ডেস্টিনেশন কিনল্যান্ড

ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়

এইমাত্র সূর্য ডুবে গেল৷

ঠিক এই মুহূর্তটারই প্রতীক্ষায় ছিল অরেস্টেস লরেঞ্জো৷ সঙ্গে সঙ্গে সে তার প্লেনের ইঞ্জিন স্টার্ট করল৷ কন্ট্রোলরুমে পাঠিয়ে দিল বার্তা—সেসনা ১৯৫৮ এক্স রানওয়ে ছাড়ছে৷

অবশ্য এ কাজটা না করলেও চলত৷ কারণ আজকের এই দুঃসাহসিক অভিযানের কথা বিমানবাহিনীর সর্বোচ্চ কর্তাও জানেন৷ শুধু জানেন বললে কম বলা হয়, তার গোপন মদত ছাড়া কিছুই করে উঠতে পারত না লরেঞ্জো৷ তবু নিয়মে কোনও ফাঁক রাখতে চায় না সে৷

রানওয়েতে বারদুয়েক চক্কর মেরে আকাশে উঠে পড়ল সেসনা৷ ছয় আসনের যুদ্ধ বিমান৷ লরেঞ্জো দক্ষ হাতে সেসনাকে তুলে নিল তিনশো মিটার উঁচুতে৷ দুরন্ত গতিতে বাতাস কেটে ছুটে চলল সুনীল সাগরের ওপর দিকে৷

অরেস্টেস লরেঞ্জোর গন্তব্য কিনল্যান্ড৷

শরীর-মন জুড়ে টগবগ করে ফুটছে প্রচণ্ড উত্তেজনা৷ নিজেকে সংযত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে লরেঞ্জো৷ উত্তেজনার বশে সামান্যতম ভুল হলেও সর্বনাশ! সব ভেস্তে যাবে৷

আর কতক্ষণ, আর কতক্ষণ? ঘড়ি দেখল লরেঞ্জো, মাত্র পাঁচ মিনিট পার হয়েছে৷ এখন এক-একটা মিনিট যেন এক এক ঘণ্টা, বুভুক্ষু হৃদয়ে একনাগাড়ে বেজে চলেছে হাতুড়ি পেটানোর শব্দ৷

দীর্ঘ একুশ মাস পর আজ লরেঞ্জো যাচ্ছে তার আপনজন—স্ত্রী ও পুত্রদের কাছে৷ স্ত্রী ভিকি কেমন আছে? প্রায় দুবছর ধরে সে একাকিনী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে সমস্ত প্রতিকূলতার সঙ্গে৷ এগারো বছরের রেনীল, ছয় বছরের আলেকজান্দ্রো, ওরা বাবাকে মনে রেখেছে?

প্রশ্ন আর প্রশ্ন৷ তার সঙ্গে আবেগের ঢেউ তোলপাড় করছে লরেঞ্জোর মনের মধ্যে না! ওদের দেখতে পাবে তো? কোনওভাবে ফাঁস হয়ে যায়নি তো এই পরিকল্পনা?

ভাবতেই বুকের মধ্যে কেঁপে ওঠে লরেঞ্জোর৷ নাহ্, এখন ভেবে লাভ কি! যা হবার, তা হবে৷

ওই—ওই তো! নীচের আদিগন্ত নীলের শেষে ধূসর তটরেখার আভাস৷

কিনল্যান্ডের উপকূল এসে গেল৷

দ্রুত প্লেনের আলো নিভিয়ে দিল লরেঞ্জো৷ ইঞ্জিনকে ‘লো ডাউন’ করে সেসনাকে নীচে নামাতে থাকে সে৷

কিনল্যান্ডের রাডারের আয়নায় ওর বিমানের ছবি একবারের জন্যেও ধরা পড়লে সমস্ত পরিকল্পনার সমাপ্তি৷

নিপুণ দক্ষতায় সেসনাকে ও নামিয়ে আনল সাগরের ঠিক তিন মিটার ওপরে৷ আধো অন্ধকারের মধ্যে সাংঘাতিক ঝুঁকি নিয়ে আলোহীন বিমানে লরেঞ্জো এগোতে থাকে বেলাভূমির দিকে৷

সাগরবেলাকে আড়াআড়ি ভাগ করেছে পাহাড়শ্রেণী৷ সামনের পাহাড়টা পেরোলে তারপর হাইওয়ে৷ সেখানেই ওদের থাকার কথা৷

শোঁ-ও-ও করে ছোট্ট সেসনা একবার উপরে উঠে পাহাড় ডিঙিয়েই আবার নেমে এল নীচে৷ লরেঞ্জো এখন ঠিক হাইওয়ের ওপর৷

কুচকুচে কলো হাইওয়েতে আলো এখনও জ্বলে ওঠেনি৷ এখনও অন্ধকার পুরোপুরি ঢেকে ফেলেনি চরাচর৷ সন্ধ্যার ধূসর আলোয় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে সেসনাকে নিয়ে ধীর গতিতে এগোতে থাকে লরেঞ্জো৷

মাত্র সাড়ে তিন মিটার নীচেই আবছা হাইওয়ে৷

হে ঈশ্বর, হে যীশু, ওদের একবার দেখিয়ে দাও৷ আর পারছি না প্রভু!—বুকের ভিতর আকুল আর্তি করে যাচ্ছে লরেঞ্জো: ওরা কোথায়? কোথায় ওরা? আসতে পেরেছে কি পাহারার ফাঁক দিয়ে? হে যীশু, জীবনে যদি কিছু ভালো কাজ করে থাকি, তার বিনিময়ে ওদের ভিক্ষা দাও, প্রভু৷

রবিবার, তারিখ ২৪ মার্চ, ১৯৯১৷ শেষবারের মতো দুই ছেলের গালে চুমু খেয়ে, স্ত্রীর দু-হাত নিজের হাতে শক্ত করে খানিকক্ষণ চেপে ধরে কিনল্যান্ডের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে পড়েছিল লরেঞ্জো৷

দরজা থেকে বেরিয়ে পথে নেমে পিছন ফিরতেই ও দেখল, ভিকি হাত নাড়ছে আস্তে আস্তে৷ দু-চোখ তার জলে ভরা৷

আবার ফিরে এসেছিল লরেঞ্জো৷ নিঃশব্দে কাঁদতে থাকা স্ত্রীর মাথায় হাত বুলিয়ে অনুচ্চকণ্ঠে বলেছিল,—বোকা মেয়ে, ছিঃ কাঁদে না৷ আমি তো বলে যাচ্ছি, ফিরবই৷ যে করে হোক্৷ প্লেন, হেলিকপ্টার, বেলুন এমনকী কিছু না পেলে ডিঙি নৌকোয়, কিংবা সাগর সাঁতরে৷ তোমাদের এদেশ থেকে নিয়ে যাবই৷ আমার ওপর বিশ্বাস রাখো, প্লিজ, ভিকি!

বলতে বলতে নিজের চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে লরেঞ্জোর৷ বাঁ-হাতে টুপিটা মাথায় চাপিয়ে সে দ্রুত নেমে আসে পথে৷ স্টার্ট দেয় তার মোটর সাইকেলে৷

কিনল্যান্ডের এয়ার বেসে পৌঁছতে মিনিট পনেরো৷ কোনদিকে না তাকিয়ে ডেপুটি বেস কমাণ্ডার অরেস্টেস লরেঞ্জো উঠে পড়ল তার নিজস্ব মিগ—২৩ প্লেনে৷ দৈনন্দিন নিয়মমাফিক মহড়া৷

কিন্তু সেদিন ‘মিগ—২৩’ আকাশে উঠে রোজকার মতো ওলটপালট খেল না৷ কন্ট্রোলরুমের অফিসারদের হতভম্ব দৃষ্টির সামনে মিলিয়ে গেল উত্তর দিকে৷

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিমূঢ় অবস্থা কাটিয়ে উঠেই ছুটলেন অফিসাররা৷ তোলপাড় পড়ে গেল সারা দেশে—পালিয়েছে৷ ভিনদেশি সেনা অফিসার দেশ ছেড়ে পালিয়েছে৷

একঘণ্টার মধ্যে লরেঞ্জোর ফ্ল্যাটের সামনে একের পর এক পুলিশের গাড়ির হর্ন৷ শুরু হয়ে গেল বাঘা বাঘা গোয়েন্দা কর্তাদের রেকর্ডার নিয়ে একটানা জেরা,—আপনি জানতেন, আপনার স্বামী চলে যাবেন?

—না৷

—হাস্যকর কথা বলবেন না ম্যাডাম৷ কোথায় গেছেন উনি?

—জানি না৷

—হাঃ হাঃ হাঃ, একেবারে তোতাপাখির বুলি৷ কেন গেলেন বলুন তো?

—কী করে বলব?

—তাহলে বলতে চান, আপনার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল না?

—তা তো বলিনি৷

—আচ্ছা বলুন, আজ সকাল থেকে উনি কী কী করেছেন?

—যা যা রোজ করে থাকেন৷...

এইভাবে টানা ঘণ্টাখানেক ধরে চলল অবিরাম জেরা৷ কখনো নরমে কখনো গরমে৷ ভিকি অটল প্রত্যয়ে প্রশ্নবাণকে প্রতিহত করে গেল৷

বিফলমনোরথ হয়ে ফিরে যাবার সময় অফিসাররা বলে গেল,—কাজটা ভালো করলেন না ম্যাডাম৷ এর ফল আপনাকে পেতে হবে৷

প্রত্যুত্তরে ঠোঁট ওল্টাল ভিকি৷

ও লরেঞ্জোর কাছ থেকে আগেই জেনে নিয়েছে, প্রত্যক্ষ প্রমাণ না পেলে এদেশের পুলিশ বা মিলিটারির একচুল ক্ষমতাও নেই ওর কেশাগ্র স্পর্শ করার৷

কারণ এরা ভিনদেশি৷ বন্ধুরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী থেকে সাহায্যকারী হিসেবে এদেশে এসেছে লরেঞ্জো, তার পরিবার নিয়ে৷...

ইতিমধ্যে লরেঞ্জো কয়েকশো কিলোমিটার সাগর পেরিয়ে পৌঁছে গেছে তার কাঙ্খিত দেশ সাবেক সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রে৷

তার মিগ—২৩ যখন বেসিল বিমানবন্দর নামল, সেখানেও শোরগোল পড়ে গেল৷ লরেঞ্জো সোজা প্লেনের দরজা খুলে বেরিয়ে এল৷ পোর্টেবল লাউডস্পিকারে বলল,—আমি তার্কি বিমানবাহিনীর ডেপুটি মেজর৷ কিনল্যান্ডে ডেপুটেশনে ছিলাম৷...আমি এখানে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইছি৷

স্বয়ংক্রিয় অনুবাদ যন্ত্রে সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারপোর্টে অপেক্ষমান অফিসাররা তার ভাষা যে বুঝতে পেরেছেন, সেটা বুঝতে পারল লরেঞ্জো, যখন ওদিক থেকে আন্তরিক প্রত্যুত্তর ভেসে এল ওরই ভাষায়, স্বাগতম৷

লরেঞ্জো হাঁফ ছেড়ে বাঁচল, যাক্, ওর মনস্কামনা আপাতত পূর্ণ৷

পাঠক-পাঠিকারা নিশ্চয়ই অবাক! ভাবছেন—অরেস্টেস লরেঞ্জো পালাল কেন কিনল্যান্ড ছেড়ে? আর এমন বিদঘুটে দেশের নাম পৃথিবীর মানচিত্রে আদৌ আছে বলে তো শুনিনি৷

প্রথমে দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব দিই৷ না, কিনল্যান্ড নামটা বানানো৷ রাজনৈতিক বিতর্ক এড়াবার জন্যেই নাম পাল্টানো হয়েছে৷ তবে সময়কাল, মূল চরিত্রের নাম ও ঘটনাটা কিন্তু সূর্যের আলোর মতো সত্যি৷

এবার প্রথম প্রশ্নের উত্তর৷ কিনল্যান্ডে তখন চলছিল একনায়কতন্ত্র৷ সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ছিল না৷ ফলে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যখন বিদ্রোহের রূপ নিল, দেশের ডিক্টেটর তখন শরণাপন্ন হলেন বন্ধুরাষ্ট্রের৷ অবস্থা সামাল দিতে তুরস্ক সেনাবাহিনী এল৷ এল তার অন্যতম কর্তা, কাহিনীর নায়ক অরেস্টেস লরেঞ্জোও৷

একসময় পরিস্থিতি শান্ত হল৷ কিন্তু বন্ধুরাষ্ট্রের অনুরোধে তুরস্ক সরকার তুলে নিতে পারলেন না বাহিনী৷ নিরুপায় হয়ে স্ত্রী পুত্রদেরও এদেশে নিয়ে এল লরেঞ্জো৷

দিন যায় মাস যায়...বছরের পর বছর ঘোরে৷ কোনওপক্ষই কিন্তু বাহিনী প্রত্যাহারের নাম করে না৷ এদিকে লরেঞ্জোর কাছে কিনল্যান্ডের পরিবেশ ক্রমেই অসহনীয় হয়ে ওঠে৷ দেশের ডিকটেটর সরকারের বন্ধুরাষ্ট্র থেকে এসেছে সেনাবাহিনীর লোক৷ সাধারণ মানুষ ওদেরকে দু-চক্ষে দেখতে পারে না৷ আবার সরকারি লোকজনের কাছ থেকেও জুটতে থাকে অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য৷

অন্যদিকে লরেঞ্জো শোনে, সাগর পার হলেই বিরাট দেশ বা সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্র, সেখানে নানা সুবিধে৷ প্রলোভন তাকে হাতছানি দেয়৷ সে মতলব আঁটে এদেশ ছেড়ে পালাবার৷...

তারপরের ঘটনা একটু আগেই জেনে ফেলেছি৷

লরেঞ্জো প্রায় তিনমাস হল কিনল্যাণ্ড ছেড়ে গেছে৷ স্ত্রী ভিকির জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ৷ যখন তখন পুলিশি উৎপাত তার গা সওয়া হয়ে গেছে৷ সবচেয়ে যেটা মারাত্মক তা হল, ওদের ওপর সর্বক্ষণ নজর রাখছে গোয়েন্দা বিভাগ৷ বন্দীর জীবন কাটছে৷ পারিবারিক স্বাধীনতা, গোপনীয়তা বলে কিছু নেই৷

সেদিন সকালে কলিংবেল বাজতে দরজা খুলে ভিকি দেখে, ডাকপিওন৷ হাতে তার মোটাসোটা এক রেজিস্ট্রি পার্সেল৷ প্রবল উৎসাহে ভিকি একটানে প্যাকেটটা প্রায় ছিনিয়ে নিল৷ যা ভেবেছে, তাই! লরেঞ্জো পাঠিয়েছে সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্র থেকে৷

যাক্, লরেঞ্জো তাহলে ভালো আছে৷ ঠিক জায়গাতে পৌঁছতে পেরেছে৷ উত্তেজনায় পুড়তে পুড়তে ভিকি হুড়মুড় করে প্যাকেট খুলে ফেলে৷ লরেঞ্জোর সুদীর্ঘ চিঠির সঙ্গে একগাদা কাগজপত্র৷ ভিকি ও বাচ্চাদের সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার ভিসা ও অনুমতিপত্র, সব একেবারে তৈরি করে পাঠিয়েছে৷

ভিকি আনন্দে কাঁপছে৷ একমুহূর্ত দেরি করে না, সোজা চলে যায় কিনল্যান্ডের ইমিগ্রেশন দপ্তরে৷ কাগজপত্রগুলি জমা দেয়৷ ওর চোখে সোনালি দিনের স্বপ্ন৷

বাড়িতে ফিরে সবে একটু বসেছে ভিকি, আবার ‘পিঁ পিঁ’৷ বিরক্তির সঙ্গে দরজা খুলতেই সামনে দুটো যমদূত৷

পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের দুজন পরিচিত অফিসার৷ তাদের মুখে বাঁকা হাসি,—এই যে ম্যাডাম, গুড মর্নিং৷

রাগে গা রি রি করে উঠল ভিকির৷ দরজার দুই পাল্লা ধরে তেতো গলায় সে বলল,—বলুন৷ আবার কী দরকার?

—না, তেমন কিছু নয়৷ আপনি ভিসার কাগজপত্র জমা দিয়েছেন?

—হ্যাঁ৷

—কোনও লাভ নেই ম্যাডাম৷ আপনার হাসব্যান্ড যেভাবে দেশ ছেড়েছেন, নিজে এসে উনি না নিয়ে গেলে আপনি কোথাও যেতে পারবেন না৷ এটা জানাতেই এসেছিলাম৷...আচ্ছা চলি, বা-বাই৷

ভিকির নিভে যাওয়া দৃষ্টির সামনে দিয়ে দুটো মুশকো পথের বাঁকে হারিয়ে গেল৷ এই বদমাসরা লরেঞ্জোকে হাতে না পাওয়া অবধি তাকে ছাড়বে না৷...

মাস পাঁচেক পর আরেক বিকেল৷ ভিকি অফিস থেকে ফিরে টিভি চালিয়ে চুপচাপ বসে আছে৷ টিভি এমনিই চলছে, ভিকির মস্তিষ্কে চলেছে অহর্নিশ চিন্তার ঝড়—আর কতদিন? কতদিন সহ্য করতে হবে বিচ্ছেদ যন্ত্রণা?

এইসময় কলিংবেল বেজে উঠল৷ দরজার ওপারে সৌম্যদর্শন এক ভদ্রলোক,—ম্যাডাম, ভেতরে আসতে পারি?

—আসুন৷

ভদ্রলোক বসলেন৷ সতর্কদৃষ্টিতে চতুর্দিক দেখলেন৷ তারপর গলা একেবারে খাদে নামিয়ে বললেন,—ম্যাডাম, খুব সিক্রেট মেসেজ৷

বুক দুলে উঠল ভিকির,—বলুন৷

—মিস্টার লরেঞ্জোর খবর আছে৷ খবর পাঠিয়েছেন, যুক্তরাস্ট্রের যুদ্ধজাহাজে আনামি বিচের দক্ষিণ পশ্চিমে ২০ কিলোমিটার দূরে উনি অপেক্ষা করবেন৷ কাল বিকেল সাড়ে চারটেয়৷ আমি একটা স্পিডবোট ব্যবস্থা করেছি৷ বাচ্চাদের আপনি নিয়ে ওতে চেপে চলে যাবেন৷

—আপনার পরিচয়?

—আমি লরেঞ্জোর বন্ধু, অগাস্টিন৷

—না মিস্টার অগাস্টিন৷ এভাবে পালিয়ে আমরা যাব না৷ উনি যদি সসম্মানে আমাদের নিয়ে যান, তবেই যাব৷

লোকটি হতাশ হয়ে উঠে দাঁড়ালেন,—যাবেন না তাহলে?

—না৷

—ঠিক আছে, চলি৷

আসলে ততক্ষণে যা বোঝার, বোঝা হয়ে গেছে ভিকির৷ ফাঁদ! তাদেরা ফাঁসিয়ে দেবার চক্রান্ত৷ সে যদি একবার ইচ্ছে প্রকাশ করত, সঙ্গে সঙ্গে গোয়েন্দাদের হাতেনাতে প্রমাণ মিলে যেত৷ তখন হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, নতুন ফাঁসির দড়ি৷ লরেঞ্জো তাকে ভাগ্যিস সতর্ক করে দিয়েছিল৷

সময় বয়ে চলে৷ একঘেয়ে, হতাশাভরা দিন...মাস...বছর৷ কবে যে লরেঞ্জো তাদের নিতে আসবে, জানে না৷ কোনও খবর নেই৷

তবে গোয়েন্দা দপ্তরের কড়াকড়ি এখন কিছু শিথিল হয়েছে৷ ওরা অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়েছে, এদের পালাবার ক্ষমতা নেই৷ তাছাড়া লরেঞ্জোর এক বান্ধবী আন্তর্জাতিক সংস্থার হয়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের কল্যাণমূলক কাজ করতে এল কিনল্যান্ডে৷ সেই ভার্জিনিয়া গঞ্জালেসের মাধ্যমে মাঝে মধ্যে লরেঞ্জোর খবর পায় ভিকি৷

লরেঞ্জো প্রস্থানের ঠিক একুশ মাস পরের একদিন৷ ভিকি দরজা খুলতেই সামনেই দাঁড়িয়ে ভার্জিনিয়া৷ উত্তেজনায় সে কাঁপছে৷

ভিকি বুঝে গেল, মোক্ষম খবর আছে৷

শোবার ঘরের দরজা জানলা বন্ধ করে ভার্জিনিয়ার কাছ ঘেঁষে বসে ভিকি৷ ভার্জিনিয়া ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে বার করে একখানা সাংকেতিক ম্যাপ৷ বিভিন্ন জাগয়ায় সাংকেতিক চিহ্ণ বসানো৷ ভিকিকে বলে,—এটা হল আনমি বেলাভূমি৷ ঠিক এই জায়গায় কাল তোমরা পৌঁছে যাবে৷ পাহাড় আর হাইওয়ে যেখানে ঠিক ক্রশ করছে৷ পাশে,—এই দ্যাখো একটা ফ্রুট জুসের দোকান৷ বুঝলে?

কাঁপতে কাঁপতে ঘাড় নাড়ে ভিকি৷

—হ্যাঁ, ফোন এলে সাংকেতিক ভাষায় কথা বলবে৷ বুঝে নিও৷...আমি এখন চলি৷...খুব সাবধান, কাকপক্ষী যেন টের না পায়৷

ভার্জিনিয়া চলে গেল৷ তারপর থেকে ঠায় ফোনের সামনে বসে আছে ভিকি৷ আজ নিজের খাওয়াদাওয়া প্রায় বন্ধ৷ বাচ্চাদের কোনরকমে খাইয়ে দাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল৷

সর্বাঙ্গ দিয়ে উত্তেজনার আগুন বয়ে চলেছে৷ কখন শুনতে পাবে লরেঞ্জোর কণ্ঠস্বর?

ঠিক রাত এগারোটায়...ক্রিং-ক্রিং-ক্রিং...

জ্বরগ্রস্ত রোগীর মতো কম্পমান হাতে রিসিভার তুলল ভিকি,—হ্যালো৷

—হ্যালো, অবেস্টেস৷ ভালো তো?

হ্যাঁ হ্যাঁ—ভা—ভালো...তু...তুমি—আনন্দের আবেগে কথা আটকে যায় ভিকির৷

—শোনো, বাচ্চাদের জুতোর মাপ সাড়ে পাঁচ আর সাড়ে ছয়৷ নাটকটা কালকেই স্টেজ হচ্ছে৷ সঙ্গে কমলালেবু নিতে ভুলো না৷...বাই৷

ফোন কেটে গেল৷ ভিকির হাতে তবু ধরা থাকে রিসিভার, বেশ খানিকক্ষণ৷ সাড়ে পাঁচ-সাড়ে ছয়, এটা কাল বিকেলের সময়৷ কিন্তু কমলালেবু...কমলা...হ্যাঁ, বুঝেছি পোশাকের রং৷ ও যাতে চিনতে পারে৷

সারাটা রাত হু-হু করে কেটে গেল৷ আনন্দ—ভয়—উত্তেজনার আগুনে কোথায় উধাও হয়েছে ঘুম! মগজের কোষে কোষে শুধু নির্ভুল ছক কষে গেল ভিকি৷

আলো ফুটতেই গোছগাছ শুরু করে ভিকি৷ ছেলেদের বলল, আজ সাগরবেলায় বেড়াতে যাবে৷ দুপুরে খেয়ে-দেয়ে৷ সমুদ্রে স্নান, বেড়ানো... আনন্দ চলবে দিনভর৷

রেনিল, আলেকজান্দ্রো তো অবাক৷ বাবা যাওয়ার পর থেকে মাকে এমন উচ্ছ্বল ওরা দেখেনি৷

ছোটখাটো যেটুকু নেওয়ার, কিটব্যাগে ভরে নিল ভিকি৷ দশটার মধ্যে লাঞ্চ শেষ৷ তিনজনে বেরিয়ে পড়ল কোয়ার্টারে চাবি দিয়ে৷

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ভিকির মনে হল, দুজন ব্যক্তি পিছন থেকে সমানতালে হেঁটে আসছে৷ চট করে দাঁড়িয়ে পড়ে ভিকি৷ হ্যান্ডব্যাগ থেকে আয়না বের করে চুল ঠিক করতে থাকে৷ আয়নায় দেখল, ওই দুজন দাঁড়িয়ে পড়ে গল্প জুড়ে দিয়েছে৷

হুম্, গোয়েন্দাদের চর! ওরা ডিউটি শুরু করেছে৷ আচ্ছা, দাঁড়াও!

ভিকি চেঁচিয়ে বলল,—চলো, সোনারা! চিড়িয়াখানায় যাব৷

ছেলেরাও আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল৷ সামনে বাস আসছিল৷ হাত দেখিয়ে তিনজন উঠে পড়ল৷

বাঃ, ওই দুজনও একই বাসে উঠেছে৷

টিকিট কেটে চিড়িয়াখানায় ঢুকে একবার পেছন ফিরল ভিকি, ছেলেদের হাত ধরার অছিলায়! লোক দুটো ভিতরে ঢোকেনি৷ বাইরে নিশ্চিন্তে সিগারেট ধরিয়েছে৷

এতক্ষণে মাথার মধ্যে পুরো প্ল্যানটা ছকে ফেলেছে ভিকি৷

কাছাকাছির মধ্যে যে কয়টি জন্তুজানোয়ার ছিল, ছেলেদের দেখিয়ে, চট করে ভিকি চলে যায় পেছনের এমাজেন্সি গেটের কাছে৷ ও গেট দিয়ে সাধারণ দর্শকদের বেরোবার অনুমতি নেই৷ প্রহরী বসে আছে৷

চোখে মুখে যথাসম্ভব কাকুতি ফুটিয়ে ভিকি গিয়ে দাঁড়াল তার কাছে৷ অনুনয়ভরা গলল বলল,—বড় বিপদে পড়েছি৷ একটু অনুরোধ করব সার?

একে মহিলা, সঙ্গে দুটো বাচ্চা, তার উপর ‘সার’ সম্বোধন৷ গার্ড গলে গেল,—বলুন ম্যাডাম৷

—আমাদের একটু এখান দিয়ে বেরোতে দেবেন? একজন ওয়েট করবে৷ দেরি হলে খুব ক্ষতি হয়ে যাবে৷

প্রহরী একপলক দেখলে ওদের৷ তারপর দরজাটা খুলে দিল৷

চিড়িয়াখানা থেকে বেরিয়েই ট্যাক্সি পাওয়া গেল৷ এবার সোজা আনামি বিচ৷

বেলাভূমির যেদিকটা ভিড়ভাট্টা, সেদিক এড়িয়ে ভিকি এগোল সামনের দিকে৷ ছেলেরা লাফঝাঁপ শুরু করেছে,—মা, সমুদ্রে নামব৷

বাচ্চাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ চলল জলে ঝাপাঝাপি দাপাদাপি৷ ভিকির মাথায় একটাই চিন্তা, সাড়ে পাঁচটা বাজতে আর কত বাকি? ঘড়ির কাঁটা বড্ড ধীরে ঘুরছে৷ ওই দুটো খোঁচড় আবার চলে আসবে না তো!

একটু দূরে ফলের রসের দোকান৷ ওখানে ঢুকে একগ্লাস করে সরবত খাওয়া হল৷ তারপর বেরিয়ে এসে তিনজনে তোয়ালে পেতে বসল বালির ওপর৷ বাচ্চারা লাফঝাঁপ শুরু করল, ভিকি বসে বসে উত্তেজনায় ছটফট করছে৷

ঘড়ির কাঁটা পাঁচটা ছুঁইছুঁই৷ বাচ্চাদের ডেকে কমলারঙা পোশাক পরিয়ে দিল৷ নিজেও পরে নিল৷ কাপড়চোপড় ব্যাগে ফেলে আবার হাঁটা দিল আরও পশ্চিমমুখো, হাইওয়ের দিকে৷...

সময় সমাগত!

ঝাপসা অন্ধকারে আলোহীন বিমান!...এগিয়ে চলেছে লরেঞ্জো৷ ওর ডানদিকে হাইওয়ে৷

মাঝে মাঝে সশব্দে ছুটে যাচ্ছে বড়বড় ট্রাক, সগর্জনে৷ হেডলাইটের আলোয় মুহূর্তের ঝলসে উঠছে অনেকখানি জায়গা, আবার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে৷

আবার একটা ট্রাকের গর্জন পূর্বদিক থেকে৷ প্লেনকে আরও বাঁয়ে সরিয়ে আনল লরেঞ্জো৷

জোরালো ফোকাসে আবার আলোকিত হাইওয়ে! তখনই—ঠিক তখনই—

হাইওয়ের পাশ দিয়ে তিনটে অগ্রসরমাণ বিন্দু! কমলা রঙের৷

উত্তেজনায় নাড়ি ছিঁড়ে যাচ্ছে লরেঞ্জোর৷ ওরা—ওরা এসে গেছে!

ট্রাকটা বেরিয়ে যেতেই বোল্ডার আর রাস্তার হোর্ডিংকে সন্তর্পণে পাশ কাটিয়ে লরেঞ্জো সেসনাকে কাত করল আরও নীচে৷ হাইওয়ের ঠিক ষাট সেন্টিমিটার ওপরে প্লেনের চাকা নামাল৷

জমি স্পর্শ করেই চকিতে ‘ইউ’ টার্ন করে নিল৷ গতি কমাতে৷ এবং সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কে শিউরে উঠল৷

একচুলের জন্যে বেঁচে গেছে৷ ওর প্লেনের ডানার গা ঘেঁষে গর্জন করে বেরিয়ে গেল একটা ট্রাক৷

ভিকিও দেখে ফেলেছে লরেঞ্জোর বিমানকে! পাগলের মতো দুটো বাচ্চাকে টানতে টানতে সে ছুটতে থাকে সেসনার দিকে৷

—চলো, চলো৷ ও যে ওখানে! তোমাদের ড্যাডি৷ শিগ্গির শিগ্গির!

সেসনা থেকে সিঁড়ি নেমে এসেছে৷ দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে অরেস্টেস লরেঞ্জো৷...

তিনজনেই ঢুকে পড়েছে৷

সমস্ত নাটকটা ঘটে গেল মাত্র ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে৷

সেসনা নামার ঠিক চল্লিশ সেকেন্ডের মধ্যেই আবার গর্জন করে উঠল৷ লরেঞ্জো প্লেন নিয়ে আবার উঠে গেল আকাশে৷

দম বন্ধ করা সময়! বিমান কিনল্যাণ্ডের সীমানা এখনও ছাড়ায়নি৷

দাঁতে দাঁত চেপে লরেঞ্জো ফিরে চলে সোভিয়েত যুক্তরাস্ট্রের দিকে৷

পিছনে ক্রমেই মিলিয়ে যায় কিনল্যান্ডের তটরেখা৷

যাক, পেরোনো গেছে রাডার সীমানা৷ আঃ—আঃ, এতদিনে আমরা মুক্ত, আবার একসঙ্গে৷

আনন্দে দু-হাত তুলে তীব্র চিৎকার করে লরেঞ্জো,—ভিকি ফর ভিক্ট্রি! পেরেছি, আমরা পেয়েছি! ওরা হেরে গেছে আমাদের কাছে৷

ছোট্ট সেসনার আলো এবার জ্বলে ওঠে, উড়ে যায় আরও উঁচুতে...আকাশের মেঘসীমা পেরিয়ে৷

অধ্যায় ১৬ / ১৬
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%