চতুর্থ পরিচ্ছেদ

শান্তনু দাশ

সন্ধ্যাতে শুভ্রা, দেহির ফোন পেয়ে কলকাতার চেম্বারে দেখা করতে এলো। দেহির কাছে দত্তবাড়ির খুনের যাবতীয় বৃত্তান্ত শুনে নিয়ে শুভ্রা বলে, “যাই বল মামণি ঠিক করছিস না।”

— “কেন?” দেহি টেবিলের উপর রাখা পেপারওয়েটটা আঙুলের মাঝে ঘোরাতে ঘোরাতে বলে ওঠে।

— “তদন্তে যদি সত্যিই প্রমীলা খুনি বেরোয় তোর ইমেজ কী হবে বুঝতে পারছিস? প্রেস পুরো নাঙ্গা করে ছেড়ে দেবে।” কথাটা শুনে দেহি একটা তির্যকসূচক হাসি হেসে বলে, “আমাকে নাঙ্গা করতে পারবে সে এখনও মায়ের পেটে। “

— “কিন্তু এই কেস রিওপেন করাতে কলকাতা হেডকোয়ার্টারের পারমিশন লাগবে। তারাও নতুন করে ইনভেস্টিগেশন করবে। আর আ্যপ্লিকেশন করে পারমিশন করাতে দুইমাসের উপরে বেরিয়ে যাবে।”

— “সেটা আমার ভাবনা। তুই যেটা করবি সেটা হল কাল একবার ফরেনসিক ডিপার্মেন্ট যাবি আর কৌশিক দত্ত ও শম্ভু নাথের পি.এম. রিপোর্টটা তুলতে। কোর্ট থেকে দত্তবাড়িতে নোটিস যাবে। আমাকে পি.এম. রিপোর্টটা দেয়নি ডিপার্মেন্ট থেকে। একবার মেধাকে দিয়ে এই রিপোর্ট ভেরিফিকেশন করাব। দেখি বিয়ের পর বুদ্ধিটা খুলল নাকি মরচে পড়ল ওর।”

— ওর বিয়েতে তো গেলি না।”

— “কী করে যাব? তখন আমি এখানে? আমি তো জামসেদপুরে কেসের ব্যাপারে। যাইহোক তুই পোস্টমর্টেম রিপোর্ট তোল আমি পারমিশনের ব্যাবস্থা করছি।”

টিফিন আওয়ারে হাইকোর্টের বাইরে কার পার্কিংয়ের কাছে এসে চাবি দিয়ে গাড়ির দরজা খুলে গাড়ি স্টার্ট দেয় দেহি। গাড়ি ড্রাইভ করে দেহি সোজা পৌঁছালো কলকাতা ব্রাঞ্চে। গাড়ির দরজা খুলে গেট থেকে নামতেই ব্রাঞ্চের বাইরের অফিসার ও কনস্টেবলরা স্যালুট মেরে ওঠে। সামান্য হেসে মাথা নাড়িয়ে ব্রাঞ্চের ভিতরে ঢুকতেই একজন পরিচিত অফিসার দেহিকে দেখামাত্রই কাছে এগিয়ে এসে স্যালুট মেরে, “কী সৌভাগ্য, এখানে ম্যাডাম।” বলে ওঠে।

দেহি ভ্রূটা সামান্য কুঁচকে নিয়ে উত্তরে বলে, “আপনাদের ব্রাঞ্চ ইনচার্জের সাথে দেখা করতে চাই। যদিও অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল না।” দেহির কথাটা শেষ না হতেই অফিসারটি জিভ কেটে হেসে বলে, “কেন মজা করছেন ম্যাডাম। আপনি স্যারের ওয়াইফ আর আপনাকে স্যারের সাথে দেখা করতে হলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগে?”

দেহি মুখটা গম্ভীর করে কড়া গলায় বলে ওঠে, “আইনটা আইনের জায়গায় অফিসার।” বলে পার্সের ভিতর থেকে কার্ড বের করে অফিসারের হাতে দিয়ে দেহি বলে, “কার্ড নিন, গিয়ে বলুন আমি দেখা করতে চাই।”

অফিসার আর একটি কথাও না বলে, ভিতরের দিকে চলে যায়। মিনিট পাঁচেক পর দেহির সামনে এসে বলে, “আমি আগেই বলেছিলাম, আপনি মানলেন না। স্যার ডাকছে আপনাকে। সোজা গিয়ে ডানদিকে স্যারের রুম।”

দেহি সোজা ঘরের দিকে এগিয়ে দরজায় টোকা মেরে সামান্য দরজা খুলে, যশের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, “মে আই কামিং?”

— “প্লিজ।” দেহির দিকে না তাকিয়ে, যশ টেবিলে রাখা একটা ফাইলের পাতাগুলোয় সই করতে করতে উত্তরে বলে। অনুমতি পেয়ে ঘরে এসে দেহি দেখে, যশের ডানহাতে সাদা ব্যান্ডেজ করা, তার জন্য লিখতে বেশ অসুবিধাও হচ্ছে। যশ ফাইল থেকে চোখ না সরিয়ে শান্ত গলায় বলে, “বসো। চা, কফি, ঠান্ডা কী নেবে? কারণ তুমি যেটা খাও সেটা যদি ব্রাঞ্চে আনি তাহলে আমার যতটুকু সম্মান বেঁচে আছে সেটাও থাকবে না।”

— “নো থ্যাঙ্কস।” দেহি জায়গায় দাঁড়িয়ে বলে ওঠে।

ফাইলের থেকে চোখ উঠিয়ে দেহির দিকে তাকাতেই দেহি হাতের ফাইলটা যশের দিকে এগিয়ে দেয়।

— “কীসের ফাইল? আমাদের ডিভোর্স ফাইল করলে বুঝি?” যশ হেসে তামাশা করে প্রশ্নটা করতেই দেহি গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, “লিসন ইন্সপেক্টর আমরা বেডরুমে দাঁড়িয়ে নেই, ব্রাঞ্চে দাঁড়িয়ে। আর ডিভোর্স? নিশ্চিন্তে থাকো আর যাই করি, ডিভোর্স আমি কিছুতেই তোমায় দেব না। কাজের কথায় আসি?”

— “বসে বলো।”

— “ঠিক আছে। পাঁচ বছর আগে দত্তবাড়ির বড়বউ প্রমীলা দত্তের খুনের অভিযোগে যাবৎজীবন হয়। আমি ওই কেস কোর্টে রিওপেন করব। এই ব্রাঞ্চই সাত বছর আগে তদন্ত করেছিল। দুই বছর কোর্টে কেস চলে। এখন এই কেস রিওপেন করাতে এস.এস.পির পারমিশন লাগবে। আপনার বন্ধু এই এস.এস.পি. স্যার। তাই আমার কাজটা তাড়াতাড়ি শুরু হলে আমার মক্কেলের উপকার হয়।”

— “আর এই উপকার করে আমার লাভ?” যশ দেহির চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করতেই দেহি সামান্য হেসে হাতের পার্সটা খুলে ব্যাঙ্কের চেকবুকটা যশের দিকে ছুঁড়ে মেরে বলে ওঠে, “অ্যামাউন্ট আপনি ভরে নিন সিগনেচার আমি করে দিচ্ছি।”

— “তুমি কোনোদিন বদলাবে না, তাই না?”

— “দাম্পত্য জীবন নিয়ে কথা বলতে আমি আসিনি ইন্সপেক্টর।”

বাঁহাতে চেকবুকটা হাতে তুলে নিয়ে দেহির দিকে এগিয়ে যশ বলে ওঠে, “ভালো করেই জানো আমি ঘুষ নিই না মামণি, ধরো।”

দেহি হাতে চেকবুকটা নিতেই যশ বলে, “বেশি কিছু চাইনি, ভেবেছিলাম অন্তত আমার সাথে বসে এককাপ চা খেতে।”

— “অত সময় নেই আমার। আমি কবে আসব।”

— “বাড়িতে আজ রাতের মধ্যে হাতে পেয়ে যাবে।”

— “থ্যাংক্স।” — কথাটা বলে যশের ঘর থেকে বেরিয়ে যায় দেহি।

*************************************

মোহিতমঞ্চে নাটকের মহড়া বেশ জোর কদমেই আরম্ভ হয়ে গেছে। দেহি তার কো-আর্টিস্টদের সঙ্গে ভালোরকমই নিজের সংলাপ ঝালাই করে নিয়ে অভিনয় শুরু করে। দৃশ্যশেষে দেহি নিজের গ্রিনরুমে যেতেই শঙ্করী একটা লাল রঙের শাড়ি কস্টিউম দেহির কাছে আনতেই দেহি কপাল কুঁচকে, “এটা?” জিজ্ঞাসা করে ওঠে।

— “আপনার ড্রেস। আপনার নারী বেশের লাস্ট সিনের।” শঙ্করী হেসে বলে ওঠে। “যেখানে নবকুমার জানছে পদ্মাই তার প্রথমা স্ত্রী।”

ড্রেসের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে দেহি বলে ওঠে, “শঙ্করী আমি লাল পরি না।”

— “কিন্তু ম্যাডাম গল্পে স্ক্রিপ্টের সিনে বলা হয়েছে পদ্মা লাল রঙের পোশাক পড়েছে।”

— “স্ক্রিপ্টে কী আছে আমার জেনে লাভ নেই। আমি লাল রঙ পরা ছেড়ে দিয়েছি, ব্যস।” কথাটা শুনে শঙ্করী তাড়াতাড়ি গ্রিনরুম থেকে বেরিয়ে যায়। গ্রিনরুমের চেয়ারে পড়ে থাকা লাল রঙের কস্টিউমের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দলের পরিচালক অবিনাশ পাল শঙ্করীর কথা শুনে গ্রিনরুমের দরজা খুলে ঘরে এসে দেহিকে বলে ওঠে, “অ্যানি প্রবলেম দেহি দেবী?”

— “প্রবলেম কিছুই না। আমি লাল রঙ পরি না।”

— “কিন্তু...”

— “দেখুন অবিনাশ বাবু আপনি নাটকের খাতিরে আমাকে যা যা করতে বলেছেন করে চলেছি। এমন কি নবকুমারের ভূমিকায় যে অভিনয় করছে তার সাথে বোল্ড সিনও করছি কিন্তু এই কথা আমি রাখতে পারছি না। লাল আমি পরব না।”

— “তাহলে?”

— “ডালিম, মেরুন, যা খুশি দিন লাল নয়।”

দেহির কথা শুনে অবিনাশ পাল আর তর্ক না করে মাথা নাড়িয়ে ঘরের থেকে বেরোতে যাবে এমন সময় দেখে গ্রিনরুমের দরজায় শ্রীতমা দাঁড়িয়ে। একটা ছোট্ট হাসি হেসে অবিনাশ পাল চলে যেতেই শ্রীতমা ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকে দেহির সামনে এসে দাঁড়ায়।

— “কিছু বলবি?” শ্রীতমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেহি প্রশ্ন করতেই শ্রীতমা খুব শান্ত গলায় বলে ওঠে, “কত পরিবর্তন এসে গেছে তোর মধ্যে। এরকম তো ছিলি না। কেন করছিস?”

শ্রীতমার কথাটা শুনেই দেহি গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, “ছোট ছোটর মতো থাকো। বড়দের ব্যাপারে নাক না গলালেও চলবে।”

— “ছোট এখানে কেউই নয় দিদি। তুই কী মনে করছিস মায়ের কানে কিছু উঠছে না? কেন নিজের জীবনটাকে নিয়ে এইভাবে জুয়া খেলছিস? কার জন্য অপেক্ষা করছিস আর কেনই বা করছিস? বুকে হাত দিয়ে বলত আজ যদি তোর একটা মেয়ে থাকত আর সেই মেয়ে একটা বিবাহিত ছেলেকে ভালোবাসত, তুই মা হয়ে পারতি মেনে নিতে?” শ্রীতমার কথাটা শেষ হতে না হতেই দেহি চেয়ার ছেড়ে উঠে কষিয়ে শ্রীতমার বাঁ গালে চড় মারতেই শ্রীতমা ছিটকে পড়ে গ্রিনরুমের আয়নার সামনে।

— “এত বড় সাহস, আমার সামনে দাঁড়িয়ে তুই গলা তুলে কথা বলছিস?” রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে শ্রীতমার দিক থেকে মুখ ফেরাতেই শ্রীতমা উত্তরে বলে, “পুরোনো সময় মুঠো করে ধরে বসে রয়েছিস। যখন মুঠো খুলবি তখন শূন্য ছাড়া আর কিছুই তুই পাবি না। আর সাহসের কথাই যদি বলিস, কার উপর আঙুল তুলছিস? তুই নিজে কী করেছিলি? মায়ের গায়ে তুই হাত তুলিসনি? ফুলশয্যার রাতে যশদার গায়ে হাত তুলিসনি? আজ আমাকে বলছিস? আজ যদি ছোট হয়ে আমি তোর গালে কষিয়ে একটা চড় মারি, সম্মান থাকবে তোর? কিন্তু সেটা আমার শিক্ষায় পড়ে না। কারণ দামিনীর শিক্ষা এতটাও ঠুনকো নয়।”

কথাগুলো বলে শ্রীতমা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই দেহি মাথায় হাত দিয়ে চেয়ারে বসে পড়ে।

দেহির শ্বশুরবাড়ির নাম হল “সোনার তরী।” সর্বহারা বা নৃত্যবীণা বাড়ি দুটোতে থাকার সময় দামিনী, দুই মেয়ের জন্যই আলাদা আলাদা স্টাডিরুম বানিয়ে দিয়েছিল কিন্তু দেহির শ্বশুরবাড়িতে দেহির নিজস্ব কোনো কাজের ঘর নেই। নেই বলাটা ভুল, যশ অনেকবার দেহিকে ঘরের কথা জিজ্ঞাসা করেছিল কিন্তু প্রত্যুত্তরে দেহি নির্বাকরূপই বজায় রেখে গেছে। যে বাড়িটা নিজের বাড়ি মনে না করে হোটেল মনে করে থাকে সেখানে নিজের বলে কিছু আছে এটা দেহি মনেই করে না। তাই জন্য নিজের শোবার ঘরটাই দেহির কাজের ঘর বানিয়েছে। ছোট্ট একটা আর্কিটেক্ট স্টাইলের মেহগনি কাঠের টেবিল ও তার দুই ধারে দুটো ল্যাম্প। তলায় ছোট চাবি দেওয়া দেরাজ জাতীয় জিনিস। দেহি এতটাই নিজের প্রতি আত্মহংকারী, যে প্রতি মাসের এক তারিখে থাকা-খাওয়া বাবদ শ্বশুরের টেবিলে রেখে আসে। শাশুড়ি সংসারের কোনো কথা বলতে এলেই দেহি নিজের হ্যান্ডপার্সটা এগিয়ে দিয়ে জানিয়ে দেয় টাকা নিয়ে মুখ যেন বন্ধ রাখে। বারংবার এই ব্যবহার পেতে পেতে পৃথা আশা ছেড়েই দিয়েছে যে এই রায়চৌধুরী পরিবারে তার পরে দেহি সংসারের দায়িত্ব নেবে।

নিজের ঘরের বড় আলোটা নিভিয়ে আর্কিটেক্ট টেবিলের আলো জ্বালিয়ে একটা নীল রঙের চ্যানেল ফাইলে চোখ রেখে হাতে একটা অপ্সরা পেন্সিল নিয়ে একনাগাড়ে পড়ে চলেছে। মাঝে মাঝে পেন্সিলটা দিয়ে ফাইলের কাগজগুলোর বিশেষ জায়গায় আন্ডারলাইন করেছে। সময় যে রাত সাড়ে বারোটা পেরিয়ে গেছে সেদিকে খেয়াল নেই দেহির। যশ এখনও ফেরেনি ব্রাঞ্চের থেকে। হঠাৎ ঘরের দরজা দুটো টোকা মেরে, “বউদি।” ডাকটা দিয়ে ওঠে। বাড়িতে কাজ করে যে মেয়েটি তার নাম মঞ্জু, এ তারই ডাক।

— “দরজা খোলা।” দেহি ফাইলের থেকে মুখ না তুলে বলে ওঠে।

ঘরের দরজা ঠেলে মঞ্জু ভিতরে এসে দেহি কাছে ভয়ে ভয়ে এগিয়ে, আর্কিটেক্ট টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই, “বলো।” গম্ভীর কণ্ঠে দেহি বলে ওঠে।

মঞ্জু খুব ধিমিস্বরে বলে ওঠে, “বাড়িতে মামা-মামি নেই।” যশের মা আর বাবাকে মঞ্জু মামা ও মামি বলে সম্বোধন করে। “আজ দুপুরে ওঁরা বর্ধমানের বাড়িতে গেছেন। ফিরবে ওই তিন-চারদিন পর।”

মঞ্জুর কথাগুলো শুনে দেহি পড়া থামিয়ে মঞ্জুর দিকে তাকাতেই মঞ্জু একটা ঢোক গিলে ভয়ে চোখ বড় বড় করে বলে ওঠে, “ না, মানে, দাদার খাবার তো এতদিন মামি বেড়ে এসেছে। আজ...!”

— “তো বেড়ে রাখো।” দেহি মঞ্জুর কথা থামিয়ে কথাটা বলতেই মঞ্জু সঙ্গে সঙ্গে জানায়, “দাদা পছন্দ করে না। তাই তুমি যদি দাদার খাবার বেড়ে...।”

— “আমি ব্যস্ত আছি মঞ্জু। তুমিই দিয়ে দাও। আর আমি রান্না জানিও না, এসব কাজ আমি কোনোদিন করিনি। আর তোমার দাদার যদি তোমার বেড়ে দেওয়া খাবারে সমস্যা হয় তাহলে দাদাকে বলে দিয়ো নিজেরটা যেন নিজেই বেড়ে নেয়।”

— “দাদা সেটাই করে বউদি। কিন্তু, কাজের থেকে ফিরে দাদার আর ইচ্ছা করে না, তাই বলছিলাম এই কটা দিন যদি তুমি।”

— “উফফ। কাজের সময়।”

মঞ্জু আর একটা কথাও না বলে ঘর থেকে দ্রুত কদমে পালিয়ে যায়।

যশ বাড়িতে এলো ঠিক একটা দশে। গ্যারেজে বাইক রেখে সদর দরজার কলিং বেল বাজাতেই মঞ্জু এসে দরজা খোলে।

— “বাবা-মা কখন গেল রে মঞ্জু?” ঘরে ঢুকতে ঢুকতে যশ জিজ্ঞাসা করে।

— “ওই সাড়ে তিনটে।”

— “তুই খেয়েছিস?”

— “না দাদা।”

মঞ্জুর কথাটা শুনেই যশ একটু ভারী গলায় বলে ওঠে, “তোকে না বারণ করেছি রাত করে না খেতে। যা খেয়ে শুয়ে পড়। আমি আমার খাবার বেড়ে নেব।” শেষের কথাগুলো বলতে বলতে যশ সিঁড়ি দিয়ে উপরে নিজের ঘরের দিকে চলে যায়।

দরজা খুলে ঘরের ভিতরে এসে ঘর সম্পূর্ণ অন্ধকার দেখামাত্রই স্যুইচ জ্বেলে ঘরের আলো জ্বালে। ঘরে দেহি নেই। বাথরুমের দিকে তাকিয়ে দেখে নেয় বাথরুমের দরজাও হালকা করে খোলা। যশ মনে মনে চিন্তা করে নেয়, “আজ দেহি ক্লাবে আর সেই মাঝরাতে মদ খেয়ে বাড়ি ফিরবে।” কাবার্ড থেকে ঘরোয়া পোশাক বের করে নিয়ে বাথরুমে যায় যশ। মিনিট পনেরো পর বাইরের পোশাক ছেড়ে মুখ-হাত-পা ধুয়ে বাথরুমের বাইরে বেরিয়ে এসে ঘরের আলো নিভিয়ে সিঁড়ির দিকে যায়। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে হঠাৎ একটা অভাবনীয় দৃশ্য দেখামাত্রই যশ সিঁড়ির মুখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। ডাইনিং প্লেসে, ডাইনিং টেবিলের ধারে কালো রঙের সিল্ক ও নেটের নাইটগাউন পরে দেহি প্লেটে ভাত বাড়ছে। মুহূর্তের মধ্যে যশ নিজের দুই চোখ দুই হাতে ভালোরকম রগড়ে নিয়ে, টেবিলের দিকে তাকাতেই দেখে দেহি মুখ গম্ভীর করে তাকিয়ে। মুহূর্তের মধ্যে দেহি খেপে বলে ওঠে, “আসার জন্য কি কোর্টের নোটিশ দিতে হবে?”

যশ ভয়ে ভয়ে টেবিলের সামনে গিয়ে দেহির পাশে রাখা চেয়ারটায় বসে দেহির দিকে তাকাতেই দেহি যশকে বলে ওঠে, “হয়েছে দেখা। গিলে উদ্ধার করো।”

ইতিমধ্যে মঞ্জু রান্নাঘরের থেকে জলের বোতল নিয়ে এসে টেবিলের উপর রেখে বলে ওঠে, “বউদি, তোমার তো খাওয়া হয়নি। চেম্বারের থেকে ফিরে নিজের ঘরে সেই যে ঢুকলে। তুমিও বসে পড়ো।” কথাটা শুনে যশ দেহির দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকাতেই দেহি আরও রেগে গিয়ে মঞ্জুর উদ্দেশ্যে বলে ওঠে, “তোমায় চিন্তা করতে হবে না মা। আমি নিজেরটা নিজেই বেড়ে নিতে পারি। যাও গিয়ে খেয়ে নাও।”

— “কিন্তু খাওয়ার পর এঁটো প্লেট...”

— “তুই যাবি?” — তীব্রস্বরে দেহি চিৎকার দিতেই মঞ্জু দৌঁড়ে রান্নাঘরে পালিয়ে যায়।

দেহি, যশের ব্যান্ডেজ খোলা হাতের দিকে তাকাতেই দেখে কাঁটার ঘায়ে যশের হাতের তেলোর চামড়া কেটে গিয়ে ভিতরের মাংসটা দেখা যাচ্ছে। চামচ দানীর থেকে একটা চামচ তুলে নিয়ে দেহি যশের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “মাছের ঝোল, নুন লেগে আরও জ্বলবে, এটা দিয়ে খাও। মাছ আমি বেছে দেব।”

— “কোন ব্র্যান্ড খেয়েছ?” যশ প্রশ্নটা করতেই দেহি চোখ বড় বড় করে বলে ওঠে, “মানে?”

— “না। বিয়ের দেড় বছর পর এই রূপ প্রথমবার দেখলাম। তাই জিজ্ঞাসা করলাম কোন ব্র্যান্ড খেয়ে এইরকম হল আজ। কারণ স্বাভাবিক রূপে তুমি তো রণংদেহি।”

কথাটা শোনামাত্রই মুহূর্তের মধ্যে টেবিলে রাখা কাচের গ্লাসটা তুলে মাটিতে আঁচড়ে ফেলতে যাবে যশ হাতটা ধরে নিয়ে বলে ওঠে, “ঠিক আছে, ঠিক আছে আমার ভুল। শান্ত, বি কুল। রাগ করতে হলে আগে খেয়ে নিয়ে তারপর রাগ করো।”

দেহি গ্লাসটা টেবিলের উপর রেখে নিজের প্লেটে ভাত বেড়ে খেতে থাকে। খাওয়া শেষ হলে, দেহি, নিজের ও যশের প্লেট নিয়ে টেবিলের থেকে তুলে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়। মঞ্জু আগের থেকে খেয়ে দেয়ে নিজের ঘরে চলে গেছে। যশ রান্নাঘরের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখে রান্নাঘরের বেসিনের কল খুলে যাবতীয় এঁটো বাসন দেহি মেঝে ঘষে নিচ্ছে। মাজাঘষা শেষ করে হাত ধুয়ে রান্নাঘরের বড় মার্বেল স্ল্যাবের উপর বাসনের জল ঝরাতে উপুড় দিচ্ছে এমন সময় যশ মুহূর্তের মধ্যে পিছন থেকে দেহির কোমর দুইহাতে জড়িয়ে ধরতেই দেহি চমকে ওঠে। যশ নিজের ঠোঁটটা দেহির কানের কাছে নিয়ে আলতো করে ছুঁইয়ে খুবই শান্ত গলায় বলে ওঠে, “প্লিজ এমনই থাকো, আগের মতো হয়ে যেও না। খুব অচেনা লাগে তোমায়। আমি আমার আগের মামণিকে হারিয়ে ফেলেছি।” যশের কথা শেষ হতে না হতেই দেহি মুহূর্তের মধ্যে নিজের কোমরের থেকে যশের হাত ছাড়িয়ে সজোরে যশের গালে চড় মেরে বলে ওঠে, “লিসন ইন্সপেক্টর। খাবার বেড়ে খাইয়েছি মানে এটা নয়, যশ রায়চৌধুরীর বউ হয়েছি। কোনোদিন না, কখনোই না।”

কথাগুলো বলে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যায় দেহি।

ফরেনসিক ডিপার্মেন্টে দেহি পৌঁছাল সকাল এগারোটা নাগাদ। ডিপার্মেন্ট হেড ডক্টর মেধা। মেধার কাছে খবর যাওয়া মাত্রই নিজের চেম্বারে এসে দেখে দেহি দাঁড়ানো।

— “দিদিভাই।” বলে মেধা জড়িয়ে ধরে দেহিকে। “এত কাজের চাপ যে আমার বিয়েতেও এলি না। না তুই এলি, না মণিমা।”

নামটা শোনামাত্রই দেহি মুখ গম্ভীর করে বলে ওঠে, “আমি ছিলাম না আর তোমার মণিমা কেন আসেনি, তা তুমি তোমার মাকে জিজ্ঞাসা করে জেনে নিয়ো। কারণ তোমার মা, তার খবর খুব ভালো রাখে। যাইহোক, আমার একটা হেল্প দরকার।”

— “কী হেল্প?”

দেহি হাতের নীল ফাইলটা এগিয়ে দিয়ে বলে, “এখানে দুইজনের পি.এম. রিপোর্ট আছে। ভ্যারিফিকেশন প্রয়োজন। মার্ডার হয়েছিল সাতবছর আগে।”

— “অসম্ভব!” মেধা বলে ওঠে। “সাতবছর আগের রিপোর্ট আমি কীভাবে ভেরিফাই করব। ক্লুই তো পাব না।”

— “না মেধা। এই মার্ডার প্রিপ্ল্যানিং। রিপোর্ট দেখলে তুইও বুঝতে পারবি। খুন হুট করে করা হয়নি। আগের ইনভেস্টিগেশন অফিসাররা কীভাবে এইদিকে নজর দিল না, তাই ভাবছি।”

— “ওকে। আমি দেখছি কী করতে পারি। কাল একবার ফোন কর আমাকে।”

দুইবোনের মধ্যে কিছুক্ষণ কথাবার্তা চলার পর দেহি ফরেনসিক ডিপার্মেন্ট থেকে বেরিয়ে আসে।

একটা কফিশপে টেবিলে যশ আর শুভ্রা বসে। যশ একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বলে ওঠে, “মামণির দিন দিন রাগ বেড়েই চলেছে। আমি আর পারছি না শুভ্রা। কী কারণ কিছুই বুঝতে পারি না। তুমি ওর সবথেকে কাছের। তুমি বলো কারণটা কী?”

— “যশ আমি জানি না। মামণিকে আমি আগে তবু কিছু বলতে পারতাম এখন সেটাও পারি না। তোমাদের বিয়ের পর কালিন্দীর বাড়ির কথা ছেড়েই দাও, সর্বহারাতে যাওয়াও প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে মামণি। তুমি ওর সাথে কথা বলো যশ।”

— “কতবার? কতবার বলার চেষ্টা করেছি, জানতে চেয়েছি, কিছুই বলে না।”

— “ভেঙে পোড়ো না। মামণি উপর থেকে ভীষণ কঠিন কিন্তু ভিতরে নরম। ওকে আর-একটু সময় দাও।” কথাটা বলে টেবিলের উপর রাখা যশের হাতটা শুভ্রা চেপে ধরে।

কফিশপের শেষের মুহূর্তটা দূর থেকে দেহি সম্পূর্ণ লক্ষ করে, গাড়ির কাচ তুলে, “ঠিক আছে, চলো।” সলীলকে বলে ওঠে।

সন্ধ্যায় ব্রাঞ্চের যাবতীয় কাজ ফেলে রেখে দেহির চেম্বারে এসে উপস্থিত হয় যশ। পাঁচ-ছয় জন মতো ক্লায়েন্ট বসে।

— “আমার কিছু কথা আছে।” কথা বলে যশ চেম্বারের বাইরে বেরিয়ে আসে। দেহি চেয়ার ছেড়ে উঠে, বাইরে এসে দেখে যশ বাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বাইকের সীটে আঙুল দিয়ে হিজিবিজি কাটছে।

— “কী ব্যাপার? আমার কাজের সময় এখানে কেন?” দেহি বলে।

— “তুমি শুভ্রাকে বের করে দিয়েছ?”

— “হ্যাঁ। তুমি জানলে কী করে?”

— “আমায় ফোন করে বলল।”

— “হ্যাঁ দিয়েছি, তো?”

— “কেন?”

— “তার কৈফিয়ত তো আমি তোমায় দেব না।”

— “শুভ্রা আমার বন্ধু। আমার বন্ধু কোন দোষে আরোপী সেটা জানার পুরো অধিকার আমার আছে।”

— “আর বিশেষ করে বন্ধু থুড়ি বান্ধবীটা যদি শুভ্রা হয়, তাই না?” একটা বিদ্রূপহাসি হেসে দেহি বলে ওঠে। যশ মুখ গম্ভীর করে জিজ্ঞাসা করে, “কী বলতে চাইছ, সোজা ভাবে বলো।” যশের কথা শোনামাত্রই দেহি সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, “সোজা কথাটা হল, বিয়ের পর তোমার বউয়ের কেন দরকার পড়ে না, সেটা আমি বুঝে ফেলেছি।”

— “মামণি...!” যশ রেগে গিয়ে দেহির দিকে হাত তুলতেই দেহি চমকে ওঠে। মারতে গিয়ে হাত মুঠো করে যশ হাত নামিয়ে বলে ওঠে, “ছিঃ। এটাই তোমার কাছ থেকে আশা করা যায়। আরে তুমি সম্পর্ক কী বোঝো? ব্যস আর না।” বলে বাইকের উপর যশ বসতেই দেহি যশের শার্টের কলার টেনে ধরে বলে ওঠে, “কী বলতে চাইছ তুমি? মানেটা কী?”

— “ছাড়ো আমাকে। এতদিন অনেক কেস লড়েছ এবার দত্তবাড়ির সাথে আর-একটা কেসও তোমায় লড়তে হবে। আমাদের ডিভোর্সের কেস। কালকের মধ্যে তুমি তোমার মায়ের কাছে ফিরে যাবে। আর যদি না যাও আমি ফোন করে বলে দিচ্ছি, তিনি যেন তার মেয়েকে নিয়ে যেতে পারে। এক ছাদের তলায় যে কেউ একজন থাকবে হয় তুমি নয় আমি।” বলে দেহিকে দূরে ছিটকে সরিয়ে বাইক নিয়ে যশ বেরিয়ে যায়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%