একটি কান্নার জন্ম

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

অনিন্দ্যকে কেউ ডাকছে।

খুব হতাশ হয়ে অনিন্দ্য ফিরে আসছিল। ডলির এই ট্রেনে আসবার কথা ছিল। কিন্তু ও এল না। ঘুম তাড়িয়ে এত রাতে স্টেশনে আসাটা বৃথাই গেল তার। মনে মনে রাগ করতে করতে ও ফিরে আসছিল আর ভাবছিল, বাপের বাড়িতে গেলে মেয়েগুলো যেন কীরকম হয়ে যায়। কেন যে এরকম হয়। অথচ অনিন্দ্য এখানে একা। এত রাতে আবার তাকে একা একা ফিরতে হবে সেই নির্জন ঘরে।

গাড়িটা অনেক লম্বা। প্ল্যাটফর্মটা শেষ হওয়ার আগে যেখানে একটু ঢালু হয়ে গেছে সেখানে থেমে একটা সিগারেট ধরাল অনিন্দ্য। পিছন ফিরে স্টেশনটার দিকে তাকাল। নিয়নের আলোয় উজ্জ্বল প্ল্যাটফর্ম, চায়ের ট্রলির ঘড়ঘড় শব্দ আর কুলিদের ধুপধাপ মাল লোড করার শব্দ তার কানে এল। তার খারাপ লাগল। বাঁদিকে গাড়িটা নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে। প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়েও অনেকখানি লম্বা গাড়িটা। গাড়িটাকে নিষ্ঠুর, হৃদয়হীন বলে গাল দিতে ইচ্ছে করছিল অনিন্দ্যর। পরের গাড়ি কাল।

ঠিক এই সময়ে সে টের পেল কেউ তাকে পিছন থেকে ডাকছে। অনিন্দ্য ফিরল। এদিকটায় আলো নেই। তবু অনিন্দ্য বুঝল এগুলো সারি-বাঁধা উঁচু ক্লাসের কামরা।

—একটু শুনবেন? ভাঙা-ভাঙা ভারী গলায় কেউ তাকে ডাকছে।

—হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। অনিন্দ্য এগিয়ে গেল।

ফার্স্ট ক্লাস কামরার দরজায় ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। কামরার ভিতর নীল রঙের মৃদু আলো জ্বলছে। আলোটা ভদ্রলোকের পিছনে। অনিন্দ্য তাঁর মুখ দেখতে পেল না।

ভদ্রলোক ঝুঁকলেন। বললেন, আমার এক্ষুনি একটু মেডিক্যাল হেল্প দরকার। আপনি সাহায্য করতে পারেন? আমার স্ত্রী খুব অসুস্থ।

ভদ্রলোকের গলাটা ভাঙা-ভাঙা, ভারী। অনিন্দ্যর মনে হল, অনেক রাত জেগে, ক্লান্ত হয়ে গলাটা বসে গেছে। অনিন্দ্য পায়ের পাতায় ভর দিয়ে উঁচু হয়ে বলল, নিশ্চয়ই। নিশ্চয়ই সাহায্য করতে পারি। কী করতে হবে বলুন?

—একটা স্ট্রেচার আর অ্যাম্বুলেন্স। এখানে হাসপাতাল আছে আশা করি।

—হ্যাঁ, বড়ো হাসপাতাল। আড়াই মাইল দূরে।

—তবে বন্দোবস্ত করুন। আমি নামাতে পারছি না, এ কামরায় আর কেউ নেই। আমার স্ত্রী একা। খুব অসুস্থ উনি। প্লিজ।

—ঠিক আছে। ব্যস্ত হবেন না। অনিন্দ্য বলল।

—একটু তাড়াতাড়ি। আমাকে এখানেই ব্রেক জার্নি করতে হচ্ছে। কয়েকটা কুলি যদি পাঠিয়ে দিতে পারেন দেখবেন। সময় পাওয়া যাবে তো?

—নিশ্চয়ই। এখানে ট্রেন অনেকক্ষণ দাঁড়ায়।

—বাঁচালেন। কষ্ট দিলাম আপনাকে।

—কিচ্ছু না।

অনিন্দ্য হাসল একটু। সে ভাবল, এর কোনো মানে নেই। ডলি এলে এ ঝামেলায় পড়তে হত না। কবজি উলটে ঘড়িটা দেখল সে। রাত দেড়টা। নিজের ভাগ্যকে ধিক্কার দিয়ে অনিন্দ্য এগিয়ে এল। কিন্তু সে আশ্চর্য হয়ে অনুভব করল, একটু আগে যেরকম ক্লান্ত লাগছিল, এখন আর ততটা লাগছে না। এখন সে চটপট এগিয়ে যেতে পারছে। কারোর জন্য কিছু করতে পারছে না। এ অনুভূতিটাই হয়তো কাজ করছে ভিতরে ভিতরে। অনিন্দ্য হাসল। আজকাল সে কোনো কাজেই খুব একটা বিরক্ত হয় না। কিছুদিন আগে খবর পেয়েছে, তার একটি ছেলে হয়েছে।

ওভারকোটটা গলার কাছটাতে কুটকুট করছিল। অনিন্দ্য একটা বোতাম খুলে দিল। টুপিটাকে নামিয়ে আনল প্রায় চোখের উপর। ডলিকে দেখবে, ছেলেটাকে দেখবে— আজ না হয় কাল। অনিন্দ্য আপনমনেই হাসল। তার পায়ের গতি বাড়ল। ছেলেটা কেমন হয়েছে কে জানে। ডলি লিখেছে, 'তুমি আসবে বলেছিলে। এলে না কেন?' তারপর লিখেছে, 'বাচ্চাটা ঠিক তোমার মতো। খুব হাত-পা ছোড়ে। ভীষণ চঞ্চল। তোমার মতো।' দুটো হাত পাখনার মতো দোলাতে দোলাতে অনিন্দ্য স্টেশনের দিকে এগিয়ে চলল। ডলি বানিয়ে লিখেছে— অনিন্দ্য ভাবল। গল্প বানাতে সে যা ওস্তাদ। অতটুকু ছেলে কখনো হাত-পা ছোড়ে? কিংবা ছুড়তেও পারে, অনিন্দ্য ঠিক জানে না। আজ ডলি এলে বেশ হত। তার বদলে কোনও এক উটকো ভদ্রলোকের স্ত্রী ট্রেনে যেতে যেতে খামোখা রাস্তায় অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অনিন্দ্য মাথা নাড়ল— না এর কোনও মানে নেই। হায় ঈশ্বর, আমাদেরও এরকম হতে পারত। আমার আর ডলির। ভাগ্যিস হয়নি।

অনিন্দ্য স্টেশনমাস্টারের ঘরে ঢুকল। অনুমতি নিয়ে ফোনটা তুলে কানে লাগাল।

তা-ই বলো!— এতক্ষণে ব্যাপারটা বুঝতে পারল অনিন্দ্য। বুঝে মনে মনে খুব একচোট হাসল সে।

রেলের লোকেরা একটা স্ট্রেচার ইতিমধ্যে জোগাড় করে এনেছে। কামরাটার সামনে একরাশ কৌতূহলী লোক ভিড় করে দাঁড়িয়েছে যারা এতক্ষণ প্ল্যাটফর্মের এখানে-ওখানে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে-বসে ছিল। কম্বল-ঢাকা দেহটাকে ধরাধরি করে নামানো হল, তারপর বয়ে নিয়ে গেল ওয়েটিং রুমের দিকে।—মালপত্রগুলো নামানো হয়ে গেছে। কামরাটা শেষবারের মতো ভালো করে দেখে নিয়ে ভদ্রলোক নেমে এলেন। প্রসারিত হাতে অনিন্দ্যর হাত দুটো নিয়ে ঝাঁকানি দিলেন জোরে। বললেন, অনেক ধন্যবাদ।

এবার অনিন্দ্য হাসল—তাহলে আপাতত আপনি নিরাপদ।

ভদ্রলোক লজ্জা পেলেন—হ্যাঁ যতক্ষণ না—

—সে তো বটেই। উইশ ইউ গুড লাক।

—কিন্তু—

অনিন্দ্য চলে যাওয়ার জন্যে ঘুরেছিল। আবার ফিরল। বলল, কী?

—ভাবছি, আমি তো এখানকার রাস্তাঘাট কিছুই চিনি না। জরুরি ওষুধপত্রের দরকার হলে এত রাত্রে কোথায় যে পাওয়া যাবে।

এ কথাটা আগেই ভাবা উচিত ছিল—অনিন্দ্য ভাবল। অনিন্দ্য মাথাটা এধারে- ওধারে দোলাল।

এই প্রথমবার পিতা হতে চলেছেন ভদ্রলোক। মাথা ঠিক রাখা মুশকিল এ সময়টাতে। নিজেকে এ ব্যাপারে খুব অভিজ্ঞ মনে হল। অনিন্দ্য মুচকি হাসল। নিজেকে খুব খুশি-খুশি লাগছে তার। আমি তো সিনিয়র— অনিন্দ্য ভাবল— হ্যাঁ অনেক সিনিয়র।

—আমি যাব। চলুন। অনিন্দ্য বেপরোয়াভাবে বলল, আমার নাম অনিন্দ্য মজুমদার। আপনার নাম?

—ধন্যবাদ। আমার নাম বিদ্যুৎ বসু। কিন্তু আপনি আবার কষ্ট করে—

—উপায় কী? তা ছাড়া আমি এখানে একা থাকি— বাড়িতে ভাববার কেউ নেই। চলুন।

—হয়তো দরকারই হবে না।

—হবে। এখানকার রাস্তাঘাট আমার চেনা। চলুন। ওরা এগোল।

অনিন্দ্য এগিয়ে যাচ্ছিল। ভদ্রলোক পিছিয়ে পড়ছিলেন। অনিন্দ্য পিছন ফিরে বলল, আসুন। তাড়াতাড়ি।

—অ্যাম্বুলেন্স তো এখনও আসেনি।

—না, কিন্তু আসতে কতক্ষণ?

ভদ্রলোক তাড়া দেখে হাসলেন। অনিন্দ্য হাসল না। সে ভাবল অতটা নিশ্চিন্ত থাকা ভালো না। যতদিন খবর পায়নি ততদিন একটা রাতও সে ঘুমোতে পারেনি, তারপর টেলিগ্রাম পাওয়ার পর রোজ ডবল করে ঘুমিয়েছে। হুঁ, ডলি নিশ্চয়ই এবার মোটাসোটা গিন্নিগোছের হয়ে উঠবে। এতদিন হেসে-খেলে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে বেশ ছিল, কিন্তু এখন সে মা, সত্যিকারের মা। আর অনিন্দ্য নিজে আস্ত একটা বাবা। নিজে নিজেই হাসল অনিন্দ্য। অ্যাঁ— বাবা বলে ডাকল নাকি ছেলেটা? সত্যি? দুর, ভাবতেও কেমন লাগে। আর ডলি কী বলবে তাকে? খোকার বাবা? না অতটা সাহস পাবে না। কারণ তাহলে সে-ও উলটে তাকে খোকার মা বলে ডাকতে পারে।

ডলির এ গাড়িতে আসা উচিত ছিল— অনিন্দ্য ভাবল। আর ভাবতে ভাবতেই ভদ্রলোকের পাশাপাশি ওয়েটিং রুমে ঢুকল সে। ওয়েটিং রুমের দেওয়ালের বিরাট আরশিটায় দু'জনের প্রতিবিম্ব পড়ল। দু'জনেই পাশাপাশি দাঁড়াল, দু'জোড়া চোখ একই সঙ্গে গিয়ে পড়ল মেঝেতে রাখা স্ট্রেচারের উপর।

স্ট্রেচারের উপর ঘন নীল রঙের কম্বলে ঢাকা একটি ক্ষীণ দেহ। বিশীর্ণ একটা সাদা হাত কম্বলের বাইরে। ঘন নীলের উপর সাদা হাতটাকে অদ্ভুত দেখাচ্ছে। মুখটা খোলা এলোমেলো চুল-সিঁদুরের মাখামাখি। চোখ দু'টো বোজা— একটা গভীর যন্ত্রণার ছাপ মুখে। ফরসা গালের উপর টিকোলো নাকটার ঠিক পাশেই একটা কালো কুচকুচে আঁচিল।

বহুদিন কেটে গেছে, তবু ভুল হল না অনিন্দ্যর।

কেউ যেন তাকে একটা ঝাঁকানি দিল। তারপর তাকে স্থির করে দিল। সে পাথরের মতো স্থির হয়ে রইল। কতকগুলো অদ্ভুত স্পর্শ আর শব্দকে সে স্থির হয়ে যেন অনুভব করল। আলোগুলো লাল, নীল, সবুজ হয়ে দোল খেল। সে চোখ বুজল। চোখ খুলল।

অনিন্দ্যর ভুল হয়নি, হতে পারে না। সে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। দাঁড়াতে হল, নইলে সে পড়ে যেত। কেউ যেন তার মুখে আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছে। আঙুলগুলো লম্বা, নরম, সুগন্ধি। কেউ তার বুকে হাত রাখল, মাথা রাখল। একটা অস্পষ্ট দুর্বোধ্য গন্ধ। অস্বস্তিকর। 'আমি মরে যেতাম', অনিন্দ্য আপনমনে বলল, 'আমি মরে গিয়েছিলাম। এখনও আমি মরে যেতে পারি।' অনিন্দ্য নিশ্বাস টানল জোরে। চোখের সামনে আলোগুলো যেন নিভে গেছে।

কিন্তু অনিন্দ্য সোজা হয়ে দাঁড়াল। বিদ্যুৎ তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। অনিন্দ্য হাসল। হাসিটা কান্নার মতো দেখাল। ভদ্রলোক চঞ্চল হলেন। একটা হাত রাখলেন অনিন্দ্যর কাঁধে। বললেন, কী?

—প্রেশার। উত্তর দিল অনিন্দ্য।

—তাহলে—

—কিছু না, এরকম হয় আমার মাঝে মাঝে।

একজন এসে খবর দিল অ্যাম্বুলেন্স এসে গেছে। বিদ্যুৎ বললেন, এক মিনিট।

উনি বাথরুমে গেলেন। অনিন্দ্য তাকাল। টানা টানা দুটি চোখের ক্লান্তি আর যন্ত্রণার নয়। কিছু দেখছে না সুধা, কিছু শুনছে না। ঠোঁট দুটো সাদা, দৃঢ়বদ্ধ। যে যন্ত্রণার সঙ্গে যুদ্ধ করছে। অনিন্দ্য আরও ঝুঁকল, হাত বাড়িয়ে সে সুধাকে এখন ছুঁতে পারে। সে তাকাল। নীল রঙের কতকগুলো শিরা দেখা যাচ্ছে সুধার গালে কপালে। 'বড় রোগা হয়ে গেছ তুমি, বড় রোগা, অনিন্দ্য ভাবল, তবু বেঁচেই আছ। কিন্তু আমি মরতে চেয়েছিলাম। পুরো চার দিন আমি অজ্ঞান হয়ে ছিলাম। আমি বিষ খেয়েছিলাম। সুধা, বেঁচে থাকাটা কী অদ্ভুত! বেঁচে না থাকলে তোমাকে দেখতাম না।'

ভদ্রলোক বাথরুম থেকে এ ঘরে এলেন। অ্যাম্বুলেন্সের লোকেরা এল।... ওরা ধরাধরি করে সুধাকে তুলল। অনিন্দ্য বলল, চলুন।

—হ্যাঁ।

কিছু বলতে হবে ভেবে অনিন্দ্য বলল, কোথায় যাচ্ছিলেন এ অবস্থায়?

—মরিরানি যাচ্ছি। সরকারি চাকরি, না গিয়ে উপায় ছিল না। বাড়িতে ওকে দেখবারও কেউ ছিল না। কিন্তু এরকম হবে যদি জানতাম তবে ছুটি নিতাম নিশ্চয়ই।

—ঠিক। তবু সাবধান হওয়া ভালো ছিল।

ভদ্রলোক কোনও উত্তর দিলেন না। ওরা পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

হাসপাতালের চত্বরটা ওরা পাশাপাশিই পার হল। ট্রলিতে করে সুধার দেহটাকে নিয়ে গেল ওরা মেটারনিটি ওয়ার্ডের দিকে। ডাক্তার-নার্স ব্যস্ত হয়ে ঘুরেফিরে দেখে গেল। ওরা এল, গেল। অনিন্দ্য আর বিদ্যুৎ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল। বিদ্যুৎ চুপ, গম্ভীর। তার মুখটা থমথম করছে, অনিন্দ্য বলল, আপনাকে ওদের দরকার হবে। আপনি যান, আমি আছি। এখানেই।

—রাত ক'টা?

—আড়াইটে।

উনি চলে গেলেন। বারান্দাটা অন্ধকার। কয়েকটা বেঞ্চ পাতা। অনিন্দ্য এগিয়ে গেল। সিঁড়ি ভাঙল গুনে গুনে। সামনে যে বেঞ্চটা পেল তাতেই বসল।

অনিন্দ্য একা। হাসপাতালের খোলা বারান্দাটা ফাঁকা। শীতটা ভয়ংকর। একটা কুকুর কাঁদল। একবার, দুবার...। অনিন্দ্য হেলান দিল দেয়ালে। তার মনে হল, তার ঘুম পাচ্ছে— অনেকদিন আগে ব্রোমাইড খেয়ে যেমন ঘুম পেয়েছিল। অনিন্দ্য আপনমনেই বলল, 'তুমি পালিয়ে গেলে, হারিয়ে গেলে, মরে গেলে। আমি ছিলাম। কিন্তু সে কি থাকা? তাকে কি অস্তিত্ব বলে? তুমি কী বলো? সারাজীবনে তুমি কাউকে তেমন করে চেয়েছিলে কি না জানি না। সে অভিজ্ঞতা না থাকলে তুমি বুঝবে না আমার কী হয়েছিল। আমার ভয়ংকর রোগ হয়েছিল, সে রোগের নাম সুধা। তুমি আমাকে শিখিয়ে গেলে তোমার নাম, আর জানিয়ে গেলে তুমি ধরাছোঁয়ার কত বাইরে। আমি বোকা। বোকারা এভাবেই ঠকে। নইলে তুমি যা ভেবেছিলে, তুমি তো তা নও। এই তো তুমি, অত্যন্ত সাধারণ এক ভদ্রলোকের স্ত্রী, প্রথমবার মা হতে যাচ্ছ। আর আমি তোমাকে দেখলাম। কিন্তু তখন আমার রোগ হয়েছিল। যেরাতে তুমি আমার সঙ্গে চলে যেতে চেয়েছিলে, তার আগের রাতেই তুমি হঠাৎ হারিয়ে গিয়েছিলে আমার জীবন থেকে। চিরদিনের জন্যে। আমিও পালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম পৃথিবী থেকেই। কিন্তু বাবা টের পেয়ে গেলেন। মা, বাবা, ঠাকুমা— সবাই আমাকে পাহারা দিতেন। তারপর আমি মরতে চেয়েছিলাম। পুরো চার দিন মৃত্যু আমাকে নিয়ে যাবে বলে দোরগোড়ায় বসে ছিল। মৃত্যু আমার আশপাশে ঘুরেফিরে বেড়িয়েছে, আমাকে ছুঁয়েছে। কিন্তু বেঁচে উঠতে হল। সুধা, ভাগ্যিস মরে যাইনি। তুমি জানো না আমার ছেলে হয়েছে। তুমি জানো না আমার স্ত্রী আজকে আমার ছেলেকে নিয়ে এখানে আসত। সে আসেনি, তার বদলে তুমি এলে। কিন্তু সে আসবে— আজ না হয় কাল।'

চৌকো চৌকো কয়েকটা আলোর আভাস মেটারনিটি ওয়ার্ডের জানালা দিয়ে ঘাসের উপর এসে পড়েছে। বাইরে একটু কুয়াশা। অনিন্দ্য কোটের কয়েকটি বোতাম খুলল। ক'টা বেজেছে তা অনিন্দ্য জানে না। জানবার ইচ্ছেও নেই। যেন তার চারদিকে শীতার্ত অন্ধকার পৃথিবীটা ভয়ংকর শূন্য। কেউ যেন এল। জুতোর শব্দ। সে ফিরে গেল। জুতোর শব্দ। অনিন্দ্য ভাবতে লাগল— 'সুধা, একসময়ে মনে হয়েছিল তোমাকে ছাড়া পৃথিবীতে কাউকেই চাওয়া যায় না।' ভুল। আমি আমার স্ত্রী-কে ভালোবাসি, তুমি আমার স্ত্রী হলে তোমাকেও তেমনিই বাসতাম, হয়তো অন্য কেউ হলে তাকেও বাসতাম। ভালোবাসাটা আমার জন্মগত সংস্কার। তুমি জানো না, প্রতি পদক্ষেপেই আমাদের মৃত্যু হয়। সেই মৃত্যুই আবার আমাদের সঞ্জীবনী দিয়ে যায়। আমার মনে যখন তোমার মৃত্যু হয় তখন আমারও হয়। এক আমিকে পিছনে ফেলে আর-এক আমি এগিয়ে যাই। কিন্তু টের পাই না। সুধা, যখন দুঃখ পাই, যখন কাঁদি, যখন মরতে ইচ্ছে করে তখন আমি বড় স্বার্থপর হয়ে যাই। তোমাকে বুঝিনি, জানিনি, অথচ চেয়েছিলাম। কেন? তুমি নিশ্চয়ই হেসেছিলে, কিংবা কে বলতে পারে হয়তো একটু দুঃখও পেয়েছিলে, কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না, আমি আমার নিজের দুঃখে কেঁদেছিলাম, মরেছিলাম, আবার নিজের জন্যেই বাঁচছি। আমার স্ত্রী-র দিকে তাকিয়ে কখন তোমার জন্যে দীর্ঘশ্বাস পড়েনি আমায়— কারণ তুমি তো মৃত, আর সে আমারও মৃত্যু হয়েছে।'

অনিন্দ্য আপনমনে বলল, 'আমি তো কতকগুলো মৃত্যুর যোগফল। এই যোগফলটাই বেঁচে থাকা। আজকে তোমাকে দেখে আমি খুব চমকে গিয়েছিলাম। তারপর তোমাকে মনে পড়ল, নিজেকে মনে পড়ল। আমার স্মৃতিগুলো যেন অনুভূতি হয়ে ফিরে আসছিল। আমার মনে হচ্ছিল, তুমি আমার মুখে আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছ, বুকে হাত রাখছ— যেমনটা করতে। তারপর ঝোঁকটা কেটে গেল। আমি তখন একটি ছেলে ও একটি মেয়ের কথা ভাবতে লাগলাম। যেন তারা তৃতীয় পক্ষ, আমি নই, তুমি নও। তারা যেন অনিন্দ্য আর সুধা— যাদের আমি চিনতাম— তারা এখনকার তুমি কিংবা আমি নই। তারা আলাদা জাতের, আলাদা গোত্রের।

'বড় যন্ত্রণা, সুধা। এসব ভাবতে আমার ভালো লাগে না। কাল রাতে আমি যা ছিলাম, আজ আর তা নেই। আমি যেন বদলে গেছি। সুধা, আমার কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কেন যে জানি না।'

আকাশের রং ছাই-ছাই। একটা মস্ত বড় কুয়াশা শরীরী জন্তুর মতো আকৃতি নিয়ে মাঠের উপর স্থির হয়ে আছে। অনিন্দ্য অনুভব করছে, একটা শিরা-ছেঁড়া, পাগল-করে-দেয়া কান্নার যন্ত্রণা বুকের মধ্যে আছাড় খাচ্ছে। তাকে যেন ভেঙে ফেলবে, গুঁড়ো করে ফেলবে যন্ত্রণাটা। তার গলাটা শক্ত, কান্না একঘেয়ে, বিষণ্ণ।

অনিন্দ্য উপুড় হয়ে শুল বেঞ্চটার উপর। তার চোখ বেয়ে ধারা নামল। সে কাঁদল। কাঁদতেই লাগল। আর হঠাৎ সব কান্নাকে ছাড়িয়ে আর একটা নতুন, একেবারে নতুন কান্না শোনা গেল।

অনিন্দ্য উঠল। আস্তে আস্তে প্রায় ফিসফিস করে বলল, 'আহা, সুধা। তুমি কি বেঁচে আছ? শুনতে পাচ্ছ?'

তারপর অনিন্দ্য, কেন যে সে নিজেই জানে না, বলল, 'পৃথিবীর এক গোলার্ধে যে সূর্যকে দেখছ সে আর-এক গোলার্ধে অন্ধকার করে এসেছে। সুধা, আমি তোমাকে দেখব না, দেখা দেব না।'

অনিন্দ্য উঠে দাঁড়াল। কোনোদিকে না তাকিয়ে এগিয়ে গেল। তারপর সে সিঁড়ি ভাঙতে লাগল। এক, দুই, তিন, চার...

আনন্দবাজার পত্রিকা—১৮ অক্টোবর ১৯৫৯

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%