একাদশ পরিচ্ছেদ

শান্তনু দাশ

দত্তবাড়ি ঢোকার ঠিক গলির মুখটাতেই অনেকগুলি দোকানপাট। বিকেল থেকেই এখানে বাজারটা বসে। চলে রাত্রি আটটা সাড়ে আটটা পর্যন্ত। এর মধ্যেই একটি মেয়ে ফুটের ধারে পান, বিড়ি, সিগারেট, নস্যি, খৈনি ও গুটকা জাতীয় বিভিন্ন নেশার সামগ্রী নিয়ে বেচতে বসেছে। পরনে লাল হলুদের ম্যাড়ম্যাড়া ছাপার শাড়ি ও লাল সুতির ব্লাউজ, মাথার চুল টাইট করে নিয়ে খোঁপা করা, কানে রিং, গলা ফাঁকা, হাতে কয়েকগাছা সোনালি চুড়ি, মুখে পান। কয়েকজন ক্রেতা আসছে, টাকা দিচ্ছে, কিনছে, চলে যাচ্ছে। কিন্তু মেয়েটির চোখ দত্তবাড়ির দিকে। হঠাৎ বাড়ির কাজের মেয়ে রত্না, বাড়ির সদর দরজা খুলে গলির মুখে এগিয়ে আসতে থাকে। রত্নাকে কাছে আসতে দেখেই মেয়েটি ঝুড়িতে রাখা লাল শালুতে ঢাকা পানের বোরজের উপর জলের ছিটা দিতে থাকে। রত্না মোড়ের কাছে এসে এদিক ওদিক একবার চোখ ঘুরিরে নিয়ে মেয়েটির দিকে এগিয়ে যায়।

— “একগজ পান দাও তো।” রত্না কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে মেয়েটিকে বলে ওঠে। মেয়েটি একঝলক রত্নাকে দেখে নিয়ে বলে, “বাংলা পাতা নাকি মিঠা পাতা?”

— “বাংলা।” রত্নার কথা শুনে মেয়েটি পানের উপর থেকে শালু সরিয়ে বাংলা পাতার পান বাছতে বাছতে জিজ্ঞাসা করে, “তুমি দত্তবাড়িতে কাজ করো না?”

— “হ্যাঁ।” রত্না উত্তরে বলে। “তা তুমি কি নতুন নাকি? এই বাজারে আগে তো দেখিনি।”

— “হ্যাঁ দিদি। আমি বসি হচ্ছে ষোড়োর পল্লীতে। রাস্তার কাজ চলছে, ভোট না সামনে। তাই কয়েকদিন এখানে বসব।”

— “ও। কী নাম তোমার?”

— “আমার নাম শঙ্করী।” নামটা শুনেই রত্নার মুখের হাসি নিমিষের মধ্যে মুখের উপর থেকে মিলিয়ে গেল। সেটা লক্ষ করতেই শঙ্করী জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “কী হল দিদি?”

— “হ্যাঁ? না, আসলে তোমার নামের সাথে আমার এক দিদির নামের মিল।”

— “ও। ওই প্রমীলার কেস?” বলামাত্রই রত্না অবাক হয়ে, “তুমি কী করে জানলে?” জিজ্ঞাসা করাতেই শঙ্করী হেসে পানের গজ রত্নার হাতে দিয়ে বলে, “কেন, খবরের কাগজে বেরিয়েছিল তো। এই দত্তবাড়িতে কয়েক বছর আগে বড় ছেলে খুন হল।”

— “বড়ছেলে না, মেজছেলে।”

— “ও।”

— “আমিই প্রথম লাশ দেখি।”

— “তাই? তোমার ভয় লাগল না দেখে?”

— “লাগেনি আবার?”

মুহূর্তের মধ্যে নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে শঙ্করী রত্নার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলে, “ও দিদি আসল ব্যাপারটা কী গো? দেওর-বউদির ব্যাপার?”

— “হ্যাঁ। তাছাড়া কী? আমি প্রথমে জানতাম না। পরে জেনেছি।”

— “আর বাড়ির বড়কত্তা সে কিছু জানত না?”

— “সব জানত। জেনে না জানার ভান। এই বাড়িতেই শঙ্করী বলে এক দিদি কাজ করত। যার কথা তোমায় বললাম। খুব ভালো ছিল দিদি। তাকেও তাড়িয়ে দিল।”

— “শম্ভু বলেও তো কে একজন খুন হয়।”

— “এক নম্বরের শুয়োরের বাচ্চা। ঠিক করেছে, যে খুন করেছে।”

— “কেন গো দিদি?”

— “পরে আর-একদিন বলব। দেরি হয়ে গেলে বকা খাব।”

— “ও, না না তুমি তাহলে যাও। দেরি করো না।” শঙ্করীর কথাটা শুনে রত্না একটা পঞ্চাশ টাকার নোট শঙ্করীর সামনে ধরতেই শঙ্করী বলে, “ও দিদি। ভাঙতি হবে না।”

— “এমা! আমার কাছেও তো খুচরো নেই।”

— “তাতে কী হয়েছে? কাল দিয়ে দিয়ো। আমি তো এই কয়দিন এখানেই বসব। আর দুই-তিন টাকা মেরে কেউ বড়লোক হয় না। মারে বড়লোকরাই, গরীবরা না।”

— “যা বলেছ।” কথাটা শেষ করে রত্না একটা ছোট্ট হাসি দিয়ে গলির দিকে এগিয়ে যায়।

শঙ্করীর পাশেই এক ফেরিওয়ালা চা নিয়ে বসেছিল। সে শঙ্করীকে ডেকে বলে ওঠে, “ও দিদি, একশো খুচরো হবে?”

— “হবে।” শঙ্করী বলে। বোঝা গেল শঙ্করী ইচ্ছা করেই রত্নাকে টাকা ভাঙিয়ে দিল না। চা ওয়ালাকে, একশো টাকা খুচরো দিয়ে শঙ্করী বলে, “তুমি একটু এগুলো দেখো তো, আমি একটু হালকা হয়ে আসি।”

— “আচ্ছা দিদি।” চাওয়ালা বলে।

বাজারের লোকের নজর বাঁচিয়ে একটা নির্জন গলিতে ঢুকে, শঙ্করী, ব্লাউজের ভিতর থেকে একটা কীপ্যাড ফোন বের করে।

হোটেলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, দেহি ব্রাশ নিয়ে গালে সিমার লাগাচ্ছে এমন সময় সেলফোনটা বেজে ওঠে। নম্বরটা একঝলকে দেখে নিয়ে ফোন রিসিভ করে “হ্যালো” বলতেই বিপরীত দিক থেকে মহাভারত কথা আরম্ভ করে। পুরোটা শুনে নিয়ে দেহি বলে, “শম্ভুর ব্যাপারে আমিও এখানে এসে অনেক কিছু শুনলাম।”

— “তাহলে কালকে যেভাবে হোক রত্নার পেট থেকে কথা বের কর।”

...

— “আমি তো বলেছিলাম, অন্য নাম নিলে কথা বের করতে অসুবিধা হতো, শঙ্করী বললেই সব বেরিয়ে আসবে।”

...

— “হ্যাঁ আমি কাল ট্রেনে উঠব। আজ একটু দিল্লি মার্কেট যাচ্ছি।”

— “বাল। রাখ ফোন।” কথাটা বলে দেহি ফোন কেটে দেয়।

অফিসার ঘোষাল পি.এম রিপোর্ট নিয়ে, চিফ ইন্সপেক্টর অম্বর সরকারের টেবিলের উপর রেখে সেটা জানাতেই অম্বর সরকার যেন সত্যিই অম্বরতল হতে ধরণীপাতে পড়ল। হাতে পি.এম. রিপোর্টটা নিয়ে, ঘোষালের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, “বাব্বা! একদিনের মধ্যেই?”

— “তাইতো দেখছি স্যার।”

রিপোর্টে ভালোমতো চোখ বুলিয়ে নিয়ে ঘোষালের দিকে তাকাতেই ঘোষাল “আবার কিছু ভুল লিখেছে ডক্টর সেন?” ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করে ওঠে।

— “লিখেছে তো অনেক কিছুই। গাড়ি বের করো। একবার ফরেন্সিকে গিয়ে একটু সামনাসামনি হই।” অম্বরের কথাটা শেষ হতে না হতেই দুমাদুম বোমের শব্দ।

— “বোম মেরেছে। পুলিশ স্টেশনে বোম মেরেছে।” অফিসার ঘোষাল চিৎকার দিয়ে লাফালাফি করে টেবিলের ফাইলপত্র তচনছ করতেই অম্বর, ঘোষালের মাথা চেপে ধরে দাঁত চিপে বলে ওঠে, “চকলেট বোম। পাশের গলিতে বিয়ে ঘোষাল। বোধহয় বর ঢুকল।” অম্বরের কথাটা শুনে ঘোষাল স্বাভাবিক হয়ে বলে, “ও। হ্যাঁ, সানাই বাজছে।”

দিল্লি মার্কেটের একটা বড় শপিংমলের পারফিউম রোতে দেহি তিন চারটে সেন্ট নামিয়ে হাতে স্প্রে করে নিয়ে গন্ধ চেক করতে থাকে।

— “হুইচ ওয়ান ম্যাম?” মলের একটি মেয়ে হেসে জিজ্ঞাসা করতেই দেহি একটি সেন্টের বোতল এগিয়ে দিয়ে বলে, “দিস ওয়ান।” দেহির পরনে ধূসর রঙের উপর শর্ট লাইন নেট ড্রেস, মাথার চুল সামনের দিলে পফ করে হস্টেল খোঁপা, কানে কালো পালকের মতো লম্বা কানের আর ডান হাতে কালো রঙের ওয়াঙ্কি। শপিং শেষ করে কাউন্টারে থেকে বিল নিয়ে দেহি শপিংমল থেকে বেরিয়ে এসে হোটেলের রাস্তা ধরে। পনেরো মিনিটের হাঁটা পথ।

এই সড়কে দোকানপাট কম ছোট ছোট কম রেটের হোটেলের আধিক্য বেশি তাই লোকজনের ভীড় মোটামুটি। এই সড়কের বিপরীত দিকে একটি মন্দির আছে। প্রায়শই সেখান থেকে ঘণ্টার শব্দ ভেসে আসে। ডানহাতে ধরে রাখা সেলফোনটা অন করে দেহি সময়টা দেখে নেয়, “ছটা।” যশ আজ ব্রাঞ্চ থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে ইন্ডিয়া গেটের দিকে ঘোরাতে নিয়ে যাবে। খুব ধীর কদমে দেহি পথ চলছে। নজর রাস্তার দিকে। হঠাৎ সামনের থেকে বাইকের হর্ন শুনতেই দেহি হকচকিয়ে গিয়ে সড়কে হোঁচট খেয়ে পড়তেই হাতের জিনিসপত্র সড়কে ছড়িয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে বাইক চালক বাইক থামিয়ে, বাইক থেকে নেমে দেহির কাছে হাঁটু গেঁড়ে বসে “আর ইউ ওকে?” জিজ্ঞাসা করতেই দেহি মাথা তুলে কিছু বলতে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে বাইক চালককের মুখ দেখে থেমে যায়। দেহিকে দেখার পর বাইকচালকের মুখের ভাবও সেইরকম। দেহির মুখ থেকে যেন কথা বেরোতে চাইছে না, শুধু দুটো স্থির চোখ জল ঝরিয়ে নীরবে অনেক কিছু বলে চলেছে। কারণ দেহির সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসা রূপম।

মুহূর্তের মধ্যে রূপমের চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা জল গাল গড়িয়ে বেয়ে পড়ে। সে কিছু বলতে পারছে না, কেবল দেহির মুখের দিকে সে তাকিয়ে। ধীরে ধীরে নিজের বাঁহাতটা তুলে দেহির ডানগালে আলতো করে ধরে কাঁপাস্বরে “দেহি!” বলে ডাকতেই দেহি একমুহূর্ত দেরি না করে রূপমকে দুই বাহুতে জড়িয়ে ধরে। রূপমও দেহির কোমর ও পিঠ শক্ত করে চেপে ধরে সড়ক থেকে নিজের বুকে করে তোলে। দুইজনের মধ্যে কোনো কথা নেই, আছে শুধুই কান্না, না বলা বহু কথা। রূপমের কাঁধে চোখ বন্ধ করে মাথা রেখে দেহি যেন রূপমকে অনুভব করতে চাইছে। ধীরে ধীরে দেহি, রূপমের কাঁধে মাথা রেখে চোখ খুলতেই আচমকা, রূপমের কাছ থেকে দুই পা পিছিয়ে যায়।

— “কী হল?” রূপম শান্তস্বরে জিজ্ঞাসা করে।

কিন্তু দেহির দৃষ্টি রূপমের দিকে নয় বরং রূপমের কাঁধ পেরিয়ে তার পিছন দিকে। সেটা রূপম লক্ষ করতেই পিছন ফিরে দেখে, কয়েক হাত দূরে যশ বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে তাদেরকেই দেখছে। যশকে দেখামাত্রই রূপম “ওটা যশ।” বলতেই দেহি চমকে গিয়ে রূপমের দিকে তাকায়। দেহির চোখে একটাই প্রশ্ন, যশ কী তাহলে সব জানে? বাইক স্ট্যান্ড করে ধীর কদমে যশ রূপম ও দেহির কাছে এগিয়ে আসতেই রূপম আনন্দের সাথে বলে ওঠে, “যশ, এই হল সে। যার কথা তোকে বলেছিলাম। এ হল দেহি। আমার দেহি।” কথাটা বলেই যশের সামনে রূপম দেহির দুটো কাঁধ দুই হাতে চিপে ধরে। দেহির নজর যশের চোখের দিকে। রূপমের কথা শুনে একটা ছোট্ট হাসি দিয়ে যশ বলে ওঠে, “বাহ! নাইস জোড়ি!” দেহির নজর মুহূর্তের মধ্যে যশের মুখ থেকে সরে গিয়ে যশের পায়ের দিকে যায়। যশ দেহির রাস্তায় ছড়ানো জিনিসপত্র ও সেলফোনটা মলের ব্যাগের ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে দেহির হাতে তুলে দেয়। দেহি বাঁহাতে ব্যাগের হ্যান্ডেলটা ধরতেই যশ নিজের ডানহাতটা দেহির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, “হায়। আই অ্যাম যশ, ইয়োর রূপম ইজ মাই ফ্রেন্ড।”

ডক্টর সেন ফরেন্সিক ল্যাবেই ছিল। অম্বর ও ঘোষাল ল্যাবে গিয়ে ঢুকতেই ডক্টর সেন অবাকের সুরে জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “কী হল স্যার? আমি তো রিপোর্ট পাঠিয়ে দিয়েছি।”

— “না, সে রিপোর্ট তো আমার হাতেই আছে।” অম্বর বলে। “কিন্তু রিপোর্টে যেগুলো লিখেছ সেটা বুঝতে এলাম।”

— “ও, আসুন।” কথাটা বলে, ডক্টর সেন বডির কাছে অম্বর ও ঘোষালকে বলে, “ভিক্টিমের বয়স, পঁয়ত্রিশ থেকে আটত্রিশের মধ্যে। শরীরে বিষ পাওয়া গেছে।”

— “ঠিক এইটাই আমি জানতে এসেছি। কী বিষ?”

— “এই মুহূর্তে আমি সেটা ধরতে পারিনি। কারণ ভিক্টিম হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে।”

— “মানে মারা যাওয়ার পর বিষ দেওয়া হয়েছে?”

— “সেটা বোঝার জন্যই টেস্ট করে চলেছি। তবে মৃত্যুর সময় রাত্রি দেড়টা থেকে দুটো। বিষ শরীরে ঢুকেছে সাড়ে বারোটা থেকে একটা, খাবারের সাথে।”

— “ভিক্টিমকে শনাক্ত করার মতো কিছু বিষয়?”

— “নো।” ডক্টর সেন কথাটা বলতেই অম্বর, ঘোষালের কানের কাছে গিয়ে আস্তে করে বলে ওঠে, “এই জন্যই হাতুড়ে ডাক্তার বলি।”

ডক্টর সেন অম্বরের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতেই অম্বর “যদি আমার উপকারে লাগে এমন কিছু পাও, তাহলে আমাকে জানিয়ে ধন্য কোরো। চলো ঘোষাল।” কথাটা বলে ঘোষালকে সঙ্গে করে নিয়ে ল্যাব থেকে বেরিয়ে যায়।

ইন্ডিয়া গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দেহি একদৃষ্টে লালপাথর ও গ্রানাইট নির্মিত স্মৃতিসৌধটিকে দেখে চলেছে। চল্লিশ মিটার লম্বা ফুট দিয়ে হেঁটে আসার সময় দূর থেকেই স্মৃতিসৌধটির সামনের তিনটি তিন রঙের পতাকা দেহি লক্ষ করেছিল। দেহি পতাকাগুলির দিকে তাকাতেই রূপম বলে, “তিনটে পতাকার মধ্যেই আমাদের ন্যাশানাল ফ্ল্যাগ আছে। নীল রঙের পতাকাটা ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্স, সাদা রঙের পতাকাটা ইন্ডিয়ান নেভী আর লাল রঙের পতাকাটা ইন্ডিয়ান আর্মিদের রিপ্রেজেন্ট করে।”

রূপমের কথা শুনলেও দেহি আড়চোখে লক্ষ করে যশ সৌধটির সামনে থাকা অমর জাওয়ান জ্যোতিটির কাছে এগিয়ে একদৃষ্টে আগুনের দিকে তাকিয়ে। আরও কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে তিনজনে ওখান থেকে বেরিয়ে আসে।

ফ্লুফি রেস্তোরাঁর ফোরসীটের একটা টেবিলের একপাশের চেয়ারে যশ ও যশের বিপরীতে থাকা দুটো চেয়ারে পাশাপাশি রূপম ও দেহি বসেছে। রূপমের সাথে দেখা হবার পর থেকে একটা কথাও দেহি বলেনি। যশ আর রূপম নিজেদের মধ্যে হেসে খেলে কথা বলে চলেছে কিন্তু দেহি সম্পূর্ণ নির্বাক। ওয়েটার খাবার টেবিলে দিয়ে যাওয়ার পর পরই যশ, “কত বছরের রিলেশন তোদের?” রূপমকে জিজ্ঞাসা করতেই রূপম হেসে উত্তরে বলে, “গুনিনি রে। তোকে তো বলেছিলাম ওর মা যখন আমাকে এখানে ট্রান্সফার করে তখন ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছিল।” কথাটা বলেই রূপম দেহির দিকে ঘুরে টেবিলে রাখা দেহির ডানহাতটা বাঁহাতে চেপে ধরে বলে, “আমি কোনোদিন ভাবতে পারিনি যে ওর সাথে আমার দেখা হবে।”

দেহি আলতো করে রূপমের হাতের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে কাঁটাচামচটা তুলে নেয়। যশ আর রূপম নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে খাবার খেলেও দেহি, হাতে কাঁটাচামচটা ধরে নুডলসের উপর কেবল বোলাতে থাকে। যশ সেটা অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ করে নিয়ে বলে, “কী হল ম্যাডাম, খাচ্ছেন না যে?” যশের কথা শুনে রূপম হেসে বলে, “আসলে অনেকদিন পর দেখা তো, ঠিক বুঝতে পারছে না। যশ একে যতটা শান্ত মনে করছিস, ততটা শান্ত নয়। এই মেয়ে কথা কম হাত বেশি চালায়।”

— “তাহলে তো বরের জীবন সংকটে।” যশ হাসতে হাসতে বলে।

রূপম দেহির দিকে ঘুরে নিয়ে শান্ত গলায় বলতে শুরু করে, “জানো দেহি, এই যশও কিন্তু ম্যারেড। বাট আমার অবাক লাগে ওর বউয়ের কথা ভেবে। অন্ধ হলে যা হয়। এত ভালো হাসবেন্ড পেয়েও, ঘর পেয়েও কিছুই তার কাছে নেই। এতদিন ধরে যশ এখানে একটা খবর নেবার প্রয়োজন বোধ করে না, এমন ফালতু...” কথাটা পুরো শেষ করতে না দিয়েই মুহূর্তের মধ্যে দেহি সামনে রাখা প্লেটে ঠেলা দিতেই প্লেট রেস্তোরাঁর ফ্লোরেতে পড়ে ভেঙে চৌচির। ওখানে থাকা সবাই তিনজনের টেবিলের দিকে তাকাতেই দেহি রাগে চেয়ার ছেড়ে উঠে রেস্তোরাঁর বাইরে বেরিয়ে যায়। প্লেট ভাঙার শব্দে রেস্তোরাঁর লোক টেবিলের কাছে এসে “ক্যায়া হুয়া স্যার?” জিজাসা করাতে যশ হেসে নিয়ে বলে, “কুছ নেহি। হড়বড়ানি মে গিড় গেয়া। ম্যা প্যায়সে দে দুঙ্গা।”

— “নেহি নেহি স্যার য়ো বাত নেহি হ্যায়। ম্যাডাম কো কাহি চোটয়োট তো নেহি আয়ি না?”

— “নেহি।”

— “মে আভি দুসরা প্লেট ভেজ দেতা হু।” বলে লোকটি টেবিলের পাশ থেকে সরে যায়।

রূপম মাথা নামিয়ে যশকে বলে, “কিছু মনে করিস না। ওর মাথা অল্পতে গরম হয়ে যায়।” রূপমের কথাটা শুনে যশ ভারী গলায় উত্তরে বলে, “তাই? কিন্তু আমার তো মনে হল অনেক দেরিতে মাথাটা গরম হয়েছে।”

— “মানে?”

— “মানে বুঝে কাজ নেই তোর। যা ওকে বুঝিয়ে নিয়ে আয়।” যশ কথাটা বলতেই রূপম চেয়ার ছেড়ে উঠে রেস্তোরাঁর বাইরে বেরিয়ে এসে দেখে, ফুটের সামনে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট জ্বেলে দেহি তাতে টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে চলেছে।

নিজের স্টাডিরুমে বসে, সামনের টেবিলের উপর আন-আইডেন্টিফাই ভিক্টিমের পোস্টমর্টেম রিপোর্টটাতে ভালোরকম চোখ বুলিয়ে চলেছে অম্বর সরকার। থানা থেকে ফিরতেও আজ দেরি হয়েছে। কী করে খুন হল, বিষই খেলে তার প্রভাবে না মরে, হার্টফেল করে কী করে মরল এইসব চিন্তা করতে করতে কখন যে স্টাডিরুমের দরজা খুলে শুভ্রা চায়ের কাপ নিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, সেটা খেয়ালই করেনি অম্বর।

— “এই যে”, শুভ্রা ডাক দিতেই অম্বর থতমত খেয়ে সামনে তাকাতেই শুভ্রা বলে ওঠে, “রাতে খাওয়ার আগে তোমার কিন্তু চা খাওয়া বারণ। তাও দিচ্ছি।” কথাটা বলে চায়ের কাপ টেবিলের উপর রেখে শুভ্রা, অম্বরের মুখের দিকে তাকিয়ে একঝলক দেখে নিয়ে আবার বলে ওঠে, “কী হয়েছে বাপি? থানা থেকে ফিরে সেই যে এই ঘরে এসেছ তারপর আর বেরোয়নি। প্রতিদিন ফিরে আগে ছবি আঁকো, আজ সেটাও না।”

অম্বর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে নিয়ে শুভ্রাকে যাবতীয় ঘটনা বলতে শুরু করে। সম্পূর্ণ ঘটনার বিবরণ শুনে নিয়ে শুভ্রা বলে, “দেখি পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা।” শুভ্রার কথামতো অম্বর, পি.এম. রিপোর্টটা শুভ্রার হাতে দিতেই শুভ্রা প্রথম পাতাতেই ভিক্টিমের ছবি দেখে চমকে ওঠে।

— “সর্বনাশ!” শুভ্রা বলে ওঠে।

— “কী হল?” অম্বর জানতে চাইলে শুভ্রা উত্তরে বলে “কেস পুরো ঘুরে গেল?”

— “তুই চিনিস একে?”

— “চিনি মানে? এর বাড়ির কেসই তো কোর্টে চলছে। আশীষ দত্ত, সন্তোষপুরে বসতবাড়ি, দত্তবাড়ির বড়ছেলে, বাপের নাম মহেন্দ্রনাথ দত্ত, এর ভাইয়ের নামই দেবাশীষ।”

— “সন্তোষপুরে বাড়ি। বডি পেলাম কাপসিরোডে। প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে।”

— “বাপি, তুমি ইমেডিয়েট ব্রাঞ্চ ফরেন্সিকে আশীষ দত্তের বডি আনো। মেধা একবার পরীক্ষা করে আসল কথা বের করে নিয়ে আসবে।”

— “ওকে।” অম্বরের কথা শেষ না হতেই শুভ্রা দ্রুত স্টাডি রুম থেকে বেরিয়ে যায়।

শ্বশুরবাড়ির ডাইনিং টেবিলে খাবারের প্লেট সাজাতে সাজাতেই মেধার শাশুড়ি রান্নাঘরের থেকে জলের জগটা নিয়ে এসে টেবিলের উপর রেখে, “মেধা, ঋককে ডেকে নিয়ে এসো।” মেধাকে বলে ওঠে।

— “হ্যাঁ মা।” কথাটা বলে সিঁড়ি দিয়ে দোতালায় উঠে নিজের শোবার ঘরের দরজা খুলে দেখে, ঋক ল্যাবের একটা ফাইল খাটের উপর রেখে সেটা দেখে চলেছে। মেধা পাশে দাঁড়িয়ে ডাক দিতেই ঋক মুহূর্তের মধ্যে মেধার হাত টেনে ধরে নিজের বুকের উপর এনে জড়িয়ে ধরে।

— “ছাড়ো। মা ডাকছে।” মেধা বলে।

— “ডাকুক।” কথাটা বলে মেধাকে ঘুরিয়ে বুকের নীচে এনে, ঋক মেধার গলার কাছে ঠোঁট বোলাতে থাকে।

— “ঘুষি মেরে দেব কিন্তু। ছাড়ো।”

— “না।”

ইতিমধ্যে মেধার সেলফোন বেজে উঠতেই, মেধা ঋককে নিজের উপর থেকে সরিয়ে, খাট থেকে উঠে ডেক্সের কাছে এগিয়ে সেলফোন হাতে তুলে নিয়ে দেখে শুভ্রার ফোন। মেধা কপালটা কুঁচকে নিয়ে আপনমনে, “এত রাতে?” বলে নিয়ে ফোন রিসিভ করে “হ্যাঁ শুভ্রাদি বলো।” অন্যদিকে ঋক খাট থেকে উঠে এসে, পিছন থেকে মেধার কোমর দুইহাতে জড়িয়ে ধরে মেধার কাঁধের কাছে আলতো করে কামড় দেয়। বিপরীত দিক থেকে শুভ্রা বলে ওঠে, “দত্তবাড়ির বড়জন আশীষ দত্ত মার্ডার।”

— “সে কী?” কথাটা শুনেই মেধা বলে। “ধুর! দেখছ তো শুভ্রাদির সাথে কথা বলছ।”

— “কে রে? ঋক না?”

— “আবার কে?” মেধা বলতেই শুভ্রা বলে ওঠে, “দে তো ফোনটা ওর হাতে।”

কথামতো মেধা ঋকের হাতে ফোনটা দিতেই ঋক, “হ্যালো” বলে আর অন্যদিক থেকে শুভ্রা শুরু করে, “ওই, বউকে আদর পরে করবি। সারারাত পড়ে আছে। কাজের কথা চলছে।”

— “তোমরাই কাজ করো, আমরা কিছুই করি না।”

— “খুব বুলি বেড়েছে দেখছি? বাচ্চা ছেলে, নাক টিপলে দুধ বেরোয় আবার বড় বড় কথা।”

— “তাহলে বাচ্চা ছেলের সাথে বোনের বিয়ে দিলে কেন? বোন ধেড়ে ছিল বলে?”

— “ওই, সাহস তো মন্দ না। বড় শালী হই। হাসিঠাট্টা করার শালী নই। দাঁড়া, এর পরের ফোনটা মামণিকে করতে বলব। তখন দেখব।” দেহির নাম শোনামাত্রই ঋক বলে ওঠে, “থাক। আমি নীচে যাচ্ছি। বড়দিকে ফোন দিতে হবে না। কথা কম বলে, হাত বেশি চালায়।” বলে নিয়ে ঋক, ফোনটা মেধার হাতে দেয়।

মেধা ফোন হাতে নিয়ে “হ্যালো” বলতেই শুভ্রা বলতে শুরু করে, “আজ রাতেই ল্যাবে বডি ঢুকবে। গত পোস্টমর্টেমে বলছে বিষ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু হার্ট অ্যাটাক।”

— “কী? সে কী করে হয়?”

— “সেটার জন্যই তো তোর কাছে বডি পাঠাচ্ছি। মামণি এখানে নেই। ফিরে এসেই রিপোর্ট নিয়ে লাফালাফি করবে, তার আগে তুই রেডি রাখ।”

— “দিদিভাই নেই? কোথায় গেছে?”

গোল্ডেন হোটেলের সামনে দেহিকে রূপম বাইক থেকে নামিয়ে বলে ওঠে, “গোল্ডেনে উঠেছ? যশও গোল্ডেনে।” রেস্তোরাঁয় থাকাকালীন রূপম যখন দেহিকে বোঝাতে বাইরে যায় তখনই যশ, বিল মিটিয়ে রেস্তোরাঁর থেকে চলে যায়। দেহি, রূপমের প্রশ্নে সামান্য মাথা নাড়িয়ে হোটেলের ভিতরে ঢুকতে যাবে হঠাৎ রূপম পিছন থেকে বলে ওঠে, “কাল সকালে নিতে আসব তোমায়।” বলে বাইক নিয়ে বেড়িয়ে যায়।

হোটেলের রুমের দরজা খুলে দেহি ভিতরে ঢুকতেই দেখে, ঘর অন্ধকার। কিন্তু চাঁদের আলোয় দেহি স্পষ্ট দেখতে পেল কাচের জানলার দিকে মুখ করে যশ দাঁড়িয়ে। দেহি রুমের দরজা বন্ধ করতেই যশ শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “শাস্তির কারণ তাহলে এইটা?” দেহি নির্বাক। যশ একইভাবে বলে চলে, “আমি অনেক কিছুই ভেবেছি, কিন্তু এটা কোনোদিন মাথাতেই আনিনি, তুমি অন্য কারোর। আমি ভেবেছিলাম আমার উপর রাগের কারণ একটাই আর সেটা হল, তোমাকে প্রথমদিন সত্যি কথাটা না বলা। যেদিন প্রথম তোমার সাথে আমি দেখা করি, সেদিন আমি জানতাম, তোমার মা আমার সাথে তোমার বিয়ে ঠিক করেছে, কিন্ত তুমি জানতে না আর আমি জেনেও তোমায় বলিনি। ভাবতাম, এই কথাটা জানাইনি বলে তুমি আমার উপর রেগে আছো। জানাইনি তার কারণ, আমি একটু ভয় পেয়েছিলাম। যদি সত্যিটা জানার পর আমার সাথে আর দেখা না করো সেই ভেবে। কিন্তু এখন কারণটা ক্লিয়ার। যাও শুয়ে পড়ো।” কথাগুলো বলে যশ জানলার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বেডের কাছে এসে ব্ল্যাঙ্কেটটা মাটিতে পাততে গেলেই দেহি কাঁপাস্বরে বলে ওঠে, “আমি তো মেঝেতে শুতে বলিনি।”

— “জানি। কিন্তু তুমি তো রূপমের। এটা জানার পর একঘরে এক বিছানায় শোয়া সম্ভব কি মামণি? সরি, সরি দেহি।”

নিজের নামটা শোনামাত্রই দেহি দুবার নাক টেনে জোরের সাথে বলে ওঠে, “বেশ তো। তাহলে তুমি কেন, মেঝেতে না হয় আমিই শুচ্ছি।” কথাটা শেষ করে নিয়ে, হাতের ব্যাগটা সোফার উপর ছুঁড়ে বাথরুমে গিয়ে ঢুকে ফুলফোর্সে শাওয়ার চালায়। প্রায় আধাঘণ্টা পর নাইটগাউন পরে, বাথরুম থেকে বেরিয়ে, শপিং ব্যাগের ভিতর থেকে ফোনটা বের করে নিয়ে দেখে, স্যুইচ অফ। সেটাকে অন করে, বেডের থেকে সাদা পিলোটা নিয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ে। যশও ফিরে এসে পোশাক ছাড়েনি। দেহি শুয়ে পড়তেই যশ বাথরুমে ঢুকে নিজের পোশাক বদলে বাইরে এসে দেহির পাশে হাঁটু গেঁড়ে বসে শান্ত গলায় যশ বলে, “বিছানায় চলো।”

— “না।” দেহি রেগে বলে ওঠে।

— “আচ্ছা ঠিক আছে, রেস্তোরাঁয় আমি একটু বেশি বলে ফেলেছি। সরি। আমি বিছানায় শোবো আর তুমি মেঝেতে এটা আমাকে শাস্তি দেওয়া নয়? সে তো এসে গেছে। আর নতুন করে আমাকে শাস্তি নাইবা দিলে। ওঠো, জেদ কোরো না। আজ সত্যিই কিন্তু আমার মনমেজাজ ভালো নেই। আমার কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ওঠো।” কথাটা শেষ করে যশ দেহির হাতটা ধরতেই দেহি ধীরে ধীরে মেঝে থেকে ওঠে।

রাত বেড়েই চলেছে। একখাটে দেহি ও যশ একে অপরের দিকে পিঠ করে শোয়া। না যশের চোখে ঘুম, না দেহির। দুইজনেরই চোখ দিয়েই অঝোরে ঝরে চলেছে অশ্রুজল। মুহূর্তের মধ্যে দেহির ফোন বেজে উঠতেই দেহি চমকে ওঠে। পিলোর পাশেই ছিল ফোনটা। হাতে তুলে নিতেই দেখে শুভ্রা। চোখের জল মুছে, ফোন রিসিভ করে, “হ্যালো” বলতেই শুভ্রা বলে, “কী রে তুই? তিনঘণ্টা ধরে কল করে যাচ্ছি। ফোন অফ।”

— “রাস্তায় ফোন পড়ে গিয়ে অফ হয়ে গিয়েছিল।” দেহির গলা শোনামাত্রই শুভ্রা বলে ওঠে, “কী হয়েছে তোর? এইরকম গলা লাগছে কেন?”

— “আমার কিছু হয়নি। বল।”

শুভ্রা আশীষ দত্তের বিষয় সবকিছু জানায়। দেহি ধীরে ধীরে বেডে উঠে বসে, ভালোরকম শুনে নিয়ে বলে, “মেধা কী ল্যাবে?”

— “বোধহয়।” শুভ্রা বলে।

— “ঠিক আছে তুই রাখ। ফিরি আগে।”

— “মামণি কিছু হয়েছে?”

— “না।”

— “তোর যখন প্রচুর মেন্টাল প্রেশার থাকে তখন তোর গলা এইরকম শুনতে লাগে। আবার যশের সাথে বাঁধিয়েছিস?”

— “আমায় ফিরতে দে। ফিরে এসে বলছি।” কথাটা বলে দেহি ফোন কেটে দিয়ে বেড থেকে উঠে সোজা বাথরুমে গিয়ে ঢোকে।

ট্রলি গোছানো শেষ হলে, দেহি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার দেখে নেয়। দেহির পরনে কালো রঙের ব্রোকেট ব্লাউজের সঙ্গে সাদা কালো নেটের শাড়ি একপিন আঁচল করা। মাথার ঘন লম্বা চুল বড় রোলিং খোঁপা বাধা আর তার ঠিক মাঝখানে সাদা রঙের ব্রোজ। কানে সাদা পুঁতির ঝোলা কানের ও ডান হাতের কয়েকগাছা মুক্তচুড়ি, কপালে কালো রঙের মাঝারি গোল টিপ। খোঁপার বাঁদিক থেকে সাদা ফুলের মালা। চোখে গ্রে কালারের লেন্স। ঠোঁটের উপর হালকা চকলেট কালারের ম্যাট লিপস্টিক লাগাতে লাগাতেই যশ দরজার বাইরে থেকে দুটো টোকা মেরে রুমের ভিতর আসে। যশ ঘরের ভিতর আসতেই দেহি আয়নার থেকে মুখ সরিয়ে যশের দিকে তাকাতেই যশ একদৃষ্টে দেহির দিকে তাকিয়ে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে ঘোর কাটিয়ে যশ বলে ওঠে, “আমি তৎকাল টিকিট করতে গিয়েছিলাম।”

— “কেন?”

— “কেন কী? রূপমও সাথে যাবে। এখানে আসার পর থেকে রূপম একবারও বাড়ি যাইনি। আমি অনেক বলে একমাসের ছুটি গ্রান্টেড করিয়েছি। এবার প্রবলেমটা হল, আমার আর তোমার টিকিট একসাথে, কিন্তু ওর কেবিন আলাদা। তাই বলছিলাম আমাদের দুজনেরটায় তুমি আর রূপম ট্র্যাভেল করো, আমি সিঙ্গেলটায়...” ঘর কাঁপিয়ে মুহূর্তের মধ্যে দেহি যশের গালে চড় কষিয়ে দেয়। যশ ধীরে ধীরে গালে হাত রেখে দেহির দিকে তাকাতেই দেখে, দেহি কাবার্ড থেকে একটা সবুজ নীল চেকের টিশার্ট ও সাদা জিন্স বের করে বেডের উপর রেখে আদেশের সুরে বলে ওঠে, “তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নীচে এসো। আমি রিশেপসনে গিয়ে চেক আউট করছি।” কথাটা বলে বেডের উপর থেকে ট্রলিটা নামিয়ে সেটা টেনে নিয়ে ঘর থেকে দেহি বেরিয়ে যায়।

ট্রেন সময় মতোই বিকাল চারটে পঁচিশে নিউ দিল্লি স্টেশন থেকে রাজধানী ছাড়তে শুরু করে। শিয়ালদা পৌঁছাবে আগামীকাল সকাল দশটায়। ট্রেনের একটি কেবিনে রূপম ও যশ এবং অপর আর-একটি কেবিনে তিনজনের সঙ্গে দেহি। কেবিন থেকে রূপম কুপে আসতেই দেখে দেহি দরজার ধারে দাঁড়িয়ে। বাইরের দুরন্ত দৃশ্য চোখের পলক না ফেলে দেখে চলেছে। রূপম কাছে এগিয়ে পিছন থেকে দেহির ডান কাঁধে একটা চুমু দিতেই দেহি সামান্য চমকে ওঠে। রূপমের দিকে মুখ ঘোরাতেই রূপম বলে, “কী হয়েছে তোমার? তোমাকে দেখে অন্যরকম লাগছে। তুমি তো এমন নও। এত চুপচাপ।” রূপমের কথা শুনে দেহি সামান্য হেসে নিয়ে বলে, “সময় সব কিছু শিখিয়ে দেয় রূপম। যাই হোক ,বউ কেমন আছে?”

— “উফফ। জানি না।” রূপম রেগে বলে ওঠে।

— “বিয়ের পর কোনোদিন বউয়ের সাথে কথা বলেছ? তার কাছে জানতে চেয়েছ কোনোদিন, তার ইচ্ছাটা কী?”

— “আমার শোনার ইচ্ছাও নেই, জানারও দরকার নেই।”

— “এইবার না হয় গিয়ে জিজ্ঞাসা কোরো।”

— “তুমি আর আমি তো একই গণ্ডিতে আজ।”

— “না রূপম। এক নয়। পুরো আলাদা।”

— “তোমার হাসবেন্ডের নাম কী?”

— “কী হবে তার নাম জেনে?”

— “বলো না।”

— “সময় আসুক, ঠিক বলব। যাও যশ কেবিনে একা।” কথাটা বলে আবার বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে শান্ত গলায় বলে ওঠে, “তোমার বন্ধুর বউ হয়তো খুব খারাপ, কিন্তু বন্ধুটা তো খারাপ নয়। সময় দাও ওকে।”

রূপম আর কথা না বাড়িয়ে কেবিনের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে যায়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%