শান্তনু দাশ
— “ধরে নিন আমার দেহের শোভিত স্বর্ণলংকারগুলি দেখানোর তরেই পরিধান করেছি। আর সত্যি কথা বলতে স্ত্রীলোকের গয়না থাকলে সে আর পাঁচজনকে না দেখিয়ে বাঁচে না। বুঝেছেন? এবারে চলুন নবকুমারবাবু, আপনার পত্নী, কপালকুণ্ডলার সহিত সাক্ষাৎ সেরে আসি।” নাটকের সংলাপ, কো-আর্টিস্টকে দেহি বলে শেষ করতেই দলের বাকি অভিনেতা অভিনেত্রীরা হাততালি দিয়ে ওঠে। পরিচালক অবিনাশ পাল, “ব্রাভো ব্রাভো!” বলে সিন ডিভিশনে পেন দিয়ে রাইট চিহ্ন দেয়। সিনের অভিনয় শেষ করে নিজের গ্রিনরুমে এসে বসতেই শঙ্করী এসে জল দেয় দেহিকে।
— “আপনারা দুইবোনই কপালকুণ্ডলায় কাঁদাবেন।” শঙ্করী সামান্য হেসে কথাটা বলে।
দেহি বোতলের থেকে সামান্য জল খেয়ে নিয়ে বলে, “শঙ্করী এই সিনের যে ব্লাউজটা আমায় দিয়েছ সেটার পুট একটু বাড়াও। খুবই টাইট।”
— “আচ্ছা। কয়েকদিন ধরে আপনাকে একটা কথা বলব বলব করছিলাম। ভয়ে বলতে পারছি না।”
— “কী ব্যপারে?” একটু অবাক হয়ে দেহি জিজ্ঞাসা করে।
শঙ্করী সামান্য দ্বিধা নিয়ে বলে, “আচ্ছা যারা খুন করেনি, অথচ জেলে আছে, তাদের মুক্তি পাওয়ার কোনো রাস্তা নেই?”
— “নিশ্চয়ই আছে।”
— “অবিনাশ বাবুর কাছে শুনেছি আপনি নাকি সত্যের পূজারিনী। আমি বলছি বউদি খুন করেনি মেজদাকে। খুন করতে পারে না। ঠিক মতো তদন্ত হয়নি। আপনি আমার বউদিকে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিন। আমি আমার সর্বস্ব আপনাকে দিয়ে আপনার ফিস মিটিয়ে দেব।” কথাটা বলেই নিজের গলায় পড়ে থাকা সোনার সরু চেনটা খুলে দেহির সামনে রাখতেই দেহি, “আরে আরে, শঙ্করী কী করছ?” বলে ওঠে। “আমার কিচ্ছু লাগবে না। বেশ যখন এত বিশ্বাস তোমার বউদির উপর, আমি দেখছি কী করতে পারি। কোন জেলে আছে প্রমীলা দেবী?”
— “তাহেরপুর।”
দেহি সামান্য চিন্তা করে নিয়ে, শঙ্করীর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, “আচ্ছা প্রমীলা দেবীর সপক্ষে একজন অ্যাডভোকেট তো ছিলেন। তার নাম মনে আছে?”
— “না। তবে...!”
— “তবে?”
— “এই কেসের যিনি তদন্ত করেছিলেন, যার অ্যাভিডেন্সের উপর ভিত্তি করেই বউদির জেল হয়, সেই ইন্সপেক্টরের নাম মনে আছে আমার। কিন্তু, বউদির শেষ শুনানির আগেই ওই ইনচার্জ বদলি হয়ে যান।”
— “কী নাম সেই ইন্সপেক্টরের?”
দেহি প্রশ্ন করতেই সময় নিয়েই শঙ্করী বলে ওঠে, “ইন্সপেক্টর রূপম সেন।”
— “কী নাম বললে?” দেহির মুখের ভাব বদলে গেছে। এক অদ্ভুত নমনীয়তা দেহির মুখের উপর ভেসে ওঠে। “রূপম সেন?”
— “হ্যাঁ দেহি দেবী।”
হঠাৎ সহ-পরিচালক দীপক ঘরে এসে বলে ওঠে, “দেহি দেবী, আপনাকে একটু মিউজিসিয়ানদের সাথে বসতে হবে। গানের তালের কী সমস্যা হচ্ছে যেন।”
সকাল নটার সময় ঘরের ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আই পেন্সিল দিয়ে সুন্দর করে চোখটা আঁকতে থাকে দেহি। পরনে কালো এয়ারহোস্টেস কোট আর কালো রঙের শর্টস স্কার্ট। কোমর ছাড়ানো ঘন লম্বা চুলটাকে মাথার মাঝখানে এনে একটা সাদাকালো দাবার ছকের মতো দেখতে গাডার বেঁধে চুলছেড়ে রেখেছে, হাতের লম্বা নখে গাঢ় কালো রঙের নেলপলিশ, চোখে ধূসর রঙের লেন্স। চোখ আঁকা শেষ করে সিঁদুরেলাল রঙের ম্যাট লিপস্টিক দিয়ে ঠোঁটটা এঁকে নেয়। কানে সরু চেনের মতো লম্বা সিলভার রঙের কানের। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময়টা দেখে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের ডেক্সের উপর রাখা রূপালি মেটালের হাতঘড়িটা বাঁহাতে উলটো করে পরে নিয়ে ঘরের দরজা খুলে হাইহিল জুতোর খটখট শব্দ করে নীচের দিকে নেমে যায়।
ড্রাইভার সলীল একটা ছোটো কাপড় হাতে নিয়ে গাড়ির কাচটা ভালো করে মুচ্ছিল। দেহিকে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসতে দেখেই কাজ থামিয়ে গাড়ির দরজা খুলে দেয়। দেহির বাঁহাতে একটা সাদা রঙের অফিসিয়াল ফাইল আর ফাইলের সঙ্গে হাতের দুই আঙুলের মাঝে সাদা রঙের ছোট ফাউনটেন পেন এবং ডান হাতে দাবার ছকখাটা হ্যান্ডপার্স। গাড়ির ভিতরে ঢুকে বসতেই ড্রাইভার সলীল স্টেয়ারিং সীটে বসতেই, দেহি পিছন থেকে, “তাহেরপুর জেল।” বলে ওঠে। সলীল কথামতো গাড়ি স্টার্ট দেয়।
“ধ্বনিল আহ্বান মধুর গম্ভীর, প্রভাত অঙ্গণ মাঝে— দিকে দিগন্তে ভুবন মন্দিরে শান্তি সংগীত বাজে...।”
খুব আস্তে একটা রবীন্দ্রসংগীত গাড়িতে বাজছে। দেহি হাতের সাদা ফাইলটা খুলে একটা একটা করে পাতা উলটে পড়ে চলেছে।
তাহেরপুর ঢুকতে সময় নিল প্রায় আড়াইঘণ্টার মতো। সুবিশাল পুরোনো জেলখানা। উপরে ইংরাজীতে লেখা— “ESTD:— 1890।” গাড়ি জেলের সামনে দাঁড়াতেই দেহি ফাইল হাতে গাড়ি থেকে নেমে নিয়ে সলীলকে বলে, “আমার সময় লাগবে। তুমি আশেপাশে বেরিয়ে যাও। খাওয়াদাওয়া করো। ঠিক দেড়ঘণ্টা পর নিতে আসবে।”
— “ঠিক আছে ম্যাডাম।” সলীল বলে নিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে, ঘুরিয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায়।
জেলের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর শিবানী নন্দী। শিবানী নন্দীর ঘরের দরজার সামনে দেহি দাঁড়াতেই শিবানী নন্দী, “আসুন ম্যাডাম, বসুন।” বলে ওঠে। দেহি ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসতেই শিবানী একগাল হেসে বলে, “গতকাল মিহির স্যার ফোন করে বলেছিল আপনি আসবেন।”
— “হ্যাঁ, আমি মিহিরদাকে বলতে বলেছিলাম।” দেহি বলে। “প্রমীলা দত্ত কত নম্বর সেলে?”
— “তিনশো দুই। চলুন।” বলে নিয়ে ইন্সপেক্টর শিবানী নন্দী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, সঙ্গে দেহিও।
সেলের পথে যেতে যেতে দেহি, শিবানীকে জিজ্ঞাসা করে, “প্রমীলা দত্ত কোনো অশান্তি করে এখানে?”
— “না ম্যাডাম। খুব চুপচাপ। খুব দরকার না পড়লে কারোর সাথে তেমন কোনো কথা বলে না। প্রথম কয়েকদিন সেলের বাকি মেয়েরা টর্চার করত কিন্তু প্রমীলার ব্যবহার এতই শান্ত যে তারা নিজের থেকেই সেটা বন্ধ করে দিয়েছে। এখানে ফুলের বাগান দেখাশোনার কাজ প্রমীলাই করে।”
— “তাহলে এখন তো প্রমীলা বাগানে।”
— “হ্যাঁ। আমি কনস্টেবল মীরাকে বলে দিয়েছি। ডাকতেও চলে গেছে। প্রমীলাকে এখানেই নিয়ে আসবে।” কথাটা শেষ হতে না হতেই কনস্টেবল মীরা, সঙ্গে করে প্রমীলাকে নিয়ে আসে। প্রমীলার চুল উশকোখুশকো। গালে ও হাতে মাটি লেগে আছে আর পরনে ধুলো লাগা নীলপাড়ের সাদা শাড়ি ও সাদা ব্লাউজ। প্রমীলা সেলের কাছে এসে দাঁড়াতেই শিবানী নন্দী বলে ওঠে, “উনি তোমার সাথে কথা বলবেন। যা জিজ্ঞাসা করবেন তার উত্তর দেবে।” বলেই দেহির দিকে ঘুরে শিবানী দেহির উদ্দেশ্যে বলে, “মীরা রইল। কিছু দরকার পড়লে ওকে বলবেন।”
— “তার দরকার পড়বে না, মীরা দেবীর না থাকলেও চলবে।” দেহি বলে।
আর কথা না বাড়িয়ে মীরা আর ইনচার্জ শিবানী চলে যায়। অন্যদিকে দেহি তিনশো দুই নম্বর সেলের ভিতরে প্রমীলাকে নিয়ে ঢোকে। সিমেন্টের একটা বেদীতে দেহি বসে নিয়ে বলে ওঠে, “আমায় আপনি চিনবেন না। কিন্তু যার কথায় আমি আপনার সাথে দেখা করতে বা কথা বলতে এসেছি তাকে আপনি অবশ্যই চিনবেন।”
দেহির কথাটা শুনেও যেন প্রমীলা শুনল না। নীরবে মাথা নত করে সেলের মেঝের দিকে তাকিয়ে।
— “আপনি বসুন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না।” দেহি বলতেই বাধ্য মেয়ের মতো প্রমীলা দেহির পাশে বেদীর উপর বসে। দেহি ছোট্ট একটা হাসি হেসে বলে, “আমি এসেছি একজন মানুষের সাথে কথা বলতে, কোনো কাঠপুতুলের সাথে না। আমি যা জিজ্ঞাসা করব তার যে সবই বলতে হবে এমন কেউ মাথার দিব্যি দেয়নি। আপনার যেটা মনে হবে বলবেন, যেটা মনে হবে না, সেটা বলবেন না।”
প্রমীলা চুপ করে থাকে। দেহি বলে, “শঙ্করী পালকে চেনেন?” নামটা শোনামাত্রই প্রমীলা চমকে উঠে দেহির দিকে তাকাতেই দেহি শান্ত গলায় বলে, “হ্যাঁ। ওই শঙ্করী আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছে।”
— “কেমন আছে ও? ওই বাড়িতে অত্যাচার করছে না তো ওর উপর?” গলায় একটা ভয় মেশানো কাঁপা স্বরে প্রমীলা প্রশ্নটা করে।
দেহি আগের মতোই একইভাবে উত্তরে বলে, “না। দত্তবাড়িতে ও এখন আর কাজ করে না। আপনার হয়ে সাক্ষী দিয়েছিল বলে, ওকে ওই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এখন ও রঙমহল থিয়েটারে মেকআপ অ্যান্ড ড্রেস ডিজাইনের কাজ করে। এই রংমহলেই আমার সাথে আমার পরিচয়।”
— “আপনি?”
— “আমি কে, সেটা পরে জানলেও চলবে। আপনি আমার প্রশ্নের উত্তরগুলো দিন।”
— “বলুন।”
— “দত্তবাড়ির মেজছেলে কীভাবে মারা গেল বা বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল এসব আমার জানা। আমার প্রশ্ন, যে রাতে কৌশিক দত্ত মারা যায় সেই রাতে আপনি কৌশিক বাবুর সঙ্গে দেখা করেননি। আপনি আপনার জবানবন্দিতে বলেছিলেন। পুলিশ জানতে চায় আপনি ছিলেন কোথায়, সেই উত্তর আপনি দেননি। ওই প্রশ্নটাই আমি করছি। কোথায় ছিলেন আপনি?”
প্রশ্নটা শুনে প্রমীলা একটা ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে বলে, “কী হবে জেনে? আমি খুন করেছি এটাই সবাই জানে, সবাই মানে। আপনি না বললেও আমি জানি আপনি কোনো রিপোর্টার। আমার কথাশুনে মিডিয়াতে উছলাবেন, কিছুদিন লোকেরা হাই হাই করবে তারপর যেই কে সেই। নতুন করে কিছুই হবে না।”
প্রমীলার কথাগুলো শুনে দেহি পার্সের ভিতর থেকে সিগারেট বের করে নিয়ে তার থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে নাক দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলে, “কী হবে, সেটা আমার উপর ছাড়ুন। আপনি বলুন। কোথায় ছিলেন সেইদিন?”
— “আমি ওই রাতে ঠাকুরঘরে ছিলাম।”
— “একা?”
— “না।”
— “সাথে কে ছিল?”
— “দীপিকা।”
— “রাত দেড়টায় সময় এমন কী জরুরি আলোচনা করছিলেন দুই সতীনে?”
প্রমীলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তরে বলে, “দত্তপরিবারে একটা বাচ্চার খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল আর আশীষের পক্ষে সেটা সম্ভব ছিল না।”
— “জানি আশীষ বাবু বন্ধ্যা পুরুষ। সোজা ভাষায় যাকে বলে ধজ।”
— “হ্যাঁ। কিন্তু দীপিকার উপর সেক্সুয়াল টর্চার আশীষ দিনের পর দিন বাড়িয়ে চলছিল। আশীষ বুঝতেই চাইছিল না যে ওর দ্বারা বাচ্চা হবে না। তাই ওই রাতে আমি দীপিকার সাথে কথা বলতে গিয়েছিলাম এর সমাধানের উপায় নিয়ে।”
— “সমাধানটা কী?” দেহি প্রশ্ন করতেই প্রমীলা মাথা নামিয়ে ঠোঁট কামড়াতেই, দেহি সামান্য হেসে বলে, “আমি বলি?”
আতঙ্কে চোখ বড় বড় করে প্রমীলা দেহির দিকে তাকাতেই দেহি বলে, “কৌশিক বাবু। কী তাই তো?”
প্রমীলা মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ” করে বলে, “দীপিকা, আমার আর কৌশিকের সম্পর্কের কথা জানত আর কৌশিককেও আমি জানিয়ে ছিলাম যে দীপিকা জানে। আমি কৌশিককে বলি, দীপিকার সাথে ইনটিমেট হয়ে ওকে প্রেগন্যান্ট করলে ও আশীষের হাত থেকে বাঁচবে। প্রথমে কৌশিক আপত্তি জানালেও পরে রাজি হয়। এই কথাটাই ওইদিন দীপিকাকে বলতে গিয়েছিলাম।”
— “আর দীপিকা দেবী রাজি হয়েছিলেন?”
— “হ্যাঁ।”
— “তার মানে ওই দিন রাতে আপনি কৌশিকবাবুর কাছে যাননি, গিয়েছিল দীপিকা দেবী?”
— “হ্যাঁ।”
— “এই কথাটা না জানানোর কারণ?”
— “আমি চাইনি আশীষ জানুক। আমার কথা তো ইন্সপেক্টর রূপম সেন বাড়িতে জানাতে বাধ্য হয়েছিল। এবার আমার সাথে দীপিকাও, তাই চুপ করে গেলাম।”
— “এই সম্পর্কের কথা দত্তবাড়ির ছোটবউ দ্যুতি দেবী জানল কী করে?”
— “আমি বলতে পারব না। আমি নিজেও অবাক হই যখন জানতে পারি যে দ্যুতিও জানে।”
সিগারেটটা মেঝেতে ফেলে জুতোর চাপে সিগারেটের আগুন নিভিয়ে দেহি বলে ওঠে, “কাজের লোক শম্ভু নাথের খুনের সময় আপনার ব্লাউজের টুকরো ওর হাতে পাওয়া যায়। সেটা কীভাবে?”
— “বিশ্বাস করুন আমি সত্যিই জানি না। শম্ভু কাকা বাবার সবথেকে কাছের লোক ছিল। তিরিশ বছর ধরে ওই বাড়িতে। যেদিন শম্ভুকাকার বডি পাওয়া যায় তার আগের দিন রাতে বাবার সাথে শম্ভু কাকার অনেকক্ষণ কথা হয়েছিল।”
— “কী কথা?”
— “আমি শুনতে পাইনি কারণ খুবই আস্তে কথা চলছিল আর তার উপরে দরজা বন্ধ।”
— “কৌশিকবাবু খুন হবার আগে আপনার নামে উইল করেছিল কেন?” কথাটা শুনেই প্রমীলা নিজের মাথায় দুই হাত রেখে বলে ওঠে, “এইটা কেন করল আমি নিজেও জানি না। আমাকে বলেইনি। আর এই উইল বেরোবার পরই বাড়ির সকলে জানতে পারল আমার আর কৌশিকের সম্পর্কের কথা।”
— “উইল বার হল কীভাবে?”
— “দ্যুতি। দ্যুতিই, রূপম বাবুকে বলেছিল, যে ও নাকি কৌশিকের কাছে উইল দেখেছে। কিন্তু ঘরের আলমারি ও দেরাজ ঘেঁটেও উইল পাওয়া গেল না। উইল পাওয়া গেল খাটের তলায়। খাটের নীচের তক্তার সাথে আটকানো ছিল।”
— “শেষপ্রশ্ন, আপনি খুন করেছেন?” দেহির এইরকমই অদ্ভুত প্রশ্নে প্রমীলা অবাক হয়ে দেহির দিকে তাকাতেই দেহি নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে বেশ গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, “প্রমীলা দেবী প্রথমেই বলি আপনার ধারণা ভুল। আমি কোনো নিউজ রিপোর্টার নই। আমার নাম দেহি, অ্যাডভোকেট দেহি। শঙ্করীর বিশ্বাস আপনি খুন করেননি। আগে কী হয়েছিল কীভাবে তদন্ত চলেছিল আমার জানা নেই। কিন্তু এবার নতুন ভাবে আবার দত্তবাড়ির রহস্যের তদন্ত শুরু হবে। আমি আপনার কেস আদালতে রিওপেন করাব। বেল করাতে পারব কি না এই মুহূর্তে বলতে পারছি না, তবে আমি যেটা মানি সেটা হল, সত্যমেব জয়তে। আবার দেখা হবে।” একাধারে কথাগুলো বলে সেলের দরজা খুলে সেল থেকে বেরিয়ে যায় দেহি। অন্যদিকে প্রমীলা বিহ্বলদৃষ্টে দেহির চলন অন্বেষণ করতে থাকে।
হঠাৎ আকাশ সেজে ঘনবর্ষার সমাগম ঘটাল প্রকৃতিতে। বৃষ্টি উপেক্ষা করে দেহির গাড়ি ছুটে চলেছে তাহেরপুর থেকে কলকাতার দিকে। গাড়ির কাচের থেকে বাইরের বৃষ্টি দেখে চলেছে দেহি। শুধু বাইরে নয় গাড়ির ভিতরেও চলছে বারিবর্ষণ। দেহির চোখ লাল। দুই চোখ দিয়ে অঝোরে ঝরে চলেছে জল। চোখের পলক পড়ছে না বললেই চলে। চোখের উপর ভেসে উঠছে গভীর এক চিন্তা।
_________________________________
এয়ারপোর্টের বাইরে বাইক স্ট্যান্ড করে তার উপর বসে রয়েছে রূপম। পরনে কালো শর্টশার্ট আর সাদা ঘেষা আকাশী জিন্স। কিছু দূরে বড় গাড়ির থেকে দেহি নেমে গাড়ির ডিকি থেকে একটা বড় সাইজের ট্রলি বের করে ডিকির ঢাকনা নামিয়ে ড্রাইভারের কাছে গিয়ে কিছু বলতেই ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে চলে যায়। রাত সাড়ে বারোটা। আমেরিকার ফ্লাইট ছাড়বে রাত দেড়টায়। ট্রলি টেনে নিয়ে রূপমের কাছে এসে দেহি দাঁড়াতেই রূপম হালকা করে দেহির দিক থেকে মুখটা ঘুরিয়ে নেয়।
— “এইরকম মুখ দেখে যেতে কারোর ভালোলাগে?” দেহি ঠোঁটের কোণায় ছোট্ট একটা হাসি হেসে জিজ্ঞাসা করে ওঠে। মাথার চুল সুন্দর করে বড় খোঁপা করা। পরনে আকাশী ও উজ্জ্বল নীলে কাজ করা লং কুর্তি এবং কালো টাইট জিন্স, পায়ে কালো হিল জুতো।
দেহির প্রশ্নে কোনো উত্তর না দিয়ে একইরকমভাবে অন্যদিকে রূপম তাকিয়ে থাকতেই দেহি আবার বলে ওঠে, “পুলিশবাবু, আমি না গেলে সেরা অ্যাডভোকেট হব কী করে? একবার আমার দিকে তাকাও। দেখো আমাকে। তোমার দেওয়া ড্রেসটা পড়ে ভালো লাগছে কি না বলো?”
রূপম চুপ করে অন্যদিকে তাকিয়ে। দেহি রূপমের কাছে দুই পা এগিয়ে দুইহাতের তেলোয় রূপমের মুখটা ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে শান্ত গলায় বলে, “এমন হবে জানলে, আমি মা আর মণিকে সাথে নিয়ে আসতাম। আসতে চেয়েছিল, তোমার জন্য আটকালাম। কেন এরকম করছ?” কথাটা বলে দুইবাহুতে রূপমকে জড়িয়ে ধরতেই, রূপম দেহির কোমর দুই হাতে চেপে ধরে বলে, “কী করছ, লোকে দেখছে।”
— “দেখুক, এটা আমার ডায়লগ হবার কথা।” দেহি রূপমের কাঁধে মাথা রেখে বলে। “ছটা তো মাস, দেখতে দেখতে কেটে যাবে।” বলে নিয়ে রূপমের কাঁধ থেকে মাথা তুলে দেহি আবার বলে ওঠে, “তোমার নৈহাটি ব্রাঞ্চে ট্রান্সফার হচ্ছে তাই না?”
— “হ্যাঁ।”
— “ভালোই, বাপ যেখানে কাজ করত ছেলেও সেখানে করবে। সাহস করে এর মধ্যে বাবাকে আমার কথা বলো। কে বলতে পারে, ফিরে এসে শুনলাম বিয়ে করে বসে আছো?”
— “উফফ। তোমার মুখে কিছু আটকায় না?”
— “না।”
— “অন্য মেয়েকে বিয়ে করতে যাব কেন?”
— “না বলছি এই কারণে, তিনবছর হয়ে গেল বাবাকে আমার কথা ভয়ে বলতে পারোনি। এবার অন্তত বলো। দেখো কী বলে।”
রূপম সামান্য হেসে নিজের বুকে দেহিকে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে, “তুমি তোমার মাকে খুব ভালোবাসো তাই না?”
— “খুব। মা আমার আদর্শ রূপম। মা নিজের আদলে আমাকে তৈরি করেছে। আমি ফিরে এসে মাকে তোমার কথা জানাব।”
— “আর তোমার মা যদি না মানে?”
— “রূপম, মা কোনদিন আমার কথা রাখেনি এমনটা হয়নি। ঠিক মানবে।”
গাড়ির একটা বড় ঝাঁকুনিতেই দেহির ঘোরটা কাটে। তাকিয়ে দেখল সলীল, বাড়ির গেটের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়েছে। বৃষ্টি অনেকক্ষণ আগেই ধরে গেছে। গাড়ি থেকে নেমে দেহি ঢুকে গেল শ্বশুরবাড়ি, সোনারতরীতে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন