শান্তনু দাশ
হোটেলের রুমের ভিতরে এসে দেহি দেখে ব্যবস্থা সব ভালোই। ফোর স্টার হলেও ফাইভ স্টার থেকে কম কিছুই নয়। হোটেলের গ্রাউন্ড ফ্লোরটায় ক্যান্টিন। রুমবয় ট্রলি রেখে দেহির মুখের দিকে তাকাতেই দেহি বলে ওঠে, “কফি হোগা?”
— “ইয়েস ম্যাম।” বছর কুড়ির ছেলেটি বলতেই দেহি মাথা নাড়িয়ে পার্স খুলে, দুইশো টাকার একটা নোট বের করে ছেলেটিকে টিপ দেয়। টিপ হাতে করে ছেলেটি বেরিয়ে যেতেই দেহি, রুমের আয়নার সামনে গিয়ে নিজেকে একবার দেখে নিয়ে কানের কাছে লাগানো কাঁটা ক্লিপটা একটু চেপে আয়ানার থেকে সরে আসে। ট্রলিটাকে রুমের সোফায় উঠিয়ে চেন খুলে নিজের দরকারি জিনিসপত্রগুলো একঝলকে দেখে নেয়। মিনিট পাঁচেক পর রুমের দরজায় টোকা মেরে “কফি ম্যাম” বাইরে থেকে ছেলেটি বলে ওঠে। দরজা খুলে ট্রে থেকে কফির মগ তুলে নিয়ে দেহি ছেলেটিকে বলে, “দশমিনিট বাদ আকে কাপ লে যানা।”
— “শিয়োর ম্যাম।”
হোটেলের সোফায় বসে কিছু একটা চিন্তা করতে করতে কফিতে চুমুক দিতে থকে দেহি। ইতিমধ্যে হঠাৎ বেডের পাশে থাকা ল্যাম্পডেক্সের উপরে রাখা ফোনটা বেজে ওঠে। সোফার সামনে থাকা টি-টেবিলের উপর কফি মগটা রেখে ফোনের কাছে এগিয়ে রিসিভারটা তুলে “হ্যাঁলো” বলতেই বিপরীত দিক থেকে গলা ভেসে আসে, “হ্যাঁলো ম্যাম, রিসেপশনিস্ট সঞ্জনা হিয়ার। আপনে জো প্রাইভেট ট্যাক্সি মাঙ্গওয়ায় থে উসকা ড্রাইভার আ গ্যায়া। আগাড় আপ বিজি না হো তো উসে আপসে মিলনে কো বলু?”
— “জী। নাম কেয়া হ্যাঁ উসকা?”
— “জী প্রবীন। প্রবীন শর্মা।”
ব্লুয়েড বারের সামনে প্রাইভেট ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে গাড়ি থেকে নেমে দেহি সোজা ঢুকে যায় বারের ভিতরে। বারের ভিতরটা পুরো কাচ দিয়ে বাঁধানো। মাঝে কাচের ড্যান্সফ্লোরকে ঘিরে চারিদিকে চারটে রোলিং সীট নিয়ে কাচের গোল টেবিল। বারের কাউন্টারের সামনে দেহি এগিয়ে যেতেই কাউন্টারে থাকা লোকটির মুখের ভাব সম্পূর্ণ বদলে গেল।
— “জী ম্যাডাম।” লোকটির প্রশ্ন শুনে দেহি নিজের জিন্স প্যান্টের ব্যাকপকেট থেকে সেলফোনটা বের করে তার থেকে একটা ছবি দেখিয়ে বলে ওঠে, “ইয়ে লড়কী ইয়াপাড় আতি হ্যায়?”
— “জী ম্যাডাম।”
— “আকেলি ইয়া সাথ মে কোয়ি ওর ভি?”
— “সাথমে এক আদমি র্যাহেতা থা। ওর য়ো জো আদমি হ্যায়, য়ো ইহা কা পার্মানেন্ট কাস্টমার হ্যায়।”
— “নাম ক্যায়া হ্যায় উস আদমিকা?”
— “সেলিম।”
দেহি আরও কিছু প্রশ্ন করতে যাবে এমন সময়, হঠাৎ দেহির পিছনে চার-পাঁচজন ব্যক্তি এসে দাঁড়ায়।
— “হোয়াট?” দেহি জিজ্ঞাসা করতেই এক ব্যক্তি বুকপকেট থেকে আইকার্ডটা বের করে দেহির মুখের সামনে ধরে। এরা সবাই দিল্লি ব্রাঞ্চের অফিসার। দেহি বুঝতে পারল, ইন করা শার্টটা বারে আসার আগে ছেড়ে রাখে আর কোমরের দিকে গোঁজা ছিল দেহির গানটা, ফোন বের করতে গিয়ে গানের ট্রিগারটা দেখে ফেলেছিল অফিসাররা। একজন লেডি অফিসার দেহির কোমর থেকে গানটা বের করে নিয়ে বলে ওঠে, “ইয়ে ক্যায়া হ্যায়?”
— “গান হ্যায়।”
— “কিউ হ্যায়?”
— “জিসকে লিয়ে আপ লোগোকে পাশ মে হ্যায়।”
— “উলটা জাওয়াব দেতি হ্যায়?” কথাটা বলেই মুহূর্তের মধ্যে দেহির গালে চড় মারে লেডি অফিসারটি।
লাকশা নামে রূপমের এক খবরি এসে জানায় নিউ দিল্লির বর্ডার সীমানায় পঞ্চম হোটেলে সেলিম রয়েছে। ওখান থেকে উত্তরাখণ্ড যাবার প্ল্যান করেছে। রূপম কথাটা যশকে জানানো মাত্রই যশ বলে, “দিনে না, রাতে তোল মালটাকে, মাল সমেত। কারণ বর্ডার ক্রস একা করবে না। ব্যাঙ্কের টাকা নিয়েই করবে।” যশের কথায় সামান্য মাথা নাড়িয়ে রূপম বলে, “আর তোর ধারণাই ঠিক। সেলিম ব্লুয়েডেই যায় আর নাফিসাও থাকে। ওরা ফোন করে জানালো। এদিকে কোন এক মেয়েকে গান সমেত ধরে নিয়ে আসছে।”
— “ও। নাফিসার কোনো খবর?”
— “হ্যাঁ। দুইদিন আগে সেলিম আর নাফিসা বারে যায়। সেলিমের টাকা কম পড়ে যাওয়ায়, নাফিসা নিজের আংটি ওখানে দিয়ে আসে আর বলে, আজ রাতে সেটা টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে।”
— “রাতে বার অন হয় কখন?”
— “দশটা।”
— “ঠিক আছে, তুই বর্ডারের দিকে সেলিমকে তোল, আমি নাফিসাকে তুলছি।”
কথা শেষ করে যশ আর রূপম সিক্রেটরুম থেকে বেরিয়ে আসে। ব্রাঞ্চের বাইরে এসে রূপম ও যশ নিজের নিজের বাইকে উঠে স্টার্ট দিয়ে ব্রাঞ্চের বাঁ গেট দিয়ে বেরোয়। অপরদিকে ডান গেট দিয়ে পুলিশভ্যানে দেহি ব্রাঞ্চে ঢোকে।
ইনচার্জ রুমে দেহিকে ক্রমাগত জেরা করে চলেছে অফিসাররা। দেহির কথা কিছুতেই ওরা বিশ্বাস করতে চাইছে না যে দেহি একটি বিশেষ কাজে কলকাতা থেকে দিল্লি এসেছে। যে গানটা দেহির কাছ থেকে ওরা পেয়েছে, ওটা লাইসেন্স প্রাপ্ত। ভুলবশত সেটা কলকাতাতে ফেলে এসেছে। অফিসারদের সঙ্গে দেহির তর্ক আরও বেড়ে উঠেছে, এমন সময় যশের সঙ্গে আসা একজন অফিসার কাউন্টর রুম থেকে বেরিয়ে এসে সোজা ঢোকে ইনচার্জ রুমে। দেহিকে ইনচার্জ রুমে দেখামাত্রই অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “এ কী, আপনি ম্যাডাম? এখানে?”
ইনচার্জ রুমের ইন্সপেক্টর চৌবেজী কৌতূহল নজরে বলে ওঠে, “সমীরজী আপ জানতে হ্যায় ইসকো? ইয়ে ক্রিমিনাল হ্যায়।”
অফিসার সমীর নিজের কপালে ডান হাত মেরে বলে ওঠে, “যশ স্যারকো আগাড় পাতা চলা না, তো পুরা ব্রাঞ্চহি উলট পলট কর দেঙ্গে।”
— “মাতলাব?”
— “মাতলাব? মাতলাব, ইয়ে হ্যায় চৌবেজী, জিসকো আপ পকড়কে লায়ে হ্যায় না, ইয়ে কোয়ি ওর নেহি, যশ স্যারকা পত্নী হ্যায়।”
— “ক্যায়া?” শোনামাত্রই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় ইন্সপেক্টর।
— “হ্যাঁ। ওর ইয়ে কলকাত্তাকা এক জানেমানে ওয়াকিল হ্যায়।”
দেহির রাগ তখন সপ্তমে। মুহূর্তের মধ্যে বলে ওঠে, “যতসব বুদ্ধিহীনদের নিয়ে ব্রাঞ্চ চালাচ্ছে। আমার পুরো প্ল্যানটা ভেস্তে দিল।”
অফিসার সমীর বেশ নরম ও ভয়ার্তসুরে জিজ্ঞাসা করে, “কোনো বিশেষ দরকারে সুপ্রিম কোর্টে এসেছেন?”
— “না। আমি এসেছি রঘুবীর ওরফে সেলিমের খোঁজে।”
— “কী?”
— “হ্যাঁ। একটা কেসে এর নাম উঠে এসেছে।”
— “স্যারও এরই খোঁজে...”
— “জানি।” কথাটা চেপে দেহি বলে ওঠে।
— “এই সেলিমের সাথে একটা মেয়ের নামও এখানে উঠে এসেছে। নাফিসা।” বলে অফিসার ফাইল থেকে নাফিসার স্কেচ বের করে দেহিকে দেখাতেই দেহি মুহূর্তের মধ্যে বলে ওঠে, “এর নাম নাফিসা নয়। দ্যুতি দত্ত। দত্তবাড়ির ছোটবউ। এই দত্তবাড়ির কেসের ব্যাপারেই দিল্লি আসা।” দেহি কথাটা শেষ করেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই লেডি অফিসারকে কষিয়ে বাঁ হাতের চড় মারতেই লেডি অফিসার ছিটকে পড়ে রুমের মেঝেতে।
— “সরি, সরি। গলত মাঝ সামঝিয়ে, গাল পে মছছর থা।” বলে নিয়ে টেবিলের উপরে রাখা গানটা হাতে তুলে, দেহি ইনচার্জ রুম থেকে বেরিয়ে যায়। বেরোবার ঠিক আগে, পিছন না ঘুরেই দেহি গম্ভীর গলায় বলে, “সমীরবাবু, যশ যেন খবর না পায় আমি দিল্লি এসেছি।”
ইন্সপেক্টর সম্পূর্ণ দৃশ্যটা দেখে নিয়ে ধিমি গলায় বলে ওঠে, “ইয়ে ক্যায়া থি সমীরজী। স্যার যিতনা নরম, ইয়ে তো উতনিহি গরম।”
ব্লুয়েডবারে রাত ঠিক দশটা নাগাদ যশ বাইকটা থামায়। পরনে কালো রঙের টি-শার্ট আর কালো কটন জিন্স, পায়ে সাদা শু। বাইক স্যান্ড করে ডানহাতের তর্জনী আঙুলে চাবির রিং ঘোরাতে ঘোরাতে বারের ভিতরে ঢোকে যশ। বার পুরো ভরতি। কাউন্টারবারের কাছে গিয়ে যশ একটা রোলিং সীটে বসে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে কোণায় বসে থাকা লাল লংস্কার্ট পরা দ্যুতির দিকে। মুহূর্তের মধ্যে বারের মিউজিসিয়ানরা তাদের ইন্সট্রুমেন্ট বাজাতেই বার সিংগার বারের ড্যান্সিং ফ্লোরে এসে উপস্থিত হয়।
— “সাত সামুন্দার...
সাত সামুন্দার পার ম্যা তেরে পিছে পিছে আ গ্যায়ি, ম্যা তেরে
পিছে পিছে আ গ্যায়ি।
যুল্মি মেরি জান— ও যুল্মি মেরি জান তেরে কদমোকে নীচে আগ্যায়ি...।
সাত সামুন্দার পার ম্যা তেরে পিছে পিছে আ গ্যায়ি ম্যা তেরে
পিছে পিছে আ গ্যায়ি।”
বারের সিংগারকে দেখামাত্রই যশ হকচকিয়ে ওঠে। মদ না ছুঁয়েই কি নেশা উঠে গেল তার? দুবার মাথা মাথা ঝাঁকিয়ে সিংগারের দিকে তাকাতেই পুনরায় চমকে ওঠে। ভুল সে দেখেনি। কালো অফ শোল্ডার লংগাউন, থাইয়ের কাছ থেকে নীচ পর্যন্ত গাউনটা চেঁড়া। মাথার চুল পুরো খোলা ও পিছনের দিকে একটা সাদা স্টোনের ব্রোজ লাগানো। চোখ স্মোকি লাইনারে আঁকা ও চোখের মণিতে ঘাস রঙের লেন্স, ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক। কানে সরু চেনের মতো সাদা স্টোনের কানের, গলায় একই রকম স্টোনের চোকার, কেবলমাত্র বাঁহাতে চওড়া সাদা স্টোনের ব্রেসলেট। পায়ে কালো রঙের হাইহিল জুতো। জুতোর উপরেও সাদা স্টোনের কাজ করা। সিংগার আর কেউই নয় স্বয়ং দেহি। দেহিকে দেখামাত্রই যশ বাঁহাত দিয়ে নিজের মাথার ব্রহ্মতালুটা সামান্য চুলকে নেয়।
— “না — ছুপা আপ...নি প্যাহেচান, তুঁ না ছুপা সাচ কো...ও
না ছুপা আপনি প্যাহেচান তুঁ না ছুপা সাচ কো—
ক্যায়সে তোড়ু তেরে ঝুটকো, তুঁ না জান্তা মুঝকো
সীধি তেরে পা...শ,
সীধি তেরে পাশ ম্যা আঁখিয়া মিচে মিচে আগ্যায়ি—
সাত সামুন্দার—
সাত সামুন্দার পার ম্যা তেরে পিছে পিছে আ গ্যায়ি ম্যা তেরে
পিছে পিছে আ গ্যায়ি। “
দেহি পুরো মাতিয়ে তোলে ব্লুয়েডবার। গানের সঙ্গে সঙ্গে দেহির নামে প্রচুর টাকা পড়তে শুরু করেছে ম্যানেজারের ক্যাশ ফান্ডে। দেহির গলার গানটা আমাদের সকলের পরিচিত কিন্তু দেহি গানের শব্দগুলো নিজের মতো বদলে নিয়েছে। দেহির গান যেন দ্যুতির উদ্দেশ্যেই। দ্যুতির এক মুহূর্ত সময় লাগল না দেহিকে চিনতে। অন্যদিকে দেহিকে একরাতের জন্য নিজের সঙ্গে পাওয়ার জন্য কাস্টমারেরা ম্যানেজারের সঙ্গে তর্ক শুরু করে দিয়েছে। ম্যানেজার কিছুতেই বোঝাতে পারছে না, যে গাইছে সে খুদ উকিল ওরফে পুলিশ গিন্নি।
— “ম্যা—নে আপনে দপ-তর স্যা হি, দিতুঝ-কো আ...ওয়াজ...
ম্যানে আপনে দপ্তর স্যা হি দি তুঝকো আওয়াজ
নীচে কাহি পে খাড়া রাহা, তুঁ সামঝা খুদ কো চালাক
তুঁ ওহা...পার না আ—য়া,
তুঁ ওহাপার না আয়া তো ম্যা খুদ হি দিল্লি আগ্যায়ি
— সাত সামুন্দার—
সাত সামুন্দার পার ম্যা তেরে পিছে পিছে আগ্যায়ি ম্যা তেরে
পিছে পিছে আ গ্যায়ি।
ও যুল্মি মেরি জান তেরে কদমোকে নীচে আগ্যায়ি...।
সাত সামুন্দার পার ম্যা তেরে পিছে পিছে আ গ্যায়ি ম্যা তেরে
পিছে পিছে আ গ্যায়ি ম্যা তেরে
পিছে পিছে আ গ্যায়ি।”
দ্যুতি ব্লুয়েডবারের সীট থেকে উঠতে যাবে, হঠাৎ সে লক্ষ করল তার চারদিকে চারজন লেডি অফিসার সিভিল ড্রেসে তাকে ঘিরে রয়েছে। অন্যদিকে গান শেষ করে দেহি, ঠোঁটের কোণে এক অভুতপূর্ব হাসি রেখে দ্যুতির দিকে এগিয়ে তার মুখোমুখি রোলিং সীটে বসে। যশও নিজের সীট ছেড়ে এগিয়ে আসে, দ্যুতির দিকে। বারের ম্যানেজার, অবশেষে তার কাস্টমারদের বুঝিয়ে দিল, যে এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ বারকে আন্দোলিত করল, সে আসলে কে, তার উদ্দেশ্য কী? বারে একটা শান্ত আবহ যন্ত্রসংগীত বাজছে। দেহি, খুব শান্ত গলায় বলে ওঠে, “তাহলে বলুন কোন নামে ডাকলে আপনার ভালো লাগবে? দ্যুতি নাকি নাফিসা?” দেহির প্রশ্নে দ্যুতি মুখ গম্ভীর করে, দেহির দিকে তাকিয়ে থাকে। দেহির ডানপাশে যশ দাঁড়ানো। দ্যুতি একইরকম নীরব ভূমিকা অবলম্বন করতে থাকলে, যশ বলে, “আপনার চুপ থাকলেও বিপদ, না থাকলেও বিপদ। আর যার জন্য আপনি দিল্লি ছুটে এসেছেন সেও কিন্তু ধরা পড়ছে আজ রাতের মধ্যেই। সেলিম ওরফে রঘুবীর।” যশের কাছ থেকে নামটা শোনামাত্রই দ্যুতি আচম্বিত হয়ে যশের দিকে তাকায়। দ্যুতি ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে বারের গোল টেবিলের উপর রাখা ফ্লাওয়ার ভাসের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতেই দেহি টেবিলের উপর নিজের বাঁহাত দিয়ে চাপড় মেরে তীব্রস্বরে “আপনার ধারণা নেই দ্যুতি দেবী, আমি কতটা ভয়ঙ্কর। আমি মরা মানুষের পেট থেকে সত্যিটা বের করে নিয়ে আসি, সেই জায়গায় আপনি তো বেঁচে।” বলে ওঠে। দ্যুতি যখন এর পরও নিজের অনড় মৌনতায় স্থায়ী থাকে দেহি মুহূর্তের মধ্যে নিজের সীট ছেড়ে উঠে অফিসারদের প্রতি বলে, “আপনারা আপনাদের কাজ শুরু করুন। তারপরও যদি মুখ না খোলে আমি আছি। এর মতো আচ্ছা আচ্ছা মেয়ের পেটে লাথি মেরে কথা বের করেছি, সেই জায়গায় এ আমার কাছে কিছুই না।”
দেহির কথামতো অফিসাররা দ্যুতির হাত টেনে ধরে সীট থেকে তুলে বারের দরজার দিকে এগিয়ে যায়। ব্রাঞ্চ অফিসাররা বেরিয়ে যেতেই যশ, দেহির মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, “তুমি এখানে কেন?” যশের কথাটা শুনে দেহি পুরো নাটকের সুরে, “ওগো শুনছ, তুমি ছাড়া আমি আমি অচল গো। তোমাকে একমুহূর্ত ছেড়ে থাকতে পারছি না। হয়েছে? শান্তি? বুঝে গেছো কেন এসেছি?” বলামাত্রই যশ ডানহাতটা কপালে দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বলে ওঠে, “উফফ, সবকিছুতে উলটো জবাব।” কথাটা শুনে দেহি যশের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে ওয়াইন কাউন্টারের দিকে তাকাতেই যশ সঙ্গে সঙ্গে দেহির বাঁহাতটা ডানহাতে টেনে ধরে বলে ওঠে, “আবার ওদিকে কেন? একদম না।” দেহি যশের কথার উত্তর না দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে নিজের বাঁহাতটা যশের হাত সমেত রিভার্স করে ঘুরিয়ে নিয়ে যশকে পিঠ বরাবর নিজের সামনে এনে বাঁহাতে যশের ডানহাত পিঠের কাছে ও ডানহাতে যশের গলা চিপে ধরে দেহি কানের কাছে গিয়ে ধিমিস্বরে বলে, “মুঝে পেয়াস লাগি হ্যায়, সামঝো হাওয়ালদার।” বলে নিয়ে যশকে ছেড়ে বার কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যায়।
কাউন্টারে গিয়ে সেখানের সিগারেট ট্যাব থেকে একটা সিগারেট তুলে লাইটার জ্বেলে ধরাতেই যশ পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলে, “তেষ্টা পেলে এটা খেতে হয়? চলো অন্য কিছু খাওয়াচ্ছি।” যশের কথায় কোনো ভ্রূক্ষেপ না করে দেহি মুহূর্তের মধ্যে কাউন্টারে থাকা ছেলেটিকে সিটি মেরে ডাকতেই যশ চমকে ওঠে।
— “ইয়েস ম্যাম।” ছেলেটি দেহিকে বলতেই দেহি এক নেশা মেশানো গলায় বলে ওঠে, “ওয়ান রেড ওয়াইন প্লিজ।”
— “শিয়োর ম্যাম।”
ছেলেটি কাচের ওয়াইন গ্লাসের অর্ধেকটা ভরতি করে একটা বরফের টুকরো ফেলে, দেহির দিকে এগিয়ে দিয়ে যশকে বলে ওঠে, “অ্যান্ড ইউ স্যার?”
— “হি ডাজনট ড্রিঙ্ক অ্যালকোহল বিকজ হি ইস এ পোলাইট মিল্ক বয়।” দেহি একইরকম স্বরে যশের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে ওয়াইন গ্লাসে চুমুক দেয়। যশ একদৃষ্টে দেহির দিকে তাকিয়ে। ওয়াইন শেষ করে গ্লাসটা টেবিলে রাখতেই যশ বলে, “তেষ্টা মিটেছে, এবার চলো।”
— “ওয়ান মোর প্লিজ।” দেহি একটা দুষ্টু হাসি হেসে যশের দিকে তাকিয়ে ছেলেটিকে বলে ওঠে।
— “মামণি, এবার কিন্তু বেশি হয়ে যাচ্ছে।”
বোঝা গেল দেহি ইচ্ছাকৃত দ্বিতীয়বার ওয়াইন অর্ডার দিল। ছেলেটি ওই গ্লাসে আবার ওয়াইন ঢেলে তার মধ্যে একটা বরফের টুকরো ফেলে, দেহির দিকে এগিয়ে দিতেই দেহি পুরোটা খেয়ে মুহূর্তের মধ্যে গ্লাসটা মেঝেতে ফেলে দেয়। গ্লাস ভেঙে চৌচির। ছেলেটি দেহির মুখের দিকে তাকাতেই দেহি হেসে বলে ওঠে, “সিগারেট, ওয়াইন ওর ইয়ে গ্লাসকা প্যায়সা, সাব স্যা লে লেনা।” বলে নিয়ে হাসতে হাসতে বারের বাইরে বেরিয়ে যায়। যশ নিজের কপালে দুবার ডানহাতের চাপড় মেরে নিয়ে, প্যান্টের ব্যাকপকেট থেকে গাঢ় বাদামি রঙের ওয়ালেটটা বের করে।
ব্লুয়েডবারের বাইরে বেরিয়ে এসে যশ দেখে সিঁড়ির ধারে দেহি হাতের সেলফোনটা ঘাটছে। যশ কাছে এগিয়ে গিয়ে, বলে ওঠে, “উঠেছ কোথায়?”
— “বিভা প্যালেস।” দেহি বলে।
— “যাবে কিসে?”
— “হোটেল থেকে একটা প্রাইভেট ট্যাক্সি নিয়ে রেখেছি। ফোন করব।”
— “ফোন করার দরকার নেই। চলো।”
— “তুমি তো ব্রাঞ্চে যাবে।”
— “সে তোমায় বিভাতে নামিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যাব। তোমার তো খাওয়া হয়নি কিছু, চলো কিছু খেয়ে নাও।”
— “হোটেলে গিয়ে খেয়ে নেব।”
— “না, হোটেলে খেতে হবে না।” কথাটা যশ মিনতি নয়, বেশ কড়াসুরেই বলে। দেহি যশের দিকে তাকিয়ে কিছু না বলে দিল্লি বাজারের সড়কের দিকে চলে যায়।
ঘড়িতে সময় বলছে রাত্রি পনে এগারোটা। দিনের বেলায় এই বাজারসড়ক যতটা লোকবহুল থাকে, রাত্রি নটার পর ধীরে ধীরে লোকসংখ্যা ক্রমশ কমে আসে। স্ট্রিট ল্যাম্পের সোলার আলোতে সড়ক যেন মোহিত বাতাবরণ তৈরি করেছে। বাজারসড়কের রাস্তাটা মিলেছে দিল্লি ন্যাশানাল হাইওয়ের সঙ্গে। নির্জন সড়কে দেহি আর যশ হেঁটে চলেছে রেস্টুরেন্টের দিকে। যশ বাইকটা বারের পাশেই রেখে এসেছে। ফেরার পথে নেবে। হাঁটার ফাঁকে যশ দেহির দিকে তাকাতেই দেখে দেহি নিজের লম্বা ছাড়া চুলগুলো বাঁহাতে ঘুরিয়ে বাঁকাধে নিয়ে এসেছে। এমনই এক রাতে কলকাতার সড়ক পথে দেহি আর যশের প্রথম দেখা হয়েছিল। সেই দিনও লেখিকা দ্রৌপদীর মার্ডার কেসের ব্যাপারে একজনকে ধরতে কলকাতার নাইট ক্লাবে দেহি গিয়েছিল। যশও সেই ক্লাবে গিয়েছিল নিজের কাজে। দুটো মানুষের প্রথম দেখাতে অনেকরকমের পন্থা রয়ে যায় কিন্তু দেহি আর যশের প্রথমদর্শনেই ঘটেছিল মারপিট। না, না। যশ মারেনি উলটে দেহির হাতে মার খেয়েছিল। যশের আজও মনে পড়ে সেই রাতের কথা। সেই কথা ভেবেই বোধহয় যশ ঠোঁট চেপে হাসতেই দেহি সেটা লক্ষ করে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে হাঁটা থামিয়ে “হাসছ কেন?” রেগে জিজ্ঞাসা করে ওঠে।
— “যা ব্বাবা! হাসতেও পারব না?” অবাক হয়ে যশ বলে।
— “হাসির তো একটা কারণ আছে। এমন কী মনে পড়ে গেল যে হাসি পেয়ে গেল?” দেহির প্রশ্নে যশ হাসতে হাসতে বলে, “ম্যাডাম মানে তোমার মা যেদিন প্রথম তোমার কথা আমাকে বলে সেদিন বলেছিল, যশ আমার সবথেকে দামি হিরেটা তোমার হাতে তুলে দিচ্ছি।”
— “তাতে হাসির কী আছে?”
— “না, তখন বুঝতে পারিনি যে ভূগোলের ভাষায় কয়লাকেও হীরে বলে।” কথাটা শোনামাত্রই দেহিকে ঠেকায় কে? মুহূর্তের মধ্যে হাতের কালো হ্যাঁন্ডপার্সটা সড়কে ফেলে, ডানহাতে যশের গলা ল্যাম্পপোস্টে ঠেঁসে ধরে বাঁহাতে সজোরে যশের পেটে ঘুষি চালাতেই যশ “উরি তেরি!” বলে ওঠে।
যশের গলা দেহি ছাড়তেই যশ দেহির ডানহাতের কবজি ধরে মুহূর্তের মধ্যে দেহির পিঠের পিছনে নিয়ে গিয়ে কোমরের কাছে চেপে ধরে। নিজেকে ছাড়ানোর জন্য দেহি বাঁহাতে যশের গলা ধরতে গেলে যশ সেই হাতটাকেও একইরমভাবে ঘুড়িরে কোমরের সঙ্গে চেপে ধরে হাসতে হাসতে বলে, “এবার? আগেও বলেছি, বাঘিনী হওয়া ভালো, কিন্তু বাঘ শিকার করাটা ভালো নয়।” দেহি নিজেকে ছাড়ানোর জন্য চেষ্টা করলে যশ হালকা করে দেহির বাঁহাতে সামান্য মোচড় দিতেই দেহি, “আহঃ” করে আর্তনাদ দিয়ে ওঠে।
— “যশ হাতে লাগছে।” দেহি কথাটা বলামাত্রই যশ হেসে, “কার লাগছে? তোমার লাগে এটা জানতাম না তো।” হেসে বলে নিয়ে দেহিকে ছেড়ে দেয়।
দিল্লি বাজার সড়কের শেষের মুখটাতেই রয়্যাল রেস্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্টের দরজা খুলে দেহি আর যশ ভিতরে ঢুকে দেখে, বেশ কয়েকজন কাস্টমার বসে খাবার খাচ্ছে। যশ ও দেহি ভিতরের দিকে এগিয়ে গিয়ে একটা টু সীটের টেবিলে গিয়ে বসে। সামনে রাখা বড় মেনুচার্টটা হাতে তুলে নিতেই রেস্টুরেন্টের লাল হলুদ গেঞ্জি পড়ে ওয়েটার এসে দাঁড়ায় টেবিলের সামনে। ভালো মতো দেখে নিয়ে দেহি বলে, “রাজমা চাওল অ্যান্ড চিকেন রেসেলা।”
— “অ্যান্ড ইউ স্যার?” ওয়েটার যশকে জিজ্ঞাসা করতে যশও চোখ দিয়ে সেই খাবার আনতে বুঝিয়ে দিতেই ওয়েটার মাথা নাড়িয়ে কিচেনের দিকে চলে যায়।
বিয়ের পর প্রথম যশ আর দেহি বাইরে কোথাও একাসঙ্গে বসে খাচ্ছে। বিয়ের পর নবদম্পতি কপোত-কপোতির ন্যায় মধুচন্দ্রিমায় যায় কিন্তু এদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। কারণ এদের মধ্যে মধু কম মৌমাছির হুলের দংশনই বেশি। আর রইল চন্দ্রিমার কথা সেটা অবশ্যই অমাবস্যার। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ওয়েটার টেবিলে খাবার সার্ভ করে দেয়। দেহি চামচ দিয়ে খাবার মুখে তুলে যশের দিকে তাকাতেই যশ বলে ওঠে, “অনেকদিন পর তোমার গলায় গান শুনলাম। তুমি এখন আর গান প্র্যাকটিস করো না কেন?” যশের কথা শুনে দেহি একটা লাল রঙের টিস্যুক্লোথ হাতে তুলে ঠোঁটের তলাটা সামান্য মুছে নিয়ে বলে, “কী করে করব? হারমোনিয়াম কোথায়? বীণাটা কোথায়? সবকটা কালিন্দীর বাড়িতে।”
— “আমাকে একবারও বলেছ সেটা? বললেই আমি ওই বাড়ি থেকে আনিয়ে দিতাম।”
— “বলতে হবে কেন? তুমি জানতে না যে আমি গান করি।” দেহির কথাটা শুনে যশ বাঁহাতটা মাথায় রেখে বলে, “ভগবান তুমি আছো কোথায়? আচ্ছা ঠিক আছে, নিজের তাগিদে যদি ওসব আনতাম তাহলে তোমার যা রাগ, দেখতাম বীণাটা তুলে মাটিতে আছাড় মেরে ভাঙতে। এরপরও বলো গরজ করে নিয়ে আসি?” যশের কথাটা শুনে দেহি কোনোরকম উত্তর না দিয়ে মুখ নামিয়ে খাবার খেতে থাকে। যশ একটা ছোট্ট হাসি হেসে বলে, “ঠিক আছে, আমি ফিরে গিয়ে আনিয়ে দেব।”
কিছুক্ষণ খাবার খাওয়ার পর যশ আবার জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “তুমি কি বিভাতেই থাকবে?”
— “কেন?”
— “আমি বলছিলাম, বিভা থেকে চেক আউট করে তুমি আমি যে হোটেলে আছি সেখানে চলে এসো। গোল্ডেনে।”
যশ কথাটা বলে সম্পূর্ণ অপেক্ষা করছিল দেহির “না” উত্তরটা শোনার জন্য। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে দেহি ছন্দ বদলে বলে ওঠে, “আজ চেক আউট করব নাকি কাল?” দেহির কথাটা শুনে যশ থতমত খেয়ে দেহির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতেই দেহি কপাল কুঁচকে আবার বলে ওঠে, “খাও। আর দেখতে হবে না আমাকে।”
ইতিমধ্যে যশের পকেটে থাকা সেলফোনটা বেজে উঠতেই যশ পকেট থেকে সেলফোনটা বের করে নিয়ে দেখে রূপমের ফোন। ফোন রিসিভ করে হ্যাঁলো বলতেই বিপরীত দিক থেকে রূপম জানায়, ব্যাঙ্কের টাকা সমেত সেলিম ওরফে রঘুবীরকে সে ধরে ফেলেছে। ব্রাঞ্চে ঢুকতে একঘণ্টার মতো লাগবে। রূপমের কথা শুনে যশও নাফিসা যে হাতেনাতে ধরা পড়েছে সেটা জানায়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন