দ্বাদশ পরিচ্ছেদ

শান্তনু দাশ

সকাল দশটা দশে শিয়ালদা স্টেশনে রাজধানী থামে। স্টেশনের বাইরে এসে রূপম একটা প্রাইভেট ট্যাক্সি ধরে নিজের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়। অন্যদিকে যশ ও দেহি আর-একটা প্রাইভেট ট্যাক্সি নিয়ে সোনার তরীর দিকে বেরিয়ে যায়। বাড়ি পৌঁছাতে সময় লাগল প্রায় আধাঘণ্টার মতো। দেহিকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে যশ ব্রাঞ্চের দিকে গাড়ি ঘোরাতে বললে দেহি বলে ওঠে, “কিছু খেয়ে নিয়ে তারপর যেতে?”

— “আমি ব্রাঞ্চে খেয়ে নেব।”

যশ ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে যেতেই দেহি ধীরে ধীরে বাড়ির ভিতরে ঢোকে।

অন্যদিকে দত্তবাড়ি তোলপাড়। আশীষের খুনের খবর শুনে মহেন্দ্রনাথের শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ। মেধা পি.এম. রিপোর্ট রেডি করে ইচ্ছাকৃত আশীষের বডি বাড়ির লোকদের হ্যান্ডওভার করছে না। তার অবশ্যি কারণটা হল দেহি। চিফ ইন্সপেক্টর অম্বর সরকার, অফিসার মিস্টার ঘোষাল আর কলকাতা ব্রাঞ্চের কয়েকজন অফিসার ও লেডি কনস্টেবলদের নিয়ে উপস্থিত হয় দত্তবাড়িতে। নীচের হলঘরেরই সবাইকে ডাক পাঠিয়ে অম্বর সরকারই আশীষের খবরটা জানায়। অম্বর বাড়ির সবার দিকে চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে দেবাশীষের কাছে এগিয়ে বলে ওঠে, “আশীষ দত্ত কে হয় আপনার?”

— “বড় দাদা।” দেবাশীষ উত্তরে বলে।

— “হুম। দাদা। তা আপনার দাদা গত দুই রাত বাড়ির বাইরে। একটা মিসিং রিপোর্ট লেখারও দরকার পড়ে না?”

— “দাদা মাঝে মধ্যেই রাতের পর রাত বাইরে কাটায়। সেইভেবে...”

— “সেই ভেবেই করেননি। বুঝতে পেরেছি।” কথাটা বলে মুহূর্তের মধ্যে কাজের লোকদের দিকে আঙুল তুলে অম্বর জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “এরা কারা?”

— “বাড়ির কাজের লোক।” দেবাশীষের কথা শুনে অম্বর চোখ বড় বড় করে নিয়ে এক দুই করে গুনে নিয়ে বলে, “ছয়জন কাজের লোক আর বাকি দুই মহিলা কাজের মেয়ে।”

— “আসলে আমাদের প্রতিজনের সাথে একজন।”

— “ও। খুব ভালো। তা আশীষ দত্তের কাজের লোক কোনটা?”

দেবাশীষ আঙুল তুলে একজনকে দেখিয়ে দিতেই অম্বর তার কাছে এগিয়ে বলে ওঠে, “নাম?”

লোকটির বয়স আন্দাজ পঁয়ত্রিশ। মাঝারি হাইট, মাথায় চুল ভালোই। অম্বর প্রশ্ন করতেই লোকটি নিজের নাম বলে, “জীবন।”

— “জীবন কী?”

— “জীবন রায়।”

— “বাড়ি?”

— “পূর্ব মেদিনীপুর।”

— “তোর বাবুর ফোন কই?”

— “বাবু তো ফোন নিজের সাথে নিয়েই বেরোতো।”

— “আচ্ছা? দুই রাত আগে নিয়ে বেরিয়েছিল?”

— “বোধহয়। কত্তাবাবা বলতে পারবে।”

— “কত্তাবাবা কে?” অম্বরের প্রশ্নে জীবন মহেন্দ্রনাথের দিকে ইশারা করতেই অম্বর সেটা বুঝে নিয়ে “ও” করে বলে ওঠে, “তা কত্তাবাবা জানবে কী করে?”

— “বেরোবার সময় কত্তাবাবার সাথে দেখা করতে গিয়েছিল আশীষ দাদা।” কথাটা শুনে অম্বর মহেন্দ্রনাথের দিকে তাকাতেই মহেন্দ্রনাথ বলে, “আমি খেয়াল করিনি।”

— “হুম।”

ইতিমধ্যে উপরের সিঁড়ি দিয়ে দ্যুতি নীচে নেমে এসে দেবাশীষের কাছে এসে সেলফোন এগিয়ে বলে, “তুমি উপরে ভুলে এসেছিলে।”

— “ইনি কে?” অম্বর জিজ্ঞাসা করতেই মহেন্দ্রনাথ মুখ ঘুরিয়ে বলে, “দত্তবাড়ির ছোটবউ।”

অম্বর শুনে নিয়ে এসে বলে ওঠে, “ছোটবউমা, আপনার স্বামী কী কোথাও বেরোবে?”

— “কেন?” দ্যুতি জিজ্ঞাসা করতেই অম্বর বলে, “না, জিজ্ঞাসাবাদের সময় হাতে ফোন দিলেন। পরে দিলেও হতো। তা আপনি এতক্ষণ ছিলেন কোথায়?”

— “উপরে।”

— “কেন?”

— “মেয়ে ঘুম পারাচ্ছিলাম।”

— “ও।” অম্বর দ্যুতির থেকে মুখ ঘুরিয়ে দীপিকার দিকে এগিয়ে বলে, “আপনি আশীষ বাবুর স্ত্রী?”

— “হ্যাঁ।” দীপিকা বলে। “দুই নম্বর।”

— “মানে?”

— “মানে, আশীষের আরও একজন স্ত্রী আছে। প্রমীলা।”

— “ঘোষাল শুনে নাও, আমাদের একটা সামলানো দায় হয়ে দাঁড়ায় আর এঁর বাবু দুইখান।” অম্বর কথাটা বলতেই ঘোষাল যেন মনে বল পেল। মুহূর্তের মধ্যে বলতে শুরু করে, “যা বলেছেন স্যার। একজনকে খাওয়াতে পরাতে এত খরচ আবার আর-একজনকে কাঁধে চাপানো? বুঝলেন স্যার বউ বাপের বাড়ি গেলে যেন আমার ধড়ে প্রাণ আসে।”

— “ঘোষাল...। তোমার দাম্পত্য জীবনের আলোচনা করতে বসিনি।”

— “সরি স্যার।”

— “হুম। তা আপনার স্বামী কোথায় বেরোবে বলে গিয়েছিল?”

— “আমাকে কিছু বলে যাইনি।” দীপিকা বলে।

— “কেন? আপনাদের মধ্যে কথা হয় না?”

— “না।”

— “ঝগড়া?”

— “ওইরকমই।” কথাটা শুনে অম্বর আবার ঘোষালের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে, “দেখলে তো ঘোষাল, বাবু বাড়িতে বউ রেখে গাড়ি নিয়ে বাইরে মেয়ে নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়ে গিয়েছিল।”

— “স্বাভাবিক স্যার।” ঘোষাল বলে ওঠে। “বউ আর গাড়ির মধ্যে বেশি তফাত নেই। গাড়িকে ঘরে বসিয়ে রাখলে যেমন বিগড়ে যায়, তেমনই বউও ঘরে বসে বসে বিগড়ে যায়। বউ তো বিগড়েছে তাই গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিল, যেমন আমার কথাই ধরুন...”

— “ঘোষাল...!”

— “সরি স্যার।”

— “হুম। যাই হোক। আশীষ দত্তের বডি কাল পেয়ে যাবেন। আর হ্যাঁ, ব্রাঞ্চে যখনই যাকে যাকে ডাক পাঠাব সে পৌঁছে যায়। নইলে এই ঘোষাল এসে তাকে তুলে নিয়ে যাবে। কী ঘোষাল?”

— “হ্যাঁ স্যার, তোলার ব্যাপারে আমি এক্সপার্ট। আমি তো আমার বউকে আমার শ্বশুরের সামনে দিয়ে তুলে...”

— “ঘোষাল...” অম্বর রেগে বলে দত্তবাড়ি ত্যাগ করতেই পিছন পিছন মিস্টার ঘোষাল বলতে বলতে যায়, “না, না স্যার। ওই তোলা নয়। বাসি বিয়েতে পুকুর কেটে বউকে কোলে তুলে...!”

ফরেন্সিক ল্যাবে দেহি আর শুভ্রা পৌঁছাতেই মেধা একটা সাদা নীল রঙের চ্যানেল ফাইল হাতে দিয়ে বলে, “পি.এম. রিপোর্ট।”

— “আগের ফরেন্সিক ডক্টর যে রিপোর্ট দিয়েছিল, সেটা ঠিক আছে?” দেহি জিজ্ঞাসা করে।

— “হ্যাঁ।” কথাটা বলে মেধা আশীষ দত্তের বডির কাছে এগিয়ে বলে, “বিষ দেওয়ার ফলে, এর মৃত্যু হয় আর অ্যাক্সিডেন্টটা ফেস ইঞ্জিউর করার জন্য। ভালো করে মাথায় যে আঘাতটা লেগেছে সেটা লক্ষ কর, আঘাতটা কপালের একদম মাঝখান দিয়ে। যদি নর্মাল অ্যাক্সিডেন্ট হতো তাহলে, নিজেকে বাঁচানোর জন্য আশীষ দত্ত গাছে ধাক্কা খাওয়ার আগে মাথার ডানদিক সামনে করত। অতএব ধাক্কা লাগার আগেই আশীষ দত্ত মারা গিয়েছিল।”

— “সেটা বিষের প্রভাবে?”

— “একদম। আশীষ দত্তকে যে বিষ দেওয়া হয়েছিল তার নাম হল ব্যারামেক্সিন।”

— “হোয়াট?” দেহি অবাক হয়ে বলে ওঠে। “ব্যারামেক্সিন কী রাস্তার দোকানে কিনতে পাওয়া যায় নাকি?”

— “সেটাই কথা। ব্যারামেক্সিনের কাজ হল, হার্টে এফেক্ট করা। বাইরে থেকে পরীক্ষা করে ব্যারামেক্সিনকে ধরা সম্ভব নয়। কারণ এই বিষ খাওয়ার বারো কী চোদ্দ ঘণ্টা পর গিয়ে ঠোঁটের ভিতরের ভাগ সামান্য নীল হয়। নর্মাল পরীক্ষা করলে মনে হবে ভিক্টিম হার্টফেল করে মারা গেছে, যেটা ওই ফরেন্সিক ডক্টর লিখেছিলেন।”

মেধার কথা শুনে নিয়ে দেহি খুব শান্ত গলায় বলে ওঠে, “কিন্তু ব্যারেমেক্সিন ল্যাব থেকে বের করা সম্ভব?” কথাটা শুনে মেধা ক্যামিকেল ডেক্সের থেকে একটা ছোট্ট জল ভরতি শিশি এনে বলে, “এটা হল ব্যারামেক্সিন। এখানে মাত্র ওয়ান এমএল আছে। যে যে ল্যাবে ব্যারামেক্সিন আছে সেখানে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, প্রতিটি ল্যাবেই সেম অ্যামাউন্টের ব্যারামেক্সিন সার্ভ করা হয়েছে।”

— “তাতে ক্ষতিটা কোথায়?”

— “ক্ষতিটা এইখানে যে, আশীষ দত্তের শরীরে ওয়ান এম এল নয়, ফাইভ এম এল ডোজের ব্যারামেক্সিন আমি পেয়েছি। তাহলে কী এবার ক্লিয়ার?” মেধার কথাটা শুনে দেহি ঠোঁটের কোণায় একটা ছোট্ট হাসি ধরা দেয়। দেহির চোখ ও ঠোঁটের হাসি বুঝিয়ে দিচ্ছে, দত্তবাড়ির রহস্য সমাধানের মুখ।

দত্তবাড়িতে আরও দুইদিন ফরেন্সিকে বডি রেখে তারপর মেধা আশীষ দত্তের বডি, হ্যান্ডওভার করে।

— “আমাকে এইরূপ ত্যাগ করাবার দুঃসাহস দেখিয়ো না। তোমার ধারণা নেই আমি কতটা ভয়ঙ্করী। ঐশ্বর্য যদি আমার প্রিয় হতো তাহলে তোমার জন্য আগ্রার সিংহাসনে পদাঘাত করতাম না। কীসের অহংকার তুমি আমার সম্মুখে প্রকাশ করো? আজ আমি তোমার পদতলে দ্বারস্থ হয়েছি বলে? আজ তুমি আমায় লাথি মারোনি, মেরেছ নিজ ভাগ্যকে। পরজন্মে নয় নবকুমার, ইহজনমেই তুমি আমার হবে। কারণ যে অধিকার কপালকুণ্ডলার আছে, সেই একই অধিকার আমারও আছে। কারণ আমিই তোমার সেই প্রথমা স্ত্রী, পদ্মা।”

সন্ধ্যায় রঙমহল থিয়েটারের আসন্ন নাটকের রিহার্সালে দেহি পৌঁছাতেই সবাই বেশ উল্লাসিত হয়ে ওঠে। জানতে পারে, নাটকটি দুইমাস পরে নয় এই মাসের উনিশ তারিখে মোহিতমঞ্চে নির্ণায়িত হবে। কথাটা শুনে দেহি কপালে সামান্য ভাঁজ কাটে। কারণ এর পরের দিনই কোর্টের হেয়ারিং ডেট। নাটকের রিহার্সাল সেরে দেহি শুভ্রার সঙ্গে ঠিক নটা নাগাদ দেখা করতে যায়। রূপম আর যশের কথা শুভ্রাকে জানালে শুভ্রা শান্ত গলায় বলে, “একদিন না একদিন যশ জানতই। তুই এত চিন্তা করিস না। যদি মনে হয় আমি নিজে রূপমের সাথে গিয়ে কথা বলব।”

— “কাল দেখা করবে বলেছে।” দেহি বলে।

— “করবি। দেখা না করার তো কিছু নেই। আমি তোকে জানি মামণি। যেটা উচিত মনে হবে সেটাই করবি। কারোর কোনো কথা শোনার দরকার নেই।” কথাগুলো শুনে দেহি সামান্য মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ” করে।

রাতের নির্জন গঙ্গার ঘাটের সিঁড়িতে রূপম দেহির হাত ধরে বসা। দেহির দৃষ্টি গঙ্গার দিকে। রূপম আপনমনে নিজের কথা বলে চলেছে। হঠাৎ দেহি বলে ওঠে, “বউয়ের সাথে কথা হয়েছে?” কথাটা শুনে রূপম সামান্য কপাল কুঁচকে বলে ওঠে, “তুমি সবসময় এক কথা কেন বলো?” কথা শুনে দেহি একটা ছোট্ট হাসি হেসে বলে, “স্বভাব। স্বভাব মানুষকে সেরা করে, স্বভাবই মানুষকে খারাপ করে।”

— “হুম। আমাকে একটা কথা বলবে?”

— “বলো।”

— “তুমি আমাকে আগের মতোই ভালোবাসো তো?”

— “যদি উত্তরে আমি বলি না, তাহলে কি তোমার ভালোবাসা কমে যাবে?”

— “ধুর, সেটা হয় নাকি? তখন তো আরও বেশি করে তোমায় ভালোবাসব, যাতে ভালোবাসা না কমে।” কথাটা শেষ করেই রূপম, দেহির কাঁধ ধরে টেনে নিজের বুকের ভিতরে জড়িয়ে ধরে। দেহির কাঁধের কাছ থেকে ঠোঁট ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে রূপম, দেহির ঠোঁটের কাছে নিজের ঠোঁট এনে ছুঁতে গেলে দেহি মুহূর্তের মধ্যে বলে ওঠে, “এবার ফিরতে হবে আমায়।” কথাটা শুনে রূপম মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ” করে নিয়ে বলে, “একুশ তারিখ আমি ফিরে যাচ্ছি। এবার একা যাব না, তোমায় নিয়েই যাব। তুমি যাবে তো?”

বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে। দেহি নীচের ড্রয়িং প্লেসের সোফায় বসে গভীর এক চিন্তায় নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছে। চোখের পলক তার পড়ছে না। কিন্তু গাল দিয়ে বেয়ে পড়ছে চোখের জল।

___________________________________________________

মুহূর্তের মধ্যে সজোরে দরজা খোলে দেহি। স্টাডিরুমে দামিনী ও মেধার মা সৌরজা বসা। দেহি ঘরে ঢুকতেই দামিনী রেগে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। দেহির চোখ লাল, নিঃশ্বাসও ঘনঘন পড়ছে। দামিনীর কাছে ধীর কদমে এগোতে এগোতে গম্ভীর গলায় দেহি বলে ওঠে, “কী মনে করো তুমি নিজেকে ডি আইজি দামিনী সেনসরকার? তুমি জিতে গেছো? রূপমকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে দিয়েছ বলে আমি বদলে যাব? ভুল ভাবনা। না। তুমি জেতনি বরং হেরে গেছো। আমার বিয়ে ঠিক করেছ? তাহলে পরের মাসে কেন? তুমি চাইলে কালকেই বিয়ের পিঁড়িতে দেহি বসবে। যে বিয়ের যজ্ঞের আগুন তুমি জ্বালাতে চলেছ, সেই আগুনে আমি একা না, সেই সংসারকেই আমি জ্বালিয়ে রেখে দেব। যার সাথে আমার বিয়ে দিচ্ছ, তার জীবন আমি ছারখার করে দেব। তুমি হেরে গেছো দামিনী।” মায়ের নাম নেওয়া মাত্রই দামিনী সজোরে দেহির গালে চড় কষায়। গালের উপর হাত রেখে দেহি দামিনীর দিকে তাকিয়ে ডানহাতে দিয়ে উলটো হাতের চড় মারতেই দামিনী ছিটকে পড়ে স্টাডি টেবিলের উপরে।

______________________________________________________

মুহূর্তের মধ্যে চিন্তাটা কেটে গেল কলিংবেলের শব্দে। রাতে যশ বাড়ি ফিরল প্রায় দেড়টা নাগাদ। বাড়ির দরজা মঞ্জু নয়, সোফা থেকে উঠে গিয়ে দরজা খুলল দেহি নিজে। দেহিকে দেখামাত্রই যশ মাথা নামিয়ে ড্রয়িং প্লেসে ঢুকতেই দেহি বাঁধা দিয়ে বলে ওঠে, “ইচ্ছাকৃত রাত করে ঢোকাটা বন্ধ করো। তুমি দেহি না, তুমি যশ। যেটা তোমাকে মানায় সেটাতেই থাকো।”

ইতিমধ্যে যশের মা পৃথা নিজের ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এসে যশকে বেশ কড়া গলায় বলে ওঠে, “কীরে তুই? মানুষে একটা ফোন করে খবর দেয় যে সে বাড়িতে ফিরবে কখন আর তুই একটা খবর দেবার প্রয়োজন মনে করিস না? এই মেয়েটা কোর্ট করে, ক্লায়েন্ট সামলে, রিহার্সাল করে এসে না খেয়ে বসা। যা তাড়াতাড়ি জামা ছেড়ে, হাতপা ধুয়ে নীচে আয়।” মায়ের কথা শুনে কোনোরকম উত্তর না দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যায় যশ। দেহি পৃথার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে ওঠে, “আপনি গিয়ে শুয়ে পড়ুন।”

— “হ্যাঁ যাচ্ছি। তবে আমি তোমায় একটা কথা বলি, কারোর জন্য না খেয়ে বসে থাকাটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তুমি যত তাকে সুযোগ দেবে সে ততটাই সেটার অপব্যাবহার করবে।”

— “সেই দলে আপনার ছেলেও পড়ে?” দেহি জিজ্ঞাসা করতেই পৃথা একটুও সময় না নিয়ে বলে, “হান্ড্রেড পার্সেন্ট পড়ে। আলটিমেটলি পুরুষ তো আর তার উপরে পতিদেবতা।” পৃথার কথা শুনে দেহি সামান্য হাসতেই পৃথাও হেসে ওঠে।

ঘড়ির টিকটিক শব্দে ঘরের পরিবেশ পুরো থমথমে হয়ে ওঠে। দেহি ঘরের জানলার সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে চলেছে। যশ সেটা লক্ষ করতেই বিছানা থেকে উঠে, দেহির পাশে দাঁড়ায়। শান্ত গলায় যশ বলে, “কী হয়েছে তোমার?” দেহি শুনেও যেন শুনল না। একইরকমভাবে সিগারেটে টান দিয়ে চলেছে। যশ আবার বলে ওঠে, “খেয়াল আছে কটা সিগারেট এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টানলে? নটা। এবার কিন্তু খুব বাড়াবাড়ি হচ্ছে। কীসের চিন্তা এত? সম্পর্কের? তুমি এটা বুঝতে পারছ না, যে এতে তোমার মেন্টালি কতটা প্রেশার ক্রিয়েট হচ্ছে? আর একসপ্তাহ পরে তোমার হেয়ারিং ডেট। নিজের চিন্তাটাই যদি স্থির না রাখো তাহলে কেস টানবে কী করে? আর যদি সম্পর্কের চিন্তা তোমার মাথায় ঘোরাফেরা করে তাহলে আমি বলছি, সেটা চিন্তার কোনো বিষয়ই নয়। কোনোদিন তোমায় কোনো কিছুতে বাঁধা দিইনি, আজও দেব না। তুমি রূপমকে ভালোবেসেছ, কোনো অন্যায় করোনি। আরও তাড়াতাড়ি আমি রূপমকে তোমার সামনে আনতাম যদি প্রথম দিনই আমায় সবকিছু বলে দিতে। রূপম একুশ তারিখে দিল্লি ফিরে যাবে। ও বলছিল এইবার তোমাকে সাথে নিয়েই ফিরবে।” কথাগুলো একাধারে বলে নিয়ে যশ, দেহির হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে জানলা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। দেহি যশের দিকে মুখ ফিরিয়ে শান্ত গলায় বলে, “আমি যাব।”

— “বেশ। আমি সব ব্যাবস্থা করে রাখব।” কথাটা বলে যশ বিছানার দিকে এগিয়ে যায়।

সলীল গাড়িটা কল্যানীর বি-ব্লকের কাছে এসে ডায়ে মোড় নিল। গাড়ির ব্যাকসীটে বসে দেহি কমপ্যাক্টের আয়না খুলে, সাদা রঙের পফটা দিয়ে গালের মেকআপটা একটু ফ্রেশ করে নেয়। দেহির পরনে, দুধে আলতা রঙের অফ-শোল্ডার মিডি, মাথার চুল একপিঠ করে বাঁদিকে নেওয়া, কানে সোনালি রঙের বড় ও সরু ইয়ার রিং, ডানহাতে সোনালি রঙের চাপা ব্রেসলেট ও পায়ে সোনালি রঙের হাইহিল জুতো এবং চোখে ক্যাট-আই লেন্স।

শুভ্রা দেহির ডানপাশে বসে, হাতে একটা ফাইল নিয়ে গভীর মনোযোগের সঙ্গে পড়ে চলেছে। পরনে ফুটি রঙের এ-লাইন লং ড্রেস, শুভ্রার মাথার চুল হস্টেল করে খোঁপা করা, কেবলমাত্র কানে কালো রঙের চাপা কানের ও পায়ে কালো রঙের পেন্সিল হিল জুতো। ফাইলটা পড়ে নিয়ে শুভ্রা, দেহির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে, “তাহলে আমরা কি এখন জাহ্নবীর বাড়িতে যাচ্ছি?”

— “হুম।” ঠোঁটের উপর বেবিপিঙ্ক ম্যাট লিপস্টিকটা নতুন করে লাগাতে লাগাতে উত্তর দেয় দেহি। শুভ্রা সামান্য কপালে ভাঁজ কেটে বলে, “এত সাজার কী আছে? কে দেখবে তোকে ওখানে?” শুভ্রার প্রশ্নে দেহি আড়চোখে শুভ্রার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে “পাড়ার ছেলেরা তো আছে। মেয়েরা তো সাজেই ছেলেদের জন্য। সেটা কী মুখে বলা যায়। সবার সামনে বলতে হয় নিজের জন্য সাজছি।” দেহির কথা শেষ হতেই গাড়ি এসে দাঁড়ায় একটি বেগুনি-সাদা রঙের দোতালা বাড়ির সামনে। বাড়ির নাম “নির্মলা।”

গাড়ি থেকে নেমে বাড়িটিকে একঝলক দেখে নিয়ে গেট খুলে দেহি ও শুভ্রা বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে। বাহারি কোনো ছাপ বাড়িটির মধ্যে নেই। সদর দরজার কাছে এগিয়ে দরজায় বারকয়েক টোকা দিতেই এক পঁয়ত্রিশ বছরের মহিলা দরজা খুলে, দেহি ও শুভ্রাকে দেখে “বলুন” বলে ওঠে। দেহি দুইহাত জড়ো করে নমস্কার জানিয়ে নিজের আসল পরিচয় দিতেই মহিলাটি দেহি ও শুভ্রাকে ঘরে আসতে বলে।

ঘরে প্রবেশ করে দেহি ও শুভ্রা দুটি বেতের চেয়ারে বসতেই মহিলাটি বলে, “আমার নাম সরোজিনী দাস। জাহ্নবী আমার বাড়িতে ভাড়া থাকত। জাহ্নবী তখন আমার থেকে কয়েক বছরের ছোট।”

— “জাহ্নবী একাই থাকত?” দেহি প্রশ্ন করে। উত্তরে সরোজিনী বলে, “হ্যাঁ। ওর আসল বাড়ি বোধহয় ওই শান্তিপুরের দিকে। মাত্র তিনমাস এই বাড়িতে ভাড়া থেকেছে। বেশ কয়েকবছর আগে পুলিশও ওর খোঁজ করতে এই বাড়িতে আসে।”

— “জাহ্নবীর পরিবারে কে কে আছে?”

— “সঠিক বলতে পারব না। আসলে জাহ্নবী খুবই চুপচাপ থাকত।”

— “জাহ্নবীকে শেষ যেদিন দেখেন তার সাথে কোনো কিছু নিয়ে কথা হয়েছিল?”

— “তেমন কিছুই নয়, তবে জাহ্নবী খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে করত। আমার বিশ্বাস, জাহ্নবী প্রেগন্যান্ট ছিল।”

— “তাই! তা কীভাবে বুঝলেন?”

— “একবার আমি দোকানে ওষুধ কিনতে যাই। জাহ্নবীও গিয়েছিল ওষুধ কিনতে। যে ওষুধগুলো ও কিনেছিল সেগুলো প্রেগনেন্সির।”

— “কৌশিক দত্তের নাম শুনেছেন কখনও ওর মুখে?” দেহির প্রশ্নে কিছুক্ষণ চিন্তা করে নিয়ে সরোজিনী বলে, “না। তবে একটি ছেলে ওকে প্রায়শই রাতে বাড়ির সামনে গাড়ি করে নামিয়ে দিয়ে যেত। সে কৌশিক দত্ত কিনা বলতে পারব না।” সরোজিনীর কথাটা শুনে দেহি নিজের সেলফোন থেকে কৌশিক দত্তের ছবি বের করে সরোজিনীর সামনে ধরে জিজ্ঞাসা করতেই সরোজিনী মাথা নাড়িয়ে “না” করে বলে, “এই ছেলেটি নয়।”

শুভ্রা ও দেহি একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। কিছুক্ষণ চিন্তা করে দেহি আর-একটা ছবি সরোজিনীর সামনে ধরতেই সরোজিনী মুহূর্তের মধ্যে উত্তেজিত হয়ে, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। এই ছেলেটি।” বলে ওঠে।

গোডাউন থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠতে যাবে দেবাশীষ। এমন সময় দেবাশীষের হাত চেপে ধরে শুভ্রা। দেবাশীষ প্রথমে চমকে উঠলেও শুভ্রাকে দেখামাত্রই একটা হাসি হেসে বলে ওঠে, “তুমি এখানে? কতবার ফোন করি, কিন্তু পাত্তা দাও না।” কথাটা শুনে শুভ্রা হাসতে হাসতে উত্তরে বলে, “পাত্তা দেব বলেই তো আসা। তোমার সাথে একজন দেখা করবে।”

— “কে?” দেবাশীষ জিজ্ঞাসা করা মাত্রই দেহি পিছন থেকে এসে দেবাশীষের কাঁধের উপরে চাপড় মারে। মুখ ঘুরিয়ে দেহিকে দেখামাত্রই দেবাশীষ চমকে ওঠে। দেহি জাহ্নবীর ছবি মুখের সামনে ধরে দেবাশীষকে জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “জাহ্নবী কোথায়?”

— “কে জাহ্নবী? আমি চিনি না।” দেবাশীষ কথাটা বলা শেষ করতেই দেহি কষিয়ে দেবাশীষের গালে চড় মারে। দেহি একটা বিদ্রূপসূচক হাসি হেসে বলে, “মনে পড়ল?”

দেবাশীষ চুপ করে থাকতেই দেহি আবার বলে ওঠে, “তুই যে জাহ্নবীকে ওর ভাড়া বাড়িতে ড্রপ করতে যেতিস সেটা প্রমাণ করতে আমার বেশি সময় লাগবে না। বল এবার, জাহ্নবীর পেটে যে সন্তান এসেছিল, তার জন্য দায়ী তুই তো?”

— “না।” দেবাশীষ বলে ওঠে। “বাচ্চাটা মেজদার ছিল। আমি জাহ্নবীকে চিনতাম। কিন্তু দ্যুতিকে কোনোদিন বলিনি সেটা।”

— “জাহ্নবী দত্তবাড়িতে গিয়েছিল তো?”

— “হ্যাঁ। দিনটা ছিল বিজয়া দশমী। বাড়ির সবাই গঙ্গার ঘাটে। থাকার মধ্যে মেজদা, শম্ভুকাকা আর বড়দা। আমি আসি অনেক পরে। ঘাট থেকে ফিরে উপরের হল ঘরে যেতেই দেখি মেজদা বড়দার গলা চিপে ধরেছে আর শম্ভু কাকা ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে মেজদার হাত থেকে বড়দাকে ছাড়িয়ে অশান্তির কারণ জানতে চাওয়ায় মেজদা বলে শম্ভু কাকা আর বড়দা দুজনে মিলে জাহ্নবীকে খুন করেছে। কথাটা শুনেই আমি মেজদার ঘরে গিয়ে দেখি, মেঝেতে জাহ্নবীর লাশ পড়া। গলা টিপে খুন। এর মধ্যে আমার কোনো ভূমিকা নেই। জাহ্নবীর খোঁজে পুলিশ এই বাড়িতে এলে বড়দাই টাকা পয়সা খরচ করে, কেস ধামাচাপা করায়।”

— “মহেন্দ্রনাথ জানতেন?”

— “হ্যাঁ। কারণ বাবার জাহ্নবীকে খুব পছন্দ হয়েছিল। যার জন্য জাহ্নবীর সাথেই মেজদার বিয়ে ঠিক করেছিল।”

— “তুই গাড়ি করে ছেড়ে দিতি কেন?”

— “মেজদা গাড়ি ড্রাইভ করতে জানত না।”

— “জাহ্নবী কেন খুন হল, সেটা আমি বুঝতে পেরে গেছি, ওটা আদালতেই বলব। আমার প্রশ্ন জাহ্নবীর লাশ কোথায়?”

দেহির প্রশ্নে দেবাশীষ চুপ করে থাকে। কিছুক্ষণ পর শান্ত গলায় বলে ওঠে, “দত্তবাড়িতেই।”

ব্রাঞ্চ সাব-ইনস্পেক্টর মিহির হালদার কয়েকজন অফিসার ও কনস্টেবলকে সঙ্গে করে নিয়ে দেহির কথামতো দত্তবাড়িতে উপস্থিত হয়। তাদের হাতে দেবাশীষ বন্দি। দেবাশীষের কথামতো সবাই ছাদের চিলেকোঠার ঘরে এসে দাঁড়ায়। অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে মিহির হালদার দেখে সেখানে কোনো লাশ নেই। মুহূর্তের মধ্যে দেবাশীষের কলার চিপে রেগে বলে ওঠে, “ইয়ার্কি মাড়াচ্ছ আমাদের সাথে? কোথায় লাশ? আর এতবছর ধরে এখানে লাশ পড়ে থাকলে গন্ধ বেরোবে না?” কথাগুলো শুনে দেবাশীষ ডানহাতের আঙুল তুলে দেওয়ালের দিকে ইশারা করতেই মিহির হালদার সেদিকে ঘুরে দেখে, ঘরের তিনটি দিকের দেওয়ালের রঙ আকাশী কিন্তু যে দেওয়ালটা দেবাশীষ দেখালো সেটা আকাশী রঙের হলেও, তিনটি দেওয়ালের থেকে সামান্য ফারাক। মনে হচ্ছে দেওয়ালটিকে নতুন করে এগিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে।

শুরু হয় শাবল দিয়ে দেওয়াল ভাঙা। প্রায় কুড়ি মিনিটের মাথায় দেওয়ালটিকে ভেঙে মিহির হালদারকে ডাক দিতেই মিহির হালদার চমকে ওঠে। জাহ্নবীর কঙ্কাল দাঁড় করানো আর কঙ্কালটিকে দেখে মনে হচ্ছে পুরো সিমেন্টের। অর্থাৎ শুধু নতুন করে দেওয়াল নয়, খুন করার পর জাহ্নবীর সারা শরীরে সিমেন্ট লাগিয়ে তারপর দেওয়াল তোলা হয়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%