ফোটন

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

ফোটনকে পাবলিক খুব পেঁদিয়েছে আজ। এখন ওই যে লাইনের ধারে মরকুটে কদম গাছটার তলায় পড়ে আছে ফেলে-দেওয়া জিনিসের মতো। লুঙ্গিখানা গিঁট মেরে পরেছিল, তাই এখনও লেগে আছে কোমরে। গেঞ্জি ফর্দাফাঁই হয়ে উঠে গেছে, হাওয়াই শার্ট বেপাত্তা। গোছা গোছা চুল ছিঁড়ে নিয়ে গেছে মাথা থেকে। মুখ যেন একশো বোলতার হুলে ফুলেফেঁপে বেলুন। চোখ বোজা, নাক কাটা, ঠোঁট থেঁতলানো। রক্ত জমে গেছে, এখন আর হড়হড় করে নাক-মুখ দিয়ে পড়ছে না। দু-চারটে মাছি উড়ছে ধুলো আর রক্ত-মাখা মুখের কাছে। হাড়গোড় ভেঙে থাকলেও এখন তা বোঝবার উপায় নেই। তবে না-ভাঙাই সম্ভব। ফোটনের হাড় তো পাকা।

ফোটনের আশপাশ দিয়েই লোকজন যাতায়াত করছে বাজারে, স্টেশনে। তাকাচ্ছে। ফের দেখি না-দেখি না ভাব করে চলে যাচ্ছে।

জগদীশ ঘোষ মান্য খদ্দের। তাঁর কোঁকড়া চুলে শ্রদ্ধার সঙ্গে কাঁচি চালাতে চালাতে পপুলার সেলুনের শ্বেতিওয়ালা জগন কণ্ঠহরিকে উদ্দেশ করে বলল, এইবেলা একটা রিকশা ডেকে তুলে নিয়ে যাও। পুলিশ এসে আর পারবে না।

কণ্ঠহরি সেলুনের এক বর্গফুট ঘুলঘুলিটার ভিতর দিয়ে ফোটনের দিকে চেয়ে ছিল। শুকনো ঠোঁটটা জিভ দিয়ে ভেজানোর বৃথা চেষ্টা করে বলল, যাই। কিন্তু পাহারা আছে যে।

কে পাহারা!

চারটে ছেলে ঝোপড়ার ওদিকটায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে অনেকক্ষণ ধরে।

কিছু বলবে না। লাশটা নিয়ে আর করবে কী বলো!

লাশ কথাটায় কলজেটা ব্যাঙের মতো একটা লাফ মারে কণ্ঠহরির। পাবলিকের কাছে ফোটন যা-ই হোক, তার তো ছেলে। সারাদিন খবর ছিল না, অনেক খুঁজে খুঁজে খবর নিয়ে তবে এখানে এসে সন্ধান পাওয়া গেছে।

কণ্ঠহরি কষ্টেসৃষ্টে উঠে পড়ল। কোমরটায় বাতের ব্যথা বহুকাল ধরে বাঘের থাবা মেরে বসে আছে। নড়েও না, চড়েও না। চরণগঙ্গার গোঁসাই বলেছিল, চীনে বিছে লাগালে সেরে যাবে। তা চীনে বিছের এখন জোগাড় নেই। ডাক্তার-বদ্যি সব ফেল মেরে গেল। উবু হয়ে কাজ করতে পারে না, ভার তুলতে পারে না। বড়ো কষ্ট। বসার পর উঠলে কিছুক্ষণ কুঁজ মেরে থাকতে হয়। বড্ড টাটায় তখন। একটু হাঁটাহাঁটি করলে তারপর কোমর সরল হয়।

চারপাশটা দেখে নিয়ে কণ্ঠহরি গিয়ে কাছটিতে দাঁড়ায়। না, শ্বাস আছে এখনও। বুক ওঠানামা করছে। ঝোপড়ার ওদিকটায় চার ছোকরা একটু তফাত হয়েছে। কণ্ঠহরি একটা চলন্ত রিকশাকে হাত তুলে থামাল। রিকশাওয়ালার দিকে চেয়ে কণ্ঠহরি বলে, একটু হাত লাগাবি বাবা? বুড়ো মানুষ আমি, একা পেরে উঠব না।

পকেটমার আছে নাকি ছোকরাটা?

কণ্ঠহরি মাথা নেড়ে বলে, ওসব নয়। আর হলেই-বা তোর কী? তোকে ঠিক পয়সা দেব। ধর বাবা একটু।

রিকশাওয়ালা নেমে এগিয়ে এল। কিন্তু সে ফোটনকে ধরবার আগেই ঝোপড়ার ওপাশ থেকে চারটে ছোকরা ভূতের মতো বাতাস ফুঁড়ে সামনে দাঁড়াল, এই যে দাদু, বডি তুলছেন যে বড়ো। কার পারমিশন নিয়েছেন?

কণ্ঠহরি ঢোঁক গিলে বলল, আমার ছেলে।

ওসব জানি। আপনি ফোটনের বাপ না পিসে তা জেনে আমাদের লাভ নেই। বডি তুলবে পুলিশ। থানায় খবর গেছে।

কণ্ঠহরির হাত কাঁপছে। ফোটনকে ছাড়তে পারছে না। কোমরটা টাটাচ্ছে বেদম। বলল, পুলিশ আর কী করবে বাবারা, নিয়ে আরও মারবে।

তা সে ফালতু মস্তানি করতে গেলে ঝাড় তো খেতেই হবে, দাদু। বডিটা ছেড়ে দিন। ও মাল এখন আমাদের।

ছেড়ে দিতেই ফোটন আবার গদাম করে মাটিতে পড়ে গেল। কণ্ঠহরি মাজাটা ডলতে ডলতে ককিয়ে উঠল, অরে বাবাঃ... ওঃ...

একটা ছোকরা একটু মোলায়েম গলায় বলল, আইন ইজ আইন। বুঝলেন দাদু? পেঁদিয়েছে পাবলিক, আর পাবলিক মানেই হচ্ছে ভোটার, মানে সরকার। বডি তুলতে হলে তুলবে পুলিশ, মানে পাবলিক সার্ভেন্ট। আপনার-আমার কিছু করার নেই। কে হন যেন আপনি?

কণ্ঠহরি বিকৃত মুখ করে বলল, বাবা। অনেক পাপ করেছি তো, তাই।

ছোকরাটা আকাশের দিকে চেয়ে গলা চুলকোতে চুলকোতে বলল, সেন্টিমেন্টে খোঁচা মেরে দিলেন দাদু? বাপ-ছেলে রিলেশন বলছেন, ঠিক তো!

ফোটনের বাপ হওয়া এমন কিছু গৌরবের নয় যে, লোক মিথ্যে করে বাপ সাজাবে। কণ্ঠহরি সে কথায় না গিয়ে বলল, বাপই বটে।

কিন্তু আমাদেরও তো রেসপনসিবিলিটি আছে দাদু। বলাইদা— আমাদের লিডার বলে গেছে, খবরদার বডি কাউকে ছুঁতে দিবি না, পুলিশের লোক এলে রিলিজ করবি।

বুঝেছি বাবা। অনেকক্ষণ হয়ে গেল, তাই বলছিলাম—

আমরা বলি কী, কিছু মাল খসান, বডি তুলে নিয়ে যান, কেউ কিছু বলবে না।

বুঝেছি। কত?

পঁচিশ।

আমার কাছে অত নেই।

কত আছে?

পাঁচ।

সার্চ করলে যদি বেশি বেরোয়?

কণ্ঠহরি ককিয়ে উঠে বলে, দশ।

খুব চিপ হয়ে যাচ্ছে না?

আর নেই, বাবা।

ছোকরাটা রিকশাওয়ালাকে একটা ধমক দিল, তোল-না শালা গিদধড়, তুলে লে। উঠে পড়ুন দাদু, গিয়ে একটু ডেটল-ফেটল লাগিয়ে দেবেন, মাল ঠিক ফিট হয়ে যাবে।

রিকশায় তুলতে ছোকরাগুলো একটু হাত লাগাল।

পকেট থেকে দশটা টাকা বেরিয়ে গেল ফালতু। কোমরটা টাটাচ্ছে। ফোটনের আলিশান শরীরের চাপে কণ্ঠহরির শুঁটকো চেহারাটা ফোঁক ফোঁক করছে, হাঁসহাঁস করছে। দিশি মদের গন্ধে গুলিয়ে উঠছে গা। রিকশাটা হপ্তা বাজারের ভাঙা রাস্তায় ঝকাং ঝকাং করে যত লাফায় তত প্রাণবায়ু বেরোতে থাকে কণ্ঠহরির। উপায় থাকলে ফোটনকে এখন জুতোপেটা করত কণ্ঠহরি। কিন্তু ভগবান কি আর সেইদিন দেবেন?

গোটা পাঁচ-সাত রামঝাঁকুনির পর আচমকাই কণ্ঠহরির গায়ে হড়াক করে দিশি মদ আর খানিক কিমা কারি গরম বমি ফেলল ফোটন। তারপরই সটান বসে বলল, কোন শালা বে হুটোপাটা করতে লেগেছিস? কোন শুয়োরের—

কণ্ঠহরি চিঁ চিঁ করে বলে ওঠে, আমি রে আমি।

লাল টকটকে দুখানা চোখে ফোটন তাকে ভালো করে দেখবার চেষ্টা করে, শালা বাবা নাকি বে?

চুপ করে বোস তো, গা-টা একটু এলিয়ে দে।

শুয়োরের বাচ্চারা সব গেল কোথায় বলো তো! অ্যাঁ! একটা একটা করে ধরে জমি নেওয়াব শালাদের, সব ক-টার মাগকে বিধবা করে ছাড়ব। খানকির...

চুপ করে বোস বাবা। ধরে থাক শক্ত করে।

সব বিলা করে দেব, বুঝলে! জ্বালিয়ে দেব শালা!

হবে হবে। এখন একটু—

ফোটনের কনুইয়ের একটা রামগুঁতোয় কণ্ঠহরি বেঁকে যায়। বাপ, জোর লেগেছে।

বলাই শালার গলা যদি না নামাই তবে আমি বাপের ছেলে নই, বুঝলে?

কণ্ঠহরির বুঝবার মতো অবস্থা নয়। ফোটন বড্ড হাত-পা চালাচ্ছে। কণ্ঠহরি মুখখানা হাতচাপা দিয়ে নিজেকে বাঁচাতে বাঁচাতে বলে, হবে হবে, সব হবে। এখন একটু চুপ করে বোস তো।

লাইনের ওধার ওর, ঠিক আছে। এধারে আমি তোলা নেই তাতে ওর বাবার কী, তুমিই বলো!

তা বটে।

জানো তুমি? লাইনের এধার থেকে বাইশটা ছেলে আমাকে ওধারে টেনে নিয়ে গেল। আর শালা বলাই গলায় নল ঠেকিয়ে বলে কিনা, এ এলাকায় পা দিয়েছিস কেন? কত বড়ো মিথ্যে কথা?

দুনিয়াটা পাপে ভরে গেছে। তুই একটু চুপ করে বোস তো বাবা, এত ছটফট করিসনি!

বলাইয়ের সঙ্গে হচ্ছিল তো হচ্ছিল। কথা নেই, বার্তা নেই, দুটো হুমদোমতো লোক কোত্থেকে এসে বলল, এটাকে ধরেছিস, খুব ভালো করেছিস। শালা সিনেমার টিকিট ব্ল্যাক করে, সেদিন আমার বউদি একটু দরাদরি করায় বলেছিল, ফোট মাগি, এত বড়ো সাহস! বলেই দুমদাম লাগাতে শুরু করল। পাবলিকও জুটে গেল সেইসঙ্গে। বলো, এ কী বিচার?

কণ্ঠহরি ফোটনের বড়ো শরীরটাকে রিকশার মধ্যে ঠিক আঁটিয়ে রাখতে পারছে না। বলল, ধর্ম কি আর আছে রে বাপ? কনুইটা ফের লাগবে, দেখিস?

ওঃ শালারা খুব রগড়েছে। আমিও দেখব শালা বলাইকে, লাইনের ওদিকে টেনে নিয়ে গিয়ে মস্তানি! বাপের বেটা হলে লাগতি এদিকে এসে, জল ভরে দিতাম।

ন্যায্য কথা শুনে কণ্ঠহরি সায় দিল, বটেই তো।

আমিও বাগে পাব একদিন। তিনটে লাশ ফেলে দিয়েছি, আমাকে তো চেনে না এখনও।

চিনবে রে চিনবে। সবই রয়েসয়ে হয়।

ফোটন একটু কমজোরি হয়ে পড়েছে। ঝুম হয়ে কিছুক্ষণ চোখ বুজে বসে রইল। ফাটা ঠোঁট দিয়ে ফের রক্ত বেরোচ্ছে বগবগ করে। ফোঁটা ফোঁটা বেয়ে পড়ছে কালো বুকে। হপ্তা বাজারের খোয়া-ওঠা রাস্তায় টাল্লা খেয়ে নেচে নেচে রিকশা এগোচ্ছে। রিকশা, ঠেলা, পাঁউরুটির গাড়ি, ভ্যান, সাইকেল আর মানুষে ঠাসে ঠাস ভিড় ঠেলে ফোকর করে করে এগোনো ভারী শক্ত।

আস্তে চালাস বাপ, কণ্ঠহরি বলে।

রিকশাওয়ালা তেজে জবাব দিল, আস্তেই চলছে।

বিড়বিড় করে কী যেন বলছে ফোটন। মাথাটা বুকের ওপর ঝুলে পড়েছে। চোখ বোজা। শরীরটা দুলছে এদিক-সেদিক। কণ্ঠহরি কানটা একটু এগিয়ে দেয়, কী বলছিস, ও ফোটন?

বলাইকে সাফ করলে গোটা এলাকাটা একদিন আমার হয়ে যাবে, বুঝলে বাবা? সবাই বলবে ফোটন মালিক। ব্ল্যাকাররা তোলা দেবে, সবজিওয়ালা, চালওয়ালা, সাট্টাওয়ালা সব শালা দেবে। চারটে লরি করব, দুটো মিনিবাস, একটা কালী মন্দির দেব। বুঝলে বাবা?

দিস। খুব ভালো হবে।

মারল তো শালা, জানে খতম করতে পারল? মরদ হলে পারত। আমি যেদিন ধরব বুঝলে বাবা, জানে খতম করে দেব। লেজ মাড়িয়ে ছেড়ে দেব না। ঠিক হবে না বাবা?

কণ্ঠহরি খুব ভালোমানুষের মতো মুখ করে বলে, তা-ই তো রে। ঠিক কথা।

ফোটন একটু হেলান দেয় কণ্ঠহরির শরীরে। মাজাটা কোঁক করে ওঠে কণ্ঠহরির। মদের ঝাঁজালো গন্ধ আসে নাকে। বমিটা জামায় শুকোচ্ছে। তবু কণ্ঠহরি ছেলের বিশাল শরীরের ঠেস সহ্য করতে করতে মনশ্চক্ষে দেখতে পায়, ফোটন লাইনের দু-ধারে দুটো স্তম্ভের মতো বিশাল পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে বলাইয়ের কাটা মুন্ডু। সেই বিশাল ঠ্যাঙের তলা দিয়ে নতমস্তকে যাতায়াত করছে বেয়াদব পাবলিক আর ঠনাঠন পয়সা প্রণামি ফেলে যাচ্ছে।

কণ্ঠহরি ফোটনের মাথাটা কাঁধে চেপে ধরে আদরের গলায় বলে, হবে রে হবে, সব হবে। সবার কি আর চিরকাল দুর্দিন থাকে?

আনন্দবাজার পত্রিকা—২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%