ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়

বাসটা যেখানে নামিয়ে দিল সেখান থেকে বাড়ি বড়জোর মিনিট দুয়েকের হাঁটাপথ৷ প্যাট্টি পিঠে তুলে নিল কিটস্ ব্যাগটা, তারপর জোরে জোরে হাঁটতে শুরু করল৷
ওর মনের মধ্যে খুশির ঢেউ! কী আনন্দ! কী আনন্দ!
আজ পরিবেশও ভারি চমৎকার৷ আকাশে ঝকঝকে রোদ্দুর৷ দুদিকে হলুদ পাকা গমের খেত৷ হু-হু করে হাওয়া৷ সবুজ গাছগাছালিতে ছায়াচ্ছন্ন সরু পথ৷ আকাশে বাতাসে সূর্যমুখী মুক্তির স্বাদ৷
ওই-ওই তো, ওদের খামার বাড়ি৷ আদিগন্ত সূর্যমুখী হলুদের মধ্যে ফুটে আছে৷ বাড়ির সামনে লনে মা দাঁড়িয়ে৷
নিমেষে তেইশ বছরের প্যাট্টি শার্ন বালিকা হয়ে গেল৷ ছুটল ওর মায়ের দিকে৷
—মা, মেনি মেনি হ্যাপি রিটানর্স, মা, হ্যাপি বার্থ ডে!
বলতে বলতে সে সজোরে জাপটে ধরে মোটাসোটা মাকে আর অবিশ্রান্ত চুমু খেতে থাকে মায়ের গালে,—আজ তোমায় ছাড়ছি না৷ ছাড়ব না৷
মাও ততক্ষণে জড়িয়ে ধরেছেন মেয়েকে,—ওরে পাগলি! কখন এলি?
এইমাত্র৷—মায়ের বুকে মুখ গুঁজে প্যাট্টি বলল: পাপা কোথায়? দাদারা?
সবাই আছে৷—বারবারা হাসতে হাসতে বললেন: ওই দ্যাখ্, তোর বাবা তোকে ঠিক দেখতে পেয়েছে৷ গুটি গুটি এগিয়ে আসছে৷ হিংসুটে লোক তো, ভাবছে, মেয়ের আদর সবটাই বুঝি মা পেয়ে গেল৷
প্যাট্টি মুখ তুলল৷ তারপরেই চেঁচিয়ে উঠল,—হ্যাল্লো, পাপা, মাই ইয়ং ফ্রেন্ড!
হাই প্যাট্টি ডার্লিং৷—প্যাট শার্প হাসিমুখে দু-হাত বাড়িয়ে দিলেন: কাম অন্৷
১৯ অক্টোবর, ১৯৯১৷ আমেরিকার ওরিগন প্রদেশের এই ‘গ্রস ভ্যালি’ গ্রামে শার্পদের খামারবাড়িতে আজ শুধুই উৎসবের আনন্দ৷ শনিবার, সপ্তাহান্তিক ছুটির প্রথম দিন৷ উপরন্তু আজ আবার শ্রীমতী বারবারা শার্পেরও জন্মদিন৷ দুই ছেলের একজন থাকে নিউইয়র্কে, অন্যজন ওয়াশিংটনে৷ সবার ছোট মেয়ে প্যাট্টি কাজ করছে সাংবাদিকতার, সে আজ এখানে, কাল ওখানে৷ ফলে কারও সঙ্গেই কারও দেখা সাক্ষাৎ হবার বিশেষ সুযোগ হয়ে ওঠে না৷ প্রায় একমাস পর আজ আর কাল দু-দুটো দিন একসঙ্গে থাকবে, খাবে, বেড়াবে—তারিয়ে তারিয়ে সবাই মিলে উপভোগ করবে ছুটির মজা৷
দুপুরে বেশ গুছিয়ে খাওয়াদাওয়া হল৷ তারপর সবাই মিলে বসল টেলিভিশনের সামনে৷ প্যাট্টি একটা ডকুমেন্টারি ভিডিয়ো-ফিল্মে সহকারী পরিচালকের কাজ করেছে৷ সেই ফিল্মের ক্যাসেট ও নিয়ে এসেছে বাবা-মা দাদাদের দেখাবার জন্য৷
প্যাট্টি সবচেয়ে ছোট, বাবা-মা দাদাদের অতি আদরের৷ তার মধ্যে আবার বাবারই ও বেশি ন্যাওটা৷ বাবা প্যাট শার্পও মেয়ে বলতে অজ্ঞান৷ তাঁর কথা, প্যাট্টি নাকি সব পারে৷
ছবিটা দেখতে দেখতে তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন,—বাঃ, বাঃ! এই কম্পোজিশনটা তো দারুণ হয়েছে৷ কী রে, তোরা বল্?
দাদারাও সায় দিয়ে উঠল,—হ্যাঁ, হ্যাঁ৷ এটা ওর প্রথম কাজ মনেই হচ্ছে না৷
প্যাট্টি লজ্জারক্ত মুখে হাসল,—যাঃ৷ তোমরা বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছ৷
ছবিটা শেষ হল৷ দুই দাদা উঠে গেল৷ অনেকদিন পর এমন ছুটির দিন, একটু বিছানায় গড়িয়ে নেওয়ার ইচ্ছে৷
প্যাট শার্প বললেন,—প্যাট্টি, এবার কী করবি? খানিকক্ষণ আকাশে ঘুরলে মন্দ হয় না, কী বলিস?
দারুণ, দারুণ হবে৷—প্যাট্টি লাফিয়ে উঠল: চলো পাপা৷ আমি চট্ করে ক্যামেরাটা নিয়ে আসি৷ কতকগুলো টপ্ শট ট্রাই করব৷
প্যাট গেলেন নিজের লনের দিকে৷ প্যাট্টি ছুটল দোতলায় ওর প্রিয় ৩৫ মি.মি. ক্যামেরাটা আনতে৷ প্যাট্টির তেরো বছরের জন্মদিনে বাবার উপহার৷
একটু পরেই লনের পাশের হ্যাঙার থেকে ছোট্ট প্লেনটা বেরিয়ে এল৷ কিছুটা ছুটল মসৃণ রাস্তায়, তারপর সোঁ-ও-ও করে উঠে পড়ল আকাশে৷ টু-সিটার বেবি প্লেন৷ সামনে চালকের আসনে প্যাট শার্প, ঠিক পিছনের একমাত্র সিটে প্যাট্টি৷
অনেকদিন পর বাবার সঙ্গে আকাশভ্রমণে৷ প্যাট্টির আনন্দ বাধা মানছে না৷ সে কলকল করে উঠল,—দেখো, দেখো খেতের পাশ দিয়ে ছোট্ট নদীটা৷ ঠিক যেন হলুদ সমুদ্রের মাঝে রুপোর ফিতে৷
বলতে বলতে সে ‘ক্লিক্-ক্লিক্’ করে যাচ্ছে ক্যামেরা নিয়ে৷ প্যাটও তাল মিলিয়ে যাচ্ছেন,—এক কাজ কর প্যাট্টি৷ এবার তুই আমাদের গ্রাম নিয়ে একটা ছবি কর৷ টাকার জন্যে ভাবিস না! তুই পারবি৷
বড়সড় পাখির মতো ডানা মেলে ভেসে চলেছে প্লেন৷ বেশ নিচু দিয়ে৷ প্যাট একসময় নামকরা পাইলট ছিলেন৷ নিয়মিত দেশ বিদেশ ঘুরতেন বোয়িং নিয়ে৷ ছোট্ট প্লেনটা ঠিক তাঁর পোষা পাখির মতো মসৃণগতিতে এগিয়ে চলেছে৷
নীচে সরে যাচ্ছে ওদের গ্রাম...শহর...গ্রস্ ভ্যালি৷ প্যাট্টির ছেলেবেলার প্রিয় বন্ধু ক্যাথির বাড়ি এসে গেল৷ প্যাট হেসে বললেন,—কীরে, বন্ধুর সঙ্গে দেখা করবি?
চোখে ক্যামেরা, প্যাট্টি মাথা নাড়ল,—না, এখন না৷ ফেরার সময় না-হয়...পাপা, পাপা, দ্যাখো৷ ফ্যান্টাস্টিক!
প্লেন এখন উড়ে চলেছে বিশাল খাঁড়ি উপত্যকা পেরিয়ে আরও দক্ষিণে৷ প্যাট ঝুঁকে পড়লেন,—বাঃ! সত্যিই অপূর্ব৷
ঢেউখেলানো পাহাড়ি উপত্যকার মাঝে সবুজ প্রান্তরে চরছে হাজারে হাজারে ভেড়া৷ সাদা লোমশ, উপর থেকে মনে হচ্ছে সবুজের মাঝে থোকা থোকা সাদা ফুল নেচে বেড়াচ্ছে৷
সমানে ‘ক্লিক্’ করে যাচ্ছে প্যাট্টির ক্যামেরা৷ ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে ও মগ্ন, কোনদিকে হুঁশ নেই৷
হঠাৎ প্যাট্টির খেয়াল হল, বেশ খানিকক্ষণ সব নিস্তব্ধ৷ সেও কথা বলছে না, পাপাও উত্তর দিচ্ছে না৷
ক্যামেরা চোখ থেকে নামিয়ে প্যাট্টি পিছন থেকে আলতো ঠেলা দিল প্যাটকে—ও পাপা, কী গো! কিছু বলছ না কেন? অ্যাই—
প্যাটের মাথাটা ডানদিকে হেলে পড়ল৷
চকিতে বিশ্বভুবন দুলে উঠল প্যাট্টির চোখের সামনে৷ ক্যামেরা পড়ে গেল অবশ হাত থেকে৷ ও ঝুঁকে পড়ে সামনের দিকে, চিৎকার করে উঠল,—পাপা, এই পাপা!
পাপা নিরুত্তর৷ দু-চোখ বোঁজা, মাথাটা কাঁধের ওপর এলিয়ে পড়েছে৷ হাতদুটো স্টিয়ারিং-এ৷ অসাড় শরীর৷
প্লেন ভেসে চলেছে সামনের দিকে৷
প্যাট্টির মাথায় বেজে উঠল পাগলাঘণ্টি, মৃত্যু! সামনে নির্ঘাত মৃত্যু৷ বাবার নিশ্চয়ই হার্ট অ্যাটাক্ হয়েছে৷ ও নিজেও প্লেন চালাতে জানে না৷ তার নিজেরও বাঁচার কোনও আশা নেই৷
প্লেনে রেডিও নেই, ঝাঁপ দেবার প্যারাসুটও নেই! আপনা আপনি উড়তে উড়তে একসময় প্লেনের তেল ফুরিয়ে যাবে৷ ‘ঝুপ’ করে খসে পড়বে আকাশ থেকে৷
কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল৷ প্যাট্টি নিশ্চল স্ট্যাচু৷ নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি৷ কী করবে, হাল ছেড়ে দেবে ভাগ্যের হাতে?
কিন্তু কীই বা করতে পারে ও? কোনদিন ও প্লেন চালায়নি৷ প্যাট্টির হঠাৎ মনে পড়ল, যে কবার উড়েছে বাবার সঙ্গে, প্যাট বলে যেতেন,—শিখে রাখ৷ এই দ্যাখ এটা হল স্টিক, প্লেনকে উঁচুতে তোলে বা নামায়৷ আর এটা থ্রট্ল, ইঞ্জিনের গতি কমায় বাড়ায়, বন্ধ করে৷ এই দুটোই হচ্ছে প্লেন চালানোর আসল জিনিস৷ পাকা পাইলটরা এদুটো দিয়েই প্লেন কন্ট্রোল করে৷
এই তো, এই তো মনে পড়ছে! এইটুকু শিক্ষা নিয়েই ওকে আজ মোকাবিলা করতে হবে৷ না—ও হাল ছাড়বে না৷
লাল টুকটুকে সূর্য ওর বাঁদিকে সমান্তরাল উচ্চতায়, আস্তে আস্তে নেমে যাচ্ছে নীচে৷ প্যাট্টি সূর্যের দিকে তাকাল৷ যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে৷
ওর ভিতর থেকে কেউ যেন ফিসফিস করে বলে উঠল,—চেষ্টা করো প্যাট্টি৷ তুমি সব পারো৷
বাবা—নিশ্চয়ই বাবা! বাবা তাকে এখনও সাহস যোগাচ্ছেন৷
বাবার শরীরের দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই বলে উঠল প্যাট্টি—পাপা, দেখো, আমি নিশ্চয়ই পারব৷
কন্ট্রোল বোর্ডের একদিকে, হ্যাঁ, এটাই স্টিক৷ আর সবুজ যন্ত্রটা হ্যাঁ, থ্রট্ল৷ বাবার দুটো পা যেখানে, ওগুলো বোধহয় ব্রেক, ক্লাচ এইসব৷ বোর্ডে তো আরো একগাদা সুইচ আছে৷ ওগুলো কীসের? স্মৃতি হাতড়াতে থাকে প্যাট্টি, না, কিছুই মনে পড়ছে না৷ আসলে কোনওদিন তো জিগ্যেসই করেনি পাপাকে৷
এখন প্রথম কাজ, প্লেনটাকে ১৮০০ ডিগ্রি ঘোরাতে হবে৷ সম্পূর্ণ উল্টোদিকে ফিরতে হবে৷ এখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে ‘শানিকো’তে ছোট্ট এয়ারস্ট্রিপ আছে৷ একমাত্র ওখানেই নামবার মতো জায়গা পাওয়া যাবে৷
স্টিক দিয়ে কীভাবে ঘোরাবে? থ্রট্ল্ দিয়ে গতি কমাবে প্লেনের? প্যাট-এর উপর দিয়ে ঝুঁকে পড়ে ড্যাশবোর্ডের দিকে তাকাল প্যাট্টি, আশিতে কাঁটা কাঁপছে৷ সামান্য একটু কমানো যেতে পারে৷ কিন্তু পঁয়ষট্টি থেকে কমে গেলে পড়তে থাকবে প্লেন৷ তখন একবার পাক খেতে শুরু করলে আর রক্ষে নেই৷
সত্তরে কাঁটা রেখে স্টিকটা ডানদিকে ঘোরাল প্যাট্টি৷ অমনি—একি, প্লেন যে থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে৷ ওর মনে পড়ল, বাবা বলতেন, পাকা চালকরা যেকোনও যানের চাল বুঝে কাজ করে৷ মসৃণভাবে চালানোটাই আসল কথা৷ প্যাট্টি আবার পূর্বস্থানে নিয়ে গেল স্টিককে৷
প্লেন আবার স্থিরগতিতে ফিরে এল৷
হ্যাঁ-হ্যাঁ, প্যাট্টি বুঝেছে, দমকা হাওয়ার জন্যেই প্লেনটা ধাক্কা খেয়ে কাঁপছিল৷ হাওয়াটা যেই এবার কমে এল, ও খুব ধীরে ধীরে ঘোরাতে থাকে স্টিক৷ একটু ঘোরায়, থামে, আবার ঘোরায়৷
এই তো, প্লেনটা এবার আস্তে আস্তে ঘুরছে৷ বাঁদিকের সূর্য এসে গেছে ওর ডানদিকে৷ তার মানে ওর সামনে এখন দক্ষিণ দিক—শানিকো৷ স্টিকটা ঠিক সময়মতো ফিরিয়ে আনল প্যাট্টি৷ থ্রটল্ ঘুরিয়ে গতি বাড়িয়ে নিল৷
প্লেন উড়ে চলেছে৷ নিষ্পন্দ বাবার ঘাড়ের পাশ দিয়ে ঝুঁকে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা কষছে তেইশ বছরের তরুণী৷
প্যাট্টির মাথায় উড়ে উড়ে আসছে বাবার পুরোনো টুকরো টুকরো কথা—সবসময় ধীরস্থির থাকবি৷ তুই ঠিক থাকলে তোর বাহনও ঠিক থাকবে৷...স্টিক সামনে পেছনে করলে প্লেনের ডানা উপরনিচ হয়৷ প্লেনকে উপরে নীচে তোলা যায়৷ তবে সবটাই করতে হবে বাতাসের অবস্থা বুঝে৷...
প্যাট্টি পরখ করে দেখতে স্টিক ধরে টান ছিল৷ নিমেষে গোঁত্তা খেয়ে উঠল প্লেন৷ য্-যা! আবার ভুল হল, বাতাসের গতি দেখা হয়নি৷
বহুদূরে ছোট্ট ছোট্ট ঘরবাড়ির ফাঁকে, ওই যে দেখা যায় শানিকো এয়ারস্ট্রিপ৷ যাক্, ঠিক পথেই আসছে তাহলে৷
এবার আসল পরীক্ষা, শেষ পরীক্ষা৷ সামান্যতম ভুল হলে দাউদাউ জ্বলে যাবে প্লেন, সব লড়াই খতম৷ প্লেন ল্যান্ডিং—বড়সড় পাইলটদের ক্ষণিকের ভুলে কী ভীষণ সব দুর্ঘটনা ঘটে যায়৷ আর পাট্টি তো জীবনে এই প্রথম প্লেনের সুইচে হাত দিল৷
তাহলে কী তীরে এসে তরী ডুববে?
প্যাট্টির ভিতর থেকে আবার কে যেন বলে উঠল,—ভয় নেই প্যাট্টি৷ স্টেডি থাকো৷
মুহূর্তে প্যাট্টির শক্তি ফিরে এল৷ ওকে পারতেই হবে৷ সবচেয়ে বড় কথা, আজ যদি প্লেনে দুর্ঘটনা ঘটে যায়, কেউ তো আসল ঘটনা জানতেও পারবে না৷ সবাই বলবে, একষট্টি বছরের বুড়ো বাপ তাজা মেয়েটাকে মেরে ফেলল৷
নীচে...নীচে এসে যাচ্ছে শানিকো এয়ার স্ট্রিপ৷ প্যাট্টি মনে মনে বিড়বিড় করে চলেছে,—পাপা, পাপা! তোমার আদরের মেয়ে প্যাট্টি বড় বিপদে...তুমি সাহায্য করো৷
থ্রটল্ ঘুরিয়ে গতি কমিয়ে দিল প্লেনের৷ এখন ঠিক পঁয়ষট্টি কিলোমিটার কাঁটা৷ এবার স্টিক ধরে খুব ধীরে ধীরে সামনের দিকে ঠেলতে থাকে প্যাট্টি...নামছে নামছে৷
আচমকা আবার দমকা হাওয়া! সর্বনাশ! প্লেন থরথর করতে শুরু করেছে৷
চট্ করে স্পিড বাড়িয়ে স্টিক টেনে নিল আলতো করে৷ প্লেন ফিরে এল আগের উচ্চতায়৷ কিন্তু ইতিমধ্যে এয়ার স্ট্রিপ পেরিয়ে গেছে প্লেন৷
আবার স্টিক ডানদিক বাঁদিক করে, হাওয়া বুঝে প্লেনকে ঘুরিয়ে আনল প্যাট্টি আগের জায়গায়৷
দ্বিতীয়বার... নাহ্...! এবারেও ঠিক হল না৷ স্টিক আর থ্রটল্-এর ঠিক মিল হল না৷
দরদর করে ঘামছে প্যাট্টি৷ এই শীতার্ত বাতাসেও৷ জীবনমৃত্যুর পরীক্ষা চলছে, পাশ করতে পারবে কিনা জানে না৷
শানিকো এয়ারস্ট্রিপের পাশে এক হোটেলের হলঘরে বিল ব্রাগার স্কাউট ছেলেদের ক্লাস নিচ্ছিলেন৷ সকাল থেকে পি.টি. ট্রেনিং প্যারেড হয়েছে৷ এখন তিনি প্রাথমিক চিকিৎসা সম্বন্ধে বোঝাচ্ছেন৷
হঠাৎ তাদের কানে ভেসে এল এঞ্জিনের কর্কশ গর্জন৷ বিল জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখলেন, একটা টু-সিটার বেবি প্লেন গোঁত্তা খেয়ে নামল৷ পরক্ষণেই শোঁ করে উঠে গেল৷
এই সন্ধের সময় এখানে তো কেউ প্লেন নামায় না৷ বিল বেশ অবাক হলেন৷ তারপর ভাবলেন, কোনও আকাট পাইলট হয়ত কায়দা দেখাচ্ছে৷ কিংবা ঠিকমতো নামাতে পারছে না প্লেন৷
কৌতূহলী ছেলেরাও সব চলে গেছে বাইরে৷ বিল তাদের ডাকলেন,—বয়েস, লিভ দ্যাট্৷ বি সিটেড৷ লেট আস ডিসকাস দি প্রবলেম অব ফার্স্ট এইড্৷
পঞ্চমবার৷ এই নিয়ে চার-চারটে চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে৷ ক্রমেই হতাশ হয়ে উঠছে প্যাট্টি, ও বোধহয় পারল না! হেরে যাবে৷
ওর ডানহাত স্টিকে, বাঁ-হাত থ্রটলে৷ থ্রটল্ ঘুরিয়ে গতি আবার কমিয়ে দিল৷ এবার...হ্যাঁ৷ হাওয়া কমে গেছে, সামনের দিকে ধীরে ধীরে ঠেলছে স্টিককে... ডানাদুটো ভাঁজ হচ্ছে, প্লেন নেমে যাচ্ছে...নেমে যাচ্ছে...
পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে স্ট্রিপের ছোট ছোট ঘাস, পরমুহূর্তে কর্কশ শব্দ আর ঝাঁকুনি৷
প্লেন স্পর্শ করেছে জমি! নাহ্, আগুন ধরেনি৷ একটানে থ্রটল্ ঘুরিয়ে প্যাট্টি বন্ধ করে দিল ইঞ্জিন৷
ওর বাঁ-হাত জাপটে ধরেছে অচেতন প্যাট শার্পকে৷ খানিকটা গড়িয়ে গড়িয়ে থেমে গেল প্লেন৷...
ব্রিল ব্রাগার শুনতে পেলেন ইঞ্জিনের বিকট আওয়াজ৷ জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে যখন দেখলেন সেই ছোট্ট প্লেনটা, বেশ রাগত হয়ে বেরিয়ে এলেন বাইরে৷ পাইলটটাকে একটু কড়কে দেওয়া দরকার৷ কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই৷ এইসব অপদার্থগুলো লাইসেন্স পায় কী করে!
লম্বা লম্বা পা ফেলে বিল এগোচ্ছিলেন প্লেনের দিকে৷ হঠাৎ তিনি দেখলেন, প্লেন থেকে নেমে লম্বা লম্বা পায়ে তাঁর দিকে ছুটে আসছে, হ্যাঁ, এক তরুণী মেয়ে৷
কিছু বোঝার আগেই মেয়েটি ঝড়ের মতো এসে পড়ল তাঁর সামনে৷ মেয়েটির দু-চোখে আতঙ্ক! বিধবস্ত, ঝড়ে পড়া কাকের মতো অবস্থা৷ মেয়েটি তার দু-হাত ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল,—বাঁচান! প্লিজ, আমার বাবাকে বাঁচান৷ উনি ওই প্লেনের মধ্যে, হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হয়েছে৷ ফোন—ফোনটা কোথায় বলতে পারেন?
ইশারায় টেলিফোন বুথ দেখিয়ে দলবল নিয়ে বিল ছুটে গেলেন প্লেনের দিকে৷
প্যাট শার্প-এর অচেতন শরীরটা সবাই মিলে ধরাধরি করে এনে শোয়ানো হল পাশের ঘাসজমির ওপর৷ বিল ব্রাগার নাড়ি ধরে রইলেন কিছুক্ষণ, কান পাতলেন বুকে৷
নাহ্, শব্দটা নেই৷ হৃদয়ঘড়ি স্তব্ধ হয়ে গেছে চিরদিনের মতো৷ প্যাট শার্প অনেক আগেই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন৷
প্যাট শার্পের অন্ত্যেষ্টি অনুষ্ঠানে প্যাট্টিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন বারবারা৷ খালি বলছিলেন,—আমি অলুক্ষুণে, অপয়া৷ নইলে আমার জন্মদিনে আমাকে ছেড়ে গেল লোকটা?
কাঁদতে কাঁদতেই মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল মেয়ে,—একদম বাজে কথা বলবে না৷ তাই যদি হতো, তাহলে কি আমি ফিরে আসতে পারতাম মাটিতে? পাপা না থেকেও আকাশে আমার পাশে সারাক্ষণ ছিল৷ ওঁর কথাগুলো কেবলই বেজেছে আমার বুকের মধ্যে৷ আর উনি তো আমাদের সবসময় বলতেন, মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না৷ তবে মৃত্যু যেন যন্ত্রণার না হয়৷ দেখো মা, উনি একটুও কষ্ট পাননি৷
পাশে দাঁড়িয়েছিলেন প্যাট্টির কাকা এড্ শার্প৷ উনিও এয়ারফোর্সের প্রাক্তন প্রশিক্ষক৷ এড্ বললেন,—আমি জীবনে এত অবাক হইনি৷ প্রশিক্ষণ পাওয়া পাইলটরাও প্লেন নামাতে হিমসিম খায়, আর প্যাট্টি শুধু শুনে-শুনেই প্লেন নামিয়ে দিল৷ তোর বাবা ঠিক কথাই বলত রে, আমার প্যাট্টি সব পারে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন