ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়

হেডলাইটের তীব্র আলোয় গড়িয়ে গড়িয়ে ছুটে আসছে হাইওয়ে৷ দু-ধারের ঝাঁকড়া গাছগুলো ক্ষণিকের আলো মাখামাখি হয়েই ঢুকে যাচ্ছে অন্ধকারের গর্ভে৷
জন শেন বসে আছে ষ্টিয়ারিং ধরে৷ সগর্জনে ট্রাক ধেয়ে চলেছে উইলিস্টন শহরের দিকে৷
মাঝে মাঝে ওদিক থেকে সাঁ-সাঁ করে দু-একখানা গাড়ি, ট্রাক৷ চোখে আলোর ঝলক মেরে চলে যাচ্ছে উল্টো দিকে৷ নিবিড় অন্ধকারে দিগন্ত আকাশ মুছে গেছে৷ আকাশে একফালি
চাঁদ ম্লান জ্যোৎস্না ছড়িয়ে ঝুলে আছে৷
জন অন্যমনস্ক৷ আর বেশিক্ষণ নয়, অন্ধকার ফিকে হতে না হতে ও পৌঁছে যাবে নিজের শহরে৷ স্ত্রী-ছেলেমেয়ে প্রিয়জনদের কাছে৷ তারপর তিন দিন টানা বিশ্রাম৷
জনের কাজটা বিরক্তিকর৷ মাসের পনেরো দিন বাড়ির বাইরে৷ রাতের পর রাত ট্রাক চালানো এ শহর থেকে ও শহরে৷ ট্রাক বোঝাই নানান সরঞ্জাম৷
এবারে যেমন ওর ট্রাকে কয়েক লাখ মৌমাছি আর শ’আড়াই কৃত্রিম মৌচাক৷ এগুলো যাবে বাণিজ্যিক মধু তৈরির একটি কারখানায়৷
ডানদিকের মাইল স্টোন চোখে পড়ল জনের—উইলিস্টন ৫ কি.মি.৷ যাক্—প্রায় এসে গেছে!
এবার একটু গতি কমাতে হবে৷ অ্যাকসিলেটর থেকে ডান পা আলগা করতে হবে৷ কিন্তু—কিন্তু এ কী! অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যে তার নির্দেশ মানছে না! সে কি গাড়ি চালাচ্ছে, না গাড়ি তাকে চালাচ্ছে?
ভাবতে ভাবতেই সহসা দু-চোখে আবার আলোর ঝলক! চোখ ধাঁধিয়ে গেল৷ ওদিক থেকে আরেকটা গাড়ি৷
সর্বনাশ! ব্রেক—ব্রেক কষতে হবে! রাস্তাটা এখানে এল শেপের! আরে—পা যে পাথরের মতো অবশ৷
প্রাণপণ চেষ্টায় ডান পা-কে অ্যাকসিলেটর থেকে তুলে ব্রেকে যখন চাপ দিল ততক্ষণে কয়েক সেকেন্ড দেরি হয়ে গেছে৷
জন আতঙ্কে চোখ বুঁজল৷ শুধু শুনতে পেল, কানফাটানো বিকট আওয়াজ! ওর শরীরটা কাত হয়ে গেল৷ স্টিয়ারিংটা এল বুকের ওপরে৷
দুটো গাড়িতে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে গেছে৷ জন বুঝল, ওর ট্রাক কাত হয়ে পড়েছে৷
তবু—তবু ও বেঁচে আছে! হ্যাঁ, এই তো, ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছে৷ জন বুকে হাত দিতে চেষ্টা করে—নাহ্, উপায় নেই৷ স্টিয়ারিংটা ওকে সিটের সঙ্গে গেঁথে ফেলেছে৷
ইঞ্জিনটা এখনও বন্ধ হয়নি৷ চাকাগুলো বনবন শূন্যে ঘুরে চলেছে৷
লোকজন আসবে কি উদ্ধার করতে? অন্য গাড়িটার ড্রাইভার বা আরোহীরা কি বেঁচে আছে?
দোষটা কি তার একার? ওই গাড়ির ড্রাইভারও কাটিয়ে নিতে পারত৷
উহ্! জন যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল৷ ওর ঘাড়ে কে যেন সূঁচ বিঁধিয়ে দিয়েছে৷
ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাকাতে চেষ্টা করে, গাঢ় অন্ধকারে কিছুই দেখতে পায় না৷
উহ্—আহ্! ছটফট করে ওঠে জন৷ আবার, আবার! আবার পরপর কয়েকটা সূঁচ সজোরে বিঁধল ওর ঘাড়ে, কানের নীচে৷
নড়াচড়ার উপায় নেই৷ এবার কিছু যেন সুড়সুড় করে বেয়ে উঠেছে মোজা আর প্যান্টের ফাঁক দিয়ে৷
পা ঝাড়বার চেষ্টা করে জন৷ সঙ্গে সঙ্গে—আহ্! সূঁচের জ্বালা, এবার পায়ে৷
সর্বনাশ! মৌমাছি—মৌমাছি!
তার ট্রাকের খাঁচাবন্দী মধুমক্ষিকার দল এখন মুক্ত৷ তারা লাখে লাখে বেরিয়ে পড়েছে৷ খুঁজে পেয়েছে জনকে৷
আর রক্ষে নেই৷
জন শুনেছে, মৌমাছি যখন হুল ফোটায়, তখন তার শরীর থেকে বেরোয় এক বিচিত্র পদার্থ—ফেরোমন৷ ওই ফেরোমনের তীব্র গন্ধই টেনে নিয়ে আসে অন্য মৌমাছিদের৷
এখন সেটাই ঘটছে৷ মৌমাছি কূল জেনে গেছে, অসহায় শিকার হাতেই নাগালেই বন্দী৷ দলে দলে তারা আসছে৷
জন জানে, হুলের বিষে যাদের অ্যালার্জি নেই, তাদেরও যদি দুশোটা মৌমাছি কামড়ায়, তবে মৃত্যু হতে পারে৷
যা হবার হবে, ভেবে তো লাভ নেই৷ এখন অপেক্ষা করা ছাড়া কিছু করারও নেই৷ হ্যাঁ, হুলের দংশন সহ্য করতে হবে, আর মনের জোর বাড়িয়ে যেতে হবে৷
জন দাঁতে দাঁত চেপে নিথর হয়ে পড়ে থাকে৷...
স্থানীয় লোকজন জেনে গেছে৷ সাইরেন বাজিয়ে ছুটে এসেছে পুলিশবাহিনী৷
দশ-বারো জোড়া হেডলাইটের ফোকাস অন্ধকারকে ছিঁড়ে ফেলেছে৷ শহরের ডেপুটি শেরিফ ভয়াল দৃশ্যটা দেখেই অস্ফুটে বলে উঠলেন,—ওরে বাপ্স!
দুমড়োনো মুচড়ানো ট্রাকের চতুর্দিক কালো মেঘে ঢাকা! সে মেঘ দিয়ে শব্দ হচ্ছে—বম্—ম্—ম্...! লক্ষ লক্ষ মৌমাছি বাহিনী৷
পুলিশের বড়কর্তা হতাশভাবে মাথা নাড়েন,—না স্যার৷ সব শেষ৷ এরকম অ্যাক্সসিডেন্টে কারও বেঁচে থাকা সম্ভব নয়৷
এইসময় ক্ষীণ কণ্ঠ ভেসে আসে ট্রাকের মধ্যে থেকে,—আ—মি—এ—খা—নে!...বাঁ...চাঁ...ও৷
হেডলাইটের আলো এবং মানুষের কণ্ঠস্বর জনের চোখে ও কানে পৌঁছেছে৷ ওরা এসে গেছে, এবার ও হয়ত বেঁচে যাবে!
কিন্তু কতক্ষণ? শরীরে মুহূর্তে মুহূর্তে হুল বিঁধে যাচ্ছে, মানুষবাহিনীর আগমন সংবাদ মৌমাছিদের বুঝি আরও হিংস্র করে তুলেছে৷
কতক্ষণ আর যুঝবে জন? বাঁ-চোখের কোণ সামান্য খুলে দেখে, ওর চারপাশে কালো মেঘের মতো মৌমাছি বিনবিন করছে৷ খুশিমতো বসছে দেহের ফাঁকা জায়গায়, পরমানন্দে হুল বিঁধিয়ে দিচ্ছে৷
ডেপুটি শেরিফ বলেন,—শুনুন, প্রথমে এই মৌ-বাহিনীকে বাগে আনা দরকার৷
—স্যার, ফোম চার্জ করব?
উঁ—হু!—মাথা নাড়লেন ডেপুটি শেরিফ: ভিতরে লোকটা দম আটকে মারা যাবে৷
ইতিমধ্যে ফায়ার ব্রিগেড তার সাজসরঞ্জাম নিয়ে এসে গেছে৷ বাহিনী প্রধান পোরসেল্লি সামান্য এগিয়ে যান ট্রাকের দিকে,—ওহে ভাই, ঠিক আছ তো?
প্রতুত্তরে জনের করুণ আর্তি ভেসে আসে,—বাঁ-চা-ও!...আর পারছি...না...!
দমকল ও পুলিশ বাহিনীর দুই প্রধান ডেপুটি শেরিফের সঙ্গে আলোচনা শুরু করলেন৷ কীভাবে লোকটাকে অক্ষত রেখে ট্রাক থেকে বার করে আনা যায়?
প্রথম কাজ মৌমাছিগুলোকে নিষ্ক্রিয় করতেই হবে—৷ অতঃপর লোহা কাটার মেশিন এনে সামনের ভাঙা উইন্ডস্ক্রিনের মধ্যে দিয়ে ঢুকিয়ে দিতে হবে৷ এতে অবশ্য একটা ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে৷ কোনওভাবে ওই ‘কাটার’ মেশিনের ছুঁচলো ডগা স্টিয়ারিং ছাড়িয়ে যদি জনের পেটে ঢুকে যায়, তাহলেই শেষ! কিন্তু এছাড়া উপায়ও নেই৷
এমনসময় বীমা কোম্পানির লোক নিয়ে মৌমাছি কোম্পানির মালিক ভদ্রলোক হাজির হলেন৷ তাঁকে দেখেই এঁরা তিনজন ঝাঁপিয়ে পড়লেন,—এই যে, আপনি এসে গেছেন! আপনার মৌবাহিনী তো আমাদের নাস্তানাবুদ করে দিল মশাই৷ ভিতরে ড্রাইভারটাও মারা পড়ল বলে! কী করা যায় বলতে পারেন?
উড়ন্ত কালো মেঘের দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক একমুহূর্ত ভাবলেন৷ তারপর বললেন,—হোস্ পাইপ দিয়ে জল ছড়িয়ে দেখুন৷ পাখনা ভিজে গেলে ওরা উড়তে পারবে না৷
তাই তো৷ এত সোজা উপায় মনেই আসেনি৷ সঙ্গে-সঙ্গে তিন গাড়ি দমকল জল ছেটাতে শুরু করল৷ তিন দিক থেকে৷
ইতিমধ্যে আবছা-আবছা আলোয় ভারি অপার্থিব হয়ে উঠছে জায়গাটা৷ বিশাল উঁচু জলস্তম্ভ ফোয়ারের মতো ফিনকি দিয়ে ছড়াচ্ছে৷ ফেনিল জলকণা উড়ছে হাওয়ায়, ধোঁয়ায় মতো৷
জমাট বাধা কালো একটা মেঘ ক্রমেই ছোট থেকে আরও ছোট হয়ে যাচ্ছে৷
একটা সময় মেঘটা মিলিয়ে গেল৷ কপারে ঘাম মুছলেন ডেপুটি শেরিফ বললেন,—উফ্, যাক্! গেছে৷ এবারে আপনারা স্টিয়ারিংটা কাটার ব্যবস্থা করুন৷
শুনছ, ও ভাই শুনছ?—হুলের বিষে জর্জরিত জনের চেতনা ফিরে আসে৷ কেউ তাকে ডাকছে৷
ক্ষীণকণ্ঠে জবাব আসে,—বলুন৷
—মেশিনটা ঢোকাচ্ছি৷ তুমি কোনভাবে একটু ওটাকে স্টিয়ারিং হ্যান্ডেলে লাগিয়ে দাও৷
ই-ই-ই, দুটো হাতের কনুই অবধি চেপে বসেছে স্টিয়ারিং৷ নাড়তে গেলেই প্রচণ্ড লাগছে৷ তবুও প্রাণপণ চেষ্টায় ও হাতদুটো আরেকটু বার করে মেশিনের গোড়াটা ধরে৷ ফিট করে দেয় হ্যান্ডেলে৷
আস্তে আস্তে বলে,—এবার চালান৷
ঘ্—র্—র্—মে মেশিন চলতে শুরু করে৷ স্টিয়ারিংটা কাটছে...মেশিনের পুলার দিয়ে ক্রমেই টেনে নিচ্ছে নিজের দিকে...বুকের উপর চাপ কমছে ধীরে ধীরে...
আঃ—কী আরাম! জগদ্দল পাথরটা সরে গেছে৷ জন চোখ বোজে, জ্ঞান হারায়৷
মিনিট পনেরোর মধ্যে উদ্ধারকারী বাহিনীর যুবক রিচার্ড ব্রোকোলা ঢুকে পড়ে ভাঙা উইন্ডস্ক্রিন দিয়ে৷ ভিতরে জনের অচেতন দেহ পাঁজাকোলা করে তুলে সে বেরিয়ে আসে বাইরে৷
স্ট্রেচারে জনকে শুইয়ে দিতেই সবাই শিউরে উঠল,—ঈস্! কী ভয়ানক!
জনের মুখের আদলটা গোলাকার মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়েছে৷ চোখ নাক কান কিছুই আলাদা করে চেনা যাচ্ছে না৷ ওর মুখে কতশো হুল বিঁধে আছে, কে জানে৷
ডেপুটি শেরিফ চেঁচিয়ে উঠলেন,—এখনি একে হাসপাতালে নিয়ে যাও৷ অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন না দিলে বাঁচবে না৷...
শেষপর্যন্ত অবশ্য সপ্তাহখানেক ভুগে জন শেন সুস্থ হয়ে ওঠে৷ ওর ভাগ্য সুপ্রসন্ন৷ মৌমাছির কামড় ছাড়া হাত পা কিছুই ভাঙেনি৷
ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৯২ সালের ২৩ মে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন