সামনে শমন

ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়

কুয়াশার ওড়না সরিয়ে ভোরের আলো ফুটি-ফুটি৷ নেপাল রাষ্ট্রের রয়্যাল চিতওয়ান অভয়ারণ্যে নিজের তাঁবু থেকে ধীরপদে বেরিয়ে এল বাইশ বছরের যুবক ম্যানফ্রেড পিলার৷

সুইট্‌জারল্যান্ডের সেনা-কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে বেড়াতে এসেছে ম্যানফ্রেড৷ বহুকাল ধরেই এদেশ দেখার স্বপ্ন দেখেছে সে৷ শুনেছে অপরূপ বৈচিত্র্যে ভরা এই বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের পাহাড়-পর্বত সমতল অরণ্য সাগর আর নানা ভাষাভাষী মানুষের কথা৷

তাঁবুর বাইরে পা দিয়েই ম্যানফ্রেড মুগ্ধ হয়ে গেল৷

নিবিড় বন, সবুজ গাছপালার জড়াজড়ি৷ তাদের গা থেকে এখনও টুপ্‌টাপ্‌ করে ঝরে পড়ছে রাতের শিশির৷ নির্মেঘ আকাশে এইমাত্র সূর্যোদয় হয়েছে৷ আবির রাঙা সূর্যালোক এখন মাখামাখি সবুজ পাতায়-ফুলে শিশিরকণায়৷ ডালে ডালে শুরু হয়ে গেছে পাখপাখালির কলধ্বনি। মায়াবি স্নিগ্ধতায় ঘেরা এক স্বপ্নরাজ্য৷

বিহ্বল ম্যানফ্রেড৷ সত্যিই এ উপমহাদেশ তুলনাহীন৷

চমক ভাঙে নেপালি গাইডের ডাকে,—সাব, রেডি?

হ্যাঁ হ্যাঁ৷—ঘুরে দাঁড়ায় ম্যানফ্রেড : চলো চলো৷

পিঠের রুকস্যাক, ক্যামেরা নিতে ঢুকে পড়ে তাঁবুর মধ্যে৷...

এক-দেড় ফুট লম্বা লম্বা হলুদ-সবুজ ঘাসে বনপথ আকীর্ণ৷ হাঁটা বেশ দুরূহ৷ তবে ম্যানফ্রেডের কাছে এখন কোনও কষ্টই কষ্ট নয়৷ দুচোখ ভরে সে গিলছে অরণ্যপ্রকৃতিকে৷

নেপালি গাইড বলল,—সাব্‌, আমরা এখন রাপ্তী নদীর দিকে এগোচ্ছি৷ এই জঙ্গল দিয়ে নদীটা বয়ে গেছে৷ আরে সাব্‌—ওই যে—সাব্‌, ক্যামেরা!

মুহূর্তে ম্যানফ্রেড ক্যামেরা তাক করে৷

একটু দূরেই একপাল হরিণ চরে বেড়াচ্ছে, নির্ভয়ে নিশ্চিন্তে৷ ঝলমলে আলোয় যেন সোনার শরীর!

জনহীন বিশাল অরণ্য৷ চারশোরও বেশি বিভিন্ন জাতের জন্তু ও পাখপাখালির বাসভূমি৷ বানর, বাইসন, হরিণ, বনবিড়াল এসব তো আছেই, আছে চিতা, আছে একশিঙা গন্ডারও৷ তাছাড়া কতরকমের রংবেরঙের পাখি, ম্যানফ্রেডদের যাত্রাপথ জুড়ে সমানে চলেছে তাদের হৈচৈ৷

ম্যানফ্রেড অভিভূত হয়ে দেখছে, ‘ক্লিক ক্লিক’ শব্দে চিরস্থায়ী করে রাখছে ছবির ফ্রেমে৷

প্রায় ঘণ্টাখানেক এগোবার পর বন কিছুটা পাতলা হয়ে এল৷ বনস্পতিদের বাঁধন কিছুটা আল্‌গা, তবে ঘাস রয়েছে আগেরই মতো৷

গাইড বলে ওঠে,—সাব্‌, নদীর পাড়ে এসে গেছি৷

আহা! একটু দূরেই, গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় শুভ্র ফেনিল জলধারা৷ উচ্ছ্বসিত রাপ্তী বয়ে চলেছে৷

সহসা প্রৌঢ় নেপালি একটু থমকে দাঁড়ায়৷ অভিজ্ঞ চোখ এদিক ওদিক তাকায়৷ আকাশের দিকে নাক তুলে কীসের গন্ধ টানছে৷

ম্যানফ্রেডও দাঁড়িয়ে পড়ে,—কী ব্যাপার বাহাদুর?

সাব্‌, মনে হচ্ছে আমরা একেবারে আসল জায়গায় এসে গেছি৷—নেপালি মুখে দু-একটা কুঞ্চন: তবে কুছ—কুছ খতরা৷

কী বলছ?—ম্যানফ্রেড বিরক্ত : একবার বলছ আসল জায়গা, আবার বলছ খতরা?

জী সাব্‌৷—গাইড ঘাড় নাড়ে : এখানেই বনের জানোয়াররা পানি পিতে আসে৷ ওই যে ওই—ওই দেখুন ওদের পায়ের ছাপ৷

চমৎকার!—সোচ্ছ্বাসে বলে ওঠে ম্যানফ্রেড: আমরা তাহলে এখানেই দাঁড়াই, কী বলো৷ সবার সঙ্গেই টাটকা মোলাকাত হবে৷ দারুণ দারুণ ছবি তুলতে পারব৷

—জি সাব্‌৷ কিন্তু—

—আঃ, কিন্তু কিন্তু করো না তো!

বলতে বলতে তড়িঘড়ি চোখে ক্যামেরা লাগিয়ে লেন্স সেট করতে থাকে ম্যানফ্রেড৷

অকস্মাৎ বাহাদুরের ভয়ার্ত চিৎকার,—ওহ্‌ সাব্‌! সাবধান!

পরক্ষণেই ম্যানফ্রেডের ক্যামেরার লেন্স জুড়ে ভীষণদর্শন একটি খড়্গ৷

চোখ থেকে ক্যামেরা নামাতেই সর্বাঙ্গ অবশ।

গন্ডার! একশৃঙ্গ গন্ডার! স্লেট পাথরের মতো বর্মে ঢাকা জঙ্গী দেহ, নাকের সামনে ধারালো সূঁচোলো খড়্গ—মেলট্রেনের গতিতে সে ধেয়ে আসছে ম্যানফ্রেডেরই দিকে৷ তফাত মাত্র গজ পঞ্চাশেক৷

পালাও! পালাও! মাথার মধ্যে পাগলাঘণ্টি বাজছে ম্যানফ্রেডের৷ গন্ডারের গোঁ, আর রক্ষে নেই৷

প্রাণপণে ছুটেছে ম্যানফ্রেড, কোথায়--কোথায় আশ্রয়? অন্তত একটা গাছ?

বেচারি অনভিজ্ঞ তরুণ! জঙ্গলে আসার আগে বাসিন্দাদের নিয়ে সে অনেক পড়াশোনা করেছিল। কিন্তু মোক্ষম ব্যাপারটাই জানত না। জানত না গন্ডার তাড়া করলে এঁকেবেঁকে দৌড়তে হয়৷ মাথা নিচু করে ওই ভারি শরীর নিয়ে দৌড়োয় বলে গন্ডার ‘জিগ্‌জাগ্‌’ পথে শিকারকে ধাওয়া করতে পারে না৷ দিকভ্রষ্ট হয়৷

সোজা ছুটছে ম্যানফ্রেড, ছুটছে সর্বশক্তি দিয়ে৷ ঠিক পেছনে ভূমিকম্পের মতো গুম্‌ গুম্‌ পদধবনি ক্রমেই এগিয়ে আসছে...

কাছে...আরো কাছে...

আর নিস্তার নেই! ম্যানফ্রেডের পিঠে ধারালো স্পর্শে নিঃসীম আতঙ্কে ম্যানফ্রেড চোখ বোঁজে৷ হে যীশু! বাঁচাও!

আঁ—আঁ—আঁ! ম্যানফ্রেডের মরণ আর্তনাদে নিথর বনভূমি শিউরে উঠল৷ খড়্গ সোজা পিঠে বিঁধিয়ে দানব ওকে তুলে ধরেছে শূন্য৷

আজ মৃত্যু! আজ শেষ! খড়্গ বিঁধিয়ে নৃশংস দানবটা ঝাঁকুনি দিচ্ছে বারবার! অসংখ্য গোখরো সাপ ছোবল মারছে পিঠে৷ তবু এখনও জ্ঞান হারায়নি ম্যানফ্রেড! ওকে বাঁচাতেই হবে, মরবে না কিছুতেই।

নাহ্—বোধহয় আর হল না৷ ভয়ংকর এক ঝাঁকুনি দিয়ে দানবটা খড়্গসমেত ওকে পেড়ে ফেলল ঘাসজমিতে৷

চিৎ হয়ে থাকা ম্যানফ্রেডের অসহায় চোখ দেখল, প্রবল আক্রোশে জানোয়ারটা খড়্গটা নামিয়ে আনছে ওর পেটের কাছে...

পেট হয়ে খড়্গটা চলে গেল উরুর দিকে৷ মুহূর্তে ফালাফালা হয়ে গেল নরম উরুদুটো৷

সমস্ত অনুভূতি হারাল ম্যানফ্রেড৷ উহ্‌, মৃত্যু এত ভয়ংকর!

কিছুদূরের শক্তপোক্ত একটি গাছ থেকে সমস্ত ঘটনাটাই প্রত্যক্ষ করেছে প্রৌঢ় নেপালি গাইড৷ ভয়াবহ দৃশ্যটা সহ্য করতে না পেরে শেষে চোখ বুঁজে ফেলেছিল। ম্যানফ্রেডের দেহটাকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে খড়্গ নাচাতে নাচাতে একশিঙা গন্ডারটা যখন অন্যদিকে চলে গেল, চতুর্দিক ফাঁকা দেখে সে নেমে আসে৷

সামনেই রক্তাপ্লুত এক মাংসপিণ্ড! কয়েকমুহূর্ত আগেও যে ছিল ছটফটে একটি যুবক! কী মর্মান্তিক পরিণতি!

থম্‌ মেরে দাঁড়িয়ে ইতিকর্তব্য যখন ভাবছে নেপালিটি, এমন সময় এক ক্ষীণ স্বর,—আমায়...নিয়ে...চলো!

কেঁপে উঠল বাহাদুর, কে? কে বলল কথাটা? নিস্তব্ধ বন, জনপ্রাণীর চিহ্ন নেই৷

—দেরি করো না—প্লিজ!

এ কার গলা? নেপালির দু-চোখ বিস্ফারিত৷ সঙ্গে সঙ্গে সে উবু হয়ে বসল ছিন্নভিন্ন দেহটার পাশে৷

তাই তো—তাই তো! মুখ নড়ছে অস্ফুটে৷ জান আছে—এখনও জান আছে! অবিশ্বাস্য ঘটনা!

একমুহূর্ত দেরি না করে গাইড দুহাতে তুলে নিল রক্তে ভেসে যাওয়া দেহটাকে৷ মুখটা আবার নড়ে উঠল,—আমায়...হাসপাতালে...

—যাচ্ছি সাব্‌৷

প্রাণপণে দৌড়তে থাকে নেপালি বাহাদুর৷

রয়্যাল চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্কে ঢোকার মুখেই সৌরাহ! ছোট্ট গঞ্জ শহর, তার গা ঘেঁষেই শুরু হয়েছে সবুজ বনাঞ্চল৷

শহরের প্রান্তে বনের মধ্যেও রয়েছে একাধিক ট্যুরিস্ট লজ৷ তারই একটাতে অস্ট্রেলিয়া থেকে আগত যুবক জর্ডন আর্মস্ট্রং ও তার বান্ধবী সান্‌ড্রা জেক্রি পোশাক সাফ করছিল সামনের দীঘির পাড়ে বসে৷ আর্মস্টং আবার কবি-স্বভাবের৷ কাজ করতে করতে মাঝেমাঝেই রোদ ঝলমল সবুজ প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে ‘আহা ওহো’ করে উঠছিল৷ আর ঝাঁঝিয়ে উঠছিল সান্‌ড্রা—জলদি করো৷ এখনি হাতি এসে যাবে৷

এই সময় হাঁফাতে হাঁফাতে ওদের কাছে ছুটে এলেন লজের মালিক। বললেন,—জঙ্গলে সর্বনাশ ঘটে গেছে! গন্ডারের হিংস্র হামলায় তোমাদেরই মতো একজন শ্বেতাঙ্গ যুবক—

কী! কী হয়েছে ছেলেটার?—তড়াক করে লাফিয় উঠল আমস্ট্রং৷

এখনও মরেনি সাব৷ তবে প্রাণটুকুই যা ধুকপুক করছে৷ যেকোন মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যাবে৷ বে-চা-রা!—কপাল চাপড়ালেন ম্যানেজার৷

কোথায় আছে ও?—সান্‌ড্রা রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল৷

—জঙ্গলের মধ্যেই একটা গ্রামে৷ যাবে তোমরা ম্যাডাম? এদিকে তোমাদের ঘুরতে যাবার হাতিও কিন্তু এসে গেছে৷

—ওতে চেপেই যাব! চলো জর্ডন, হারি আপ্‌৷

একটানা মিনিট পঁয়তাল্লিশ বন ভেঙে এগোবার পর মাহুত হাতি থামাল৷ ওরা এসে গেছে৷

ছোট্ট গ্রাম, সামান্য ক’ঘর বাসিন্দা৷ এক জায়গায় সব ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে৷

ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল দুজনে৷ পরক্ষণেই ওদের গলা চিরে বেরিয়ে এল,—ওহ্‌ ঈশ্বর!

ছেলেটার শরীরের নিম্নাঙ্গ বলে কিছু নেই৷ চোখ মুখ গড়িয়ে অবিশ্রান্ত রক্ত ঝরছে৷ ক্ষত জায়গায় গাছগাছড়ার শেকড়বাকড় পাতাপুতি লাগিয়েছে গাঁয়ের আদিবাসী মানুষরা, তাতে কাজ হচ্ছে সামান্যই৷

জর্ডন আর সান্‌ড্রা দ্রুত এগিয়ে গেল কাছে৷ প্রায় অচেতন শরীরের কানের কাছে মুখ নিয়ে জর্ডন বলে উঠল,—আর ভয় নেই! আমরা এসে গেছি৷ তুমি জেগে থাকো৷

এই মুহূর্তে এ ছাড়া আর কীই বা বলার আছে? যতক্ষণ ওর চেতনা লুপ্ত না হচ্ছে, ততক্ষণই আশা! উত্তরে একবার মুখ নাড়ল যুবক৷

গাঁয়ের মানুষদের দিয়ে চটপট বাঁশের একটা মাচা বানিয়ে ফেলা হল৷ তারপর দেহটাকে তার উপর শুইয়ে সবসুদ্ধু তোলা হল হাতির ওপর৷

কোনও কথা নয়, চলো হাসপাতাল!

দুপুর দুটো বেজে গেল বনের সরকারি সদর দপ্তরে পৌঁছতে৷ কিন্তু সেখানে কী অসহায় অবস্থা! না আছে টেলিফোন, না আছে ওয়ারলেস৷ এমনকি প্রাথমিক চিকিৎসাটুকুর ব্যবস্থাও নেই৷

অসহায় জর্ডন ও সানড্রা পাগলের মতো ছোটাছুটি করতে থাকে৷ কিন্তু কোথায় সমাধান? অথচ ম্যানফ্রেডের রক্তক্ষরণ কিছুটা বন্ধ না করতে পারলে, রক্তপাত হয়েই ও মারা যাবে৷

এইসময় দেখা গেল হাতির পিঠ থেকে নেমে এসেছেন শ্বেতাঙ্গ এক প্রৌঢ় মানুষ৷ বন ঘুরে ফিরছেন৷ জটলা দেখে নিজেই এগিয়ে এলেন কাছে,—কী ব্যাপার?

ব্যাপার তো দেখতেই পাচ্ছেন স্যর!—হতাশ-রাগে কাঁধ ঝাঁকাল জর্ডন : মানুষ মারার পুরো বন্দোবস্ত৷

আমার নাম কেলভিন ডেভিডসন৷ ইউ.এস.এ. থেকে আসছি৷—ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে দিলেন : পেশায় ডাক্তার৷ আমি কি ওকে দেখতে পারি?

দেবদূত! নিশ্চিত দৈবপ্রেরিত! লাফিয়ে উঠে ডেভিডসনের হাত জড়িয়ে ধরল জর্ডন,—ডক্টর,ডক্টর! প্লিস ওকে বাঁচান!

চেষ্টা করছি৷—ডেভিডসন কাঁধের ব্যাগ খুলে একগাদা ব্যান্ডেজ বার করলেন : আমার কাছে এই মুহূর্তে সেলাই করার মতো বা ব্যথা কমাবার ওষুধ কোনটাই নেই৷ এগুলো দিয়েই যতটা—৷ একে এখুনি নিয়ে যেতে হবে কাছের কোনও হাসপাতালে৷ আমিও থাকছি৷

বলতে বলতে ডেভিডসন ম্যানফ্রেডের সর্বাঙ্গে ব্যান্ডেজ জড়াতে আরম্ভ করলেন৷ সান্‌ড্রা তাঁকে সাহায্য করছিল৷ আর জর্ডন ছুটল বনদপ্তরের অফিসে, গাড়ি চাই৷

আড়াইটে নাগাদ মুমূর্ষু ম্যানফ্রেডকে নিয়ে জর্ডন সান্‌ড্রা, এবং ডেভিডসন এসে পৌঁছলেন নারায়ণঘাটে৷ ছোট শহর, একটিমাত্র সরকারি হাসপাতাল৷

কিন্তু ডাক্তার কই? নার্সরা জানাল, তিনি বিকেলের আগে আসবেন না৷

ওরা তিনজন বারবার অনুনয় বিনয় করতে লাগল৷ কাকস্য পরিবেদনা! ডাক্তারবাবু এখন বিশ্রাম নিচ্ছেন, আসতে পারবেন না৷

ম্যানফ্রেড বিড়বিড় করে ভুল বকছে৷ রক্তক্ষরণ হয়েই চলেছে৷ অসহায় তিনজন, ছটফট করছে৷ সময় পার হয়ে যাচ্ছে৷ যেকোন সময় ওর জীবনদীপ নিভে যাবে৷

ডাঃ ডেভিডসন আর থাকতে না পেরে এগিয়ে গেলেন মেট্রনের কাছে,—ম্যাডাম, আমি ইউ.এস.এ.-র ডাক্তার৷ আপনারা যদি একটু আমায় সাহায্য করেন তো আমিই ওকে—

না ডক্টর৷ আমাদের পারমিশান নেই৷—নিরুত্তাপ কণ্ঠ মেট্রনের৷

অতএব নিরুপায় প্রতীক্ষা! ঘড়ির কাঁটা যেন ঘুরছেই না৷ কখন যে বিকেল হবে!

শেষ অবধি সাতটা বাজল৷ নেপালি ডাক্তার অ্যানাস্থেসিস্টকে সঙ্গে নিয়ে দেখতে এলেন৷ অ্যানাস্থেসিস্ট জানালেন, রোগীর যা অবস্থা তাতে অজ্ঞান করা বিরাট ঝুঁকি৷ জ্ঞান আর নাও ফিরতে পারে৷ বড়জোর কয়েকটা ইনজেকশন দিয়ে কিছুটা অসাড় করা যেতে পারে৷

উহ্‌! অসহ্য যন্ত্রণা! যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা৷ একেকটা করে সেলাই টানছে ডাক্তার আর ককিয়ে উঠছে ম্যানফ্রেড৷ অবশ্য জোরে চেঁচাবারও শক্তি নেই তার৷ শুধু মনে হচ্ছে তার শরীরে কেউ যেন শাবল দিয়ে কোপাচ্ছে৷

মাথার পাশে বসে সমানে অভয় দিয়ে যাচ্ছেন ডেভিডসন,—ভয় নেই৷ এবার পিঠ হল৷ এই উরুটা সেলাই হয়ে গেল৷ এবার বাঁ-উরু...তুমি নিশ্চয়ই ভালো হয়ে যাবে...!

অস্ত্রোপচার শেষ হল এক সময়৷ ম্যানফ্রেড নেতিয়ে পড়ল অপারেশন টেবিলে৷ ওর মাথার মধ্যে ধীরে ধীরে আবার ফিরে আসছে নতুন শক্তি—ওকে বাঁচতেই হবে৷

ডুভিনজেলের বাড়িতে বসে অকস্মাৎ হিলডা পিলার টেলিফোন পেলেন,—তোমার ছেলে ম্যানফ্রেড দুর্ঘটনায় মারাত্মক জখম!

বিনামেঘে বজ্রপাত! মা ছুটে গেলেন কনস্যুলেট অফিসে৷ মন শক্ত করে ফেলেছেন৷ যেভাবেই হোক্‌ যেতে চান ছেলের কাছে৷

সরকারি কর্তারা তাঁকে নিরস্ত করলেন,—মৃত্যুভয় কেটে গেছে৷ আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি কোনও একজন ডাক্তারের সঙ্গে ওকে দেশে উড়িয়ে আনতে৷ আপনি শান্ত হোন৷

অবশেষে সপ্তাহখানেক পর ম্যানফ্রেড উড়ে এল দেশে৷ ভর্তি হল হাসপাতালে৷ চলল অত্যন্ত আধুনিক চিকিৎসা৷ তারপর?...

প্রায় আটমাস পরে ম্যানফ্রেড হাজির হল সেনাবাহিনীর দপ্তরে৷

শুধুমাত্র অসীম মনের জোরেই মৃত্যুকে বৃদ্ধাঙ্গুণ্ঠ দেখিয়ে ফিরে এল ম্যানফ্রেড৷ ম্যানফ্রেডের ভাষাতেই বলি, ‘এ ঘটনা আমায় এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা দিয়েছে৷ তা হল—মানুষ মানুষেরই জন্যে৷ দু-পায়ে হাঁটলেই সবাই মানুষ হয় না৷ মনুষ্যত্ব আর বিবেক, মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় কিছু নেই৷...’

এ ঘটনা ঘটে ১৯৮৭ সালে, ১০ নভেম্বর৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%