শান্তনু দাশ
মোহিতমঞ্চে নাটকের মহড়াতে রঙমহল থিয়েটারের সকল কলাকুশলী নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত। নাটকে যারা আবহ সৃষ্টি করবে তাদের সঙ্গে শ্রীতমা বসে তালিম নিয়ে চলেছে ক্রমাগত। অন্যদিকে দুই নৃত্য শিক্ষক, দেহির সঙ্গে নাচের বিভিন্ন মুদ্রায় নৃত্য প্রশিক্ষণ দিয়ে চলেছে। দলে শঙ্করীর কাজ হল, নাটকে নায়িকা চরিত্রদের রূপদান মানে মেকআপ, হেয়ার সেটিং ও কস্টিউম নির্বাচন করে তাদের সুসজ্জিত করা। এই নাটকে দেহির মেকআপ আর্টিস্টের কাজ শঙ্করী নিজেই করছে। কয়েকদিনের মধ্যেই শঙ্করী বেশ কাছের হয়ে উঠেছে দেহির। রিহার্সালে মাঝেসাঝে শুভ্রা আসে।
গ্রিনরুমে দেহির লম্বা চুল সাজাতে সাজাতে সামান্য হেসে শঙ্করী হঠাৎ বলে ওঠে, “পদ্মা ক্যারেকটারটা যেন আপনাকেই মানায়।”
সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে দেহি উত্তরে বলে, “বলছ?”
— “একদম! আর সত্যি বলতে আপনার নাচের সাথে গানের গলাও যে এত সুন্দর তা অবিনাশবাবু বলেছিল ঠিকই কিন্তু প্রথমে বিশ্বাস করিনি। শ্রীতমা দেবীর কাছে শুনলাম বহুদিন পর আপনি গান করছেন।”
কথাগুলো শুনে দেহি তেমন গুরুত্ব না দিয়ে শঙ্করী হঠাৎ জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “আচ্ছা শঙ্করী, প্রথম যেদিন আমার সাথে দেখা করেছিলে সেদিন জানিয়েছিলে, তুমি যেই বাড়ি কাজ করতে সেই বাড়ির বড়বউ খুন করে। কিন্তু সেটা তুমি বিশ্বাস করো না।”
দেহির বাঁদিকের চুলে কাঁটা গুঁজতে গুঁজতে মুখে কিছু না বলে শুধু মাথা নাড়িয়ে শঙ্করী “হ্যাঁ” করে। দেহি আয়নার থেকে শঙ্করীকে দেখে নিয়ে বলে, “কেন?”
— “বাড়ির সবাই বড় বউদিকে দিকে ভুল বুঝল।”
— “কী নাম তোমার বড় বউদির?”
— “প্রমীলা।”
— “কী হয়েছিল, সাতবছর আগে?” শঙ্করী কাঁটা গুঁজে নিয়ে একটা মোটা দাঁতের চিরুনি নিয়ে দেহির চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলে, “বাড়ির মেজছেলে কৌশিক দত্ত গলায় দড়ি দেয়। কিন্তু পোস্টমর্টেম রিপোর্টে আসে এটা খুন। যাবতীয় খুনের প্রমাণ প্রমীলা বউদির বিপক্ষে। আসলে এই কৌশিকদার সাথে বড় বউদির একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম আমি বাদে এটা বাড়ির অন্য কেউ জানে না। কিন্তু দেখলাম দীপিকা বউদি আর দ্যুতি বউদিও এই সম্পর্কের ব্যপারে জানত।”
— “ও। মানে বাড়ির মেজবউ আর ছোটবউ?” দেহি প্রশ্নটা করতেই শঙ্করী মুহূর্তের মধ্যে বলে ওঠে, “না না। কৌশিকদা বিয়ে করেনি। প্রমীলা বউদির স্বামী আশীষদার দুই বিয়ে। দ্বিতীয়পক্ষ হল এই দীপিকা বউদি আর বাড়ির ছোটবউ দ্যুতি বউদি।”
— “বাহঃ। এক বাড়িতে সতীন এই সময়ে।”
— “হ্যাঁ। পুলিশ তদন্ত করে যা বের করে তা হল, কৌশিকদার মৃত্যুর পর সবথেকে বড় লাভ হচ্ছে প্রমীলা বউদির।” কথাটা শুনে দেহি কপালটা সামান্য কুঁচকে নিয়ে খুব ধীরস্বরে বলে, “মানে? কৌশিকবাবুর মৃত্যুতে তোমার বউদির কীভাবে লাভ হচ্ছে?”
— “মারা যাওয়ার আগে কৌশিকদা নিজের একটা উইল করে। তাতে লেখা ছিল আকস্মিকভাবে আমার মৃত্যু হলে আমার ভাগের দত্তবাড়ির অংশ প্রমীলার হবে।”
— “কী?” দেহি বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে ওঠে।
শঙ্করী চুলের কাজ শেষ করে, দেহির সামনে রাখা চেয়ারে বসে নিয়ে বলে, “হ্যাঁ দেহি দেবী। এই কথা পুলিশ বাড়ির সবাইকে বললে, বাড়ির সবাই আপনার মতোই অবাক হয়। তখনই সবাই জানতে পারে, মেজদার সাথে যে বড় বউদির একটা সম্পর্ক ছিল। “
— “এই উইলের ব্যাপারে তোমার বড় বউদি জানত?”
— “বড় বউদি বার বার বলেছিল সে কিছুই জানে না এই ব্যপারে।”
— “তা প্রমীলার উপর পুরোপুরি সন্দেহ দানা বাঁধল কী করে?” দেহি প্রশ্নটা করতেই শঙ্করী সামান্য চুপ করে নিয়ে বলে ওঠে, “দ্বিতীয় খুনে।”
কথাটা শুনে দেহি একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে শঙ্করীর দিকে। শঙ্করী বলে চলে, “মেজদার খুনের ঠিক সতেরো-আঠারো দিনের মাথায় দত্তবাড়ির সবথেকে পুরোনো কাজের লোক শম্ভুকাকা খুন হয়। দত্তবাড়ির পিছনে বিশাল বড় গোলাপবাগান। মালি বলাই ভোরবেলায় জল দিতে গিয়ে শম্ভুকাকার দেহ দেখতে পায়। বুকের বাঁদিকে সরু কিছু দিয়ে হার্টে আঘাত করে খুন করে। পুলিশ এসে শম্ভুকাকার বডি সার্চ করে দেখতে পায় শম্ভুকাকা ডান হাত মুঠো করে রয়েছে। মুঠো খুলে পাওয়া গেল ব্লাউজের টুকরো। যেটা কাঁধের কাছ থেকে ছেঁড়া আর ব্লাউজটা ছিল প্রমীলা বউদির। খুনের আগে যে শম্ভুকাকার সাথে খুনির ভালোই হাতাপাই হয়েছে লাশ দেখে আমিও বুঝতে পেরেছিলাম। পুরোপুরি সন্দেহ গিয়ে পড়ল বউদির উপর। তারপর পুলিশ আরও কিছু প্রমাণ বউদির ব্যাপারে পায় যেটা আমরা কাজের লোকেরা জানি না। কোর্টে কেস উঠলে সবাই বউদির বিপক্ষে কথা বলে, বউদিকে খুনির আসামির দিকে ঠেলে দেয় কেবল আমি বাদে। আমি বলেছিলাম বউদি খুন করেনি। কারণ মেজদার খুনের সময় বড় বউদি ঘরে না থাকলেও সেই রাতে ছাদে যায়নি। সবাই ভাবল আমি বউদিকে বাঁচাবার চেষ্টা করছি। আদালতে প্রমাণ হল বউদিই খুনি। আমি প্রথম থেকে মেজদার সাথে বউদির সম্পর্কের কথা জানতাম আর সেটা জেনেও বাড়ির লোকেদের জানাইনি কেন, কেন আমি কোর্টে বউদির হয়ে সাক্ষী দিলাম, এই রাগে দত্তবাড়ির ছোট বউ দ্যুতি বউদি আমায় গলা ধাক্কা দিয়ে দত্তবাড়ির থেকে বের করে দেয়।” কথাটা বলেই সালোয়ারের ওড়নাটা দিয়ে শঙ্করী নিজের চোখটা মুছে নেয়।
দেহি পুরো বৃত্তান্ত শুনে নিয়ে বলে, “বাড়ির যিনি কর্তা তিনি কিছু বললেন না?”

— “তিনি আর কী বলবেন?” কড়া গলায় শঙ্করী বলে ওঠে। “একে ছেলে চলে যাওয়ার শোক। তারপর তিরিশ বছরের বিশ্বস্ত কাজের লোক খুন হল, বাড়ির বউ, ছেলের সাথে সম্পর্ক রেখেছে সব মিলিয়ে ওঁর যেন ধরাকম্পিত হয়। তার উপরে দ্যুতি বউদির সাথে কত্তাবাবার ভালো সম্পর্ক ছিল না।”
— “কেন?”
— “দত্তবাড়ির বউদের উপর প্রচুর নিয়ম ছিল যেটা ছোট বউদি মানত না। এটা কত্তাবাবার খুব রাগ। এছাড়া ছোড়দা আর দ্যুতি বউদির প্রেম করে বিয়ে। মামারবাড়ি মানুষ আর জাতে বোধহয় কায়স্থ ছিল না কারণ কত্তাবাবা সবসময় জাত তুলে ছোট বউদিকে অপমান করত।”
হঠাৎ গ্রীনরুমের দরজায় টোকা মেরে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর বাইরে থেকে বলে ওঠে, “দেহি দেবী আপনাকে মঞ্চে লাগবে। নবকুমার আর পদ্মার সিন।”
রঙমহল থিয়েটারের মহড়া প্রতিদিন চললেও দেহি বা শ্রীতমা প্রতিদিন যাতায়াত করে না। দলের পরিচালক অবিনাশ পাল দুইজনের সময় ও সুবিধা দেখেই এদের দুইজনকে মহড়াতে ডেকে পাঠায়। সপ্তাহে তিনদিন, খুব বেশি হলে চারদিন। শুধুই শঙ্করী নয় দলের সবার সঙ্গে দেহির বেশ ভাব জমে গেছে। রঙমহলের অফিসে ঢুকতেই সকল নাটকের ছবি দেয়ালে সুন্দর করে টাঙানো। তার মধ্যেই দেহি ও শ্রীতমার চোখ আটকিয়ে ছিল বিশেষ একটি ছবিতে। দুই বাই দুই ফ্রেম বাঁধানো নাটকে অভিনীত নায়িকার ছবি। সিঁদুরে লাল রঙের রূপালি সুতোর ভারী কাজ করা শাড়ি ও উজ্জ্বল নীল কাজ করা ব্লাউজ, সারা দেহ সুসজ্জিত গয়নায় ভূষিত। ছবিতে ধোঁয়ার মধ্য থেকে বেরিয়ে আসছে, নায়িকা দুর্গা রূপে। ডান হাতে নীলপদ্ম ও বামহাতে ত্রিশূল নিয়ে কোনাকুনিভাবে উপরের দিকে তাকিয়ে। ছবির নীচে লেখা “দেবী মাহাত্ম্য” অর্থাৎ নায়িকা আর অন্য কেউই নয়, দেহি ও শ্রীতমার মা, ডি.আই.জি দামিনী সেনসরকার।
রিহার্সাল শেষ হতে হতে রাত্রি সেই এগারোটা। বাড়ি ফিরতে আরও মিনিটসাতেক। দেহি একাই গাড়ি নিয়ে ড্রাইভ করে বাড়ি যাতায়াত করে। শ্রীতমাও তেমনই, কিন্তু মাঝেসাঝে শ্রীতমার স্বামী বিজয় এসে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। তেমনই আজ রিহার্সাল শেষে বাড়িতে ফিরে পোশাক বদলে নস্যি রঙের নাইটগাউন গায়ে চড়িয়ে একটা সিগারেট জ্বেলে ঘরে পায়চারি করতে থাকে। এক অদ্ভুত চিন্তা যেন দেহির মুখে ধরা দিয়েছে। ঘরের ঘড়িতে টিকটিক শব্দে সাড়ে এগারোটার ঘর পেরোয়। যশ এখনও ব্রাঞ্চ থেকে ফেরেনি। ঘর অন্ধকার। কাচের জানালা খোলা আর তার মধ্যে দিয়েই চাঁদের নীল আলো এসে পড়েছে দেহি ও যশের শোবার ঘরে। পনে বারোটা নাগাদ বড় গেটের সামনে বাইকের হর্ন ও গেট খোলার শব্দে দেহি বুঝতে পারে যশ দপ্তর থেকে ফিরল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ঘরের দরজা খুলে যশ ঢুকতেই দেহি ভ্রূ কুঁচকে মুখ ঘুরিয়ে জানালার দিকে চলে যায়। যশ ঘরের আলো জ্বেলে, নিজের কাবার্ড খুলে একটা হলুদ গেঞ্জি আর নীল ট্রাকশুট বের করে নিয়ে বাথরুমে ঢোকে। ঘরে কেবলই ঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া কিছুই নেই। না স্বামীর কোনো কথা না বউয়ের। যশ বাথরুমে ঢুকতেই দেহি স্যুইচবোর্ডের কাছে গিয়ে ঘরের আলো নিভিয়ে খাটে শুয়ে পড়ে। কিন্তু চোখের পাতা বন্ধ নয়, তাকিয়ে আছে আকাশের চাঁদের দিকে। একটু শীত শীত করলেও, অসম্ভব হাত, পা, পায়ের গোঁড়ালি ব্যথা করছে দেহির। রিহার্সালে থাকাকালীনই কপালের বাঁদিকটা ধরে ছিল। নাক দিয়ে বেরোচ্ছে উষ্ম নিঃশ্বাসও। মিনিট পনেরো পর বাথরুমের দরজা খুলে যশ বেরিয়ে এসে দেখে দেহি জানালার দিকে পাশ ফিরে শুয়ে। আলো না জ্বালিয়ে ঘরের দরজা খুলে সোজা নীচের ডাইনিং প্লেসে চলে যায় যশ।
যশের মা পৃথা ডাইনিং টেবিলে খাবার বেড়েই রেখেছিল। যশ হাত ধুয়ে টেবিলের সামনে চেয়ার টেনে বসতেই পৃথা ভাতের প্লেট এগিয়ে দেয় যশের দিকে।
— “মামণি খেয়েছে বাড়ি ফিরে?” যশ কথাটা জিজ্ঞাসা করতেই পৃথা একটু কড়া গলায় বলে ওঠে, “না খাওয়ার তো কিছু নেই বুবুন। তোমার বউ তো তোমার অপেক্ষা করে না। নিজেই নিয়েথুয়ে খেয়ে এঁটো প্লেটটা টেবিলের উপর রেখে চলে যায়। আমি আছি তো মাজার জন্য। তোমার চিন্তা না করলেও চলবে বাবা।”
— “তোমাদের খুব বড় ক্ষতি আমি করেছি মা।” ভাতের দিকে তাকিয়ে পলক না ফেলে যশ বলে।
— “আমাদের নারে। সব থেকে বড় ক্ষতিটা হয়েছে তোর। মাঝে মাঝে চিন্তা হয় রে। আমি আর তোর বাবা কতদিন? বয়সটা হচ্ছে। তারপর? সাধ করে, রূপগুণ দেখে ঘরে ছেলের বউ আনলাম। কী পেলাম?”
— “ছাড়ো। বাদ দাও মা।”
— “ছেড়েই তো দিয়েছি। শাশুড়ি হয়েও কোনো কাজে বাঁধা দিয়েছি আজ পর্যন্ত? আর আমি তো সেরকম শাশুড়ি নই যে বউয়ের উপর ফৌজদারি করব। খেয়ে নে, রাত হয়ে যাচ্ছে।”
আর একটা কথাও না বলে ধীরে ধীরে যশ খেতে থাকে। খাওয়া শেষ করে নিয়ে ঘরে ফিরতে ফিরতে যশের সময় লাগল পায় আধাঘণ্টা। আলো না জ্বালিয়ে কাঠের আলমারি খুলে, একটা চাদর ও বালিশ বের করে, সেটা মেঝেতে বিছিয়ে বালিশে মাথা রেখে একদৃষ্টে দেহির দিকে তাকিয়ে থাকে। ফুলশয্যার রাতেই এইঘরেই যে স্ত্রী-স্বামী সামনে সিঁথির সিঁদুর লেপটে, হাতের শাঁখাপলা ভেঙে বলে বিয়েটাই মানে না, তার প্রতি কী আশা রাখবে সেই স্বামী? প্রথম দেখাতেই যাকে ভালোবেসে ফেলেছিল, সে কী অপরাধে দিনের পর দিন এই শাস্তি তাকে দিয়ে চলেছে, সেটা আজও প্রশ্ন যশের কাছে। এসব চিন্তা করতে করতে কখন ঘুমটা চলে এলো যশ তা বুঝতে পারল না।
ঘুমটা হঠাৎ ভাঙল একটা অস্ফুট স্বরের শব্দ শুনে। মেঝে থেকে উঠে খাটের দিকে তাকাতেই দেখে দেহি খাটের উপর আড়মোড়া কাটছে আর মুখ থেকে অদ্ভুত রকমের শব্দ বের করছে। মুহূর্তের মধ্যে ঘরে আলো জ্বেলে যশ দেহির কাছে এগিয়ে যায়। “মামণি...!” বলে ডাক দিয়ে দেহিকে ছুঁতেই যশ হাত সরিয়ে দেহির দিকে তাকিয়ে থাকে। দেহির সারা শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। ঘরের কাচের আলমারির থেকে থার্মোমিটার বের করে সেটার পারদটা ঝাঁকিয়ে নামিয়ে নিয়ে বহুকষ্টে দেহির জিভের তলায় রাখে যশ। মিনিটতিনেক পর থার্মোমিটার মুখের থেকে বের করে যশ দেখে একশো তিন দশমিক ছয় ডিগ্রি ফারেনহাইট। মাঝেমধ্যে ঠান্ডায় কেঁপে কেঁপে উঠছে দেহি। মুহূর্তের মধ্যে ঘরের এসি বন্ধ করে, দরজা খুলে নীচে চলে যায় যশ। রান্নাঘর থেকে একটা কাচের বাটিতে জল ভরে উপরে ঘরে আসে। ডেক্সের উপর রাখা ওয়ালেটের পাশে নিজের সাদা নীল চেক রুমালটা নিয়ে দেহির কপালে জলপট্টি দিতে থাকে যশ।
ঘরে জ্বরের ওষুধ ছিল। ওষুধের বাক্স থেকে দুটো ট্যাবলেট নিয়ে জল দিয়ে কোনোরকমে দেহিকে খাইয়ে আবার জলপট্টি দিতে থাকে। পায়ের চেটোর কাছে গিয়ে যশ কোলের উপর দেহির পা তুলে নিয়ে একনাগাড়ে ঘষতে থাকে সামান্য আরোগ্যর তাগিদে।
দেহির ঘুমটা ভাঙল একটু সকালের দিকে। চোখ মেলে খাটের পায়ের দিকে তাকাতেই দেহি চমকে ওঠে। যশ পায়ের কাছে মাথা রেখে শুয়ে। রাগে মুহূর্তের মধ্যে ডান পা দিয়ে যশের মাথায় লাথি মারতেই যশ একটা জোরে চিৎকার দিয়ে ছিটকে পড়ে ঘরের মেঝেতে।
— “কোন সাহসে খাটে এসেছ তুমি?” দেহি রেগে বলে ওঠে।
যশ মাথায় হাত রেখে দেহির দিকে তাকাতেই দেহি আবার বলে, “কাল আমার শরীরটা সামান্য খারাপ থাকায় আমার উপর...!”
— “মামণি, কীসব বলছ?”
— “ঠিক বলছি।”
— “কাল রাতে জ্বরে কাতরাচ্ছিলে।”
— “তো? মরে যেতাম। পড়ে থাকতাম। তোমার সাহস কী করে হল আমাকে ছোঁয়ার?” কথাটা বলে খাট থেকে নেমে ড্রেসিং টেবিল কাছে এগিয়ে একটা ধারালো চুলের কাঁটা হাতে তুলে মুহূর্তের মধ্যে যশের কাছে গিয়ে যশের ডান হাতের তেলোয় চালিয়ে দেয়।
— “আহঃ...!” যশের হাত কেটে রক্ত।
— “দ্বিতীয়দিন যদি আমাকে আর একবার ছোঁয়ার চেষ্টা করো, মনে থাকে যেন গলার নালি কেটে রেখে দেব।” রাগে কাঁপতে কাঁপতে কথাটা বলে বাথরুমে ঢুকে যায় দেহি।
যন্ত্রণায় ক্ষতস্থানে হাত চিপে যশ জানালার দিকে এগিয়ে যায়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন