ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়

ফিলাডেলফিয়া হাসপাতালের ল্যাবরেটরি৷ বিকার, ফানেল, টেস্টটিউব, স্ট্যান্ড, বার্নার সারি সারি সাজানো৷ একপাশে ছড়ানো ছিটোনো ফাইল খাতার স্তূপ৷
সেই স্তূপের মধ্যে মাথা ঝুঁকিয়ে হিসেবনিকেশে মগ্ন একজন মানুষ৷ দেখতে সুদর্শন হলেও চেহারায় অযত্নের ছাপ স্পষ্ট৷ একমুখ খোঁচা খোঁচা দাড়ি গোঁফ, চুল৷
মানুষটির কোনও দিক খেয়াল নেই৷ একমনে কাগজের উপর আঁকিবুকি কাটছেন৷ রসায়নের সব ফর্মূলা লিখছেন, কাটছেন আবার লিখছেন৷ মাঝে মাঝে অস্থিরভাবে মাথা ঝাঁকাচ্ছেন৷ আবার ঝুঁকে পড়ছেন কাগজের ওপর৷
—স্যার, নতুন এই বোতলটা রেখে গেলাম৷
কে—কে—অ্যাঁ?—চমকে উঠে সহকারীর দিকে তাকাতে সংবিত ফেরে মানুষটির : ও তুমি! হ্যাঁ-হ্যাঁ, রেখে যাও৷ ভালো কথা, ওতে সোডিয়াম সাইট্রেট পরিমাণমতো মিলিয়েছ তো?
—হ্যাঁ স্যার৷
—ঠিক আছে৷
দৃষ্টিকে আরেকটু প্রখর করলে চোখ পড়ে, ওই ল্যাবরেটরির একদিকে তাকে পরপর বোতল সাজানো৷ প্রায় প্রত্যেক বোতলেই গাঢ় লাল তরল ভর্তি৷
ওই তরল আর কিছুই নয়, মানবদেহের প্রাণরস—রক্ত!
আমাদের এ কাহিনীর নায়ক ম্যাক্স স্টুমিয়া বহুদিন ধরে এই প্রাণরস নিয়ে গবেষণায় ডুবে আছে৷
কিছুদিন আগে আরেক বিজ্ঞানী লুইস অ্যাগট এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করে সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীসমাজে তোলপাড় তুলেছেন৷ সেই আবিষ্কারের আগে কেউ জানত না, কীভাবে রক্ত সংরক্ষণ করা যায়৷ রক্ত কোনও শরীর থেকে বের করে রাখতে গেলেই জমাট বেঁধে যেত৷ তাই কারও শরীরে রক্ত দেবার প্রয়োজন হলে রক্তদাতা ও গ্রহীতাকে পাশাপাশি শুইয়ে একজনের দেহ থেকে সরাসরি অন্যজনের দেহে সঞ্চারিত করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না৷
লুইস অ্যাগটের এই আবিষ্কারের ফলে সে সমস্যার সমাধান হয়েছে৷ তবে অন্য বেশ কিছু সমস্যা থেকেই গেছে৷
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তরল রক্ত রোগীর দেহে প্রবেশ করলে তা জমাট বেঁধে যাচ্ছে৷ কিংবা হয়তো মুমূর্ষু ব্যক্তির ব্লাড গ্রুপ জানা নেই৷ সেসময় রক্ত-সারণী পরীক্ষা করে রক্ত দিতে দিতে রোগীর প্রাণপাখি খাঁচাছাড়া হয়ে যায়৷ যুদ্ধক্ষেত্রে বা দুর্ঘটনাস্থলে এরকম ব্যাপার হামেশাই ঘটে থাকে৷
এ সমস্যার মোকাবিলা করা যায় কেমন করে?
ম্যাক্স স্টুমিয়া এই সমস্যা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বেশ কয়েক বছর ধরে৷...
ম্যাক্স একটা বিষয় পরিষ্কার বুঝেছেন রক্তের ‘প্লাজমা’ অংশ, যার মধ্যে রয়েছে তার মূল উপাদান শ্বেত ও লোহিত কণিকা, তাকে যদি রক্ত থেকে আলাদা করে ফেলা যায়, একমাত্র সেক্ষেত্রেই এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব৷
কারণ এই ‘প্লাজমা’ বা ‘রক্তরস’ সব মানুষেরই এক৷ ব্লাড গ্রুপ মেলানোর দরকার নেই৷ তাছাড়া রক্তাল্পতা হলে এই রক্তরসকে যদি শরীরে প্রবেশ করানো যায়, তবে এই রস নিজেই রক্ত বানিয়ে নিতে সক্ষম৷...
পৃথিবীর ওপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে৷ নাৎসী বাহিনীর ‘ফুয়েরার’ হিটলারের রণহুঙ্কারে শিউরে শিউরে উঠছে পৃথিবীর মানুষ৷ আর কতদিন ঠেকিয়ে রাখা যাবে যুদ্ধ, কে জানে৷
ম্যাক্স স্টুমিয়া ফিলাডেলফিয়া হাসপাতালের গবেষণাগারে স্বেচ্ছাবন্দী৷ দেশ-কাল সবকিছু থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন৷ নিরবচ্ছিন্ন সাধনায় নিমগ্ন৷
সহসা একদিন জ্বলে উঠল আলো৷
ম্যাক্স নিশ্চিত—তিনি সফল হয়েছেন৷ রক্তরসকে রক্ত থেকে বিচ্ছিন্ন করা গেছে৷
এবার এই পদার্থটিকে কীভাবে প্রয়োগ করা যায়? গিনিপিগের ওপর তিনি এই রস সঞ্চারিত করে দেখেছেন, তারা বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷
কিন্তু মানুষের শরীরে একে প্রবেশ না করানো অব্দি নিশ্চিত তিনি হবেন কী করে? এ সাফল্যের দাবিও তো করতে পারবেন না ম্যাক্স৷
হাসপাতাল ভর্তি রোগী৷ অনেকেরই রক্ত প্রয়োজন৷ স্টুমিয়া জনে জনে গিয়ে শুধান, একবার কী ওই তরল শরীরে প্রবেশ করিয়ে দেখবেন? রক্তের বিকল্প হিসাবে?
সজোরে ঘাড় নাড়ে রোগীরা, না—না৷ পাগলের পাল্লায় পড়ে জান খোয়াব নাকি!
এমনকী মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর আত্মীয়স্বজনও রাজি হয় না৷ সিধে বলে দেয়,—দেখুন মশাই, উনি আপনার গিনিপিগ নন৷ উনি মরছেন, ওঁকে শান্তিতে মরতে দিন৷
সহকর্মী ডাক্তাররাও এ ব্যাপারটা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করতে ছাড়েন না ম্যাক্সকে৷ তাঁরা বলেন,—ম্যাক্স! এই পাগলামি ছেড়ে হাসপাতালের কাজে মন দাও৷
দুর্ভাগ্য, এমন একজন মানুষ কিছুতেই পাওয়া গেল না, যে স্বেচ্ছায় ম্যাক্সের রক্তরস শরীরে নিতে প্রস্তুত৷
চাকরির নিকুচি করেছে! রাগে দুঃখে ক্ষোভে ম্যাক্স ছেড়েই দিলেন হাসপাতালের কাজ৷ সব সম্পর্ক চুকিয়ে বাউন্ডুলের মতো ঘুরতে ঘুরতে একদিন এসে দাঁড়ালেন ব্রাইন মড্ হাসপাতালের গেটে৷
নামের পাশে এত এত ডিগ্রি, সেই ডাক্তার নিজে এসেছেন! হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাদরে টেনে নিলেন ম্যাক্সকে৷
পুরনো কাগজপত্র নিয়ে ম্যাক্স আবার নতুন করে শুরু করলেন৷
এক সমস্যা৷ ওই রক্তরস শরীরে ঢোকাতে কেউ রাজি নয়৷
এইসময় এই অঞ্চলে ভয়ানক এক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটল৷ ছড়িয়ে পড়ল মহামারী হয়ে৷ এই রোগে শরীরের রক্ত বিষিয়ে যায়৷ দূষিত রক্ত বার করে তাজা রক্ত শরীরে সঞ্চারিত করতে গেলেই তা শিরায় জমাট বেধে যাচ্ছে৷ ফল—অবধারিত মৃত্যু৷
রোগটার প্রচলিত নাম—স্কাইরকেটিং৷
ম্যাক্স সুযোগটা নিলেন৷ আক্রান্ত রোগীদের জনে জনে গিয়ে শুধোতে লাগলেন, এই ‘সিরাম’ বা ‘রক্তরস’ তারা দেহে ঢোকাতে রাজি কিনা৷ এতে তাদের মঙ্গল৷ বোতলের রক্তের মতো শিরায় জমাট বেঁধে প্রাণ হারাতে হবে না৷
কাকস্য পরিবেদনা! মৃত্যুপথযাত্রী রোগীরাও কেউ ‘গিনিপিগ’ হতে রাজি নয়৷
সেদিন সকালবেলা৷ রোগীদের ওয়ার্ডে ঝিম মেরে বসে আছেন ম্যাক্স স্টুমিয়া৷ নাঃ! তাঁর সাফল্য প্রমাণ করার সুযোগই আর বোধহয় মিলবে না৷
চোখের সামনে দেখছেন, বেডে সারি সারি শায়িত রোগীদের শরীরে বোতলে করে রক্ত দেওয়া হচ্ছে৷ কয়েক মিনিটের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষগুলোই যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠছে! তারপর ঢলে পড়ছে মৃত্যুর কোলে৷
বাঁ-দিকের বেডে শুয়ে আছে একটি কিশোর৷ একমাথা কোঁকড়া চুল, ফর্সা ফুটফুটে৷ পাশেই দাঁড়িয়ে ওর বাবা-মা৷ মা চোখে হাত চাপা দিয়ে কাঁদছেন, বাবা শক্ত হয়ে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করছেন৷
কিশোর ছেলেটিও স্কাইরকেটিং মারণ রোগে আক্রান্ত৷
ডাক্তাররা এবার এগিয়ে গেলেন ওর দিকে৷ বোতলবন্দী রক্ত ঝোলালেন স্ট্যান্ড থেকে, সিরিঞ্জ বের করে কিশোরের বাঁ-হাত টেনে নিলেন৷
ছেলেটা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে৷ বোধহয় বুঝতে পারছে, এবার ওর চলে যাওয়ার পালা৷
চেয়ারে বসে উত্তেজনায় টানটান স্টুমিয়া৷ উহ্, এ অসহ্য! এরকম নিষ্ক্রিয়ভাবে চোখের সামনে দেখতে হবে মৃত্যুর মিছিল৷
সিরিঞ্জ ঢুকে গেল হাতের শিরায়৷ বোতল থেকে রক্ত পড়ছে টপ্...টপ্...টপ্....
আহ্...মা গো!—যন্ত্রণায় চেঁচিয়ে উঠেছে ছেলেটা৷
আবার একই ঘটনা৷ রক্ত শিরায় জমাট বেঁধে যাচ্ছে!
বন্ধ করুন!—উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠলেন ম্যাক্স স্টুমিয়া৷ একলাফে গিয়ে দাঁড়ালেন বেডের সামনে৷
আপনারা ওর বাবা-মা?—রীতিমতো হাঁপাচ্ছেন ম্যাক্স : আমি ‘প্লাজমা’-কে রক্ত থেকে আলাদা করেছি৷ আমি সিওর, এই প্লাজমা দেহে ঢোকালে জমাট বাঁধবে না৷ প্লাজমা থেকেই শরীরে রক্ত তৈরি হয়ে যাবে৷ আমাকে এই রক্তরস ওর শরীরে সঞ্চারিত করার একবার সুযোগ দিন৷ আবার মনে হয় ও জীবন ফিরে পাবে৷
মাথা নাড়লেন বাবা,—না মশাই৷ ফালতু জিনিস আমার ছেলের শরীরে ঢোকাতে দেব না৷
আসলে শুধু উনি নন, এলাকার অনেকেই ম্যাক্সকে ‘পাগল বিজ্ঞানী’ নামে চেনেন৷
কিন্তু ও—নইলে ও যে মারা যাবে!—ম্যাক্স গেঙিয়ে উঠলেন৷
আস্তে বলুন!—রীতিমতো ধমকে ওঠেন বাবা: রোগীর কানের কাছে এসব বলছেন কেন? আপনি-আপনি—
বাবা!—অতিকষ্টে ডান হাত তুলে কিশোর তাঁকে থামিয়ে দেন৷ ছেলেটির সারা মুখ যন্ত্রণায় নীল৷
কী—কী বলছ সোনা?—বাবা-মা দুজনেই ঝুঁকে পড়েন ছেলের মুখের ওপর৷
ওনাকে...আমার ওপর পরীক্ষা...করতে দাও৷—থেমে থেমে অস্ফুট কণ্ঠে বলে কিশোর, প্লিজ, প্লিজ৷
—না—না৷ কী বলছি তুই! ওসব বিষাক্ত জিনিস তোর ওপর—
ছেলেটি সবেগে মাথা নাড়ে! বিড়বিড় করে বলে,—আমি তো জানি...বাঁচব...না৷ তবু যদি উনি পারেন কিছু করতে!
মা হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন৷ কাঁদতে কাঁদতে বলেন,—ওগো শুনছ? খোকা যখন বলছে, তখন ওনাকে একবার সুযোগ দাও না৷
বাবারও দু-চোখে জল টলটল,—বেশ৷ আপনি দেখুন৷...চলো, আমরা বাইরে দাঁড়াই৷
স্ত্রীকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন বাইরে৷
ততক্ষণে ম্যাক্স রক্তের বোতল সরিয়ে ফেলেছেন৷ সেখানে ঝুলিয়েছেন ওই ‘সিরাম’ বা রক্তরস ভর্তি বোতল৷
এবার পরীক্ষা!
বোতলে বুদবুদ উঠছে...রক্তরস শরীরে যেতে শুরু করেছে...
দু-হাত মুঠো ম্যাক্সের, দু-চোখ বিস্ফারিত, মেরুদণ্ড টানটান৷
যাচ্ছে, যাচ্ছে, শরীরে যাচ্ছে সিরাম৷ এখনও জমাট বাঁধছে না৷ কিশোরের মুখে স্বস্তির স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠছে৷
বোতল শেষ হতে চলল...এবার আরেকটা বোতল...৷
ছেলেটির চেহারায় সজীবতা ফিরে আসছে৷ আরামে বুঁজে আসছে তার দু-চোখ৷ সে ঘুমিয়ে পড়ে৷
সফল! ম্যাক্স স্টুমিয়া সফল! পাগলের মতো তিনি ঘুমন্ত কিশোরের কোঁকড়া চুলে বিলি কাটতে লাগলেন, ওর কপালে চুম্বন করতে লাগলেন৷
কেউ এসে পিঠে হাত রাখল৷ চমকে ম্যাক্স দেখলেন, ছেলেটির বাবা৷
বাবা-মা দুজনের চোখ দিয়ে ঝরে পড়ছে অশ্রুবিন্দু৷
এ অশ্রু, সব হারানোর পর সব ফিরে পাওয়ার আনন্দের, গভীর কৃতজ্ঞতার৷...
ম্যাক্স স্টুমিয়ার কাহিনী এখানেই শেষ৷ শুধু উল্লেখ করা যেতে পারে দুটো ব্যাপার৷ প্রথম, এই আবিষ্কার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বহু মানুষকে জীবন ফিরিয়ে দিয়েছিল৷ দ্বিতীয়, সেদিনের সেই রোগাক্রান্ত কিশোর পরে নিজেও এক বিশ্ববিশ্রুত বিজ্ঞানী রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন