শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

শীতে রোদে, প্রায় দিনই সকালে শীতলাবাড়ির মাঠে গিয়ে বসি। পশ্চিমে বহু পুরনো—অন্ধকার শীতলা মন্দির, তার চত্বরে হাড়িকাঠ। দক্ষিণে মজা গভীর গর্তের মতো সবুজ জলের পুকুর, তার ভাঙা পাড়ে একশো-দুশো বছরের পুরনো বাড়ির দুটো দেয়াল নোনায় ঝুরঝুরে হয়ে দাঁড়িয়ে। অশ্বত্থের শিকড় ছেয়ে ফেলেছে তাদের। ওই দেয়ালের পাশ দিয়ে পায়ে হাঁটা বুনো পথ চলে গেছে দক্ষিণে, আগাছা, বাঁশবনের ভিতরে দুঃখী কয়েকটা ছন্নছাড়া বাড়ির উঠোনে গিয়ে শেষ হয়েছে। উত্তর ধারে রাস্তা, পশ্চিমমুখো সমবায়পল্লি, বেলানগর সাহেববাগান, মাকালপাড়া অবধি চলে গেছে বড়ো ঝিলের ধার ঘেঁষে। রাস্তা পেরোলে উত্তরে আবার বাঁশবন— তার মাঝখানে আবার সবুজ জলের একটা প্রাচীন পুকুর। আমার চারধারে এমনই সব দৃশ্য—প্রাচীনতার ছাপ যার গায়ে। মাঝে মাঝে গ্রিল-দেওয়া নতুন বাড়ি, দোকান, রাস্তা দিয়ে মোটর সাইকেল দৌড়ে যায়, পুবে ইলেকট্রিক ট্রেনের লাইন। কলকাতা খুব দূরে নয়। ছাদে উঠলে দক্ষিণ-পূর্বে হাওড়া ব্রিজের মাথা দেখা যায় কুয়াশার মতো আবছা। মাত্র আট কিলোমিটার।
শীতলা ধানের মাঠে শীতের কবোষ্ণ রোদে আমার দু-বছরের মেয়ে গরবিনি হয়ে হাঁটে। ভারী উলের পোশাকে তাকে এস্কিমোদের মতো দেখায়। মাঠের ধারেকাছে ছাগল চরে। বেওয়ারিশ কুকুরেরা ল্যাং ল্যাং করে বেড়ায়। আমার মেয়ে তার নরম হাতে ঢিল কুড়িয়ে ছুঁড়বার চেষ্টা করে। ঢিল কুড়োতে একটু দূরে চলে যায়, আবার দৌড়ে চলে আসে কাছে, আমার হাঁটু ছুঁয়ে দাঁড়ায়। আবার আস্তে আস্তে হেঁটে দূরে যায়। আবার ফিরে আসে। বাবাকে ঘিরে ওই তার খেলা। আনমনে চেয়ে দেখি। বাঁশবনে গভীর মর্মর তুলে আসে উত্তরের হাওয়া, শীতের কবোষ্ণ রোদ নেশাড়ু ওম দেয়। সামনেই পুরনো দেয়ালটা, পশ্চিমে শীতলার থান, গঞ্জের রাস্তা দিয়ে যাতায়াতের মানুষ—এসবই আমাকে আলগাভাবে স্পর্শ করে। চোখের সামনে কিছু এই বাস্তবতা, আর কিছু আমার মনের প্রক্ষিপ্ত স্মৃতি ও কল্পনা— সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত ঘেরাটোপ রচনা করে আমার চারদিকে। আমি গভীর চোখে দক্ষিণের পুকুরের সবুজ রং দেখি আর অমনি উড়োজাহাজের মতো দিগন্তে হাজারটা স্মৃতি উড়ে আসে। পুকুরপাড়ে