শান্তনু দাশ
দুপর ঠিক দেড়টা নাগাদ রাজধানীর বড় সড়কের পাশে ফ্রান্সি রেস্টুরেন্টের ফোরসীটের টেবিলে রূপম আর যশ বসা। ওয়েটার ট্রেতে করে কাচের গ্লাসে জল রেখে যেতেই রূপম একটা গ্লাস তুলে নিয়ে তাতে একটা চুমুক দিয়ে বলে ওঠে, “জেরা করে কিছু পেলি?”
— “এখনও পর্যন্ত পুরো মুখ খোলেনি।” যশ শার্টের ডানহাতাটা গোটাতে গোটাতে বলে ওঠে।
— “থার্ড ডিগ্রি অ্যাপ্লাই কর।”
— “সেটাই ভাবছি।”
যশের কথা শেষ হতে না হতেই হোটেলের বেয়ারা ট্রেতে করে খাবার প্লেট নিয়ে এসে রূপম আর যশের সামনে রেখে, “এ্যানিথিং এল্স স্যার।”
— “নো।” যশ বলে।
বেয়ারা চলে যেতেই রূপম একটা চামচ দিয়ে খাবার মুখে তুলে বলে, “বারোদিন হয়ে গেল, এখনও কোনো ক্লু পেলি না? এদিকে বাড়িতে তো বউ চিন্তা করবে।”
যশও খাবার মুখে তুলে একটা বিদ্রূপসূচক হাসি হেসে বলে, “চিন্তা? হ্যাঁ। তা তো করবেই। তবে আমাকে নিয়ে নয়, নিজেকে নিয়ে।”
— “মানে?” রূপমের প্রশ্নে যশ নিজের দাম্পত্য জীবনের কিছু ঘটনা বলতেই রূপম অবাক হয়ে বলে ওঠে, “আমার অবাক লাগছে যশ। তোর বউ কি সত্যিই অন্ধ? আমি না হয় একজনকে ভালোবেসে অন্যজনের সাথে বিয়ে করে তার সাথে সংসার করতে পারলাম না বা আমি নিজের থেকে করতে চাইলাম না, কিন্তু তোর তো তা নয়। এই কটাদিনে তোর সাথে মিশে তোকে যতটা চিনেছি দেড় বছর এক ছাদের তলায় থেকে তোর বউ তোকে চিনল না, এটা ভেবে অবাক লাগছে। দুঃখ হচ্ছে তোর বউয়ের জন্য যে এত ভালো হাজবেন্ড পেয়েও তার সাথে এই ব্যবহার করছে।”
— “আর আমার সেই মেয়েটার কথা ভেবে অবাক লাগে যে তোকে ভালোবেসে ঘর ছাড়তে পারল না। অন্য একজনকে বিয়ে করে বসে আছে।”
— “ওকে আমি দোষ দিতে পারি না যশ। বাড়ির পরিস্থিতির সাথে অনেক লড়াই করেছে। আমি বিয়ে করেছি জেনেও এতটুকু ভালোবাসা কমে যায়নি। আজ হয়তো সে স্বামীর সাথে সুখে সংসার করছে। হয়তো একটা সন্তানের মাও হয়েছে।”
— “এখানে আসার পর কন্ট্যাক্ট করার চেষ্টা করিসনি?”
— “করেছিলাম, ফোন অফ। হয়তো আমার মতোই ওর নম্বরও বদলে দিয়েছিল বা আগের নম্বরটা হয়তো ব্লকই করিয়ে দিয়েছে।”
— “রূপম, কলকাতায় গিয়ে একবার খোঁজ নে।”
— “খোঁজ নিয়েই বা কী হবে যশ? ফেরার রাস্তা তো নেই। আমার কথা বাদ দে এবার বল এখানে এসে বউকে ফোন করেছিস একবারও?” কথাটা শুনে যশ মাথা নাড়িয়ে না করতেই রূপম বলে, “তাহলে? রাগারাগি করলে চলে? থানা থেকে ফিরে গিয়ে একবার ফোন করিস।”
কথাশুনে যশ একটা ছোট্ট হাসি দেয়।
শুভ্রা দেহির গ্রিনরুমে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে বলে ওঠে, “তোর সন্দেহই ঠিক।”
— “মানে?” দেহি নাটকের পোশাক খুলতে খুলতে বলে ওঠে।
ঘরে শঙ্করীও ছিল। দেহি শঙ্করীর দিকে ইশারা করতেই শঙ্করী ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। শুভ্রা বলতে শুরু করে, “কৌশিক দত্ত, মহেন্দ্রনাথের চায়ের ব্যাবসাটা সামলাত। এখন সেই ব্যাবসা দেবাশীষের হাতে। ওই ব্যাবসার ম্যানেজারের নাম প্রকাশ মাইতি। এই প্রকাশবাবু, মহেন্দ্রবাবুর সময় থেকে। ঠিকানা বের করে ওঁর বাড়ি গিয়ে জানতে পারি, আশীষের আগে কৌশিকের বিয়ের কথা চলছিল আর খুনের দুইমাস আগে দেবাশীষ, কৌশিকের সাথে দেখা করতে আসে ও কৌশিকের সঙ্গে কোনো একটা বিষয় নিয়ে সামান্য তর্ক চলে। প্রকাশবাবু বলেন দেবাশীষ যে চিনির ব্যাবসাটা সামলাত সেটার ক্যাশিয়ার ছিল রঘুবীর দাস। এই রঘুবীর টাকা পয়সার ঘোটালা করছিল আর সেটা কৌশিক দত্ত ধরতে পেরে মহেন্দ্রনাথকে জানায় আর মহেন্দ্রনাথ রঘুবীরকে গলা ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। এই রঘুবীরের হয়ে কথা বলতেই নাকি দেবাশীষ, কৌশিকের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল।”
— “এই রঘুবীর এখন কোথায়?” দেহি প্রশ্ন করতেই শুভ্রা উৎসাহের সাথে বলে ওঠে, “ওইটার খোঁজ নিতে গিয়েই তো ঝটকা খেলাম।”
— “মানে?” অবাক হয়ে দেহি জিজ্ঞাসা করে।
শুভ্রা বলতে শুরু করে, “রঘুবীরকে ব্যাবসায় ঢোকায় দেবাশীষ তাও দ্যুতির কথা শুনে। দ্যুতির নাকি দুঃসম্পর্কের দাদা এই রঘুবীর।”
— “হতেই পারে। শ্যালক বাবাজীকে বউয়ের কথায় ব্যাবসার দায়িত্ব দেয়।”
— “আরে তা নয়। ঝটকা তো এইবার। রঘুবীরকে খোঁজ করতে এই কেসের অফিসার, মিহিরদার কাছে যেতেই মিহিরদা বলে, “এই রঘুবীরের খোঁজ তারাও করছে।”
— “কী?”
— হ্যাঁ। লাগল তো ঝটকা? এর আসল নাম কী তা কেউ জানে না। কেউ বলে রঘুবীর, কেউ বলে সেলিম, কেউ বলবন্ত। আসল কথা হল এ একজন সুপারি কিলার। গত সাতমাস আগে, এখানে যে ছয়কোটি টাকার ব্যাঙ্ক ডাকাতি হল, তার প্ল্যানার এই। যার খোঁজে যশ দিল্লিতে। খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি এই রঘুবীরের দিল্লিতে একটা ঘাঁটি আছে। আর-একটা কথা, প্রতি মাসে সাতদিনের জন্য দ্যুতি দেবী তার মামার কাছে যান।”
— “তো? যেতেই পারে। রানাঘাটে।”
— “ওহে আমার কানুন দেবী রানাঘাট নয়, দ্যুতি দেবী দিল্লি যান।” কথাটা শুনে দেহি নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে বলে, “তুই জানলি কী করে?”
— “ইনকোয়ারি অফিস থেকে। চায়ের গোডাউন থেকে বেরোচ্ছি হঠাৎ দেখি গাড়িতে দেবাশীষ আর পাশে একজন অল্পবয়সি মেয়ে। বুঝলাম ওটাই দ্যুতি। ফলো করি, দেখি স্টেশনে গাড়ি থামিয়ে, ব্যাগপত্র নামিয়ে দেবাশীষ বেরিয়ে যায়। তখন অফিস থেকে জানতে পারি প্রতি মাসেই এই দ্যুতি রাজধানীর টিকিট বুক করে।”
— “বুঝলাম। দিল্লির ঠিকানা এনেছিস?”
— “হ্যাঁ।”
শুভ্রা ফাইল থেকে ঠিকানা দেহির হাতে দিতেই দেহি বলে ওঠে, “তৎকাল রাজধানীর টিকিট বুক কর একটা।”
— “একটা কেন?” শুভ্রা অভিমানের সুরে প্রশ্ন করতেই দেহি বলে, “দুজন নয় তাই। পর পর ক্লায়েন্টের হেয়ারিং ডেট। তুই আদালতের হেয়ারিংগুলো সামলা, দিল্লি আমি একা যাব।”
— “কিন্তু মামণি...!”
— “ধুর বাল, কথা কম বল। নে চুলের কাঁটাগুলো খুলে দে।”
— “ছাড়ো আমাকে।” আশীষের বুকে সজোরে ধাক্কা মেরে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দীপিকা বলে ওঠে। আদালতে আশীষ, দীপিকা আর কৌশিকের সম্পর্কের কথা জানার পর থেকে দীপিকার উপর শারীরিক অত্যাচার আরম্ভ করেছে। দীপিকার বাঁ ঠোঁটের কোণায় রক্ত শুকিয়ে জমাট বেঁধে গেছে। দীপিকা বলে ওঠে, “এরপর আমার গায়ের হাত দিলে ফল খুব খারাপ হয়ে যাবে আশীষ।”
কথাটা শুনে আশীষ কটমটিয়ে দীপিকার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, কী করবি? তোর মতো মাগী আশীষ দত্তের কিচ্ছু ছিঁড়তে পারবে না।”
— “ছেঁড়ার মতো কিছু থাকলে তবে না ছিঁড়ব। ভুলে যেও না, আমি আর দিদি চুপ আছি বলেই এখনও পর্যন্ত দত্তবাড়ির ভাত মুখে রুচছে, নইলে কবেই জেলের ভাত গলা দিয়ে নামত। একই বাড়িতে দুই বউ নিয়ে ঘর করা বেরিয়ে যেত। সেটা আমায় করতে বাধ্য কোরো না। বেশি কিছু না, সোজা অ্যাডভোকেট দেহি দেবীর কাছে যাব আর রিপোর্টটা করব। যে মেয়ে এতবছরের দত্তবাড়ির ঐতিহ্য ওই ভরা আদালতে উপচে ফেলতে পারে, সেই মেয়ে তোমায় শ্রীঘরে ঢোকাতে দুইসেকেন্ডেও সময় নেবে না। নটা বছর এই জেলখানায় বন্দী আমি। বাপ হতে পারোনি, আবার বড় বড় কথা বলছ? আমার জীবন, দিদির জীবন, দুটো মেয়ের জীবন নষ্ট করেছ তোমরা বাপ বেটায়। তুমি অক্ষম, দিদি বা আমি না। আর কৌশিকের কাছে যেতে আমায় যদি সত্যিই কেউ বাধ্য করে থাকে সেটা হলে তুমি, শুধুমাত্র তুমি।”
দীপিকার তীব্র ভর্ৎসনায় আশীষ রেগে ঘরের দরজা সজোরে খুলে বাইরে বেরিয়ে যায়।
পরেরদিন কোর্টে গিয়ে দেহির চেম্বারে শুভ্রার সঙ্গে দেখা হলে, শুভ্রা দেহির হাতে দিল্লির টিকিট দিয়ে জানায় আগামীকাল শিয়ালদা থেকে বিকাল সাড়ে চারটেতে রাজধানী ছাড়বে আর দিল্লি পৌঁছবে পরের দিন সকাল দশটা। এ.ওয়ান ক্লাস কেবিনের বি বাহাত্তর নম্বর বার্থ। নিজের সাদা রঙের বড় সাইড ব্যাগের চেন খুলে টিকিটটা ঢুকিয়ে বলে ওঠে, “আজ বিকালে আমার বাড়িতে চলে আসবি।”
— “কেন রে?” শুভ্রা জিজ্ঞাসা করে।
— “তিনটে কারণ। এক শঙ্করীর ভাড়া বাড়িতে গিয়ে প্রমীলার সাথে কয়েকটা কথা বলা, দুই কিছু জিনিস শপিং করা এবং তিন বহুদিন হয়ে গেল আমরা দুই মূর্তি কোথাও একসাথে বেরোই না আর কাল একবার পার্লার যেতে হবে সকালে।
— “তুই শপিং করবি নাকি আমাকে করাবি?”
— “দুটোই।”
— “উকিল না হয়ে তোর মডেল হওয়া দরকার ছিল, যতসব।”
— “ইচ্ছা তো সেটাই ছিল কিন্তু বিধিলিপিতে মডেলের বদলে মক্কেল আর শুনানি থাকলে খণ্ডাই কী করে?
দেহির কথাটা শুনে শুভ্রা সামান্য হেসে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে বলে ওঠে, “ও এই মাসে আমার একটা বিয়ের নিমন্ত্রণ আছে, তোর বিয়ের কালো বেনারসীটা দিতে পারবি?”
— “নিয়ে নিস। ওটা ভাবছি তোকে দিয়েই দেব।” দেহির কথাটা শুনেই শুভ্রা কিঞ্চিত কপালে ভাঁজ কেটে বলে, “কী বলছিস তুই, পাগল নাকি? বিয়ের শাড়ি কাউকে কেউ আজীবনের জন্য দিয়ে দেয় নাকি?”
দেহি একটা সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলে ওঠে, “ওটা পরিও না, শুধু শুধু আলমারিতে পচছে।”
— “ধুর। কত সাধ করে বেনারস গিয়ে ওখানকার পুরোনো কারিগরদের নিজে ডিজাইন করে অর্ডার দিয়ে বানিয়েছিলি। কালোর উপরে রূপোলী আর লাল সুতোর কাজ করা। কিন্তু বিয়েতে ওটা পরেই বিয়ের পিঁড়িতে বসবি তখন কে জানত?”
— “কপালে থাকলে সব সম্ভব।” ছাইদানিতে সিগারেটের ছাই ফেলতে ফেলতে দেহি বলে।
শুভ্রা টেবিলে রাখা ছড়ানো ছিটানো কাগজগুলো একটা হলুদ রঙের ফাইলের মধ্যে ঢোকাতে ঢোকাতে বলে ওঠে, “কপাল? হুঁ, তুই নিজে করেছিস ওটা। আজও আমার মনে আছে বিয়ের দিন রাগ এতটাই তুঙ্গে তোর, লাল বেনারসীর উপর পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলি, পিপি বরণ করতে গেলে একহাত মেরে বরণডালা উলটে ফেলিস, বৃদ্ধিতে বসিসনি, যশের বাড়ি থেকে গায়েহলুদের তত্ত্ব আসার আগেই স্নান করে নিয়েছিলি, মাছ দিয়ে ভাত খেয়েছিলি ছিঃ ছিঃ। কী করতে বাকি রেখেছিলি তুই? এমনকি ফুলশয্যার রাতে যশের সামনে সিঁথির সিঁদুর মুছে, হাতেহাতে কব্জিতে মেরে শাঁখাপলা ভাঙিস।”
দেহি বহুক্ষণ আগেই চেয়ার ছেড়ে উঠে কাচের জানালার ধারে গিয়ে একদৃষ্টে বাইরে তাকিয়ে শুভ্রার কথাগুলো শুনে চলেছে। হাতের দুই আঙুলের মাঝে ধরে রাখা সিগারেট পুড়ে চলেছে।
শুভ্রা বলে চলে, “পাগলের মতো একটা কথা বলেছিলি বিয়ের দিন। না খেয়ে সেদিনই থাকবি আর লালরঙ সেদিন নাকি পড়বি, যেদিন নিজের ভালোবাসার কাছে যাবি।”
দেহি একইরকমভাবে জানালার বাইরে তাকিয়ে। শুনেও যখন কোনো উত্তর দিল না, শুভ্রা আর কথা বাড়ালো না, কারণ শুভ্রা জানে, দেহির মন কেঁদে উঠলে সে চুপ করে থাকে যাতে কেউ বুঝতে না পারে, দেহির কষ্ট হচ্ছে। শুভ্রা হাতের ফাইল টেবিলের উপর রেখে জানালার সামনে এগিয়ে ডান হাতটা দিয়ে দেহির বাঁকাঁধের উপর হাতটা রাখতেই দেহি, খুব শান্ত গলায় বলে ওঠে, “থেমে গেলি কেন? বলে যা। মণি বলে, মিমি বলে, তুই কেন বাকি থাকবি?”
— “মামণি, বলব না কেন? তারা যেমন তোর কাছের তুইও আমার কাছের। সেই ছোট্টবেলা থেকে আমরা বান্ধবী। এক জায়গায় না থেকে, পাড়ার পার্কে খেলাধুলা না করেও আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি হয় কেবল কাগজ কলমের মাঝে। তুই বড় হয়েছিস কালিন্দীতে আর আমি নৈহাটিতে। তোর সাথে প্রথম দেখা হল লোরেটোতে গিয়ে। ওই স্কুল বেঞ্চে বইপত্রের মাঝে আমাদের বন্ধুত্ব। তারপর একসাথে ল কলেজ। তাহলে বলব না কেন?”
দেহি জানালা থেকে সরে গিয়ে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলেও শুভ্রা আপনমনে দেহির দিকে তাকিয়ে বলে চলে, “কেউ না জানুক আমি তো জানি তোর রূপ কীরকম। সবেমাত্র কলেজে আমরা ভর্তি হয়েছি। বাপির পোস্টিং তখন লালবাজার। আততায়ীদের হাতে বাপির গুলি লাগল। ভাই কোনো উপার্জন করে না, আমি করি না, বাপির অবস্থা খারাপের দিকে। নার্সিংহোমে টাকার বিল এদিকে বেড়ে চলেছে সেই সময় তুই নিজের অ্যাকাউন্টের টাকা তুলে নিয়ে আমাকে দিয়ে দিয়েছিলি।”
— “আহঃ!! শুভ্রা এবার কিন্তু সত্যিই ভালো লাগছে না থাম না।” দেহি কপাল কুঁচকে বিরক্তির ভঙ্গিতে কথাটা বলতেই শুভ্রা সামান্য হেসে নিয়ে বলে, “থমকেই তো পড়তাম মামণি যদি বাপি সেই সময় না বাঁচত।”
কথাটা বলে শুভ্রা দেহির সামনের চেয়ারে বসে, চুপ করে ফাইল গোছাতে থাকে।
বিকেলে সোনারতরীর ডোরবেলটা বাজতেই মঞ্জু সদর দরজার কাছে এগিয়ে দরজা খুলতেই দেখে শুভ্রা।
একগাল হেসে মঞ্জু জিজ্ঞাসা করে, “শুভ্রাদিদি, কতদিন পর এলে। ভালো আছো?”
— “হ্যাঁ, তুমি কেমন আছো মঞ্জু?” শুভ্রাও প্রত্যুত্তরে হেসে নিয়ে বলে।
শুভ্রার চুল সুন্দর করে হস্টেল খোঁপা করা। পরনে ধূসর আর কালো রঙের লং কুর্তি তলায় মাখন কালারের কটন জিন্স, কানে বড় গোলের রূপোলি রঙের কানপাশা, ডান হাতে চামড়ার ঘড়ি ও বাঁহাতে সাদা তিনটে শান্তিনিকেতনী কাঠের চুড়ি গলায় গজমতির আকৃতির মতো রূপোলী মেটালের লকেট দেওয়া কাঠের হার। চোখ সুন্দর করে আঁকা, ঠোঁটে মেরুন লিপস্টিক আর কপালের মাঝবরাবর সরু ও লম্বা করে টানা লম্বা টিপ। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে দেহির ঘরের সামনে এসে বন্ধ দরজাতে তর্জনী দিয়ে দুটো টোকা দিতেই ভিতর থেকে, “ খোলা।” দেহি বলে। দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে দেখে দেহি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লম্বা গাঢ় বাদামি চুলগুলোকে মোটা দাঁতের চিরুনি দিয়ে বাঁদিকে এসে আঁচড়াচ্ছে। পরনে চন্দন কালারের লং গাউন, বাঁদিকের থাইয়ের কাছ থেকে পা পর্যন্ত চেঁড়া। কানে লাল স্টোনের রম্বস আকৃতির বড় চাপা কানের, গলা থেকে বুক পর্যন্ত একটা লাল স্টোনের হার, হাতের নখে লাল নেইলপলিশ আর ঠোঁটে গাঢ় লালের ম্যাট লিপস্টিক এবং চোখের মণিতে সীগ্রীন রঙের লেন্স।
— “আমি পনেরো কুড়ি মিনিট লেটে উপরে এলাম, তাও তোর হল না?” শুভ্রা দেহির সামনে এগিয়ে ড্রেসিং টেবিলের থেকে কাজল পেন্সিলটা তুলে চোখতে লাগাতে লাগাতে বলে ওঠে।
— “না।” দেহি বলে ওঠে। চুল আঁচড়ে বাঁদিকে সম্পূর্ণ চুলগুলোকে নিয়ে এসে শুভ্রার দিকে তাকিয়ে দেহি আবার বলে, “বেশি চোখে ঘোষো না, কাজলের বদলে কালি হয়ে যাবে।” কথাটা বলেই শুভ্রার দিকে পিঠ দিয়ে ঘুরে বলে, “মাঝের দুটো লেস টাইট করে বাঁধত।”
গাউনের পিঠের কাছে মোটা বারো থেকে চোদ্দোটা লেস পিঠ আটকানোর জন্য। লেসে দড়ি টাইট করতে করতে শুভ্রা কপালটা সামান্য কুঁচকে বলে ওঠে, “কীরে তুই ইনার পড়িসনি?”
— “এই গাউনের সাথে ইনার পড়া যায়?” দেহি বলে। “ব্রেস্টের আছে এমনিই টাইটসেট ভেলবেট।”
— “কিন্তু পুরো পিঠ খোলা কোমর পর্যন্ত।”
— “ওইজন্যই তো কিনেছি।” কথাটা বলে কাবার্ডের কাছে এগিয়ে গিয়ে কাবার্ড খুলে পাথর বসানো গাঢ় লাল রঙের পার্সটা বের করে।
শুভ্রা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তখন ড্রেসিং টেবিলের থেকে গাড়ির চাবি তুলে নিয়ে শুভ্রার হাতে ছুঁড়ে বলে ওঠে, “চুপ কর না বাল। কেন মাইরি বাইরে বেরোনোর সময় আমার ঝাঁট গরম করানোর প্ল্যানে আছিস? যা, গাড়ি বের কর আর আজকে তুই ড্রাইভ করবি।”
শুভ্রা কথা না বাড়িয়ে দরজা খুলে সিঁড়ি নীচে নামতে থাকে। দেহি লাল রঙের পেন্সিল হিলটা পায়ে পড়ে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের ডেক্স খুলে একটা লালপাথরের হ্যান্ড ওয়াঙ্কি বের করে বাঁহাতে পরে নিয়ে নিজের পার্সে যাবতীয় সামগ্রী ঢুকিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
সাহারোড থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে বড় রাস্তায় উঠে আরও কুড়ি মিনিট ড্রাইভ করার পর সত্তর বাই সতেরো বিবেকানন্দ পল্লীতে এসে শুভ্রা ও দেহি উপস্থিত হয়। বাঁয়ে বাঁক নিয়ে একটা রাস্তায় ঢুকতেই দেহি গাড়ির কাচ নামিয়ে রাস্তার মোড়ে ডান ধারে একটা চা, পান সিগারেটের দোকানে বসা বয়স পঁচিশ চব্বিশ বছরের ছেলে বলে ওঠে, “দাদা কলম বিশ্বাসের বাড়িটা কোন দিকে?”
— “কোন কমল বিশ্বাস দিদি?” দোকানদার জিজ্ঞাসা করে।
— “বাড়ি ভাড়া দেয় যিনি।” দেহি কথাটা বলতেই দোকানদার চিনতে পারায় মুখের অবাকভাব দূর করে বলে ওঠে, “ও মিঠুদা। ওইজন্য প্রথমে বুঝতে পারিনি। সোজা গিয়ে বাঁদিকের গলিতে ঢুকে দুটো বাড়ির পর। সাদা রঙের বাড়ি।”
— “ধন্যবাদ।” দেহি বলতেই শুভ্রা গাড়ি স্টার্ট দেয়।
কথামতো গাড়ি সোজা পথে গিয়ে প্রথম বাঁদিকের গলির মুখ থেকে একটু সরে গিয়ে গাড়ি পার্ক করে। গলির মুখে কয়েকজন ছেলে আড্ডা মারছে আর হাতে নিয়ে সেলফোন ঘাটছে। দেহি গাড়ির দরজা খুলে নামামাত্রই গলির মুখে থাকা ছেলেগুলির নজর সেলফোন থেকে সরে গিয়ে দেহির দিকে আটকায়। শুভ্রা গাড়ি লক করে নিয়ে দেহির সাথে গলির দিকে এগোতেই ছেলেগুলি সঙ্গে সঙ্গে দেহির দিক থেকে চোখ সরিয়ে নেয়।
সাদা রঙের দোতলা বাড়ি। চারিদিকে মাঝারি আকৃতির পাঁচিল ও গ্রিলের দরজা। দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই দেখে একটা গোলাপ, বনগাঁদা, টগর, ছোট কলমের গন্ধরাজ গাছ নিয়ে গড়ে উঠেছে ছোট্ট একটা বাগান। দরজা খুলে ঢুকতেই দেহি একঝলকে বাড়ির ফলকটা দেখে নিয়েছিল। ফলকে কোনো নাম নেই, কর্পোরেশনের নম্বর আছে। নুড়ি ফেলা পথে হেঁটে গিয়ে একতলার সদর দরজায় কলিংবেল বাজাতেই সেকেন্ড দশেক পর দরজা খোলে মাঝবয়সি একজন লোক। গায়ের রঙ কালো, দেহের গঠন ভালো, কানের গোঁড়ার দিকের চুলে সামান্য পাক ধরেছে, নাক ও ঠোঁটের মাঝে গোঁফ। পরনে একটা দাদুহাতা আর নীল চেকের লুঙ্গি।
— “কমল বিশ্বাস?” দেহি প্রশ্ন করে।
লোকটি মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ” করে নিয়ে পালটা প্রশ্ন করে, “আপনারা?”
— “আমাদের চিনবেন না। আমরা শঙ্করী পালের সাথে দেখা করতে এসেছি। এই বাড়িতেই তো ভাড়া থাকে।”
— “হ্যাঁ। দোতলায়। ওই বাঁদিক দিয়ে দেখুন উপরে ওঠার লোহার সিঁড়ি আছে। আপনারা কোথা থেকে এসেছেন?”
কমল বিশ্বাসের প্রশ্নে দেহি নয় উত্তরটা দিয়ে উঠল শুভ্রা। একটা তির্যক দৃষ্টি দিয়ে প্রত্যুত্তরে বলে, “শঙ্করী যে থিয়েটারের দলে কাজ করে আমি সেখান থেকে এসেছি আর ইনি হলে প্রডিউসারের স্ত্রী।”
— “ও।” একগাল হেসে নিয়ে কমল বিশ্বাস বলেন, “ওইদিকে এগিয়ে যান।”
সদর থেকে সরে, ডানদিকে গিয়ে লোহার সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলায় এসে দুই বান্ধবী দাঁড়ায়। দরজায় টোকা মারতেই শঙ্করী দরজা খুলে বলে, “আসুন, আসুন।”
প্রমীলা খাটের উপর বসে টেলিগ্রাফ নিউজ পেপারটা বিছানাতে সম্পূর্ণ পেতে পড়ছিল। দেহি আর শুভ্রাকে দেখা মাত্রই খবরের কাগজ ভাঁজ করে গুছিয়ে নিতে নিতে প্রমীলা বলে, “বসুন দেহি দেবী। আপনিও বসুন শুভ্রা দেবী।”
ঘরের আসবাব পত্র বলতে একটা বড়সাইজের খাট দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে, একটা নস্যি কালারের লোহার গোদরেজের আলমারি একটা ছোট কাঠের ড্রেসিং টেবিল এবং ঘরের অপর দিকের কোণায় একটা কাঠের টেবিল ও দুটো কাঠের চেয়ার।
দুটো চেয়ার খাটের দিকে টেনে এনে তাতে শুভ্রা আর দেহি বসে। ঘরের চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে দেহি শঙ্করীর দিকে তাকিয়ে বলে, “কতদিন এই ভাড়া এসেছ শঙ্করী?”
— “তিন বছর হল।” শঙ্করী বলে।
— “খাট আলমারি ড্রেসিংটেবিল আগের থেকেই ছিল?”
— “না, না। আমি এসে তারপর কিনি।”
— “কত ভাড়া নেন কমল বাবু?”
— “সাড়ে তিন হাজার। আপনারা বসুন আমি চা করে নিয়ে আসি।”
কথাটা বলে শঙ্করী রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। দেহি নিজের পার্সটা খুলে নিয়ে তার থেকে সিগারেটের বাক্স বের করে একটা সিগারেট লাইটার দিয়ে ধরিয়ে নিয়ে ধোঁয়া ছাড়তেই প্রমীলা ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে ওঠে।
— “হাসলেন যে?” দেহি সেটা দেখে নিয়ে প্রশ্ন করতেই প্রমীলা বলে, “আপনার স্টাইল আর স্মোকিং করা দেখে একজন নায়িকার কথা মনে পড়ে গেল।”
— “কোন নায়িকা?” শুভ্রা আগ্রহের সাথে জিজ্ঞাসা করে। প্রমীলা শুভ্রার দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে নিয়ে বলে, “অপর্ণা সেন।”
কথাটা বলতেই ঘরের তিনজন একসাথে হেসে ওঠে।
দেহি ঘরের মেঝের দিকে দৃষ্টি রেখে সিগারেটের ছাইটা ঝাড়তে ঝাড়তে হঠাৎ প্রমীলার দিকে না তাকিয়েই বলে ওঠে, “কৌশিক বাবুর সাথে সম্পর্ক তৈরি হল কী করে?”
প্রশ্নটা শুনে, প্রমীলা কিঞ্চিত চুপ করে থেকে একটা ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে উত্তরে বলে, “মা হতে পারছিলাম না বলে আশীষ শারিরীক ও মানসিক অত্যাচার করে চলেছিল ওই দত্তবাড়ির চার দেয়ালের ভিতরে। দীপিকা তখনও ওই বাড়িতে আসেনি। একদিন রাতে আশীষ এতটাই আমাকে মারধর করছিল যে কৌশিক বাধ্য হয়ে আমাদের ঘরে এসে ওর দাদাকে থামায়। পিঠে বেল্টের আঘাতে দাগ হয়ে গিয়েছিল। কৌশিক ওই মুহূর্তে আমায় সামলিয়েছিল। প্রথমে বুঝতে পারিনি দেহি দেবী, কীভাবে একটু একটু করে আমার মনের ভিতরে ও জায়গা করে নিয়েছে। দীপিকাকে বিয়ে করে আনার পর আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে ওঠে।”
দেহি পুরোটা শুনতে শুনতে সিগারেটটা শেষ করে ফিল্টারটা ফেলার জন্য এদিক ওদিকে দেখতেই প্রমীলা একটা ছোট্ট হাসি দিয়ে বলে ওঠে, “ওই টেবিলের কোণায় একটা ভাঙা কাপ আছে, মোমবাতি বসানো ওটাতে ফেলুন।”
কথামতো দেহি চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে টেবিলের কোণা থেকে কাপ নিয়ে তাতে ফিল্টারটা ফেলে মুহূর্তের মধ্যে বলে ওঠে, “আপনার জন্যই তো কৌশিক বাবু বিয়ে করছিলেন না, তাই না?”
কথাটা শুনে প্রমীলা অবাক হয়ে কপালে সামান্য ভাঁজ কেটে নিয়ে বলে ওঠে, “আমি সঠিক বলতে পারব না দেহি দেবী।”
— “কেন? কৌশিক বাবুর বিয়ে নিয়ে কোনো কথাবার্তা কোনোদিন হয়নি?”
— “হয়েছে। ও সব সময় বলত ভালো যাকে বেসেছি তাকে কোনোদিন ভুলতে পারব না।”
— “তা ভালোবাসার মানুষটি কে ছিল? আপনি নাকি বাইরের কেউ?”
প্রমীলা, দেহির প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকতেই দেহি নিজের চেয়ারে এসে বসে বলে ওঠে, “প্রমীলা দেবী আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, আশীষ বাবুর আগে কৌশিক বাবুর বিয়ের কথা চলছিল দত্তবাড়িতে।”
— “চলতে পারে। তখনও আমি ওই বাড়ির বউ হয়ে যাইনি।” প্রমীলা বেশ জোরের সঙ্গে কথাটা বলে ওঠে। শুভ্রা খুব স্থির নজরে প্রমীলার দিকে তাকিয়ে। দেহি নিজের পার্সের চেনটা খুলে একটা ছোট গোল আয়না আর পপ বের করে নিয়ে আয়না সামনে ধরে কপালের কোণার সামান্য ঘাম মুছতে মুছতে, খুব শান্ত গলায় বলে, “তা তো ঠিকই। কিন্তু সেই সম্পর্কে কৌশিক বাবুর সাথে আপনার কথা হয়নি বা কৌশিক বাবু আপনাকে বলেননি এটা ঠিক আমার বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না প্রমীলা দেবী। কিছু কথা তো হয়েছিলই।”
প্রমীলা ভেবে নিয়ে বলে, “একবার কৌশিক হেঁয়ালি করে আমায় বলেছিল, সে যদি বিবাহিত হতো, তাহলে তাকে আমি ভালোবাসতাম কিনা। সত্যি বলতে কৌশিক খুব চাপা প্রকৃতির ছেলে ছিল। ব্যাবসার কাজ সামলিয়ে গোডাউন থেকে রাতে বাড়ি ফিরে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে থাকত। ঠিক সাড়ে দশটায় খেতে নামত।”
— “বুঝলাম। আচ্ছা দ্যুতি দেবীর বাপের বাড়ির লোক বলতে কি মামা মামি?”
— “হ্যাঁ। দ্যুতির বাবা-মা নাকি ছোটবেলায় মারা যায় আর সেই থেকে মামার বাড়িতেই মানুষ।”
— “মামা কতবার দত্তবাড়িতে এসেছেন?”
— “আমি থাকতে একবারই মাত্র ওর মামাকে দেখেছিলাম।”
— “ও। মানে দ্যুতি দেবীর বউভাতের দিনই কেবল।”
— “দ্যুতির তো অনুষ্ঠান করে বউভাত হয়নি।”
প্রমীলার কথাটা শুনে দেহি কপালের বাঁ ভ্রূটা কোনাকুনি তোলে। ইতিমধ্যে রান্নাঘরের থেকে শঙ্করী একটা ফাইবারের ট্রেতে করে চার কাপ চা ও বিস্কুট নিয়ে আসে। খাটের উপরে ট্রে রেখে একে একে সবার হাতে চায়ের প্লেট তুলে দিয়ে প্রমীলার পাশেই শঙ্করী চায়ের কাপ নিয়ে বসে। দেহি চায়ের কাপে একটা সুড়ুত করে টান দিয়ে, “বাহঃ, দারুণ” বলে ওঠে। শুভ্রারও যে চায়ের স্বাদ পছন্দ হয়েছে তা মুখে না বললেও মুখের ভাব দেখে বোঝা গেল।
প্লেটের উপর কাপ রেখে দেহি জিজ্ঞাসা করে, “তাহলে বিয়েটা হল কীভাবে দেবাশীষ বাবুর সাথে?” প্রমীলা চায়ে একটা চুমুক দিয়ে নিয়ে বলে, “একদিন হঠাৎ সন্ধ্যায় দেবাশীষ, দ্যুতিকে বিয়ে করে নিয়ে আসে। শুরু হয় বাড়িতে তুমুল অশান্তি। দ্যুতির সাথে কয়েকমাসের ভালোবাসা তারপর এই বিয়ে। প্রথমে বাবা কিছুতেই মানতে চাইনি। বাড়ি থেকে তাড়িয়েই দিচ্ছিল তখন কৌশিকই বাবাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে দ্যুতিকে মেনে নিতে বাধ্য করায়।”
— “কৌশিক বাবুর উপর টান এত বেশি কেন?”
দেহির প্রশ্নটা শুনে প্রমীলা মেঝের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলে ওঠে, “এটা আমারও প্রশ্ন। কেন এত টান?”
— “শেষ প্রশ্ন। দ্যুতি দেবীর দুঃসম্পর্কের কোনো দাদা আছে নাম রঘুবীর?”
— “কই এমনটা তো শুনিনি। ওর মামার? দুঃসম্পর্কের কী বলছেন, নিজের ভাই বোন কেউ নেই। ওর মামা নিঃসন্তান।”
কথাগুলো শুনে দেহি সামান্য মাথা নাড়িয়ে চায়ের কাপে চুমুক দেয়।
:::::::::::::::::::
ফুডপ্লাজা নামের একটা রেস্টুরেন্টের টেবিল বসে ন্যাপকিনটা কোলের উপর খুলে পাততে পাততে শুভ্রা বলে, “আমার তো অনেক পারফিউম ছিল তাও দুটো পারফিউম কিনে দিলি?”
— “ককটেল করে মাখবি।” কাচের গ্লাসে রাখা জলটা তুলে নিয়ে দেহি বলে ওঠে।
— “ফালতু।”
জলে একটা ছোট্ট করে চুমুক দিয়ে, সামনে রাখা বড় সাইজের মেনুকার্ডটা হাতে তুলে নিয়ে খাবার দেখে নিয়ে একটা ওয়েটারকে ডেকে খাবার অর্ডার দেয় দেহি। রেস্টুরেন্টে বসে থাকা বহু ছেলেরা বার বার দেহি পায়ের দিকে তাকাচ্ছে, যেখান থেকে থাইয়ের অংশটা বেড়িয়ে আছে। সেটা বহুক্ষণ আগেই দেহি লক্ষ করে নিয়েছিল।
— “মামণি, প্যাড কিনবি বলছিলি কিনলি না তো।” শুভ্রা হঠাৎ করে কথাটা বলতেই দেহি দাঁতে জিভ কেটে বলে ওঠে, “ইসস, একদম মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে। ঠিক আছে বাড়ি ঢোকার আগে মেডিকেল থেকে নিয়ে নিয়ে নেব।”
— “কী বুঝলি?”
— “বুঝলাম দিল্লি না যাওয়া পর্যন্ত প্রশ্নের কোনো সমাধান নেই। তোকে এখানে থেকে কয়েকটা কাজ করতে হবে।”
— “কী কাজ?”
— “সন্তোষপুরে গিয়ে দত্তবাড়ির সম্পর্কে যাবতীয় ইনফরমেশন কালেক্ট করবি। ঘরের খবর আর বাইরের খবর দুটোই। দরকার পড়লে দত্তবাড়ির উপর ছদ্মবেশে নজর রাখবি। ওই বাড়িতে যে দুটো কাজের মেয়ে আছে, কী যেন নাম?”
— “রত্না আর পদ্মা?”
— “হ্যাঁ, হ্যাঁ। ওই দুটোর পেটে লাথি মেরে কথা বের করতে পারবি তো?”
— “বাঁহাতের খেলা।”
— “ব্যস, যা যা পাবি ছোট বড় যেটাই হোক জানাবি। আর একটা কাজ তোকে করতে হবে।”
— “সেটা কী?” আগ্রহের সাথে শুভ্রা জানতে চাওয়া মাত্রই দেহি একটা দুষ্টু হাসি হেসে শুভ্রাকে নিজের দিকে টেনে, কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ধীর গলায় কথাটা বলতেই শুভ্রা রে রে করে না বলে ওঠে।
— “ওটা আমি পারব না মামণি।”
— “আমি তোকে মতামত জানাতে বলিনি। আমার আমার সিদ্ধান্ত জানালাম।”
— “আরে ও বিবাহিত। অবিবাহিত হলেও...” শুভ্রাকে পুরো কথাটা শেষ করতে না দিয়েই দেহি বলে ওঠে, “কেন রে বাল? সকলের সামনে যশের হাত চেপে ধরতে পারো আর অন্য কারোর বরের গলা জড়িয়ে ধরতে পারবে না? যখন যশের হাতটা ধরেছিলে তখন কি যশ অবিবাহিত ছিল? বড় বাল আমার। সাতদিনের জন্য দিল্লি যাচ্ছি। ফিরে এসে যেন শুনি ঘুঘু ফাঁদে পড়েছে।”
দেহির কথা শেষ হতেই ওয়েটার ট্রে করে খাবার নিয়ে এসে টেবিলের উপর রাখে।
খাবার মুখে তুলে নিয়ে সামান্য চিবিয়ে শুভ্রা বলে, “আচ্ছা মামণি, কৌশিক আর প্রমীলার সম্পর্কের কথা দত্তবাড়ির সবাই কি জানত? নাকি জেনেও না জানার ভান?”
— “সেটাই তো মনে হচ্ছে।”
— “তাহলে কৌশিককে খুন করার সব থেকে বড় মোটিভ একজনরই আছে?”
— “কার? আশীষের?”
— “হ্যাঁ। কারণ বউ, ভাইয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে সেই রাগে...”
— “আর চাকর শম্ভু? প্রমীলা তো আর চাকরের সাথে সম্পর্ক রাখেনি তাহলে সে খুন হল কেন?”
— “সিম্পল, কৌশিককে খুন করতে শম্ভু দেখে নিয়ে ছিল। সেটা আশীষ জানতে পেরে ওকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয় আর প্রমীলার ব্লাউজের টুকরো ওর হাতে গুঁজে দেয়। এক ঢিলে দুই পাখি।”
— “ভালো থিঙ্ক কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, দত্তবাড়ির বিষয়টা এত সহজ বিষয় নয়।”
— “কীভাবে?”
— “সেটা কনফার্ম করার জন্যই তো কাজটা করতে বললাম। একবার যদি ফাঁদে পা দেয় ঘুঘু, ব্যস কেল্লাফতে।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন