শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

'কোন মহামায়া?' বলতে বলতে তিনি উত্তেজনায় বিছানার ওপর উঠে বসলেন। ওঁর বোধহয় রক্তচাপের রোগ, সে কারণেই পলকে মুখ রাঙা হয়ে উঠল, বড় ছেলেমানুষের মতো আনন্দে উপচে-পড়া হাসি ওঁর মুখে। 'মহামায়ার মাথায় কত চুল ছিল জানো? এই এত একরাশ।' তিনি দু-হাতে অনেকটা ছড়িয়ে দেখালেন, 'কোঁকড়া কোঁকড়া কী ঘন আর কালো চুল ছিল ওর। 'বললে বিশ্বাস করবে না, সেই চুল বাঁধতে দু'জন লাগত। মস্ত খোঁপা মাথায় নিয়ে যখন হাঁটত তখন মনে হত, ওর মাথা টলমল করছে, এক্ষুনি ও পড়ে যাবে। বাব্বা! কত বড় খোঁপা?' শূন্যে একটি কলস ধরে রাখার মতো করে তিনি দু-হাত তুলে দেখালেন, স্মৃতিতে ফিরে যাচ্ছিলেন বলে ওঁর চোখ অন্যমনস্ক, মুখে তেমনি চাপা হাসি। হঠাৎ খেয়ালে ফিরে এসে হাত বাড়িয়ে বললেন, 'আরে! তুমি দাঁড়িয়ে কেন? বোসো।' খাটের পাশেই চেয়ার। বসতে যাচ্ছিলুম, উনি অধৈর্যের স্বরে বললেন, 'আরে না, চেয়ারে না। অত দূরে কথা হয় না। এই বিছানাতেই বোসো।' লেপে ঢাকা পা গুটিয়ে নিয়ে বললেন, 'বোসো বাবা।' নিজের রুক্ষ এলোচুল তিনি দু-হাতে পিছনদিকে ঠেলে দিচ্ছিলেন। বিকেলের শেষ আলোটুকু ওঁর মুখের একপাশে এসে লেগে ছিল, আলোর বিপরীত দিক থেকে আমি ওঁর ছায়ামতো মুখের দিকে চেয়ে ছিলাম। উনি আমার দিকেই চেয়ে ছিলেন, বললেন, 'তোমাকে দেখেই চেনা উচিত ছিল। একেবারে মায়ের মতো মুখ। মহামায়ার সঙ্গে দেখা নেই প্রায় চল্লিশ বছর, তবু মহামায়ার মুখ আমার হুবহু মনে আছে। দেখতে সুন্দর ছিল বলে না, কত সুন্দর মেয়ের মুখই তো ভুলে গেছি, মহামায়াকে মনে আছে শুধু ওই চুলের জন্য। ওর পিছনে কত ঘুরে ঘুরে বন্ধুত্ব পাতিয়েছিলুম জানো। লক্ষ্মী মেয়ে ছিল মহামায়া, আমরা প্রায়ই ওকে দাঁড় করিয়ে চুল মেপে দেখতুম, আর ও চুপটি করে দাঁড়িয়ে আমাদের কাণ্ড দেখে হাসত।' ওঁর প্রাচীন মুখে ছেলেমানুষের ঠোঁট-টেপা দুষ্টু হাসি দেখে আমি হেসে মায়ের জন্য অহংকারে আর লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলুম। উনি আবার বললেন, 'একেবারে মায়ের মতো মুখ তোমার। কী বলব তোমাকে, সাত-আট বছর ধরে আমি প্রায় বিছানাতেই পড়ে আছি। রোগে এত ভুগছি বলেই কি না কে জানে আজকাল আর খুব চেনা লোকেরও নাম মনে থাকে না, রোজ দেখা হয় এমন লোকেরও নাম ভুলে যাই। কিন্তু যেই তুমি বললে, আমার মা-র নাম মহামায়া, অমনি বুকের ভিতরটা চমকে উঠল, সারদেশ্বরী আশ্রমের সে সময়ের সব মেয়ের মুখ যেন সারি সারি ভেসে উঠল চোখের সামনে। ভাবতেই হল না, মহামায়াকে মনে পড়ে গেল, যেন কালকেও দেখেছি ওকে। দু'জন মহামায়া ছিল আমাদের, তোমার মা ছিল চুলওয়ালা মহামায়া।' বলতে বলতে উনি ঝুঁকে পড়ে ওঁর একটু উষ্ণ নরম একখানা হাত রাখলেন আমার হাতের ওপর। 'মহামায়ার কথা আমি একটুও ভুলিনি। একা একা থাকি, আর প্রায়ই সেই দিনের মধ্যে চলে যাই, মহামায়ার কথা আমার আজও ভীষণ মনে পড়ে। কতদিন রাত্রে দুঃস্বপ্ন দেখে সকালে উঠে মনে হয়েছে, মহামায়াকে, সবাইকে চিঠি লিখি—তোমরা সবাই আমার কাছে একবার এসো। যারপরনাই মনে পড়ে যায় যে, কারোরই ঠিকানা জানি না, কে কোথায় আছে, বেঁচে আছে কি না, তাও জানি না। কত বছর হয়ে গেল।' আমি লক্ষ করলুম যে, ওঁর হাত কাঁপছে না, কিন্তু বোধহয় ওঁর রক্তের ভিতর কিংবা অস্থিমজ্জার ভিতরে কোথাও টানমতো কিছু একটা কাঁপছে। তা শুধু আবেশ না শুধু দুঃখ না, শুধু ভালোবাসা না, তার চেয়েও ভিন্ন কিছু। সেই কল্পনা খুব ধীরে ধীরে আমারও অস্থিমজ্জার ভিতরে চলে আসছিল। মায়ের সেই কৈশোরে আমি যে কোথায় ছিলুম। আমার মায়ের সেই কিশোরী মুখ একবার দেখতে বড় সাধ হয়। ওঁর একটা হাত আমার হাতের ওপর উনি নিঃসংকোচে অন্য হাতটি বাড়িয়ে আমার মাথার সামনে চুল সরিয়ে দেখে নিয়ে বললেন, 'ও মা। তোমার সেই চুল কই? এইটুকু বয়সেই মাথার সামনেটা যে ঢাকা।' একটু ধমকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়েই হেসে ফেললেন, 'আর এই বুঝি এখনকার স্টাইল, এই ছোট করে চুল ছাঁটা? একে চুল না কী বলে?' মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকি বলে এইটুকু বয়সেই আমার বুকের ভিতরে বাদলা বাতাস লাগছিল, ধরে-আসা গলা সামলে হেসে বললুম, 'আমার চুল উঠে যায় বলে ছোট করে ছাঁটি। ওতে কম ওঠে।' উনি গলা নামিয়ে গোপনে বলার মতো করে বললেন, 'মহামায়া বকে না? যার মায়ের মাথায় অত চুল, তার মাথার এই ছিরি দেখে বকে না?' যেন বড় ছেলের কাছ থেকে কৌশলে কথা বের করে নিচ্ছেন, ওঁর এই ভাব দেখে আমার স্বভাবত বয়স্ক গম্ভীর মনের ভিতর আমি প্রাণপণে শিশু হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি, মাথা নেড়ে বলি, 'বকে। বিচ্ছিরিভাবে বকে চলে, আমি মরে গেলে এরকম করে চুল কাটিস। আমি তোর ওই ন্যাড়া-ন্যাড়া মাথা দেখতে পারি না।' উনি ঝুঁকে-থাকা মুখ ধীরে ধীরে সরিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসে বললেন, 'ঠিকই বলে। আমাদের আমলে পুরুষদের স্টাইল ছিল বাবরি চুল আর বড় জুলপি।' খিলখিল করে হাসলেন। তারপর আস্তে আস্তে ওঁর মুখ শান্ত হয়ে এল। শুধু চোখে-মুখে অন্তর্নিহিত আনন্দের স্মিত ভাবটুকু ছড়িয়ে রইল। বললেন, 'তুমি যে খুঁজে খুঁজে আমার কাছে এলে, একে ভাগ্য ছাড়া কী বলে? কী জানি, কেন মহামায়ার কথা আমার এত মনে পড়ে। মহামায়ার কথা অত ভাবি বলেই বোধহয় ভগবান তোমাকে আমার কাছে এনে দিলেন। কী নাম তোমার? নাম বলতেই উনি আবার কিশোরী মেয়ের মতো হেসে উঠলেন, 'জীবনলাল, সে কী! ও তো পুরনো নাম। মহামায়া ওই নামে তোমাকে ডাকে?' লজ্জায় মুখ নিচু করে আমি মাথা নাড়ি, 'না। আমাকে অন্য নামে ডাকে।' ওঁর প্রাচীন রুগণ মুখখানায় আবার মুখ-টেপা দুষ্টু হাসি ফুটে ওঠে, 'সে নাম কি খুব খারাপ? পচাগচা গোছের কিছু?' আমি জোরে মাথা নাড়ি, না। মা-র মেজাজ ভালো থাকলে আমাকে বাবা বলে ডাকে, কখনও রুন্টুবাবা। মেজাজ ভালো না থাকলে শুধু রন্টু। আমার ডাকনাম রন্টু।' বড় খুশি হলেন উনি। মাথার রুক্ষ চুল বার বার হাত দিয়ে পিছনে ঠেলে দেওয়া ওঁর প্রায় মুদ্রাদোষ। মাথার চুলে আঙুল চলন্ত রেখে উনি বললেন, 'রন্টুবাবা, বেশ নাম। আমিও তোমাকে ওই নামে ডাকব। কিছু মনে কোরো না, আমি নাম বড় ভুলে যাই। যদি তোমার নামও কখনও মনে না পড়ে তাহলে আমিও তোমাকে বাবা বলে ডাকব। কেমন?' টের পেলুম উনি যে হাতটি আলগোছে আমার হাতের ওপর রেখেছেন সেটি ক্রমে ঘেমে উঠল। একটুক্ষণ অন্যমনস্ক থেকে উনি আবার হাসলেন, 'আমার যে ছেলেটা মরে গেছে তার নাম রাখা হয়নি। তিন মাসের হয়ে মরে গেল, তার মধ্যেই এত ভুগছিল যে, আমরা ওর অসুখের ভাবনাচিন্তায় নাম রাখার কথাই ভুলে গিয়েছিলুম। কেবল ছেলেটা বা বাছাটা বলে কাজ চালিয়ে নিতুম। ছেলেটা কিছুই ভোগ করতে পারল না। কপাল। বড়লোকের ঘরে জন্মানো বৃথাই। বাপ-মায়ের আদর পেল না, একটা নামও সময় করে দিয়ে উঠতে পারলুম না।' বলতে বলতে আমার উনি বেশ জোরে হেসে উঠলেন, 'তোমাকে দেখে আমার মরা ছেলের কথা মনে পড়ছে, এ কথা বললে, খুব বিচ্ছিরি শোনাবে, না! আসলে তা নয়, রন্টুবাবা, নামের কথায় হঠাৎ মনে পড়ে যাচ্ছিল কার যেন নামই দেওয়া হয়নি— মনে করতে করতে বাচ্চাটার কথা মনে পড়ে গেল। নইলে ওর কথা আমার মনেই নেই।' উনি স্মিত মুখে চুপ করে রইলেন। এইসব কথা শুনে কী করতে হয় তা জানা নেই বলে আমি মুখ নামিয়ে রাখলুম। বেডশিটের ওপর দুটো মাছি খেলছে, ওঁর সারা রোগা হাতখানা আমার হাতের ওপর রাখা, আমি হাত নাড়তে পারছি না।
মুখ নিচু করে ছিলুম বলেই মেয়েটির ঘরে আসা আমি টের পাইনি। ওঁর গলায় 'একে চিনিস?' এই কথা শুনে মুখ তুলে দেখলুম যেন মায়ামন্ত্রবলে একটি মেয়ে বাতাসের ভিতর থেকে এসে সামনে দাঁড়াল, ওষুধ-রাখা টেবিলটার ওপাশে। এক পলক আমাকে দেখে চোখ সরিয়ে নিল। ওঁর দিকে চেয়ে মাথা নাড়ল— না, চেনে না। উনি আমার দিকে চেয়ে হাসলেন। 'এই আমার মেয়ে রিখিয়া। এটাই একমাত্র। আর আমার কিছু নেই। উনি মেয়ের দিকে হাসিমুখ ফিরিয়ে বললেন, 'এ হচ্ছে রন্টুবাবা, মহামায়ার ছেলে।' সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটির চোখ বড় হল, মায়ের দিকে ঝুঁকে চাপা স্বরে বলল, আমি স্পষ্ট শুনতে পেলুম, 'কোন মহামায়া? চুলওয়ালা মহামায়া?' উনি হেসে উঠে আমার দিকে তাকালেন, 'দেখো, মহামায়ার কথা এই বাড়ির সবাই জানে। চল্লিশ বছর দেখা নেই, চিঠিপত্র নেই, তবু ওর কথা এত মনে আছে যে, সবাইকে বলে বেড়াই।' আমার হাতের ওপর থেকে ধীরে ধীরে উনি হাত সরিয়ে নিলেন, তারপর হাতটা শূন্যে তুলে রিখিয়ার কাঁধের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন, এমনভাবে যেন আঁকড়ে ধরতে চান। শ্যামলা-সুন্দর কিশোরী রিখিয়া, তার ছিপছিপে শরীর যেন কোন অদৃশ্য ছিলার টানে নোয়ানো ধনুক, গুটিসুটি হয়ে মায়ের বুকের কাছ থেকে বিছানায় বসল, আমার মুখোমুখি। আমি প্রাণপণে চোখ সরিয়ে রাখলুম।
আমি চোখ না তুলে ওঁর গলা শুনলুম, 'জানো রন্টুবাবা, রিখিয়া কেন আমার কাছে এসেছে?' হাসির শব্দ আর সেই সঙ্গে রিখিয়ার 'উঃ মা, চুপ করো না।' 'উনি চুপ করলেন না', 'বুঝলে, কষ্ট হচ্ছে, রিখি ঘড়ি ধরে এসে দেখে যায় আমি রেগে গেছি কি না। যদি চোখ বুজে কখনও শুয়ে থাকি, তবে নাকের কাছে হাত নিয়ে দেখে শ্বাস চলছে কি না, বুকে হাত দিয়ে দেখে ঢিপঢিপ করছে কি না! মাঝে মাঝে ধরা পড়ে যায়, চমকে চেয়ে দেখি পালিয়ে যাচ্ছে।' রিখিয়া একবার মাথা ঝেঁকে বলল, 'মোটেই না।' উনি চুপ করে রইলেন। খানিকক্ষণ বাদে আবার ওঁর হাসির শব্দ শোনা গেল— 'রিখিয়া নামটা খুব অদ্ভুত, না রন্টুবাবা! ওর এ নাম রেখেছিল ওর বড়মামা। তার ছিল পেটের ব্যামো, বিহারে রিখিয়ার চেঞ্জে গিয়ে সেই রোগ সারল, ফিরে এসে দেখে ভাগনি হয়েছে, নাম রাখল রিখিয়া। আমাকে বলল, তোর মেয়ের রোগবালাই রুখে দিলুম। ওর কোনও পেটের রোগ হবে না, রিখিয়া নামের গুণ দেখিস। নামের গুণ কি না জানি না। রন্টুবাবা, তবে রিখি আমাকে ভোগায়নি। জন্মের পর থেকেই ও দেখছে আমি বিছানায় শোয়া। বিছানাই বলতে গেলে আমার ঘরবাড়ি, পৃথিবী, জীবন যা বলো। ও বোধহয় জেনেশুনেই এসেছিল আমার পেটে, লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে ছিল বরাবর, একটুও ভোগায়নি।' আমি আড়চোখে দেখলুম উনি দেয়ালের দিকে অন্যমনে তাকিয়ে আছেন, আর আলতোভাবে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন রিখিয়ার কাঁধ থেকে হাত পর্যন্ত। রিখিয়ার কৌতূহলী চোখ আমাকে দেখছিল, একটু আড়ষ্ট হয়ে আমি আবার মুখ নামিয়ে নিই। রিখিয়া কী অদ্ভুত নাম।
উনি রিখিয়ার কাঁধ ছেড়ে খোলা চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন, মুখে অন্যমনস্ক হাসি, বললেন, 'রিখিয়ার আরও একটা নাম আছে, জানো রন্টুবাবা?' রিখিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল, 'আ! মা...।' উনি আমার দিকে ঝলমলে চোখে চেয়ে বললেন, 'ওর বাপ ওকে ডাকে গোগো। কেন জানো? ওর বাবা কাজের মানুষ, পাঁচ-সাতটা ব্যাবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকে সব সময়। রিখিয়া প্রায় সময়েই বাপের অফিসঘরে গিয়ে ওকে জ্বালাত, আর ওর বাবা ওকে গো, গো বলে তাড়াত। সেই থেকে মেয়ের নাম হয়ে গেল গোগো।' মুখ নিচু করে আমি একটু হাসলুম। তারপর মুখ তুলে রিখিয়ার চোখে চোখ রেখে প্রথম কথা বললুম, 'আমার ছোট বোনেরও ওইরকম একটা নাম আছে।' কিশোরী রিখিয়ার চোখে হাসি মিটমিট করে উঠল। লাজুক মুখে জিজ্ঞেস করল, 'কী নাম?' বললুম, 'গুনগুনিয়া।' খিলখিল করে হেসে ওঠে রিখিয়া, সে হাসি দেখে মনে হয়, সে মায়ের কাছে ওরকম হাসতে শিখেছে, নয়তো মা তার কাছে। বলল, 'কেন, এরকম নাম কেন?' আমি রিখিয়ার হাসিমুখ দেখতে দেখতে লজ্জায় আমার মাথা নামাই, 'ওর অনেক নাম। ভালোনাম পাঞ্চালী, বাবা ডাকে থুড়ি, মা ডাকে খুকু। আর সারাদিন গুনগুন করে গান গায় বলে আমি ডাকি গুনগুনিয়া।' রিখিয়া মাথা কাত করে বলে, 'পাঞ্চালী বেশ নাম। গুনগুনিয়া আরও সুন্দর।' বলেই সে তার মায়ের দিকে চেয়ে একটু ঘুরে বলে, 'মা, আমার একটা নামও সুন্দর নয়। গোগো, রুখু, রখি, রিখিয়া —একটাও না।' উনি নিঃশব্দে হেসে বললেন, 'কত দীনদুঃখীর কত ভালো নাম থাকে। নামে কী যায়-আসে? পছন্দ না হলে বিয়ের পর নাম পালটে নিস। আজকাল তো ওরকম হয়।' রিখিয়া 'ইস' বলে মায়ের বুকের কাছে মুখ গুঁজে দিল। উনি হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, 'তুমি কি খুব লাজুক, রন্টুবাবা?' পলকেই আমার নাকে-মুখে রক্ত ছুটে আসে বলে আমি মুখ নামাই। উনি বললেন, 'কিছু মনে কোরো না। আজকালকার ছেলেদের আমার একদম পছন্দ হয় না। চোঙা প্যান্টা পরে রাস্তায় শিস দিয়ে হাঁটে, মাথা ফাঁপিয়ে চুল আঁচড়ায়। দেখ-না রিখি এইটুকু মেয়ে, প্রায় নাকি স্কুলের রাস্তায় ছেলেরা ওকে ইশারা-ইঙ্গিত করে...' রিখিয়া চাবুকের মতো ছিটকে উঠে বলল, 'মা, এরকম করলে কিন্তু...।' উনি হাসিমুখে যেন ওঁর পোষ-মানা বেড়ালকে টেনে নিচ্ছে, এইভাবে রিখিয়াকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, 'রিখি, রন্টুবাবাকে কিছু খেতে দিবি না? ফ্রিজে রসগোল্লা আছে, আর একটু দইয়ের শরবত...।' আমার দিকে মায়াবী চোখ তুলে বললেন, 'একটু খাও রন্টুবাবা।' রিখিয়া আমার দিকে চেয়ে একটু হেসে উঠে গেল। রিখিয়া দরজার কাছে গেলে উনি ডেকে বললেন, 'আর সেই ফোটোটা আনিস রিখি।'
উনি আমার দিকে চেয়ে হঠাৎ বললেন, 'বাইরেটাকে আমার যে কী ভয়, রন্টুবাবা। ঝড়বাদল, গাড়িঘোড়া, গুন্ডা-বদমাইশ, শিস-দেওয়া বখাটে ছেলে— আরও কত কী। সারাদিন শুয়ে শুয়ে এইসব ভাবি। রিখির জন্য ভাবি, রিখির বাবার জন্য ভাবি...' বলতে বলতে উনি হাসলেন।
রিখিয়া ফিরে এল। তার হাতের প্লেটের দিকে চেয়েই আমি বললুম, 'এত খাব না।' রিখিয়া ঠোঁট উলটে হাসল, 'এত কোথায়?' টুকুমাসি বড়ো চোখে চেয়ে বললেন, 'ইস! উনিশ-কুড়ি বছরের ছেলে, খাবে না কী?' আমি রিখিয়ার মুখ থেকে চোখ নামিয়ে প্লেট হাতে নিলুম। বললুম না যে আমার বয়স বাইশ।
খাওয়া হয়ে গেলে টুকুমাসি সেই ঠোঁট-টেপা দুষ্টু হাসি হাসলেন। 'রন্টুবাবা, এবার তোমাকে একটা জিনিস দেখাব।' বলতে বলতে উনি আমাকে সামনে পুরনো লাল-হয়ে-আসা একটা গ্রুপ ফোটো তুলে ধরলেন, 'খুঁজে বের করো তো কোনটা তোমার মা, আর কোনটা আমি।'
মাকে চিনলুম এক পলকেই। সেলাইয়ের মেশিনের সামনে বসা রোগা কিশোরী, মস্ত চোখ, চুলের ঢল নেমেছে পিছনে প্রতিমার চালচিত্রের মতো, দুখানা হাতের একটি হুইলের ওপর, অন্যটি সুঁচের কাছে শান্ত, কনুই-ঢাকা ব্লাউজ। চেনা অথচ অচেনা এই আমার মা? আমি বিস্ময়ে হেসে উঠলুম, ব্যগ্র আঙুল বাড়িয়ে দেখালুম, 'এই তো আমার মা'। টুকুমাসি হেসে উঠলেন, 'ঠিক। নিজের মা-কে চিনতে একটুও দেরি হয়নি। আর আমি?' ফোটোতে সারি সারি ভালোমানুষ মেয়েদের শান্ত আশ্রমিক মুখ, প্রায় একই রকমের পোশাক। আমি ব্যস্ত আঙুল বাড়িয়ে খুঁজতে লাগলুম। টুকুমাসি ম্লান একটু হেসে বললেন, 'বরং আমার মুখটা আর-একবার ভালো করে দেখ নাও রন্টু বাবা। শুনে বড় লজ্জা পেলুম, আমার হাত ঘেমে উঠল—এর ভিতরে কোনটা টুকুমাসি। সামনে বসে একসারি মেয়ে, পিছনে দাঁড়িয়ে আর একসারি—আমার অনির্দিষ্ট অসহায় আঙুল ঘুরতে লাগল। খেয়াল করিনি, রিখিয়া ঝুঁকে ছিল আমার ঘাড়ের পাশে। হঠাৎ তার বাড়িয়ে-দেওয়া হাতের আঙুল আমার আঙুলে ঠেকল ফোটোর ওপর, তার চাপা গলা আমার কানের কাছে ফিসফিস করে ওঠে।' 'এই আমার মা?' তারপর আরও চাপা সুরে 'বোকা কোথাকার।' টুকুমাসি চোখ বুজে বালিশে হেলান দিয়ে বললেন, 'সত্যিই আর চেনা যায় না, রন্টুবাবা।' শুনে লজ্জায় আমার কান্না পাচ্ছিল। এই তো টুকুমাসি আমার আঙুলের নিচে, আমার কিশোরী মায়ের পাশে বসা, যত রোগা তত সুন্দর এই তো টুকুমাসি। উনি চোখ বুজে শান্ত গলায় বললেন, 'এই আমি রন্টুবাবা, তোমার মায়ের পাশে।' হাসলেন, 'একজন রন্টুবাবার মা, অন্যজন রিখিয়ার মা। বিশ্বাস হয় না রন্টুবাবা, না?'
অনেকক্ষণ পর আমি সিঁড়ি বেয়ে আস্তে আস্তে নেমে যাচ্ছিলুম। পিছনে রিখিয়া, দরজার কাছে গিয়ে মুখ ফিরিয়ে বললুম, 'আসি'। রিখিয়া সিঁড়ির শেষ ধাপটায় দাঁড়িয়ে কৌতূহলী চোখে আমাকে দেখছিল, বলল, 'আবার আসতে হবে।' বললুম, 'আসব।'
রাস্তায় নেমে হঠাৎ খেয়াল হল, আমার বুকপকেটে মায়ের চিঠি। টুকুমাসিকে লেখা। তাতে লেখা, রন্টু তোমার কাছে যাচ্ছে। এ বছর বি.এ. পাস করল। ওকে একটু দেখো, যদি পারো, কাজের একটু সুবিধে করে দিও। বড় দুঃখে-কষ্টে আছি... ইত্যাদি। চিঠিটা দেওয়া হল না টুকুমাসিকে।
কিন্তু তার জন্য আমার দুঃখ ছিল না। আমি হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে বললুম, তোমার কাছে আবার আসব, টুকুমাসি। একটু থেমে আবার বললুম, তোমার কাছেও আসব রিখিয়া। তারপর একটু দ্বিধা, একটু লজ্জা আমাকে পেয়ে বসল।
কেননা আমি তো জানি, একদিন সুসময়ে রিখিয়ার সঙ্গে... আমার ভালোবাসা হবে।
আনন্দবাজার পত্রিকা—২৩ এপ্রিল ১৯৬৭
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন