যবনিকা পতন

শান্তনু দাশ

পাড়াতে আজ রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা। সকাল থেকেই মাইকে গান বেজে চলেছে। সকাল দশটা। নিজের ঘরে আয়নার সামনে দেহি বসা। মুখে বিষাদের ছাপ। কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজা খুলে শুভ্রা ঢুকতেই দেহি আয়নার থেকে শুভ্রাকে দেখে। শুভ্রা দেহির কাছে এগিয়ে ডান কাঁধে হাত রাখতেই দেহি একটা বিমর্ষহাসি হেসে বলে ওঠে, “আমি ঠিক করছি তো?” শুভ্রা হাঁটু গেঁড়ে দেহির সামনে বসে নিয়ে দেহির দুটো হাত শক্ত করে ধরে নিয়ে বলে, “একদম ঠিক করছিস। তোর মন যেটা চেয়েছে, সেটাই আসল, সেটাই সত্যি। যশ তোকে দিতে যাচ্ছে?”

— “না। আমি একাই যাব।”

কথাটা শুনে শুভ্রা মাথা নাড়িয়ে, নিজের ব্যাগ খুলে একটা লাল রঙের বটুয়া দেহির হাতে দেয়। বটুয়ার উপর সোনালি রঙে লেখা “আর কে জুয়েলার্স”।

হাতে নিয়ে দেহি বলে, “পরশু নাটক দেখতে না দিয়ে জুয়েলার্সে বসিয়ে রাখলাম তোকে।” হঠাৎ দরজায় টোকা। “দেহি” বলে বাইরে থেকে ডাক দিয়ে ওঠে পৃথা।

— “ভিতরে এসো।” শুভ্রা বলতেই পৃথা দরজা খুলে ভিতরে আসে।

দেহির দিকে এগিয়ে, দেহির মুখ দেখে পৃথা জিজ্ঞাসা করে, “কী হয়েছে তোমার? দিল্লি থেকে ফেরার পর কেমন যেন বদলে গেছো। যশ কি খারাপ কিছু তোমায় বলেছে?” পৃথার প্রশ্নে দেহি মাথা নাড়িয়ে “না” বলতেই পৃথা বলে, “তাহলে সকাল থেকে একটা কিছু তুমি মুখে তোলোনি।”

— “আমার কিছু খেতে ভালো লাগছে না।” দেহি শান্ত গলায় বলতেই পৃথা উত্তরে বলে, “বেশ। মন ভালো না থাকলে কোনোকিছুই ভালো লাগে না। যখন মনে হবে আমায় ডাক দিয়ো, আমি খাবার করে দেব।” বলে নিয়ে পৃথা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। বেরোনোর আগে শুভ্রার দিকে তাকিয়ে পৃথা বলে, “ওই, যাবার আগে দুপুরের খাবার খেয়ে তারপর যাবি।”

— “খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে, বিরাট শিশুর আনমনে... খেলিছ।

প্রলয়-সৃষ্টি তব পুতুল খেলা...নিরজনে প্রভু, নিরজনে, খেলিছ।”

সন্ধ্যায় ছটা দশ নাগাদ পাড়ার জলসা আরম্ভ হয় উদ্বোধনী সমবেত নজরুল গীতি দিয়ে। যশ ব্রাঞ্চ থেকে অনেকক্ষণ আগেই বাড়ি ফিরে বাবা-মা ও মঞ্জুকে পাড়ার অনুষ্ঠান জোর করে দেখতে পাঠিয়েছে, যাতে দেহি যে আজ বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে সেটা কেউ বুঝতে না পারে। বাড়ি ফিরে গায়ের নীল শার্টটা খুলে সোফায় ফেলে রেখে সোফাতে বসে দুইহাতে কপালটা ধরে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে নাক টানার শব্দ। চোখ থেকে কয়েকফোঁটা জল মেঝেতে পড়ল। উপরে নিজের ঘরে দেহি তৈরি হচ্ছে।

— “শূন্যে মহাআকাশে তুমি, মগ্ন লীলা বিলাসে

হাসিছ খেলিছ তুমি আপন সনে নিরজনে প্রভু, নিরজনে।

খেলিছ।”

ড্রেসিং টেবিলের ডেক্সটা দুইহাতে ধরে দেহি নীরবে চোখের জল ঝরিয়ে চলেছে। ধীরে ধীরে বাঁহাতটা বাড়িয়ে শুভ্রার দেওয়া বটুয়ার গিঁটটা খুলে মখমলে জড়ানো সোনা বাঁধানো শাঁখা পলার জোড়াটা বের করে ধীরে ধীরে দুইহাতে গলিয়ে নেয়। ড্রেসিং টেবিলের কাবার্ডটা টেনে নিয়ে সোনার নুপূরটা হাতে তুলে, আলতা পরা পায়ে পড়তে থাকে। কেঁদে কেঁদে দেহির দুটো চোখ পুরো রক্তজবা। নুপূর পরে নিয়ে মাথার লম্বা চুলের গোড়াটা আঁচড়ে নিয়ে ঘড়ির দিকে তাকায় দেহি। ধীরে ধীরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে উঠে ঘরের আলো নিভিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে।

যশ একই রকমভাবে মাথায় হাত দিয়ে সোফায় বসা। পরনে সাদা স্যান্ডোগেঞ্জি ও নীল জিন্স প্যান্ট। জুতোটাও পা থেকে ছাড়েনি। হঠাৎ কিছু একটা মনে হওয়াতে মাথা থেকে হাত সরিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকাতে যশ অবাক হয়ে উঠে দাঁড়ায়।

— “তারকা ও রবি শশী খেলনা তব, হে উদাসী,

পরিয়া আছে রাঙা পায়ের কাছে, রাশি রাশি।

নিত্য তুমি হে উদাস, সুখে দুখে অবিকার,

নিত্য তুমি হে উদার...”

দেহির মাথার ঘন ও লম্বা চুল পুরো খোলা। পরনে লাল ব্রোকেটের কোয়াটার হাতা ব্লাউজের সঙ্গে একপিন করে আঁচল ছাড়া লাল রঙের সিফন শাড়ি। গলায় চাপা একটা সোনার হার ও কুচমতি সাইজের সোনার লম্বা মটরহার, কানে সোনার টানা দেওয়া ঝুমকো, হাতে সোনার কয়েকগাছা চুড়ি ও সোনা বাঁধানো শাঁখা পলা এবং বাঁ হাতে আয়স্তি। চোখে কাজল, ঠোঁটে গাঢ় লাল ম্যাট লিপস্টিক , কপালে গোল টিপ ও সিঁথিতে টানা সিঁদুরের রেখা। যশের চোখ আটকে গেছে দেহির রূপের কাছে।

ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এসে যশের চোখের দিকে দেহি তাকাতেই যশ মুহূর্তের মধ্যে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। দেহি নিজের নজর নামিয়ে ধীর কদমে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দেয়। যশ দরজার একধারে দাঁড়িয়ে দেহিকে দেখে চলে।

— “ভাঙিছ গড়িছ নীতি ক্ষণে ক্ষণে, নিরজনে প্রভু, নিরজনে।

খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে, বিরাট শিশুর আনমনে... খেলিছ।”

গঙ্গার ঘাটের কাছে এসে দেহি গাড়ি থামায়। ঘাটের সিঁড়ির কাছে রূপম দাঁড়িয়ে। দেহিকে দেখামাত্রই রূপম দৌড়ে দেহির কাছে এসে দাঁড়াতেই দেহি কাঁপাস্বরে বলে ওঠে, “আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে রূপম।” দেহির চোখে জল। রূপম একদৃষ্টে দেহির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে ওঠে, “কোথায় যাবে?”

— “নিজের বাড়িতে।” কাঁদতে কাঁদতে দেহি উত্তরে বলে। “তুমি আমার স্বামীর নাম জানতে চেয়েছিলে না? আমার স্বামীর নাম যশ রায়চৌধুরী। তোমার বন্ধু।” দেহির কাছ থেকে যশের নাম শোনার পরও রূপমের কোনো উদ্বেগ দেখা গেল না। রূপমের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল কেবল অশ্রুজল। দেহি বলে চলে, “রূপম ভালোবাসায় কোনো শর্ত যেমন থাকে না জোরও খাটে না। তুমি বলেছিলে তোমার আর আমার গণ্ডি এক। না রূপম, এক নয়। বিয়ের সাত পাঁকের একটা দিব্যি হল, তোমার জীবনের সব ইচ্ছাপূরণের দায়িত্ব আমার। যশ সেটা মনে প্রাণে মেনেছে। আমার সবথেকে কাছের জন আমার মাও যেখানে আমার হাত ছেড়ে দিয়েছিল, সেই হাত শক্ত করে ধরে যশ আমাকে পথ পার করিয়েছে। স্বামী হয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে আমাকে, অধিকার নয়, উদারতাই ভালোবাসার সবথেকে বড় বুনিয়াদ। আজ তোমার সাথে যেতে কেউ বাধা দেওয়ার নেই। যশ একটা বারের জন্য পরে তোমায় বা আমায় প্রশ্ন করবে না। কিন্তু সেই সাত পাঁকের আগুন আমায় আজ তোমার সাথে যেতে বাধা দেয়, তুমি রাগ করবে? সত্যি করে বলো তো একজন নিরপরাধ ছেলের চোখের জলের উপর দাঁড়িয়ে আমি বা তুমি সুখী হতে পারব? অন্যের কথা বাদই দিলাম, তোমার স্ত্রী, রাজশ্রী? তার মুখের সামনে কোনোদিন আমি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব? একটা মেয়ে সব কিছু ছেড়ে তোমার হাত ধরেছে, তার দোষ কোথায়? কী অধিকার আছে সেই মেয়েটাকে আমার শাস্তি দেবার? জীবনে দেহি কোনোদিন কারোর কাছে হারেনি, কিন্তু আজ দেহি যশের ভালোবাসার কাছে হেরে গেছে। একটু একটু করে যশ আমাকে ওর দিকে টেনে নিয়েছে রূপম। আমি জানি আমি তোমার সাথে অন্যায় করলাম। আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো।”

শেষ কথাটা শুনতেই রূপম সঙ্গে সঙ্গে কাঁদতে কাঁদতে বলে ওঠে, “এই কথাটা বলতে এতদিন সময় নিলে? আমি প্রথম থেকেই জানতাম তুমি যশের কে হও। তুমি দিল্লি যাওয়ার আগে যশের ওয়ালেটে তোমার ছবি দেখি। তুমি কী মনে করেছিলে, আমি তোমায় নিয়ে যাওয়ার জন্য এখানে এসেছি। না দেহি। যশকে এই অল্পদিনের মধ্যে যতটা চিনেছি, দেহি দেড় বছর সাথে থেকে কী করে বুঝতে পারছে না এই চিন্তা বার বার কুড়ে কুড়ে খেয়েছে। আজ তোমায় এখানে ডেকেছিলাম এটা বলার জন্যই। যশই দেহির জন্য, রূপম নয়। ক্ষমা তো ভুল করলে চায়, ঠিক কাজ করলে ক্ষমা চায় না কেউ।”

দেহি কাঁদতে কাঁদতে রূপমের হাত চেপে ধরে ভাঙা গলায় বলে ওঠে, “আমি যাই?”

— “একদম। তাড়াতাড়ি।”

— “আমার উপর একটুও রাগ নেই তো?”

— “একটুও না। উলটে আজকের পর থেকে আরও সম্মান বাড়ল, যে সত্যিই লোকেরা ঠিক বলে, তুমি সত্যের পূজারিনী। যাও দেহি। যশ অপেক্ষা করছে। মানুষের রূপ তো চারদিনের অতিথি। যশ বা খ্যাতি তাকে অমর করে রাখে।”

কাঁদতে কাঁদতে হাত ছেড়ে দেহি গঙ্গার ঘাট ও রূপমের কাছ থেকে বিদায় নিতেই, গঙ্গার ঘাটের সিঁড়িতে মুখে হাত চেপে কাঁদতে কাঁদতে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে।

অন্ধকার ঘরের জানলার ধারে দাঁড়িয়ে জল থেকে জল ঝরিয়ে চলেছে যশ। আজ সে যেন নিজের মধ্যে নেই। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ পেয়ে পিছন ফিরতেই দেখে, দেহি। মুহূর্তের মধ্যে চোখের জল দুইহাতে মুখে ধরা গলায় জিজ্ঞাসা করে, “ফিরে এলে? কিছু ফেলে গেছো?”

— “একটা প্রশ্নের উত্তর জানতে এসেছি।” দেহি গম্ভীর গলায় উত্তর দেয়।

— “বলো।”

— “আমাকে ভালোবাসো?” দেহির প্রশ্নে যশ মাথা নামিয়ে দেয়। দেহি ধীর কদমে যশের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই যশ ধীরে ধীরে দেহির দিকে তাকায়। দেহি আবার বলে ওঠে, “কী হল আমি কিছু জিজ্ঞাসা করছি। ভালোবাসো আমাকে?”

— “হুম।”

— “সেই জন্যই ফিরে এসেছি। ফেলে গেছিলাম সংসারটাকে। সেটা নিতে এসেছি।”

— “আর আজ যদি আমি রাজি না হই? যদি এই ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিই তখন কী করবে?”

— “কী আর করব? লাথি মেরে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকব। সেটাও কি আলাদা করে বলতে হবে?” কথাটা শুনে যশ কপালটা কুঁচকে দেহির দুটো কাঁধ দুইহাতে চেপে ধরে বলে, “তুমি কোনোদিন বদলাবে না তাই না?”

— “একটুও না। আমি বদলে গেলে আদালতটা চলবে কী করে?” কথাটা বলেই দেহি যশের মাথার পিছনে দুটো হাত রেখে নিজের কাছে টেনে এনে যশের ঠোঁটের সাথে নিজের ঠোঁটের মধ্যে চেপে ধরে। যশও কাঁধ ছেড়ে দেহিকে নিজের বুকের মধ্যে চেপে ধরে দেহির ঠোঁটের উপর নিজের ঠোঁট দিয়ে বারংবার ভালোবাসা আঁকতে থাকে।

অন্যদিকে সান্ধ্যকালীন অনুষ্ঠান থেকে ভেসে আসে সমবেত সংগীত,

— “হরষ গীত উচ্ছ্বসিত হে...

আনন্দ-বসন্ত সমাগমে।

হরষ গীত উচ্ছ্বসিত কিরণমগন গগনে...

এ কী লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ, প্রাণ এসো হে...

আনন্দ-বসন্ত সমাগমে।”

।। সমাপ্ত।।

অধ্যায় ১৫ / ১৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%