শান্তনু দাশ
বাড়ির নাম সোনার তরী। সেই বাড়িরই বড় লোহার গেটের সামনে স্লেট রঙের মার্সেটিজ গাড়িটা থামল মাঝরাতে। মেইনগেট খুলে গাড়িটিকে ভেতরে ঢুকিয়ে গাড়ি পার্ক করে, সদর দরজা খুলতেই দেখে নীচের বড় হলঘরটি ঘুটঘুটে অন্ধকার। হিলতোলা পায়ের জুতোর খটখট শব্দে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে যাবে এমন সময়, “দাঁড়াও!” ডাক শুনে দেহি দাঁড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে জ্বলে ওঠে হলঘরের আলো। বড় হলঘরের আলো জ্বলে উঠতেই দেহি চোখের সামনে নিজের বাঁ হাতটা এনে চোখ ঢাকে। পরনে ডালিম রঙের লং স্কার্ট। মাথার লম্বা গাঢ় বাদামি রঙের চুল খোলা, হাতে সোনালি রঙের হ্যাঁন্ডপার্স, পায়ে সোনালি রঙের পেন্সিল হিল। চোখের উপর থেকে হাত সরিয়ে গম্ভীর স্বরে দেহি বলে ওঠে, “আপনার আর কোনো কাজ নেই? আমার পিছনে ডাক দেওয়াই আপনাদের একমাত্র লক্ষ্য?” দেহির শরীরের থেকে তীব্র ওয়াইনের গন্ধ ভেসে আসছে আর সামনে দাঁড়িয়ে শাশুড়ি পৃথা।
— “লক্ষ করতাম না, যদি না তুমি সংসারটা ধরতে দেহি।”
— “রাত দুটোর সময় বাড়ি ফিরে লেকচার শোনার সময় আমার নেই।” কথাটা বলেই সোনালি রঙের পার্সের চেনটা খুলে সিগারেটের বাক্সটা বের করে নিয়ে তার থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে দেহি বলে ওঠে, “আপনি আপনার কাজ করুন।”
পৃথা মুখ গম্ভীর করে গুরুস্বরে বলে ওঠে, “তুমি বোধহয় ভুলে যাচ্ছ তুমি রায়চৌধুরী বাড়ির পুত্রবধু। সংসারের একটা দায়িত্ব তুমি নাওনি। রাত আড়াইটার সময় কোন ভদ্রলোকের বাড়ির বউ মদ খেয়ে ক্লাবপার্টি করে শ্বশুরবাড়ি ঢোকে? আধুনিকতা মানে তো ব্যভিচার নয় দেহি।”
— “শাট আপ ইউ বিচ।”
— “দেহি...!” পৃথা চিৎকার দিতেই দেহি ডানহাতের তর্জনীটা ঠোঁটের কাছে নিয়ে এসে “হুঁশশশশ...!” করে ওঠে। “আস্তে, কানে লাগে। এত জোরে কথা বললে আমার নেশাটাই কেটে যাবে। আর হ্যাঁ বাড়িতে বসে আমার কাছ থেকে শ্বশুর-শাশুড়ি সেবা পাওয়ার আশা রাখবেন না।”
— “রাখি না। বিন্দুমাত্র রাখি না।”
— “তাহলে মাঝরাতে না ঘুমিয়ে আমাকে আটকাচ্ছেন কেন?”
— “আটকাচ্ছি এই কারণে, যে যার হাতটা ধরে এই রায়চৌধুরী বাড়ির বউ হয়ে এসেছ, তাকে অন্তত দেখো। স্বামীটা তোমার। বিয়ের পর প্রত্যেকটা স্বামীই চায় তার স্ত্রীয়ের একটু সঙ্গ, একটু ভালোবাসা। আমাদের সেবা করতে যশ তোমাকে বাড়ির বউ করে নিয়ে আসেনি দেহি আর আমি নিজেও মনে করি না যে বাড়ির বউকে, শ্বশুর-শাশুড়িকে একেবারে সিংহাসনে বসিয়ে সেবা করতে হবে। সংসারটা শুধু আমার একার নয় দেহি, তোমারও। তোমার বর কী খাচ্ছে কোথায় যাচ্ছে এক মুহূর্তের জন্য খোঁজ নাও তুমি?”
— “আপনি নিজে থামবেন নাকি আমি দুইহাত মেরে থামাব?”
— “দেহি!”
— “আর একটা কথা ভালো করে বুঝে নিন, না আমার এই রায়চৌধুরী বাড়ির প্রতি কোনো মোহ আছে না আপনার ছেলে, কী যেন নাম, ও হ্যাঁ যশ, যশের প্রতি অনুরাগ আছে। দ্বিতীয়বার আমি বাড়ির ফেরার পর লেকচার দিতে এলে ফলটা ভালো হবে না। নিজের গায়ে আগুন জ্বেলে ফোর নাইনটি এইট ঠেসে জেলে পাঠাব, মনে থাকে যেন।” কথাটা বলেই খটখট শব্দে দোতলায় উঠে যায়। উঠতে উঠতে আপনমনে দেহি তেজে বলে ওঠে, “বাল! পুরো নেশাটা শালা কেটে দিল।”
সিঁড়ি পেরিয়ে দোতলার বড় বারান্দা অতিক্রম করে ডায়ে বাঁক নিয়ে গণেশ খোদাই করা কাঠের দরজার হ্যাঁজবোলটা ঠেলে ঘরে ঢুকে স্যুইচ জ্বালতেই দেহি দেখতে পায়, বড়খাটের বাঁপাশে বালিশে মাথা দিয়ে চোখের উপরে হাত রেখে ঘরের মেঝেতে শুয়ে আছে যশ। পরনে নীল স্যান্ডোগেঞ্জি আর ধূসর রঙের ট্রাকশ্যুট। ঘরের দরজা পা দিয়ে ঠেলে বন্ধ করে ঘরের ড্রেসিং টেবিলের সামনে এগিয়ে পার্সটা ড্রেসিং টেবিলের ডেক্সের উপর রেখে কানের পাশে লাগানো কাঁটা ক্লিপ ধীরে ধীরে খুলতে থাকে। ঘরে ঢুকতেই ওয়াইনের গন্ধ ম-ম করে শোবার ঘরকে ছেয়ে ফেলে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে পাশক্লিপ খুলতে খুলতে একদৃষ্টে আয়নায় নিজেকে দেখতে থাকতে দেহি। দেহির চোখ যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে, সে সব ছারখার করতে উদ্ধত হয়ে উঠেছে। চোখের উপরে হাত দিয়ে ঢেকে রাখলেও আর চোখে দেহিকে দেখে চলেছে যশ। বিয়ের পর থেকেই একঘরে থাকলেও একখাটে এই দম্পতি রাত্রিযাপন করে না। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা যেটাই হোক, দেহি খাটে ও যশকে ঘরের মেঝেতে শুয়েই রাতগুলো কাটাতে হয়। বিয়ে করেও তাদের মধ্যে চলেছে বিয়ের নামে সন্ন্যাস।
চুলের যাবতীয় কাঁটা ক্লিপ খুলে, আয়নার সামনে থেকে সরে যায় ঘরের কাবার্ডের দিকে। কাবার্ড খুলে একটা হালকা রঙের আকাশী সিল্কের স্লিপিংগাউন বের করে, কাবার্ড বন্ধ করে বাথরুমে ঢোকে দেহি। মিনিট পনেরো পর বাথরুম থেকে পোশাক বদলে চোখের কাজল, ঠোঁটের হালকা মেরুন লিপস্টিক ও মুখের মেকআপ তুলে বেরিয়ে আসে। ড্রেসিং টেবিলের ডেক্স থেকে পার্সটা হাতে তুলে পার্সের চেনটা খুলে সিগারেটের বাক্সর থেকে সিগারেট বের করে নিয়ে সেটা লাইটার জ্বেলে জ্বালিয়ে, লাইট বোর্ডের কাছে গিয়ে আলো নিভিয়ে ঘরের কাচের জানালার দিকে গিয়ে দাঁড়ায় দেহি।
— “আমাকে সম্মান করো না ঠিক আছে, বাড়ির যারা বড়, যারা সবসময় তোমার ভালো চাইছে তাদের অসম্মান করছ কেন?” অন্ধকার ঘরে খুব ধিমিকণ্ঠে যশ দেহির উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলে ওঠে। দেহি জানালার ধারে দাঁড়িয়ে একইরকম ভাবে সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে চলেছে। যশ মেঝে থেকে উঠে ধীরে ধীরে জানালার কাছে এগিয়ে, দেহির দিকে তাকিয়ে বলে, “তোমার সব রাগ তো আমার উপর। তাহলে আমার মা-বাবাকে তার শাস্তি দিচ্ছ কেন? শাস্তিটা আমার বরাদ্যেই থাক। জানি না কোন অপরাধের শাস্তি তুমি দিয়ে চলেছ?” যশের কথা শেষ হতে না হতেই মুহূর্তের মধ্যে দেহি ডানহাতের দুই আঙুলের ভিতরে ধরে রাখা জলন্ত সিগারেটটা যশের ডান বাহুতে ছ্যাঁকা দিয়ে ওঠে।
— “আহঃ...! মামণি। কী করছ?” ছ্যাঁকা জায়গায় বাঁহাত চেপে নিজের জায়গা ছেড়ে ছিটকে গিয়ে যশ কথাটা বলতেই দেহি ঠোঁটের কোণায় একটা হাসি দিয়ে শান্ত গলায় বলে, “পুড়ে গেল, তাই না ইন্সপেক্টর? জ্বলছে? একটা সামান্য সিগারেটের ছ্যাঁকা খেয়ে এই অবস্থা। আর যে মানুষটা প্রতিদিন জীবন্ত চিতাতে বসে পুড়ে চলেছে তার কী হচ্ছে?”
— “বিয়ের পর থেকে এইভাবে দিনের পর দিন রাগ তোমার বেড়ে চলেছে। কেন এরকম করছ? কীসের রাগ এত? কার উপরে? আমাকে অপছন্দ থাকলে কেন আমাকে বিয়ে করলে?”
মুহূর্তের মধ্যে দেহি যশের গালে চড় মেরে তীব্রস্বরে বলে ওঠে, “লিসন ইন্সপেক্টর, আমার উপর স্বামীগিরি ফলাতে যেও না। আগেও বলেছি আবারও বলছি, না আমি বিয়েটা মেনেছি না তোমাকে স্বামী। পুঁতে রেখে দেব লেকচার দিতে এলে। আর খুব ভালোমতো জানো, আমি যেটা বলি সেটাই করি। চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়ো।”
যশ আর কোনোরকম কথা না বলে মেঝেতে গিয়ে বালিশে মাথা রাখে। দেহি জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরের কালো আকাশ দেখতে থাকে।
কোর্টরুমের কাজ শেষ করে গায়ের কালো রঙের লয়ার-রৌটা টেবিলের উপর খুলে রেখে টেবিলের সামনে থাকা চেয়ারটায় বসতে যাবে এমন সময় শুভ্রা ঘরে এসে ঢোকে।
— “মিটল?” দেহি প্রশ্ন করে ওঠে।
— “না। এত তাড়াতাড়ি মেটে? পরের মাসে হেয়ারিং পড়ল আবার।” কথাটা বলতে বলতে দেহির সামনের চেয়ারটায় শুভ্রা বসে।
হঠাৎ দেহির ব্যাগের ভিতর থেকে সেলফোনটা বেজে উঠতেই দেহি ব্যাগের থেকে সেলফোন বের করে দেখে নাম নয়, নম্বর। ফোন রিসিভ করে দেহি। — “হ্যাঁলো! অ্যাডভোকেট দেহি স্পিকিং।”
— “হ্যাঁলো, আমি অবিনাশ পাল কথা বলছি।”
— “অবিনাশ পাল?”
— “রঙমহল থিয়েটারের...!”
— “হ্যাঁ হ্যাঁ, অবিনাশ বাবু চিনতে পেরেছি বলুন।
— “আপনি আমাকে আধঘণ্টা মতো একটু সময় দিতে পারবেন?”
— “হ্যাঁ নিশ্চয়ই। কী হল আবার? থিয়েটারে কোনো সমস্যা?”
— “না না, সেরকম কিছুই নয়। একটু অন্য ব্যাপারে।”
— “ঠিক আছে আপনি তাহলে আজ আটটা নাগাদ আমার চেম্বারে আসুন।”
— “অশেষ ধন্যবাদ।” বলে অবিনাশ পাল ফোনটা কেটে দেয়।
কথামতো ঠিক আটটা নাগাদ অবিনাশ পাল একটি মেয়েকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে দেহির কালিন্দীর চেম্বারে দেখা করে। দেহি তার বেয়ারাকে চা আনতে বলে অবিনাশ পালের দিকে তাকিয়ে, “হ্যাঁ বলুন ব্যাপার?” বলে ওঠে।
অবিনাশ পাল সামান্য হেসে নিয়ে বলে, “একসময় আপনার মা ডি.আই.জি. দামিনী ম্যাডাম আমাদের রঙমহল থিয়েটারে তদন্তের স্বার্থে দুর্গার ভূমিকায় অভিনয় করে এসেছে। তার চর্চা আজও আমাদের থিয়েটারে সবার মুখে মুখে।”
দামিনীর নাম শোনামাত্রই দেহির মুখ গম্ভীর হয়ে যায়। বেশ শান্ত অথচ গুরুস্বরে বলে, “আপনি কি দামিনী সেনসরকারের প্রশংসা করতে আমার কাছে এসেছেন?”
— “না! না। আমি এসেছি আমার একটি বিশেষ কাজে। আগামী চার মাস পর মোহিতমঞ্চে একটি নাটক আমি মঞ্চস্থ করতে চলেছি। আমি খুব আশা নিয়ে এসেছি যে ওই নাটকটিতে আপনি যদি অভিনয় করেন।” কথাটা শোনামাত্রই দেহি চমকে ওঠে। “আমি?” দেহি বলে। “আপনার মাথা ঠিক আছে অবিনাশ বাবু?”
অবিনাশ পাল বেশ ভয়ে ভয়ে ঢোক গিলে বলে, “আসলে যে নাটকটি আমি করতে চলেছি তাতে আপনার ছোট বোন শ্রীতমা দেবীও অভিনয় করতে রাজি হয়েছেন।”
— “মণি?”
— “হ্যাঁ। আমার ইচ্ছা আপনারা দুইবোন এই নাটকটিতে অভিনয় করুন। কোনো অসুবিধা হবে না। যে নায়িকা চরিত্রে আপনাকে বসাতে চলেছি সেই চরিত্রটি আপনার পছন্দ হবেই।”
কথাগুলো বলেই একটা মোটা নাটকের স্ক্রিপ্ট বের করে টেবিলের উপর দেহির সামনে রাখে।
— “এই হল গল্পটি।” অবিনাশ পাল বলে। “আপনি আগে পড়ে দেখুন যদি খারাপ লাগে করবেন না।”
এরপর অনেক জোর করে যখন দেহিকে রাজি করাতে অপারগ অবিনাশ পাল সেই মুহূর্তে অবিনাশ পালের সঙ্গে আসা মেয়েটি দেহিকে রাজি করাতে সক্ষম হয়।
— “মেয়েটি কে অবিনাশ বাবু?” দেহি প্রশ্ন করতেই অবিনাশ পাল বলে, “এর নাম শঙ্করী, শঙ্করী পাল। কয়েকবছর হল দলের সাথে কাজ করছে। জানেন এই মেয়েটি শিক্ষিতা হয়েও লোকের বাড়িতে কাজের মেয়ের কাজ করে এসেছে।”
কথাটা শুনে দেহি একটু অবাক হয়ে “মানে?” জিজ্ঞাসা করতেই শঙ্করী উত্তরে বলে, “আসলে আজ থেকে সাতবছর আগে আমি এক বড় ব্যবসায়ী ব্যক্তির বাড়িতে কাজের মেয়ে হিসাবে কাজ করতাম। একদিন হঠাৎ ওই বাড়ির মেজছেলে খুন হয়। তদন্ত করে জানা যায় খুন করেছে ওই বাড়ির বড়বউ। কিন্তু আমার বিশ্বাস ছিল বউদি মানে ওই বাড়ির বড়বউ খুন করেনি। একমাত্র আমিই কোর্টে বউদির সপক্ষে সাক্ষী দিই। এটাই অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়। ওই বাড়ির ছোটবউ আমাকে কাজের থেকে বের করে বাড়ির থেকে তাড়িয়ে দেয়। তারপর অবিনাশবাবুর সাথে আমার দেখা হলে উনি আমায় ওঁর দলে কাজে নেন।”
পুরো ঘটনাটা শুনে দেহি বলে, “কোন বাড়িতে কাজ করতে?”
— “দত্তবাড়ি। বাড়ির কর্তা মহেন্দ্রনাথ দত্ত।”
অবিনাশ পালের বোধহয় এসব কথা শুনতে ভালো লাগছিল না। তাই জন্যই কথা কেটে জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “দেহি দেবী, নাটকটি করবেন তো?”
কথাটা শুনে দেহি সামান্য হেসে নিয়ে বলে, “আগে গল্পটি পড়ি দ্যান জানাব। যাইহোক, গল্পটির নাম কী আর আমার চরিত্র কোনটি?”
কথাটা শুনে অবিনাশ পাল বেশ আগ্রহের সঙ্গে বলে ওঠে, “গল্পের নাম কপালকুণ্ডলা। আপনার চরিত্রটি হল লুতফা উন্নিসা ওরফে পদ্মা আর শ্রীতমা দেবী আর-একটি নায়িকা কপালকুণ্ডলা চরিত্রে অভিনয় করছেন।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন