প্রজাপতি

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

প্রজাপতির পাখনায় যে নানা রঙের চিত্র করে দেয় সে থাকে ওই গলির ভিতরদিকে শেষ মাথায়। এখন তার বয়স হয়েছে ঢের। তার কাশি ওঠে, হাঁপ ধরে, স্মৃতিভ্রংশ হয়। চোখের দৃষ্টিও কি কমে আসছে না ধীরে ধীরে? এ কাজের দামই বা দেয় কে? লোকে শুধু বাহবা দেয়। লোকটার তো তাতে খাওয়া জোটে না। তার জামা ছেঁড়া, চশমার ডাঁট ভাঙা, হাত কাঁপে। তবু প্রজাপতিরা এলে সে চুপ করে বসেও থাকতে পারে না। সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম সব তুলি দিয়ে রং করে দেয়, নকশা আঁকে। প্রজাপতিরা খুশি হয়ে উড়ে যায়।

লোকটা তার ঘর থেকে সারাজীবন বড় একটা বেরোয়নি বাইরে। সময় কোথায়? সারা ঘরে বিবর্ণ ডানা মেলে সারাক্ষণ বসে আছে হাজার হাজার প্রজাপতি। অপেক্ষা করছে কার কখন পালা আসবে। লোকটা বিরামহীন রং- তুলি নিয়ে কাজ করে যায়। চশমাটা এক-একবার নেমে আসে নাকের ডগায়। সেটা তুলে দেয়। কখনও-বা কাঁকালে ব্যথা হয়, সে একটা পাশ ফিরে বসে। কখনও কখনও মাথা ঝিমঝিম করে, তখন একটু মাথা ঝাঁকিয়ে নেয়।

আপনমনে একটু বিড়বিড় করে কথা বলার অভ্যাস আছে তার। সে কথা কাউকে শোনানোর জন্য নয়। এমনকী সে নিজেও শোনে না। তবু বলে, তাতে বুক হালকা হয়, কাজে মন আসে।

প্রজাপতিরা কোনও কথা বলে না। শুধু ডানা নাড়ে আর অপেক্ষা করে। রং হয়ে গেলে উড়ে যায়। আর কখনও ফিরে আসে না।

চোখে কম দেখে বটে, কিন্তু ইদানীং সে লক্ষ করছে, আগের মতো তত বেশি প্রজাপতি যেন আসছে না। তবে কি পৃথিবীর বেশির ভাগ প্রজাপতিরই রঙের কাজ শেষ করে ফেলেছে সে? নাকি অন্য কোনও ভালো রং করার লোকের সন্ধান পেয়েছে প্রজাপতিরা?

লোকটা বিড়বিড় করল, 'বাবা সকল, আমি কি আর তেমন ভালো রং করতে পারি না আজকাল? ভুলভাল রং দিই নাকি মাখিয়ে? নকশার কাজ কি জমছে না তেমন? মনে ধরছে না তোমাদের?'

অন্ধ গলির এই শেষ মাথায় তার একটেরে ঘর থেকে পৃথিবীর কোনও খবরই পাওয়া যায় না। লোকটির একটু ধন্দ লাগে। কাজ করতে করতে সে বিড়বিড় করে, আর কোন আবাগির বেটা কারিগর বুঝি প্রজাপতিদের কেড়ে নিচ্ছে আমার কাছ থেকে। তা এই বুড়ো বয়সে আমি কি পেরে উঠব তার সঙ্গে? ও বাবা সকল, তার কি বয়স কম? তার রং কি আরও ভালো? সে কি আমার চেয়েও বেশি ভালোবাসে তোমাদের?

সন্দেহের কাঁটা দিন দিন আরও দংশায় ভিতরে ভিতরে। প্রজাপতির সংখ্যাও যে কমছে দিনকে দিন। লোকটা অবশেষে একদিন তার রং-তুলি সরিয়ে রেখে হাত মুছে ওঠে। বাইরে যাওয়ার কোনও পোশাক তার নেই। ছিল, তবে পড়ে থেকে জীর্ণ, ধুলো হয়ে গেছে কবে। লোকটা তার ফাটাফুটো কামিজ একটু সেলাই করে গায়ে দেয়। দাড়ি ও চুল আঁচড়ে নেয়। তারপর বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। কানাগলি পেরিয়ে চারদিকে চেয়ে সে অবাক। কত যুগ কেটে গেছে, সে ঘর থেকে বেরোয়নি। ওই সেই বড় সড়ক। তার ওপাশে ছিল বিশাল এক খেত। হেমন্তে সরষের চাষ হত। ঈশানে ছিল পদ্মবন। কোথায় গেল সব। এখন চারদিকে যে কেবল মানুষের তৈরি ঘরবাড়ি, কলকারখানা।

লোকটা বিরক্ত হয়।

একজন ব্যস্ত দোকানদার হঠাৎ ভারী সুন্দর একটা গন্ধ পেল। খুব পুরনো মহার্ঘ আতরের শিশিতে স্বপ্ন ও স্মৃতির মতো যে গন্ধ লেগে থাকে অনেকটা সেরকম। সেই গন্ধ যেন আচমকা এসে বর্তমানকে ভুলিয়ে দেয়। নিয়ে যেতে থাকে অতীতের দিকে। যখন পৃথিবীর আরও গাছপালা ছিল। নদীর জল ছিল সুপেয় ও টলটলে। যখন যখন...

দোকানদার মুখ তুলে তাকিয়ে একজন বুড়ো মানুষকে দেখতে পায়। দীনদরিদ্র চেহারা। কিন্তু বুড়ো লোকটির চোখ দুটি কী গভীর। কী মায়াময়!

লোকটা সামান্য ভ্রুকুটি করে বলে, 'আমার প্রজাপতিরা সব কোথায় গেল বলতে পারো?'

দোকানদার এত ব্যস্ততার মধ্যেও এই অপ্রয়োজনের প্রশ্ন শুনে বিরক্ত হল না। তার মনে হয় প্রশ্নটা জরুরি। কোনও-না-কোনও দিক থেকে অবশ্যই জরুরি। সে একটু ভাবল। তারপর বিনীত ও দুঃখিতভাবে মাথা নেড়ে বলল, 'জানি না।'

'কে বলতে পারে?'

দোকানদার মৃদু হেসে বলল, 'কেউ বোধহয় পারে না।'

লোকটা বিরক্তির সঙ্গে মাথা নেড়ে বেরিয়ে আসে।

একজন ব্যস্ত কর্মচারী সংগীতের ঝংকার শুনে চমকে ওঠে। এই সংগীত সে কোথায় শুনেছে? না, সংগীত তো নয়। এ একজনের কণ্ঠস্বর। কিন্তু যেন সুরে সুরে ভরা। এরকম কণ্ঠস্বর সে কখনও শোনেনি। কিংবা শুনেছিল। হাজার হাজার বছর আগে, কোন জন্মান্তরে। সেই শব্দ কি স্মৃতিতে রয়ে গেছে আজও। আশ্চর্য!

কর্মচারী লোকটিকে ভালো করে দেখে। না, একে সে চেনেও না। কিন্তু ওই কণ্ঠস্বর যে তাকে এ অগাধ স্মৃতির সাগরে ঠেলে দিচ্ছে। ঢেউ এসে নিয়ে যাচ্ছে তাকে মাঝদরিয়ার দিকে। সে আকুল স্বরে বলে, 'আমি তো জানি না প্রজাপতিদের খবর।'

'তাহলে কে জানবে?'

কর্মচারী দীর্ঘ একটি শ্বাস ফেলে বলে, 'কেউ, জানে কি না তাও জানি না তো।'

হতাশ লোকটা আবার পথে বেরিয়ে আসে। এক চিত্রকর মুহ্যমান হয়ে পট আঁকছিল, হঠাৎ একটু আলো এসে পড়ল তার পটে। পটখানি বড় অপরূপ দেখাতে লাগল। চিত্রকর মুখ তুলে চায়। তার দাওয়ায় রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে একজন বুড়ো মানুষ। তার শরীরের খাঁজে খাঁজে আলোর রেখা। যেন ওই সূর্য থেকে নেমে এল। আর সেই আলোর মধ্যে সূক্ষ্ম বর্ণালি। আলোর এত গভীরতা কখনও অনুভব করেনি চিত্রকর। এই আলো যেন সব ব্যর্থতাকে ঢেকে দেয়। এই আলো থেকেই জন্ম নেয় পটুয়ার চোখ।

'এখন প্রজাপতিরা আর আমার ঘরে তেমন আসে না, কেন বলো তো? আমি ছাড়া কে তাদের পাখনায় রং করে দেয়?'

চিত্রকর অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে বলে, 'আমি নই। আমি ওরকম রঙের কাজ জানি না।'

'তাহলে কে করে?'

'কেউ না।'

'আমার প্রজাপতিরা তবে আসছে না কেন?'

চিত্রকর কেঁপে ওঠে। এইখানে একদিন মাঠভরা প্রজাপতি ছিল, সে জানে। এখন আর মাঠ নেই। তত প্রজাপতি নেই। কেন নেই? এই প্রশ্নে সে নিজেও উদ্বিগ্ন হংয়। দুঃখিত হয়। মাথা নেড়ে বিষণ্ণ মুখে বলে, 'জানি না তো!'

লোকটা বেরিয়ে পড়ে আবার। দিনভর একে-ওকে-তাকে জিজ্ঞেস করে। কিন্তু হদিশ পায় না।

দিনশেষে ক্লান্ত লোকটা ফিরে আসে ঘরে। এখনও প্রজাপতিরা আছে। হাজার হাজার নয়। কয়েকশো মাত্র। একদিন কমতে কমতে...

লোকটা আজ তুলি ছোঁয় না। চুপ করে জানলার ধারে বসে বিড়বিড় করে বকে, 'বাবা সকল, তোমরা যেদিন ফুরোবে সেদিন আমার চোখের জ্যোতি নিভে যাবে। কাজ ছাড়া আমি কি বাঁচতে পারি?'

বিবর্ণ একটা প্রজাপতি উড়ে এসে তার কোলে বসে। পাখা কাঁপায়।

'দাঁড়াও বাবা সকল, ব্যাপারটা একটু বুঝে দেখি। আমার এই বুড়ো মগজে তেমন ঠাহর করতে পারছি না বৃত্তান্তটা।'

বিবর্ণ প্রজাপতিরা উড়ে উড়ে একে একে কাছে আসে তার। কোলে বসে, মাথায় বসে, হাতে বসে। এইভাবে ছেয়ে ফেলে তাকে। লোকটার ভারী আহ্লাদ হয়। প্রজাপতি নরম পাখনায় স্পর্শ করে তার চোখ, নাক, আঙুলের ডগা। সেই সুখস্পর্শে এক অপার্থিব শিহরন।

লোকটা খোলা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে পৃথিবীকে বলে, 'আমি যে এই ছাড়া আর কোনো কাজ জানি না।'

লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কিন্তু রং আর তুলির দিকে আর হাত বাড়াতে ইচ্ছে করে না তার। বিড়বিড় করে সে বলে, 'এই ভালো বাবা সকল, তোমরা আজ ঘিরে থাকো আমাকে। আজ এইরকম হোক।'

আস্তে আস্তে লোকটাকে ঢেকে ফেলে প্রজাপতিরা। তার ছেঁড়া কামিজ, রুক্ষু দাড়ি, লোলচর্ম সব ঢেকে থাকে। একথোকা ফুলের মতো দেখায় তাকে।

ভোরের দিকে একটা পাগলা বাতাস এল। ঝাঁক বেঁধে প্রজাপতি উড়ে গেল বাইরে। তারপর আর-একঝাঁক। রঙিন, ফুরফুরে কাগজের ফুলের মতো প্রজাপতি। লোকটা আর চোখ মেলে তাকাল না। কিন্তু তার দেহ থেকে অন্তহীন প্রজাপতি উড়ে যেতে লাগল বাইরের পৃথিবীর দিকে। হাজার হাজার। লক্ষ লক্ষ।

আনন্দবাজার পত্রিকা—২০ ডিসেম্বর ১৯৮১

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%