বড় কচুপাতার আড়ালে সুপুরি গাছের ঘাটলায় কে যেন ঘোমটায় মুখ ঢেকে বাসন মাজতে বসেছে। সে কে বলো তো? জেঠিমা, না ঠাকুমা?... নীলাম্বরি ... খুড়ি... নাকি মামণিপিসি? ওই যে প্রকাণ্ড বর্গিথালাখানা, ওটাতে ভাত খায় আমার ঠাকুরদা না? অবিকল দেখতে পাই, বালি-দুর্গাপুরের পুকুরটার ওই পাশে স্বপ্নের ঢালু বেয়ে ছায়ায় আচ্ছন্ন এক ঘাটলায় ময়মনসিংহের সেই পগারপার নেমে এসেছে। বুনো পথটি আলো থেকে বেঁকে ছায়ার আচ্ছন্নতায় হঠাৎ কয়েকশো মাইল পেরিয়ে গিয়ে শৈশবস্মৃতিতে চলে গেল। একটু গেলেই দেখা যাবে নরম মাটিতে গোড়ালি চেপে তৈরি পিল-এ জেত্তাল খেলছে রাখালভাই আমার বিশা। আর চারদিকে বাস্তবতার মধ্যে এইভাবেই স্বপ্ন ও স্মৃতির ভেজাল মিশে যায়। কিছু সত্য, কিছু বা মনের নির্মাণ—আমরা কি সকলেই এরকম ঘেরাটোপে বাস করি না?
গরম লাগে বলে আমার দু-বছরের মেয়ে টুকি তার মাথায় চুটি টেনে খুলে ফেলেছে, হাঁটু ছুঁয়ে ডাকছে, বাবা। চমকে উঠে তাকাই। মনে পড়ে; এই উনিশশো একাত্তরে আমি ছত্রিশ পূর্ণ করে যাচ্ছি। ছত্রিশে আমার জীবন পরিষ্কারভাবে দ্বিখণ্ডিত। নস্টালজিয়ার স্রোতে ছটফট করে ধুলোয় গড়ায় আমার মন। অন্যদিকে স্থির বহিরঙ্গে পড়ে আছে আমার শান্ত কাটা মুণ্ডের মতো অস্তিত্ব— শীতের কবোষ্ণ রোদের আরামে অর্ধনিমীলিত চোখ। সেই চোখে সবিস্ময়ে আত্মজার দিকে চেয়ে থাকি। তুমি কে? আমার মেয়ে আমার হাঁটু ছুঁয়ে টুপিটা বাড়িয়ে দেয়। বলে, নে বাবা নে।
আমি নিই। তাকে দিই আমার শৈশবস্মৃতির উত্তরাধিকার।
বেলতলার যেখানে ঘটপুজো হয়েছিল সেইখানে দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করছে একটা ছাগল, ভ্রমরের দোকানের সামনে বসে কুকুর পা চুলকোয়, ন্যাড়া শিমুল গাছে এসে বসে। ময়ূরকণ্ঠি রঙের কবুতর, খড়-বোঝাই মন্থর গরুর গাড়ি চলে যায়। আমার মেয়ে আমার হাত ধরে টেনে নিতে থাকে, মাঝে মাঝে দাঁড়ায় বিস্ময়ে চারধারের তুচ্ছ দৃশ্য সব দেখে। এইসব দৃশ্য-শব্দ, শীতের এই নরম রোদের সকাল সে সঞ্চয় করে নেয়। একদিন দূর ভবিষ্যতে তারও চারদিকের বাস্তবতায় মিশে যাবে তার এইসব শৈশবস্মৃতি। অবেলায় দুপুরের ঘুম ভেঙে উঠে সে-ও একদিন অবাক বিস্ময়ে দেখবে, তার দক্ষিণের জানালার পাশে সজনের ডালে তার শৈশব থেকে উড়ে এসে চুপ করে বসে আছে ময়ূরকণ্ঠি এক কবুতর।
আমাদের হৃদয়ের শব্দহীন জ্যোৎস্নায় অবিরল এইসব স্মৃতিদের ওড়াউড়ি। নিজের বুকের ওমে যেমন পাখিরা মুখ ডুবিয়ে রাখে, তেমনি মাঝে মাঝে স্মৃতিতে আমাদের মুখ ডোবানো। আমাদের প্রিয় কেন স্মৃতি? বোধহয় এই কারণে যে, স্মৃতি আমাদের মৃত্যুর বিপরীত দিকে নিয়ে যায়।
মাঝে মাঝে মনে হয় মৃত্যু সবকিছুর নিয়ামক।
তার চৈতন্যময় অস্তিত্বকে মানুষ বড় ভালোবাসে। অস্তিত্ব মানুষের বড়ো প্রিয়। এই প্রিয়ত্বের মূল হচ্ছে দুর্বলতা। তার চেতনা, তাঁর অস্তিত্ব— একে ছেড়ে সে কোনও জড়বস্তু হয়ে যেতে চায় না।... ফলে অস্তিত্বের নিয়মই হচ্ছে মৃত্যুর বিপরীত দিকে চলা। মানুষ চায় অনন্ত অস্তিত্ব। এই ইচ্ছা উদ্ভিদে, পশুতে, কীটেও রয়েছে— Instinct হিসেবে। মানুষের ইচ্ছা আরও তীব্র আবেগপূর্ণ। অথচ অস্তিত্ব— অনন্ত নয় তা সে জানে। নিয়মানুসারে মৃত্যু আসে। ওই মৃত্যুই জীবনকে দুর্বলতার মুকুট পরায়, মহার্ঘতা আরোপ করে।
কিছুকাল আগে আমার এক বর্ষীয়সী আত্মীয়ের হৃদরোগের খবর পেয়ে যাদবপুরের উদ্বাস্তু কলোনিতে তাঁকে দেখতে যাই। তখন শীতের ম্লান বিবর্ণ অপরাহ্ণ। বোধহয় শীতের অপরাহ্ণর মতো বিষণ্ণ সময় আর হয় না। কেমন যেন মৃত্যু-আকীর্ণ চরাচর। টিনের ঘরে দরিদ্র বিছানায়, দক্ষিণের খোলা জানালার দিকে শিয়র করে আমার সেই আত্মীয়া শুয়ে ছিলেন। সেই অপরাহ্ণের মলিন আলোয় আমি তাঁর নির্বাণোন্মুখ মুখখানায় কী যে দেখেছিলাম তা এখনও আমার কাছে যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। মানুষ আর-একটা মানুষকে কখনওই সম্পূর্ণরূপে দেখতে পায় না। খানিকটা দেখে, খানিকটা কল্পনা করে নেয়। সম্ভবত আমিও আমার সেই বর্ষীয়সী স্নেহপ্রবণা আত্মীয়ার রোগক্লিষ্ট মুখখানার খানিকটা দেখেছিলাম, আর খানিকটা কল্পনা করে নিয়েছিল মৃত্যুচিন্তায় আকীর্ণ আমার ব্যাকুল মন। সেই প্রায়ান্ধকার ঘরে, আমি তক্ষুনি আসন্ন মৃত্যুকে অনুভব করেছিলুম। আমার সেই আত্মীয়ার প্রবীণ মুখশ্রীর অক্ষিপল্লবে, ভ্রূ-তে, রুক্ষ চুল ও বিবর্ণ গাত্রচর্মে। তিনি আকুলভাবে দুই হাতে আমার হাত ধরে বললেন, আমি যে কাল মরে যাচ্ছিলাম রে! আজ যে আমি তোকে দেখতেও পেতাম না। এই কথা বলে তিনি কাঁদতে লাগলেন। সেই কান্নায় অসম্ভব ব্যাকুলতা ছিল। সেই কান্না কেবল আমার উদ্দেশ্যেই নয়, সম্ভবত এই জীবন, এই সংসার, এই আলো-অন্ধকার এবং পাপ-পুণ্যময় ব্যাপ্ত যে জীবন তার উদ্দেশেই ছিল সেই নৈর্ব্যক্তিক চলন। সত্তরের কোঠায় তখন তাঁর বয়স, দীর্ঘস্মৃতিবিজড়িত জীবন— প্রিয় এবং অপ্রিয় সুখ এবং দুঃখজড়িত, অনুযোগ এবং ক্ষমায় গঠিত এই জীবন তাঁকে খুব শিগগিরই একদিন ছেড়ে যেতে হবে। একটা ঢেউ এসে হয়তো তাঁকে নিয়ে যেতে পারেনি, কিন্তু পরবর্তী ঢেউ আসবেই তাঁকে নিয়ে যেতে। যতক্ষণ না আসে ততক্ষণ এই জীবন কী ভীষণ মূল্যবান। হয়তো এতসব তিনি এত স্পষ্ট করে ভাবেননি। তিনি হয়তো তাঁর প্রবাসী সন্তানদের কথা ভাবছিলেন— হায় ভগবান, ওদের সঙ্গে একবার দেখা হবে না? তিনি তাঁর ঘরের দিকে চেয়ে ভাবছিলেন— এই ঘরসংসার কে দেখবে? কিছুক্ষণ কেঁদে তিনি চুপ করে ছিলেন। কিন্তু তাঁর নীরব কান্নার রেশ হৃৎপিণ্ডের অস্পষ্ট শব্দের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। আমি তা অনুভবও করছিলাম। মাঝে মাঝে তাঁর স্খলিত বিলাপ এই পৃথিবীতে তার অস্তিত্বের একটা শেষ চিহ্ন রেখে যেতে চাইছিল। দেয়ালে টাঙানো তাঁর স্বর্গত স্বামীর ছবি, তার পাশে গুরুদেবের ছবি। প্রতিদিন জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে তিনি হয়তো কতবার স্বামীর ছবির দিকে চেয়ে স্বগতোক্তি করেছেন, আমাকে তোমার কাছে টেনে নাও, বড় একা আছি। হয়তো তিনি গুরুদেবের ছবির দিকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছেন, এবার শ্রীচরণে স্থান দাও, সংসার আর কেন? তবু প্রকৃত মৃত্যুর স্তব্ধতা। নিকটবর্তী হলে তিনি পরপারের কোনও গতিকেই শান্তভাবে কল্পনা করতে পারছিলেন না। যে জীবন ফেলে যেতে হবে, সেই রক্তমাংসপিণ্ডের উপর নির্ভরশীল নশ্বর ক্ষণস্থায়ী জীবনের স্মৃতিই তাঁকে বিপরীত দিকে আকর্ষণ করছিল। মৃত্যুর উপশম চাইছিল তাঁর স্মৃতিতাড়িত মন।
আমি তাঁর সেই আকুলতাকে মনপ্রাণ দিয়ে অনুভব করলাম। আমার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে মৃত্যুর ডাক বেজে গেল। তখন অপরাহ্ণের বিষণ্ণ শীতবেলা, চারদিকে ঝুম হয়ে নামছে শীতের কুয়াশা-ছড়ানো রহস্যময় অতিলৌকিক সন্ধ্যাকাল। বুকের ভিতর ধড়াস করে আছড়ে পড়ছে আমার হৃদযন্ত্র, আমার অস্তিত্ব, আমার আমি। কল্পনার চোখে প্রত্যক্ষ করলাম আমারই— এক প্রবীণ বয়সের শেষ দৃশ্য— দক্ষিণ শিয়রে মাথা, কাল অপরাহ্ণ, শীতের বেলায়, আমার মৃত্যুর ঘোর-লাগা চোখের দিকে চেয়ে আছে পৃথিবীর প্রিয়জন, যাদের কাছ থেকে আমার বিদায়— বিদায়।
কিন্তু কোথায় যাব আমি? কোথায়? পাঠশালার হঠাৎ পাঠ-ভুলে-যাওয়া ভীত বালকের মতো অস্থিরভাবে চারদিকে চেয়ে এই অদ্ভুত সংকটের সমাধান খুঁজি আমি আজও।
এ সেই পুরনো ঘটনা, যা বুদ্ধদেবের জীবনেও ঘটেছিল। জরা, ব্যাধি, মৃত্যুর উপশম খুঁজতে তিনি সংসার ত্যাগ করেছিলেন। নাকি ভুল বললাম? এরকম কোনও ঘটনা ভগবান বুদ্ধর জীবনে ঘটেনি। ঘটেছিল গৌতম নামে একজন মানুষের জীবনে। সেই মানুষ গৌতম পরবর্তীকালে হয়েছিলেন ভগবান বুদ্ধ। কিন্তু গৌতম যদি বুদ্ধ না হতেন? ঠিক সেইরকমই বুদ্ধের পরও কোটি কোটি মানুষ জন্মগ্রহণ করেছে, জরা-ব্যাধি-মৃত্যুর কবলিত হয়েছে। তারা গৌতমের সেই মানুষী দুর্বলতাকে অনুভব করে, ভয় পায়, অস্থিরতা বোধ করে। কিন্তু তারা সংসার ছাড়তে পারে না, তারা ফাঁদে-পড়া জন্তুর মতো দেখে সব মর্মন্তুদ দৃশ্য— যৌবনে জরা লাগছে, কীটদষ্ট হয়ে যাচ্ছে সুন্দর ফল দেখে প্রিয়বিয়োগ। গৌতমের যন্ত্রণা আমরা পেয়েছি, বুদ্ধর প্রশান্তি নয়।
যে বৌধির দ্বারা বুদ্ধ মৃত্যুকে জয় করেছিলেন, তার প্রকৃত পরিচয় আমার অজানা। শোনা যায়, বুদ্ধ আত্মার অস্তিত্ব মানতেন না, তাঁর জন্মান্তরবাদকে কর্মতত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। আমার তাতে তেমন আগ্রহ নেই। আমার প্রিয় তাঁর জাতকের গল্প। গল্প নয়, স্মৃতিচারণ। শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি নয়, এ স্মৃতি হচ্ছে জন্ম-মৃত্যু ভেদ করে নিজের অনন্ত প্রবাহকে লক্ষ করা। নিজেকে অনন্ত বলে জানলে মৃত্যু তুচ্ছ হয়ে যায়। মৃত্যুর উপশম কি বুদ্ধ এইভাবেই অলৌকিক স্মৃতিচারণের ভিতর দিয়ে খুঁজে পেয়েছিলেন? অনেকটা এরকম আভাস দিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ, তখন তিনি অর্জুনকে বলেছিলেন, তুমিও অনেকবার জন্মগ্রহণ করেছ, আমিও অনেকবার। কিন্তু তোমার আর আমার মধ্যে প্রভেদ হচ্ছে এই যে, তোমার সেইসব জন্মের কথা মনে নেই, আমার আছে। এইজন্যই কি আমাদের প্রার্থনার মন্ত্র বলা হয়— দেহি হে জীবনবুদ্ধি নিয়তং স্মৃতিচিদযুতে?
—অস্তিত্বের আর-একটি গুণ তার বুদ্ধি। বিস্তার বা সম্প্রসারণ তার প্রকৃতিগত। জীবন এক জায়গায় স্থির নেই। তার গতি নানামুখী। বুদ্ধিও তার এক রকমের গতি। এই গতির কোনও বিরাম নেই। পৃথিবী হচ্ছে উপলখণ্ডময় একটি পদ্ম। তার উপর দিয়ে আহত-ব্যাহত হয়েও এই গতি বয়ে যায়। এই যে আমার 'আমি' তা প্রতিনিয়তই পালটে যাচ্ছে। বহু খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায় অস্তিত্ব। এই বহুধাবিভক্ত সত্তাকে গ্রথিত রাখে তার স্মৃতিবাহী চেতনা। স্মৃতি হচ্ছে সেই ধনুক, যা জীবনের ছিলাকে রাখে টানটান।
আমরা চলেছি আমাদের স্মৃতির সুতো ধরে ধরে। শীতের কবোষ্ণ রোদে আমার মেয়ে আমাকে হাত ধরে শীতলাবাড়ির মাঠ থেকে যখন ঘরে নিয়ে যায়, তখন আমার চারপাশে যে সুন্দর প্রকৃতির ঘেরাটোপ, যে আলো-ছায়াময় মায়াবী নির্মাণ, তার ভিতর দিয়েও চলেছে আমাদের অজ্ঞাতে এক স্মৃতিমন্থনের কাজ। আমার স্মৃতিই বলে দিচ্ছে যে মেয়েটি আমার হাত ধরে টেনে নিচ্ছে, সে আমারই মেয়ে। আমার মেয়ের স্মৃতি তাকে বলে দিচ্ছে যে, আমি ওর বাবা। নইলে আমরা পরস্পরের কাছ থেকে হারিয়ে যেতাম। কালকের 'আমি'র কাছ থেকে হারিয়ে যেতাম আজকের 'আমি'। তবু আমরা সকলেই কিন্তু বুদ্ধ বা কৃষ্ণ নই। আমাদের সীমাবদ্ধ স্মৃতিশক্তি জন্ম-মৃত্যু ভেদ করতে পারে না, এমনকী এই জন্মেরই কত কথা ভুলে গেছি, কতদিনকার কথা, মনেও পড়ে না। তবু ওই সুতো ধরে ধরেই আমাদের আন্দাজি চলা।
আত্মা অত ধাতু থেকে এসেছে, তার অর্থ গমন। আর এই গমন বা গতির মধ্যে জীবাত্মার অসীম আকাঙ্ক্ষা হল আত্মরক্ষা, আত্মপোষণ, আত্মবিস্তার এবং যা, কিছু এর পরিপন্থী, তার নিরসন করা। তাই তার কাঙ্ক্ষিত প্রার্থনা হচ্ছে—যা—মূয়স্ব, মা জহি, শক্যতে চেৎ মৃত্যু মনলোপর। মেরো না, মেরো না, পারো তো মৃত্যুকে অবলুপ্ত করো। নিজেকে মানুষ জানুক বা না জানুক, 'আমি আছি' এই বোধটা সে ছাড়তে চায় না।
সে চায়— তার থাকাটা হোক চিরন্তন। মৃত্যু নিশ্চিত, তবু মানুষের চাওয়া, তার থাকাটা হোক চিরন্তন। মৃত্যু নিশ্চিত, তবু মানুষের চাওয়া তার বিপরীতগামী। বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত মানুষ মৃত্যু দেখেছে অনেক; জীবনের যোগফল, মানুষ অসহায়ভাবে সমর্পণ করে যায় মৃত্যুর পারে। তবে তার এই অন্তহীন জীবনের আকাঙ্ক্ষা কোথা থেকে আসে? কেন আসে?
আবার শীতের এই সুন্দর সকালটিতে ফিরে আসি। সাদা, উজ্জ্বল দিন। পৃথিবীর আধখানা জুড়ে দুধসাদা এক কবুতর বসে আছে যেন। তার বুকের স্নিগ্ধ ওম ওই রোদে আর আমাদের শরীরের তাপে। মেয়ের হাত ধরে আমি হেঁটে যাচ্ছি। অদূরে উঁচু রেললাইনের বাঁধ, চারদিকে বাড়িঘর, গাছপালা, রোদ। কিছু মানুষের নির্মাণ, কিছু প্রকৃতির কিছু যা আমার স্মৃতির প্রক্ষেপ, কিছু কল্পনা। সাদা কবুতরের মতো এই সকালে পৃথিবীতে নশ্বরতা নেই কেন। আমাদের জানালায় তাদের অন্তহীন খেলায় মেতে আছে আলো আর বুলবুলি। ঘাসের উপর দিয়ে চঞ্চল গতিবেগে দৌড়ে চলেছে আমার শৈশবের ছায়া। উড়োজাহাজের মতো দিগন্তে দেখা যায় স্মৃতি। চারদিক থেকে ছুটে আসে আমার হারানো অংশগুলি। কিছুই হারায় না— এই বিশ্বাসে আমি কয়েক মুহূর্তের জন্য অনন্ত অবিনশ্বর হয়ে যাই।
মাকালতলার মাঠে একবার চার দিন অবিরাম সাইকেল চালিয়েছিল আসলম। মাইক বেজেছিল, লোকে ভিড় করেছিল খুব। লোকের মুখে মুখে তখন কেবল সেই সাইকেল চালানোর কথা। তিন দিনের দিন দুপুরবেলা কৌতূহলবশত দেখতে যাই। গিয়ে দেখি এক মর্মন্তুদ দৃশ্য। মাঠের মাঝখানে একটা ছোট্ট ছেঁড়া তাঁবু, তাঁবুর বাইরে একটা টেবিলে পা তুলে দিয়ে গুটি দুই ছেলে ক্লান্ত হয়ে বসে আছে। তাদের সামনে গ্রামোফোনে ঘুরছে হিন্দি গানের রেকর্ড। তারা নিস্পৃহভাবে শূন্যে চেয়ে আছে, তাঁবুর চারধারে চক্কর দিচ্ছে রোগা চেহারার আসলম। তার মাথায় কান-ছোঁয়া টুপি, গায়ের ছিটের শার্ট, পরনে পাজামা। সাইকেল ধরে ধরে চলেছে একটি ছেলে। সাইকেলের কোনও গতি নেই, অতি কষ্টে ঘুরে যাচ্ছে তার চাকা, প্রতিবার প্যাডল করতে আসলমের মুখ যন্ত্রণায় বেঁকে যাচ্ছে। তার গালের হাড় উঁচু হয়ে আছে, থুতনিতে জমেছে দাড়ি, চোখ ঘোলা লাল। আসলম ঘুরছে আর ঘুরছে। কোনও দর্শক নেই, অবিরাম সাইকেলের ঘোরা দেখতে দেখতে তারা ক্লান্ত হয়ে চলে গেছে বিষয়কর্মে। তাঁবুতে, সাইকেলে, চোখে ফুটে উঠেছে সুগভীর একঘেয়ে নিরর্থক শ্রমের কাতরতা, গতিহীন চলার ক্লান্তি। তবু ঘুরে যেতে হবে বলে ঘুরছে আসলম—ঘুরে যাচ্ছে। মাইক্রোফোনে গায়িকার গলাতেও আশ্চর্য— সেই ক্লান্তি, শ্রমকাতরতা। তাঁবুর পিছনে ডোবার ধারে এক ন্যাড়া বজ্রাহত তাল গাছ। তাঁবু থেকে চোখ তুলে উটের গ্রীবার মতো দীর্ঘ সেই তাল গাছের দিকে তাকাতেই হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতার কথা মনে পড়ে, যা মানুষকে মাঝে মাঝে লাশকাটা ঘরে ডেকে নিয়ে যায়। আসলম কি বারংবার তার প্রদক্ষিণে সেই তাল গাছটা দেখে এক ক্লান্তিহীন ঘুমের কথা ভেবেছিল? কে জানে? তবে এইটুকু জানি যে, আসলমের ওই সাইকেল চালানোর মতোই এক নিরর্থক দুর্বহ জীবন যাপন করতে করতে মাঝে মাঝে ওই তাল গাছের মতো দীর্ঘ এক নিস্তব্ধতা আমাদের ডাক দেয়। চোখ তুললেই আকাশ চোখে পড়ে, জানালার ধারে সজনের ডালে শৈশবের কবুতর এসে চুপ করে বসে থাকে দিগন্তে উড়োজাহাজের মতো, স্মৃতি দেখা দেয়— তখন এই জীবনের ক্লান্তি আর থাকে না। স্মৃতিকে বহন করে চেতনা এক অনন্ত প্রবাহকে খোঁজে। তখন কেবলই মনে হয়, আমাদের এই নশ্বর জীবনের পিছনে চিরন্তন বস্তু এক রয়ে গেছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা—২ জুলাই ১৯৭২
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন