শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

মুখার্জি সাহেব নামক যে পাক্কা সাহেবটিকে আমি শিশুকাল থেকে চিনি তাঁর ইংরেজিতে ভুল নেই, কাঁটা-চামচে ভুল নেই, টাইয়ের নট-এ ভুল নেই, ফুট বুট কোথাও ভুল নেই। ব্রিটিশ আমলে সাহেবদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রেলের প্রশাসন সামলাতেন। ডিনার খেতেন তাঁদের সঙ্গে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তিনি বন্ড সই করেছিলেন। ছিলেন মিলিটারির লেফটেনান্ট। ক্রিকেট-টেনিস খেলতেন অনায়াস দক্ষতায়। এই সাহেবকে আমি খুব কাছ থেকে চিনি, কারণ ইনি আমার বাবা।
এই সাহেবিয়ানার নির্মোকটি খসে যেত যখন পুজো আসত। পুজোর চারটে দিন এই পাকা সাহেব কিন্তু পালটে যেতেন। তখন এত বাঙালি দেখাত তাঁকে যে বিশ্বাস হয় না এই সেই সাহেব মানুষটি। শুধু তা-ই নয়, ধুতি আর গরদে সেজে উপোস থেকে অঞ্জলি দেওয়া আর তারপর ধুতি-পাঞ্জাবিতে সেজে সেই লাঠি হাতে বিকেলে পায়ে হেঁটে ঠাকুর দেখতে বেরোনো। আর কী অক্লান্ত হাঁটা।
সে আমলে এত গায়ে গায়ে পুজোর আয়োজন ছিল না। একটা প্যান্ডেল থেকে আর-একটা প্যান্ডেলের দূরত্ব থাকত অনেক। বাবার সঙ্গে আমরা কদাচিৎ ঠাকুর দেখতে গেছি। দু-একবার তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দম বেরিয়ে যেত। পায়ে ব্যথা আর রাজ্যের ক্লান্তি নিয়ে ফিরতাম। কিন্তু বাবার চোখ-মুখ উজ্জ্বল। ঠাকুর দেখে ফিরে এসে এক কাপ গরম চা নিয়ে বসে যেতেন কোন ঠাকুর কেমন হল তা নিয়ে উন্মত্ত আলোচনায়।
আমাদের ছেলেবেলার বিজয়া সম্মিলনীটা ছিল এক অসাধারণ ঘরোয়া আসর। তার আগে বিকেলবেলায় মেয়েদের উলুধ্বনি আর কান্নাকাটির ভিতর দিয়ে দর্পণ-বিসর্জনের পর প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয়েছে নিরঞ্জনে। ফাঁকা প্যান্ডেল হাঁ হাঁ করছে শূন্যতায়। সেদিকে তাকালে কী নেই-কী নেই বলে একটা হাহাকারে বুক ভরে যায়।
কিন্তু সন্ধের পর প্যান্ডেলে ফিরে আসত নিরঞ্জনকারীরা। ধীরে ধীরে জমায়েত হতে থাকত পল্লির মেয়ে-বুড়ো-বাচ্চারা। শান্তিজল নিতে পা ঢেকে বসত সবাই। ভাবগম্ভীর পরিবেশ।
তার পরদিনই বসত বিজয়া সম্মিলনীর আসর। কোলাকুলি, নাড়ু-তক্তি বিতরণের পর সেই আসরটি ছিল ভারী চমৎকার। আর সেই আসরে আমি আমার সাহেব বাবাকেও গান গাইতে দেখেছি।
পুজো এলেই আজও সাত্তাত্তর বছর বয়সে বাবা উজ্জ্বল চঞ্চল হয়ে ওঠেন। এখন আর তিনি পাঁড় সাহেব নন। সুট ধরে ধরে বাক্সে পড়ে থেকে পুরনো হচ্ছে। কত জোড়া ফিতেওয়ালা জুতো ছিল, সব পড়ে থেকে বেঁকেচুরে নষ্ট হয়ে গেল।
তবে টানটান মেদহীন শরীরটা নিয়ে এখনও ঠিক যৌবনকালের মতোই লাঠি হাতে বেরিয়ে পড়েন। সঙ্গী পেলে ভালো, না হয় তো একলাই। সঙ্গী জোটানো তাঁর পক্ষে মুশকিল। কেউ ওঁর ওই দূরপাল্লার হাঁটায় রাজি নয়। তাই একাই বেরিয়ে পড়েন। দূরদূরান্তে ঘুরে ঘুরে পুজো দেখেন। রাতে ফিরে এসে এক কাপ গরম চা নিয়ে বসে যান ঠাকুর দেখার গল্প করতে। চোখে-মুখে উজ্জ্বল আভা।
আমরা ঠিক বাবার মতো নই। অত প্রাণশক্তি আমাদের নেই। ঠাকুর দেখতে যাওয়ার ভিড় ঠেলাঠেলির কথা ভাবতেই যেন নিজেকে ভারী বুড়ো লাগে।
তাই ভাবি, আমাদের চেয়ে বাবা কত বেশি যুবক। আর তাঁর তুলনায় আমরা কতই-না বুড়ো।
আনন্দবাজার পত্রিকা—২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন