েছেন। আপনাকে এটাও বলে রাখি, আজ থেকে সাতবছর আগে এই কেসের তদন্ত যে ইন্সপেক্টর করেছিল অর্থাৎ ইন্সপেক্টর রূপম সেন, তিনিও আদালতে উপস্থিত আছে। আমার প্রশ্ন, উইলের কথা আপনি জানলেন কী করে?”

দেহির প্রশ্নে দ্যুতি একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে নিয়ে বলে, “ওই উইল আমিই নিজে তৈরি করেছিলাম।”

— “কোর্টকে সেই কারণটা বলবেন, কেন করেছিলেন?”

— “আমি কৌশিক আর বড়দি মানে প্রমীলা দত্তের সম্পর্কের কথা জানতাম। কৌশিক, মহেন্দ্রনাথ দত্তের খুব প্রিয় ছিল। কিন্তু বড়দির সাথে সম্পর্কের কথা জানাজানি হলে, উনি ভেঙে পড়বেই, আমার উদ্দেশ্য ছিল ওঁকে মানসিক আঘাত দিয়ে অসুস্থ করা। কিন্তু ইন্সপেক্টর রূপম সেন, সেটা কিছুতেই বাড়ির লোকদের জানাচ্ছিল না, তাই আমি একটা জাল উইল তৈরি করি, যাতে রূপম বাবু বাধ্য হয় সত্যিটা বলতে। আর সেটাই হয়েছিল। আসলে আমার বার বার মনে হচ্ছিল, মহেন্দ্রনাথ এই সম্পর্কের কথা জানতেন আর তিনি বিষ দিয়ে মেজদাকে মেরেছে।”

— “মনে হবার কারণ?”

— “আমি বাড়ির কাজের লোকেদের কাছ থেকে জানতে পারি, মহেন্দ্রনাথের দেরাজে বিষ আছে।”

— “মাঝপথে দিল্লি যাওয়ার কারণ?”

— “সেলিম আমাকে ব্ল্যাকমেল শুরু করেছিল, সেই টাকাটা দিতে।”

— “ব্ল্যাকমেল কীসের জন্য?”

— “কারণ আমার কথামতোই ও জাল উইলটা তৈরি করে।” দ্যুতির কথা শুনে পুরো কোর্টরুম শান্ত। দেহি একঝলক দ্যুতিকে দেখে নিয়ে নিজের জায়গায় যেতে বলে। দ্যুতি উইটনেস বক্স থেকে বিদায় নিতেই দেহি জজসাহেবের দিকে ঘুরে বলে ওঠে, “মাই লর্ড এই কেসের মূল যে আরোপী অর্থাৎ শ্রীমতি প্রমীলা দত্তকে এবার উইটনেস বক্সে ডেকে নিতে চাই।”

জজসাহেবের আদেশ পেয়ে প্রমীলা দেহির সামনে উইটনেস বক্সে এসে দাঁড়ায়। পরনে সাদা রঙের থান। দেহি সামান্য বিনম্রসুরে জিজ্ঞাসা করে, “শুনলাম কাল রাতে আপনার শরীর খুব খারাপ করেছিল।” দেহির প্রশ্নে প্রমীলা মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ” করে।

— “বিশ্বাস মানুষকে সর্বনাশের পথে ঠেলে দেয়।” হঠাৎ দেহির এইরকম একটা কথায় প্রমীলা একটু অবাক হয়ে দেহির দিকে তাকায়। দেহি বলে, “প্রমীলা দেবী আপনি জাহ্নবী পালের নাম কখনও শুনেছেন?”

দেহির প্রশ্নে স্ত্রীলোকের নাম শুনে জজসাহেব জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “মিসেস দেহি, এই জাহ্নবী পাল কে? এই কেসের সাথে তার কী সম্পর্ক?” জজসাহেবের প্রশ্নে, দেহি শান্ত গলায় বলে, “মাই লর্ড, এই জাহ্নবী পালই হল দত্তবাড়ির ত্রয়ীখুনের কাণ্ডারী। আজ থেকে পনেরো বছর আগে, এই জাহ্নবীর সাথে ভিক্টিম কৌশিক দত্তের ভালোবাসা ছিল। দুজনে বিয়েও করবে বলে ঠিক করে এবং এদের সম্পর্ক দত্তবাড়ির অধিস্বামী শ্রী মহেন্দ্রনাথ দত্ত মেনেও নেন। কিন্তু মুশকিল হল, এই বাড়ির বড় ছেলে আশীষ দত্তের তখনও বিয়ে হয়নি। মাঝপথে, কাঁচা বয়সেই জাহ্নবী গর্ভবতী হয় ও সন্তানটা ছিল কৌশিক দত্তের। জাহ্নবীর আসল বাড়ি নদীয়ার বীরনগর। গর্ভবতী হবার প্রথম মাসেই জাহ্নবী কল্যাণীতে এসে শ্রীমতি সরোজিনী দাসের বাড়ি ভাড়া ওঠেন। সন্তানের মাস তিন মাসে ঠেকলো, এরপরই সবাই বুঝতে পেরে যাবে যে বিয়ের আগেই জাহ্নবী মা হতে চলেছে। সেইজন্য জাহ্নবী দত্তবাড়িতে কৌশিকের সাথে দেখা করতে যায় এই ভেবে যদি আশীষ দত্তের আগে সে বিয়ে করে। ওই বছরই আশীষ দত্তের সাথে, উইটনেসে দাঁড়িয়ে থাকা বাদী শ্রীমতী প্রমীলা দত্তের সাথে আশীষ দত্তের বিয়ে হয়।” এটুকু বলে নিয়ে দেহি জজসাহেবের থেকে মুখ ফিরিয়ে প্রমীলার দিকে তাকিয়ে আবার বলে ওঠে, “বলুন প্রমীলা দেবী জাহ্নবীর কথা আপনি জানতেন কিনা?” দেহির প্রশ্নে প্রমীলা সামান্য মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ” করতেই দেহি জিজ্ঞাসা করে, “কীভাবে?”

— “কলেজে থাকাকালীন কৌশিক একটি মেয়েকে ভালোবাসত, তার নাম জাহ্নবী। ব্যস এইটুকুই কৌশিক আমায় বলেছিল। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এখন সে কোথায়, উত্তরে কৌশিক হেঁয়ালির সুরে বলে, “সে সবসময় আমার সাথে। তার সাথে আজও আমি সময় কাটাই”।”

— “মাই লর্ড, এই জাহ্নবী গর্ভবতী অবস্থায় উপস্থিত হলে সে প্রমীলা দেবীর স্বামী ওরফে ভিক্টিম আশীষ দত্তের মুখোমুখি হয়। বাড়িতে সেদিন কেবলমাত্র কৌশিক দত্ত, আশীষ দত্ত ও কাজের লোক শম্ভু নাথ উপস্থিত ছিল। কৌশিক দত্ত কিছুক্ষণের জন্য বাইরের দোকানে সিগারেট কিনতে যাওয়ায়, কৌশিক দত্তের ঘরে আশীষ দত্ত ও শম্ভু নাথ এসে ঢোকে এবং দুইজনে জাহ্নবীর গলা টিপে খুন করে।”

মুহূর্তের মধ্যে কোর্টরুমে কলরব উঠলে, “সাইলেন্ট ইন দ্য কোর্ট।” জজসাহেব বলে ওঠে। “ইউ মে।” দেহিকে আদেশ দিতেই দেহি আবার বলতে শুরু করে, “আশীষ দত্ত ছিলেন অতিলোভী। তিনি প্রথমে জানতেন না জাহ্নবী প্রেগন্যান্ট। আশীষ দত্তের উদ্দেশ্য ছিল, জাহ্নবীকে ভোগ করা আর এর সাথে যুক্ত ছিল চাকর শম্ভু নাথ। কিন্তু যেই মুহূর্তে আশীষ দত্ত জানতে পারল, জাহ্নবী কৌশিকের সন্তানের মা হতে চলেছে, তার জিঘাংসা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। ভাবল, কৌশিকের সন্তান আগে জন্ম নিলে যদি ওঁর বাবা মহেন্দ্রনাথ সব সম্পত্তি কৌশিকের সন্তানকে দিয়ে দেয়। সে বাড়ির বড়ছেলে, অধিকার তার। ব্যস, জাহ্নবীকে খুন। যে বাড়িতে আরাধ্যা স্বয়ং সন্তানের দেবী, মা ষষ্ঠী, সেই বাড়িতেই অজন্মিত নিষ্পাপ সন্তান সমেত, এক মাকে চাকর ও মুনিব মিলে খুন করে। প্রমীলা দেবী, মা পাপ মেনে নেননি। সন্তানের জিঘাংসায় সন্তান হত্যা। যার জন্য আশীষবাবু কোনোদিন সন্তানের সুখই পেলেন না। মাই লর্ড এই ঘটনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষী হলেন, দত্তবাড়ির ছোটছেলে শ্রী দেবাশীষ দত্ত। আমি ওঁর কাছ থেকেই বিস্তারিত ঘটনা জানতে পারি। যার জবানবন্দি আমি আদালতে সাবমিট করেছি।” দেহি বলে নিয়ে প্রমীলার দিকে ঘুরে প্রমীলাকে নিজের জায়গায় গিয়ে বসতে বলে।

জজসাহেবের দিকে ঘুরে দেহি দত্তবাড়ির কর্তা মহেন্দ্রনাথ দত্তকে উইটনেস বক্সে ডাকার আর্জি জানালে জজসাহেব সম্মতি দেন।

— “মহেন্দ্রবাবু, দ্যুতি দেবী জানাল আপনার কাছে বিষ আছে, সেটা সত্যি?”

— “হ্যাঁ।” মহেন্দ্রনাথ দত্ত বলে।

— “কী বিষ?”

— “নর্মাল পেস্টিসাইড।”

— “ইঁদুর মারার জন্য?”

— “হ্যাঁ। তবে কৌশিক যেদিন খুন হয়, সেদিন রাতে আমিও আমার দেরাজ থেকে বিষ বের করি।”

— “কেন? দ্যুতি দেবীকে খাওয়াবেন বলে?”

— “না। আশীষকে। দিনের পর দিন কৌশিকের মানসিক যন্ত্রণা আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। আশীষের জন্য কৌশিকের জীবন তছনছ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু...”

— “কিন্তু আপনি পারলেন না। কারণ কোথাও গিয়ে আপনার মনে হয়েছিল, কৌশিকের মৃত্যুতেই কৌশিকের মুক্তি। তাই না?” কথাটা শুনে মহেন্দ্রনাথ অবাক চোখে দেহির দিকে তাকায়। অস্ফুটস্বরে বলে ওঠে, “আমি খুন করিনি।”

— “আমি তো বলিনি আপনি খুন করেছেন। আপনার এটা চিন্তা এসেছিল। আর এই মনের বিষাদটা আপনি আপনার চাকর শম্ভুর সাথে শেয়ার করেন।” কথাটা বলেই দেহি জজসাহেবের দিকে ঘুরে বলে ওঠে, “মাই লর্ড এই শম্ভু নাথ অতি রঙিন প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। বাড়ির কর্তারা শুধু নয়, মেয়েদের শরীর ভোগের নেশা এর মধ্যেও বর্তমান ছিল। এই শম্ভুই বাড়ির কাজের মেয়ে রত্নার সাথে একটা সম্পর্ক তৈরি করে আর রত্নার কাছে, মহেন্দ্রনাথের কথাটা জানিয়ে দেয়। কাজের মেয়েরা যথেষ্ট ভয় পেত, কারণ এই শম্ভু বড়কত্তা মানে মহেন্দনাথের অতি প্রিয়। শম্ভুর কথা না শুনলে যদি দত্তবাড়ির পাট চুকে যায়। আপনি আসতে পারেন মহেন্দ্রবাবু।”

দত্তবাড়ির সপক্ষে থাকা উকিল নিলেশ বাড়ুই অনেকক্ষণ সহ্য করে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে বলে ওঠে, “অবজেকশন মাই লর্ড। দেহি দেবী অযথা আদালতের সময় ব্যয় করছেন। খুনগুলো কে করেছেন? সেটা যদি উনি জেনে থাকেন তাহলে কেন সেটা আদালতে পেশ করছেন না?”

— “মাননীয় বন্ধুবর, এসব ব্যাপারে সময় লাগে।” দেহি মুহূর্তের মধ্যে বলে ওঠে। “সুতোতে একটা গিঁট নেই। আমি ধাপে ধাপে বুঝিয়ে সিঁড়ি ভাঙি। স্টেপজাম্প করে না।”

— ”অবজেকশন ওভাররুল। মিসেস দেহি ইউ মে প্রসিড।” জজসাহেব কথাটা বলতেই দেহি বলে, “মাই লর্ড, আমি এবার এমন একজনকে উইটনেস বক্সে ডাকতে চলেছি, যার সাথে এই দত্তবাড়ির সম্পর্ক নেই এবং তিনি হলেন শ্রী নয়ন পাল। যাকে কলকাতা ব্রাঞ্চ বীরনগর থেকে অ্যারস্ট করেছে।”

জজসাহেব আদেশ দিতেই যশ ও সাথে দুজন অফিসার নয়ন পালকে কাঠগড়ায় এনে তোলে। দেহি মুখে একটা হাসি এনে নয়নের কাছে এগিয়ে বলে, “দিল্লি নামার পরেই আমি বলেছিলাম, আবার দেখা হবে।” দেহিকে দেখে নয়য়ের মুখের ভাব পুরো বদলে গেল। দেহি জজসাহেবের দিকে ফিরে আবার বলে ওঠে, “মাই লর্ড উইটনেস বক্সে দাঁড়িয়ে থাকা এই ব্যাক্তির সম্পূর্ণ শনাক্তকরণের জন্য আমি আদার উইটনেস বক্সে বাদীপক্ষের প্রধান সাক্ষী শ্রীমতি শঙ্করী দেবীকে ডেকে নিতে চাই।”

— “পারমিশন গ্রান্টেড।”

অপর কাঠগড়ায় শঙ্করী এসে দাঁড়াতেই দেহি শঙ্করীর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে, “শঙ্করী দেবী সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই ব্যাক্তিকে চেনেন?”

— “না।” শঙ্করী বেশ জোরের সাথেই বলতেই দেহি নরম সুরে হেসে বলে ওঠে, “সে কী? যার সাথে সাত পাঁক ঘুরে সিঁদুর পড়লেন, সেই স্বামীকে চিনতে পারলেন না?” শঙ্করীর মুখ পাথর, দেহি বলে চলে, “কৌশিক দত্ত, শম্ভু নাথ ও আশীষ দত্তকে খুন আপনি করেছেন।” মুহূর্তের মধ্যে কোর্টে লোকদের গুঞ্জন আরম্ভ। দত্তবাড়ির লোকেদের মুখের ভাব বদলে গেছে। প্রমীলা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে শঙ্করীর দিকে।

শঙ্করী গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, “প্রমাণ?”

— “প্রচুর আছে।” দেহিও গম্ভীর গলায় বলে ওঠে। “প্রথম প্রমাণ, আপনি হলেন জাহ্নবী পালের বউদি। জাহ্নবীকে আপনি খুবই ভালোবাসতেন। জাহ্নবীর পেটে কার সন্তান সেটা জাহ্নবী আপনাকে জানিয়েছিল আর আপনি আপনার স্বামী নয়ন পালকে সেটা জানান। আপনি এটাও জানতেন, জাহ্নবী দত্তবাড়িতে যাওয়ার পর থেকে তার খোঁজ মিলছে না। অতএব হয় জাহ্নবী মারা গেছে অথবা জাহ্নবীকে দত্তবাড়ির লোকেরা কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। সেই সুবাদে আপনি সন্তোষপুরে গিয়ে দত্তবাড়িতে কাজের লোক হয়ে কাজ করতে শুরু করেন আর শম্ভু আর আশীষের চরিত্র খারাপ ছিলই, আপনি সেটার সুযোগ নিয়ে নিলেন। এটা ওইবাড়িতে কাজ করে রত্না, আমার বান্ধবী কাম অ্যাডভোকেট শুভ্রা সরকারকে জানিয়েছে। আপনার স্বামী ওষুধ ডেলিভারি নয় ওষুধ তৈরির কাজ করে। যার জন্য তাকে বড় বড় ড্রাগস ল্যাবে যাতায়াত করতে হয়। কারণ এই তিন ভিক্টিমের শরীরে যে বিষ পাওয়া গেছে তা বাজারের কেনা বিষ নয়। নয়ন পাল আপনাকে বিষ দিল আর আপনি সেগুলো ব্যবহার শুরু করে দিলেন। কৌশিক দত্তকে রাইসিন, শম্ভু নাথকে অ্যাকোনাইট আর আশীষ দত্তকে ব্যারামেক্সিন। আপনাকে আমি সেইদিনই ধরে ফেলেছিলাম, যেদিন আপনার ভাড়া বাড়িতে আপনার ও প্রমীলা দেবীর সাথে দেখা করতে যাই। টেবিল থেকে ভাঙা কাপ তোলার সময় আমি বইয়ের ধারে একটা বিষের শিশি দেখতে পাই আর ওটা আমি চুরিও করি। পরীক্ষা করে জানি ওটা রাইসিন। এর পরের ঘটনা আমার জানা। এবার আপনি আদালতকে বলবেন নাকি আমি? না বললেও কোনো সমস্যা নেই, কারণ নয়ন পালের জবানবন্দি ব্রাঞ্চ ইনচার্জ যশ রায়চৌধুরীর কাছে।”

শঙ্করী মাথা নামিয়ে বলে ওঠে, “আমি প্রায়শই দেখতাম কৌশিক ছাদের ওই চিলেকোঠা ঘরটায় গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত। একদিন প্রমীলা নীচে নেমে আসার পর আমি উপরে যাই কৌশিককে বলতে যে আমি জাহ্নবীর দিদি। কিন্তু চিলেকোঠার ঘরে ঢুকতে গিয়ে আমি শুনতে পাই, কৌশিক কাঁদতে কাঁদতে দেওয়াল ধরে বলছে, আমার জন্য তোমায় মরতে হল জাহ্নবী। দাদা আর শম্ভু শুধু নয়, আমিও দোষী। আর...”

— “আর তখনই আপনি ঠিক করলেন এদের মারবেন। শম্ভু আর আশীষ দুইজনই আপনার হাতে। মহেন্দ্রনাথ যে খুন করতে চায় কৌশিককে সেটা শম্ভু আপনাকে আগেই বলেছিল। আর শম্ভুর বিশ্বাস যাতে আরও আপনার প্রতি গভীর হয় সেটার জন্য, আপনি শম্ভুকে প্রমীলা দেবী ও কৌশিক দত্তের সম্পর্কের কথা জানিয়ে দেন। সুতরাং কোনোমতেই সন্দেহর তীর আপনার দিকে এগোবে না। আপনি কৌশিক দত্তকে বিষ দিলেন, কিন্তু কৌশিক দত্ত মরল না। আপনি ভাবলেন বিষ কাজ করেনি। আসলে নয়ন পাল কেবল এটা জানত রাইসিন বিষ। কিন্তু তার প্রভাব কী সে জানত না বলেই আপনি জানতেন না। আপনি শম্ভুর সাহায্যে কৌশিকবাবুকে ফাঁস দিয়ে ঝুলিয়ে দিলেন।

— “হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি কৌশিককে খুন করেছি। জাহ্নবী বিশ্বাস করেছিল ওকে আর তার ফলস্বরূপে কী পেল? আমি ওইদিন রাতে দীপিকা নেমে আসার পর ছাদে কৌশিকের সাথে দেখা করতে যাই। সব বলি। কাঁদতে কাঁদতে ওকে মিনতি করি যে জাহ্নবীর দেহ কোথায় সেটা জানার জন্য। আমি পুরো প্ল্যান করেই ছিলাম। ও সত্যি কথা বললেও আমি ওকে মারব, না বললেও মারব। কৌশিক কিছুই বলল না, ব্যস পিছন দিকে থেকে শম্ভু এসে আমার কাজটা করল।

— “শম্ভুকে মারার কারণ?”

— “হুমকি দিচ্ছিল খুব। আর হুমকি না দিলেও মারতাম কারণ চালের সাথে কাঁকড় থাকলে, দাঁতে কাটতে পারে।”

— “শম্ভু বেঁচে। মাঝখান থেকে প্রমীলা দেবী আর কৌশিক দত্তের সম্পর্কের কথা উঠে এলো। ব্যস পুরো সন্দেহ দানা বেঁধে নিল প্রমীলা দেবীর উপর। শম্ভুকে সূঁচের আগায় বিষ মিশিয়ে খুন। খুন করে প্রমীলা দেবীর ব্লাউজের টুকরো শম্ভুর হাতে গুঁজে দেওয়া। এইখানে হল মুশকিল। প্রমীলা দেবী জেলে। কিন্তু আশীষবাবু বাকি। দ্যুতি দেবীর সন্দেহ আপনার উপর হয়ে গিয়েছিল আর সেটা আপনি আঁচ করতে পেরেই দত্তবাড়িতে ইচ্ছাকৃত ঝগড়া করে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। মনে চলছে প্রতিশোধের শিখা। পাঁচ বছর পর আমার সাথে দেখা হবার পর আপনার সেই প্রতিশোধের আগুন পুনরায় জ্বলে উঠল। কোনোক্রমে আমার সাহায্য নিয়ে যদি প্রমীলা দেবীকে জেল থেকে বের করে আনা যায় তাহলে আশীষ দত্তকে মারতে কোনো আসুবিধা হবে না। কারণ প্রমীলা বেরোল আর আশীষ খুন হল। খুনি কাকে ধরা হবে, প্রমীলা দত্তকে। ওইদিন রাতে আশীষ দত্তকে ব্যারামেক্সিন মেশানো খাবার খাইয়ে মেরে অ্যাক্সিডেন্ট করালেন। মোবাইল সমেত যাবতীয় আইডি প্রুফ সাথে নিয়ে নিলেন যাতে কোনো ভাবেই আশীষের সাথে আপনি যুক্ত সেটা কেউ ধরতে না পারে। বিষয়টা যাতে খুনই দাঁড়ায় সেটা প্রমাণ করার জন্য। নয়ন পাল দিল্লি গিয়েছিল ল্যাব থেকে ব্যারামেক্সিন আনতে। কথায় বলে ভাগ্য, সেটা আমার ক্ষেত্রেই হল। ট্রেনের একই কেবিনে আমি ও নয়ন পাল। ওখানকার হার্বাল ল্যাব থেকে ফাইভ এমএল ব্যারামেক্সিন চুরি হয়েছে।” কথাটা বলেই বারটেবিলের কাছে এগিয়ে শুভ্রার হাত থেকে একটা রিপোর্ট নিয়ে জজসাহেবের টেবিলে দেহি পেশ করে।

— “বলুন শঙ্করী দেবী, আমি এতক্ষণ ধরে যা যা বললাম সব ঠিক কিনা।”

শঙ্করী মাথা নামিয়ে “হ্যাঁ” করতেই দেহি বলে ওঠে, “দ্যাটস অল মাই লর্ড।”

কথাটা বলে দেহি বার টেবিলে নিজের জায়গায় গিয়ে বসে আর অন্যদিকে জজসাহেব শাস্তি লিখতে থাকে।

শাস্তি স্বরূপে শঙ্করী পাল ও নয়ন পালকে খুনের জন্য যাবতজীবন ও দেবাশীষ দত্তকে জাহ্নবীর দত্তের খুনের প্রমাণ লোপাটে সাতবছরের জেল কাস্টেডি বরাদ্দ করে। কোর্টের বাইরে দেহি আসতেই প্রমীলা জড়ো হাত করে বলে ওঠে, “আপনাকে ধন্যবাদ দেব, নাকি সত্যিটা জানাতে শোক প্রকাশ করব, জানি না।” প্রমীলার কথা শুনে দেহি একটা ছোট্ট হাসি দিয়ে বলে ওঠে, “ওই জন্যই তো বললাম, বিশ্বাস করাটাই কাল। মেয়েরাই যে মেয়েদের পরমশত্রু এটা আবার প্রমাণ করে গেল। যাইহোক, আপনি এখন থাকবেন কোথায়?”

মুহূর্তের মধ্যে দীপিকা সামনে এসে বলে, “আমার কাছে থাকবে দিদি। যে বাড়িতে তার অধিকার সবার আগে।” কথাটা শুনে দেহি বলে, “যাক, একটা মেয়েই যে মেয়ের মনকে বুঝতে পারে সেটাও প্রমাণ হল।”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%