ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়

অপূর্ব! চতুর্দিকে তুষারমুকুট শোভিত পাহাড়শ্রেণী, ধু-ধু সবুজ প্রান্তরে ছিটোনো পেঁজা তুলোর মতো বরফ৷ একটানা বয়ে চলেছে নিঃসঙ্গ পাহাড়ি নদী নিক, রুপোলি ফিতের মতো৷ কবোষ্ণ হলুদ রোদ্দুর আর হিমেল হাওয়া...
দুনিয়ার সবচেয়ে উত্তরের দেশ—আলাস্কা৷
কিন্তু এখানেও মৃত্যু ওৎ পেতে আছে৷ নির্মম নৃশংস মৃত্যু!...
বুঝলি, ভালো দিনেই বেরিয়েছি৷—হানচেল বলল : একেবারে মাসের প্রথম দিন৷
যা বলেছিস৷—চেন ওর কথায় সায় দেয় : মাসটাও সেপ্টেম্বর, বুনোহাঁস এখন অঢেল৷
সালটা দ্যাখ্৷—হানচেল আবার বলে : উনিশশো একাশি৷ গোড়ায় এক, শেষেও এক৷
দূ-র!—চেন হেসে ধমক দেয় : যত্তসব বাজে সংস্কার! শোন এবারে মোটরবোটটা থামাতে হবে৷ তলায় আটকে যাচ্ছে৷
হুম্!—হানচেল সামান্য ঝুঁকে পড়ে: ভাঁটার টান শুরু হয়েছে! তুই বরং খাবারের ব্যাগটা নে, আমি রাইফেল দুটো!
বলতে বলতে ওরা মোটরবোটের স্টার্ট বন্ধ করে পাড়ের কাছে নিয়ে আসে৷ হানচেলের কাঁধে রাইফেল, চেনের হাতে খাবারের ব্যাগ৷ একলাফে ওরা জমিতে নেমে বোটটাকে টেনে ডাঙায় এনে তুলল৷
নক্স চেন আর লটন হানচেল৷ দুই প্রাণের বন্ধু! আলাস্কার অ্যানকরেজ শহরের প্রায় সবাই ওদের একডাকে চেনে৷ কোথাও শিকারের গন্ধ পেলেই হল! চেন আর হানচেল পৌঁছে যায় সেখানে৷ যদিবা তেমন কিছু না থাকে তো—নিদেনপক্ষে বুনোহাঁস! তাই সই!
এই শরৎ ঋতুতে আলাস্কায় নানাজাতের বুনো হাঁসের ছড়াছড়ি! যেমন নধর চেহারা, তেমনি জিভে জল আসা স্বাদ! দু-বন্ধুতে তাই একটু ছুটি পেলেই, ব্যস! মোটরবোটটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে৷
নদীর পাড় ধরে চেন আর হানচেল এগোচ্ছে উত্তর দিকে৷ এখনও অনেকটা পথ হাঁটতে হবে৷ দুজনেরই আপাদমস্তক ঢাকা গরম পোশাকে৷
আগে আগে চলছে হানচেল, পিছনে চেন৷
পায়ের নীচের বালিটা কী ঠান্ডা রে! সরসর করছে!—হানচেল নীরবতা ভেঙে বলে : ভাটায় বালি নিংড়ে জল টেনে নিচ্ছে৷ সমুদ্র কাছেই তো৷ এখানে তাই জোয়ার—
থেমে যায় হানচেল! কী ব্যাপার! চেন কথা বলছে না কেন?
সঙ্গে সঙ্গে পিছন ফিরল হানচেল এবং শিউরে উঠল৷
একটু দূরেই অসহায়ভাবে নিশ্চল চেন৷ ওর সামনের পা বাড়ানো৷ পিছনের পা গোড়ালি অবধি ডুবে গেছে জমিতে৷ সামনের দিকে ভর দিয়ে ও আপ্রাণ চেষ্টা করছে পিছনের পা তুলতে—পারছে না! আরও ডুবে যাচ্ছে!
মুহূর্তে আতঙ্কের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল হানচেলের মুখে—চোরাবালি! মরণবালি! চেন আটকে পড়েছে চোরাবালির ফাঁদে৷
হানচেল শুনেছে, আলাস্কা অঞ্চলের চোরাবালি কী ভয়ানক! শিলাপাথরের সঙ্গে মিশে থাকে সূক্ষ্ম বালুকণা৷ জোয়ারে যখন নদীর জল তিন-চার ফুট ওপরে ওঠে, এইসব ডাঙাও চলে যায় জলের নীচে৷ বালিগুলো শিলা থেকে আলাদা হয়ে যায়, জলে ভরে ওঠে৷ আর ভাটার সময় টান যত বাড়ে, বালি-পাথরের আঁটুনি ততই শক্ত হতে থাকে৷
জোয়ার না আসা অবধি এই বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়া একরকম অসম্ভবই বলা চলে৷
হানচেল দ্রুত এগিয়ে এল বন্ধুর দিকে,—চেন! তুই এক্ষনি খাবারের ব্যাগটা ফেলে দে৷ বোঝা হালকা কর৷ আর যতটা পারিস, ঝুঁকে পড় সামনের দিকে৷
চেনের মুখ আতঙ্কে নীল৷ কাঁধ থেকে একটানে সে ছুঁড়ে দিল খাবারের ব্যাগটা৷ সেটা এসে পড়ল হানচেলের কাছেই৷
সঙ্গে সঙ্গে আঁতকে উঠে কয়েক পা পেছিয়ে গেল হানচেল৷
নিমেষের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল ব্যাগ!
সে কী! এখানেও চোরাবালি!
চটপট নিজের কোমর থেকে চামড়ার বেল্টটা খুলে ফেলল হানচেল! দেখা যাক্ শেষ চেষ্টা করে! বেল্টের অন্যপ্রান্ত সে ছুঁড়ে দিল চেন-এর দিকে,—ধর!
চেন দু-হাতে সর্বশক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরল বেল্টটাকে৷ আর এদিক দিয়ে প্রাণপণে টানতে চেষ্টা করে হানচেল!
উঃ—উঃ! এই হিমঠান্ডাতেও ফোঁটা ফোঁটা ঘামের বিন্দু জমে হানচেলের মুখে ঘাড়ে গলায়! আরেকটু...আরেকটু—আরও জোরে...!
নাহ্! হানচেল নিজেই যে এগিয়ে যাচ্ছে! চেনের ডান পা গেঁথে আছে মাটির নীচে৷ ওর পা কেউ যেন সাঁড়াশি দিয়ে চেপে ধরেছে৷
হবে না, এভাবে হবে না৷ দুজনকেই মরতে হবে৷
চেন, চেন! তুই অপেক্ষা কর৷ আমি, আমি দেখছি!—বলতে বলতে হানচেল ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট দিল দক্ষিণ দিকে৷
চেন পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে জনমানবহীন প্রান্তরে৷
সূর্য অনেকটা উপরে উঠে পড়েছে৷ তার মানে আর ঘণ্টাদুয়েক পরেই জোয়ার আসবে৷ জল মিনিটে মিনিটে বাড়বে কয়েক ইঞ্চি করে৷ ব্যস, সলিল সমাধি৷
চেনের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ওর ছেলেমেয়েদের মুখগুলো৷ সতেরো বছরের কিশোরী তারা, চোদ্দো বছরের তৃণা আর দশ বছরের দুরন্ত দামাল অ্যান্টনি৷ ওদের সঙ্গে কি আর কোনোদিন দেখা হবে না?
পায়ের তলাটা কি ঠান্ডায় পচে যাচ্ছে?—উহ্! অসহ্য যন্ত্রণা যেন খুবলে খাচ্ছে৷ দাঁতে দাঁত চাপে চেন, ওকে সহ্য করতে হবে৷
ওর চোখের সামনে ভেসে উঠেছে ওর সদ্য প্রয়াত স্ত্রীর হাস্যোজ্জ্বল মুখ৷ ক্রিস্টিন৷ মাত্র বত্রিশ বছর বয়েসে দুরারোগ্য ক্যান্সারে দুনিয়ার মায়া কাটিয়েছে৷
কিন্তু কী অসম্ভব মনের জোর ছিল ক্রিস্টিনের! অসহনীয় কর্কটের সমস্ত দংশন মুখ বুঁজে সে সহ্য করেছে শেষদিন পর্যন্ত৷ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে চেন ক্রিস্টিনের শেষ সময়টা৷ যন্ত্রণায় ওর শরীরটা কুঁকড়ে এতটুকু হয়ে গেছিল, কিন্তু মুখে লেগে ছিল মধুর হাসি৷
মৃত্যু হার মেনেছিল ওই মহিলার কাছে৷
ক্রিস্টিন পারলে চেন পারবে না? এত তাড়াতাড়ি সে হার মানবে মৃত্যুর কাছে?
না, কখনও না! চেন সামনের দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে! তার শরীরটা একটু একটু করে ডুবে যাচ্ছে মৃত্যুবালুকায়৷
অ্যানকরেজ শহরের উপকণ্ঠে এয়ার ফোর্স বেস৷ সকাল দশটা৷ লেফটেনান্ট কর্নেল বিল ল্যাঙ্গলির টেলিফোনটা বেজে উঠল,—ক্রিং ক্রিং!
—হ্যালো! কর্নেল স্পিকিং!
—হ্যালো সার! আমি লটন হানচেল, অ্যানকরেজ শহরের বাসিন্দা! আমার একমাত্র বন্ধু নক্স চেন নিকের পাশের চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছে! প্লিস, প্লিস—তাকে বাঁচান৷ ওর বাড়িতে ও ছাড়া—
—স্টপ ইট্৷ জলদি সঠিক জায়গাটা বলুন৷ এখনও বেঁচে আছে কি?
—নিশ্চয়ই সার৷ জায়গাটা হল—
আধঘণ্টার মধ্যেই একখানা বড় আকারের ফৌজি হেলিকপ্টার ভেসে উঠল আকাশে৷ হেলিকপ্টারে পাঁচজন লোক৷ অভিজ্ঞ পাইলট জিম সিল্স্, কো-পাইলট মাইক মিলার, ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার মাইক এঞ্জেল্স্ এবং দুজন উদ্ধারকারী প্যারা-রেসকিউয়ার রাডল্ফ কুলা আর ডন হামফ্রেজ৷
হেলিকপ্টার উড়তে থাকে নদীর পাড় বরাবর৷ কোথায়...কোথায় সেই মানুষটা?
সহসা চেঁচিয়ে ওঠে কো-পাইলট মিলার,—ওই যে, ওই যে! পশ্চিমদিকে!
ঠিক কুড়ি মিটার দূরত্বে ডুবন্ত চেন৷ হেলিকপ্টার এসে স্থির হল মাটি থেকে সামান্য উপরে৷
ঝুলন্ত দড়ি ধরে লাফ দিয়ে নামল কুলা আর হামফ্রেজ৷ দৌড়ে গেল অসহায় চেনের দিকে৷ সরু সরু শাবলের মতো দেখতে দুটো অস্ত্র নিয়ে ওরা কাদা ভেঙে এগোতে থাকে৷ কাদা খুঁড়ে, টেনে চেনকে বার করে আনতে হবে৷
কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে কুলার বাঁ-পা গেঁথে গেল আঠালো কাদায়৷ হামফ্রেজের দু-দুটো পা-ই হাঁটু অবধি ডুবে গেছে৷
সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হল কুলা৷ ঝটিতি সে শরীর বাঁকিয়ে মুচড়ে নিজের পা-টা বের করে আনল৷ তারপর টান দিল সঙ্গীর বগলের মধ্যে দিয়ে হাত গলিয়ে,—নাহ্! এভাবে হবে না! এখানেও সেই মরণ বালি৷
চেনকে ফেলে ওরা পিছিয়ে যায় হেলিকপ্টারের দিকে৷
হেলিকপ্টার থেকে এবার নেমে এল একগাছা মোটা নাইলনের দড়ির গায়ে ঝোলানো বড় প্যাডল সিট৷ লম্বা একখণ্ড মজবুত তক্তা, তার দুপাশে দুটো গদিওয়ালা প্যাডল লাগানো৷
চেনের দেহ কোমর অবধি ডুবে গেছে৷ জীবন্ত সমাধি হতে আর ফুট তিনেক বাকি৷
কুলা হামফ্রেজ ওই যন্ত্রটাকে বারকয়েক দুলিয়ে ছুঁড়ে দিল চেনের দিকে৷ অব্যর্থ লক্ষ্য! দুহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরল চেন৷
দড়িটাকে পেঁচিয়ে নাও শরীরে!—হামফ্রেজ চিৎকার করে বলে: প্যাড্ল দুটোকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সিটটাকে দুপায়ের ফাঁকে ঢোকাবার চেষ্টা করো!
প্যাড্ল ঘোরাবার সঙ্গে সঙ্গে কাদাবালি ছিটকোতে থাকে৷ চেনের চোখমুখ ঢেকে যায়৷ এদিক থেকে দড়িতে টান দেয় কুলা হামফ্রেজ!
সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে চেন—সিটটাকে পায়ের ফাঁকে—না! কিছুতেই হচ্ছে না৷ উঠছে না দেহটা একচুলও৷
অন্যদিক থেকে কুলা হামফ্রেজও প্রাণপণে টানতে থাকে দড়ি! নাহ্, মনে হচ্ছে জমাট সিমেন্টের মধ্যে চেন গেঁথে গেছে৷
দড়ি ছেড়ে দিল প্যারা-রেসকিউয়াররা৷ দেখা যাক, হেলিকপ্টার দিয়ে টান দিলে ইঞ্জিনের শক্তিতে দেহটা যদি একটুও ওঠে৷
ঘর্-র্...র...র...!
গর্জন করতে করতে হেলিকপ্টার ওপরে উঠতে থাকে...
দড়িতে এবার টান পড়ছে...আরও...আরও...
স্টপ্-প!—প্রচণ্ড আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল কুলা৷
চেনের মুখ যন্ত্রণায় নীল! একচুলও ওঠেনি তার দেহ৷ কুলার মনে পড়ে গেল কিছুকাল আগের এমন আরেক ঘটনা৷
এরকম টানের চোটে সেই হতভাগ্যের দেহটা কোমর থেকে ছিঁড়ে দু-আধখানা হয়ে গেছিল!
হেলিকপ্টার থেকে পরিস্থিতিটা দেখেছে পাইলটরাও৷ ক্যাপ্টেন সিলস বলল,—এভাবে হবে না মিলার! আমাদের লোকটার একেবারে মাথার ওপর চলে যেতে হবে৷ একদম কাছে৷ তারপর টানতে হবে সোজাসুজি!
কী বলছ তুমি ক্যাপ্টেন?—মিলার বলল : যেরকম হঠাৎ হঠাৎ দমকা বাতাস দিচ্ছে, একচুল এদিক ওদিক হলে তো হেলিকপ্টারটা সোজা খসে পড়বে ওর ঘাড়ে!
ঝুঁকি নিতে হবে৷—সিলস শক্তকণ্ঠে বলে : অন্য কোন পথ নেই৷ জোয়ার আসতে বড়জোর ঘণ্টাখানেক বাকি৷
ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার এঙ্গেলসও ঘাড় নড়ল৷
হেলিকপ্টার আবার উড়তে উড়তে এগিয়ে এল চেনের মাথার উপরে...ককপিঠে শক্ত হয়ে বসে জিম সিল্স্...
ঠিক ন’মিটার উপরে হেলিকপ্টার৷ প্রপেলারের ঘূর্ণিতে থকথকে কাদা ছিটকোতে থাকে ভীষণভাবে, চেনের সারা শরীর ঢেকে যায়৷
দরজায় টানটান দড়ি ধরে বসে এঞ্জেল্স্!
হেলিকপ্টার এবার ধীরে ধীরে নামতে থাকে...ছ’মিটার...আরও নীচে, তিন মিটার...ইঞ্জিনের কানফাটা গোঙানি...এবার দু-মিটার...
ওহ নোও!—দু-হাত নাড়িয়ে আতঙ্কে আর্তনাদ করে ওঠে চেন৷ কপ্টারের দরজা দিয়ে ঝুলন্ত মই তার মাথা ছুঁই ছুঁই৷
ততক্ষণে ওই সিঁড়ি বেয়ে ঝুলে পড়েছে এঙ্গেল্স্৷ সরু শাবল দিয়ে দু-হাতে সে খুঁড়তে শুরু করেছে চেনের দুপাশের বালিমাটি!
কিন্তু যত খুঁড়ছে, চারপাশ দিয়ে তত কাদামাটি গলিত লাভার মতো এসে ভরাট করে দিচ্ছে জায়গাটা৷ প্রাণপণে চেষ্টা করছে চেনও৷
ককপিটে বসা সিল্স্-এর কপালে ঘাড়ে জমছে বরফশীতল ঘামের ফোঁটা৷ দু-পা প্যাডেলে, দু-হাত স্টিয়ারিঙে! একচুল এদিক-ওদিক হলেই —একবার দমকা বাতাস বইলেই মুহূর্তে শেষ হয়ে যাবে সব চেষ্টা৷
পাগলের মতো কাদামাটি সরাচ্ছে এঙ্গেল্স্৷ চেনের দেহের নিম্নাংশ সম্পূর্ণ অদৃশ্য৷ পেটের কাছ অবধি কবরে!
সহসা পাহাড়ের দিক থেকে একঝলক দামাল হাওয়া! কপ্টার বাঁ-দিকে টলে গেল। কো-পাইলট চেঁচিয়ে উঠল—বি স্টেডি সিল্স্৷
ঘড়িতে একটা পঁয়তাল্লিশ! জোয়ারের সময় হয়ে গেছে! নিষ্পন্দ পাথরের মতো বসে আছে ক্যাপ্টেন সিল্স্...দু-পায়ের গোড়ালি ব্যথায় টনটন করছে...সামনে কাদাবালিতে জল কি তির তির করছে?
সময় নেই, আর সময় নেই! এখনই তো বালিগুলো আলগা হতে আরম্ভ করবে!
দরজা দিয়ে ভেসে এল এঙ্গেল্সের কণ্ঠ,—হেই, হেই, ঘুমোচ্ছ কেন? ঘুমিও না—এখ্খুনি উঠে আসবে৷ হেই-হেই—!
চেনের দুটো হাত নেতিয়ে পড়েছে! এতক্ষণ লড়াই করে ও কি হেরে যাচ্ছে?
মিলার চেঁচিয়ে উঠল,—টানো, এঙ্গেল্স্, টানো! জোয়ার এসে যাচ্ছে! বালি আলগা হয়ে যাচ্ছে!
বলতে বলতে সে পেছন থেকে এসে জাপটে ধরে এঙ্গেল্স্কে! শরীরের সব শক্তি জড়ো করে টানতে থাকে দড়ি ধরে! হেইও...আরো জোরে...হেইও...
দুটো বাজে৷ আচ্ছন্ন চেনের মস্তিষ্কের কোষে কোষে যেন বেজে উঠল বাঁচার অদম্য আশা...ও কি উপরে উঠছে? সারা শরীরে সহস্র সাপের দংশন...ও কি বাঁচবে?
হ্যাঁ—হ্যাঁ, তাই তো! ও উপরে উঠছে৷ কোমর অবধি উঠে এসেছে! আরেকটু—আরেকটু—
চেনের সমস্ত চেতনা সক্রিয় হয়ে উঠেছে আবার৷ দু-হাতে সে আঁকড়ে ধরেছে সিটটাকে...আরেকটু উঠলেই সিটটাকে—
পেয়ে গেছি, পেয়ে গেছি! দু-পায়ের ফাঁকে পেয়ে গেছি! সঙ্গে সঙ্গে সিটটাকে চেন গলিয়ে দিল দু-পায়ের ফাঁকে, হাত দিয়ে প্যাডে্ল করতে আরম্ভ করল...
ইঞ্জিনের আওয়াজ ছাপিয়ে চেনের কানে আসছে কাদামাটির তীক্ষ্ম তীব্র শব্দ! সর্-সর্-সর্...ও দ্রুত উঠে আসছে!
উপর থেকে ঝুঁকে পড়েছে একজোড়া হাত৷
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে হাতদুটো স্পর্শ করল চেনের কাঁধ৷ পরক্ষণেই হ্যাঁচকা টানে বিধ্বস্ত দেহটা কপ্টারের ভিতরে৷
নিশ্চিত মৃত্যু হার মানল মানুষের কাছে!
ততক্ষণে ককপিটে এলিয়ে পড়েছে ক্যাপ্ঢেন সিল্স্, এই অসম লড়াইয়ের প্রধান নায়ক৷ অবসন্নকণ্ঠে বলে উঠল,—আর পারছি না মিলার৷ বাকি কাজটুকু তুমিই করো৷
অ্যানকরেজ হাসপাতালে সপ্তাহ দুয়েক চিকিৎসার পর নক্স চেন যখন ছাড়া পেল, তখন সে পুরোপুরি সুস্থ! আশ্চর্যের কথা হল, অতখানি দীর্ঘ সময় হিমশীতল মাটির তলায় থাকলেও চেনের তেমন গুরুতর কিছু হয়নি৷
আরও আশ্চর্য ব্যাপার হল, চেন একবারের জন্যেও দেখতে পায়নি তার প্রাণরক্ষাকারী জিম সিলসকে৷ কপ্টারের ভিতরে ঢুকতে-ঢুকতেই সে জ্ঞান হারিয়েছিল৷
সুস্থ হয়ে চেন প্রথমেই ছুটে যায় সেই এয়ারফোর্স বেসে৷ বন্ধু হানচেলকে নিয়ে৷ গিয়ে শোনে, জিম সিলসকে ওই ঘাঁটি থেকে বদলি করে ফ্লোরিডায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে৷
তাতে হয়েছেটা কী? চোখের দেখার সম্পর্কই কি সব? জিম সিলসকে না দেখলেও চেন তো তাঁকে চেনে বুকের প্রতিটি স্পন্দনের মধ্যে৷
চেনের লেখা জবানবন্দিতে তারই প্রকাশ ঘটল!
‘হ্যাঁ, আমি গিয়ে ক্যাপ্টেনের দেখা পাইনি৷ এ ঘটনার আগে বা পরে কোনদিন তাকে দেখিওনি৷ তবু, বিশ্বাস করুন, আমি তাঁকে চিনি অন্তরের একেবারে অন্তঃস্থল থেকে৷ আমার নতুন জীবন যে তাঁরই দেওয়া৷
‘তাই কোনও রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও তিনি আমার আত্মার আত্মীয়, থাকবেনও চিরদিন৷ ওই মানুষটার জন্যেই এ দুনিয়া আমার কাছে আজ আরও সুন্দর৷ মানুষের সংজ্ঞাই আমার কাছে আমূল বদলে গেছে৷ জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি পরম সত্যকে—সবার উপরে মানুষ!
‘মানুষই মানুষের কাছে ঈশ্বর, মানুষই পারে সবকিছুকে জয় করতে৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন