ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়

তুই ফের বিজ্ঞাপন দিয়েছিস?—বলতে বলতে দরজা দিয়ে প্রবেশ করে টম হিউজ৷
—ইয়াহ্! বেরিয়েছে? দে-দেতো কাগজটা৷ আমি সিওর, এবার সাড়া পাবই৷
—ছাই পাবি! তোর মতন পাগল তো গন্ডায় গন্ডায় নেই৷ এসব পাগলামি ছাড় তো৷ মাথা ঠান্ডা করে একটু ভেবে দ্যাখ্, তুই কী ভীষণ দুঃসাহসের কাজ করতে চাইছিস৷ এই অতবড় মহাদেশটা, যার বেশিরভাগটাই জঙ্গল পাহাড় মরুভূমিতে ভর্তি—
—আমি যাবই৷ কেউ না এলে একাই৷
দৃঢ়স্বরে কথাটা বলেই বন্ধুর কাছ থেকে কাগজটা ছিনিয়ে নেয় এডওয়ার্ড কুক৷ পড়তে শুরু করে তার নিজেরই দেওয়া বিজ্ঞাপনটা!...
প্রিয় বন্ধু, আমি পায়ে হেঁটে আফ্রিকা মহাদেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পাড়ি দেব৷ আপনি যদি এই দুর্গম অভিযানে আমার সাথী হতে চান, অবিলম্বে যোগাযোগ করুন৷ আপনার সব খরচ আমার৷—এডওয়ার্ড কুক৷
বাঃ, ওরা বেশ গুছিয়ে লিখে দিয়েছে তো!—কুক উচ্ছ্বসিত: তোকে বলে দিচ্ছি, এবার সাড়া পাবই৷
হ্যাঁ, এই আনন্দেই থাক৷—গজগজ করতে করতে বাইরে দিকে এগোয় টম: তোকে থামানো স্বয়ং যিশুরও অসাধ্য৷
ঠিক ধরেছিস৷—মুচকি হেসে কুক বলে: শোন্, অভিযানের জন্যে বেশ কয়েকটা জরুরি জিনিস কিনতে হবে৷ তুই যাবি তো আমার সঙ্গে?
কোনও উত্তর না দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে যায় টম৷
ঠিক তিনসপ্তাহ পর৷ ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ৮ই সেপ্টেম্বর, সকালবেলা৷
জাহাজে ভেসে অস্ট্রেলিয়া থেকে দক্ষিণ অফ্রিকার কেপটাউন৷ সেখান থেকেই শুরু হবে যাত্রা৷
তবে একা নয়, সঙ্গী শেষাবধি জুটেছে কুকের৷ ওই সর্বশেষ বিজ্ঞাপনের কল্যাণেই৷ সঙ্গীটি স্বভাবে কুকেরই মতন, ওরকমই বেপরোয়া, দিলখোলা, ফুর্তিবাজ স্বভাবের যুবক৷ নাম রোনাল্ড মনসন৷
এই অল্প ক’দিনেই রোনাল্ডের সঙ্গে তাই দারুণ সখ্যতা জন্মে গেছে কুকের৷
কেপটাউনে দিনদুয়েক বিরতি৷ তারপরেই শুরু হল অভিযাত্রা, লক্ষ্য ওদের আফ্রিকার উত্তর সীমান্ত৷
কুক ও রোনাল্ড হাঁটতে শুরু করে৷ পরনে ওদের খাকি প্যান্ট, ঢোলা শার্ট, কোমরবন্ধে বুলেটের থলি, মাথায় টুপি, কাঁধে রাইফেল আর পিঠে হ্যাভারস্যাক৷
মাঝে মাঝে ছোট ছোট জনবসতি, কালো মানুষদের গ্রাম৷ ছোটখাটো জঙ্গল, নদীও পড়ল৷ ওরা দিনে হাঁটে, রাতে ঘুমিয়ে নেয়৷
দুসপ্তাহ পার হয়ে গেল৷ একটানা হেঁটে দুজনেই পরিশ্রান্ত৷ জোহানেসবার্গ শহরে পৌঁছল৷ এখানে কালো মানুষদের উপর যারা চাবুক চালায়, সেই শ্বেতাঙ্গ পুরুষরাও রয়েছে৷ তাদের জন্যেই গড়ে উঠেছে হোটেল, বাজার, ক্লাব, অফিস৷
পকেটে রেস্ত কম৷ দুই বন্ধু তাই সস্তার হোটেলে ঘর ভাড়া নিল৷ একদিন এখানে থেকে ক্লান্তি কাটিয়ে নিতে হবে৷ তাছাড়া আরও কিছু টুকিটাকি কেনাও বাকি৷
যথাসময়ে ওরা জোহানেসবার্গ ছাড়ল, ম্যাপ দেখে এগিয়ে চলে উত্তর পূর্বে৷ মাঝে মাঝেই কম্পাস ধরে ওরা দিক মিলিয়ে নেয়৷
সামনে কোনও জনবসতি নেই৷ শুধুই গহন অরণ্য৷ বিশাল বিশাল বনস্পতি পত্রপল্লবে সূর্যকে আটকে নিষ্পলকে তাকিয়ে আছে দ্বিপদ অভিযাত্রীদের দিকে৷
হাঁটছে তো হাঁটছেই, জঙ্গল আর শেষ হয় না৷ রাতে গাছের ডালে জিরোনো, সকালে উঠে আবার হাঁটা৷ রাতে জিরোনোই সার, জঙ্গলের আরশোলা সাইজের মশার কামড়ে ঘুমোনো অসম্ভব৷
তিনদিন অবিরাম হাঁটার পর ছোট্ট একটা জনবসতি৷ সামান্য কয়েকঘর বাসিন্দা৷ সবাই কালো মানুষ৷
শরীর আর চলছে না৷ হাবেভাবে অতি কষ্টে দুজনে ওই জংলি মানুষদের বোঝাল,—আমরা শত্রু নই, বন্ধু৷ রাতের জন্য একটু আশ্রয় চাই৷
অনেক বোঝানোর পর গাঁওবুড়োর চোখ থেকে সন্দেহের ভ্রূকুটি অপসৃত হল৷ রাতে থাকার জন্যে একখানা পাতায় ছাওয়া চালা জুটলো, খিদে মেটাতে মিলল কিছু বুনো ফল, ঝলসানো মাংস৷
আঃ, কী উপাদেয়! পেটভরে খেয়ে পরম আরামে চোখ বোঁজে রোনাল্ড আর কুক৷
আগে ঘুম ভাঙে রোনাল্ডেরই৷ চোখ মেলে দেখে, বেড়ার ফাঁক দিয়ে ভোরের রাঙা আলো এসে ঢুকেছে৷ পাশে অঘোরে নিদ্রিত কুককে সে ঠেলা মারে,—অ্যাই, অ্যাই এডওয়ার্ড! সকাল হয়ে গেছে—!
বলতে বলতে সে চমকে ওঠে৷
এ কী! কুকের সর্বাঙ্গ যে পুড়ে যাচ্ছে৷
ধড়মড়িয়ে উঠে বসে রোনাল্ড৷ কোমলকণ্ঠে ডাকে,—এডওয়ার্ড, কী হয়েছে তোমার? উঠে পড়ো৷
কোন সাড়া নেই৷ অভিযানের নেতাই ধূম জ্বরে বেহুঁশ!
কালক্ষেপ না করে সঙ্গে সঙ্গে রোনাল্ড ছুটে যায় গাঁয়ের প্রধান গাঁওবুড়োর কাছে৷ যতটা সম্ভব বোঝায় বন্ধুর অবস্থাটা৷
আদিবাসী মানুষগুলি সত্যিই পরোপকারী, অতিথিবৎসল৷ অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই গাঁয়ের ওঝাকে নিয়ে গাঁওবুড়ো নিজেই এসে হাজির হল ওদের কুটিরের সামনে৷
বেশ কিছুক্ষণ ধরে নেড়েচেড়ে অচেতন কুককে পরীক্ষা করে ওঝা৷ তারপর থলি থেকে একটা তরল পদার্থ ঢেলে দিল কুকের গলায়৷
ভীষণ উদ্বিগ্ণ রোনাল্ড—এই টোটকায় হিতে বিপরীত হবে না তো?
আধঘণ্টার মধ্যে কুক চোখ মেলে তাকায়৷ ওকে তাকাতে দেখে ওঝা আরও খানিকটা ওষুধ একটা খোলায় ঢেলে রোনাল্ডের হাতে দিয়ে বলে,—এটা আজ আরেকবার খাইয়ে দিও৷ তবে এ জ্বর খুব বিশ্রী, পুরোপুরি সেরে উঠতে একমাস লেগে যাবে৷
ওঝা ও গাঁওবুড়ো প্রস্থান করে৷ ঘরের মধ্যে একা রোনাল্ড বিড়বিড় করে,—একমাস! তাহলে তো এবারের মতো অভিযান বাতিল৷
না—! কথাটা কানে যেতেই কুক লাফিয়ে উঠে বসল৷ হাঁপাতে হাঁপাতে তীব্রকণ্ঠে বলে,—কখ্খনো না! অভিযান ব্যর্থ হতে পারে না৷ তুমি—তুমি একাই যাবে!
সে হয় কখনও? তোমাকে এই অবস্থায় ফেলে আমি চলে যাব? কখ্খনো না৷—রোনাল্ড সজোরে মাথা ঝাঁকায়৷
হ্যাঁ, যাবে৷ একশোবার যাবে!—জ্বরাক্রান্ত শরীরেও কুক যেন টগবগ করে ফুটছে: অভিযানে কোনও মানুষই অপরিহার্য নয়, অপরিহার্য হল অভিযান৷ তাকে সামান্য কারণে কখনোই ব্যর্থ হতে দেওয়া চলে না৷ শোন রোনাল্ড—
একটু দম নিয়ে কুক ফের বলে,—এই অভিযানের গেড়াতেই ঠিক হয়েছিল, আমিই নেতা৷ বলেছিলাম, আমার সবরকম নির্দেশ তুমি শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে মেনে চলবে৷ সেই নেতা হিসেবেই তোমায় নির্দেশ দিচ্ছি, আজকেই তুমি বেরিয়ে পড়ো৷
থমকে গেল রোনাল্ড৷ অকাট্য যুক্তি৷ আর নেতা, তার বন্ধুই তাকে বলছে, ছেড়ে যেতে৷ সে মানতে বাধ্য৷ কিন্তু মন মানছে না! অসহ্য আবেগ উঠে আসছে শরীর বেয়ে, কথা বন্ধ করে দিচ্ছে৷ তবু অতিকষ্টে সে বলে,—বেশ, আমি যাচ্ছি৷ কিন্তু তুমি?
আমি?—রোনাল্ডের অশ্রুসজল চোখের দেিক তাকিয়ে কুকেরও বাকরোধ হয়ে যায়৷ মুখ নামিয়ে অস্ফুটে সে বলে: আমি সুস্থ হয়ে ফিরে যাব শহরে, জোহানেসবার্গে৷ সেখানে অপেক্ষা করে থাকব তোমার জয়ের সংবাদের জন্যে৷ বিদায়, বিদায় বন্ধু৷
বি-দা-য়!—রোনাল্ড উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত যা কিছু গুছিয়ে নেয়৷ কাঁধে ফেলে উদ্ভ্রান্তের মতো বেরিয়ে আসে কুটির ছেড়ে৷
পেছনে দুহাতে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়ে এড্ওয়ার্ড কুক৷
ছোট্ট শহর মেসিনা৷ রোডেশিয়ার সীমান্ত৷ টানা একসপ্তাহ একা একা বনবাদাড় ঠেঙিয়ে এখানে এসে পৌঁছেছে রোনাল্ড৷
নিঃসঙ্গ বিষণ্ণ রোনাল্ড ঢুকেছে একটা ‘আর্মস’-এর দোকানে৷ কিছু টোটা কিনতে হবে৷ হঠাৎ পিছন থেকে ডাক,—রোনাল্ড, আরে রোনাল্ড না?
কে? কে? কুক ফিরে ফিরে এসেছে? সচকিত রোনাল্ড মুহূর্তে ঘাড় ঘোরায়৷
ক্ষণিকের সুদীর্ঘ অদেখা স্তব্ধতা৷ কয়েকমুহূর্ত পরেই কণ্ঠের মালিককে চিনতে পারে রোনাল্ড৷ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে ওঠে,—উইলসন? তুই এখানে?
ছেলেবেলার বন্ধু উইলসনও উত্তেজিত,—তার আগে বল্, তুই এখানে কেন? কী ব্যাপার?
সংক্ষেপে সব খুলে বলল রোনাল্ড৷
শুনেই লাফিয়ে ওঠে উইলসন,—আঃ দারুণ! আমিও যাব তোর সঙ্গে৷
—তুই! এই বিপজ্জনক অভিযানে?
—হ্যাঁ৷ বুঝলি, অনেকভাবে চেষ্টা করলুম ভাগ্য ফেরাতে, কিন্তু কিছুতেই ফাটা কপাল জুড়তে পারিনি৷ সেজন্যেই এদেশে এসেছি৷
—কিন্তু এতে তো, দোস্ত তোমার কপাল ফিরবে না৷ উল্টে বারোটা বাজবে৷
বাজুক গে!—উইলসনের দু-চোখের তারা যেন নাচতে থাকে: এরকম একটা অ্যাডভেঞ্চার! সেই ছেলেবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতুম দুনিয়ার সেরা অভিযাত্রী হব৷ সে সুযোগ হাতের কাছে পেয়ে ছাড়া যায়? চল্-চল্, আজই রওনা হব৷
একজন থেকে আবার দুজন৷ নতুন উৎসাহে, উদ্দীপনায় ওরা এগিয়ে চলে৷ পথনির্দেশিকা কুকের ম্যাপ৷ ওরা হাঁটতে থাকে উত্তর-পূবমুখো৷ উইলসন ছোকরা দারুণ আমুদে৷ একনাগাড়ে বকবক করতে পারে, তার ঝুলিতেও আছে নানান মজাদার সব গল্পগাছা৷
বেশ কয়েকদিন পার হয়ে গেছে৷ রোডেশিয়াকে পিছনে ফেলে রোনাল্ড আর উইলসন এসে হাজির হয় বুলাওয়েয়োতে৷ গত দিনগুলোয় ভয়ঙ্কর কষ্ট হয়েছে ওদের৷ খরায় জ্বলছিল রোডেশিয়া৷ মাথার উপর গনগনে সূর্য যেন সহস্র আগুনের ধুনি জ্বেলে দিয়েছিল৷ মাঠঘাট বনপ্রান্তর ফেটে ফুটিফাটা৷ আগুনে মাটিতে পা ফেলা যায় না৷ শেষ ক’টা দিন অগত্যা ওরা দিনে ঘুমিয়েছে, রাতে হেঁটেছে৷
এমনি করেই ওরা পেরিয়ে এসেছে আফ্রিকা মহাদেশের ১৬০০ মাইল৷
বুলাওয়েয়োতে জিরোতে না জিরোতেই আকাশে ঘনকৃষ্ণ মেঘ দেখা দিল৷ দাবদাহের প্রকোপ গেল কমে৷ দুই বন্ধু সব ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে আবার হাঁটা শুরু করল৷
কিন্তু অনভিজ্ঞ বেচারিরা জানত না, অরণ্য অধ্যুষিত আফ্রিকা বর্ষার সমাগমে কতখানি দুর্গম, বিপদসঙ্কুল৷
অবিশ্রান্ত বৃষ্টি আর বৃষ্টি! পথ চলা দায়৷ থকথকে আঠালো কাদা, পা আটকে যায় কাদায়৷ তার উপর বর্ষা পেয়েই গর্ত থেকে বেরিয়ে পড়েছে বিষাক্ত যত পোকামাকড়, মশা মাছি৷
আর—হ্যাঁ, সাপ! বর্ষার এই অরণ্যে বিষাক্ত সর্পরাজদের অবাধ বিচরণ! একবার তো ভয়ানক বিষাক্ত র্যাল স্নেকের ছোবল খেতে খেতে বেঁচে গেল রোনাল্ড৷ একটি কামড় মানেই মৃত্যু৷
তবু থেমে গেলে চলবে না৷ অভিযান মানেই জীবনের ঝুঁকি—সব বাধাবিপত্তি ঠেলে লক্ষ্যে পৌঁছনো৷
সহসা একদিন ওদের চোখের সামনে দেখা দেয় ঢেউ খেলে যাওয়া নীল পাহাড়শ্রেণী৷
তড়িঘড়ি কুকের ম্যাপ বের করে রোনাল্ড৷ চেঁচিয়ে ওঠে উল্লাসে,—কিলিমাঞ্জারো৷ কিলিমাঞ্জারো! প্রায় অর্ধেক এসে গেছি৷
দুজনের হাঁটার গতি গেল বেড়ে৷ পাহাড়ে পেরোলেই কেনিয়া৷
কিন্তু ওরা যত এগোয়, ছলনাময়ী পাহাড় তত পিছিয়ে যাচ্ছে৷
দিগন্তে ক্রমেই স্পষ্ট আর উঁচু হয়ে উঠছে পাহাড়ের ঢেউ৷ তবু এখনও বহুদূর! কুছ পরোয়া নেই—এগিয়ে চলো৷
ওরা পার হচ্ছে একটা গভীর অরণ্য৷ নিথর নিস্তব্ধ বনভূমি, ছায়াচ্ছন্ন৷ শুধু পাতার শব্দ, পাখির কলকাকলি৷
সামনে খানিকটা তৃণভূমি৷ সেখানে চরছে জেব্রা আর বাইসনের দল৷
সতর্ক হল রোনাল্ড উইলসন৷ জেব্রা ঠিক আছে, কিন্তু বাইসন ছেড়ে কথা বলবে না৷ ওরা সন্তর্পণে ঘাসবনকে পাশ কাটায়৷
অকস্মাৎ হাড়কাঁপানো ভয়াল গর্জন,—উম্-ম্-ম্-ম্!
থরথর কেঁপে উঠে বাঁ পাশে তাকাতেই ওদের রক্ত বরফ হয়ে গেল৷
আফ্রিকার অরণ্যসম্রাট—পুরুষ সিংহ! ঝাঁকড়া কেশর ফুলিয়ে সে গুঁড়ি মারছে৷ এখুনি লাফ দেবে৷ লক্ষ্য কি ওরাই?
হাতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড৷ রাইফেল তোলার সময় নেই, কাছাকাছি বড় গাছও নেই, দৌড়ানোও মূর্খতা৷ কিংকর্তব্যবিমূঢ় দুই বন্ধু দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকে ঠকঠক করে৷
মৃত্যু কয়েক গজ দূরে৷
হঠাৎই ভয় পাওয়া জেব্রার দল ওদের দুপাশ দিয়ে এলোপাথাড়ি ছুটতে আরম্ভ করল৷ সিংহটাও লাফ দিল তখনই৷
মারা গেল একজন৷ অভাগা এক জেব্রা৷
দ্বিপদ দুজন অবশ্য ততক্ষণে অনেক দূরে৷ সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ওরা ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটেছে বনবাদাড় ভেঙে, দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে৷
কতক্ষণ যে এভাবে ছুটেছে, খেয়াল নেই৷ ওরা থামল একেবারে কিলিমাঞ্জারোর পায়ের তলায় এসে৷
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে৷ গাঢ় লাল ছোপ লেগেছে অরণ্য চরাচরে৷
এখানেই আজ যাত্রাবিরতি৷...
পরদিন সকাল৷ দুজনে প্রস্তুত হয় পাহাড়ে উঠতে৷ এইসময় ওদের চোখ পড়ে নিজেদের পায়ের দিকে৷ ঈস্! জুতো যে ছিঁড়ে ফর্দাফাই৷ পাথুরে নুড়িতে ভরা পাহাড় এই জুতো পরে ওঠা তো অসম্ভব! অত্যুৎসাহী উইলসন একবার চেষ্টাও করল উঠতে৷ খানিকটা উঠেই ‘উঃ আঃ’ করতে করতে নেমে এল নীচে৷
অগত্যা ওরা সিদ্ধান্ত নিল যে কিলিমাঞ্জারো পর্বতকে বেড় দিয়ে তাঞ্জানিয়া কেনিয়া সীমান্ত দিয়ে এগুবে৷
আবার পথ হাঁটা—অন্তহীন সময়হীন৷ মাথার উপর সূর্য উঠছে, নামছে, ওরা এগিয়ে চলেছে লক্ষ্যের দিকে৷
কেনিয়ায় ঢুকে একটু এগোতেই আবার নিবিড় অরণ্য৷ জঙ্গল এতই গভীর, উপরের গাছাপালার বুনোট এতই ঘন, যে সূর্যালোকও হার মেনেছে৷ ডালপালা কাটতে কাটতে বনের মাঝে পথ করে ওরা এগিয়ে চলে৷ সতর্ক দৃষ্টি ওদের চতুর্দিকে৷
হঠাং কানে ভেসে আসে গাছপালা ভাঙার মড়মড় শব্দ৷ শব্দটা তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে৷ চমকিত দুজনেই, হঠাৎ ঝড় উঠল নাকি?
কয়েকমুহূর্তের মধ্যেই শব্দের উৎস তাদের সামনে আত্মপ্রকাশ করে৷ সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কে ওরা পাথর৷
একটা দাঁতাল হাতি৷ চোখদুটো টকটকে লাল, শুঁড় উঁচিয়ে জঙ্গল ভাঙতে ভাঙতে ওদের দিকেই ধেয়ে আসছে৷ হাতিটা যেকোন কারণে ক্ষেপে গেছে৷
সংবিত আগে ফিরে পেল রোনাল্ড৷ ঊর্ধ্বশ্বাসে সে ছুট লাগাল বনের মধ্যে দিয়ে৷ বেচারা উইলসন তখনও বাহ্যজ্ঞানরহিত, দাঁড়িয়ে আছে৷
হুঁশ যখন ফিরে এল তার, বড্ড দেরি হয়ে গেছে! হাতিটার শুঁড় তার মাথার উপরে তখন দোল খাচ্ছে৷ একেবারে শেষমুহূর্তে বাঁচার তাগিদ প্রায় শুঁড়টা ছুঁয়ে সে গড়িয়ে গেল ফুটবলের মতো৷ অদূরের প্রকাণ্ড এক উইঢিবির পেছনে লুকোতে চেষ্টা করল গড়াতে গড়াতে৷
শিকার ফস্কে যাওয়ায় খুনে হাতিটা তখন আরো উন্মত্ত৷ মূর্তিমান যমদূতের মতো সে তেড়ে এল উইঢিবির দিকে৷ প্রচণ্ড লাথিতে ঢিবিটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে সে। উইলসনকে শুঁড়ে পেঁচিয়ে ধরল৷
হাতির শুঁড়ে অসহায় উইলসন শূন্যে! অদূরে অসহায় দর্শক রোনাল্ড৷ এক্ষুনি কিছু একটা করতেই হবে৷
হয়ত এর ফলেই অকস্মাৎ রোনাল্ডের কণ্ঠ চিরে বেরিয়ে এল জান্তব গর্জন,—ওঁ আঁ—ও আ...আঁ৷
থমকে গেল হাতিটা৷ শুঁড়টা ঘুরিয়ে সে খুঁজতে থাকে শব্দের উৎস৷
এই তো সময়৷ কালক্ষেপ না করে রোনাল্ড সর্বশক্তি দিয়ে মাথার সাদা বড় টুপিটা ছুঁড়ে মারল খুনের মাথা লক্ষ্য করে৷ শূন্যে পাক খেতে খেতে সেটা গিয়ে আঘাত করল হাতির মাথায়৷
সামান্য স্পর্শ, তবু অপ্রত্যাশিত৷ হাতিটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল৷ তারপর শুঁড় নামিয়ে উইলসনকে ছেড়ে সে খুঁজতে থাকে শব্দের উৎসকে৷
খোঁজ, ব্যাটা খোঁজ! ওরা আর দাঁড়ায়! বিপর্যস্ত উইলসনকে টানতে টানতে হিঁচড়োতে হিঁচড়োতে রোনাল্ড ছুটে চলে৷ ছোট্ ছোট্—যতদূর যাওয়া যায়৷
তাদের ছোটা যখন থামল, দিনমণি ডুবে গেছে দিগন্তে৷
আজ আর এগোবার শক্তি নেই—এখানেই বিশ্রাম৷ শ্বাপদসঙ্কুল বনভূমির মধ্যেই একটু ফাঁকা জায়গা দেখে আগুন জ্বালায় ওরা চারপাশে৷ যাহোক কিছু মুখে দিয়ে শুয়ে পড়ে৷
রাত কত রোনাল্ড জানে না৷ হঠাৎ ওর ঘুম ভেঙে যায় বিশ্রী বোঁটকা গন্ধে৷ চোখ মেলে দেখে, আগুন নিভে গেছে৷ পাশে অকাতরে নিদ্রিত বন্ধু উইলসন৷ আর অনতিদূরে একগুচ্ছ চোখ জ্বলছে৷
ধড়মড়িয়ে উঠে বসল উইলসন৷ জন্তুগুলো মুখ দিয়ে অদ্ভুত আওয়াজ করছে—খ্যাঃ খ্যাঃ খ্যাঃ৷
হায়েনা! শিয়ালগোত্রের অত্যন্ত ধূর্ত জানোয়ার! স্বভাবে ভিতু হলেও ঘুমন্ত বা অসহায় প্রাণী পেলেই সদলবলে টেনে নিয়ে যায়৷
তড়াক করে লাফিয়ে উঠে মুখ দিয়ে জান্তব আওয়াজ করল রোনাল্ড৷ রাইফেলটাও সে বাগিয়ে ধরেছে৷ ধুপ্ধাপ্ শব্দে পালিয়ে গেল জন্তুগুলো৷
আগুনটা উস্কে দিয়ে আবার শুয়ে পড়ল রোনাল্ড৷...
হাঁটা আর হাঁটা—শেষহীন পথ৷ এইভাবে হাঁটতে হাঁটতে দুই অভিযাত্রী ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই জুন অতিক্রম করল নিরক্ষরেখা৷
কিন্তু জঙ্গল চলেছে ওদের সঙ্গে—শেষ আর হয় না৷
এভাবে চলতে চলতে ওরা এসে পৌঁছল মাউন্ট কেনিয়ার পার্শ্ববর্তী সমতলভূমিতে৷
অরণ্য এখানেও সঙ্গের সাথী৷ উপরন্তু ফাঁকা যেটুকু জায়গা, সেটুকুও ভরে আছে লম্বা লম্বা ঘাসে৷
পথ চলা যেমন কষ্টকর, আর তেমনি বিপজ্জনক৷ বড় বড় ঘাসের আড়ালে যেকোনও সময় আত্মগোপন করতে পারে হিংস্র শ্বাপদেরা৷
আবহাওয়াও আচমকা পাল্টে গেছে৷ শীতার্ত বাতাস বইছে হু-হু করে৷ অপ্রতুল জামাকাপড়ে হাড়ের মধ্যে বিঁধে যাচ্ছে ঠান্ডার সূঁচ৷
তবুও দুই অভিযাত্রীর বুকের মধ্যে আশার আলো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে৷ মাত্র একের তিন ভাগ পথ বাকি৷ দুর্গম পথের বেশিরভাগটাই পেছনে ফেলে এসেছে তারা৷
হঠাৎ ঘাসবনে ও কীসের শব্দ—স্-র্-র৷ মুহূর্তে ঘাড় ঘোরায় দুজনে৷
সর্বনাশ! খড়্গ ঝুঁকিয়ে মেলট্রেনের বেগে পিছন থেকে ছুটে আসছে এক গন্ডার৷
আকস্মিক বিপদে উইলসন বরাবরই একটু শ্লথ! রোনাল্ড তার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান মারে৷ বিদ্যুৎগতিতে ছুটে যায় সামনের ঝাঁকড়া গাছটা লক্ষ্য করে৷
ওঃ! এক চুলের জন্যে রক্ষা পাওয়া গেছে৷ তরতর করে গাছ বেয়ে উঠতে উঠতে ওরা দেখে, গন্ডার মহোদয় ব্যর্থ আক্রোশে গাছের গোড়ায় খড়্গ ঠুকছে৷ সেই প্রচণ্ড আঘাতে থরথর কেঁপে উঠছে বিরাট মহীরূহ৷
উইলসন রোনাল্ড প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে গাছকে৷
এদিকে আরেক বিপত্তি! ঝাঁকুনির চোটে গাছের ফাঁকফোঁকর থেকে কাতারে কাতারে বেরিয়ে এসেছে লাল বড় বড় পিঁপড়ে৷ নির্বিচারে তারা কামড়াতে তাকে দুই বন্ধুকে৷
উঃ! কী অসহ্য জ্বালা! সর্বাঙ্গ কয়েক মিনিটেই ফুলে উঠেছে৷
উইলসন কাতরকণ্ঠে বলে,—ওঃ রোনাল্ড! আর পারছি নারে৷
চুপ!—রোনাল্ড ধমকে ওঠে৷
এমনসময় আচমকা আরম্ভ হয়ে গেল সাঁ-সাঁ ঝোড়ো বাতাস৷ ওদের কাছে যেন শাপে বর হল৷ ঝড়ে গাছপালাগুলো দুলতে লাগল, পাখিরা কোটরের আশেপাশে পাক খেতে লাগল৷
ঝড়ের মাতন দেখে গন্ডারটা এদিক ওদিক বারকয়েক তাকায়, তারপর ছুট দেয় অন্যদিকে৷
আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দুজনে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে গাছ থেকে৷ সর্বাঙ্গ যেন জ্বলে যাচ্ছে বিষের জ্বালায়৷ ঘাসের জমিতে গড়াগড়ি দিতে থাকে পাগলের মতো৷
সামনে সুপ্রশস্ত নীল নদ৷ ওপার দেখা যায় না, দিগন্তে গিয়ে মিশেছে৷
নীল নদের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে রোনাল্ড আর উইলসন৷ গভীর চিন্তামগ্ন৷ ওদের অভিযান নতুন সমস্যার মুখোমুখি৷
কেনিয়ার গহন জঙ্গল পার হয়ে ওরা আবিসিনিয়ায় ঢুকতে পারেনি৷ সীমান্তরক্ষীরা আটকে দিয়েছে৷ বলছে, সামনে জলাভূমি আর অরণ্য৷ যে যায়, সে আর ফেরে না৷ সুতরাং তারা ওদের জেনেশুনে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে না৷
অগত্যা ওই সীমান্ত ত্যাগ করে পশ্চিম দিকে উগান্ডা পার হয়ে ওরা এসে পৌঁছেছে সুদানে৷ তারপর কিছুটা হাঁটতে না হাঁটতেই মূর্তিমান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে দিগন্তবিসারী নীল নদ৷
এই সেই সুপ্রাচীন নীল নদ! এর কথা ওরা পড়েছে হাজার হাজার বছর আগের মিশরীয় সভ্যতার গৌরবময় ইতিহাসে৷ আজও বয়ে চলেছে অবিরাম৷
ওদের এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্থানীয় আদিবাসীরা ভিড় করে আসে৷ ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে রোনাল্ড বোঝানোর চেষ্টা করে ওদের উদ্দেশ্য৷ সবাই একবাক্যে রায় দেয় বজরা ভড়া করে নীল নদ পাড়ি দিতে৷
অতএব আপাততঃ পদযাত্রা শেষ৷ বজরায় চেপে ওরা ভেসে চলে নীলনদ বেয়ে৷
এমনিভাবে ৩০০ মাইল পাড়ি দেবার পর ওরা এসে পৌঁছোয় জলাভূমির প্রান্তে৷ নীলনদের পশ্চিম দিক ধরেই এই জলাভূমি, চলেছে মাইলের পর মাইল৷
জলাভূমি হলেও ডাঙা তো৷ জলবিহার তো অভিযানের নীতিবিরুদ্ধ৷ এদিকে জলাভূমিতে হাঁটারও উপায় নেই৷ কোথাও হাঁটু, কোথাও বা কোমর অবধি ঘোলা জল৷ তার উপর বড় বড় জলজ ঘাস মাথা উঁচিয়ে আছে৷
এবার একটা ডোঙা নৌকো কিনে ফেলল ওরা৷ দুটো বৈঠা নিয়ে উঠে বসল ডোঙায়৷ সামনে দিগন্তবিসারী জলাভূমি৷
কিন্তু দুর্ভাগ্য যেন ওদের সঙ্গের সাথী৷ এই বিলে যে এমন বিষাক্ত মশার বাস, ওরা কি স্বপ্নেও ভেবেছিল?
কী দুঃসহ কষ্ট! দিনরাত ভনভন করছে মশা৷ কামড়ে কামড়ে সারা গায়ে ঘা হয়ে গেল! একটু ঘুমোবার জো নেই৷
তার মধ্যে আবার গোদের উপর বিষফোঁড়া ওই জলাঘাসগুলো৷ ওগুলো আটকে দেয় ডোঙাকে৷ তখন নেমে জলার মধ্যে দিয়ে ডোঙা মাথায় নিয়ে হাঁটতে হয়৷ জলের পোকামাকড়রা কামড়ে ধরে নিম্নাঙ্গ৷
সর্বাঙ্গে শুধু যন্ত্রণা আর ক্ষত৷
অভিযাত্রী দুজন তবু এগিয়ে চলে এগিয়ে চলে অজেয় আশা আর প্রাণশক্তি সম্বল করে৷ লক্ষ্য আর দূরে নয়৷
১৯২৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর এই ম্যারাথন পদযাত্রা সমাপ্ত হল৷ ক্ষতবিক্ষত বিপর্যস্ত দুটো মানুষ ধুঁকতে ধুঁকতে এসে পৌঁছোল কায়রো শহরে৷ পোশাক পরিচ্ছদ শতচ্ছিন্ন, মুখময় দাড়িগোঁফের জঙ্গল, সারা গায়ে দগদগে ঘা৷ তবু তারই মধ্যে ঠিকরে বেরুচ্ছে দু-চোখের অত্যুজ্জ্বল দীপ্তি৷ অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছোনোর আনন্দে, জয়ের গর্বে
নিঃশেষিত জীবনীশক্তি হঠাৎই সহস্রগুণ বেড়ে গেছে৷
হোটেলে পৌঁছে প্রথমেই ওরা চালু করল নিজস্ব শক্তিশালী রেডিয়ো ট্রান্সমিটার৷ দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করল: ‘হে বিশ্ববাসী, আমরা দুজন অস্ট্রেলিয়ান যুবক, পায়ে হেঁটে আফ্রিকা মহাদেশ পার হয়েছি৷’
খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই দুনিয়ার নানান্ কোণ থেকে ছুটে এল অজস্র সাংবাদিক, ফোটোগ্রাফাররা৷ তারা এদের ইন্টারভিউ নিতে চায়, ছবি ছাপতে চায়৷ রাতারাতি বিশ্ববিখ্যাত হয়ে গেল দুই অখ্যাত যুবক৷
কিন্তু না! রোনাল্ড বেইমান নয়৷ উপস্থিত সবাইকে সর্বপ্রথমে সে একটা কথাই বলল: ‘এই অভিযানের নেতা এড্ওয়ার্ড কুক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন জোহানেবার্গের কাছে পারানা গ্রামে৷ আপনারা সবার আগে তাঁর খবর নিন৷ তাঁকে জানান, তাঁর পরিকল্পিত অভিযান সার্থক হয়েছে৷’
বলার সময় রোনাল্ডের চোখদুটো চিক্চিক্ করছিল৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন