চক্রভেদ

ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়

ডিসেম্বরের কনকনে সন্ধ্যা৷ মিয়ামির পথঘাট জনবিরল৷ তবে, যে রেস্তোরাঁয় এই কাহিনীর যবনিকা উঠছে, সেখানে প্রচুর মানুষ৷ সবাই পানাহারে, গল্পগুজবে মত্ত৷ রেস্তোরাটি সম্পূর্ণ বাতানুকূল, নরম উষ্ণতায় ভরা৷

এই রেস্তোরাঁর একটি ছোট্ট টেবিলে আপাতত বসে আছে এডওয়ার্ডো মেরা এবং তার স্ত্রী৷ ঠিক বসে আছে বলা যায় না৷ উৎসুকভাবে দরজার দিকে তাকাচ্ছ মেরা, ঘনঘন ঘড়ি দেখছে, সিগারে অধৈর্য টান দিচ্ছে৷

রেস্তোরাঁর স্যুইং ডোর খুলে গেল৷ এডওয়ার্ডোর মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে ওঠে৷ মায়াবী স্বল্প আলোয় দেখা যায়, আগন্তুক এক মহিলা৷

গাঢ় কালো গাউন পরনে, তাতে রঙিন কাচ বসানো৷ একমাথা বাদামি ঝাঁকড়া চুল৷ মুখে উগ্র প্রসাধন৷ মদালসা চেহারা, সঠিক বয়স বোঝা অসম্ভব! বর্ণনানুযায়ী সব মিলে যাচ্ছে৷

হাই মার্থা!—মহিলাকে সাদর সম্ভাষণ জানায় মেরা : তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলুম৷ আমার নাম—

এডওয়ার্ডো মেরা৷ আর ইনি তোমার স্ত্রী, তাই তো?—সামনের চেয়ারে বসতে বসতে মার্থা টোরেস মুখ টিপে হাসে : রতনে রতন চেনে, বুঝলে! তারপর বলো, কী খবর? হঠাৎ তোমার আগমন এবং তলব?

খবর?—এডওয়ার্ডোর গলা দরাজ হয়ে ওঠে : তোমার জন্যে দারুণ সুখবর! আমরা চাই, গোটা নিউইয়র্কে সরবরাহের দায়িত্ব তুমি নাও৷

এ আর এমন কথা কি!—মার্থা কাঁধ ঝাঁকায় : তোমাদের টার্মসগুলো বলো৷ জানোই তো, লাভজনক হলে মার্থা কোন কাজেই পেছপা নয়৷ তাছাড়া গত এক বছরে তোমাদের বিক্রি—

হ্যাঁ হ্যাঁ, সে তো বটেই৷—মার্থাকে থামিয়ে দেয় এডওয়ার্ডো: হবে, হবে, সব বলব তোমায়৷ এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন? আগে একটু—কী খাবে বলো?

অতঃপর নিম্নকণ্ঠে কথোপকথন চলতে থাকে৷ সঙ্গে অঢেল খানাপিনা৷ আর এই ফাঁকে আমরা বরং পিছিয়ে যাই বেশ কিছুকাল আগে, এই ঘটনার সূচনালগ্নে৷

১৯৭৫ সাল৷ পিপ টোরেস ও তার স্ত্রী মার্থা সপরিবারে মধ্য আমেরিকা থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে এসে উপস্থিত হল নিউইয়র্ক শহরে৷ পিপ চাকরি নিল ম্যানহাটন রেস্তোরাঁয়৷ ছোট ছেলেমেয়েদের ভর্তি করে দেওয়া হল স্কুলে৷ লেখাপড়া শিখিয়ে ওদেরকে দশজনের একজন করবে, মার্থা-পিপের সর্বক্ষণ এই একটিই স্বপ্ন৷

অন্যরা বেশ এগিয়ে যেতে লাগল তরতর করে৷ কিন্তু সবার বড় ছেলেটাকে নিয়েই যত অশান্তি৷ নিজের জন্মভূমি থেকে এখানে চলে আসার পর থেকেই ও কেমন রগচটা, বাউন্ডুলে গোছের হয়ে গেছে৷ সর্বক্ষণ বন্ধুবান্ধব, আড্ডা-ইয়ার্কি, কারও কথা শোনে না৷ স্কুলে যাওয়াও বন্ধ করেছে ছেলেটা৷

কিছুদিনের মধ্যেই মার্থারা দেখল, পাওনাদাররা বাড়ি অবধি এসে ওকে ডাকাডাকি করছে৷ তার মানে—ফূর্তি করার জন্য ছেলে ধারও করছে!

মার্থা নিঃশব্দে ছেলের উপর নজর রাখতে থাকে৷ ছেলের অজান্তে ওর ঘরে গোপনে সন্ধান চালায়৷

এর পরপর একদিন মার্থা চোখে অন্ধকার দেখল৷

ছেলের প্যান্টের পকেটে কাগজে মোড়া সাদা গুঁড়ো! তড়িঘড়ি সেটাকে নিয়ে পাশের বাড়ির ভদ্রলোকের কাছে নিয়ে যেতেই মার্থা জেনে গেল, ওর সর্বনাশ হয়ে গেছে! ছেলে ড্রাগ-আসক্ত!

তারপর কত বোঝানো হয় ছেলেকে! সেইসঙ্গে চিকিৎসা! হেন বড় ডাক্তার নেই, যাঁর কাছে যায়নি মার্থা-পিপ৷ তাদের যেটুকু সঞ্চয়, সম্বল ছিল, সবই এক ধাক্কায় উড়ে গেল৷

কিন্তু সবটাই নিষ্ফল, ব্যর্থ৷ ভয়ানক ওই নেশা ইতিমধ্যেই শিকড় বিছিয়ে ফেলেছে ছেলেটার মধ্যে৷

মার্থার অন্য ছেলে-মেয়েরা অবশ্য এ পথে পা বাড়ায়নি৷ তারা লেখাপড়া শিখছে, হাতের কাজ শিখছে৷ মেজো ছেলে জর্জ তো ভারি সুন্দর হীরে কাটার কাজ শিখে ফেলেছে৷

বড় ছেলের চিকিৎসায় জলের মতো টাকা খরচ হচ্ছে৷ মাথায় দুশ্চিন্তার আগুন জ্বলছে৷ তবু ছেলে জর্জের কাছে মার্থা শিখে ফেলল গয়নার কাজ৷ হীরে কাটা, পালিশ, সোনায় বসানো এইসব৷

আয় অনেক বেড়ে গেল পরিবারের৷ ছেলের চিকিৎসা ছাড়াও সন্তর্পণে টাকা জমাতে লাগল মার্থা৷

যে দোকানে মা-বেটা কাজ করত, তার মালিকের নাম আলেক্স পন্স্৷ মার্থার কাজে উৎসাহ-উদ্যম দেখে পন্স্ একদিন বললেন, তুমি কি নিজে ব্যবসা করতে চাও?

মেঘ না চাইতেই জল! মার্থা সাগ্রহে ঘাড় নাড়ে৷

—শোনো, আমি আমার দোকানের একটা অংশ মাসিক ভাড়ায় দিতে পারি৷ তবে হ্যাঁ, ভাড়াটা ঠিক সময়মতো দিতে হবে৷ আর একটা কথা—ব্যবসা চালু করতে তোমার তো জুয়েলারির স্টক রাখতে হবে৷ কিছু টাকা নিশ্চয়ই তোমার আছে৷ বাকিটা যদি চাও তো, আমার কাছ থেকে ধার নিতে পারো৷ মাসে মাসে সুদসহ ফেরত দিলেই হবে৷

দেবতা! ইনি নিশ্চয়ই মানুষের বেশে স্বয়ং ভগবান৷ কৃতজ্ঞতায়, আবেগে মার্থা কথা বলতে পারে না৷ মাথা নীচু করে চোখের জল লুকোতে৷

আলেক্স পন্স্ ধার দিলেন দশ হাজার ডলার৷ মার্থা এর মধ্যেই নিজেদের সঞ্চয় দিয়ে যতটা পেরেছে দোকান সাজিয়ে ফেলেছে৷ আলেক্সের টাকাটা অতি গোপনে এনে লুকিয়ে রাখল নিজের বাড়িতে৷

মার্থা জর্জকে বলে রাখল, দুজনে মিলে পরদিনই যাবে জুয়েলারির কারখানাগুলোতে৷ বেশ কিছু বাছাই করা গহনা রাখবে দোকানে৷

পরদিন সকাল৷ আচমকা মার্থার উন্মত্ত চিৎকার৷ ওদের ফ্ল্যাট শুধু নয়, আশেপাশের প্রতিবেশীরাও ছুটে এল৷

মার্থা পাগলিনীর মতো টান মেরে মেরে জিনিসপত্র বের করে ফেলছে আলমারি থেকে আর চিৎকার করছে,—কোথায় গেল? কোথায় গেল?

গতকালের দশ হাজার ডলার অদৃশ্য! বাড়ি থেকে উধাও ওর নেশাসক্ত বড় ছেলেও৷

এর পরদিনই আবার মর্মান্তিক আঘাত৷ বড় ছেলেকে কে বা কারা নৃশংসভাবে খুন করে ফেলে রেখে গেছে মিয়ামির সমুদ্রতটে৷

মার্থার চোখের জল শুকিয়ে গেছে৷ সমস্ত অন্তরাত্মা জুড়ে জ্বলছে দাউদাউ চুল্লি৷

এই শয়তানদের খুঁজে বের করতে হবে! প্রতিশোধ নিতে হবে, ওদের ঝাড়েবংশে নিকেশ করতে হবে৷

কয়েকদিন পরেই আলেক্স পন্স্ হঠাৎ মার্থাকে ডেকে বললেন,—দেখো, তোমার টাকা গেছে, ছেলেও গেছে! খুবই দুঃখের, সন্দেহ নেই৷ কিন্তু আমি তো অনন্তকাল বসে থাকতে পারব না৷ আমার টাকাটা ফেরত চাই৷ তুমি এক কাজ করতে পারো, কিছু টাকা এখন দাও৷ বাকিটা আমার দোকানে দেখভাল করে তার মাইনে বাবদ মাসে মাসে কাটা যাবে৷

বিপর্যস্ত, অসহায় মার্থা! চারিদিকে শুধুই নিকষ অন্ধকার৷

পন্স্-এর দোকানে আসত ওর বন্ধু রোমারিও মার্টিনেজ৷ এই সময়ই মার্টিনেজ মার্থাকে বলল,—আমি তোমাকে হাজার পাঁচেক এখন দিতে পারি৷ তবে দোকানটা বন্ধক রাখতে হবে৷

নিরুপায় মার্থার রাজি হওয়া ছাড়া উপায় কী!

একদিন সকালবেলা৷ মার্থা আলেক্সের দোকান সাজাচ্ছে, ঝাড়পোঁছ করছে৷ দোকান খুলবে৷

হঠাৎ—ও কী! মার্থার চোখদুটো স্থির হয়ে গেল৷ দোকানের পিছনে সিন্দুকের ওপরে কতকগুলো পলিথিনের ব্যাগ৷ ব্যাগভর্তি সাদা গুঁড়ো৷

এ তো সেই গুঁড়ো, যা মার্থা পেয়েছিল ছেলের প্যান্টের পকেট থেকে৷

মার্থার সর্বাঙ্গ ঝিমঝিম করতে থাকে৷ কাঁপতে কাঁপতে মার্থা বসে পড়ে মেঝেয়৷

কয়েক মিনিট কেটে যায়৷ মার্থার মাথাটা আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে আসে৷ তার কাছে এখন জলের মতো স্বচ্ছ সবকিছু৷

যা ভেবেছিল, তাই৷ কয়েকদিন পরই মার্থা জানতে পারল, টেক্সাসে রোমারিও মার্টিনেজ গ্রেপ্তার হয়েছে নিষিদ্ধ মাদক বিক্রি করতে গিয়ে৷

ঠিক সেইদিনই এক মহিলাকণ্ঠের ফোন৷ সে বলল,—আমি মার্টিনেজের বান্ধবী৷ মার্টিনেজের টাকা এখনই শোধ করতে হবে৷ মার্টিনেজ হাজতে৷ জামিনের টাকা দরকার! নতুবা আমরা যেভাবে বলব, সেভাবে তোমায় কাজ করতে হবে৷

অসহ্য রাগে মার্থার শরীরে অগ্নিতরঙ্গ৷ শয়তান! নরকের কীট! ওর ছেলেকে শেষ করে, ওর সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে ওরা ওকে ফাঁদে ফেলেছে! এবার টানছে দলে!

পরক্ষণেই সে নিজেকে ঠান্ডা করে, উহুঁ! উত্তেজিত হয়ে লাভ নেই৷ শান্তকণ্ঠে জানায়,—আমাকে একটু ভেবে দেখতে দিন৷

পরদিন আবার ফোন৷ মার্থা ততক্ষণে মনস্থির করে ফেলেছে৷ জানায় সে,—ঠিক আছে৷ আমাকে কী করতে হবে বলুন৷...

হ্যাঁ, এই সেই মার্থা টোরেস, যাকে সম্পূর্ণ অন্য চেহারায় কাহিনীর গোড়াতেই দেখেছি মিয়ামির অভিজাত রেস্তোরাঁয়৷ মাদকের একজন মাতব্বরের সঙ্গে দরদস্তুর, হিসেব-নিকেশ করতে৷ এর মধ্যে অবশ্য কয়েকটা বছর গড়িয়ে গেছে৷ শেষ হতে চলেছে ১৯৮৩ সাল৷

এবার আমরা রেস্তোরাঁতেই ফিরে যাই৷

খানাপিনা চলেছে, চলেছে তরল হাস্যপরিহাস৷ পানীয়তে চুমুক মেরে এড্ওয়ার্ডো মেরা সরসকণ্ঠে বললে,—সত্যি মার্থা, আমরা আগে ভাবতেও পারিনি, তুমি এই কাজ এত ভালোভাবে করতে পারবে৷

সবকিছু কি আগে থাকতে ভাবা যায়? ভবিষ্যৎ কি কেউ বলতে পারে?—চোখ ঘুরিয়ে মার্থা বলে৷

ঠিক বলেছ৷—মেরার কণ্ঠস্বর ঈষৎ জড়িত : তোমার সঙ্গে কথাবার্তায় আমি খুব খুশি৷ সঙ্গে করে আমরা কুড়ি লক্ষ ডলারের হেরোইন নিয়ে এসেছি৷ ওগুলো তুমি স্টক করে বিক্রির ব্যবস্থা করো৷ আরও স্টক পাঠাচ্ছি৷ আর হ্যাঁ—

একটু থেমে এডওয়ার্ডো বলে,—আমাদের সর্বাধ্যক্ষ মানে বস তোমার সঙ্গে দেখা করতে খুব ইচ্ছুক৷ তোমার যদি আপত্তি না থাকে তো, আগামী ১৩ই জানুয়ারি উনি তোমার সঙ্গে দেখা করবেন৷

সানন্দে! এ আমার সৌভাগ্য৷—মার্থার চোখ দুটো চকচক করে উঠল৷ বলল,—কী নাম আমাদের বসের?

মিটিমিটি হাসল এডওয়ার্ডো,—দেখা হলেই জেনে নিও৷ আর তাছাড়া নাম তো ওনার একটা নয়! কোনটা বলব?

১৩ জানুয়ারি, ১৯৮৪৷ মিয়ামির সেরা হোটেলের কাফে-রুমে মার্থা টোরেস অপেক্ষারত৷ আলো-আঁধারি পরিবেশ৷

কাঁটায় কাঁটায় ঠিক ছ’টায় সামনের স্যুইং ডোর ঠেলে প্রবেশ করল এডওয়ার্ডো মেরা৷ আর ঠিক তার পিছনেই কালো স্যুট পরা—

বিস্ময়ের ধাক্কায় সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মার্থা৷ দু-চোখ বিস্ফারিত!

গুড ইভ্নিং৷—বলতে বলতে ‘বস’ যখন সামনের সোফা টেনে বসে পড়ল, তখনও মার্থার কথা বলার শক্তি নেই৷

‘বস্’ আর কেউ নয়, মার্থার একসময়ের ‘বন্ধু’ আলেক্স পন্স্!

আলেক্সের মুখে মৃদু হাসি,—যাক্! চিনতে পেরেছ তাহলে! বলো, কেমন আছ?

মার্থা ততক্ষণে নিজেকে ফিরে পেয়েছে৷ মুখে হাসি ফুটিয়ে সে বলে,—ফাইন! মার্থা কখনো খারাপ থাকে না৷

গুড গার্ল!—আলেক্স বলে : তোমার স্বামীর ব্যাপারটার জন্যে আমরা দুঃখিত৷ একটা ভুল বোঝাবুঝি...তাছাড়া কি জানো, এই ওয়ার্ল্ডে ওইসব সেন্টিমেন্ট—

লিভ্ ইট্৷—মার্থা জবাব দেয় : আমি ওসব নিয়ে ভাবি না৷ জীবনটা তো উপভোগের জন্যেই৷ স্বামী-ছেলে সব প্রিমিটিভ ব্যাপার, তাই না!

কথাবার্তা চলার মাঝেই ওয়েটাররা টেবিলে পানীয়ের গ্লাস ও স্ন্যাক্স্ সাজিয়ে দিয়ে গেছে৷ পন্স্ ইশারা করে,—নাও, শুরু করা যাক্৷

টেবিল থেকে মার্থা ন্যাপকিনটা তোলে হাতমুখ মুছতে৷ হঠাৎ ওর হাত ফসকে ন্যাপকিনটা পড়ে যায় আলেক্সের উরুতে৷

মার্থা মাথা নিচু করে,—এক্সট্রিমলি স্যরি৷

ঠিক তখনই অবিকল ভোজবাজির মতো ওদের চতুর্দিকে এসে ঘিরে দাঁড়ায় কয়েকজন রিভলবার হাতে মানুষ,—হ্যান্ড্স্ আপ্!

তিনজনই হতচকিত! হাত তুলে উঠে দাঁড়ায়৷ আলেক্স বলে,—তোমরা কারা? কী চাও?

চাই তোমাদের!—বলতে বলতে দলের নেতা পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে টেবিলে ফেলে : আমরা সরকারের ড্রাগ কন্ট্রোল দপ্তরের ডিটেকটিভ৷ অল অফ ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট৷

আলেক্স ও এডওয়ার্ডোর ব্যাগ থেকে বেরোল পঞ্চাশ লক্ষ ডলারের মাদক—হেরোইন৷ আর ওই দুজনের হোটেলের ঘর তল্লাসি করে পাওয়া গেল আরও কয়েক কোটি ডলারের নিষিদ্ধ মাদক!

মাদক চোরাচালানের ঘটনার এইখানেই ইতি৷ ঝাড়েবংশে তছনছ হয়ে গেল আলেক্স পন্স্ ও এডওয়ার্ডো মেরার নিষিদ্ধ সাম্রাজ্য৷ গোয়েন্দা পুলিশের জেরার মুখে ধরা পড়তে লাগল এক একটা এলাকার বড়-ছোট-মাঝারি সব চাঁই পাচারকারী৷

কিন্তু এই মার্থা টোরেসের ব্যাপারটা কী? ছেলে খুন, টাকা লোপাট এবং তারপর তার নিষিদ্ধ জগতে জড়িয়ে পড়ার মধ্যে কিন্তু কিছু ফাঁক থেকে গেছে৷ সেটা বরঞ্চ শোনা যাক্ মার্থার জবানিতেই৷

‘আমার কাছে সব যখন পরিষ্কার হয়ে গেল, তখন আমার মাথায় জ্বলে উঠল প্রতিশোধের আগুন! এদের কাউকে আমি ছাড়ব না৷ পুলিশকে দিয়ে সবক’টাকে জেলে পাঠিয়ে মারব৷

‘মেজো ছেলে জর্জকে নিয়ে সেদিনই খুব গোপনে গেলাম গোয়েন্দা পুলিশের দপ্তরে৷ দুর্ভাগ্য, প্রথমে কেউই আমায় পাত্তা দিলেন না৷ আমিও আমার জেদে অটল! আমাকে এঁদের বোঝাতেই হবে৷ সোজাসুজি ঢুকে গেলাম গোয়েন্দাপ্রধান জনসনের কাছে৷ তাঁকে খুলে বললাম সব৷ আমার মর্মান্তিক বিপর্যয়ের কাহিনী৷ ঠান্ডা মাথায় তিনি সব শুনে ড্রাগ কন্ট্রোল শাখার প্রধানকে ডাকলেন তাঁর চেম্বারে৷ সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনায় স্থির হল, আমি ওদের দলে মিশে যাব৷ পুলিশ হাতে পেলেও আমায় ছোঁবে না৷ আবার কোনওরকম সাহায্যও করবে না৷ সে ঝুঁকি পুরোটা আমার৷

‘শুরু হল আমার কাজ৷ ধীরে ধীরে আমি সামান্য পাচারকারী থেকে হয়ে উঠলাম ডিস্ট্রিবিউটর৷ তবে হ্যাঁ, আমি নিজে ওই বস্তু কখনো সাপ্লাই করিনি৷ যখনই বিক্রির জন্যে আমাকে ও জিনিস দেওয়া হয়েছে, আমি সোজা নিয়ে জমা দিয়েছি পুলিশের কাছে৷ অবশ্যই সবার আড়ালে৷ জনসন নিজের বিশেষ অ্যাকাউন্ট থেকে ওর পরিবর্তে টাকা আমায় দিতেন৷ মাদক বিক্রি না করেই ‘বস’দের কাছে হয়ে উঠলাম সবচেয়ে কাজের ‘মেয়ে’!

‘হ্যাঁ, এর মধ্যেই আমার জীবনে আবার নেমে ভয়াল দুর্যোগ৷ আমাকে একদিন ওদের লোক দেখে ফেলল পুলিশের দপ্তর থেকে বেরোতে৷ ওরা সঙ্গে সঙ্গে ধরে নিল, আমি বেইমানি করেছি৷ সেই রাতেই খবর পেলাম, ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণে আমাদের বাড়ি উড়ে গেছে৷ আমার স্বামী সেসময় বাড়িতেই ছিলেন৷

‘আমার মনের অবস্থা? নাঃ৷ বোঝাতে পারব না! কোনদিকে আমার চিন্তা নেই৷ অহর্নিশ মস্তিষ্কে হাতুড়ি পিটছে শুধু একটাই কথা—প্রতিশোধ! প্রতিশোধ চাই!

‘আমার এটুকু ভাগ্য, পুলিশ আগেই আঁচ করে আমার ছেলেমেয়েদের সরিয়ে নিয়ে গোপন ডেরায় রেখেছিল৷ স্বামীকেও বলেছিল৷ তিনি রাজি হননি৷

‘খবরটা পেয়েই আমি সঙ্গে সঙ্গে ফোন করি এডওয়ার্ডোকে৷ সে ‘বেইমানি’র ইঙ্গিত করতেই আমি ঝাঁঝাল গলায় চেঁচিয়ে বলি,—আমার ছেলে মেয়েদের পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে সন্দেহ করে! আমাকেও নিয়ে গেছিল জেরা করতে৷ আর তোমরা কিনা—

‘মেরা ফোনেই মাপ চায়৷ বলে,—সরি, সরি৷ মিসফায়ার হয়ে গেছে৷ ক্ষমা করে দাও!

‘এরপর মেরার সঙ্গে আমার মিয়ামিতে দেখা হয়৷ তখনই ঠিক হয়, বসের সঙ্গে দেখা করার ব্যাপারটা৷

‘আর হ্যাঁ, আলেক্সের সঙ্গে শেরাটনে বসে আমি ইচ্ছে করেই ন্যাপকিনটা ফেলে দিয়েছিলাম৷ ওটা ছিল সাদা পোশাকের গোয়েন্দাদের কাছে আমার সিগন্যাল৷

‘আমার সব গেছে৷ স্বামী পুত্র বাড়িঘর সব৷ আমি একেবারে নিঃস্ব, সর্বস্বান্ত৷

‘তবু বিশ্বাস করুন, এখন আমি সুখী, আমি তৃপ্ত৷ আমি পেরেছি ওই নরকের কীটদের ধবংস করতে৷ আমি জানি, আর কোনও বাবা-মাকে আমার মতো সব হারাতে হবে না৷ মরণকীটের কামড়ে অকালে ঝরে পড়বে না আধফোঁটা নিষ্পাপ ফুলেরা৷

আমি এখন রাতে ঘুমোতে পারি৷ আমি খুব ভালো আছি৷’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%