ভয়াল আগন্তুক

ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়

ঝকঝকে নীল আকাশ৷ অর্ধেক জুড়ে বরফে ঢাকা পর্বতের ঢেউ৷ প্রখর রৌদ্রে জ্বলছে হীরকখণ্ডের মতো৷ তার কোল ঘেঁষে আদিগন্ত সবুজ বনানী৷

ম্যাথিয়াসের পা দুটো যন্ত্রের মতো প্যাড্ল করে যাচ্ছিল ক্যানোর ভেতরে, সে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিল ধ্যানগম্ভীর মৌন ভূধরের দিকে৷

ম্যাথিয়াস, এই ম্যাথিয়াস! আমরা এসে গেছি৷ ওই-ওই যে!—ক্লদিয়ার চিৎকারে ওর ঘোর কেটে গেল৷

ম্যাথিয়াস দেখল, ওদের ‘ক্যানো’ হ্রদের তীরের কাছে চলে এসেছে৷ আর ক্লদিয়া লাফ মেরে ক্যানো থেকে পাড়ে গিয়ে উঠল৷

ম্যাথিয়াস নৌকাকে পাড়ের আরও কাছে নিয়ে গেল৷ তারপর লাফিয়ে নেমে ক্যানোকে পাড়ে টেনে তুলল৷

ক্লদিয়া ছোট্ট কাঠের কেবিনঘরে পৌঁছে গেছে৷ হাত নেড়ে সে ডাকছে ম্যাথিয়াসকে৷

ম্যাথিয়াস পা চালাল৷

১৯৯৪ সালের ৯ই জুন৷ এই দুই জার্মান তরুণ তরুণী পেশায় ডাক্তার৷ নেশা পাহাড়-জঙ্গলে বেড়ানো৷ হাসপাতালে কাজ করতে মাসকয়েক আগে ২২ বছরের ক্লদিয়ার সঙ্গে ২৬ বছরের ম্যাথিয়াসের আলাপ৷ আলাপ থেকে গভীর বন্ধুত্ব৷ ওরা শুনেছিল, কানাডার উত্তর পশ্চিমের প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যের কথা৷

অতঃপর সিয়াটেল-এর হারবারভিউ হাসপাতালে চাকরি নিল ম্যাথিয়াস৷ ডেকে পাঠাল ক্লদিয়াকে৷ এবার একটু ফাঁক পেতেই দুজনে বেরিয়ে পড়েছে নিসর্গের রূপসুধা উপভোগ করতে৷ ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ক্যারিবু পবর্তমালা আর গহন অরণ্যে দশদিনের সফর৷

ওদের সঙ্গী এই প্যাড্ল করা ক্যানো, পিঠে হ্যাভারস্যাকে খাবারদাবার ও টুকিটাকি পোশাক পরিচ্ছদ৷ আজ সকালেই ওরা যাত্রা শুরু করেছে৷ মূল শহর থেকে ওই ক্যানোয় চেপে বিস্তীর্ণ হ্রদ বেয়ে চলে এসেছে বহুদূরের অরণ্যরাজ্যে৷

তবে ক্লদিয়া-ম্যাথিয়াসই শুধু নয়, প্রতিবছর শয়ে শয়ে এরকম ভ্রমণপিপাসু ছেলেমেয়েরা পাড়ি দেয় এই হ্রদ বেয়ে৷ তাদের রাত্রিবাসের জন্যে বেশ কয়েকমাইল অন্তর অন্তর ছোট ছোট কাঠের কেবিনও বানানো আছে৷ ওই জায়গাগুলিকে বলে ‘ক্যাম্পসাইট’৷ প্রয়োজনে তাঁবুও পাতা যেতে পারে৷

ছোট্ট এককামরার কাঠের ঘর৷ ভাঙাচোরা৷ দরজায় শিকল তোলা৷ ম্যাথিয়াস পৌঁছে যেতেই ক্লদিয়া শিকল নামিয়ে দরজাটা খুলে দিল৷ ভিতরে ঢুকে পড়ল৷

পশ্চিমের জানলা খুলে দিল ক্লদিয়া৷ একঝলক রোদ্দুর ঝাঁপিয়ে পড়ল ঘরে৷ পরমুহূর্তেই চেঁচিয়ে উঠল,—ম্যাথিয়াস৷ দেখো, দেখো!

কাঠের মেঝেতে, দেওয়ালে তিন চারটে সতর্কবাণী লেখা৷ আগের কোনও অভিযাত্রীরা লিখে গেছে৷

‘কালো ভালুক! সাবধান৷’

‘আমাদের খাবারদাবার ভর্তি হ্যাভারস্যাক লোপাট করেছে৷’

‘রাতে খুব উৎপাত করেছে! সাবধান!’

ক্লদিয়া ম্যাথিয়াসের মুখের দিকে তাকাল,—কী করবে?

ম্যাথিয়াস বলল,—না না, জেনেশুনে ব্ল্যাক বিয়ারের খপ্পরে পড়ার কোনও মানে হয় না৷ তবে এটা বাজে রসিকতাও হতে পারে৷ কারণ, যারা এখানে আসার পারমিট এবং ক্যানো ভাড়া দিল, সেই সরকারি কর্তারা তো স্পষ্ট বলল, লেকের ত্রিসীমানায় কোনও ভালুকের খবর তাদের কাছে নেই৷

ছাড়ো তোমার সরকারি আমলাদের কথা!—ক্লদিয়া বলল: ওরা কোনও খবর রাখে নাকি? ট্যাক্স আর ক্যানোর ভাড়া পেলেই ওদের কাজ শেষ৷

ম্যাথিয়াস আর তর্ক বাড়াল না৷ লেকের দিকে হাঁটা দিল৷ কয়েকমিনিটের মধ্যেই ওদের ক্যানো ফের তরতর করে এগিয়ে চলল আরও সামনের দিকে৷

কনকনে হিমশীতল জল৷ শরীরের অনাবৃত অংশে ছিটকে এলেই হাড়ে কাঁপুনি দিচ্ছে৷ ম্যাথিয়াসের অবশ্য তাতে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই৷ ক্ষুধার্তের মতো ও তাকিয়ে আছে অবারিত শোভার দিকে৷ নিঃশব্দে সময় বয়ে যাচ্ছে৷

ক্লদিয়ার প্যাডলিং বন্ধ হয়ে গেল৷ ও টোকা মারল ম্যাথিয়াসকে,—ওই যে, পরেরটা—একুশ নম্বর কেবিন!

এই কেবিনের দরজাটা খোলা৷ ভিতরে দুজন তরুণী স্লিপিং ব্যাগে শুয়ে আছে৷ পায়ের শব্দে ওরা উঠে বসল৷

ক্লদিয়া বলল,—স্যরি৷ বিরক্ত করলাম৷ তোমরা কি আজ এখানেই থাকছ?

হ্যাঁ৷—একজন বলল: কাল ভোরে উঠেই চলে যাব৷ তোমরাও চলে এসো, অনেক জায়গা আছে৷

—আমাদের সঙ্গে ফোল্ডিং তাঁবু আছে৷ অসুবিধে হবে না৷ খাটিয়ে নেব৷ কবে এসেছ তোমরা?

—আজকেই৷...ফিরছি৷ তোমরা কি আরও এগোবে?

—ইচ্ছে আছে৷

—হ্যাঁ, হ্যাঁ৷ আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাও৷ নদীর মোহানা পাবে৷ ওঃ, জায়গাটা যে কী সুন্দর, না দেখলে ভাবতে পারবে না৷ তবে যা করার, তাড়াতাড়ি কর৷ এখনই ঝুপ্ করে অন্ধকার নেমে আসবে৷

ক্লদিয়া-ম্যাথিয়াস দুজনেই ঘাড় ঘোরাল৷ তাকাল৷ তাই তো! সূর্য পর্বতের মাথার ওপর চলে এসেছে৷

ক্লদিয়া চটপট তাঁবু খাটাতে শুরু করল৷ ম্যাথিয়াস ছুটল লেকের দিকে৷ ক্যানোটাকে ডাঙায় এনে রাখতে হবে৷

মিনিট পনেরোর মধ্যে এদিকের কাজ শেষ৷ সূর্যও চলে গেছে পবর্তশ্রেণীর ওপারে৷ বিকেলের নরম আলো মুছে যাচ্ছে মুহূর্তে মুহূর্তে, ঝাপসা হয়ে আসছে চরাচর৷

পোর্টেবল স্টোভে পাউরুটি সেঁকা শেষ৷ এখন তাতে ন্যুডল্স্ চাপিয়ে দিয়েছে ক্লদিয়া৷

খাওয়াদাওয়া শেষ করে, তাঁবু ভালো করে আটকে ওরা দুজন যখন স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে পড়ল, ম্যাথিয়াস ঘড়ি দেখল—মাত্র সাড়ে পাঁচটা৷ বিকেল গড়াতে না গড়াতেই চতুর্দিক ঘোর অন্ধকারে ডুবে গেছে৷

ম্যাথিয়াস ঘুম ভেঙে তাকাল৷ স্লিপিং ব্যাগ থেকে বাঁ-হাতটা টেনে বের করল সে! রেডিয়ামের কাঁটাদুটোয় ছ’টা বাজে৷

এবার আস্তে আস্তে চোখ সয়ে যেতে ম্যাথিয়াস দেখতে পেল, বাইরের অন্ধকার তরল হয়ে আসছে৷

কাল সারারাত অঘোরে ঘুমিয়েছে ওরা৷ সারাদিন ক্যানো চালানোর ধকল তো কম নয়৷ পাশে ক্লদিয়া এখনও নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছে৷

আস্তে ওকে টোকা মারল ম্যাথিয়াস,—ক্লদিয়া, উঠে পড়ো৷ ভোর হয়ে গেছে৷

বলতে বলতে নিজেকে স্লিপিং ব্যাগ থেকে বের করে আনল৷ ক্লদিয়াও উঠে বসল স্লিপিং ব্যাগের ভেতর থেকে৷

আঃ,কী ঘুম ঘুমিয়েছি!—আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে ক্লদিয়া বলল: শহরে, নরম বিছানাতেও এত ভালো ঘুম—ও...ও...কী? ম্যা—থি—!

আচমকা কেঁপে কেঁপে কথা বন্ধ হয়ে গেল ওর! তাঁবুর বাইরের দিকে তাকিয়ে চোখদুটো ওর বিস্ফারিত৷

সেদিকে তাকাতেই ম্যাথিয়াসের রক্ত জমে গেল৷

একজোড়া কুতকুতে চোখ! চোখের মালিক ধারাল নখ দিয়ে নিঃশব্দে ছিঁড়ে ফেলছে তাঁবুর ঊর্ধ্বাংশ!

ব্ল্যাক বিয়ার! কালো ভালুক!

মুহূর্তের মধ্যে বিমূঢ় অবস্থা কাটিয়ে উঠল ম্যাথিয়াস, ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,—ক্লদিয়া! স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে পড়ো৷

কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেছে৷

ক্লদিয়া স্লিপিং ব্যাগের মধ্যেই ছিল, সে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল৷ ম্যাথিয়াস আর ঢোকার সময় পেল না৷

মুহূর্তের মধ্যে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল তাঁবু৷ দাপাতে দাপাতে ভয়াল আগন্তুক এসে দাঁড়াল অসহায় ম্যাথিয়াসের সামনে৷

ক্লদিয়া চাপা পড়ল ভাঙা তাঁবুর নীচে৷

ম্যাথিয়াস শুনেছে, ভালুক মৃত প্রাণীকে আক্রমণ করে না৷ স্লিপিং ব্যাগের বাইরেই সে উপুড় হয়ে রইল মড়ার মতো৷

পরক্ষণেই অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরে উঠল ম্যাথিয়াস,—উঃ!

হিংস্র শ্বাপদের ধারালো নখ ঢুকে গেছে ওর নিতম্বে৷

ব্ল্যাক বিয়ার তার অতিথি আপ্যায়ন শুরু করেছে৷

অথচ কিছু করার নেই৷ ম্যাথিয়াস জানে, ভয়ানক শক্তিধর এই শ্বাপদের সঙ্গে লড়াই করা মানেই মৃত্যু৷ তার চেয়ে—

আহ্! এবার দাঁত দিয়ে ওর পিঠ খুবলাচ্ছে জানোয়ারটা৷ ওঃ—মৃত্যুর দাঁত কী যন্ত্রণাদায়ক! ম্যাথিয়াসের চোখের সামনে ভেসে উঠল সুদূর জার্মানিতে ওর মায়ের মুখ৷ ও একমাত্র সন্তান৷ মা কি ওর মৃত্যুর খবর সহ্য করতে পারবে?

প্রাণপণে চেষ্টা করছে ম্যাথিয়াস, ওর শরীর থেকে মনকে বিচ্ছিন্ন করার৷ যন্ত্রণার অনুভূতি যাতে না বোধ হয়৷

কিন্তু কতক্ষণ? দাঁত আর নখ ওর পিঠের মাংস ফালা ফালা করে যাচ্ছে! শিরা উপশিরা জুড়বে কি আর কোনও দিন?

চিকিৎসক হিসেবে ম্যাথিয়াস ভাবতে শুরু করেছে: জটিল শিরা উপশিরা যদি কেটে যায়, তাহলে তো রক্তক্ষরণ বন্ধই হবে না৷ বাঁচা অসম্ভব৷ এখনই কিছু একটা করতেই হবে৷ কিন্তু কী?

পিঠ ছেড়ে এবার পায়ের দিকে নজর দিয়েছে যমদূত৷ প্যান্ট ভেদ করে সে খাবলে নিচ্ছে নরম মাংস৷

ওই অবস্থাতেই অস্ফুটে বলে উঠল ম্যাথিয়াস,—ক্লদিয়া! ক্লদিয়া! আমাকে মেরে ফেলছে!

ক্লদিয়া অতি কষ্টে নিজেকে বের করে এনেছে তাঁবুর ভগ্নস্তূপ থেকে৷ ম্যাথিয়াসের কথাগুলো যেন সপাটে চাবুক মেরে জাগাল ওকে৷ স্লিপিং ব্যাগ থেকে বেরিয়ে সে ছুটল অদূরের ২১ নম্বর কেবিনের দিকে৷

আকাশ বেশ ফরসা হয়ে এসেছে৷ অপরূপ প্রকৃতির বুকে পাখিদের কিচিরমিচির প্রাণের সাড়া জাগিয়ে তুলেছে৷ অথচ এই সুন্দর মুহূর্তেই চলেছে অসহায় দ্বিপদের ওপর হিংস্র শ্বাপদের অবিরাম আক্রমণ৷

য্-যা! কেবিন ফাঁকা, ওরা চলে গেছে৷ ক্লদিয়ার দিশেহারা চোখ পাক খাচ্ছে ছোট্ট ঘরটার মধ্যে৷ একটা কিছু চাই! অন্তত একটা হাতিয়ার৷

ওই-ওই তো! কেবিনের এককোণে হাতখানেক লম্বা ছোট্ট একটা কাঠের খণ্ড৷ ডুবন্ত মানুষের খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো ক্লদিয়া শক্ত করে ধরল কাঠটাকে, ছুটল অকূস্থলে৷

কালো লোমশ জানোয়ারটা একনাগাড়ে নিষ্ঠুর খেলা চালিয়ে যাচ্ছে নির্জীব ম্যাথিায়াসের ওপর৷ রক্তে ভাসছে জমি৷

ক্লদিয়ার দুচোখ জ্বলছে৷ পা টিপে টিপে সে এগিয়ে যায় ভালুকের পিছন দিকে৷ শক্ত হাতে ধরে কাঠের টুকরাটা৷

একপা...একপা...এইবার! সর্বশক্তি দিয়ে ক্লদিয়া আঘাত করল ভালুকটার পিছন দিকে—সপাটে কাঠটা আছড়ে পড়ে ওর পশ্চাদদেশে৷

উঁ-উঁ-ম্! আচমকা পিটুনিতে ঘাবড়ে ককিয়ে ওঠে ভালুকটা৷ পিছনে না তাকিয়েই ছুট দেয় জঙ্গলের দিকে৷

কিন্তু ম্যাথিয়াসের এ কী অবস্থা? রক্তের বন্যায় তালগোল পাকানো মাংসপিণ্ডের মতো একটা শরীর। এবার কী করবে ক্লদিয়া?

হাঁটু গেেড় বসল ক্লদিয়া, ডাকল,—ম্যাথিয়াস! ম্যাথিয়াস! ওটা চলে গেছে৷ ওঠো, ওঠো!

চেতনার ওপার থেকে যেন ফিরে এল ম্যাথিয়াস৷ ও উঠে বসতে চায়, পারে না৷

ক্লদিয়া ওর বগলের তলা দিয়ে হাত গলিয়ে পুরো ওজনটা নিয়ে নিল নিজের ওপর৷ টেনে টেনে নিয়ে চলল কেবিনের দিকে৷ বাঁ হাতে ওর কাঠের টুকরোটা৷

অর্ধেকটা পথ চলে এসেছে ওরা, ঠিক সেইসময় পিছনে থপ্ থপ্ শব্দ! কী সর্বনাশ৷ শয়তানটা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এদিকেই আসছে৷

ক্লদিয়া বেপরোয়া৷ ও বুঝে গেছে, এইমুহূর্তে একটাই কাজ! ভালুকটাকে ভয় দেখানোর জন্যে বাঁহাতের কাঠটা ঘোরাতে লাগল বনবন করে৷ আর চিৎকার করতে লাগল প্রাণপণে,—বাঁচাও! কে আছ, বাঁচাও!

জনহীন প্রান্তরে, পাহাড়ে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে লাগল—বাঁ-চা-ও...বাঁ-চা-ও! কেউ এল না৷ তবে একটাই লাভ হল৷ ভালুকটা কিছু দূরে থমকে দাঁড়াল৷

এই ফাঁকে নির্জীব ম্যাথিয়াসকে টানতে টানতে কেবিনের ভিতর ঢুকিয়ে ফেলল ক্লদিয়া৷ দরজা বন্ধ করে দিল৷

ম্যাথিয়াসের চেতনা ফিরে এসেছে৷ অতিকষ্টে বলল,—লা-ভ-নেই৷ ওই দানবটার একধাক্কায় এই দরজা ভেঙে যাবে!

ক্লদিয়া ইশারায় ওকে থামাল৷ পকেট থেকে লাইটার বের করে ঘরের কোণে জড়ো করা কাঠকুটোকে মাঝামাঝি এনে আগুন জ্বালাল৷

তারপর বলল,—শোনো, তোমাকে বাঁচাতে হলে আমাকে লোকালয় থেকে সাহায্য নিয়ে আসতে হবে৷ তোমায় এই অবস্থায় ক্যানোতে করে নিয়ে যাওয়া যাবে না৷ ওই জানলার কাছে চলো৷ একহাতে এই কাঠের টুকরো আর অন্য হাতে এই জ্বলন্ত কাঠটা মাঝে মধ্যে দোলাবে৷ তাহলেই ওটা আর কাছে আসবে না৷

আমি কি পা-র-ব?—নিস্তেজ কণ্ঠে বলল ম্যাথিয়াস৷ সমানে ওর রক্তক্ষরণ হয়ে চলেছে৷

পারতেই হবে! আমি চললাম৷—বলতে বলতে দরজা খুলে লাফিয়ে বেরোল ক্লদিয়া৷ ওরে বাপস্৷ কৃষ্ণকায় যমদূতটা একেবারে সামনে এসে পড়েছে৷

মুহূর্তে বিজাতীয় চিৎকার ছেড়ে তেড়ে গেল ক্লদিয়া৷ ভালুকটাও অমনি দৌড় লাগাল জঙ্গলের দিকে৷

পরের মিনিট দুয়েকের মধ্যে ক্যানোয় চেপে বসল ক্লদিয়া৷ তীর বেগে ক্যানো ছুটে চলল ফিরতি পথে৷...

নিস্তব্ধ প্রকৃতিরাজ্য! কোথাও জনপ্রাণীর চিহ্ণ নেই৷ কোনও অভিযাত্রীদলকেও দেখা যাচ্ছে না৷

দাঁতে দাঁত এঁটে ক্লদিয়া প্যাড্ল করে চলেছে৷ ছিটকে ছিটকে উঠছে হিমশীতল জল৷ শ্রান্তি ঝাঁপিয়ে আসছে শরীর বেয়ে৷ কোনও উপায় নেই! ম্যাথিয়াস একা পড়ে আছে৷

ঝড়ের গতিতে আধঘণ্টা চলার পর দূ-রে বিন্দুর মতো একটা জলযান দেখা গেল৷ নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে৷ ক্লদিয়ার প্যাডেলিং এর গতি বেড়ে গেছে৷

কয়েক মিনিটের মধ্যে ক্লদিয়া পৌঁছে গেল কাছে৷ ইঞ্জিনচালিত বড়সড় নৌকো৷ ক্লদিয়া আবার চেঁচিয়ে উঠল,—কে আছ? বাঁচাও৷

সঙ্গে সঙ্গে দুজন লোক বেরিয়ে এল৷ এরা সরকারি জলপুলিশের লোক৷ ক্লদিয়া দু-এক কথায় তাদের পুরো ঘটনা বুঝিয়ে বলল৷

সঙ্গে সঙ্গে ক্লদিয়াকে তুলে নিয়ে নৌকাটি ছুটে চলল কেবিন ২১-এর দিকে৷

দুজনের মধ্যে বয়স্কজন বলল,—সাংঘাতিক! কিন্তু আমাদের কাছে ব্ল্যাক বিয়ারের কোনও ইনফর্মেশন ছিল না৷ জন, তুমি ‘হেলিকপ্টার পেট্রল্’ কেও মেসেজ দিয়ে দাও৷ ওরা আমাদের আগেই পৌঁছে যাবে৷

এরপরের ঘটনা আরো আধঘণ্টার৷ সিনেমার মতো ঘটে গেল৷ আগে পৌঁছল হেলিকপ্টারই৷ পাইলট যখন ২১ নম্বর কেবিনের পাশের প্রান্তরে আকাশযানটি নামাচ্ছে, তার চোখ পড়ল, কেবিনের জানলা দিয়ে শুধু একখানা হাত বেরিয়ে আছে৷ সে হাত ধরে আছে একটি জলন্ত কাঠ৷

আর হেলিকপ্টারের গর্জনে দ্রুত জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যাচ্ছে বিশালকায় একটি প্রাণী—ব্ল্যাক বিয়ার৷....

এই ঘটনার সমাপ্তি এখানেই টেনে দেওয়া যেত৷ তবে সে ক্ষেত্রে পাঠক পাঠিকাদের মোক্ষম প্রশ্নটির জবাব দেওয়া বাকি থাকে৷

নিষ্পন্দ ওই হাতটি নিঃসন্দেহে ম্যাথিয়াসের৷ সে কি আদৌ বেঁচে ছিল? মারাত্মকভাবে আহত হবার এতক্ষণ পরও কি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা কষা সম্ভব?

হ্যাঁ বন্ধু, সম্ভব৷ মানুষ চেষ্টা করলে, সব পারে৷ অদম্য ইচ্ছাশক্তিই তার অফুরন্ত প্রাণ শক্তির উৎস৷

তিনমাস গুরুতর চিকিৎসাধীন থাকার পর ম্যাথিয়াস যেদিন হাসপাতালের কেবিনে নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াল, সেই দিনই ক্লদিয়া ওর আরোগ্যর কামনায় নিয়ে এসেছিল একটি লাল গোলাপ৷ ম্যাথিয়াসের হাতে সেটা তুলে দিতে ম্যাথিয়াস বলল,—ক্লদিয়া! তোমার সঙ্গে আমি সারা জীবন থাকতে চাই৷ তুমি কি রাজি?

ক্লদিয়া সলজ্জভাবে ঘাড় নাড়ল৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%