শান্তনু দাশ
কলকাতা ব্রাঞ্চে নিজের ঘরে একটা মোটা ফাইল সকাল থেকে ঘেঁটে চলেছে যশ। গত সাতমাস আগের একটা ব্যাঙ্ক ডাকাতির কেস। কোনো ক্লু যেন ধরা দিচ্ছে না যশের হাতে। আরোপীদের ধরে জেরা করেও কোনো ফল নেই। এদিকে এস.এস.পি. স্যার যশকে ক্রমাগত চাপ দিয়ে চলেছে এই ব্যাঙ্ক ডাকাতির ব্যাপারে। অবশেষে পুলিশ খবরীদের কাছ থেকে একটা খবর এলো এই ডাকাতির মূল পাণ্ডা যে তার ডানহাত মানে খুব খুব কাছের একজন দিল্লিতে ঘাঁটি নিয়েছে। সেই সম্পকির্ত ফাইলই যশ দেখে চলেছে।
দুইজন অফিসার যশের ঘরে এসে “জয় হিন্দ স্যার।” বলতেই যশ ফাইলের থেকে মুখ তুলে বলে ওঠে, “টিম রেডি করো বিনয়। দিল্লি বেরোতে হবে।”
— “আজ রাতেই স্যার?”
— “হ্যাঁ। আর এক মুহূর্ত দেরি করা যাবে না।”
যশের কথা শেষ হতেই দুই অফিসার স্যালুট মেরে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
অন্যদিকে দেহি নিজের কোর্টরুমের কাজ শেষ করে নিজের ঘরে এসে দত্তবাড়ির কেসের কাজে মন লাগিয়ে দিয়েছে। পরের সপ্তাহে আদালতে তারিখ পড়েছে। অর্থাৎ ঠিকঠাক নথি জমা দিতে না পারলে আদালত প্রথম শুনানিতে এই কেস খারিজ করে দেবে। কিছুক্ষণ পর শুভ্রা চেম্বারের দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়, গায়ের কালো রঙের লয়ার রৌটা হাতের উপর রেখে। শুভ্রার ছায়া টেবিলের উপর পড়তেই দেহি ফাইলের থেকে মুখ তুলে নিয়ে শুভ্রার দিকে তাকাতেই শুভ্রা খুব শান্ত গলায় বলে ওঠে, “আমাকে ডাকার কারণ? আরও কিছু অপমান বাকি আছে বুঝি?”
কথাটা শুনে দেহি চেয়ার ছেড়ে উঠে, দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে শুভ্রার ডানহাতটা ধরে নিয়ে বলে, “হ্যাঁ বাকি আছে।” কথাটা বলেই দুই বাহুতে শুভ্রাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে দেহি বলে ওঠে, “মুহূর্তের মধ্যে মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিল রে। বুঝতে পারিনি।”
শুভ্রা দেহির মাথায় আলতো করে হাত রেখে বলে, “সেটাই স্বাভাবিক। যশ না দেখলেও আমি কফিশপ থেকে তোর গাড়ি দেখে ফেলেছিলাম আর তাই ইচ্ছা করে তোকে দেখানোর জন্যই যশের হাতের উপর হাত রাখি।” কথাটা শুনেই দেহি শুভ্রার কাঁধ থেকে মাথা তুলে নিয়ে “মানে?” অবাক দৃষ্টিতে প্রশ্ন করে ওঠে। শুভ্রা একটা ছোট্ট হাসি হেসে বলে, “ওই দৃশ্য দেখার পর তুই যদি রিয়্যাক্ট না করতি তাহলে আমার হাত ধরাটাই বৃথা যেত কিন্তু যেটা হবার সেটাই হয়েছে। যশ বার বার আসলটা জানতে চাইছে। আমি তোর আর রূপমের কথা পুরো চেপে আছি। আমি বলে দিয়েছি আমি জানি না কিন্তু এইভাবে আর কতদিন? সত্যিটা তো একদিন জানবেই। মামণি রূপমের ফেরার আর রাস্তা নেই, কেন এই রকম করছিস?”
মুহূর্তের মধ্যে শুভ্রাকে ছেড়ে দেহি টেবিলের কাছে এগিয়ে কাঁপাস্বরে বলে ওঠে, “আমি কোনোদিন রূপমকে ভুলতে পারব না শুভ্রা। আজও মনে আছে, আমেরিকা থেকে ফিরে যেই মুহূর্তে ওর সাথে দেখা করি, সেই সময় মাথা নামিয়ে আমার সাথে কথা বলেছিল। তখনই বুঝেছিলাম কিছু একটা করে বসে আছে। আমি নেই আর সেই মুহূর্তে বিয়ে করে বসল। এই ঘটনা জানার পরও ওকে ভুল ভাবতে পারিনি। আর ওই দামিনী জানামাত্রই রূপমকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে দিল। দেড় বছর হয়ে গেল কোনো খবর আমি পাইনি।” কথাগুলো দেহি কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে। শুভ্রা ধীর কদমে দেহির কাছে এগিয়ে এসে দেহির কাঁধে হাত রাখতেই দেহি শুভ্রার দিকে তাকিয়ে চোখ থেকে জল ঝরাতে ঝরাতে বলে ওঠে, “সবাই আমাকে ভুল বুঝল। সিঁদুর মাথায় দিলেই কি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হয়? মন থেকেও তো মানতে হয়। রূপম যেখানে নিজের স্ত্রীকেই মানেনি, রূপমকে ভুল বুঝি কী করে বলতে পারিস? এই কথাটা কতবার মিমিকে বললাম, ওই দামিনীকে বললাম, দামিনীর পায়ে পড়লাম তাও মানল না। রূপমকে ট্রান্সফার করল সেইদিন বললাম একবার, শুধুমাত্র একবার আমাকে দেখা করতে দাও সেটাও দামিনী দেয়নি। কোথায় ট্রান্সফার করেছে আজও জানি না। এবার বল এরপরও নিজের জীবন নিয়ে জুয়া খেলব না তো কী করব? কী আছে আমার? কে আছে আমার? কেও নেই।”
— “মামণি তোর কাছে যেটা আছে সেটা কারোর কাছে নেই। তুই সোনা আর পিতলের মধ্যে গুলিয়ে ফেলছিস। যশকে বলে দে সব কথা।”
— “না। বলব না। আমার গায়ে হাত তুলতে গিয়েছিল।”
— “তোলে তো নি। আর তুই যে উঠতে বসতে ওর গায়ে হাত তুলিস তখন? তুই সবসময় বলতি প্রত্যেকটা মানুষের একটা সহ্য ক্ষমতা থাকে কিন্তু সেটা ক্রস করলে মানুষটা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। কাল তুই সেটাই করেছিস। যশকে আমার সাথে দেখে রাগ হয়েছিল, বা আমাকে খারাপ ভাবলি সব মানলাম, কিন্তু যশের চরিত্রতে দাগ দিতে গেলি কেন? এটা অন্যায় নয় মামণি? আমার কথা বাদই দে, যশকে তো আমার থেকে তুই ভালো করে জানিস। একঘরে রাতের পর রাত যে ছেলেটা মেঝের উপর শুয়ে ঘুমিয়েছে, একবারও তোর শরীরের উপর জোর খাটাতে যায়নি তার চরিত্র খারাপ এটা তোর ভাবনায় এলো কী করে? কালকের ব্যাপারে তোর উপর কোনো রাগ নেই আমার, কিন্তু যশের রাগের কারণটা আছে। পূর্ব দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে সূর্য উদয়ের আশা রাখলে কোনোদিন সেটা চোখে দেখতে পারবি না মামণি। কারণ যেদিকে তুই তাকিয়ে সেদিকে সূর্য অস্ত যায়। যশকে মেনেনে মামণি...!”
— “না। কখনোই না। আমি পারব না।” কথাটা বলে টেবিলের উপর হাতদুটো হাত রেখে চোখ বন্ধ করে মাথা নামিয়ে নেয় দেহি।
রঙমহল থিয়েটারের পরিচালক অবিনাশ পাল অভিনয়ের সামান্য গণ্ডগোল দেখে মঞ্চে উঠে এসে দেহিকে বিনয়ী সুরে বলে, “দেহি দেবী সব ঠিক আছে কিন্তু নবকুমারের পা-টা ধরার সময় আপনার আর-একটু এক্সপ্রেশন লাগবে সোহাগের। কারণ আপনার চোখ বুঝিয়ে দিচ্ছে এরপরের দৃশ্যে কিছু একটা ঘটবে সেটা আগের থেকে অডিয়েন্সকে বুঝিয়ে দিলে মুশকিল।”
— “ঠিক আছে, আর-একবার করছি।” দেহি মাথা নাড়িয়ে বলে ওঠে।
পরিচালকের কথামতো আর-একবার নাটকের দৃশ্যটি ঠিক মতো অভিনয় করে নিয়ে গ্রিনরুমে গিয়ে বসে দেহি। শঙ্করী ঘরে আসতেই দেহি বলে, “পরের সপ্তাহের বুধবার ফার্স্ট হেয়ারিং। তুমি কিন্তু অবশ্যই উপস্থিত থাকবে।”
দেহির কথা শুনে শঙ্করী কপালে সামান্য ভাঁজ কেটে নিয়ে বলে, “বউদি ছাড়া পাবে?”
— “সেটা বলা মুশকিল। কারণ এই কেসের সঠিক বক্তব্য পেশ করতে না পারলে কেসটাই খারিজ হয়ে যাবে।”
— “আর দত্তবাড়ি?”
— “আজকের মধ্যে কোর্ট থেকে নোটিস চলে যাওয়ার কথা। আমি কাল বিকালে দত্তবাড়িতে যাচ্ছি।”
দেহির কথাটা শোনামাত্রই শঙ্করী চমকে ওঠে। দেহি সামান্য হেসে বলে, “আমি কোর্টে ওঠার আগে সবসময় বিপরীত পক্ষের কথা শুনি। আমি যার পক্ষ হয়ে কেস লড়ছি সে যে সব সত্যিই বলেছে এটা আমি প্রথমেই বিশ্বাস করি না।”
— “কিন্তু ম্যাডাম ওই বাড়ি খুব সাংঘাতিক।”
— “আর আমি তার থেকেও সাংঘাতিক।” কথাটা বলেই দেহি ছোট্ট করে একটা চোখ মারে শঙ্করীকে।
শঙ্করী সামান্য হাসতেই দেহি প্রশ্ন করে, “আচ্ছা শঙ্করী, একটা প্রশ্ন আছে।”
— “বলুন।”
— “প্রমীলা দেবী থাকার সময় বাড়ির যাবতীয় সাংসারিক দায়িত্ব ওঁর উপর ছিল।”
— “হ্যাঁ।”
— “তারপর কার হাতে যায়?”
শঙ্করী দেহির লম্বা চুলে নকল জুঁইয়ের মালা লাগাতে লাগাতে বলে, “দায়িত্ব কেউ হাতে তুলে দেয়নি বলতে পারেন জোর করে দ্যুতি বউদি নিয়ে নিয়েছিল। বড়দা মানে আশীষদা একটু রাগী ও চুপচাপ প্রকৃতির মানুষ। ছোড়দা পুরো উলটো। আর মহেন্দ্রবাবু বেশ ভেঙে পড়েছিলেন মেজদার মৃত্যুতে।”
— “তোমার মেজদা বিয়ে করেনি কেন?”
— “তা জানি না। বোধহয় বড় বউদির জন্য।”
— “মহেন্দ্রনাথ তার মেজছেলের উপর একটু বেশি ডিপেন্ড থাকার কারণ কিছু বলতে পারবে?”
— “সঠিক জানি না তবে আমার মনে হয় মহেন্দ্রবাবুর কথামতো চলত বলে। দেখুন টাইট হয়েছে?” শঙ্করী প্রশ্নের মাথার বাঁদিকে হাত দিয়ে দেখে নিয়ে দেহি উত্তরে বলে, “হ্যাঁ।”
রাত সাড়ে দশটায় রিহার্সাল শেষ করে বাড়িতে ঢুকতে গিয়েই দেহি দেখে যশের বাইক। এত তাড়াতাড়ি কোনোদিনই যশ বাড়ি ফেরে না। গাড়ি বড় লংয়ে পার্ক করে, গাড়ি থেকে নেমে দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে ডোরবেল বাজতেই মঞ্জু দরজা খোলে।
— “তোমার দাদা কখন এসেছে?” দেহি প্রশ্ন করে।
মঞ্জু উত্তরে জানায় নটা নাগাদ যশ খুব হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছে। দেহি আর কোনো কিছু জিজ্ঞাসা না করে সিঁড়ি দিয়ে সোজা উপরে উঠে যায়। দরজা খুলে ঘরে ঢুকতেই দেখে একটা সাদা রঙের ছোট ট্রলিতে নিজের পোশাক ভরছে যশ। মুহূর্তে মধ্যে যশের কাছে এগিয়ে, দেহি বলে ওঠে, “ট্রলি গোছাচ্ছ কেন? কোথায় যাচ্ছ?” দেহির প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়েই নিজের মতো কাজ করে চলে যশ। ট্রলির চেন টানতে যাবে, এমন সময় দেহি চেন চেপে ধরে কপালে কুঁচকে রেগে বলে ওঠে, “আমি কিছু জিজ্ঞাসা করছি তোমায়। কোথায় যাচ্ছ?”
— “চেন ছাড়ো। আটকাব।” যশ গম্ভীর গলায় বলে ওঠে।
— “কোথায় যাচ্ছ?”
— “সেটা জেনে তুমি কী করবে?”
— “কারণ এই সময় তোমার বাবা-মা বাড়িতে নেই তারা ফিরে আমাকেই জিজ্ঞাসা করবে।”
— “সেটা নিয়ে তোমায় চিন্তা করতে হবে না। তোমায় কেউ কিছুই জিজ্ঞাসা করবে না, আমি ফোন করে জানিয়ে দেব। ছাড়ো আমি বেরোব।”
— “আমার উপর রাগ করে নিজের বাড়ি ছাড়ার দরকার কী?” চেনের উপর থেকে হাত সরিয়ে ড্রেসিং টেবিলের কাছে এগিয়ে বলে ওঠে দেহি। “আজ নিজের কিছু কাজ থাকার জন্য আমি যাইনি। আমি কালকেই চলে যাব।”
যশ কোনো রকম উত্তর না দিয়ে কাবার্ড খুলে কয়েকটা ফাইল বের করে নিজের অ্যাটাচীতে ভরে নেয়। দেহি আবার বলে ওঠে, “আমি কিন্তু এখনও উত্তর পাইনি। কোথায় যাচ্ছ?”
— “দিল্লি।” যশ বলতেই দেহি, আয়নার থেকে মুখ ঘুরিয়ে যশের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, “মানে? কতদিনের জন্য?”
— “বলতে পারছি না।”
— “তোমার বাবা-মা বাড়িতে নেই, তুমিও বেড়িয়ে যাচ্ছ, যদি কিছু দরকার পড়ে তখন?”
— “একা থাকতে ভালোবাসো, থাকো আর তোমার কাউকেই দরকার পড়বে না। তুমিই তো বলো যে একা সবকিছু সামলাতে পারো। আর আমার কাবার্ডের লকারের চাবি রয়েছে। লকারে টাকাও রেখে গেছি। আশা করছি অসুবিধা হবে না।” কথাটা বলে দ্রুতগতিতে ঘর থেকে ট্রলি আর অ্যাটাচী নিয়ে বেরিয়ে যায় যশ।
যশ বেরিয়ে যেতেই দেহি খাটের উপর বসে পড়ে। হঠাৎ দেহি দেখতে পায়, খাটের পাশে থাকা ডেক্সের উপরে একটা ছোট বুদ্ধমূর্তিতে চাপা দেওয়া চার ভাঁজ করা চিঠি। বুদ্ধমূর্তি সরিয়ে চিঠির ভাঁজ খুলতেই দেখে কয়েকটা লাইনে লেখা,
— “কাল অজান্তে রেগে গিয়েছিলাম। আমি যেখানে মাথা ঠান্ডা রাখার কথা বলি, সেখানে আমি নিজেই মাথা গরম করে তোমায় চলে যেতে বলেছিলাম। কিন্তু ওটা কেবলই মাথা গরমের কথা, আমার মনের নয়। ব্রাঞ্চের কাজে দিল্লি যাচ্ছি। আমার কাবার্ডের লকারের চাবি তোমার ড্রেসিং টেবিলের দেরাজে আছে। মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করো আর কালকের ব্যাপারটা যদি পারো, ভুলে যেও।
— যশ। ”
চিঠি পড়ামাত্রই দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রয়িং প্লেস পেরিয়ে বাড়ির পার্কিং লংয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই যশ গাড়িতে ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে বলে ওঠে, “পাগল হয়ে গেছো?”
দেহি গাড়ির কাছে এগিয়ে যশের সামনে দাঁড়িয়ে বলে, “যাওয়ার ইচ্ছা থাকলে আজকেই যেতাম কাজের দোহাই দিতাম না আর কালকের ব্যাপারটা যদি পারো ভুলে যেও।” কথাটা বলে গাড়ির সামনে থেকে সরে গিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকে যায় দেহি।
যশ সামান্য হেসে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে যায়।
পরেরদিন সকালে ফরেনসিক ডিপার্মেন্টে দেহি, মেধার সঙ্গে দেখা করতে যায়। মেধা নিজের ঘরের টেবিলের উপরে বসে হাতে দত্তবাড়ির দুই খুনের মানে কৌশিক দত্ত আর শম্ভু নাথের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট নিয়ে দেহিকে বলে, “আগের রিপোর্ট যা ছিল সঠিক মনে হচ্ছে। কৌশিক দত্তকে বিষ দেওয়া হয়েছে তারপর তাকে লোহার রডের সাথে নাইলনের দড়ি দিয়ে ঝোলানো হয়েছে। আর শম্ভু নাথের রিপোর্টে বলেছে খুনির সাথে একটা স্ট্রাগল চলে দ্যান খুনি খুব সরু পিন জাতীয় কিছু হৃদপিণ্ডে ফুটিয়ে তাকে খুন করে।”
দেহি ঘরের কাচের জানালার ধারে দাঁড়িয়ে সিগারেটে টান দিতে দিতে পুরো কথাটা শুনে নিয়ে বলে, “সামথিং মিসিং মেধা। মিসিং। কিছু একটা গোপনে আছে।”
— “দেখ দিদিভাই, যদি বডি থাকত আমি বলতে পারতাম। ফরেনসিকের ক্লুয়ের উপর ডিপেন্ড করে কী পাব?”
— “কৌশিক দত্তের পোশাকে বা শম্ভু নাথের পোশাক থেকেও কিছু পাওয়া গেল না?”
— “দিদিভাই সাতবছর আগের কেস, সাতদিনের নয়।”
— “মেধা আমি কিছু শুনতে চাই না। তুই কিছু হলেও বার কর। আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না এত ইজি ভাবে খুনি সামনে এলো কী করে? প্রথম থেকেই সব যেন সাজানো ঘুঁটি। একটা একটা করে ক্লু প্রমীলার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তোর থেকে মিমি অনেক ভালো।”
— “সেই এখন তো আমার মা ভালো হবেই। যদি তোমার কাজে আসতাম তাহলে আমি ভালো হতাম।”
— “ধুর। তুই কিছু একটা কর।”
— “আমি কী করব? আমি ভালো করে চেক করেছি।”
— “তুই আরও একবার কর।”
— “আচ্ছা। তাই হবে। এবার বল তুই আমার বাড়ি যাচ্ছিস কবে?”
— “দেখি।”
— “আচ্ছা, প্রমীলা খুন করতে পারে না এই ধারণা হচ্ছে কেন?”
দেহি জানালা দিয়ে সিগারেটের পোঁড়া অংশটা জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে বলে, “তিনটে কারণ, এক মোটিভলেস, দুই কৌশিক খুন হলে প্রমীলার ক্ষতি সত্য প্রকাশে আর তিন বিষ খাইয়ে লাশ তোলা। টাইমিং গণ্ডগোল লাগছে।” কথাগুলো শুনে নিয়ে মেধা বলে, “দুপুরের দিকে একবার আয়। আমি লাস্ট একটা চান্স নিয়ে দেখি যদি কিছু পাই।”
মেধা ফরেনসিক ল্যাবে কৌশিক দত্ত খুন হওয়ার দিন যে গেঞ্জিটা পড়েছিল সেটা কাচের বক্সটেবিলের উপর ফেলে হাতে একটা বড় ম্যাগনিফাইংগ্লাস নিয়ে গভীর দৃষ্টিতে দেখে চলেছে। হঠাৎ একটা বুকের কাছের নির্দিষ্ট জায়গায় ম্যাগনিফাইংগ্লাস নিয়ে যেতেই মেধা থেমে যায়। তাড়াতাড়ি ক্যামিক্যাল সেল্ফের কাছে এসে একটা লম্বা সরু কাচের ড্রপারে করে নীল রঙের একটা ক্যামিক্যাল নিয়ে গেঞ্জির কাছে এসে ওই নির্দিষ্ট জায়গায় সেটা ফেলতেই লাল রঙের গেঞ্জির বুকের কাছের জায়গাটা তামাটে বর্ণের হয়ে যায়। মেধার ঠোঁটের কোণায় একটা বিজয়ী হাসি।
কথামতো, দেহি ঠিক আড়াইটার সময় ফরেনসিক ডিপার্মেন্টে আসতেই মেধা তাড়াতাড়ি দেহিকে সঙ্গে করে ল্যাবে নিয়ে আসে।
— “কিছু পেলি?” দেহি প্রশ্ন করতেই মেধা একটা তীক্ষ্ণ হাসি হেসে বলে, “কিছু নয়, অনেক কিছু পেয়েছি।” বলে নিয়ে কৌশিক দত্তের গেঞ্জিটা হাতে তুলে বলে ওঠে, “এইখানে রঙটা বদলে গেছে সেটা দেখতে পারছিস?”
— “হ্যাঁ।” দেহি বলে।
— “আগের ফরেনসিক ডক্টররা এটাই মিস করে গেছে। এটা একটা বড় ক্লু।”
— “কী এটা?”
— “লবণ!”
— “কী?” দেহি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করতেই মেধা হেসে উত্তরে বলে, “মানে চোখের জল। চোখের জল শুকিয়ে একটা শুকনো আভা জায়গায় রেখে যায়। খুব নিখুঁত ভাবে পরীক্ষা না করলে সেটা ধরা সম্ভব নয়। যেটা গতবারের ডক্টর করেনি। তুই বলেছিলি যেদিন কৌশিক দত্ত খুন হয়, সেদিন প্রমীলার বদলে দীপিকা ওর সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। এবার তুই দীপিকার আর প্রমীলার চোখের জলের স্যাম্পেল নিয়ে আয়। আমি দুইজনের স্যাম্পেল মিলিয়ে নিয়ে দেখব কার ওটা।” কথাটা শুনে দেহি সামান্য মাথা নাড়ায়। মেধা বলে চলে, “এবার আসি বিষের ব্যাপারে। ফরেনসিক ডক্টর এটা ভুল করেছে নাকি ইচ্ছাকৃত সেটা বলতে পারব না।”
— “কী ব্যাপারে?”
— “রিপোর্টে মেনশন হয়েছে কৌশিক দত্তকে বিষ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু শম্ভু নাথের ফতুয়াতেও আমি বিষের স্যাম্পেল পেয়েছি। সূঁচে বিষের প্রলেপ লাগিয়ে সেটা যখন বুকে ফোটানো হয় তখন ফতুয়ার কাপড় ভেদ করার সময় আগায় লাগা বিষ ফতুয়াতে লাগে। এবার বিষে মারা গিয়েছিল কিনা সেটা কনফার্ম বলতে পারব না। কারণ রিপোর্টে বলা হয়েছে সূঁচ বুকের ভিতর দিয়ে হৃদপিণ্ডে ঢুকে ছিল।”
— “এটা কি হুট করে রাগের মাথায় খুনের ইঙ্গিত?”
— “কৌশিক দত্তের ক্ষেত্রে প্রিপ্ল্যানিং সম্ভব কিন্তু শম্ভু নাথের ব্যাপারে বলা সম্ভব নয়। আর তোর ধারণাই ঠিক। কৌশিক দত্তের ডেথ টাইম।”
— “কী রকম?”
— “যে বিষ কৌশিক দত্তকে দেওয়া হয়েছিল সেই বিষের ব্যাপারে স্টাডি করে জেনেছি বিষের মাত্রা হানড্রেড পার্সেন্ট দিলেও বিষক্রিয়া চলবে দুই দিন ধরে তারপর ভিকটিমের মৃত্যু হবে। অতএব কৌশিক দত্তকে বিষ দেওয়া হয়েছিল খুনের দুইদিন আগে রাত নটা থেকে দশটার মধ্যে আর গুরুত্বপূর্ণ কথা কৌশিক দত্তের বিষ এবং শম্ভু নাথের বিষ আলাদা। হতে পারে খুনি দুইজন অথবা ইচ্ছাকৃত খুনি বিষ বদলিয়েছে।”
— “গুড। এই না হলে মেধা দেশাই।” দেহি মেধার কাঁধে চাপড় মেরে কথাটা বলতেই মেধা হেসে বলে ওঠে, “থাক আর তেল দিতে হবে না। রান্না পারিস এখন?”
— “না। বাড়ির সবাই যদি রান্নাই করে বেড়ায় খাবেটা কে? খাওয়ার জন্য তো কাউকে লাগে। ধরে নে সেটা আমি।”
দেহির কথাটা শুনে মেধা হাসতে হাসতে একটা লাল রঙের চ্যানেল ফাইল দেহি হাতে তুলে দিয়ে বলে, “নতুন ফরেনসিক রিপোর্ট।”
দেহি রিপোর্ট হাতে নিয়ে মেধাকে জড়িয়ে ধরতেই মেধা শান্ত গলায় বলে, “বেস্ট ওফ লাক ফর দিস কেস।”
সোনারতরী থেকে গাড়িতে সন্তোষপুর ঢুকতে সময় লাগল প্রায় আধঘণ্টার মতো। বড় সড়ক পেরিয়ে গাড়ি ডান দিকে বাঁক নিল বাটিপল্লীর দিকে। একটা ত্রিতল বাড়ির লোহার গেটের সামনে দেহির ড্রাইভার সলীল গাড়ি থামাল। সময় বিকাল সাড়ে পাঁচটা। গেটের কালো মার্বেলের উপর সোনালি রঙ দিয়ে খোদাই করা “দত্তবাড়ি।” গাড়ি বাড়ির ভিতরে না ঢুকিয়ে দেহিই গাড়ির পিছন সীটের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে। পরনে সাদা রঙের ফুলস্লিভ লংস্কার্ট, পিঠের দিকে কাঁধের কাছ থেকে পুরো ইংরাজি “ভি” আকৃতি ধরে কোমরের মধ্যবর্তী স্থানে শেষ হয়েছে। মাথার ঘন লম্বা চুল হোস্টেল করে খোঁপা করা। বাঁ চোখের কাছ থেকে প্যাঁচানো একটা লক্স নেমে গেছে। চোখ সুন্দর করে কাজলে আঁকা, ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক, কানে সোনালি রঙের বড় কানপাশা, পায়ে সাদা পেন্সিল হিল ও হাতে সোনালি রঙের হ্যান্ডপার্স।
সদর দরজা খুলে দত্তবাড়িতে ঢুকে অন্দর দরজার কাছে এগিয়ে কয়েকবার ডোরবেল বাজাতেই বাড়ির ভিতর থেকে একজন দরজা খোলে।
— “কে আপনি?” একজন বছর ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের মেয়ে দরজাটা খুলে দেহিকে দেখে প্রশ্ন করে। দেহি খুব শান্ত গলায় বলে, “মহেন্দ্রনাথ দত্তের সাথে কথা আছে আমার।”
— “কিন্তু আপনি কে?”
— “সেটা পরে জানলেও চলবে।” কথাটা বলে মেয়েটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে দেহি।
প্রথমেই একটা বড় ড্রইং প্লেস। সোফায় সাদা রঙের টি-শার্ট ও কালো রঙের ট্রাকশুট পরে হাতে খবরের কাগজ নিয়ে বসে রয়েছে ত্রিশ বছরের ব্যক্তি। গায়ের রঙ ফর্সা মাথার ঘন কালো ব্যাকব্রাশ করা চুল।
দেহিকে কাছে আসতে দেখেই ব্যক্তিটি জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে “আপনি?” প্রশ্ন করে ওঠে।
দেহি গুরুস্বরে বলে ওঠে, “আপনি মহেন্দ্রনাথ দত্তের ছোটছেলে দেবাশীষ দত্ত?”
— “হ্যাঁ।”
— “আমার নাম দেহি। অ্যাডভোকেট দেহি। আমি প্রমীলা দত্তের লয়ার। “
কথাটা শোনামাত্রই দেবাশীষের মুখের ভাব পুরো বদলে গেল।
— “বাড়ির সবার সাথে আমার কথা আছে, ডাকুন।” বলেই দেহি সোফার উপর বসে ডান পায়ের উপর বাঁ পা-টা তুলে নেয়।
দেবাশীষ দোতলায় গিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ির সবাইকে ডেকে আনে। মহেন্দ্রনাথের বয়স ভালোই হয়েছে। সবাইকে একঝলক দেখে নিয়ে দেহি বলে ওঠে, “হিসাব বলছে একজন মিসিং। মানে বাড়ির ছোটবউ।”
দেহির কথাটা শেষ হতে না হতেই দেবাশীষ বলে ওঠে, “হ্যাঁ, আমার স্ত্রী দ্যুতি। আসলে উপরে মেয়েকে ঘুম পাড়াচ্ছে তাই...!”
— “তাই নীচে আসতেন পারলেন না।” দেহি বলে ওঠে। “ঠিক আছে আমিই উপরে যাচ্ছি। প্রথম প্রশ্ন উত্তরের খেলা না হয় ওঁকে দিয়েই শুরু করে আসি।” বলেই নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে দেহি সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে যায়। কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা না করে দোতলার করিডর থেকে বাঁয়ে বেঁকে দ্যুতির শোবার ঘরের ভেজানো দরজা। অনুমতি না নিয়েই সটান ঘরের ভিতরে এসে ঢোকে।
ঘরে ঢুকতেই দ্যুতি চমকে উঠে রেগে বলে ওঠে, “একি অসভ্যতামি?”
— “আমি এইরকমই দ্যুতি দেবী।”
— “দেবাশীষ বাবু বললেন আপনি মেয়ে ঘুম পাড়াচ্ছেন কিন্তু মেয়ে তো ঘুমিয়ে।”
— “আপনার এই ঘরে আসার কারণ জানতে পারি?”
— “না। আপাতত প্রশ্ন আমি করব, আর উত্তর আপনি দেবেন।”
— “বাধ্য নই।”
— “মেয়ে মানুষকে কীভাবে বাধ্য করাতে হয় সেটা আমি খুব ভালোমতোই জানি দ্যুতি দেবী। অ্যানিওয়ে, কাজের কথায় আসি? মেয়ে যখন ঘুমিয়েই পড়েছে তখন ঘরে বসে থেকে কী হবে, চলুন নীচে যাই। সেখানেই কথা হবে।”
— “যা বলার এইঘরেই বলুন।”
— “দ্যুতি দেবী না শোনার অভ্যাস আমার নেই। চুলের মুঠি ধরে যদি টেনে নামাই সেটা কি দত্তবাড়ির পাঠরানীর পক্ষে সম্মানজনক হবে? আর রইল আপনার উপর গায়ে হাত তোলার কথা, সেটা আমি আদালতে আমার মতো সামলে নেব। বলুন, নীচে যাবেন নাকি চুলের মুঠিটা ধরব?”
দ্যুতি রেগে চোখ বড় বড় করে ঘর থেকে বেরিয়ে নীচের দিকে যায়।
নীচে নেমে এসে দেহি বলে, “আপনারা নিশ্চয়ই কোর্টের কাগজ হাতে পেয়ে গেছেন আর এও জানেন আগামী বুধবার, দত্তবাড়ির মার্ডার কেস রিওপেন হবে। তাই সবাইকে একটাই প্রশ্ন আমার, প্রমীলা দেবী যদি নির্দোষ প্রমাণিত হয় তাহলে এই বাড়িতে থাকতে পারবে কিনা?”
কথাশুনেই আশীষ বলে ওঠে, “প্রমীলা নির্দোষ এটা আপনি কী করে বুঝলেন?”
— “কী বুঝলাম, কেন বুঝলাম সেটার জন্য আদালত আছে, দত্তবাড়ি নয়। আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।”
— “আগে প্রমাণ হোক তারপর ভেবে দেখব।” কথাটা আশীষ নয় মহেন্দ্রনাথ দত্ত বলে ওঠে।
দেহি মাথা নাড়িয়ে সামান্য হেসে বলে “ঠিক আছে। দ্বিতীয়প্রশ্ন আর শেষ প্রশ্ন, “কৌশিকবাবুর উইলের মতে তার অংশ প্রমীলা দেবীকে দেওয়া হবে। সেটা?”
— “কৌশিকের কোনো অংশ নেই।” মহেন্দ্রনাথ কথাটা বলতেই, দেহি বলে ওঠে, “তার মানে আপনি কৌশিকবাবুর খুনের পর উইল বদলেছেন?”
— “হ্যাঁ।”
আর একটি কথাও না বলে দেহি সোজা দীপিকার কাছে এগিয়ে বলে ওঠে, “প্রমীলা দেবী আপনার খুব প্রশংসা করছিলেন দীপিকা দেবী। চলুন আমাকে গাড়ি পর্যন্ত ছেড়ে দেবেন।”
দীপিকা আশীষের দিকে তাকাতেই আশীষ চোখের ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয় সেটা করতে। দীপিকাকে সঙ্গে করে বাড়ির বাইরে নিয়ে এসে দেহি বলে, “খুনের দিন আপনি কৌশিকবাবুর কাছে গিয়েছিলেন তাই তো?”
কথাটা শুনেই দীপিকা চমকে উঠতেই দেহি বলে ওঠে, “দত্তবাড়িতে আপনার সম্মান বাঁচানোর জন্য সে এতগুলো বছর চুপ করে ছিল। এবার আপনার পালা দীপিকা দেবী। কোর্টে সেটা বলবেন।”
— “আমার শ্বশুরমশাই আর দ্যুতি বাড়ি থেকে বের করে দেবে আমাকে।”
— “আপনার অধিকার থেকে আপনাকে কেউই সরাতে পারবে না। আর তাছাড়া আশীষবাবু এমনিও দোষ করে বসে আছে। নিশ্চিন্তে থাকুন আমি সেটা হতে দেবো না।”
দীপিকার চোখ ছলছল করে উঠতেই দেহি পার্স থেকে সাদা রুমাল বের করে বলে, “নিন চোখের জলটা মুছে নিন।”
দীপিকা রুমালটা হাতে নিয়ে চোখ মুছে দেহিকে দিতেই দেহি সেটা পার্সে ঢুকিয়ে গাড়িতে গিয়ে ওঠে। গাড়িতে বসতেই ড্রাইভার সলীল গাড়ি স্টার্ট দেয়।...
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন