অষ্টম পরিচ্ছেদ

শান্তনু দাশ

শিয়ালদা স্টেশনের ভীড় কাটিয়ে বড় ট্রলিটা টেনে নিয়ে লালরঙের রাজধানী যে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে চলে যায় দেহি আর শুভ্রা। রাস্তায় জ্যাম থাকার জন্য গাড়ি প্রচুরবার সিগনালে আটকিয়েছে। আধঘণ্টার রাস্তা দেড়ঘণ্টায় পৌঁছিয়েছে। ট্রেনের নিজস্ব ক্লাসের দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে বড় লাগেজ ট্রলিটা ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে শুভ্রা আর দেহি ভিতরে ঢোকে। ট্রেনের ছোট কুপ দিয়ে হেঁটে এসে নির্দিষ্ট কেবিনের দরজা খুলে নিজের বার্থ নম্বরটা দেখে নিয়ে ট্রলিটা রেখে বার্থ সীটে দুই বান্ধবী বসে। দেহি একটা গাঢ় পলাশ ফুলের রঙের মতো কুর্তি কালো জ্যাগিন্সের সঙ্গে পড়েছে। মাথার লম্বা চুল হস্টেল খোঁপায় বাঁধা।

— “গাড়ির চাবি দিয়ে গেলাম।” সীটে বসে দেহি বলে ওঠে। শুভ্রা গাড়ির চাবি নিজের চেনপার্সে ঢুকিয়ে নিয়ে বলে, “দিল্লিতে কোনো সমস্যা হলে একটা কল করবি আমি পৌঁছে যাব। আর সাতদিনের জন্য যাচ্ছিস ট্রলিতে জামাকাপড় ভরেছিস যেন তিনমাসের। অপারেশনের জিনিসপত্র নেবার কী দরকার?”

— “কে বলতে পারে যদি দরকার পড়ে।”

ইতিমধ্যে দুইজন ভদ্রলোক কেবিনের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে বাঁদিকের লোয়ার আর আপার বার্থের নম্বর দেখে নিয়ে নিজেদের মালপত্র রাখে। দেহির ডানদিকে লোয়ার বার্থ। শুভ্রা দেহিকে দুইবাহুতে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে, “প্রথমবার আমরা একসাথে যাচ্ছি না।”

কথাটা শুনে নিয়ে দেহি সামান্য হেসে বলে ওঠে, “যেখানে দেহি সশরীরে নেই, সেই জায়গায় তার ছায়াটা থাকা খুব দরকার। আর দেহির ছায়া শুভ্রা, তাকে যে থাকতেই হবে।”

আরও দশ মিনিট মতো কেবিনে থেকে শুভ্রা কেবিন থেকে বেড়িয়ে গিয়ে ট্রেনের বাইরে এসে প্ল্যাটফর্মে নামে। নির্দিষ্ট সময়ে ট্রেন হর্ণ মেরে স্টেশন ছেড়ে বেরোতে শুরু করে ভারতরাজধানীর উদ্দেশে। দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেহিকে দেখতে না পেলেও ট্রেনটার উদ্দেশে শুভ্রা হাত নেড়ে দেহিকে বিদায় জানিয়ে চলে।

রাজধানীর এ-ওয়ানক্লাস কেবিনে তিনজন মানুষ নিজেদের নিজস্ব কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। দেহি নিজের বড় সাইড ব্যাগের চেন খুলে তার ভিতর থেকে একটি ইংরাজি বই বের করে বুকমার্কের জায়গাটা খুলে নিয়ে, ডান পা-টা বাঁ পায়ের উপরে তুলে বইটা মুখের সামনে ধরে। বইটি হল হোমারের লেখা ‘ইলিয়াড’। এটা আসলে দেহির একটা ছুতো। কেবিনে থাকা বাকি দুই সহযাত্রীর গতিবিধি বই পড়ার মাধ্যমে লক্ষ করা। কেবিনের অপর দুই ব্যক্তির মধ্যে একজন মাঝবয়সি, অন্যজনের বয়স তার থেকে কিছুটা কম। মাঝবয়সি ভদ্রলোকের মাথার চুল কালো হলেও, পাতলা হয়ে গিয়ে সামনের দিকটায় টাকের একটা প্রভাব পড়েছে। স্বাস্থ্য ভালো, গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, পরনে কালো ও গাঢ় নীল গামছা চেকের ফাফ শার্ট ও নীল জিন্সের প্যান্ট। অপর ব্যক্তির মাথার চুল এঁর মতো পাতলা না হলেও অতটাও ঘন কেশরাশি নয়। ছিপছিপে দেহের গড়ন, গায়ের রঙ ফর্সা, পরনে ছাই রঙের ফুল টি-শার্ট সঙ্গে রিড দেওয়া মাখন কালারের কটন জিন্স। মাঝবয়সি ব্যক্তিটি আপারবার্থে হেলান দিয়ে বসে, গণশত্রু নামক এক চটি ম্যাগাজিন পড়ছে আর কমবয়সি ভদ্রলোকটি দেহির মুখোমুখি লোয়ারবার্থে পা ছড়িয়ে বসে, একটি ক্যালকুলেটরে হিসাব করে নোটবুকে গোলাপি রঙের উডপেন্সিল দিয়ে লিখে নিচ্ছে। আগের শিয়ালদা-রাজধানী থামত পাঁচটা স্টেশনে, বর্তমানে দুটো বেড়ে সাতটা হয়েছে। একশো তিরিশ কিমি ঘণ্টা বেগে রাজধানী ছুটে চলেছে ভারতের রাজধানীর দিকে। দিল্লি পৌঁছতে ট্রেনে একরাত।

প্রায় আধাঘণ্টা পর কেবিনের দরজায় দুই-তিনটে টোকা মেড়ে কেবিনের দরজা খোলে কালো কোটের সঙ্গে সাদা ফর্মাল প্যান্ট পড়া টিকিট চেকার। কেবিনের তিনজন যাত্রীই তার দিকে তাকিয়ে নিয়ে নিজেদের টিকিট বের করতে থাকে। সবার টিকিট চেক করে, হাতে ধরে রাখা কাগজে চেকিং রিপোর্ট লিখে নিয়ে কেবিন থেকে বেরোতে যাবে এমন সময়, “এক্সকিউজ মী” দেহি বলে ওঠে।

— “ইয়েস ম্যাম।” চেকার পিছন ঘুরে দেহির দিকে তাকিয়ে বলে।

— “আমাদের কেবিনের ফোর্থ প্যাসেঞ্জার কোথা থেকে উঠবে?” দেহির প্রশ্নে চেকার নিজের হাতে ধরে রাখা কাগজের পাতা উলটে দেখে নিয়ে জানায় “উনি উঠবেন আসানসোল থেকে।” শুনে নিয়ে দেহি ছোট্ট করে একটা “থ্যাঙ্কস” জানায় ও চেকার মাথা নাড়িয়ে একটা হাসি দিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়।

মাঝবয়সি ভদ্রলোকটি দেহির দিকে তাকিয়ে বিনয়ীসুরে জিজ্ঞাসা করে, “আপনি কি পুরো শেষ পর্যন্ত?”

— “হ্যাঁ।” দেহি বইয়ের থেকে চোখ উঠিয়ে উত্তরে বলে।

দেহির উত্তর শুনে কমবয়সি ভদ্রলোকটিও হাসি মুখে বলে ওঠে, “ও। আমিও দিল্লি।”

— “আমি নামব গয়া।” মাঝবয়সি ভদ্রলোকটি বলে। লোকটির কথা শুনে দেহি সামান্য হেসে নিয়ে বলে ওঠে, “তাহলে সেই এগারোটায়।”

— “হ্যাঁ। আমার নাম...”

— “ঋষিকেশ বাগচী।” মাঝবয়সি ভদ্রলোকটির কথা চাপিয়ে দিয়ে দেহি মুহূর্তের মধ্যে বলে ওঠে। দেহির দুই সহযাত্রী বিহ্বল দৃষ্টিতে দেহির দিকে তাকিয়ে থাকতেই দেহি ছোট্ট একটা মৃদুহাসি হেসে বলে, “টিকিট দেবার সময় আপনি যখন আপনার মানিব্যাগটা বের করলেন তখন আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্সটায় চোখ পড়ে।” কথাটা বলেই দেহি সামনের দিকে কমবয়সি ভদ্রলোকটির দিকে তাকিয়ে বলে, “আর আপনার নাম নয়ন পাল। এবার আপনি বলবেন আপনি তো প্যান্টের পকেট থেকে টিকিট বের করলেন তাহলে জানালাম কী করে? তার উত্তরটা হল আপনার হাতের সোনার ব্রেসলেটটায় আপনার নামটা খোদাই করা আর টিকিট চেকার টিকিট চেক করার পর আপনাকে ‘মিঃ পাল’ বলে সম্বোধন করে টিকিটটা হাতে দিয়েছিল।”

দেহির কয়েকমুহূর্তের পরিদর্শন ক্ষমতার তারিফ না করে দুই সহযাত্রী থাকতে পারল না। অপরজনের নাম জানা থাকলে ভদ্রতার খাতিরে নিজের নামটাও জানাতে হয়, সেইজন্যই বোধহয় দেহি নিজের নামটা দুই সহযাত্রীকে জানায়।

— “আমার নাম হল যাজ্ঞসেনী ব্যানার্জী।” দেহি বলে। এটা দেহির এক অদ্ভুত প্রকারের স্বভাব। খুব দরকার না পড়লে অপরিচিত মানুষের সামনে নিজের আসল নাম উল্লেখ করে না এমনকি নিজের প্রফেশনটাও গোপনে রাখে।

— “আপনি কি দিল্লি যাচ্ছেন কোনো কাজে নাকি ঘুরতে?” ঋষিকেশ বাগচী প্রশ্ন করতেই দেহি হাতে ধরে রাখা বইটি পাশে রেখে বলে, “বলতে পারেন দুটোই। আমি হলাম বেথুন কলেজের হিস্ট্রি টিচার। দিল্লি সংক্রান্ত একটা আর্টিক্যাল লিখতেই দিল্লি ঘুরতে যাওয়া।”

— “ও, আমি একটা প্রাইভেট ফার্মে জব করি। গত দুই বছর আগে আমার বাবা মারা যান আর মা মারা গেছেন আমি যখন বারো ক্লাস দিচ্ছি। গয়া যাচ্ছি ওঁদের ওই শ্রাদ্ধশান্তির কাজে।” ঋষিকেশের কথাগুলো দেহি মন দিয়ে শোনার ফাঁকে ফাঁকে আড়চোখে নয়ন পালের দিকেও দেহি তাকিয়ে দেখে নেয় নয়নও বেশ গভীর মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনছে। দুইজনের কথা শুনে নিয়ে নয়ন একগাল হেসে বলে ওঠে, “আমি পুরো আলাদা, ব্যাবসাদার মানুষ।”

— “কীসের ব্যাবসা আপনার?” ঋষিকেশ জিজ্ঞাসা করে।

— “ওষুধ ডেলিভারির। বিভিন্ন বড় বড় যে নার্সিংহোম আছে সেখানে। দিল্লি যাচ্ছি সেই সুবাদেই।”

ট্রেন পথে কেবিনের তিনজনের মধ্যে গল্প বেশ জমেই উঠেছে। ইতিমধ্যে কেবিনের দরজায় দুটো টোকা মেরে দরজা খোলে বছর পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের একজন সার্ভার, হাতে ট্রে আর তার মধ্যে কাপ প্লেট সাজানো। তিন কাপ চা কেবিনের তিন জনের হাতে দিয়ে ছেলেটি বেরিয়ে যায়। কথার ফাঁকে ফাঁকে গল্প করা আর সঙ্গে চা খাওয়া দুটোই একসঙ্গে চলছে। প্রায় মিনিট কুড়ি পর যে সার্ভারটি চা দিয়ে গিয়েছিল সে কেবিনে এসে চায়ের কাপগুলো ট্রেতে করে তুলে নিয়ে যায়। আরও দশ মিনিট ট্রেন চলার পর রাজধানী তার প্রথম স্টপেজ দুর্গাপুর জংশনে এসে থামল সন্ধ্যা ছটা আটচল্লিশ মিনিটে। এখানে মিনিট দুই থেমে গাড়ি চলতে শুরু করে তার আগামী গন্তব্য স্টেশনের দিকে। দুর্গাপুরের পর রাজধানী থামবে আসানসোল জংশনে সন্ধ্যা সাতটা ষোলো মিনিটে।

দেহি বেশ সুন্দরভাবে ইতিহাসের জ্ঞান দিয়ে চলেছে এবং তা মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঋষিকেশ ও নয়ন শুনে চলেছে। মাঝে একবার শুভ্রা ফোন করে দেহির সঙ্গে দশ মিনিটের কথা বলে নেয়। দেহির উশখুশ দেখে বোঝাই যাচ্ছে দেহি সিগারেটের নেশা উঠেছে। কেবিনের পাশেই বাথরুম। হাতে সিগারেট আর লাইটার নিয়ে বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেহি। ভিতরে গিয়ে আয়েশ করে সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে থাকে দেহি। সিগারেট খাওয়া শেষ করে বাথরুমের বাইরে বেরিয়ে এসে কেবিনে নিজের বার্থে বসতেই গাড়ি থামল আসানসোল জংশনে। রাজধানী স্টেশনে থামতেই একজন পুরুষযাত্রী এসে ঢুকল কেবিনের মধ্যে। রোগা, ফর্সা, বয়স আন্দাজ ষাটের ঊর্দ্ধে, মাথায় কাঁচাপাকা মেশানো চুল, গোঁফ দাঁড়ি কামানো ও চোখে রিমলেস চশমা, পরনে নস্যি কালারের শার্ট আর কালো ফর্মাল প্যান্ট। লাগেজ বলে কিছুই নেই কেবল একটা বাদামি রঙের ব্রিফকেস। কেবিনে প্রবেশ করে একগাল হেসে যাত্রীটি, “আমি শশাঙ্ক রায়, আমি যাচ্ছি কানপুর সেন্ট্রাল।” বলে নিয়ে দেহির উপরে আপারবার্থে উঠে পড়ে।

ট্রেন চলতে শুরু করলে, দেহি আর কোনোরকম কথা না বলে ব্যাগের ভিতর থেকে একটা গোল আয়না ও হালকা গোলাপি রঙের ম্যাট লিপস্টিক বের করে। ঠোঁটের কাছে আয়না ধরে একটু বেঁকিয়ে, আয়না থেকে আপারবার্থে থাকা শশাঙ্ক রায়কে দেখতে থাকে। শশাঙ্ক রায় নিজের ব্রিফকেসটা খুলে তার ভিতর থেকে একটা খবরের কাগজ বের করে পড়ছে। লিপস্টিক পরে নিয়ে আয়না ও লিপস্টিক ব্যাগে ঢুকিয়ে পাশে রাখা বইটি হাতে তুলে দেহি আবার পড়তে শুরু করে।

তিন-চারজন পুলিশ অফিসারদের নিয়ে সিক্রেটরুমের বড় টেবিলে একটা ম্যাপ ফেলে, হাতে একটা উডপেন্সিল নিয়ে ম্যাপের নির্দিষ্ট একটি জায়গায় গোল করে যশ বলে ওঠে, “সড়কের এই পথ দিয়ে ওরা ভ্যান নিয়ে বেড়িয়েছে। নাকাবন্দি করায় ওরা হরিয়ানা বর্ডার ক্রস করতে পারেনি। খবরি জানিয়েছে মোট তিনজনকে সাথে নিয়ে সেলিমকে দেখা গেছে শেষ বারের মতো এই ক্রসিংবর্ডারে। এরপর থেকে তাদের লোকেশন আর পাওয়া যাচ্ছে না। এর ঠিক পাঁচ কিলোমিটার ভিতরে অধুনা এক গ্রাম আছে নাম উজড়াগাঁও। রাজীব, খবরিদের অ্যাকটিভ করে খবর নিতে বলো এই উজড়াগাঁওতে। আমার বিশ্বাস সেলিম আর তার সাথীরা এইখানেই ডেরাটা বেঁধেছে।”

— “ওকে স্যার।” রাজীব কথাটা বলে আর-একজন অফিসারকে নিয়ে সিক্রেটরুম থেকে বেরিয়ে যায়।

রাজীব ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই রূপম সিক্রেটরুমের দরজা খুলে ভিতরে এসে বলে, “যশ, এই সেলিমের একটি মেয়ে পার্টনার আছে। কিন্তু মেয়েটি কে তার নাম কী সেটা জানা যায়নি। আমার এক খবরি এই খবর জানায়, গ্রীন ভিউ হোটেলে সেলিম আর মেয়েটি দেখা করেছে। কিন্তু সেখানে খবর নিয়ে জানতে পারি, সেলিমের নামে নয়, হোটেল বুক হয়েছিল মেয়েটির নামে আর মেয়েটির নাম নাফিসা শেখ। আর সেলিম নিজের নাম হোটেলে জানিয়েছে রঘুবীর।”

— “রূপম মেয়েটি নিজের আসল নাম নয় নকল নাম ইউজ করেছে।” যশ বলে। “তাহলে বসে থেকে কী হবে, চলো গ্রীনভিউ হোটেল।”

সিক্রেটরুম থেকে সকলে বেরিয়ে এসে পুলিশ ভ্যানে ওঠে। গাড়ির স্টেয়ারিং সীটে যশ ও পাশের সীটে রুপম এবং বাকি অফিসাররা ব্যাকসীটে বসে। গ্রীনভিউ হোটেলে পৌঁছতে সময় লাগল আধাঘণ্টার মতো। পাঁচতলা নির্মিত সুবৃহৎ হোটেল গ্রীনভিউ। রিসেপশনের কাছে ব্রাঞ্চমহলকে এগিয়ে আসতে দেখেই ওখানে বসে থাকা ব্যক্তিটি নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। গলায় একটা ভয় মেশানো ভাবে ব্যক্তিটি বলে ওঠে, “ক্যায়া হুয়া স্যার? অ্যানি প্রবলেম?”

— “হাঁ, প্রবলেম তো হ্যায়।” যশ রিসেপশন টেবিলে হাত রেখে বলে। “নাম?” যশের প্রশ্নে ব্যক্তিটি জানায় তার নাম মনীশ মেহেতা। রূপম নিজের সেলফোনটা পকেট থেকে বের করে একটা ছবি মনীশের সামনে ধরে জিজাসা করে ওঠে, “ইয়ে আদমি ইয়া রুকা থা?”

— “ইয়ে আদমি হোটেল ম্যা আয়া জারুর মাগাড় রুকা নেহি। সায়েদ কিসিসে মিলনে আয়া থা অর মিলনে কে বাদ চলা ভি গ্যায়া।”

— “কাব অর কিসসে?” যশ প্রশ্ন করতেই মনীশ সামনে রাখা কম্পিউটার থেকে দেখে নিয়ে বলে “জী কাল। উনহনে নাফিসা ম্যাডাম কো মিলা থা।”

কথাটা শুনে নিয়ে যশ সামান্য গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, “ইতনা বড়া হোটেল অর সিসি টিভি নেহি হ্যায়।” মনীশ মাথা নামিয়ে শান্ত গলায় বলে ওঠে, “ম্যানে বহতবার ম্যানেজার কো ইয়ে বোলা থা মাগাড় উনহনে ধৈয়ান নেহি দিয়া।”

— “নাফিসা ইয়া পাড় সিফ একদিন রুকা থা?”

— “জী।”

— “ডকুমেন্ট ক্যায়া দিয়া?” প্রশ্ন করতেই মনীশ একটা ফাইল বের করে এটা প্যানকার্ডের জেরক্স যশের হাতে দেয়। কিন্তু নাফিসার মুখ ভালো মতো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না আর ঠিকানা দিল্লির। রূপম ঠিকানাটা কপি করে নিয়ে একজন অফিসারের হাতে দিয়ে বলে “পতে পাড় খোঁজ কারো।”

যশ মনীশের দিকে তাকিয়ে বেশ কড়াভাবে বলে ওঠে, “আজীব হো তুমলোগ। এক লাড়কী আপনা আইডেন্টিটি ঠিক সে নেহি দিয়া ফিরভি হোটেল ম্যা রুম দে দিয়া? সিসি টিভি নেহি হ্যায়। তো ক্যায়া হ্যায় ইস হোটেল মে?”

— “গালতি হো গ্যায়া স্যার।”

— “নাফিসা কা হুলিয়া কুছ বাতা সাক্তে হো ইয়া য়োভি ভুল গ্যায়ে?”

— “জী কুছ কুছ ইয়াদ হ্যায়।”

— “কুছ কুছ নেহি মনীশজী, পুরা চাহিয়ে সামঝে?” কথাটা বলেই যশ পিছনে ফিরে এক অফিসারের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, “একে ব্রাঞ্চে নিয়ে গিয়ে নাফিসার স্কেচ বানাও।”

কথামতো অফিসার, মনীশ মেহেতাকে নিয়ে হোটেল থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। অন্যদিকে রূপম একজন হোটেল বয়ের সঙ্গে কথা বলে নিয়ে যশের কাছে এগিয়ে এসে বলে, “ওই ছেলেটি রুমসার্ভার। সাহিল যখন হোটেলের রুমে যায় তখন ঐ ছেলেটি ড্রিঙ্ক সার্ভ করতে গিয়েছিল আর তখন ওদের মধ্যে কিছু বিষয় নিয়ে নাকি বেশ তর্ক চলছিল।”

— “তর্ক কী নিয়ে?”

— “জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কিন্তু বলতে পারল না কারণ তারা হিন্দি ভাষায় নয় বাংলা ভাষায় কথা বলছিল। দরজায় নক করার আগে নাফিসা বেশ জোরের সাথে বলে উঠেছিল।” এটুকু বলেই রূপম, হলুদ সাদা হোটেল ইউনিফর্ম পড়া ছেলেটিকে তুড়ি মেরে সামনে ডাকে। ছেলেটি কাছে এসে দাঁড়াতেই রূপম জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “দরবাজে মে নক করনে সে প্যাহেলে ক্যায়া শুনা থা তুনে?”

— “তুমি বেশি কুথা বুলো না, তুমহার জুন্য ইয়ে সব হুইছে।” ছেলেটি বলে।

— “য়ো লাড়কী কো তুনে দেখা থা?” যশ প্রশ্ন করতেই ছেলে মাথা নাড়িয়ে “না” করে বলে ওঠে, “নেহি স্যার। ড্রিঙ্ক ও টিপ য়ো আদমি নে লিয়া থা অর দিয়া থা।”

— “ঠিক হ্যায়, তু আপনা কাম কর।” ছেলেটি চলে যেতেই যশ আর রূপম হোটেল থেকে বেরিয়ে আসে।

— “দুটো স্প্রেড।” হাতে তাস নিয়ে কিছুক্ষণ দেখে দেহি বলে ওঠে। ট্রেনে বসে সময় কাটানোর উপযুক্ত এক উপায়। কেবিনের চারজনের মধ্যে বেশ অনেকক্ষণ ধরেই তাসের ব্রীজের দৌড় চলছে। ট্রেনে থাকতে থাকতেই বাকিদের সঙ্গে শশাঙ্ক রায় মিলেমিশে গেছে। উনি যাচ্ছেন ওঁর ভাইয়ের বাড়ি। গত একসপ্তাহ ধরে ভাইয়ের শরীর খুবই খারাপ। ডাক্তারের কল পেয়েই শশাঙ্কর ছুটে যাওয়া এই কানপুরে। কল্যাণীর বি-ব্লকে ওঁর পৈতৃক বাড়ি। ভাই বহুবছর ধরে কাজের সূত্রে কানপুরে। রিটায়ার্ড করার পরও কানপুর ছেড়ে আসতে চাননি। শশাঙ্কবাবুর স্ত্রী গত হয়েছেন গতবছর অক্টোবরে। ভাই বিয়ে করেননি।

দেহির কল শুনে নিয়ে বাকি তিনজন পর পর “পাস” বলে যেতেই দেহি তাস চেলে খেলার রাউন্ড শুরু করে। দেহি ব্রীজে বেশ ভালোই পয়েন্ট তুলেছে। দেহির পার্টনার হয়েছে নয়ন আর ঋষিকেশ আর শশাঙ্ক একে অপরের পার্টনার। ব্রীজ খেলায় শশাঙ্কর হাত খুব পাকা, তাই জন্যই ঋষিকেশ মাঝে মাঝে ভুল চাল চালতেই শশাঙ্কের কাছে বকা খাচ্ছে। এদের চারজনকে দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না যে কয়েকঘণ্টা আগে পর্যন্ত এরা একে অপরের অপরিচিত ছিল। দেহি তাসের রুইতন অর্থাৎ ডায়মন্ডের নয় নম্বরটা চেলে হঠাৎ বলে ওঠে, “নয়নবাবুকে তো প্রায়শই দিল্লি আসতে হয়?” দেহির জিজ্ঞাসায় নয়ন মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ করে উত্তরে বলে, “মাসে দুই কি তিনবার।” বলে নিয়ে তাস ফেলে।

— “কলকাতার কোথায় আপনার বাড়ি?”

— “সেক্টর টু।”

— ও। “তা এখনও বিয়ে করেননি কেন?” দেহির কথা শুনে নয়ন হাসতে হাসতে বলে ওঠে, “পাগল। এই একা আছি বেশ আছি।”

— “একদম খাঁটি কথা।” মুহূর্তের মধ্যে ঋষিকেশ বলে ওঠে। “এই আমকেই ধরুন যাজ্ঞসেনী ম্যাডাম। বিয়ে যতদিন করিনি ততদিন মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে বেড়াতাম। আর এখন পায়ে বেড়ি।” কথাটা বলে নিয়ে নিজেও বাকিদের সঙ্গে হেসে ওঠে।

ট্রেন দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে পরের জংশনের দিকে। আসানসোলের পর, রাজধানী, বঙ্গকে বিদায় দিয়ে এগিয়ে যায় ভারতের অন্যতম রাজ্য ঝাড়খণ্ডের দিকে। ঝাড়খণ্ডের ধানবাদ জংশনই হল রাজধানীর পরবর্তী স্টপেজ। রাত্রি আটটা কুড়ি মিনিটে ধানবাদে পৌঁছে মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে রাজধানী এই রাজ্যকে বিদায় জানিয়ে এগিয়ে চলে বিহার রাজ্যের দিকে। রাত্রি দশটা আটান্নে রাজধানী থামে বিহারের গয়া জংশনে। কেবিনে ব্রীজের দৌড়ের সঙ্গে রাজধানী এসে থামল ধানবাদ জংশনে।

সিক্রেটরুমের টেবিলের উপর চায়ের কাপটা রেখে রূপম বলে, “বুঝলি যশ, মনীশ মেহেতা অনেক কষ্টে মনে করে নাফিসার ছবি আঁকাচ্ছে।” যশ টেবিলের সামনে নিজের পয়েন্ট থার্টি টু গানটা বের করে টেবিলের উপর ঘোরাতে ঘোরাতে বলে, “আদৌ ঠিকঠাক বলতে পারছে কিনা সন্দেহ।”

কয়েকদিনের পরিচয়ে “তুমি” থেকে বন্ধুত্বের “তুই” সম্পর্কে নামতে রূপম আর যশের সময় লাগল না। দিল্লির কোয়ার্টার ব্রাঞ্চ থেকে রূপমকে নিজের এই অপারেশনের জন্য যশ অ্যাপিল করে নিয়ে এসেছে। দিন যতই এগোচ্ছে এদের বন্ধুত্ব ততই সুদৃঢ় হচ্ছে।

দিল্লি ব্রাঞ্চের একজন অফিসার সিক্রেটরুমের দরজা খুলে ভিতরে এসে যশ আর রূপমকে জানায়, হোটেল গ্রীনভিউ থেকে নাফিসার যে ঠিকানা তারা পেয়েছিল সেটা ভুয়ো। ওইখানে গত পনেরো বছর ধরে জিতেন্দ্র রাও বলে একজন থাকে তার পরিবার নিয়ে। নাফিসাকে দেখা তো দূরের কথা নামও তারা শোনেনি। অফিসারের কাছ থেকে কথাটা শুনে রূপম আর যশ অবাক না হয়ে মুখের ভাঁজে বুঝিয়ে দেয় যে এটাই যে হবে সেটা তারা জানত। মিনিট দুয়েক পর আর-একজন অফিসার হাতে একটা ছবি নিয়ে রুমের দরজা খুলে ভিতরে এসে যশের হাতে ছবিটা দিয়ে বলে ওঠে, “নাফিসা কা ড্র।” হাতে ছবিটা নিয়ে অনেকক্ষণ দেখে নিয়ে যশ, রূপমের দিকে তাকিয়ে বলে, “মনীশের এই ছবি আদৌ ঠিক কিনা বোঝা মুশকিল। দেখে তো মনে হচ্ছে সাতাশ-আঠাশ বছরের মেয়ে।” বলে নিয়ে রূপমের হাতে ছবিটা এগিয়ে দিয়ে অফিসারদের প্রতি বলে ওঠে, “নাফিসা কা স্কেচ পাশওয়ালে জিতনে চক্কি হ্যায় য়োহাঁ সার্কুলেট কারো।”

— “ওকে স্যার।”

অফিসাররা রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই যশ, রূপমের দিকে তাকিয়ে দেখে রূপমের মুখে এক অদ্ভুত রকমের চিন্তার ছাপ। “তোর আবার কী হল?” রূপমকে জিজ্ঞাসা করতেই রূপম শান্ত গলায় বলে, “যশ, ছবির এই মেয়েটাকে আমার খুব চেনা চেনা লাগছে। একে আমি কোথাও দেখেছি।”

— “কোথায় দেখেছিস?” যশ বেশ কৌতূহলের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করে ওঠে। “দিল্লিতে?”

— “সেটাই মনে করতে পারছি না। তবে এই মেয়ের সাথে আমি কথা বলেছি।”

— “যেভাবে হোক মনে কর।”

— “সেটাই করছি।”

ইউনিফর্ম পরা সার্ভার বয় কেবিনে এসে রাতের খাবারের অর্ডার নিতে এলে ঋষিকেশ বাদে বাকি তিনজনই ননভেজ খাবার অর্ডার দেয়। দেহি এর কারণ জিজ্ঞাসা করায় ঋষিকেশ জানায় গয়াতে পিণ্ডদানের জন্য যাচ্ছে বলেই নিরামিষ খাওয়া। নটা নাগাদ ডিনার সার্ভ হলে চারজন নিজেদের মধ্যে গল্প করতে করতে খাওয়া-দাওয়া শুরু করে। এরই ফাঁকে শশাঙ্ক একবার দেহিকে জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “রাতে ট্রেনে ঘুম হয় যাজ্ঞসেনী ম্যাডাম?” প্রত্যুত্তরে দেহি জানায়, “তেমন একটা নয়।” ডিনার সার্ভের প্রায় আধাঘণ্টা পর সার্ভার বয় কেবিনে এসে ডিনারের প্লেট তুলে নিয়ে যায়। দশটা নাগাদ আর-একজন সার্ভার এসে চারজনকে বালিশ ও লাল রঙের চাদর দিয়ে যায়।

— “দেখুন তো, আর একঘণ্টা পরই তো নামব, বালিশে মাথা দিয়ে কোনো লাভ আছে?” ঋষিকেশ বালিশ হাতে নিয়ে ঝাড়তে ঝাড়তে কথাটা বলতেই দেহি সামান্য এসে উত্তরে বলে, “একটু শুয়েই নিন। কাল আপনার ধকল কম নয়।”

— “আপনি গয়া এসেছিলেন আগে?”

— “বহুবছর আগে। এসেছিলাম মেইনলি নালন্দা আর বুদ্ধগয়া নিয়ে স্টাডি করতে।”

— “একই জায়গায় দুটো?”

— “না। বুদ্ধগয়া থেকে যেতে হবে গাড়ি ভাড়া করে। তা আপনি কি ভারত সেবাশ্রমে উঠবেন?”

— “না। ওখানের হোটেল সত্যমে উঠব।”

ঘড়িতে সময় প্রায় সাড়ে দশটা। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজধানী ঢুকবে গয়া স্টেশনে। কেবিনের আলো নিভিয়ে সবাই নিজের নিজের বার্থে শুয়ে। দেহি বালিশে মাথা দিয়ে চোখ খুলে একদৃষ্টে তাকিয়ে উপরের দিকে। না জানি কেন দেহির শুভ্রার কথা ভীষণ মনে পড়ছে। সত্যিই এমন প্রথমবার হল যে, শুভ্রাকে সে সঙ্গে নিয়ে আসতে পারল না। অনেক জানা-অজানার সন্ধান করতেই দেহির দিল্লি গমন। বালিশের বাঁ পাশে রাখা সেলফোনটা হাতে তুলে স্ক্রিন অন করে সময়টা দেখে দশটা চল্লিশ। বার্থের থেকে উঠে বসে কেবিনের আলো জ্বালাতেই তিনজনের সবে মাত্র আসা তন্দ্রা মুহূর্তের মধ্যে ছুটে যায়। “কী হয়েছে ম্যাডাম?” নয়ন প্রশ্ন করতেই দেহি একটা মৃদুহাসি হেসে জবাব দেয়, “গয়া জংশন।” ঋষিকেশ, দেহির কথাটা শোনামাত্রই লাফিয়ে বার্থ থেকে উঠে বসে উত্তেজিত হয়ে বলতে থাকে, “হ্যাঁ? এসে গেছে? গাড়ি কতক্ষণ দাঁড়াবে? ছেড়ে দেবে না তো? কই নামি নামি।”

— “ঋষিকেশবাবু...” দেহি শান্তভাবে ডেকে নিয়ে বলে, “গয়া ঢুকবে। ট্রেন দাঁড়িয়ে নেই, চলছে। ধীরে সুস্থে নামুন।”

মিনিট পনেরো পর রাজধানী থামল গয়া জংশনে। এখানে ট্রেন দাঁড়াবে প্রায় দশমিনিটের মতো। ঋষিকেশ ট্রেন থেকে নামার সময় সবার সঙ্গে হাত মিলিয়ে হাসি মুখে বিদায় নেয়। গাড়িতে অনেকক্ষণ থাকাতে দেহিও হাতে কালো রঙের হ্যাঁন্ডপার্সটা সঙ্গে করে নিয়ে ঋষিকেশের সঙ্গে প্ল্যাটফর্মে নামে। ঋষিকেশকে বিদায় জানানোর আগে দেহি পার্স খুলে নিজের কার্ডটা ঋষিকেশের দিকে এগিয়ে দিতেই ঋষিকেশ সেটা একঝলক দেখে নিয়ে দেহির দিকে চোখ ফেলতেই “কোনোদিন কোনো সমস্যা হলে আমার সঙ্গে দেখা করে নেবেন” দেহি বলে।

— “আপনি অ্যাডভোকেট?” ঋষিকেশ প্রশ্নটা করতে দেহি মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ” করে।

প্ল্যাটফর্মে চা বিক্রেতারা “চায়ে চায়ে” বলে ডেকে চলেছে। ঋষিকেশ বিদায় নিতেই, দেহি একভাড় চা খেয়ে, দাম দিয়ে নিয়ে ট্রেনে ওঠে। ট্রেনে ওঠার মিনিট দুয়েকের মধ্যেই ট্রেন চলতে শুরু করে। কেবিনের মধ্যে এসে দেহি দেখে নয়ন ও শশাঙ্ক নিজের নিজের বার্থে শুয়ে। দেহি নিজের বার্থের থেকে বড় সাইড ব্যাগটা হাতে তুলে নিয়ে কেবিনের আলো নিভিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দরজার কাছে দাঁড়ায়। লাইটার জ্বালিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে সবেমাত্র সিগারেটে দুটো টান দিয়েছে এমন সময় দেহির বাঁ পাশে এসে দাঁড়ায় শশাঙ্ক।

— “ট্রেনে ঘুমানোর একদমই অভ্যাস নেই দেখছি।” শশাঙ্ক বলে।

— “না।” বলে নিয়ে দেহি ব্যাগের ভিতর থেকে সাদা রঙের গ্লাফস বের করে নিয়ে হাতে পড়তে থাকে।

— “আপনাকে হিস্ট্রি টিচার কম, ইনভেস্টিগেটর বেশি লাগে।” কথাটা শুনে দেহি একটা তীক্ষ্ণ হাসি ঠোঁটের কোণে এনে বলে, “ঘটে যাওয়া ঘটনাই তো ইতিহাস। আর তার পিছনে সন্ধান করা বা সূত্র খোঁজাই আমার কাজ।” কথাটা শুনে নিয়ে শশাঙ্ক বলে ওঠে, “এই রাজধানীর এক অশুভ ইতিহাসও আছে।”

— “জানি।” দেহি বলে। “আমি তখন ছোট। দুই হাজার দুই সালের ঘটনা। তখন রাজধানী চলত হাওড়া টু নিউ দিল্লি। এমনই এক রাতে, গয়া ক্রস করার পর রফিগঞ্জের ধাবা নদীর উপরের ব্রিজ ভেঙে রাজধানী দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটে বলাটা ভুল, ঘটানো হয়েছিল আর ঘটিয়েছিল নকশালরা। ঠিক যেমন আজকেও তাদের একটা প্ল্যান আছে, তাই না?”

— “মানে?” অবাক হয়ে শশাঙ্ক জিজ্ঞাসা করতেই দেহি মুহূর্তের মধ্যে কেবিনের সামনের কুপের দেওয়ালে শশাঙ্কর গলা বাঁ হাতে চিপে ধরে বলে, “জুতো খুলে আপারবার্থে ওঠার সময় তোর ডান পায়ের মোজা নেমে যায় আর তার ভিতরে থাকা ছোটো পাতলা ওয়াকি-টকিটার মাথার অংশটা আমি দেখতে পাই। ধানবাদ থেকে গাড়ি ছাড়ার পর তুই কুপে এসে কথা বলিস তোর দলের সঙ্গে আর এটাও বলিস, সররগঞ্জ ট্র্যাক থেকে রাজধানী পাস করলেই অ্যাটাক করতে। কারণ সিগন্যালটা ওয়াকি-টকি থেকে তুই দিবি।” কথাটা বলেই দেহি ব্যাগের ভিতর থেকে একটা বড় সাইজের মদের বোতল বের করে নিয়ে ছিপি খুলে, শশাঙ্কের মুখের ভিতর ঠেসে ধরে বলে ওঠে, “গিলতে শুরু কর।” শশাঙ্ক বহুকষ্ট করেও দেহির হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারছে না। অন্যদিকে দেহি শশাঙ্কের হাতের সাহায্যেই শশাঙ্ককে জোর করে মদ খাইয়ে চলেছে। মদের প্রভাবে শশাঙ্ক টলমল করতেই দেহি মদের বোতল কুপের ফ্লোরে রেখে শশাঙ্কের চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে যায় ট্রেনের দরজার দিকে। দরজা খুলে দেহি শশাঙ্ককে বলে ওঠে, “আমি যেমন সৎ মানুষের জন্য চোখে কালো পট্টি বেঁধে তাদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠি, তেমনই হাতের তরবারি দিয়ে জানোয়ারদের প্রাণ নিতেও আমি উৎকণ্ঠা হয়ে থাকি। টু বি থ্রো কিল ডেথ, গুড বাই!” কথাটা বলেই শশাঙ্ককে ধাক্কা মেরে চলন্ত রাজধানীর বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ট্রেনের দরজা বন্ধ করে দেয় দেহি।

কেবিনের কুপে পড়ে থাকা সিগারেটের ফিল্টারটা হাতে তুলে নিয়ে ব্যাগের ভিতরে ঢুকিয়ে কেবিনের দরজা খুলে ভিতরে এসে নিজের বার্থে বসে দেহি। ট্রেন ছুটে চলেছে আগামী রাজ্যের দিকে। বিহারের গয়ার পর রাজধানী, রাত্রি একটা পাঁচে থামে উত্তরপ্রদেশের বিনদয়াল উপাধ্যায় জংশনে।

হোটেলের রুমের টেবিলের উপর রাখা টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে সেলিম ওরফে রঘুবীরের ক্রিমিনাল ফাইলের যাবতীয় তথ্য আরও একবার পড়ে নিচ্ছে যশ। কোনো কিছু একটা বিষয় তার নজর বাঁচিয়ে লুকিয়ে আছে। ফাইলের পাশেই পেপারওয়েট দিয়ে চাপা দেওয়া নাফিসার স্কেচ আর তার পাশেই যশের সেলফোন। হঠাৎ যশের সেলফোনটা বেজে উঠতেই যশ হাতে সেলফোনটা তুলে নিয়ে দেখে রূপমের নম্বর। ফোন রিসিভ করে যশ “হ্যাঁলো” বলতেই বিপরীত দিক থেকে রূপম, “তাড়াতাড়ি ব্রাঞ্চে আয়, আর্জেন্ট “ বলে ফোন কেটে দেয়।

রূপমের কথা শুনে পরে থাকা লাল রিড দেওয়া কালো স্যান্ডোগেঞ্জির উপরে খুবই হালকা নস্যি রঙের ফুলহাতা শার্টটা পরে নিয়ে বাথরুমে ঢোকে যশ। মিনিট পাঁচেক পর ধূসর রঙের ট্রাকশ্যুট ছেড়ে বাদামি রঙের পুলিশ বেল্টের সঙ্গে নীল রঙের কটন জিন্স প্যান্টের ভিতর শার্ট ইন করে বাথরুম থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। দিল্লি ব্রাঞ্চ থেকে যশ আগে থেকেই একটা পুলিশ বাইক নিয়ে রেখেছিল। সেকেন্ড ফ্লোর থেকে লিফটে করে গ্রাউন্ড ফ্লোরে এসে পার্কিংলনের দিকে এগিয়ে যায় যশ। বাইকে উঠে চাবি দিয়ে বাইক স্টার্ট দিয়ে হাইস্পিডে তুলে ব্রাঞ্চে পৌঁছায় পনেরো মিনিটে। ঘড়িতে সময় বলছে রাত্রি একটা। ব্রাঞ্চের সিক্রেটরুমের দরজা খুলে যশ ঢুকেই রূপমকে বলে ওঠে, “কী ব্যাপার? অ্যানি লিড?” যশের প্রশ্ন শুনে রূপম সামান্য মাথা নাড়িয়ে বলে ওঠে, “ইয়েস, খবরি জানিয়েছে উজড়াগাঁওয়ের পশ্চিমদিকে একটা নির্জন এলাকা আছে, ওইখানে জনবসতি নেই, ভাগাড় জাতীয়। ওইখানে সেলিমকে দেখা গেছে।” রূপম কথাটা শেষ করতেই যশ মুহূর্তের মধ্যে বলে ওঠে, “টিম রেডি কর আর একমুহূর্ত সময় নষ্ট করা যাবে না, কারণ, এখান থেকে উজড়াগাঁও যেতে সময় লাগবে প্রায় দেড়ঘণ্টা।” যশের কথা শেষ হতেই রূপম, রুমে থাকা দুই অফিসারকে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। অন্যদিকে বিনদয়াল উপাধ্যায় জংশনে রাজধানী এসে থামে।

রাজধানী যাত্রায় সুবিধা থাকলেও সঙ্গে একটা অসুবিধাও থাকে, সেটা আর কিছুই না বারে বারে টিকিট চেকারের সময় অসময়ে টিকিট চেক করা। তেমনই ঘড়িতে যখন রাত্রি দেড়টা, ঠিক সেই সময় কেবিনের দরজায় চেকারের বারকয়েক টোকা পড়ে। কী বাড়ি, কী ট্রেন, দেহির ঘুম বরাবরই পাতলা। প্রথম টোকা শুনতেই চোখ খুলে কেবিনের নিজের দিকের বুকরিডিংয়ের ছোট ল্যাম্পটা জ্বালায়। একঝলকে বিপরীত দিকে তাকিয়ে নিয়ে দেখে নয়ন ঘুমে মগ্ন। চেকার আর-একটু জোরের সঙ্গে টোকা মারতেই দেহি কেবিনের ভিতর থেকে “কামিং” বলে ওঠে। চেকার দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে একটা ক্ষমা মেশানো ভাব এনে বলে, “সরি ম্যাডাম। ডিউটি।”

— “ইটস ওকে।” কথাটা বলে নিয়ে ব্যাগের ভিতর থেকে টিকিট বের করতে করতে নয়নকে বার দুয়েক ডাক দিতেই নয়নের ঘুম ভাঙে।

— “মাফ কিজিয়ে, টিকিট প্লিজ স্যার।” চেকারের কথা শুনে নয়নও টিকিট বের করে দেহির মতো টিকিট সাবমিট করিয়ে নেয়। চেকার কিছু একটা জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল কিন্তু সেই কথা চাপিয়ে দিয়ে দেহি বলে ওঠে, “হামারে সাথ এক প্যাসেঞ্জার থা, নাম শশাঙ্ক রায়। বহত সময় বিত গ্যায়া মাগাড় আভিতাক কুপ সে আয়া নেহি।”

— “ওকে ম্যাম, আভি দেখতা হু। আপলোগকি য়াত্রা শুভ হো।” কথাটা বলে চেকার বেরিয়ে যেতেই নয়ন বেশ অবাক দৃষ্টিতে দেহির দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, “তাই তো, শশাঙ্কবাবু কই?”

আধাঘণ্টার পথ কুড়ি মিনিটে অতিক্রম করে পুলিশ ভ্যান পৌঁছায় উজড়াগাঁও। কাঁচা সড়কের উপর দিয়ে ধুলো উড়িয়ে নিয়ে গাড়ি থামে পশ্চিমপ্রান্তে। পুলিশ অফিসার ও কয়েকজন কনস্টেবলদের সঙ্গে করে নিয়ে রূপম ও যশ ভ্যান থেকে নেমে হেটে চলে ডেরার দিকে। প্রায় মিনিট দশেক হেঁটে, থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে পুলিশমহল। তারা সবাই চাঁদের আলোয় দেখতে পেল, তাদের থেকে হাত বিশেক দূরে দুটো তাঁবু খাটানো ও তার ভিতরে জ্বলছে ক্ষীণ শিখায় হ্যাঁরিকেনের আলো। যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করে পুলিশসেনারা এগোতে থাকে তাঁবুর দিকে। অফিসার ও কনস্টেবলরা তাঁবুর কাছে এগিয়ে চারিপাশ থেকে তাঁবুকে ঘিরে ফেলে আর তাঁবুগুলোর মুখের সামনে একটিতে যশ ও অন্যটিতে রূপম হামলা করে বসে। মুহূর্তের মধ্যে শুরু হয় দুইপক্ষের গুলিবর্ষণ। তাঁবুতে থাকা ডাকাতদলের ছয়জনের মধ্যে দুইজন পুলিশের গুলিতে মারা যায় ও বাকিরা ধরা পড়ে। কিন্তু যে মুখপাত্রের জন্য যশের এখানে ছুটে আসা সেই সেলিমকে তারা পেল না। পুলিশ আসার মিনিট পনেরো আগেই সেলিম তার লোকেশন বদলে দেয়।

বিনদয়াল উপাধ্যায় জংশনের পর রাজধানীর স্টপেজ কানপুর সেন্ট্রাল জংশন। অন্ধকার কেবিনে দেহি নিজের বার্থে চোখ বুজে শুয়ে আছে। হঠাৎ কেবিনের দরজায় টোকা পড়তেই দেহি চোখ খুলে বার্থের থেকে উঠে বসে। আলো না জ্বালিয়েই কেবিনের দরজা খুলে দেখে রাতের টিকিট চেকার ও সঙ্গে কয়েকজন আর.পি.এফ।

— “আব ক্যায়া হুয়া, আপলোগ ক্যায়া রাত মে ভি শোনে নেহি দেঙ্গে?” কড়াভাবে দেহি বলে উঠতেই টিকিট চেকার ইতস্ততভাব এনে বলে, “মাফ কি জিয়ে ম্যাডাম। হামলোগ কো এক শারাব কা বটল মিলা হ্যায়। ক্যায়া আপ বাতা সাক্তে হ্যাঁ, কি আপকি কেবিন মে জো প্যাসেঞ্জার থা য়ো শারাব লেকার কুপ মে আয়া থা কি নেহি?”

— “ইয়ে মে ক্যাসে বাতা সাক্তি হু? হা কাগাজ ম্যা লিপটা হুয়া এক চিজ লেকার বাহার আয়া জারুর থা, লেকিন য়ো শারাব ইয়া কুছ অর, ইয়ে মে বাতা নেহি সাক্তি।”

— “ওকে, থ্যাঙ্কিউ অ্যান্ড সরি।” বলে চেকার ও আর.পি.এফরা চলে যেতেই দেহি কেবিনে ঢুকে দরজা বন্ধ করে।

নিজস্ব গতিতেই রাজধানী ছুটে চলেছে কানপুরের দিকে। নিজের বার্থের বুক রিডারের ল্যাম্পটা জ্বেলে নিয়ে বার্থে হেলান দিয়ে দেহি আবার বই পড়তে শুরু করে। বুঝলাম সামান্য তন্দ্রা দেহির চোখে ধরা দিতে না দিতেই চেকারের দরজা টোকায় সেটা ছুটে গেছে। উপাধ্যায় জংশন থেকে কানপুরের দূরত্ব অনেকটাই। কানপুরে রাজধানী পৌঁছাবে ভোর পাঁচটা সাতে। দেহির চোখে সামান্য ঘুমঘুম ভাবটা এলো রাত তিনটে নাগাদ। হাতের বইটার পাতাতে বুকমার্কটা রেখে বইটা বন্ধ করে, বুকল্যাম্পটা নিভিয়ে বার্থের বালিশে মাথা রাখে। চোখ বন্ধ করে এক গভীর চিন্তায় নিজেকে ডুবিয়ে দেয় নিজেকে। ঘুমটা আদৌ কখন এলো সেটা বলা মুশকিল। ভোর পাঁচটা সাতে কানপুর সেন্ট্রালে রাজধানী থামার পর থেকে শুরু হয়েছে বৃষ্টি। কানপুর সেন্ট্রালের পরই রাজধানীর লক্ষ্য রাজধানীর প্রতি, অর্থাৎ নিউ দিল্লি।

বৃষ্টি সহযোগে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের বুকে সূর্য উদয় হলেও তাকে মেঘমালা ভেদ করে দর্শন করা অসম্ভব। ভোর রাতের থেকে বৃষ্টি শুরু, থামবার লেশমাত্র নেই, উলটে বৃষ্টির জলধারা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। দেহি ধীরে ধীরে চোখ মেলে দেখে তার বিপরীত দিকের লোয়ার বার্থে, একটা ইংরাজি খবরের কাগজ হাতে নিয়ে ব্ল্যাঙ্কেটের ভিতরে পা ঢুকিয়ে নয়ন মন দিয়ে পড়ে চলেছে। বালিশের পাশে রাখা সেলফোনটা হাতে তুলে নিয়ে টাইমটা দেখে আটটা বাজতে দশ।

— “অনেকক্ষণ উঠেছেন?” নয়নকে দেহি প্রশ্ন করে। দেহির গলার স্বর শুনে নয়ন দেহির দিকে তাকিয়ে একটা ছোট্ট হাসি হেসে “গুড মর্নিং” বলে। “না, না। এই পনেরো মিনিটের মতো হল।”

দেহি নিজের বার্থের থেকে উঠে জানালার পর্দা সরাতেই বলে ওঠে, “আর সময় পেল না বর্ষা দেবী আবির্ভূতা হবার?” কথাটা বলে নিয়ে বার্থের তলা থেকে লাগেজ ট্রলিটা বের করে সেটাকে খুলে তার ভিতর থেকে একটা চিতা বাঘের চামড়া প্রিন্টের তোয়ালে এবং টুথপেস্ট ও ব্রাশ হাতে করে নিয়ে বাথরুমের দিকে চলে যায়। মিনিট পনেরো পর তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বাথরুমের বাইরে বেরিয়ে এসে নয়নের দিকে তাকিয়ে দেহি বলে, “যদি কিছু মনে না করেন একটা কথা বলি নয়নবাবু?”

— “না, না মনে করব কেন, বলুন না।” নয়ন আশ্বাস দিতেই দেহি সামান্য হেসে নিয়ে বলে “কালকের থেকে আমি একটাই পোশাকে। কাইন্ডলি আপনি যদি কিছুক্ষণের জন্য কুপের দিকে যান, তাহলে আমি ড্রেসটা চেঞ্জ করতে পারি। বাথরুমে ওর মধ্যে...” দেহি কথাটা শেষ না করতেই নয়ন নিজের বার্থ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে ওঠে, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। আমি কুপে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি, আপনার হয়ে গেলে ডাকবেন।”

— “সো কাইন্ড অফ ইউ।”

নয়ন কেবিনের বাইরে বেরিয়ে এসে কুপের জানালা দিয়ে বাইরের বৃষ্টি ভেজা দুরন্ত প্রকৃতি দেখে চলেছে। নিউ দিল্লিতে রাজধানী পৌঁছাবে সকাল দশটা পাঁচে। এখনও প্রায় দেড় ঘণ্টার রাস্তা। পনেরো মিনিট পর দেহি কেবিনের দরজার লক খুলে “নয়নবাবু” বলে ডাক দিতেই, নয়ন পিছন ফিরে ঘুরে কেবিনের দরজা খুলে ভিতরে আসে। দেহির দিকে তাকাতেই নয়ন বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। নীল, সবুজ, বেগুনী ছোটচেকের ফুলহাতা শার্ট কালো টাইট ফিটিং জিন্সের ভিতর ইন করে পরা। কোমরে সাদা রঙের সরু বেল্ট ও হাতের কাছে শার্টের ফুলহাতা দুটো ভাঁজ করে গোটানো। দেহি মোটা দাঁতের চিরুনি দিয়ে লম্বা চুল আঁচড়ে নিয়ে একটা সাদা গার্ডার দিয়ে চুলটাকে মাথার মাঝখানে নিয়ে গিয়ে বেঁধে চুল পিঠের উপর ফেলে দেয়। নয়ন নিজের বার্থের কাছে গিয়ে বসতেই সার্ভার বয় দরজায় টোকা মেরে অনুমতি নিয়ে ভিতরে ঢুকে সকালের ব্রেকফাস্টের অর্ডার নিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়। ততক্ষণে কাজল পেন্সিল দিয়ে দেহির চোখ আঁকা কমপ্লিট। হালকা কমলা রঙের ম্যাট লিপস্টিক ঠোঁটে লাগাতে লাগাতে দেহি, “দিল্লিতে কোথায় ওঠেন নয়নবাবু?” জিজ্ঞাসা করে। নয়ন খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে দেহির দিকে তাকিয়ে উত্তরে বলে, “আমি উঠব হোটেল ইউরোস্টারে। আর আপনি?”

— “হোটেল বিভা প্যালেস।” দেহির কথাটা বলতেই সার্ভার কফি, ব্রেড অমলেট ও পাস্তা ট্রেতে করে নিয়ে কেবিনে ঢুকে সার্ভ করে চলে যায়।

— “ম্যা কুছ নেহি জান্তা।” ব্রাঞ্চের সেলে অফিসারদের হাতে বারকয়েক রুলের ঘা খাওয়ার পরও সেলিমের সাথীরা মুখ খুলতে চাইছে না। সেলের বাইরে রূপম দাঁড়িয়ে থেকে এই দৃশ্য দেখে চলেছে। মুহূর্তের মধ্যে সেলের ভিতরে ঢুকে একজনের চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে ভীষণ গম্ভীর অথচ শান্তভাবে বলে ওঠে, “দেখ, মেরা সবর কা ইমতেহান মাত লে। সেলিম কাঁহা ছুপা হুয়া হ্যায় বাতা দে, তো তুঁ সায়েদ বাঁচ সাক্তা হ্যায়। ঠান্ডে দিমাগ সে সামাঝ লে, তুঁ আগার নেহি ভি বাতায়া তো ভি সেলিম হামারে হাত মে পাকড়া জায়েগা। একদিন লেট হোগা, দো দিন লেট হোগা লেকিন পাকড়া জারুর জায়েগা। উসকে বাদ তেরা কেয়া হোগা? ব্যাঙ্ককা পুরা প্যায়সা তো সেলিমকে পাস। য়ো তো ওয়াকিল কো প্যায়সা খিলায়গা ওর নিকাল ভি যায়েগা। ইসলিয়ে বোল রাহা হু, সেলিম কাঁহা পার হ্যায় বাতা দে তুজে বাঁচানা মেরি জিমেদারি। শুরু কর।” রূপমের কথাগুলো ভালোরকমভাবে শুনে নিয়ে সেলিমের দলের লোকটি বলে, “স্যার, সেলিম কাঁহা পার হ্যায় ইয়ে হামলোগ কো নেহি মালুম। দো ম্যাহেনে প্যাহেলে যাব সেলিম ইয়াপার আয়া থা তব উসনে প্ল্যান কিয়া থা কি কলকাত্তে মে ব্যাঙ্ক লুটনা পড়েগা। সেলিম কা বহত জাগে পে সেন্টার হ্যায়।”

— “সেলিমকে সাথ এক লড়কী ভি হ্যায়, নাম নাফিসা। উসকে বারে মে ক্যায়া জান্তা হ্যায়?”

— “নেহি সাব, হাম ইয়ে নাম প্যাহেলিবার শুনা।” পাশ থেকে সেলিমের দলের আর-একজন কথাটা বলে ওঠে। ইতিমধ্যে এই কথা চলাকালীন যশ সেলের বাইরে এসে সম্পূর্ণ কথাগুলো শুনে চলেছে। দ্বিতীয়জনের কথা শেষ হতেই যশ হাতে একটা কাগজ নিয়ে ধীর কদমে সেলের ভিতরে ঢুকে কাগজটা মুখের সামনে ধরে শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করে, “ইয়ে হ্যায় নাফিসা। নাম নেহি মালুম চল মান লিয়া, লেকিন ইসকো কাভি সেলিমকে সাথ দেখা হ্যায়?”

নাফিসার ছবিটা ভালোরকমভাবে দেখে নিয়ে চারজনের মধ্যে একজন হঠাৎ বলে ওঠে, “পিছলে ম্যাহেনে সেলিমকে সাথ যাব কলকাত্তা গ্যায়া থা তব ওহাপার সেলিম ইস লড়কীকে সাথ মিলা থা।”

— “কলকাত্তা মে কাঁহা?” রূপম জিজ্ঞাসা করতেই লোকটি বলে, “নাম নেহি মালুম সাব। প্যাহেলিবার কলকাত্তা গ্যায়া থা। লেকিন—”

— “লেকিন?”

— “সেলিমকো ক্লাব-পার্টিকা বহত নশা হ্যায়, ওর লড়কীয়োকা ভি লত লাগ চুকা হ্যায়।”

কথাটা শুনে যশ কপালে ভাঁজ কেটে চোখের পলক না ফেলে জিজ্ঞাসা করে, “কন সা নাইট হোটেল।”

— “য়ো পাতা নেহি। লেকিন যাবভি সেলিম শারাব পীতা থা নাইট ক্লাব সেহি পী কার আতা থা।”

যশের ডান পাশে দাঁড়িয়ে রূপম কথাগুলো ভালোমতো শুনে নিয়ে বেশ ধমকের সুরে বলে, “হার ক্লাবকা এক রিসিভ ইয়ানি কে রসিদ হোতা হ্যায়। সেলিমকে পাশ অ্যায়সা কুছ দেখা থা তুনে?” রূপমের প্রশ্নটা শুনে নিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করে নিয়ে প্রথম লোকটি বলে ওঠে, “হা স্যার। একবার নশা করকে হামসে সেলিম মিলা থা ওর আপনি জেপ সে এক কাগাজ নিকালকে বোলা থা ইয়ে দেখ, সেলিম ইহা যাকে পীতা হ্যায়।”

— “রসিদকা রঙ্গ ক্যায়া থা?”

— “গুলাবী।”

বৃষ্টিটা কমে গেলেও আকাশ থেকে মেঘ সরে যাইনি। দেহি বার্থে বসে ডান হাতের আঙুলের বড় বড় নখে সুন্দর করে সাদা রঙের নেইলপলিশ পরছিল। নয়ন খবরের কাগজটা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে বেশ কৌতূহলের সঙ্গে বলে ওঠে, “সত্যি, শশাঙ্কবাবুর কোনো পাত্তাই নেই। উনি কি কানপুরে নামলেন? কখন নামলেন, যাওয়ার সময় বলেও গেলেন না।”

— “সেটাই ভাবছি।” নখের থেকে চোখ না তুলেই দেহি উত্তরে বলে।

— “তবে আপনাদের সকলের সাথে পরিচয় হয়ে আমার খুব ভালো লেগেছে। এর আগেও বহুবার, বহু প্যাসেঞ্জারদের সাথে দিল্লি এসেছি, কিন্তু এত ঘনিষ্টভাবে যাত্রা প্রথমবার।”

— “আমারও।”

ঘড়িতে বলছে সময়টা সকাল নটা পঞ্চাশ। অর্থাৎ মাত্র দশমিনিটের মধ্যে রাজধানী এক্সপ্রেস ঢুকবে নিউ দিল্লিতে। নেইলপলিশ পরা শেষ করে নেইলপলিশটা ব্যাগের ভিতরে ঢুকিয়ে নয়নের দিকে তাকাতেই দেহি দেখে নয়ন হাসিমুখ করে দেহির দিকে তাকিয়ে। দেহি একটা ছোট্ট হাসি হেসে সেলফোনটা হাতে তুলতেই সেটা রিংটোনের সঙ্গে বেজে ওঠে। স্ক্রিনে নাম ওঠে, শুভ্রা। সঙ্গে সঙ্গে দেহি কেবিনের বাইরে বেরিয়ে এসে ফোন রিসিভ করে “হ্যাঁ বল” বলে ওঠে।

— “না না, এখনও ট্রেনে। নামার সময় হয়ে এসেছে।”

— “আমি যেখানে, সেখানে কিছু না হয়ে পারে?”

— “পরে বলব, আগে ট্রেন থেকে নামি। ও হ্যাঁ আজ কোর্টে ললিতবাবুর হেয়ারিং না?”

— “যেভাবে হোক, বেল যেন না পায়।”

— “বাল। এতদিন ধরে আমার সাথে থেকে সেটাও বলে দিতে হবে? কাউন্টার ফাইট করবি আর ললিতবাবুকে বলে দিবি অপজিট সাইডের লয়ার যেটাই প্রশ্ন করুক উত্তরে যেন বলে, মাথায় আঘাত লাগার পর অজ্ঞান ছিলাম, জ্ঞান ফেরে হসপিটালে। নেক্সট হেয়ারিং ডেট নে, তারপর আমি ফিরে দেখে নিচ্ছি। রাখছি।” কথাগুলো একাধারে বলে নিয়ে দেহি ফোন কেটে কেবিনে ঢুকে বসতেই কাচের জানালা দিয়ে দেখতে পায়, রাজধানী নিউ দিল্লি স্টেশনে ঢুকতে শুরু করেছে।

ব্রাঞ্চের বাইরে চায়ের দোকানের চেয়ারে বসে চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে টেবিলের বিপরীতে বসে থাকা রূপমকে যশ জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “এখানে নাইট ক্লাব কটা?” যশের প্রশ্নটা শুনে রূপমও হাতের ধরে রাখা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে, “চারটে। ব্লুয়েড, নাইট লাইফ, বুলারুশ অ্যান্ড শ্যাম্পেন হাউজ। মুশকিল হল এই চারটে ক্লাবের মধ্যে শ্যাম্পেন হাউজ বাদে বাকি তিনটে নাইট ক্লাবেরই রিসিভ পিঙ্ক কালারের। যদিও আমি অফিসারদের পাঠিয়ে দিয়েছি খোঁজ করতে। তারা সেলিমের ছবি দেখিয়ে ঠিক বের করে আনতে পারবে কোন্‌ ক্লাবে সেলিম বেশি যাতায়াত করত।” রূপমের কথাগুলো শুনতে শুনতে যশ চা খাওয়া শেষ করে বলে, “এই তিনটে বারের মধ্যে সবথেকে হাইকোয়ালিটির বার কোনটা?”

— “ব্লুয়েড।”

— “আর এখানের সিংগারদের কি কাস্টমারদের সাথে পাঠানো হয়?”

— “বোধহয়।” রূপম বলতেই যশ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে ওঠে, “তাহলে ব্লুয়েডেই খোঁজ কর। সেলিম ওখানেই যাতায়াত করে। কারণ ওর দলের কাছ থেকে শুনে যা বুঝলাম, সেটা হল, সেলিম খুবই হাইপ্রোফাইল লাইফ ডিজার্ভ করে।”

— “ঠিক আছে।”

— “আর ওই নাফিসার স্কেচটাও দেখা ওদের। জিজ্ঞাসা কর, সেলিমের সাথে নাফিসা যাতায়াত করত কিনা।”

নিউ দিল্লি স্টেশন থেকে নয়ন আর দেহি বাইরে বেরিয়ে এসে একে অপরের সঙ্গে হাত মেলায়। নয়ন খুব মৃদুস্বরে বলে, “আশা রাখছি আপনার সাথে আবার দেখা হবে।” কথাটা শুনে দেহি সামান্য হেসে নিয়ে বলে, “নিশ্চয়ই হবে।”

দুইজন দুদিকে ভাগ হয়ে স্টেশন রুটের দিকে এগিয়ে যায় ট্যাক্সি ধরার জন্য। ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে কালো হলুদ ছাপা ট্যাক্সি। ট্রলি হাতে টেনে নিয়ে একটি ট্যাক্সির সামনে গিয়ে চালককে “বিভা প্যালেস?” দেহি জিজ্ঞাসা করতেই চালকটি হাসি মুখে উত্তরে বলে, “জী ম্যাডাম”। ট্যাক্সির পিছন সীটের দরজা খুলে, ট্রলিটাকে আগে ঢুকিয়ে তারপর দেহি ভিতরে ঢুকে সীটে বসে। দেহি ট্যাক্সির ভিতরে ঢুকে বসতেই ট্যাক্সি চালক বাঁদিকের জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে মিটার উপরে করে দিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয়।

বিভা প্যালেস পৌঁছাতে সময় নিল মিনিট কুড়ির মতো। হোটেলের সামনে ট্যাক্সি থেকে ট্রলি নিয়ে দেহি নামতেই হোটেলের একজন হোটেল বয় এগিয়ে এসে ট্রলিটার হ্যাঁন্ডেলটা ধরে। দেহি পার্স থেকে টাকা বের করে, ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে হোটেল বয়টির সঙ্গে এগিয়ে যায় রিসেপশনের দিকে।

রিসেপশনের কাছে যেতেই দেহি দেখে একজন বাইশ তেইশ বছরের মেয়ে রিসেপশনে বসা। পাতলা চেহারা, ফর্সা, মাথার চুল খোঁপা করা, পরনে নীল রঙের কোয়াটারহাতা ব্লাউজ আর প্যারোট গ্রীন রঙের শাড়ি। বুকের ডান দিকে শাড়ির উপরে নেমপ্লেটে নাম লেখা “সঞ্জনা দুবে”। মেয়েটি দেহিকে দেখা মাত্রই একটা হাসি দিয়ে “ওয়েলকাম ম্যাডাম” বলে ওঠে।

— “মেরি বুকিং হ্যায়। অনলাইন পে।” দেহি কথাটা বলতেই মেয়েটি, সামনে রাখা কম্পিউটারে একটা কিছু দেখে নিয়ে জিজ্ঞাসা করে, “দেহি সেন সরকার?”

— “ইয়েস।”

— “জী ম্যাম। ইস ফর্মকো আপ ফিলাপ কর দিজিয়ে।” বলে একটা ফর্ম ও কলম দেহির সামনে রাখে। বাঁহাতে কলম তুলে নিয়ে ফর্ম ফিলাপ করে মেয়েটির হাতে দিতেই মেয়েটি একটা হোটেলের নেমপ্লেট রিং লাগানো চাবি হোটেল বয়টির হাতে দিয়ে বলে, “ফার্স্ট ফ্লোর, রুম নম্বর একশো গ্যায়ারা।” কথাটা শুনে ছেলেটি রিসেপশন থেকে এগিয়ে যেতেই দেহি মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করে, “আচ্ছা ইহাপার ব্লুয়েড হোটেল কিস তারাফ হ্যায়?”

— “ম্যাম, ব্লুয়েড কোয়ি র‍্যাহেনে কা হোটেল নেহি হ্যায়। য়ো নাইটক্লাব হ্যায়। দিল্লি বাজার কি তারাফ।”

— “ওকে। মুঝে এক দিন রাতকা প্রাইভেট ট্যাক্সি চাহিয়ে।”

— “হা হা কিউ নেহি ম্যাম। আপ রুম মে যাকে থোড়া রেস্ট কিজিয়ে, ড্রাইভারকো বুলাকে মে আপকো রিসেপশন সে কল করতি হু। হ্যাঁভ এ নাইস ডে ম্যাম।” কথাটা শুনে দেহি ছোট্ট করে একটা “থ্যাঙ্কস” জানিয়ে হোটেলের রুমের দিকে এগিয়ে যায়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%