শান্তনু দাশ
সিক্রেটরুমের টেবিলের সামনে চেয়ারের উপর বসে, হাতদুটো টেবিলে রেখে মেঝের দিকে তাকিয়ে। রুমে দ্যুতি বাদেও আরও দুইজন মেল অফিসার ও একজন লেডি অফিসার একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে। অনেকক্ষণ ধরে তারা প্রশ্ন করে চলেছে কিন্তু দ্যুতি সম্পূর্ণ মৌনব্রতী। ব্রাঞ্চে বাইক নিয়ে যশ ঢুকল, প্রায় বারোটা নাগাদ। সিক্রেটরুমের দরজা খুলে দ্যুতির সামনে একটা চেয়ার টেনে এনে, সেটাতে বসে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, “সেলিম ওরফে রঘুবীরের সাথে সম্পর্ক কী?” যশের প্রশ্নে দ্যুতি নির্বাক। “কিছু জিজ্ঞাসা করছি।” যশের দিকে না তাকিয়ে দ্যুতি একইরকমভাবে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকতেই, যশ নিজের মুখটা দ্যুতির সামনে এনে বলে, “আর আধাঘণ্টার মধ্যে সেলিম সেলে ঢুকছে। তার পর সত্যি এমনিই বেরিয়ে আসবে।” কথাটা শেষ করে যশ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।
গোল্ডেন হোটেলের রুম নম্বর দুশো ছয়ের দরজায় হোটেল বয় দুটো টোকা মেরে “ওয়াটার ম্যাম” বলতেই দেহি দরজা খুলে জল ভরতি কাচের জগটা নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। ডেক্সের উপর জগ রেখে, বেডের উপর রাখা নিজের সেলফোনটা হাতে তুলে নিয়ে, একটা নম্বরে ফোন লাগায় দেহি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিপরীত দিক থেকে “হ্যালো” বলতেই দেহি বলে, “কী রে ফাঁদে পড়েছে?” বোঝা গেল দেহি ফোনটা করেছে শুভ্রাকে। মিনিটদশেক কথা চলার পর দেহি ফোন কেটে বেডে সেলফোনটা রেখে তোয়ালে কাঁধের উপর নিয়ে বাথরুমে ঢোকে।
সন্তোষপুরের বসুপার্ক সরণির রাস্তার মোড়ের ধারে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। পরনে মেরুন রঙের লং স্কার্ট, মাথার চুল হোস্টেল করে বড় খোঁপা করা, চোখে কাজল, ঠোঁটে মেরুন লিপস্টিক আর কানে সোনালি রঙের বড় দুল, হাতে কালো রঙের হ্যান্ড পার্স, পায়ের কালো হিল জুতো। মেয়েটি বারবার তার ডানদিকে বেঁকে যাওয়া রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই একটা সাদা গাড়ি ডানদিকের রাস্তা থেকে বেরিয়ে এসে মেয়েটির সামনে দাঁড়ায়। গাড়ি থামতেই মেয়েটি গাড়ির জানলার দিকে ঝুঁকে শান্ত গলায় বলে ওঠে, “আমি তো ভাবলাম তুমি আসবেই না।” কথাটা শুনে গাড়ি চালক বলে ওঠে, “দেরি হয়েছে বলে? ভিতরে এসো।” চালকের কথামতো মেয়েটি দরজা খুলে গাড়ির ভিতরে এসে বসতেই, গাড়ি চালক মেয়েটির কাঁধে হাত দিয়ে নিজের দিকে টেনে ডান ঘাড়ে নিজের ঠোঁট ঠেকাতেই মেয়েটি এক অভূতপূর্ব হাসি হেসে বলে ওঠে, “এখনই? এত তারা কীসের? সারা রাত তো পড়ে রয়েছে।” চালক একটা হাসি হেসে গাড়ি স্টার্ট দেয়।
কথায় বলে রাত যত গভীরতর হয়, পাপ ততই তার আবরণ ভেদ খুলে বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়। গাড়ি ছুটে চলেছে কলকাতার সড়কে। গাড়ির চারিদিকের জানলার কাচ ওঠানো। মেয়েটি উন্মাদিনীর ন্যায় চালকের কানে ও গলায় নিজের উষ্ম ঠোঁটের ছোঁয়া ক্রমাগত দিয়ে চলেছে। এসি গাড়িতেও চালকের কপালে ঘামের একটা প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে বড় সড়কের থেকে গাড়ি বাঁয়ে বাঁক নিয়ে একটি নির্জন গলিতে ঢোকে। গাড়ি থামিয়ে চালক নিজের পরে থাকা টি-শার্টটা খুলে ফেলে নিজের বুকের কাছে টেনে ধরে মেয়েটিকে। কাঁধের কাছ থেকে গলা, গলার কাছ থেকে বুক পর্যন্ত চালক মেয়েটিকে নিজের ছোঁয়া ছুঁইয়ে চলেছে। কামদেব ও রতি যেন দুজনের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে সমায়িত হয়ে তাদের বাধ্য করছে একে অপরের সঙ্গে কামক্রীড়া করতে।
চুলের মুঠি ধরে ব্রাঞ্চের সেলের মেঝেতে সেলিমকে ছিটকে ফেলে রূপম। পাশেই দাঁড়িয়েছিল একজন অফিসার হাতে মোটা রুল নিয়ে। রূপমের ইশারা পাওয়া মাত্রই অফিসার সেলিমের পায়ের উপর রুলের দাপট দেখাতে আরম্ভ করে। সেলিমের চিৎকারে সেলের দেওয়ালও যেন ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে। মিনিট সাতেক এই দৃশ্য চলার পর অফিসারকে থামিয়ে রূপম জেরা করতে যাবে এমন সময় যশ সেলের ভিতরে এসে রূপমের কাঁধে হাত রেখে বলে, “সময় আছে। আজকের রাতের জন্য যথেষ্ট। সকাল থেকে দৌড়াদৌড়ি করছিস, বাড়ি যা। থাকুক একরাত সেলে। কাল সকালে হিসাব নেব, দুজন একসাথে।” যশের কথাটা শুনে রূপম মাথা নাড়িয়ে সেল থেকে বেরিয়ে সিক্রেটরুমে গিয়ে বসে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যশও সিক্রেটরুমে আসতেই রূপম জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “তুই ফিরবি কখন?”
— “আর দশ-পনেরো মিনিট পর।”
— “তাহলে একসাথেই যাব।”
— “না। অনেকটা জার্নি করেছিস। আমার দেরি হবে। যা।”
— “ওকে স্যার।” মজা করে মাথায় স্যালুট ঠুকে রূপম কথাটা বলতেই যশ হেসে রূপমের মাথার চুলগুলো ধরে নাড়িয়ে দেয়।
রূপম ব্রাঞ্চ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আধাঘণ্টা পর যশ রিপোর্টিং ফাইল রেডি করে টেবিলের দেরাজে ঢুকিয়ে দেরাজ লক করে বেরোতে যাবে এমন সময় কয়েকজন কলিগ সিক্রেটরুমে এসে ঢোকে।
ডায়মন্ড রেস্টুরেন্টের টু-সীটের একটি চারকোণা টেবিলে বসে কাঁটা চামচ দিয়ে ফিস কাটলেটের টুকরো মুখে পুরে নিয়ে দেবাশীষ বলে ওঠে, “রাত হয়ে যাচ্ছে না তো তোমার?” কথাটা শুনে শুভ্রা আড়চোখে দেবাশীষের পরে থাকা সাদা কটন জিন্সের প্যান্টের সঙ্গে সাদা টি-শার্টটার দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে উত্তরে বলে, “রাত যত হবে ততই তোমাকে চিনতে সুবিধা। রাতটা তো উপলক্ষ্য মাত্র, কাজটাই তো আসল নয় কি?” শুভ্রার চুল পিঠ পর্যন্ত ছাড়া, পরনে ব্রোকেটের কালো ব্লাউজের সঙ্গে, লাল চওড়া পাড়ের কালো রঙের ইক্কত শাড়ি। গলা থেকে বুকের নীচ পর্যন্ত বড় লকেট নিয়ে গজমতি সাইজের অক্সিডাইজের হার, কানে তরবারির মতো একইরকমের দুল, হাতে অক্সিডাইজের বাউটি। চোখে টানা কাজল, কপালে কালো সরু লম্বা টিপ, ঠোঁটে মেরুন লিপস্টিক।
শুভ্রার কথাটা শুনে দেবাশীষ শুভ্রার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতেই শুভ্রা আবার সেই আগের সুরে বলে ওঠে, “অত তাকিয়ে থেকো না, প্রেমে পড়ে যাবে।” দেবাশীষ ঠোঁট চিপে হেসে নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে টেবিলের উপর রাখা শুভ্রার হাত চিপে ধরে নিজের ঠোঁটের কাছে এনে চুমু দিতে গেলে শুভ্রা মুহূর্তের মধ্যে হাত সরিয়ে নিয়ে বলে ওঠে, “এখনই? তার আগে মেয়ের সঙ্গে আমাকে দেখা করাও।”
— “মেয়ে?” দেবাশীষ অবাকভাবে শুভ্রাকে প্রশ্ন করতেই শুভ্রা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ করে বলে, “হুম। তোমার মেয়ে, দীপশিখা।”
— “ও তো অনেক ছোট। তিন বছর বয়স। এমনিতেই এখন ওর মা নেই। কোনোরকমে সামলে রেখেছি।”
— “ওই জন্যই তো বলছি, আমার কাছে নিয়ে এসো। কাল সকালে গোডাউনে যাওয়ার সময় দিয়ে গেলে আর দুপুরে যখন বাড়িতে খেতে যাবে তখন নিয়ে যাবে।”
— “কান্নাকাটি করবে।”
— “করবে না। আমি আছি তো, সামলে নেব।” কথাটা বলেই শুভ্রা নিজের বাঁহাতের তর্জনীটা দেবাশীষের গালের উপর ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে বলে, “বাবাকেই যেখানে সামলে নিয়েছি, মেয়ে তো সেই জায়গায় ছোট।”
দেবাশীষ হেসে নিয়ে সোহাগের ভঙ্গিতে শুভ্রার কাঁধের উপর মাথা রাখে আর অন্যদিকে শুভ্রার মুখের মায়াময় হাসি মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গিয়ে তির্যকসূচক হাসি ধরা দেয় তার ঠোঁটের অগ্রভাগে। ইতিমধ্যে পার্সের ভিতরে থাকা শুভ্রার সেলফোনটা বেজে উঠতেই শুভ্রা পার্স খুলে সেলফোনটা হাতে নিয়ে, একঝলকে ফোনে ওঠা নামটা দেখে ফোনটা রিসিভ করে “হ্যালো” বলে। বিপরীত দিকের কথাগুলো শুনে নিয়ে শুভ্রা, “খুব বেশি হলে, একঘণ্টা” বলে ফোনটা কেটে দেয়।
— “কে?” দেবাশীষ জিজাসা করে।
— “বাবা।” নেশা ভরা আদলে উত্তর দেয় শুভ্রা। “বাড়িতে কখন পৌঁছাব সেটাই জিজ্ঞাসা করল। ওঠা যাক?”
— “তোমাকে বাড়ি ছেড়ে দিই?” দেবাশীষের প্রশ্নে শুভ্রা জায়গা ছেড়ে উঠে বলে ওঠে, “তুমি ছেড়ে দিলে, আমি যে গাড়িটা নিয়ে এসেছি সেটার কী হবে? যাও বাড়ি যাও।”
— “বাড়ি ফিরে ফোন করবে তো?”
— “আগে পৌঁছাই। কাল কিন্তু মেয়েকে অবশ্যই আনবে। কয়েকটা জামা কিনে রেখেছি।” বলে নিয়ে শুভ্রা রেস্টুরেন্টের থেকে বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠে, গাড়ি স্টার্ট দেয়।
বাথরুম থেকে একটা গাঢ় হলুদ রঙের নাইটগাউন পরে বেরিয়ে এসে দেহি ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখে নেয়, সময় সাড়ে বারোটা। হাতে কালো রঙের বারে পরা গাউনটা। সেটা কাবার্ডের হ্যাঙারে ভাঁজ করে রেখে কাবার্ডের ভিতরে ঢুকিয়ে কাবার্ডটা বন্ধ করে। বেডের ডেক্সের উপর রাখা নিজের পার্সটা হাতে নিয়ে সিগারেটের বাক্সটা বের করে তার থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে দেয়। গোল্ডেন হোটেলের থার্ড ফ্লোরে রুম নম্বর দুশো ছয়। হোটেলের কাচের জানলার ধারে এগিয়ে একদৃষ্টে দেহি তাকিয়ে গ্রাউন্ডের দিকে। চোখে এক বিষাদ ভরা চিন্তা। চোখের পলক না ফেলেই একইভাবে নিজের দিকে তাকিয়ে সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে চলেছে দেহি।
____________________________________________________
বেশ জোর কদমে নৈহাটি ব্রাঞ্চের ইনচার্জ রুমের সামনে এসে দরজার বাইরে থেকে, “মে আই কামিং?” দেহি জিজ্ঞাসা করে ওঠে। ব্রাঞ্চের ইনচার্জ মিস্টার ঘটক মুখ তুলে দেহিকে দেখামাত্রই একগাল হেসে বলে ওঠে, “আরে, দেহি দেবী আসুন আসুন।” কথামতো দেহি ভিতরে আসতেই মিস্টার ঘটক দেহিকে বসতে বলে। টেবিলের সামনে থাকা চেয়ারটা টেনে নিয়ে তাতে বসে, উৎকণ্ঠার সঙ্গে দেহি জিজ্ঞাসা করে, “ঘটকবাবু, আমি সাব ইন্সপেক্টর রূপম সেনের সাথে দেখা করতে চাই। তিনি কোথায়?”
— “রূপম? ও তো রাউন্ডে বেরিয়েছে। এখনই চলে আসবে। কিছু সমস্যা হয়েছে, আমাকে বলুন।”
— “না, তেমন কিছু নয়, একটু বিশেষ দরকার।”
— “ও। ম্যাডাম কেমন আছেন?”
— “হ্যাঁ, মা ভালো আছে।” দেহির কথাটা বলতেই রূপম ইনচার্জ রুমের দরজা খুলে “স্যার” বলে ডাকতেই, দেহি পিছন ফিরে তাকায়। ভিতরে এসে টেবিলের উপর রাউন্ড রিপোর্টের ফাইলটা রাখতেই, মিস্টার ঘটক, রূপমকে বলে ওঠে, “রূপম ইনি হলেন দেহি সেন সরকার। ডি আই জি দামিনী সেন সরকার ম্যাডামের বড় মেয়ে। উনি তোমার সাথে কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলতে এসেছেন।”
দেহি মুখ গম্ভীর করে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে রূপমের উপর। রূপম যেন দেহির মুখের দিকে তাকাতে পারছে না। এক অদ্ভুত ভয়ের ছাপ রূপমের মুখে। দেহি নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে মিস্টার ঘটককে “আমি বাইরে যাই?” জিজ্ঞাসা করতেই মিস্টার ঘটক মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। ব্রাঞ্চের গ্রাউন্ডে দেহি দাঁড়াতেই তার পিছন পিছন রূপম এসে দাঁড়ায়।
— “গাড়িতে ওঠো।” রেগে কথাটা বলে দেহি নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। রূপম বেশ ধীর কদমে গাড়িতে উঠে বসতেই দেহি গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ব্রাঞ্চের থেকে বেরিয়ে গঙ্গার ঘাটের রাস্তার দিকে বাঁক নেয়।
লোহাঘাটের সামনে গাড়ি থামিয়ে, গাড়ি থেকে দেহি নেমে, অপর দিকের দরজা খুলে রূপমের হাত ধরে গাড়ি থেকে নামিয়ে বলে ওঠে, “কী ব্যাপার তোমার? আজ সাতদিন হল, আমি আমেরিকা থেকে ফিরেছি। কলের পর কল, ম্যাসেজের পর ম্যাসেজ করে গেছি, তার একটাও উত্তর নেই?” দেহির প্রশ্নে রূপম উত্তর দেবে কী, সে মাথা নামিয়ে মাটি থেকে চলেছে। দেহি ডানহাতে রূপমের মুখ তুলে বলে, “চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলো। কী হয়েছে? যাওয়ার আগে দেখে গেছি অন্যরকম, ফিরে দেখছি অন্যরকম। বাবার শরীর ঠিক আছে?” দেহির প্রশ্নে, রূপম মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ” করে বুঝিয়ে দেয়, তার বাবার শরীর কুশলেই আছে।
— “তাহলে? কী হয়েছে তোমার? মুখ দেখে মনে হচ্ছে, খুব বড়সড়ো কাণ্ড ঘটিয়েছ।” রূপম খুব ভয়ে ভয়ে, শান্ত গলায় দেহির চোখের দিকে না তাকিয়ে উত্তরে বলে, “আমি ভুল কাজ করেছি একটা।”
— “কী করেছ?”
— “আমি বিয়ে করেছি।” রূপমের কথাটা শোনামাত্রই দেহি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে মুহূর্তের মধ্যে রূপমের গালে কষিয়ে চড় মারতেই রূপম ছিটকে পড়ে ঘাটের সিঁড়ির ধারে। মাটিতে পড়ে, দেহির দিকে তাকাতেই রূপম দেখে, দেহি কাঁদতে কাঁদতে নিজের মুখের উপর দুইহাত চেপে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়েছে। রূপম তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে দেহির কাছে গিয়ে, দেহির দুই কাঁধ ধরতেই দেহি মুহূর্তের মধ্যে রূপমের দুইহাত ছিটকে সরিয়ে বলে ওঠে, “ছোঁবে না আমাকে। একদম ছোঁবে না। এইজন্যই কোনো পাত্তা নেই।” কথাটা বলে দেহি মাটি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে, নিজের গাড়ির দিকে এগোতেই রূপম দৌড়ে গিয়ে দেহির ডানহাত চেপে ধরে বলে ওঠে, “দেহি, একবার আমার কথা শোনো।”
— “না! কোনোকিছু শোনার নেই আমার।”
— “আমি লজ্জায় তোমার সাথে দেখা করতে পারছিলাম না। আমি জানি আমি ভুল করেছি।”
— “ভুল? না ভুল তুমি না, আমি করেছি। ছাড়ো আমাকে।”
— “না, ছাড়ব না। একবার শোনো। বিয়ে করেছি ঠিকই কিন্তু কোনো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক আমাদের মধ্যে নেই। ছুঁয়েও দেখিনি তাকে। তুমি যাওয়ার পর পরই বাপির শরীর খুব খারাপ হয়েছিল। আমি জানতাম না, আমার পারমিশন না নিয়েই বাবার আমার বিয়ের কথা দিয়ে দিয়েছিল। আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম এই বিয়ে আটকানোর। আমিই ঠিক করেই নিয়েছিলাম, তোমার কথা বাবাকে বলবোই। কিন্তু ডাক্তার জানায়, ওই মুহূর্তে কোনো বিষয়ে বাবা উত্তেজিত হয়ে যায় তাহলে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। আমি পারিনি দেহি ওই মুহূর্তে বলতে।”
— “তাহলে আমার কাছে বিলাপ করে কী হবে? যাও বাবার কথায় বিয়ে করেছ এবার সংসার করো।”
— “দেহি, সত্যিই বলছি, কোনো সম্পর্ক হয়নি আমাদের মধ্যে।” কথাটা বলে রূপম দেহির কাঁধে মাথা রাখতেই দেহি নিজের চোখ বন্ধ করে কেঁদে চলে।
___________________________________________________
দরজা খোলার শব্দ পেয়েই দেহির ঘোরটা কাটে। পিছনে ফিরে ঘুরতেই দেখে যশ হাতে একটা বড় হলুদ গোলাপের বুকে নিয়ে ঢুকেছে। দেহির দিকে তাকিয়ে একটা ছোট্ট হাসি হেসে যশ, “দিল্লি ব্রাঞ্চের কলিগরা তোমাকে আর আমাকে গিফট করেছে।” বলেই হাতে ধরে রাখা বুকেটা দেহিকে দেখায়। রুমের ডেক্সের উপর রাখা ফ্লাওয়ার ভাসের পাশেই সেটাকে রেখে কপালে ভাঁজ কেটে যশ বলে ওঠে, “তুমি এখনও ঘুমাওনি কেন?”
— “এমনি।” শান্ত গলায় দেহি উত্তর দেয়।
যশ সোফায় বসে ডানপায়ের সাদা শুয়ের লেস খুলতে খুলতে একটা হাসি দিয়ে বলে, “বুঝেছি। আমি বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে মেঝেতে ব্ল্যাঙ্কেটটা পাতছি।”
যশ বাথরুমে ঢুকতেই দেহি হাতে ধরে রাখা সিগারেটের পোড়া ফিল্টারটা অ্যাস্ট্রেতে ফেলে। মিনিট কুড়ি পর সাদা স্যান্ডোগেঞ্জি আর কালো ট্রাউজার পরে বাথরুম থেকে যশ বেরিয়ে দেখে, দেহি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চিরুনি দিয়ে লম্বা চুলটা আঁচড়াচ্ছে। হাতের সাদা তোয়ালেটা গলায় জড়িয়ে নিয়ে, বেডের উপরে থাকা ব্ল্যাঙ্কেটটা ধরতেই দেহি বাঁহাতে, যশের হাতটা চেপে ধরে। যশ দেহির মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলে ওঠে, “কী হল? এটা কি রাতে তোমার লাগবে? আমি তো এক্সট্রা চাদর আনিনি। আসলে আমি তো জানতাম না তুমি আসবে।” কথাটা বলেই দেহির হাতের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে, বেডের পাশে থাকা টেলিফোনের দিকে এগোতে এগোতে বলে, “দাঁড়াও, রুম বয়কে ফোন করে, আর-একটা আনিয়ে নিই।”
— “দরকার নেই।” যশের কথা শেষ হতে না হতেই দেহি বলে ওঠে।
— “মানে?”
— “কেসের ব্যাপারে দিল্লি এসেছ। মেঝেতে শুয়ে ঠান্ডা বাঁধানোর দরকার নেই।”
— “তাহলে শোবো কোথায়? ওই ছোট্ট সোফাটায়?”
— “বাল। সোফা ছোটো, বেডটা নয়।”
গাড়ির দরজা খুলে গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির সদর দরজার কাছে এগিয়ে কয়েকটা টোকা মারতেই শুভ্রার মা, শর্বরী দরজা খোলে। একটা ছোট্ট হাসি দিয়ে শুভ্রা ঘরের ভিতর ঢুকতেই শর্বরী বলে ওঠে, “এত রাত?”
— “মা, ভালোমতোই জানো অপারেশনের কাজে গিয়েছিলাম।”
— “কিন্তু তাই বলে, এতক্ষণ?” শর্বরী কথাটা বলতেই শুভ্রা শর্বরীর কাছে এগিয়ে নিজের দুইহাত কাঁধের উপর রেখে বলে, “ইন্সপেক্টর মিসেস শর্বরী সরকার, আপনি যখন তদন্তের জন্য রাতের পর রাত ছোটাছুটি করেন, তখন আমারও ঠিক এই চিন্তাটাই হয়। আমি বলি না এটাই।” শুভ্রার কথাটা শুনে শর্বরী একটা ছোট্ট হাসি হেসে শুভ্রার কপালে একটা হালকা করে চাপড় মেরে বলে, “পাগলি। যা ড্রেস খুলে নীচে আয়। আমি খাবার বাড়ছি।”
— “মানে, তুমি এখনও খাওনি?”
শর্বরী চুপ করে যেতেই শুভ্রা বেশ রেগে বলে, “মা, আমি তোমাকে বারণ করেছি। রাত একটা বাজে। যাও খেয়ে নাও, আর আমি তো তোমায় বলে গেলাম, রাতে খেয়ে ফিরব।”
— “আচ্ছা ঠিক আছে। রাতবিরাতে চিৎকার দিতে হবে না। ঘরে যা।” কথাটা শুনে শুভ্রা রাগে গজগজিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে থাকে।
রুম অন্ধকার। কিন্তু কাচের জানলা ভেদ করে চাঁদের ক্ষীণ আলো এসে পড়েছে রুমের বেডের উপর। ওয়ালক্লকের সেকেন্ডের কাঁটার টিক টিক শব্দ যেন ঘরের স্তব্ধতা আরও বর্ধিত করে তুলছে। বেডের উপরে বাঁদিকের জানলার দিকে মুখ করে দেহি আর ডানদিকের সোফার দিকে মুখ করে যশ শুয়ে। হঠাৎ এই স্তব্ধতা ভেদ করে “মামণি—” একটা মৃদুডাক ডেকে ওঠে যশ। দেহি ডাকটা শুনে শান্ত গলায় “হুম” করতেই যশ বলে ওঠে, “কেমন একটা ভয় ভয় লাগছে।”
— “কেন?” দেহি প্রশ্ন করে।
— “না, বিয়ের পর প্রথমবার এক বিছানায় আমরা। তোমার যা মুড, হয়তো গভীর ঘুমে আমায় লাথি মেরে বিছানা থেকে ফেলে দিলে।” কথাটা শেষ হতে না হতেই দেহি যশের দিকে ঘুরে, সজোরে যশের পিঠে ধাক্কা মেরে যশকে মেঝেতে ফেলে দেয়।
— “এটা কী হল?” যশ মেঝে পড়ে থতমত খেয়ে জিজ্ঞাসা করতেই দেহি উত্তরে বলে, “বুঝিয়ে দিলাম, মেঝেতে ফেলতে হলে ঘুমের ঘোরে না, জাগা অবস্থাতেই ফেলব।”
— “তুমি কোনোদিন বদলাবে না, তাই না?”
— “শুয়ে পড়ো।”
যশ মেঝে থেকে বেডে এসে শুতেই দেহি জিজাসা করে, “দ্যুতি কিছু বলেছে?”
— “না। মুখই খুলছে না।”
— “খুলবে। সব খুলবে। কাল আমি যাই, তারপর হুড়হুড় করে খুলবে।” কথাটা বলে কিছুক্ষণ চুপ থেকে দেহি আবার বলে ওঠে, “তোমার হাত কেমন আছে?”
— “শুকিয়ে গেছে।” যশ বলে।
— “মিলিয়ে যায়নি।”
— “মানে?”
— “তুমি বুঝবে না, বাচ্চা আছো।” কথাটা বলেই দেহি নিজের পা দুটো সামান্য মুড়িয়ে “উফফ” শব্দ করতেই যশ বলে ওঠে, “কী হল?”
— “জানি না। এই ট্রেনে কন্টিনিউ বসে থেকে, তার উপর সড়কে অতক্ষণ হাঁটা, ব্যথা করছে।” দেহির কথাটা শোনামাত্রই, যশ বেড থেকে উঠে বসে, দেহির পায়ের কাছে এগিয়ে পা ধরতেই দেহি মুহূর্তের মধ্যে পা সরিয়ে বলে ওঠে, “এ কী? পায়ে হাত দিচ্ছ কেন?”
— “বললে তো ব্যথা করছে।”
— “করুক। পায়ে হাত দিতে হবে না, শুয়ে পড়ো।”
রাত বেড়েই চলেছে। দেহির চোখে ঘুম নেই। একঝলকে যশের দিকে তাকিয়ে দেহি দেখে নেয় যশ ঘুমিয়েছে কিনা। চাঁদের আলো যশের মুখের উপরে। যশের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে দেহি একদৃষ্টে কাচের জানলাটার দিকে তাকিয়ে।
__________________________________________________
হোটেলের বেডে হেলান দিয়ে দেহি সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে চলেছে। দেহির গায়ে জড়ানো একটা সাদা রঙের ব্ল্যাঙ্কেট মাত্র। পাশের ডেক্সের থেকে সেলফোনটা হাতে তুলে সময়টা দেখে নিয়ে বলে ওঠে, “এবার বাড়ি ফিরতে হবে রূপম।”
দেহি সিগারেটের পোড়া ফিল্টারটা অ্যাস্ট্রেতে ফেলতেই রূপম দেহির হাত টেনে নিজের উন্মুক্ত বুকের উপর এনে উত্তরে বলে, “কেন? থেকে যাও।” রূপমের কথা শুনে দেহি একটা বিদ্রূপসূচক হাসি হেসে রূপমের বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বলে , “আমার ব্রাটা কোথায়?”
রূপম বেড থেকে উঠে, গায়ে রয়্যাল ব্লু রঙের টি-শার্টটা চাপিয়ে ধিমিস্বরে জিজ্ঞাসা করে, “এত স্মোক করো কেন?”
— “তুমি স্মোক করো না বলে, আমিও করতে পারব না, এমন কোথাও লেখা আছে?” কথাটা শেষ করে ব্রায়ের হুকটা আটকে নিয়ে বিছানা থেকে উঠে, দেহি আকাশী ও হালকা সবুজ ঘেঁষা শর্টসমিডি পরতে থাকে অন্যদিকে রূপমও নিজের কালো জিন্সটা পরে নিয়ে কোমরে কালো বেল্টটা আটকাতে থাকে। পোশাক পরা শেষ হলে, রূপম দেহির কাছে এগিয়ে পিছন থেকে দেহির কোমর দুইহাতে চেপে ধরে নিজের কাছে টেনে এনে, কাঁধে মাথা রেখে বলে, “আমি বাড়ি ছেড়ে দিই?”
গোলাপী রঙের ম্যাট লিপস্টিকটা দিয়ে নতুন করে ঠোঁট আঁকতে আঁকতে দেহি উত্তরে বলে, “বাড়ি যাও। বউ হয়তো না খেয়ে বসে আছে।”
— “সো? থাকলে থাকবে। আমি তাকে আমার জন্য বসে থাকতে বলিনি আর তুমিও কিছু বলছ না।”
— “কোন ব্যাপারে?”
— “ডিভোর্সের।”
লিপস্টিক পরা শেষ করে, ব্যাগের ভিতরে সেটা ঢুকিয়ে নিয়ে রূপমের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে দেহি তাচ্ছিল্য সুরে জিজ্ঞাসা করে, “কার জন্য ডিভোর্স দেবে বউকে?”
— “তোমার জন্য।”
— “তাই? আমার জন্য যদি সত্যিই চিন্তা করতে তাহলে পাঁচবছর আমার সাথে প্রেম করে, অন্যকে ড্যাং ড্যাং করে বিয়ে করতে যেতে না। আর সেই সময়ে একদমই নয়, যে সময়ে আমি বাইরে।”
— “দেহি তোমাকে তো সবটাই বলেছি। কোন পরিস্থিতির উপর দাঁড়িয়ে আমাকে এই সিদ্ধান্তটা নিতে হয়েছে। বাপির কী অবস্থা ছিল সেটাও বলেছি। তারপরও এক কথা কেন বার বার বলো?”
— “লিসন রূপম সেন, বিয়েটা যখন বাবার কথাতে করেছ, ডিভোর্সটা দিলে নিজের বাবা নিনাদ সেনের কথাতেই দেবে, আমার কথায় না। কারণ আমার সেই অধিকার নেই আর।”
— “তাহলে আমরা এটা কী করছি?”
— “প্রেম করছি। ইনলিগাল। তুমি তোমার বউকে ঠকাচ্ছ আর আমি নিজেকে।”
___________________________________________________________
মুহূর্তের মধ্যে দেহি বেডে উঠে বসতেই যশের ঘুম ভেঙে যায়। যশ তাড়াতাড়ি উঠে বসে, বেডডেক্সের উপরে থাকা ল্যাম্পটা জ্বালাতেই দেখে দেহি ক্রমাগত নিঃশ্বাস ফেলে চলেছে সঙ্গে এসি ঘরেরও দরদরিয়ে ঘামছে।
— “কী হয়েছে তোমার?” যশ বেশ চিন্তার সাথে জিজ্ঞাসা করে ওঠে। “অসুস্থ লাগছে?” কথাটা বলেই বেড থেকে নেমে ঢাকা দেওয়া জল ভরতি কাচের গ্লাসের ঢাকাটা খুলে দেহির দিকে এগিয়ে দেয়। দেহি কাঁপা হাতে জলের গ্লাসটা ধরে নিয়ে খুব সামান্য একটু জল খায়।
— “ডাক্তারের কাছে যাবে?” যশ জিজ্ঞাসা করতেই দেহি মাথা নাড়িয়ে “না” করে বলে, “কিছু হয়নি। জাস্ট স্বপ্ন। শুয়ে পড়ো।”
সকাল এগারটার সময় দেহি ও যশ ব্রাঞ্চে এসে দ্যুতি যে সেলে রয়েছে সেটাতে গিয়ে ঢোকে। অন্য আর-একটি সেলে দুজন ব্রাঞ্চ অফিসাররা মিলে সেলিমকে পুরোদমে রুল দিয়ে খাতির যত্ন করে চলেছে। দ্যুতির মুখোমুখি একটা চেয়ার টেনে নিয়ে দেহি গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “কী ঠিক করলেন দ্যুতি দেবী? মুখ খুলবেন?” দেহির প্রশ্নে দ্যুতি মুখ ঘুরিয়ে ব্রাঞ্চের মেঝের দিকে তাকায় দেহি একটা হাসি হেসে আবার বলে ওঠে, “আপনাদের জন্যই আমাকে পাপ কাজগুলো করতে হয়। যাইহোক, আপনার তিন বছরের মেয়ে দীপশিখা কেমন আছে?” নিজের মেয়ের নাম শোনামাত্রই দ্যুতি চমকে উঠে দেহির দিকে তাকায়। দেহির চোখের মণি সম্পূর্ণ স্থির। মুহূর্তের মধ্যে হাতের সেলফোনটা দ্যুতির সামনে তুলে ধরতেই দ্যুতি নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ফোনের ভিডিও কলিংয়ে দ্যুতি দেখছে, একটা বন্ধ ঘরের মেঝেতে তার তিন বছরের মেয়েকে মাটিতে শুইয়ে শুভ্রা ডানহাতটা চেপে ধরতেই ছোট্ট শিশুটি চিৎকার দিয়ে ওঠে।
— “আপনি কি মানুষ?” দ্যুতি তীব্রস্বরে বলতেই দেহি একটা হাসি দিয়ে বলে ওঠে, “দ্যুতি দেবী, আমি কী রকম সেটা বলতে গেলে একটা উপন্যাস হয়ে যাবে। পরে সেটা নিয়ে আলোচনা করলেও চলবে। এবার আপনি ঠিক করুন আপনি আপনার বায়োগ্রাফি বলবেন কিনা। কারণ আপনি যত দেরি করবেন, ততই আপনার মেয়ের বিপদ বাড়বে। শুভ্রা...।” দেহি ডাকতেই শুভ্রা মেয়েটির ডানহাতটা আর-একটু জোরের সাথে ঘোরাতেই মেয়েটি আরও জোরে চিৎকার দিতেই দ্যুতি “না। না। বলছি সব বলছি।”
— “এই তো। বলবেনই যখন তাহলে আমাকে এত কষ্ট করান কেন? আমি আগেই সাবধান করেছিলাম। শুভ্রা...।” আবার দেহি ডাকতেই, শুভ্রা মাটি থেকে মেয়েটিকে কোলে তুলে নেয়।
— “বলুন কী বলতে হবে।” দ্যুতি জিজ্ঞাসা করে।
দেহি সামনের টেবিলের উপর বাঁহাতটা রেখে, দ্যুতির দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টি রেখে জিজ্ঞাসা করে, “কৌশিক দত্তের সঙ্গে যে প্রমীলার দেবীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটা আপনি জানলেন কী করে?”
— “আমি শম্ভুকাকার কাছ থেকে জানতে পারি।”
— “শম্ভু নাথ?”
— “হ্যাঁ।”
— “তিনি জানল কোথা থেকে?”
— “সেটা বলতে পারব না, কারণ সেটা আমি জিজ্ঞাসা করিনি। শম্ভুকাকা আমাকে বলেছিল, কৌশিকের সাথে প্রমীলা রোজরাতে ছাদে দেখা করতে যায়।”
— “কৌশিকবাবুকে তো আপনি বিয়ের আগের থেকে চিনতেন, তাই না দ্যুতি দেবী?” দেহি প্রশ্ন করা মাত্রই দ্যুতি চমকে ওঠে। দ্যুতির মুখের ভাব দেখে দেহি একটা ছোট্ট হাসি দিয়ে বলে, “কৌশিক, দেবাশীষ আর আপনি তিনজনই সুরেন্দ্রনাথ কলেজের থেকে পাশ আউট করেছেন। কৌশিক কেমিস্ট্রি, আপনি আর দেবাশীষ বোটানি। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, দেবাশীষের সঙ্গে কলেজে পরিচয় হবার আগে থেকে আপনি কৌশিকের সাথে মেলামেশা করতেন।”
— “হ্যাঁ, আমি কৌশিককে চিনতাম। আপনারা কৌশিককে যতই ভালো মনে করুন, ও ভালো ছিল না। আমার থেকে দুই ক্লাস সিনিয়ার। কৌশিকের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়েছিল জাহ্নবী।”
— “জাহ্নবী? সে কে?” যশ জিজ্ঞাসা করে ওঠে।
— “আমার বান্ধবী। কৌশিকের সাথে জাহ্নবীর একটা সম্পর্ক ছিল।”
— “এই জাহ্নবীর সাথেই কি কৌশিকের বিয়ের কথা চলছিল?”
— “বোধহয়। তার কারণ কলেজের সেকেন্ড ইয়ারের পর থেকে জাহ্নবীর কোনো খোঁজ আমি পাইনি। ঘাটা পুলিশ স্টেশনে আমি মিসিং ফাইলও করি, কিন্তু কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। আমি তো জানতামও না যে, দেবার দাদা কৌশিক। রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বিয়ে করে দত্তবাড়িতে দেবা আমাকে নিয়ে উঠলে আমি জানতে পারি ও কৌশিকের ভাই।”
— “তাই জন্যই মহেন্দ্রনাথকে কৌশিক বুঝিয়ে ছিল যাতে আপনাদের বিয়েটা মেনে নেয়, যাতে বাড়ির বাকিরা, জাহ্নবীর কথা জানতে না পারে?”
— “হ্যাঁ। আমার আজও মনে আছে, জাহ্নবীর সাথে আমার শেষ যেদিন দেখা হয় সেদিন ও অন্যরকম ছিল। একটা উদাসীনতা, ঠিকমতো কিছু বলছে না। কিছু একটা হয়েছিল ওদের মধ্যে।”
— “আর সেলিমের সাথে পরিচয়?” যশ প্রশ্নটা করতেই দ্যুতি বলে, “সেলিমকে আমি প্রথম দেখি মামার সাথে।”
— “মানে, বিমল বিশ্বাস বাবুর সাথে?” দেহি বলে।
— “হ্যাঁ। আমি জানতাম না ও একজন ক্রিমিনাল। একদিন মামার কাছে যাওয়ায় ওই সেলিম আমার সাথে দেখা করে কাজ চায়। আমিও ভালোমানুষ ভেবে দেবাকে এসে বলি, আর দেবা ওকে ব্যাবসার কাজে লাগায়। বাস্টার্ডটা ব্যাবসার টাকা এদিক ওদিক করতে শুরু করে। আমি নিজে একদিন গোডাউনে দেবার সাথে দেখা করতে গিয়ে ওকে ধরে ফেলি আর কৌশিককে গিয়ে সেটা জানাই। কারণ আমি জানতাম, দেবা কিছুতেই ওকে তাড়াতে পারবে না। মহেন্দ্রনাথকে হিসাব বোঝাতে পারে কৌশিকই।”
— “কিন্তু কৌশিকবাবুর সাথে তো দেবাশীষ বাবু দেখা করতে গিয়েছিল এই সেলিম ওরফে রঘুবীরের ব্যাপারে।”
— “হ্যাঁ। ও জানত না। দেবা ভাবছিল কৌশিক ইচ্ছাকৃত ওকে বের করে দিয়েছে।”
— “শম্ভু নাথ আপনাকে আর কৌশিককে ছাদে তর্ক করতে দেখেছিল, সেই তর্কটা কী জাহ্নবীকে নিয়ে?”
— “হ্যাঁ। আমি জিজ্ঞাসা করি জাহ্নবী কোথায়? কৌশিক ডাইরেক্ট বলল জানি না। কলেজের পর থেকে জাহ্নবীর সাথে ওর দেখাই হয়নি। আমিও তেড়ে বলে উঠি, সত্যি কথা না বললে আমার যেটা করার সেটাই আমি করব, চুপ করে থাকার মেয়ে আমি নই।”
— “আর এটাই ছাদে গিয়ে শম্ভু শুনেছিল।” দেহির প্রশ্নে দ্যুতি চুপ করে কপালে ভাঁজ কাটতেই দেহি গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করে, “অ্যানিথিং রং?”
— “আমার মন বলছে, শম্ভু কাকা পুরোটা শুনেছিল। কিন্তু মহেন্দ্রনাথকে পুরোটা বলেনি।” দ্যুতি ধীর গলায় বলে ওঠে।
— “এই খুনের তদন্ত চলাকালীন আপনিই কৌশিক দত্তের উইলের কথা বলেছিলেন সেটা কীভাবে জানলেন?” দেহির প্রশ্নে দ্যুতি একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে।
কাপসি রোডের ধারে একটা বড় হলুদ কৃষ্ণচূড়া গাছের গোঁড়াতে সাদা রঙের টেসলা গাড়িটা ধাক্কা খেয়ে ভগভগিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে চলেছে। স্থানীরা প্রাতঃভ্রমণ করতে এসে গাড়িটিকে দেখামাত্রই দৌড়ে কাছে গিয়ে দেখে, ড্রাইভার সীটে বসে থাকা ব্যক্তির মাথা গাড়ির স্টেয়ারিংয়ে আর গলগলিয়ে মাথা ফেটে রক্ত। আধাঘণ্টার মধ্যে কাপসি থানার পুলিশরা লোকেশনে পৌঁছে নিজেদের কাজ আরম্ভ করে। একজন কনস্টেবল লাশ ভালোরকম দেখে নিয়ে অফিসার মিস্টার ঘোষালের কাছে গিয়ে জানায়, “স্যার কোনো আইডি বা ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। থাকার মধ্যে রয়েছে এই মানিব্যাগ আর গাড়ির মধ্যে দুটো মদের বোতল।” কনস্টেবলের কথা শুনে অফিসার বাদামি রঙের মানিব্যাগটা হাতে নিয়ে সেটা খুলে দেখে কয়েকটা কাগজপত্র ও দুইহাজার টাকার বারোটা নোট। ইতিমধ্যে স্থানীয়দের জবানবন্দি নিয়ে কাপসি মিস্টার ঘোষাল, কাপসি থানার চিফ ইন্সপেক্টর অম্বর সরকারের কাছে এসে বলে, “স্যার এরা ভিক্টিমকে চেনেন না। সকালে মর্নিংওয়ার্ক করতে এসে এঁরা দেখতে পায় আর তারপর আমাদের খবর দেয়।”
— “তোমার কী মনে হচ্ছে, অ্যাক্সিডেন্ট?” অম্বর সরকার জিজ্ঞাসা করে।
— “সেরকমই তো লাগছে স্যার।”
— “আমার সেটা লাগছে না।”
— “কেন স্যার?”
— “তাড়াহুড়োয় নিজের আইডি বা ড্রাইভিং লাইসেন্স ভুলে রেখে আসতে পারি, কিন্তু মোবাইল? একটা দরকারি জিনিস সেটা বাড়িতে কেউ ফেলে আসবে না। এটা অ্যাক্সিডেন্ট নয়, মার্ডার।”
— “তার মানে খুনি খুন করে আইডেন্টিটি হাইড করার চেষ্টা করেছে।”
— “হুম। বডি পোস্টমর্টেমে পাঠাও আর এই রুটে যতগুলো পেট্রোলপাম্প আছে সেখানে গিয়ে ভিক্টিমের ছবি দেখাও। এ কে, তার শনাক্ত না হলে কেস এগোনো মুশকিল।”

সিরাডো কফিশপের একটা গোল টেবিলে বসে, দুটো হট চকলেট কফি অর্ডার দিয়ে যশ, দেহিকে বলে ওঠে, “তুমি কি এবার কলকাতা ব্যাক করবে নাকি থাকবে?”
দেহি নিজের ডানহাতের বৃদ্ধা আঙ্গুলের নখ দিয়ে ঠোঁটের উপর আলতো করে ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে উত্তরে বলে, “ভাবছি ফিরব। যার জন্য এতদূর আসা, সেটা তো সফল। ওদের তো তুমি কলকাতা চালান করবে?”
— “হ্যাঁ। আজকেই। শুধু দ্যুতিকে নয়।”
ইতিমধ্যে টেবিলের উপর দুই কাপ কফি দিয়ে যেতেই দেহি একটা কাপ আঙুলে করে তুলে নিয়ে হালকা করে চুমুক দিয়ে বলে ওঠে, “এখনও একটা সুতো গিঁট বেঁধে আছে। ওটা না খুললে সূঁচে পরাতে পারব না।”
দেহির মুখে চিন্তার ছাপটা ধরা দিতেই যশ সেটাকে কাটানোর জন্য বলে, “নেক্সট হেয়ারিং তো পরের মাসে। সাতদিনের ছুটিও থিয়েটারের থেকে নিয়েছ। সবে দুইদিন হল, আরও দুইদিন থেকে তারপর ফিরবে? এখানে অনেক কিছুর দেখার আছে।” যশের কথায় দেহি তেমন কিছু ভাব প্রকাশ না করায় যশ আর ওই বিষয়ে কথা না বাড়িয়ে এক অদ্ভুত রকমের প্রশ্ন করে দেহিকে।
— “কালরাতে কী হয়েছিল তোমার?”
দেহি কফিতে আরও দুইবার চুমুক দিয়ে নিয়ে বলে, “মহাভারত বোঝো?”
যশের প্রশ্নের উত্তরে এইরকম বিকট প্রশ্ন দেহি করতেই যশ সামান্য হকচকিয়ে যায়। কফিতে একটা চুমুক দিয়ে যশ বলে, “অল্প অল্প।”
— “দ্রৌপদী, সারাজীবন অর্জুনকেই ভালোবেসে এসেছিল। কিন্তু দ্রৌপদীকে সবথেকে ভালো কে বেসেছিল?” দেহির প্রশ্নে যশ সামান্য হেসে নিয়ে উত্তরে বলে, “ভীম।”
— “কারণ বলতে পারবে?”
— “দ্রৌপদীর সম্মানকে নিজের সম্মান মনে করত বলে। বস্ত্রহরণের সময় কেবলমাত্র ভীমই পাগলের মতো কেঁদে চলেছিল। আর বস্ত্রহরণের পর ভীমই কৃষ্ণের মতো দ্রৌপদীকে মনোবল জুগিয়েছিল।”
— “ভীমই যে সবথেকে বেশি তাকে ভালোবাসে, সেটা দ্রৌপদী রিয়েলাইজ করল কখন?”
— “খুব সম্ভবত মহাপ্রস্থানের সময়।”
— “ইয়েস।” দেহি মাথা নাড়িয়ে বলে ওঠে। “একদম শেষে। যখন দ্রৌপদীর আর কিছুই করার নেই। সুমেরু পর্বতে ওঠবার সময় দ্রৌপদী ভীষণ ক্লান্ত। পায়ে হেঁটে ওঠার ক্ষমতা নেই। অর্জুনের কাছে এই কথা বলতেই অর্জুন বলেছিল, আমি সব কিছু ত্যাগ করেছি, এমনকি স্ত্রীকেও। ওই মুহূর্তে ভীমই দ্রৌপদীকে কাঁধে তুলে সুমেরু পর্বতে উঠতে শুরু করে আর দ্রৌপদী বুঝতে পারে ইহ জীবনে তার ভুলটা কোথায়!”
— “কিন্তু তুমি হঠাৎ এইসব বলছ কেন?”
— “আচ্ছা যশ, দ্রৌপদী কি অর্জুনকে ভালোবেসে ভুল করেছিল? ভীমকে ভালোবাসলেই সে সঠিক হতো?”
— “একদমই না। দেহি, আমি যাকে ভালোবাসি তাকেও আমাকে ভালোবাসতেই হবে, এটা শর্তে পড়ে না। ভীম নিজের জায়গায় ঠিক, দ্রৌপদী নিজের জায়গায়। হ্যাঁ আশা আমি রাখতেই পারি যে সেও আমাকে ভালোবাসে। চলো হোটেলে পৌঁছে দিয়ে আমায় আবার ব্রাঞ্চে এসে একটা ফাইল রেডি করে, ওদের সাথে পাঠাতে হবে।”
— “তুমি ব্রাঞ্চে চলে যাও, আমি একা হোটেলে ফিরে যাব।”
— “স্যার, হাইওয়ের কাছে যে পেট্রোলপাম্পটা আছে, সেখানকার এক ছেলে বলল, রাত্রি সাড়ে বারোটা নাগাদ এই ব্যক্তি গাড়িতে পেট্রোল ভরতে আসে।” কাপসি থানার অফিসার মিস্টার ঘোষাল, চিফ ইন্সপেক্টর অম্বর সরকারের রুমে ঢুকে বলে ওঠে। “সাথে একজন মেয়ে ছিল কিন্তু গাড়ির কাচ পুরো খোলা ছিল না বলে মুখ দেখতে পারেনি। পোশাক দেখে বুঝতে পেরেছিল ভিতরে মেয়ে বসা।”
— “বেসিক পি.এম. রিপোর্ট আসতে কতক্ষণ আর?” কড়া গলায় অম্বর জিজ্ঞাসা করতেই ঘোষাল বলে, “রতন আনতে গেছে।”
— “ওই পেট্রোলপাম্পের সিসিটভি ফুটেজ?”
— “একসপ্তাহ ধরে খারাপ।”
— “বাহ!”
— “আমি আশেপাশে থানাতে ভিক্টিমের ছবি পাঠিয়ে দিয়েছি, যদি মিসিং রিপোর্টে ধরা পড়ে।”
— “ও তাহলে আমাদের চুপ করে বসে থাকা উচিত কখন, আশেপাশে থেকে মিসিং রিপোর্টের খবর আসবে?” কথাটা বলামাত্রই ঘোষাল মাথা নামিয়ে নেয়। চেয়ার ছেড়ে উঠে, অম্বর বলে, “খবরের কাগজে ভিক্টিমের ছবি বের করো।”
— “ওকে স্যার।” কথাটা বলতেই রুমের দরজা খুলে একজন কনস্টেবল হাতে একটা নীল রঙের চ্যানেল ফাইল নিয়ে ঢুকে, ঘোষালের হাতে দিয়ে “বেসিক পোস্টমর্টেম রিপোর্ট।” বলে, ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
প্রায় মিনিট দশেক ধরে রিপোর্ট দেখে নিয়ে বেশ অবাকের সুরে অম্বর বলে ওঠে, “নর্মাল হার্ট অ্যাটাক? এই ডাক্তারের মাথা গেছে।” কথাটা শুনে নিয়ে ঘোষাল ধীর গলায় বলে, “আমারও কিন্তু তাই মনে হচ্ছে। হুট করে বুকে ব্যথা শুরু তারপর কন্ট্রোলের বাইরে বেরিয়ে গিয়ে গাছে ধাক্কা।”
— “এটাই হল পয়েন্ট। তাহলে গাছে ধাক্কা মারার আগে বেঁচে ছিল? মৃত্যু হলে, মাথায় আঘাত লেগে হতো? হার্টফেল হল কী করে রিপোর্টে?”
— “মরার পরে হয়তো ধাক্কা মেরেছে।”
— “উফফ ঘোষাল, তুমি একটা অ্যান্টিক। ধাক্কা মারার আগে হার্টফেল হলে, গাছে ধাক্কা খেত না। সোজা পেরিয়ে গিয়ে ট্রান্সফারমারে ধাক্কাটা খেত। লক্ষ করেছিলে, গাছের থেকে প্রায় পনেরো হাত দূর থেকে গাড়ির টায়ারের দিশা বদলে গিয়েছিল?”
— “হ্যাঁ স্যার।”
— “এটা তখনই হয় যখন পাশের সীটে বসে কেউ স্টেয়ারিং হ্যান্ডেল করে।”
— “কারেক্ট, ইউ আর রাইট।” ঘোষাল কথাটা বলতেই অম্বর সরকার কটমটিয়ে তাকায়। মুহূর্তের মধ্যে ঘোষাল, চোখ নামিয়ে একটা ঢোক গিলে বলে ওঠে, “সরি স্যার।”
— “হার্টফেলের সময়টাও লেখেনি ফরেন্সিকের এই হাতুড়ে ডাক্তারটা। এটা বেসিক রিপোর্ট হয়েছে? বসে থাকো এবার ফুল রিপোর্ট পাওয়ার জন্য পুরো একদিন।” কথাটা বলেই চিফ ইন্স্পেক্টর টেবিলের উপর ছুঁড়ে ফেলে ময়নাতদন্তের রিপোর্টটা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন